জুতোয় রক্তের দাগ – ১২

১২.

সকাল আটটায় মেজর সমুদ্রের গায়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “উঃ, কী সুন্দর। কী মহান। তাকালেই বুক ভরে যায়।

পেছন থেকে ব্রাউন ফোড়ন কাট, “ফুলের বুকেই পোকা থাকে।”

মেজর খিঁচিয়ে উঠলেন, “কী থাকে সেটা আমি বুঝব। তুমি বলার কে? মাতব্বরি আমি মোটেই সহ্য করতে পারি না। এই পাজিটাকে সঙ্গে নেওয়ার যে কী দরকার ছিল তা জানি না।

মার্শাল বললেন, “তোমার গোয়েন্দা-বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করো।

অর্জুন কোনও জবাব না দিয়ে ব্রাউনকে ইশারা করল আর না মুখ খুলতে। সবাই এখন তৈরি। মার্শালের লোকজন ভাসমান সাবমেরিনটিকে শেষবার পরীক্ষা করে নেমে এল। মার্শাল বললেন, “বন্ধুগণ, এবার যাত্রা শুরু করা যাক।”

হঠাৎ মেজর হাত তুললেন, “মার্শাল, একটা কথা। জলের তলায় বিয়ার খাওয়া যাবে?”

মার্শাল হাসলেন, “তোমার জন্যে কোনও না নেই।

“থ্যাঙ্ক ইউ।” মেজর যেভাবে পা ফেলে এলেন, তাতে মনে হল হিটলার প্যারিসে নামছেন। সাবমেরিনের ভেতরের আসনগুলো বেশ আরামদায়ক। এটি জলের নীচে যখন চলে তখন ওপরের ছাদ বন্ধ থাকে। জলের ওপরে উঠে এলে লম্বা নৌকো হয়ে যায়। দুটো বড় চোঙা আছে বাতাস ঢোকার জন্যে। এ ছাড়া অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে প্রয়োজনের জন্যে। মার্শাল বসলেন না স্টিয়ারিং-এ। যদিও চারজনের জন্যেই এর ওজন বরাদ্দ তবু তিনি একজন ড্রাইভার নিলেন কর্মচারীদের মধ্যে থেকে। চারজনের বেশি হয়ে গেছে বলে মেজর আপত্তি তুলেছিলেন। মার্শাল হেসে সেটা বাতিল করলেন, “জুনিয়র ডিটেকটিভের অনারে আমরা না হয় নিয়ম ভাঙলাম। অবশ্য মালপত্র ও মানুষের সম্মিলিত ওজন এর বহনক্ষমতার অনেক নীচেই রয়েছে।

চালু হল ইঞ্জিন। এখন এটি আর সাবমেরিন নয়। সাতসকালেই মেজর বিয়ারের ক্যানে ঠোঁট দিলেন। আড়চোখে একবার ব্রাউনকে দেখলেন, তারপর বললেন, “সমুদ্রে বসে বিয়ার খেতে আমার চিরকালই ভাল লাগে। সবার মগজে তো এসব ঢুকবে না।”

ব্রাউন কথা বলে বসল, “বিয়ার পুরুষমানুষের পানীয় নয়।”

“কী? এত বড় কথা? আমি পুরুষ নই?” গর্জন করে উঠলেন মেজর। “আমি ওসব কিছুই বলিনি। বিয়ার নিয়ে কথা বলেছি।” ব্রাউনের মুখ নির্বিকার।

চটপট হাত তুলেন মার্শাল, “তা যাই বলো মেজর, তোমার যা শরীর, তাতে আমি বলি কি, বিয়ারের বদলে স্কচ খাওয়া উচিত। গতকাল তোমার জন্যে দুটো ভাল বোতল এনেছি। সারপ্রাইজ দেব বলে বলিনি।”

রাগটা টুক করে গিলে ফেললেন মেজর, “তুমি হোস্ট, তোমার কথা আলাদা। বলছ যখন তখন খাব কিন্তু সেটা অন্য কারও উপদেশ শুনে নয়।

মার্শাল চটপট একটা গ্লাস, এক জাগ বরফের টুকরো আর দু-দুটো স্কচের বোতল বের করে দিল। অর্জুনের ব্যাপারটা ভাল লাগছিল না। এইরকম সময় মেজরের এইসব খাওয়া উচিত হচ্ছে না। বিয়ার খেলে ওঁর কোনও অসুবিধে হয় না, কিন্তু দু-দুটো স্কচ হাতের মুঠোয় পেলে কী হবে কে জানে!

মার্শাল বললেন, “এবার বলো কোনদিকে যেতে হবে?”

প্রশ্নটা অর্জুনকেই করা। সে চারপাশের শান্ত সমুদ্রের দিকে তাকাল। মেজর বললেন আগ বাড়িয়ে, “জায়গাটা মেপে এসেছি। সোজা উত্তর দিকে চলো।’

মার্শাল ড্রাইভারকে সেই নির্দেশ দিলেন। অর্জুন একটু ধন্দে পড়ল। কাগজে লেখা ছিল দাঁড়-টান নৌকোয় এক ঘণ্টার পথ। সেটা ঠিক কোন্ জায়গা থেকে নৌকো যাত্রা শুরু করেছিল তার ওপর নির্ভর করছে। যদিও গতকাল মেজর নিশ্চিত হয়েছিলেন জায়গাটা দেখে কিন্তু সেটাই সঠিক জায়গা কি না তা কে বলতে পারে।

ভাঙা-ভাঙা ঢেউয়ের ওপর তরতর করে ভেসে যাচ্ছিল যানটা। ইঞ্জিনের মৃদু শব্দে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে যাচ্ছিল সাগরপাখিরা। অর্জুন দেখল ব্রাউন একদৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ জিজ্ঞেস করতেই চোখ না সরিয়ে ব্রাউন জবাব দিল, “তোমরা কেউ হাঙরটার কথা মনে রাখছ না, এটা ঠিক ব্যাপার নয়। যদি এসে যায় তা হলে কী করব বুঝতে পারছি না।

অর্জুন বলল, “এখন পর্যন্ত তো ওটা কোনও নৌকোকে জলের ওপর উঠে এসে আক্রমণ করেনি। ওটার খবর মার্শালসাহেব ছাড়া আর কেউ পায়নি এর আগে।”

ব্রাউন যেন স্বস্তি পেল একটু। কাঠ-কাঠ ভাবটা কমিয়ে বলল, “করেনি বলে যে করবে না এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।” সে মুখ ফিরিয়ে মেজরকে দেখল, “ভর-সক্কালবেলায় পিপেটা মদ খাচ্ছে। অথচ বললেই হায়েনার মতো আওয়াজ তুলবে। কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

মার্শালের হাতে এখন দূরবীন। তিনি জলের ওপর দৃষ্টি বোলাচ্ছিলেন। ব্রাউনের প্রশ্নটা এড়াতেই অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কিছু দেখতে পাচ্ছেন?”

“না। নাথিং। কিন্তু মেজর, তোমার সেই জায়গাটা থেকে আমরা কত দূরে আছি?”

মেজরের তৃতীয় গ্লাস ততক্ষণে শেষ হবার মুখে। গাঢ় গলায় বললেন, “অর্জুন, বলে দাও।”

অর্জুন বলল, “জলের গায়ে তো দাগ দেওয়া যায় না, আমার কাছে তাই সব জায়গা একইরকম লাগছে। কাল ঠিক কোথায় এসেছিলাম তাও বুঝতে পারছি না।

কথা শেষ করে সে দেখল মার্শালের মুখের পেশী বেশ শক্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন যা অবস্থা তাতে মার্শালের সাহায্য লাগবেই। লকারের কাগজের নির্দেশ একা অনুসরণ করা অসম্ভব। সে তাই কথাগুলো জুড়ল, “কাগজে লেখা আছে এক ঘণ্টা দাঁড় টেনে নৌকোয় উত্তর দিকে যেতে হবে। মে মাসে সূর্য ঠিক মাথার ওপরে আসে সাড়ে বারোটায়।”

“মে মাস? মে মাসের অঙ্ক এখন মিলবে কী করে?”

এই সময় মেজর চিৎকার করে উঠলেন, “স্টপ, স্টপ। আঃ, ইঞ্জিন বন্ধ করো।”

মার্শালের ইঙ্গিতে ড্রাইভার যানটাকে অচল করল। বিড়বিড় করে কীসব অঙ্কের হিসেব করে গেলেন মেজর। তারপর বললেন, “জল নিয়ে আমার সঙ্গে রসিকতা করতে এসো না হে। জলই আমার জীবন।” গ্লাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে বললেন, “আমরা কাছাকাছি চলে এসেছি। কিন্তু আরও ডান দিকে সরতে হবে।”

ডান দিকে মিনিট-দুয়েক যাওয়ার পর সবাই মেজরের দিকে তাকাল। তিনি তখন নতুন করে গ্লাসে স্কচ ঢালছেন। মার্শাল জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”

মেজর নির্বিকার মুখে বললেন, “কী আর হবে! শরীরটাকে ভিজিয়ে নিচ্ছি একটু।” এইসময় অর্জুন দেখতে পেল দূরে একটা মোটরবোট জল চিরে তীরের মতো ছুটে যাচ্ছে। মার্শাল এবার অর্জুনের দিকে এগিয়ে এল, “সময় নষ্ট করে কোনও লাভ নেই। পকেট থেকে কাগজটা বের করে আমার হাতে দাও।” মার্শালের প্রসারিত হাত এখন অর্জুনের সামনে।

কোনও প্রতিবাদ না করে কাগজটা দিয়ে দিল অর্জুন। সেটা চোখের ওপরে ধরে হতভম্ব হয়ে গেল মার্শাল, “আরে, এ কী ভাষায় লেখা?”

অর্জুন বলল, “বাংলা।”

“ওঃ।” ডান হাত দিয়ে কাগজ ধরে রাখা, বাঁ হাতে ঘুসি মারল মার্শাল, ‘তোমরা লকারে বাংলা লেখা কাগজ পেয়েছিলেন?”

“না। ওটা বাংলায় অনুবাদ করে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছি।”

“তা হলে দয়া করে এটাকে আবার ইংরেজিতে অনুবাদ করে দাও।”

“সেটাই তো দিচ্ছিলাম, আপনি ব্যস্ত হলেন।” অর্জুন কাগজটা ফেরত দিল। এক পলক দেখে নিয়ে পড়ল, “সমুদ্র। উত্তর দিকে এক ঘণ্টা যাত্ৰা। গতি দাঁড়-টানা নৌকোর। যেখানে মাটি যতদুর, আকাশ ততদূর! মে মাসে সূর্য মাথার ঠিক ওপরে আসে সাড়ে বারোটায়।”

“দূর! এ থেকে কী করে বুঝলে জায়গাটা এই সমুদ্রেই?”

“অনুমান।”

“কী থেকে অনুমান করছ? একটা মাথামুণ্ডু ব্লু থাকতে হবে তো?”

“উনি তো এই সমুদ্রের ধারেই বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন।”

“তা কাটিয়েছেন।” বলেই সামলে নিলে মার্শাল, “কিন্তু কোন পয়েন্ট থেকে এক ঘণ্টা দাঁড়-টানা নৌকোয় যেতে হবে?”

“তা লেখা নেই।”

বিরক্ত মার্শাল চোখ বন্ধ করলেন, “আর কী লেখা আছে?”

অর্জুন পড়ল, “ডুবুরি। পাথরটা নড়েনি নোয়ার আমল থেকে জাহাজ-বাঁধা পাথর।”

“ডুবুরি? পাথর?” মার্শালের চোখ খুলল।

মেজর বললেন, “নোয়ার আমলেও তো জাহাজ ছিল। সেই জাহাজই বাঁধা হত ওই পাথরে। সেই পাথর এখনও টিকে আছে। কী বড় পাথরই বোঝো!”

এইসময় মেজর চিৎকার করে উঠলেন, “ইউরেকা। পেয়েছি। এখানেই সমুদ্রের ওই দিকটায় ডুবোপাহাড় আছে। সেই কারণেই জাহাজ এড়িয়ে যায় ওই অঞ্চল। শুনেছি আগে সমুদ্রের জল এদিকে কম ছিল। জাহাজ থেমে যেত ওপাশেই।”

মার্শালকে খুব খুশি মনে হচ্ছিল। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “পেটের জল ছাড়া বাইরের কিস্সু বোঝো না মেজর। লম্বা-লম্বা কথা। ডুবোপাহাড়টা এখান থেকে অন্তত আধমাইল দূরে। আর উনি এতক্ষণ ডান দিক দেখছিলেন।”

মেজর কিছুই জবাব দিলেন না। সম্ভবত অতি অল্প সময়ের মধ্যে বেশি মদ্যপান করে তিনি প্রতিবাদের শক্তি খুঁজে পেলেন না। শুধু এমন ভঙ্গিতে হাসলেন যেন কোনও অবোধ শিশুর কথা শুনছেন। ততক্ষণে মেজরের নির্দেশে যানের মুখ ঘুরেছে। সিকি মাইল অতিক্রম করার পর দেখা গেল মোটরবোটটা এদিকে ছুটে আসছে। মোটরবোটে পাইলট ছাড়াও দুজন লোক রয়েছে। প্রায় পাশাপাশি এসে সেটা দাঁড়িয়ে গেল। একটা লোক চিৎকার করে বলল, “এখানে কী চাই তোমাদের? বেশ তো ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে।”

মার্শাল রাগী গলায় বললেন, “তোমরা জিজ্ঞেস করার কে হে? জলপুলিশ নাকি?”

“তাদের বাবা। শোনো, ভাল চাও তো এই এলাকা থেকে কেটে পড়ো। মার্শাল বললেন, “কারণটা জানতে পারি?”

“আমরা সরকারকে টাকা দিয়েছি এই এলাকায় মাছ ধরব বলে। কোনওরকম গোলমেলে লোক এখানে ঢুকুক আমরা চাই না। যাও, ভাগো জলদি।

লোকটার শাসানি শেষ হওয়ামাত্র মেজর হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন জড়ানো গলায়, “অ্যাই! আমাকে শাসানো হচ্ছে? পাজি, বদমাশ, ছুঁচো। জল তোদের পৈতৃক সম্পত্তি? আমাকে জল চেনাতে এসেছ!” আর তখনই ব্রাউন অর্জুনকে আঁকড়ে ধরল। লোক দুটো একইসঙ্গে ব্রাউন আর মেজরকে দেখছে। ব্রাউন ফিসফিস করে বলল, “যারা আমাকে জিপে তুলেছিল তাদের মধ্যে ওই লোক দুটো ছিল। দিব্যি করে বলছি।”

লোক দুটোর একটা তখন উঠে দাঁড়িয়েছে বোটের ওপরে। গম্ভীর গলায় সে বলল, “তোমরা আমাদের উত্তেজিত করছ। ওই হোঁতকাটাকে গুলি করে ফেললে কিন্তু আমরা চুপ করে থাকব না। তোমরা কি যাবে?”

মার্শাল তাঁর ড্রাইভারকে বললেন বোট ঘোরাতে। ফিরে আসার মুখে মেজর সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিলেন। দুটো মাস্তানের হুমকিতে রণে ভঙ্গ দেবার পাত্র তিনি নন। তাঁকে হোঁতকা বলল অথচ কেউ প্রতিবাদ করল না। এইসব।

মার্শাল কোনও কথা বললেন না। মেজর আসার পর অর্জুনকে বললেন, “মাতালদের নিয়ে জলের নীচে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এমনিতেই একজন চেনা হয়েছে। মেজরকে তীরে নামিয়ে দিচ্ছে।”

এবার মেজর উঠে দাঁড়ালেন, “মানে? আমি মাতাল? আমকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বোকামি? জল চেনাচ্ছ? দ্যাখো মার্শাল; তোমার মতলব আমার ভাল লাগছে না।”

“এর মধ্যে মতলব আবার কোথায় দেখলে?”

“আমি তীরে নামছি না।” মাথা নাড়লেন মেজর, “সেই সেকেন্ডহ্যান্ড জুতো কেনা থেকে আমরা একটার পর একটা ঝামেলা সামলাচ্ছি আর উনি শেষবেলায় এসে মাতব্বরি করছেন। আর যাবেই-বা কী করে? দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল তো?”

মোটর বোট এখন অনেক দূরে চলে গিয়েছে। কিন্তু অর্জুন লক্ষ করেছিল, ওদের কাছে দূরবীন আছে। অর্থাৎ ওরা এখনও তাদের ওপর নজর রাখছে। প্রোফেসরের লোকজন আজ হঠাৎ জল পাহারা দিচ্ছে কেন? নাকি রোজই দেয়, তার চোখে পড়েনি! ক্রমশ ওরা এমন একটা জায়গায় চলে এল যেখান থেকে আর মোটরবোট নজরে পড়ার কোনও সুযোগ নেই। মার্শাল সবাইকে সতর্ক হতে বললেন। ধীরে-ধীরে মাথার ওপর ছাদ উঠে এল দুপাশ থেকে। দুটো চোঙা ওপরে উঠে এল। ড্রাইভার আলো জ্বালিয়ে দিতেই অৰ্জুন বুঝল যানটা সাবমেরিন হয়ে জলের তলায় নেমে যাচ্ছে। মার্শাল দ্রুত নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিল ড্রাইভারকে। এবার সবাই কাচের ওপাশে জল দেখতে পেল। দৃষ্টি সইয়ে নেবার পর এক ঝাঁক মাছের সঙ্গে প্রথম মোলাকাত হল ওদের। সাবমেরিনটা খুব বড় নয়। নৌকো হিসেবে মাঝারি মনে হলেও এর ভেতরে দুটো ঘর তৈরি হয়ে গিয়েছে। জল কেটে নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে সাবমেরিন ডুবোপাহাড়ের উদ্দেশ্য। মার্শাল এবার বক্তৃতা দেবার ভঙ্গিতে বললেন, “আমার কাছে কয়েক সিলিন্ডার অক্সিজেন আছে। এখন পর্যন্ত আমরা ওপর থেকে অক্সিজেন পাচ্ছি। কিন্তু নিরাপত্তার কারণেই স্পটের কাছাকাছি পৌঁছে চোঙা দুটো নীচে নামিয়ে ফেলতে হবে। তোমাদের মধ্যে কে কে সাঁতার জানো?”

মেজর হাত তুললেন। কিন্তু তাঁর অন্য হাতের গ্লাসটা খুব কেঁপে উঠল। মার্শাল তাঁকে লক্ষ না করে অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হবে গোয়েন্দা, জলের তলায় কিছু খুঁজতে এসেছ সাঁতার না জেনে! তাজ্জব ব্যাপার।”

জলপাইগুড়ি শহরে দু-দুটো নদী থাকলেও তিস্তায় সাঁতার শেখার কোনও সুযোগ নেই। শীতকালে জল থাকে না বললেই চলে, গ্রীষ্মকালে সেখানে নামার সাহস অল্পলোকের হয়। সাঁতার শেখে সবাই করলা নদীতে। তা কয়েক বছর স্রোত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জল নষ্ট হতে বসেছে। মাকে এড়িয়ে অর্জুন কিছুদিন হাত-পা ছুঁড়েছিল। জলের ওপর শরীরটাকে ভাসিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু করলায় সাঁতার কাটা আর ইংল্যান্ডের সমুদ্রে সাঁতরানো এক ব্যাপার কেন হবে! সে হেসে মার্শালকে বলল, “আমি কোনও কাজ একদম না জেনে হাত দিই না।”

মার্শালের চোয়াল শক্ত হল। তিনি ঘুরে বসলেন সামনের দিকে। অজস্ৰ জলজ লতায় শরীর বাঁচিয়ে সাবমেরিনটা ছুটে যাচ্ছে। সাবমেরিন থেকে একটা তীব্র আলো সামনের জলের দেওয়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছে। মার্শাল এবার গতি কমাতে বললেন। ধীরে ধীরে চোখের সামনে ডুবোপাহাড়টা ভেসে উঠল। আলো নিভিয়ে সাবমেরিন একটু একটু করে ওপরে উঠতে লাগল। জলের ফুট দশেক নীচে মার্শাল সেটাকে স্থির করতে বললেন। প্রায় পাহাড়ের গা ঘেঁষে ওটা দাঁড়িয়ে পড়ল।

এবার মার্শাল অর্জুনের দিকে ঘুরে বসলেন, “এইটেই তোমার সেই ডুবোপাথর যা নোয়ার আমল থেকে নড়েনি। চালু গল্প হল, এখানেই একসময় জাহাজ নোঙর করত। এবার কী করতে হবে বলে ফেলো।”

“আপনি এখানে এর আগে এসেছেন?”

“একবারই। সাবমেরিন থেকেই দেখেছি।”

“পাথরটা কত বড়?”

“খুব বড় বলে মনে হয় না।”

“আমরা একবার পাক দিতে পারি?”

“পারি। তবে মনে রেখো জলের ওপরে পাহারাদার রয়েছে।” মার্শাল কাঁধ নাচালেন, “তুমি একেবারে মুঠো খুলবে না তা হলে। বেশ কিন্তু এই দুটো বোঝাকে সঙ্গে আনার কোনও দরকার ছিল না।”

সত্যি, মেজর এখন দেওয়ালে হেলান দিয়ে পড়ে রয়েছেন। এতদিন অর্জুন এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আছে কিন্তু কখনও এমন বেহেড মাতাল হতে দেখেনি। সে হাত বাড়িয়ে মেজরের মুঠো থেকে গ্লাসটা সরিয়ে নিতে যেতেই মেজর চোখ বন্ধ করেই বলে উঠলেন, “উঁহু। আমি সব শুনতে পাচ্ছি। জবাব দেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না বলেই চুপ করে বসে আছি। তবে যে যাই বলুক, আমি বাবা এখান থেকে নড়ছি না।”

সাবমেরিনটা তখন সন্তর্পণে পাহাড়ের দশ ফুট দূর ঘেঁষে চলতে আরম্ভ করেছে। পাহাড়টার গায়ে শ্যাওলা থিকথিক করছে। বোঝাই যাচ্ছে কেউ ওখানে কয়েক বছরের মধ্যে পা দেয়নি। সতর্ক চোখ রাখছিল অর্জুন। পাহাড়ের তলায় একটা সুড়ঙ্গ থাকার কথা।

“সাবমেরিনটাকে আর একটু নীচে নামাবেন?”

“কেন? মরার ইচ্ছে হয়েছে?” মার্শাল চিৎকার করলেন, “আরও নীচে নামলে কোথাও যদি ঠোক্কর খায় তো দেখতে হবে না। এটার দাম কত জানো?”

অর্জুন জানে না। জলপাইগুড়ির ছেলের সাবমেরিনের দাম জানার কোনও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সে জানাল, “একটা সুড়ঙ্গের খোঁজ করতে হবে যেটা পাহাড়ের তলায় রয়েছে।

“সুড়ঙ্গ? মাই গড!” মার্শাল একটু ঝুঁকে পড়ে ড্রাইভারকে নিচু গলায় কিছু বললে, সে মাথা ফিরিয়ে অর্জুনকে দেখল। তারপর সাবমেরিনটা ধীরে-ধীরে নীচে নামতে লাগল। এখন পর্যন্ত অক্সিজেন জোগাচ্ছে। ক্রমশ বাইরের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে গেল। সূর্যের আলো এতটা জল ভেদ করে নীচে নামতে পারছে না। ফলে আবার সাবমেরিনের আলো জ্বলে উঠল। প্রচুর মাছ ছুটোছুটি করছে। তাদের অনেকের চেহারা অর্জুন এ-জীবনে দেখেনি। অক্টোপাসের মতো শুঁড়অলা একটা ছোট্ট প্রাণীকে প্রায় দৌড়ে পালাতে দেখল সে পাহাড়ের খাঁজে। এর মধ্যে প্রায় তিনভাগ পাক দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এখন পর্যন্ত যা-কিছু হচ্ছে তার সবটাই অনুমাননির্ভর। এই ডুবোপাহাড়টা কাগজে লেখা নোয়ার পাথর নাও হতে পারে। এই সমুদ্রটাও ভুল জায়গা প্রমাণ হতে বেশি দেরি নেই। কিন্তু অর্জুনের কেবলই মনে হচ্ছিল তারা ঠিক পথেই এগোচ্ছে। পাহাড়টা বেশি উঁচু নয়। জলের গভীরতা ধরলে চল্লিশ ফুটের বেশি নয়। অথচ জলের মধ্যে এটাকেই কী বিশাল লাগছে। হঠাৎ মার্শালসাহেব চিৎকার করে উঠলেন। যান থেমে গেল। অর্জুনও সুড়ঙ্গটাকে দেখতে পেল। যদিও সুড়ঙ্গ না বলে গর্ত বলাই ভাল। গর্তের মুখটাতে আর একটি পাথর আছে, কিন্তু সেটা মুখটাকে ঢেকে দেয়নি। মার্শাল জিজ্ঞেস করলেন, “কী হে? এইটেই তো?”

অর্জুন উত্তেজিত হয়ে বলল, “লেখা আছে একজনই ঢুকতে পারবে। মুখটাও তো সেইরকম।”

মার্শাল বললেন, “চলো, বাকিটা দেখি। যদি আর-একটা দেখতে পাই। “বাকি পাহাড়টা চট করেই ফুরিয়ে গেল। মার্শাল জিজ্ঞেস করলেন, “সুড়ঙ্গের পর কাগজে কী লেখা আছে?”

সেটা সুড়ঙ্গের ভেতর গিয়েই বলব।

মার্শাল হাসলেন, “কিন্তু ব্রাদার, এবার যে আমাদের ফিরে যেতে হচ্ছে!” এবার ব্রাউন চিৎকার করে উঠল, “মানে? এত কষ্ট করে খুঁজে পাওয়ার পর ফিরে যাব মানে? ইয়ার্কি পেয়েছ? একবার ফিরে গেলে তুমি আর আমাদের এখানে নিয়ে আসবে? সুড়ঙ্গটা জেনে নিয়ে আমাদের কাটিয়ে দেবার মতলব?”

মেজর চোখ বন্ধ করেই বললেন, “এই প্রথম লোকটাকে বুদ্ধিমান বলে মনে হল।

মার্শাল কাঁধ নাচালেন, “ওয়েল, জেন্টলমেন, তোমরা আমাকে অপমান করছ। এইরকম অবস্থায় তোমাদের সঙ্গে কাজ করা ঠিক হবে কি না আমাকে ভাবতে হবে। উই আর গোয়িং ব্যাক।”

ঠিক সেই সময় ড্রাইভার চিৎকার করে উঠল। চিৎকার ছিটকে উঠল ব্রাউনের মুখ থেকেও সেই বিশাল হাঙরটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যাওয়ার পথ আটকে। মার্শাল চাপা গলায় বললেন, “জামা প্যান্ট খুলে নাও।” তারপর দ্রুত হাতে অক্সিজেন মাস্কগুলো একটা বাক্স থেকে বের করে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দিলেন। একমাত্র মেজর ছাড়া সবাই সেই নির্দেশ পালন করল হাঙরটার দিকে নজর রেখে। হাঙরটা একটুও নড়ছে না। অর্জুন তৈরি হতে-হতে ডাকল, “মেজর, মেজর!

মেজর চোখ বন্ধ করে বললেন, “জ্বালিও না। আমি একটা কবিতা মনে করার চেষ্টা করছি। আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ি…ধানসিড়ি…আঃ কী যেন লাইনটা?”

মার্শাল তৈরি হয়ে নিলেন সবার আগে। তারপর ছুটে গেলেন পাশের ঘরে। অর্জুন তাঁকে অনুসরণ করল। বাক্স খুলে বন্দুক বের করছেন তখন মার্শাল। বন্দুকগুলো বিশেষভাবে তৈরি। অর্জুনের দিকে একটা ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “এই গ্রেনেডের ব্যাগ কোমরে বেঁধে নাও। দশটা করে গ্রেনেড আছে এক-একটা ব্যাগে। বন্দুকের ঢাকনা খুলে এখানে গ্রেনেড বসিয়ে দেবে। তারপর ট্রিগার টিপলেই ওটা ছুটে যাবে। লক্ষ্যবস্তুর গায়ে আঘাত না লাগা পর্যন্ত বিস্ফোরণ হবে না।”

প্রচলিত চেহারার বন্দুক বা রাইফেলের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। অর্জুন একটার বদলে দুটো ব্যাগ নিল। সে শার্ট খুলেছিল, কিন্তু প্যান্ট খোলেনি। ফলে কোমরের বেল্টে ব্যাগ দুটোকে বেঁধে নিতে অসুবিধে হল না। ব্যাগের মুখে ইলাস্টিক দেওয়া। হাত ঢুকিয়ে একটা গ্রেনেড বের করে বন্দুকের খোপে পুরে নিল। ততক্ষণে মার্শালসাহেব পেছনের দরজা টেনে দিয়ে অক্সিজেন-মাস্ক পরে নিয়ে সামনের দরজা খুলতে চেষ্টা করছেন। অক্সিজেন-মাস্ক মুখে বেঁধে নিতে বেশ কসরত করতে হল অর্জুনকে। মার্শালের দেখাদেখি সিলিন্ডার চালু করতে স্বস্তি এল। একজিট হোল দিয়ে মার্শাল যখন বাইরে বেরোচ্ছেন তখন জল আছড়ে পড়ল ঘরে। কোনও কিছু চিন্তা না করে অর্জুন মার্শালকে অনুসরণ করল। যা জল ঢোকার ঢুকে গেছে ততক্ষণে কিন্তু মার্শাল বাইরে থেকে ঢাকনাটা বন্ধ করে দিলেন। জলের মধ্যে অক্সিজেন-সিলিন্ডার পিঠে ঝুলিয়ে অদ্ভুত রোমাঞ্চ হচ্ছিল অর্জুনের। তারা রয়েছে সাবমেরিনটার পেছনের দিকে। আর হাঙরটাকে শেষবার দেখেছিল সামনের দিকে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতে। মার্শাল সন্তর্পণে সাবমেরিনের দেওয়াল ধরে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

জলের মধ্যে ভেসে থাকতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না অর্জুনের। যতটা ঠাণ্ডা লাগার কথা, ততটা লাগছে না। যদিও হাঙরটার জন্যে উত্তেজিত হওয়ায় ঠাণ্ডা বোধটাই ওর কাজ করছিল না। অর্জুন সাবমেরিনের আওতা থেকে সরে চরে এল পাহাড়ের গায়ে। একটা বড় পাথরের আড়ালে আসতেই সে হাঙরটাকে দেখতে পেল। লেজ নেড়ে সেটা পেছনে সরে যাচ্ছে। আর তখনই বিস্ফোরণটা ঘটল। মার্শাল তাঁর বন্দুকের ট্রিগার টিপছেন। প্রচণ্ড ঢেউ উঠল, জলের ভেতর একটা ঝাঁকুনি বয়ে গেল আর হাঙরটার লেজের কাছে ঘোলাটে কিছু তৈরি হল মাত্র। কিন্তু অর্জুন অবাক হয়ে দেখল কিছুই হল না হাঙরটার। অর্থাৎ মার্শালের ছোঁড়া গ্রেনেড হাঙরের চামড়া ভেদ করতে পারল না। এই প্রথম হাত-পা ঠাণ্ডা লাগল অর্জুনের। সে দেখল সাবমেরিনটাকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে ড্রাইভার। সম্ভবত যুদ্ধের ফলাফল কী হতে পারে সে জেনে নিয়েছে। মার্শালকে দেখা যাচ্ছে না আশেপাশে। আর সাবমেরিন ঘোরানো মাত্র হাঙরটা পাক খেয়ে ছুটে আসতে লাগল বিশাল হাঁ করে। অর্জুন পাথরের আড়াল থেকে ট্রিগার টিপল সেই হাঁ লক্ষ করে। গ্রেনেডটা ছুটে যাওয়ার সময় এমন ঝাঁকুনি হল যেন কাঁধের কাছটা ছিঁড়ে যাবে বলে মনে হল তার। আবার সেই একই আলোড়ন, শব্দতরঙ্গ শুষে নেওয়া জলে একই কাঁপুনি। শুধু হাঙরের মুখটা বন্ধ হল এবং প্রায় অর্জুনের দশ হাত দূরে এসে ওটা গতি থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সাবমেরিনটা ততক্ষণে সরে গিয়েছে অনেকটা। একটা বিশাল হাঙরকে এত কাছ থেকে অর্জুন স্বপ্নেও দ্যাখেনি। পাথরটার আড়ালে নিজেকে যতটা সম্ভব ঢেকে রেখেছে সে। হাঙরটা নিশ্চয়ই তার অস্তিত্ব বুঝতে পারেনি। কিন্তু প্রথম গ্রেনেডটা না হয় লেজে লেগেছিল, তারটা তো সরাসরি মুখের ভেতরে আঘাত করেছে বলে মনে হচ্ছে। কোথাও আঘাত না করলে জলে অনুরণন ছড়াত না। অথচ হাঙরটা রয়েছে স্থির। যেন বুঝতে চেষ্টা করছে তার আক্রমণকারী কোথায় লুকিয়ে আছে। অর্জুন কাঁপা হাতে দ্বিতীয় গ্রেনেডটা বন্দুকে ভরল। তারপর মাস্কের আড়াল থেকে হাঙরটাকে লক্ষ করে চমকে উঠল। কোনও হাঙরের পেটের কাছে জোড়ের দাগ থাকে নাকি! অপারেশনের পর সোলাইয়ের দাগ যেমন মানুষের শরীরে থেকে যায়, তেমনি নীচ থেকে ওপরে একটা দাগ উঠে গেছে। সে ওই দাগটাকে লক্ষ করে গ্রেনেড ছুঁড়তেই অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল। তীব্র আঘাতে দাগের জায়গাটা ফাঁক হয়ে গেল। যদিও সেটাকে জুড়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে হাঙরটা। তারপরেই হাঙরের মুখ থেকে একটা নীল ধারা ছিটকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সবখানে। সেই নীলে মাছ বা কোনও জলজ প্রাণী ধরা পড়তেই মরে তলিয়ে যেতে লাগল। নীল ঢেউটা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে আসতে লাগল পাহাড়ের দিকে। অনর্গল নীল ছড়াচ্ছে হাঙরটা। ওই নীল মানে বিষ। প্রায় মেঘের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সবখানে। একটা মেঘ ধেয়ে আসছে অর্জুনের দিকেও। তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাতে হবে। অর্জুন পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে সাঁতার কাটার চেষ্টা করতেই সম্ভবত হাঙরটা তাকে দেখতে পেল। এইসময় আর একটা বিস্ফোরণ ঘটল। সম্ভবত কোনও আড়াল থেকে মার্শাল গ্রেনেড ছুঁড়েছেন। সেটি এসে লেগেছে হাঙরটার চোখে। অর্জুন দ্রুত নীল ঢেউ এড়িয়ে একটা পাথরের আড়ালে পৌঁছে মুখ ফিরিয়ে বন্দুকে গ্রেনেড ভরতে-ভরতে হতভম্ব হয়ে গেল। হাঙরটার পেটে জোড় লাগেনি। আর ওটা দুটো স্টিলের পাত ছাড়া কিছু নয়।

ব্যাপারটা বুঝতে পারা মাত্র অর্জুন হাঙর মনে হওয়া যানটির খোলা পেট লক্ষ করে বন্দুকের ট্রিগার টিপল। ধাতব পাতে তৈরি পেট আরও নড়বড়ে হয়ে গেল প্রায় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বোঝা যাচ্ছিল না ওটা হাঙর নয়, ডুবোজাহাজ বা ডুবোনৌকো, তাকে হাঙরের আদল দেওয়া হয়েছে। বস্তুটি ধীরে ধীরে জলের বুকে নেমে যাচ্ছে এখন। সেই নীল বিষ ছড়ানোও বন্ধ হয়েছে। মাটির ওপরে কেউ যদি বিষের ধোঁয়া ছুঁড়ে দেয়, তা হলে পালাবার পথ থাকে না। চোখেও দেখা যায় না সব সময়। কিন্তু জল নিজেই ওর অগ্রগতিকে কিছুটা প্রতিরোধ করে, না পারলেও চেহারাটা ধরিয়ে দেয় আর এই কারণেই অর্জুন নিরাপদে চলে আসতে পেরেছিল।

কিন্তু এবার কী করণীয়? ওই বিরাট হাঙর-মার্কা ডুবোজাহাজটির পেটে নিশ্চয়ই মানুষ আছে। এবং সব-কিছু যদি মিলে যায় তা হলে প্রোফেসর হ্যাচ এবং তাঁর বাহিনীর থাকার কথা। কিন্তু কেউ বেরিয়ে আসছে না যন্ত্রটা থেকে। অথচ ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, ওটি অকেজো হয়ে গিয়েছে। কোনও নড়নচড়ন নেই। অর্জুন মার্শালসাহেবকে খোঁজার চেষ্টা করল। ভদ্রলোককে কাছকাছি কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

জলের তলায় অক্সিজেন মাস্ক এবং পিঠে সিলিন্ডার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা ওর এই প্রথম। অস্বস্তিটা আক্রমণের ভয়েই দূর হয়ে গিয়েছিল। এখন খেয়াল হল সিলিন্ডারে কতটা অক্সিজেন আছে তাই তার জানা নেই। ফট করে যদি শেষ হয়ে যায়, তা হলেই চিত্তির। সমুদ্রের মতো নীচ থেকে ওপরে ওঠার আগেই দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে হবে। কিন্তু অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল, হাঙর-মার্কা যন্ত্রটার কাছে যেতে। কোথায় যেন পড়েছিল বিখ্যাত ইংরেজি ছবি ‘জ’স’-র জন্যে অনেক লক্ষ ডলার খরচ করে একটা হাঙর বানানো হয়েছিল—বলত কম্পিউটার। সে এমন অভিনয় করেছিল যে, পৃথিবীর কোটি-কোটি মানুষ তাকে আসল না নকল বুঝতে পারেনি। প্রোফেসর হ্যাচ কি সেইরকম একটা সমুদ্রের জলে ছেড়ে রেখেছেন?

ঠিক এইসময় বিপরীত দিক থেকে একজনকে সাঁতরে আসতে দেখল অর্জুন। ভারী শরীর, মুখ. তো দেখার উপায় নেই। লোকটা বোধ হয় হাঙর-মার্কা যন্ত্রটাকে আগে লক্ষ করেনি সেটাকে দেখামাত্র পড়ি কি মরি করে একটা পাথরের আড়ালে চলে গেল। মার্শাল সাহেব নন এ-ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত। যন্ত্রটার ওপাশ থেকে কি কেউ বেরিয়েছে? তাই যদি হয় তা হলে যন্ত্রটাকে ভয় পাবে কেন? অর্জুন ধীরে-ধীরে এগোল। পাথরের ফাঁক দিয়ে সে লোকটার পেছনে পৌঁছে যেতেই ব্রাউনকে বুঝতে পারল। ব্রাউন সামান্য ফাঁক দিয়ে যন্ত্রটাকে বুঝতে চেষ্টা করছে। অর্জুন কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারল এটা বোকামি। গ্যাসে মুখোশ পরে জলের ভেতর কথা বলা যায় না। স্পৰ্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে পেছন ফিরে কোমর থেকে ছোট ছুরি বের করে উঁচিয়ে ধরল ব্রাউন। এক ঝটকায় কিছুটা পিছিয়ে গেল অর্জুন। ব্ৰাউন কি তাকে চিনতে পারছে না? ওর তো জলের নীচে নামার কথা ছিল না। ব্রাউন নড়ছে না। তার ছুরি সতর্কভাবে উঁচিয়ে রয়েছে। অর্জুন চটপট শ্যাওলা লেগে-থাকা পাথরের গায়ে নিজের নাম ইংরেজিতে লিখল আঙুল দিয়ে। সেটাকে লক্ষ করে ছুরি খাপে ঢুকিয়ে ছুটে এল ব্রাউন। হাত জড়িয়ে ধরার সময় অর্জুন সতর্ক হল। আবেগে যদি গ্যাস-মুখোশ খুলে দেয় তা হলে আর দেখতে হবে না। ব্রাউন কি কিছু বলার চেষ্টা করছে? অর্জুন ওর হাত ধরে টানল। ব্রাউন ইঙ্গিতে যন্ত্রটাকে দেখাতেই অর্জুন নিজের বন্দুকটা তুলে ধরে বোঝাল যে ও-ই কাণ্ডটা করেছে। ব্রাউন তার পিঠ চাপড়াল।

না, আর সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। যন্ত্রটা ওরকম নিশ্চল হয়ে আছে হয়তো বিশেষ মতলব নিয়ে। কাছে যাওয়ামাত্র আক্রান্ত হওয়া অসম্ভব নয়। তার চেয়ে ওটা যখন চুপচাপ আছে তখন যে কাজের জন্যে এখানে নামা তাই করা দরকার। অর্জুন ব্রাউনকে ইশারা করল অনুসরণ করতে। তারপর ধীরে-ধীরে এগিয়ে চলল পাহাড়ে গা ঘেঁষে।

এবং এই সময় তারা মার্শালকে দেখতে পেল। মার্শাল উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত নাড়ল। বোঝাল সে পাহাড়ের ওপাশটা দেখে এসেছে। এবং তারপরেই সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। মার্শালের হাতের বন্দুকটা ব্রাউনের দিকে তাক করা। অর্জুন দ্রুত মাঝখানে চলে এসে বন্দুক নাড়তে লাগল। মার্শাল স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে ব্রাউনের পরিচয়। সে এখানে ওর উপস্থিতি মোটেই পছন্দ করেনি। শেষ পর্যন্ত ঘাড় শক্ত করে মেনে নিল, নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ অর্জুনের মাথায় অন্য মতলব এল। সে মার্শালকে দাঁড়াতে বলে ব্রাউনকে সঙ্গে নিয়ে এল সেই পাথরটার কাছে যেখান থেকে যন্ত্রটাকে দেখা যায়। ইশারায় ব্রাউনকে সেখানেই লুকিয়ে যন্ত্রটার ওপর নজর রাখতে বলল সে। ব্রাউনের মোটেই ইচ্ছে ছিল না একা থাকার কিন্তু মার্শালের বন্দুক উঁচিয়ে তোলা দেখার পর আর সে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছিল না

অর্জুন ফিরে এসে মার্শালকে দেখতে পেল না। সে পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলতে শুরু করল। নিশ্বাসের কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। হঠাৎ একঝাঁক ছোট মাছকে সামনে দিয়ে যেতে দেখল সে। মাছগুলো যেন তাকে লক্ষ করেই ডান দিকে বাঁক নিয়ে পাহাড়ের ভেতর ঢুকে গেল। অর্জুন আরও একটু এগোতেই নিচু হতে বাধ্য হল। পাগলা কুকুর তাড়া করলে যেভাবে মানুষ ছোটে সেইভাবে মাছগুলো ছুটে বেরিয়ে এসে ছত্রাকার হয়ে যে-যার মতো চলে গেল এবং যেখানে তারা ঢুকেছিল এবং বেরিয়ে এসেছিল সেখান দিয়ে খুব জোর একটি মানুষ যাওয়া-আসা করতে পারে। কাগজের লাইন দুটো মনে পড়ল। সুড়ঙ্গটা তার তলায়, ঢুকবে একটা মানুষ। অর্জুন উত্তেজিত হল। তা হলে কি এই পথটার কথাই কাগজে লেখা রয়েছে! মাছগুলো যদি ওদিকে না যেত তা হলে সে হয়তো লক্ষই করত না। অর্জুন সুড়ঙ্গের মুখটায় চলে আসতেই কাঁচা দাগ দেখতে পেল। বছরের পর বছর সেখানে জলজ উদ্ভিদ অথবা শ্যাওলা জমা হচ্ছিল, সেখানে যেন কারও হাত-পায়ের স্পর্শ পড়েছে। নইলে শ্যাওলাগুলো যেমন ঘষটে গেল কী করে? চিন্তিত হল সে। খুব সাবধানে সুড়ঙ্গের ভেতর শরীরটা গলিয়ে দিল অর্জুন। সুড়ঙ্গটা সোজা নয় যে, সামনের কিছু দেখতে পাবে। বন্দুকটাতে উঁচিয়ে রাখল হাঁটার সময়। দু’ পা দূরের বাঁকের আড়ালে কী রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু মার্শালের দেওয়া এই বন্দুকের যা ক্ষমতা তাতে এখানে এই বন্ধ জায়গায় ট্রিগার টিপলে পাহাড়টার কিছু অংশ মাথার ওপর খসে পড়তে পারে। তবু আক্রমণকারীর হাত থেকে বাঁচার জন্যে তা ছাড়া অন্য উপায় নেই। অন্তত কুড়ি পা এ-বাঁক ও-বাঁক করে হলঘরের মতো একটা জায়গায় পৌঁছতেই অর্জুন মার্শালকে দেখতে পেল। ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে মার্শাল এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছে। তার বন্দুকটি শক্ত হাতে ধরা। জলের শব্দে চকিতে পেছনে ঘুরল মার্শাল। তারপর বন্দুক নামাল। নামিয়ে ইশারা করল; এর পর কী? এরপরে কী করতে হবে তা অর্জুনেরও জানা নেই। কাগজে কিছু লেখা ছিল না। যিনি লিখেছেন, তিনি সুড়ঙ্গ পথটা বাতলে দিয়ে আগন্তুকের বুদ্ধির পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন হয়তো। অর্জুন ইশারায় জানাল সে কিছু জানে না।

ভেতরটা অনেক বেশি পরিষ্কার। খোলা সমুদ্রের কাদা-পলি যেহেতু এখানে আসতে পারে না তাই একটা ঝকঝকে ভাব চারধারে। কিন্তু এইরকম বদ্ধ জায়গায় তো গভীর অন্ধকার হবার কথা। অর্জুন ওপরের দিকে তাকালো। কেমন সাদাটে দেখাচ্ছে। ওপর থেকে কি আলো আসার কোনও পথ আছে? ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে ডুবোপাহাড়ের পেটের ভেতরে। অতএব আলো আসবে কী করে? অর্জুন ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করল। আর তখনই মনে হল মাছগুলোর পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি। ওরা নিশ্চয়ই মার্শালকে দেখে ভয় পেয়েছিল।

অনেকটা ওপরে ওঠে আসার পর অর্জুন থমকে দাঁড়াল পাহাড়ের খাঁজে পা রেখে। যেখান থেকে আলোটা আসছিল সেই জায়গায় যেন কিছুর আড়াল পড়েছে। একটা বিপদের গন্ধ পেল সে। আলোটা কি কৃত্রিম? তাদের আগেই কি কেউ এই গুহাটাকে খুঁজে বের করে অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেছিল? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল অর্জুন। সে নিজের শরীরটাকে পাহাড়ের খাঁজের ভেতর মিশিয়ে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়াল। শেষ পর্যন্ত অন্ধকার নেমে এল চারধারে। এক হাতের মধ্যে জলের ভেতর কী আছে দেখা যাচ্ছে না। নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ যেন কানে আসছে এখন। নীচে মার্শাল এখন কী করছে ঈশ্বর জানেন। হঠাৎ অর্জুনের মনে হল কেউ যদি এই গুহার মুখে নীল বিষ-গ্যাস ঢুকিয়ে দেয় তা হলে?

সে এবার বোকামিটা বুঝতে পারল। যদি শরীরের চামড়ার ক্ষতি করে তা হলে আলাদা কথা কিন্তু অক্সিজেন-মাস্ক যতক্ষণ নাকে আছে ততক্ষণ তো ওটা নিশ্বাস বন্ধ করতে পারবে না। তা ছাড়া জলের ভেতর একমাত্র সামুদ্রিক প্রাণী ছাড়া ওই বিষে দমবন্ধ হয়ে মরার আশঙ্কার কারও নেই। তা হলে যন্ত্রটা থেকে নীল বিষ-গ্যাস ছাড়ল কেন?

প্রায় মিনিট-তিনেক এভাবে কেটে যাওয়ার পর প্রচণ্ড আলোড়ন উঠল চারধারে। অর্জুনের পায়ের তলার পাহাড় কেঁপে উঠল। পড়ে যেতে-যেতে সামলে নিল সে। ওপরের ছাদের কাছে কোনও কিছু এমন আঘাত করেছে যে, টুকরো পাথর আর বালি খসে পড়তে লাগল। অর্জুন অনুমান করল মার্শাল তাঁর বন্দুকের ট্রিগার টিপেছেন। অন্ধকারকে ভয় পেয়ে না তাকে লক্ষ করে সেটাই বুঝতে পারছে না সে। যাই হোক না কেন এখনই বেরিয়ে আসার চিন্তাটা ত্যাগ করা উচিত। তা ছাড়া বেরিয়ে কোথায় যাবে সে? এই কালো অন্ধকারে গুহার সেই মুখটাই খুঁজে পাবে না যেখান দিয়ে বাইরে যাওয়া যেতে পারে। অর্জুনের মনে পড়ল অক্সিজেন সিলিন্ডারটার কথা। আর কতক্ষণ সে নিশ্বাস নিতে পারবে জানা নেই। যদি আচমকা অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় তা হলে চিরকালের জন্যে ওই পাহাড়ের পেটে পড়ে থাকতে হবে। নিজের হঠকারিতার জন্যে কাউকে দায়ী করার কোনও মানে হয় না। আর এই সময় হঠাৎই একটা আলো নীচ থেকে ওপরে উঠে এল। কেউ টর্চ জ্বাললে এইভাবেই আলো পড়ে। আলোটা একাধিক হল। ওটা পড়ছে ওপরের ছাদে। যেন কিছু লক্ষ করার চেষ্টা করছে। অর্জুন মাথা উঁচু করে তাকাল। ছাদের পাথরের অনেকটা চাঙড় নেই। এবং সেখানে কিছু ছেঁড়া রবারের তার ঝুলছে। তার মানে এখানে আগেই মানুষ এসেছে। মার্শালের কাছে টর্চ ছিল না। নীচ থেকে যারা টর্চ জ্বালছে তারা অবশ্যই অন্য লোক। মার্শালের কী হল? অর্জুন নীচ থেকে একটা আলোকে ওপরে উঠে আসতে দেখল। ক্রমশ আলোটা এগিয়ে এসে তাকে ছাড়িয়ে ছাদের দিকে চলে গেল। অর্জুন বুঝল লোকটা মেরামতির চেষ্টা করছে। অর্থাৎ তারগুলো এরা ছেঁড়েনি। যে আলোড়ন হয়েছিল, ছাদের যে চাঙড় খসে পড়েছিল, তা নিশ্চয়ই মার্শালের বন্দুক ছোঁড়ার কারণেই ঘটেছিল। এখানে ঢোকার পর ওপর থেকে যে আলো সে ছড়াতে দেখেছে তা নিশ্চয়ই কৃত্রিম আলো এবং এখন যারা সারাচ্ছে তাদেরই তৈরি করা। অর্জুন দেখল নীচ থেকে এখন একটি আলো ওপরে উঠে আসছে। তাদের অনেক আগেই এই সুড়ঙ্গ এবং পাহাড়ের পেটের গর্ত আবিষ্কৃত হয়েছে আর যারা সেটা করেছে তারা বেশ তৈরি হয়ে এসেছে। প্রোফেসর হ্যাচ। এই হাঙর-মার্কা যন্ত্রটিও নিশ্চয়ই প্রোফেসরের তৈরি। শত্রুপক্ষ অনেক বেশি চতুর এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ব্যবহারে পারদর্শী।

অর্জুন দেখল, ওপরে যে লোকটা মেরামত করছিল, সে নেমে আসছে। তীব্র আলো যা ওর টর্চ থেকে বের হচ্ছিল অর্জুনের শরীরের প্রান্ত ছুঁয়ে নীচে নেমে গেল। এবার নীচে দুটো টর্চের আলো। সম্ভবত লোকটা তারগুলো জুড়তে পারেনি অথবা আলোর যন্ত্রটা এমন বিকল হয়ে গিয়েছে যে, ওখানে পৌঁছে সারানো অসম্ভব। অর্জুন মুখ নামিয়ে ওদের দেখছিল। শরীর বোঝা যাচ্ছে না টর্চের আলোর ঔজ্জ্বল্যে। এবং ওদের একজনের আলো যখন ঘুরে মার্শালের শায়িত শরীরের ওপর পড়ল তখন সে কেঁপে উঠল। মার্শালের শরীর নিশ্চল। একটা হাত এসে ওর গ্যাস-মুখোশ খুলে নিল একটানে। এবার কিছুটা ঘোলাটে হলেই মার্শালের মুখটা দেখতে পেল সে। মার্শাল মৃত। লোক দুটো আলো নিয়ে সরে সরে যেতে লাগল। গুহাটায় আবার অন্ধকার নেমে আসছে। অর্জুন বুঝতে পারছিল ওরা বেরিয়ে যাচ্ছে। এখন এইখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে সাবধানে নীচে নামতে লাগল। যারা বেরিয়ে যাচ্ছে তারা কোনও ফাঁদ পেতেছে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। ওরা কি দুজনকেই এখানে ঢুকতে দেখেছিল? তা দেখে থাকলে ওরা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে। তা ছাড়া একটি মৃতদেহের সঙ্গে জলের ভেতরে কাটানো অর্জুনের শরীরে কাঁটা দিল। নীচে নেমে এসে ও একমুহূর্ত দাঁড়াল। এখন চারপাশ ঘুটঘুট অন্ধকারে ঢাকা। অর্থাৎ হয় ওরা সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে নয় ওর জন্যে ওত পেতে রয়েছে। অর্জুনের হঠাৎ নিশ্বাস নিতে অসুবিধে শুরু হল। তবে কি অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছে। সে সুড়ঙ্গের মুখটা আন্দাজ করে এগিয়ে চলল দ্রুত। যেন অনন্তকাল চলা, সুড়ঙ্গটা শেষ হচ্ছেই না। অর্জুনের বুকে একটা যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। যেন একটা লোহার বল চেপে বসেছে সেখানে। তার চোখের দৃষ্টি অস্বচ্ছ হয়ে আসছিল। কোনও মতে বাইরে এসে শেষ শক্তি দিয়ে ওপরে উঠতে চাইল। সিলিন্ডারের অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছে। জ্ঞান হারাবার আগে অর্জুনের চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে গেল।

ধীরে-ধীরে একটা ঘোরের মধ্যে দুলতে দুলতে অর্জুনের মনে হল সে জলের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। এবং তখনই শরীর গুলিয়ে উঠল। পেটের নাড়িভুঁড়ি পাকিয়ে উঠে মুখ থেকে একরাশ জলীয় পদার্থ ছিটকে বেরিয়ে এল। অর্জুন চোখ মেলল।

ঝাপসা-ঝাপসা মুখগুলো তাকে দেখছে। এসব কাদের মুখ! হঠাৎ মুখে মাথায় গরম একটা ভাপ লাগল। অর্জুন চোখ বন্ধ করল। খুব আরাম হচ্ছে, এই ভাপ পেয়ে। দ্রুত শরীরে শক্তি ফিরে আসছে। কেউ একজন জোর করে তার দাঁতের ফাঁক দিয়ে কিছু গলিয়ে দিল। জিভ গলা বেয়ে সেটা শরীরে নামছে। ওষুধ? শরীরটাকে গরম করতে-করতে নামছে তরল পদার্থটা। অর্জুন বুকভরে নিশ্বাস দিল। বুকে এখনও টনটনে ব্যথা। অর্জুন আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

কতটা সময় কেটে গেছে অর্জুনের খেয়াল নেই। যখন চেতনা এল তখনই তার শরীর কুঁকড়ে উঠল। যেন মাথার পাশে একটা রাগী সাপ ফোঁস ফোঁস শব্দ তুলে যাচ্ছে। ঝট করে সে উঠে বসতেই ঝুড়িটাকে দেখতে পেল। শব্দটা আসছে ওই ঝুড়ি থেকেই। সে মুখ তুলে তাঁবু দেখতে পেল। এখন কি বাইরে রাত নেমেছে? নইলে তাঁবুর মধ্যে আলো জ্বলছে কী করে? সে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করতেই বসে পড়তে বাধ্য হল। তার পায়ে একটা লোহার চেন বাঁধা। চেনটার অন্য প্রান্ত একটা বড় বাক্সের সঙ্গে জোড়া। সে কোথায় এখন? শেষ যে ছবিটা মনে আসছে তা হল জলের ভেতরে তার বুকে অসম্ভব যন্ত্রণা এবং সমুদ্রের ওপরের আকাশটা কিছুতেই দৃশ্যমান হচ্ছিল না। আর যাই হোক, সে মার্শালসাহেবের ক্যাম্পে নেই এখন। তখনই তার চোখের সামনে মার্শালের মৃতদেহ ভেসে উঠল। লোকটা কি অসহায় হয়ে পড়েছিল গুহার ভেতরে। কিন্তু তার তো মারা যাওয়া অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ছিল। কেউ নিশ্চয়ই তাকে উদ্ধার করেছে। কে? সেই লোক দুটো? যারা মার্শালকে মেরেছে? এই সময় সাপটা এমন জোরে ঝুড়ির ঢাকনায় ছোবল মারল যে, সেটা কেঁপে উঠল। আর আপনাআপনি একসটা ভয়ার্ত চিৎকার ছিটকে বের হল অর্জুনের গলা থেকে। শরীর গুলিয়ে উঠল, তার কি জ্বর হয়েছে?

এই সময় পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। লম্বা রোগা, মাথায় বারান্দাটুপি, মুখে পাইপ একটা লোক এসে দাঁড়াল তাঁবুর দরজায়, “সো ইউ আর অলরাইট?”

লোকটা হাসল, “আমাকে ধন্যবাদ দাও তোমাকে জল থেকে তুলে আনার জন্যে। ইংল্যান্ডের সামুদ্রিক প্রাণীগুলো একটা এশীয়কে খাওয়ার স্বাদ থেকে অবশ্য বঞ্চিত হল তার কারণে।”

অর্জুন লোকটাকে চিনতে পারল, তবু জিজ্ঞেস করল সে, “আপনি কে?”

“তোমার উদ্ধারকর্তা। তুমি কি একটু কৃতজ্ঞ বোধ করছ?”

“নিশ্চয়ই।”

“বাঃ, খুব ভাল। কাগজটায় কী লেখা ছিল তা এবার মনে করে বলো।”

“কোন কাগজ?”

লোকটা, অর্জুন বুঝে নিয়েছে, ইনিই প্রোফেসর হ্যাচ, গম্ভীর মুখে সাপের ঝুড়ির সামনে এগিয়ে গেলেন। দুবার মৃদু শিস দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে সাপটা তার ফোঁসাফোঁসানি বন্ধ করল। ঝুড়িতে হাত রেখে প্রোফেসর অর্জুনের দিকে না তাকিয়ে বললেন, “দেখা গেল এই রাগী সাপটাও কী রকম বাধ্য। অবাধ্যতা আমি সহ্য করতে পারি না। এ সাপ কেবলমাত্র আমার প্রতিই অনুগত। একে ঝুড়ি থেকে বের করে তোমার কোলের ওপরে ফেলে দিলে কীরকম বোধ করবে? এত বড় একটা সমুদ্রে তোমার শরীর খুঁজে পাওয়া অসম্ভব বলে কি মনে হয় না তোমার?”

“আমাকে মেরে ফেলার জন্যে নিশ্চয়ই আপনি উদ্ধার করেননি?”

“ভুল। তোমাকে উদ্ধার করেছি প্রয়োজনে, সেটা না মিটলে তোমাকে আর কী দরকার? যখন তোমার জ্ঞানহীন শরীরটাকে এখানে আনা হচ্ছিল, তখন আমার একজন কর্মচারী তোমায় দেখে ঠিক এই সাপটার মতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। বেচারাকে তুমি এমন নাজেহাল করেছিলে যে, আমার কাছে প্রচণ্ড শাস্তি পেয়েছিল। সে বদলা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু যেহেতু তুমি অজ্ঞান ছিলে তাই আমি তাকে নিবৃত্ত করেছিলুম। কাগজে কী লেখা ছিল?”

প্রোফেসর হ্যাচ এবার অর্জুনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।

“আপনি যখন ওই সুড়ঙ্গ এবং গুহার মধ্যে যেতে পেরেছেন তখন মনে হচ্ছে কিছুই আপনার অজানা নেই। তা হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন?”

“তোমার মনে হওয়ার সঙ্গে বাস্তবের মিল নাও থাকতে পারে খোকা। গত দু’ বছর ধরে আমি আমার সর্বস্ব ব্যয় করে যাচ্ছি ওটি অনুসন্ধানের জন্যে। কারণ আমি মনে করি ওই সম্পদের অংশ আমার আছে। মার্শাল মূখটা কী মনে করত নিজেকে, তা সেই জানত। সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এখানে বসল মুক্তো চাষ করতে। জীবনে যে একটা মুক্তো হাতে নিয়ে দেখেনি সে করবে মুক্তো চাষ। আর এই সমুদ্রের জলে মুক্তোর চাষ হয়? এত জায়গা থাকতে ও এখানটা বেছে নেওয়াতে আমার সুবিধে হল। ওর কাছে খবর ছিল সম্পদটা এখানকার সমুদ্রেই লুকানো আছে। মুক্তো চাষের নাম করে ও সাবমেরিনে চেপে অন্ধের মতো সমুদ্র হাতড়াত। চিরদিনই মাথা মোটা ছিল ওর। কিন্তু আমার সুবিধে করে দিল।

“কী করে?”

“প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার স্বভাবে পড়ে না খোকা।”

“আপনি ওই সাপটাকে পুষেছেন কেন?”

“বড্ড বেয়াড়া তো তুমি!” প্রোফেসর হাসলেন। একটা হাত ঝুড়ির ওপর রেখে নিজের মনেই বললেন, “সাপ আমার বড় প্রিয়। নিরীহ, চুপচাপ সাপ নয়, রাগীগুলো। ওদের ফোঁসফোঁসানি না শুনতে পেলে আমার নার্ভ উত্তেজিত হয় না।”

“মার্শালকে মারলেন কেন?”

“প্রশ্ন কোরো না। জুতোর গর্তে তুমি কাগজ পেয়েছিলে। সেই কাগজ দেখে লকারের চাবি। ব্যাঙ্ক খুব অন্যায় করেছে তোমাদের লকারের ভেতরের কাগজটা দেখিয়ে। সেই ম্যানেজারটাকে সাসপেন্ড করিয়েছি, কারণ লোকটা আমাকে কাগজ দেখাতে চায়নি। অথচ সেই কাগজ দেখার অধিকার আমারই সবচেয়ে বেশি। কারণ যে ওই সম্পদ লুকিয়ে রেখেছে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমি কাজ করেছিলাম।” প্রোফেসর এবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন। আচমকা ঝুড়িতে আঘাত করামাত্র ভেতরের সাপটা তীব্র শব্দ তুলল।

“কাগজে কী লেখা ছিল?”

“আপনি গুহাটাকে ভাল করে খুঁজে দেখেছেন?” অর্জুন ইচ্ছে করে সময় নিচ্ছিল।

“তন্নতন্ন করে। কোথাও বাক্সটা পাইনি।”

“কিসের বাক্স?”

“কাঠের বাক্সের ওপরে টিনের পাত মোড়া। জলে পচে যেতে অনেক সময় লাগবে। হিরেগুলো আছে তার মধ্যে।”

“কোথাকার হিরে?” অর্জুন বুঝতে পারছিল জ্বর আসছে শরীর কাঁপিয়ে। “ওঃ, তুমি আমাকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছ।” প্রোফেসর এগিয়ে এলেন দ্রুত পায়ে। পকেট থেকে একটা সরু কাঁটাওয়ালা গ্লাভস্ বের করলেন। অর্জুন দেখল গ্লাভসটার আঙুলের ওপরে বড় জোর সিকি ইঞ্চি ধারালো কাঁটা। সেটা পরে নিয়ে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কাগজে কী লেখা ছিল?”

অর্জুন মাথাটা পেছনে সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কী করে জানলেন যে, কাগজে যা লেখা ছিল তা আমিই জানি।”

“মার্শালের ক্যাম্পের সব খবর আমার কাছে আসত।

অর্জুনের মনে হল এখন এই পরিস্থিতিতে কাগজে যা লেখা ছিল তার কোনও গুরুত্ব নেই। প্রোফেসর তো নিজেই সেই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। সে লাইনগুলো পর পর বলে গেল। সুড়ঙ্গটা তার তলায়, ঢুকবে একটা মানুষ, অর্জুন এখানেই থামতে প্রোফেসর উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”

“আর কিছু লেখা ছিল না।” অর্জুন মাথা নাড়ল। এখন আর কথা বলতে শরীর চাইছিল না।

“তুমি মিথ্যে কথা বলছ।” হঠাৎ প্রোফেসরের হাত অর্জুনের মুখের ওপর নেমে এল। তিনি আঘাত করলেন না, শুধু হাতের উলটো পিঠটা চেপে ধরলেন। অর্জুন মুখ সরিয়ে নিতে চেষ্টা করলে বললেন, “কোনও লাভ হবে না। এখন আদর করছি, মুখ সরাতে চেষ্টা করলে আঘাত করব। কাগজে আর কী লেখা ছিল?”

“বিশ্বাস করুন আর কিছু ছিল না।” অর্জুন ফ্যাকাসে গলায় বলল।

“কাগজটা যে ভদ্রমহিলা কপি করে এনেছিলেন তিনি ঠিকঠাক কাজটা করেছিলেন?”

“মনে হয়। যদিও জিজ্ঞেস করিনি।”

“তা হলে গুহার ভেতরে গিয়ে কী খুঁজছিলে?”

“চেষ্টা করেছিলাম যদি কিছু খুঁজে বের করা যায়।” অর্জুন নিজের শক্তি ফিরে পেতে চাইছিল।

প্রোফেসর আর দাঁড়ালেন না। ঝড়ের মতো তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর অর্জুনের মনে হল প্রোফেসরের কাছে তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেল। নিজের স্বার্থেই লোকটা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, জল থেকে উদ্ধার করেছিল। এখন তাকে মেরে ফেলতে একটুও অসুবিধে নেই। প্রচণ্ড হতাশা ওকে ঘিরে ধরল। অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক না হয়ে জলে নামা খুব ভুল হয়ে গিয়েছিল। মার্শালও তো তার সঙ্গেই জলের ভিতর ছিল। উত্তেজনায় তারও কি সময় হিসাব করতে ভুল হয়ে গিয়েছিল?

কিন্তু এভাবে অসহায়ের মতো মরা চলবে না। হঠাৎ ওর মেজর আর ব্রাউনের কথা মনে পড়ল? ওরা কি তাকে খোঁজার চেষ্টা করছে না?

অর্জুন সাপের ঝুড়িটার দিকে তাকাল। ঝুড়িটা তার নাগালের মধ্যে। কিন্তু ওটা দিয়ে সে কী করতে পারে? ঢাকনা খুলে দিলে সাপটা নিশ্চয়ই তাকে কামড়াবে। সে চারপাশে তাকাল। তারপর ঝুঁকে একটা বড় কাঠের টুকরো তুলে নিল। কানের কাছে অনবরত ফোঁসফোঁসানি—শুধু মৃত্যুচিন্তা ডেকে আনে। সাপটাকে ছেড়ে দিলে যদি কামড়াতে আসে তা হলে এই কাঠ দিয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করবে কিন্তু ওই রাগী শব্দ শুনতে আর রাজি নয়। অর্জুন চার ফুট লম্বা কাঠের ফালিটা দিয়ে ধীরে-ধীরে ঝুড়ির আংটাটা খুলে ফেলল। সাপটার গর্জন আরও বেড়েছে। এক ঝটকায় ঝুড়িটার ডালা খুলে ফেলে সেটাকে বিপরীত দিকে ঠেলে দিল সে যতটা পারে। প্রায় স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে নামল সাপটা। মাটিতে পড়েই একেবারে লেজের ওপর ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে ফণা মেলে দুলতে লাগল। সাপটা যদি ওখান থেকেই ছোবল মারে তা হলে অর্জুনের শরীর পেয়ে যাবে। কাঠটাকে শক্ত হাতে বাগিয়ে ধরে রইল অর্জুন। যত দ্রুত গতিতেই সাপটা ছোবল মারুক সে ওকে আঘাত করবেই। আর এই সময় তাঁবুর বাইরে একটা গলা শোনা গেল, “ও কে বস্। ইটস মাই প্লেজার।”

শব্দটা কানে যাওয়ামাত্র অর্জুন দেখল সাপটা ফণা নামিয়ে নিচ্ছে। দ্রুত শরীরটা নীচে নামিয়ে ডান দিকে চলে গেল। একটা বড় কাঠের বাক্সের ওপাশে গিয়ে সেটা আশ্রয় নিল। আর তখনই লোকটা ঢুকল। অর্জুন ওকে চিনতে পারল। সমুদ্রের ধারে একেই সে বেইজ্জত করেছিল। তাঁবুর দরজায় দাঁড়িয়ে লোকটা হলদে দাঁত বের করে বলল, “এবার তোমাকে পেয়েছি বাছাধন। বস্ বলেছে তোমাকে নিয়ে আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। নাউ ডিসাইড ইওরসেল্ফ, তুমি কীভাবে মরতে চাও।”

অর্জুন লোকটাকে দেখল। কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র আছে। বেল্টের সঙ্গে একগোছা চাবি রিঙে ঝুলছে। ওই চাবিগুলোর একটাতে কি তার পায়ের তালা খুলবে? সে হাসতে চেষ্টা করল, “এ বিষয়ে কথা বলা দরকার। তোমার হাতে সময় আছে?”

লোকটা অবাক হল, “বাঃ, তোমার নার্ভ আছে দেখছি।” সে তাঁবুর ভেতর ঢুকে একটা বাক্স টেনে নিয়ে দু’ পা ফাঁক করে বসল, “কী কথা বলবে?”

“আমাকে ছেড়ে দেওয়া যায়?”

“এক লক্ষ পাউন্ড দিলেও না।” লোকটা হাসল।

অর্জুন দেখল লোকটা সেই বাক্সটা টানেনি যেটার পেছনে সাপটা লুকিয়েছে। আর হত্যা করার সুযোগ পেয়েও এমন আনন্দিত যে, পাশেই সাপহীন ঝুড়িটা যে পড়ে আছে তা লক্ষই করছে না। লোকটা বলল, “গুলি করব না, তাতে যন্ত্রণা পাবে না। তোমার হাতের একটা নার্ভ কেটে দেব। রক্ত বের হবে আর তুমি একটু একটু করে মারা যাবে। তোমার হাতে ওটা কী? কাঠের টুকরো? কী করবে ওটা দিয়ে? হা হা হা।”

অর্জুনের খুব রাগ হয়ে গেল। সে কাঠের টুকরোটাকে সেই বাক্সটার দিকে ছুঁড়ে দিল যেটার কাছে সাপটা আশ্রয় নিয়েছে। লোকটা বলল, “বাস্! ওই বাক্সটার ওপর এত রাগ কেন তোমার?” বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়াল।

দু’পা পিছিয়ে বাক্সটার পাশে ঝুঁকে কাঠটা কুড়িয়ে নিতে গিয়েই আঁতকে উঠল। অর্জুন দেখল লোকটার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। প্রচণ্ড ভয়ে সে ছিটকে আসতে চেষ্টা করল অর্জুনের দিকে। কিন্তু তার আগেই রাগী সাপটা ছোবল মেরেছে তাকে, পর পর দু’বার। লোকটা মুখ হাঁ করল। কিন্তু চিৎকার করার সুযোগ পেল না। সাপটা তখন দ্রুতবেগে ছুটে গেল তাঁবুর দরজার দিকে। অর্জুন দেখল লোকটা তার এক ফুট দূরে পড়ে আছে নিঃসাড়ে। এটা কী সাপ? ওর বিষ এত দ্রুত কাজ করল? বিস্ফারিত চোখে অর্জুন দেখল প্রথম ছোবল পড়েছে লোকটার কানের নীচে। এতক্ষণ যে তর্জনগর্জন করেছিল সে এখন নিঃসাড়।

মিনিট-দুয়েকের মধ্যে অর্জুন তাঁবুর দরজায় চলে এল। শরীরে এখনও রক্ত-চলাচল স্বাভাবিক নয়। একটু ঘোর লাগছে হাঁটার সময়। কিন্তু লোকটার কোমর থেকে খুলে নেওয়া আগ্নেয়াস্ত্র তাকে নবীন শক্তি জোগাচ্ছে। এটা সেই খাঁড়ি। দু’পাশে বুনো ঝোপঝাড়। তাঁবুগুলো এমনভাবে সেই সব ঝোপকে আশ্রয় করে পাতা হয়েছে যাতে বাইরে থেকে চট করে বোঝা যাবে না। অর্জুন সাপটার জন্যে চোখ বোলাল। সাধারণত ছোবল মারার পর ওরা কিছুটা নিস্তেজ হয়। কিন্তু ওই ঝোপঝাড়ে আশ্রয় পেতে ওর অসুবিধে হবে না।

তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসামাত্রই অর্জুন ওদের দেখল। প্রোফেসর হ্যাচ চারজন লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের মধ্যে সেই স্বাস্থ্যবান লোকটি রয়েছে যাকে প্রোফেসরের সঙ্গে সুপার মার্কেটে দেখতে পেয়েছিল। ওদের কাছে ধরা না দিয়ে এপাশ দিয়ে যাওয়া যাবে না। অর্জুন বিপরীত দিকে তাকাল। সমুদ্রের জল দেখা যাচ্ছে। এখন যদি লুকিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে মার্শালের ক্যাম্পে পৌঁছনো যায়, সেই চেষ্টাই করা উচিত। পাঁচজন লোকের সঙ্গে তার একার পক্ষে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার। অর্জুন পিছু হটতে লাগল আর এইসময় কুকুরের চিৎকার শুরু হয়ে গেল সেই কুকুর যাদের চেনে বেঁধে প্রহরীরা পাহারায় বেরোয়। অর্জুন পড়ি কি মরি করে দৌড়ল। পেছনেও পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে তবে সেটা খুব হালকা। ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল একটা রাগী চেহারার কুকুর দূরত্ব কমাচ্ছে। যেভাবে ছুটন্ত ইঁদুরের পেছনে লাফাবার সময় বেড়ালের মুখে ফুটে ওঠে জেদ ঠিক সেইভাবে ও এগিয়ে আসছে। এখন সামনে জল, পেছনে জঙ্গল আর রাগী কুকুর। যে গতিতে দৌড়েছিল প্রায় সেই গতিতেই অর্জুন জলের ভেতরে নেমে গেল। বুক পর্যন্ত যাওয়ার পর তার খেয়াল হল সে বেশিক্ষণ সাঁতরাতে পারবে না। এটা দ্বীপের সেইদিক, যেখানে বড় পাথর থাকায় মোটরবোট পর্যন্ত তীরে ভিড়তে পারে না। অর্জুন একটা বড় পাথরের আড়ালে চলে যাওয়া মাত্র মানুষের গলা শুনতে পেল। কুকুরের আচরণ অনুসরণ করে প্রোফেসরের লোকজন পৌঁছে গিয়েছে। অর্জুনের শরীরের নিম্নাংশ জলের তলায়। কনকনে ঢেউ এসে পড়ছে সেখানে। দুই হাতে পাথর আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। পায়ের ওজন যার ওপরে সেখানেও শ্যাওলা। কুকুরের ডাক মাঝে-মাঝে এপাশ-ওপাশ ছুটে যাচ্ছে। মুখ বের করে দেখার সাহস অর্জুনের হচ্ছিল না। মিনিট দু-তিন পরে হঠাৎ পেছনে সমুদ্রের ওপরে ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পেল সে। আর সেটা শোনামাত্র কুকুরগুলোকে শান্ত করতে অনেক শিস বাজতে লাগল। অর্জুন মুখ ঘুরিয়ে অনন্ত জলরাশির ওপর একটা ছোট্ট লঞ্চকে এগিয়ে আসতে দেখল। ওটা আসছে দ্বীপেই। কিন্তু এই তীরে নয়। ক্রমশ ডানদিক দিয়ে ঘুরে গেল লঞ্চটা। আর ওপাশের তীরের হই-হট্টগোল এখন একদম থেমে গেল।

দশ মিনিট পরে, যখন কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্রায় অসাড় তখন অর্জুন পাথরের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল। টলতে টলতে জল ভেঙে শুকনো ডাঙায় পা দিয়ে সে অসহায় চোখে চারপাশে তাকাল। কেউ কোথাও আছে বলে মনে হচ্ছে না। ওই লঞ্চটা দেখে কি প্রোফেসর হ্যাচের লোকজন নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে? লঞ্চটা কার? অর্জুন কেঁপে কেঁপে উঠছিল।

উত্তেজনায় এবং দীর্ঘসময় অনাহারে অর্জুনের পেটে ব্যথা শুরু হল। সে বালির ওপর বসে রইল কিছুক্ষণ। ব্যথা সামান্য কমতে ও যে-পথ দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিল, সেই পথে এগোল। ভেজা জামা-প্যান্ট আরও শীত তৈরি করছে হাওয়ার সঙ্গে মিশে। হাতের আগ্নেয়াস্ত্রটাকে জল থেকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল সে। সেটিকে নিয়ে সতর্ক ভঙ্গিতে এগোচ্ছিল।

হ্যাচের তাঁবুগুলো নেই। বোঝা যায় এখানে কেউ বা কারা তাঁবু গেড়ে কিছুদিন ছিল। কিন্তু মালপত্রসমেত সব-কিছু উধাও। খাড়ির পাশের জঙ্গলটাকে ভাল করে দেখল সে। এবং তখনই কিছু ব্যবহার-করা মালপত্র সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে দেখতে পেল। একটা আপেল জুসের টিন অটুট রয়ে গেছে সেখানে। ফেলে দেওয়ার সময় ওরা আর যাচাই করেনি প্রত্যেকটা। শুধু লোকচক্ষুর আড়ালে ফেলতে হবে বলেই জঙ্গলে ফেলা। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর অর্জুন টিনের মুখটা খুলতে পারল। অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে সে ক্যানটাকে যখন খালি করল তখন পেট অনেকটা ভর্তি।

প্রোফেসর হ্যাচ সদলে জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু কোথায়? মানুষটার যে চেহারা সে দেখেছে, তাতে গুপ্তধন উদ্ধার না করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পাত্র বলে মোটেই মনে হয় না। অর্জুন সমুদ্রের তীর ধরে এগোল। খানিকটা যেতেই সে সেই পথটা চিনতে পারল যেটা দিয়ে মার্শালের ক্যাম্প থেকে প্রথম দিন ব্রাউনের সঙ্গে এসেছিল। অর্জুন দৌড়তে চাইল। মিনিট-দুয়েকের মধ্যে সে লঞ্চটাকে দেখতে গেল। মার্শালসাহেবের ক্যাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্রমশ ওদের স্পষ্ট দেখতে পেল সে। মেজর একজন ইউনিফর্ম পরা লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। ব্রাউন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন ক্যাম্প তুলে লঞ্চে নিয়ে যাচ্ছে জিনিসপত্র। অর্জুনের মাথা টলছিল, দৃষ্টি মাঝে মাঝে অস্বচ্ছ হয়ে আসছে। খানিকটা ঘুরে জঙ্গল পেরিয়ে অর্জুন ডাকল, “মিস্টার ব্রাউন!”

প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে তাকাল ব্রাউন। তারপর বুকফাটানো চিৎকার করে ছুটে এসে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল অর্জুনকে, “ও বেঁচে আছে, ও বেঁচে আছে, ও ভগবান!”

মেজর তাঁর ভারী শরীর নিয়ে ছুটে এলেন, “আহ্ কী আশ্চর্য, চেপেই ছেলেটাকে মেরে ফেলবে যে। ছেড়ে দাও, চব্বিশ ঘণ্টা কোথায় ছিল সেটা জানা দরকার।

কিন্তু ব্রাউন তাকে ছাড়তেই মেজর তাকে জড়িয়ে ধরলেন। অত বড় মানুষটার চোখে এখন জল, গলায় কান্না, “ও অর্জুন, আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না।”

“এখন তো আমি ঠিক আছি।

“না, মোটেই ঠিক নেই। তোমার শরীরে প্রচণ্ড টেম্পারেচার। জামা-প্যান্ট ভিজে কেন!”

অর্জুন এতক্ষণে অস্বস্তিটাকে টের পেল। চোখ-মুখ গরম হয়ে গিয়েছে। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে খুব। মেজর ওকে ধরে ধরে লঞ্চে নিয়ে গেলেন, “মার্শাল তো ফিরল না, কী হয়েছে জানো?”

অর্জুন ফিসফিসিয়ে বলল, “তিনি আর ফিরবেন না।”

মেজর একটু দাঁড়িয়ে পড়লেন, “ওঃ। আমরা ওঁর তাঁবু, মালপত্র বন্দরে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”

অর্জুনকে একটা ডেকচেয়ারে শুইয়ে দেওয়া হল। সেইসময় ইউনিফর্ম-পরা লোকটি উঠে এলেন ব্রাউনের সঙ্গে। ব্রাউন তাঁকে বোধ হয় অর্জুন সম্পর্কে বোঝাচ্ছিল। লোকটি প্রথমেই ভেজা পোশাকটা পালটাতে বললেন। শুকনো পোশাকে কম্বল মুড়ি দেবার পর অর্জুনের আরাম হল।

অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কি কথা বলার মতো ইচ্ছে আছে?” অর্জুন হাসতে চেষ্টা করল, “বলুন।”

“ডুবো পাহাড়ের নীচে কী ঘটেছিল?”

‘সেটা অনেক বড় গল্প।”

“ও, মিস্টার মার্শাল কোথায়?”

“ডুবো পাহাড়ের নীচের গুহায় ওর মৃতদেহ পড়ে আছে।”

“হত্যাকারী কারা?”

‘প্রোফেসর হ্যাচ আর তাঁর সঙ্গীরা।”

“গুপ্তধন কি ওরা পেয়েছে?”

“না। তবে নিশ্চয়ই আবার চেষ্টা করবে।”

“ঠিক আছে। এখন বিশ্রাম নিন। পরে অনেক কথা বলতে হবে। অফিসার উঠে গেলেন। অর্জুন চোখ বন্ধ করল। জ্বরটা যেন হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে। মেজর তার পাশে বসে রয়েছেন, ব্রাউন পায়ের কাছে। সে চোখ খুলল আবার। ব্রাউন বলল, “কী ভয়ানক লাল হয়েছে চোখ, ওষুধ যা আছে সঙ্গে…!”

মেজর বললেন, “কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা হাসপাতালে পৌঁছে যাব। ডাক্তারের কাজ ডাক্তাররাই করবে।”

অর্জুন বলল, “গুপ্তধনটা ডুবো পাহাড়ের নীচেই পড়ে রইল কিন্তু!”

মেজর বললেন, “হুম।

“সেকেন্ডহ্যান্ড জুতোর গর্তে কাগজটা আমরাই খুঁজে পেয়েছিলাম।” অর্জুন বিড়বিড় করল।

মেজর বললেন, “ভুলে যাও ওসব কথা। ধরা যাক গুপ্তধন পেলাম আমরা। ব্রিটেনের ধনসম্পত্তি ব্রিটিশ সরকার অমাদের নিয়ে যেতে দিত? কক্ষনো না। ওরাই আমাদের দেশ থেকে সব মণিমুক্তো নিয়ে এসেছে, নিজেরটা কেন হাতছাড়া করবে। মিছিমিছি পরিশ্রম হত। বুঝলে? ভুলে যাও।”

কথাগুলো অর্জুনের কানে ভাল করে ঢুকছিল না। সে বলল, “ওগুলো পেলে গরিব মানুষের খুব উপকার হত। আমি জানি প্রোফেসর আবার চেষ্টা করবে কিন্তু কখনও খুঁজে পাবে না।”

“কী করে বুঝলে?” মেজর জানতে চাইলেন।

“ওরা অনেক দিন ধরে ডুবো পাহাড়টাকে খুঁজছে। যিনি ওটাকে লুকিয়ে রেখেছেন তিনি শেষটা বলে যাননি। মনে হয় প্রোফেসর ওঁকে খুন করেছিলেন না জানতে পেরে। আর আপনার বন্ধু মার্শালও ওটার খোঁজে এখানে ছিলেন। মুক্তো চাষ ভাঁওতা।”

মেজর মাথা নাড়লেন, “কারেক্ট। এই সন্দেহটা আমিও করেছিলাম। অর্জুন হাঁ করে নিশ্বাস নিল, “কিন্তু আমি হেরে গেলাম।”

এই প্রথম কথা বলল ব্রাউন, “মোটেই না। গুপ্তধন যত দামী হোক তোমার প্রাণের চেয়ে মূল্যবান নয়। আমরা সেটাকে ফিরে পেয়েছি। কী বলো মেজর?”

মেজর হঠাৎ উঠে ব্রাউনের হাত আঁকড়ে ধরলেন, “ক্ষমা করো।’

ব্রাউন খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

“তুমি একটা সত্যিকারের মানুষ সেটা ওই কথায় প্রমাণ করলে, তাই। মেজর গদগদ গলায় বললেন।

বন্দর এগিয়ে আসছে। লঞ্চ সিটি বাজাল। অফিসার এগিয়ে এলেন, “আমি অয়ারলেসে কথা বলেছি। অ্যাম্বুলেন্স আসছে।”

মেজর মুখ ফিরিয়ে দেখলেন তীব্রগতিতে একটা অ্যাম্বুলেন্স ছুটে আসছে বন্দরের দিকে। অর্জুনের বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ, অফিসার।”

***