দেড়দিন – ৪

৪.

ওরা যখন বাংলোয় ফিরল, তখন জঙ্গলে সন্ধে নেমেছে। ঝিঁঝির ডাক শুরু হয়ে গেছে চার পাশে। ফরেস্ট অফিস থেকে বাংলোর রাস্তায় আলো জ্বলছে। গাড়ি থেকে নেমে ওরা মিস্টার বিশ্বাসের নির্দেশ শুনল। রাত ন’টায় ওঁরা এখান থেকে বের হবেন। তার মধ্যে খেয়ে নিতে হবে। প্রস্তুত থাকতে হবে সারা রাত জেগে থাকার জন্যে। উনি ফিরে গেলেন।

অর্জুন নন্দিনীর সামনে দাঁড়াল, “শুনুন, আপনার সঙ্গে কথা আছে।”

“বলুন।” নন্দিনী সন্ধিগ্ধ চোখে তাকাল।

“আপনি মিসেস ভার্মার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন না।”

“কেন?” প্রতিবাদের গলায় জিজ্ঞেস করল নন্দিনী।”

“এমনও হতে পারে, মিসেস ভার্মা পরিচয় দিয়ে এখানে যিনি আছেন, তিনি হয়তো ওঁর স্ত্রী নন। হয়তো অন্য কোনও আত্মীয়, কিংবা প্রয়োজন পড়েছে বলে ওই পরিচয় দিতে বাধ্য হয়েছেন।” অর্জুন নিচু গলায় বলছিল।

নন্দিনীর চোখ-মুখে বিস্ময় ঠিকরে উঠেছিল, “সে কী!” তারপর বাংলোর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “আমি যদি কোনওভাবে দূর থেকেও ওঁকে দেখতে পেতাম।”

“সেই চেষ্টা না করাই ভাল।” বলতে বলতে অর্জুন দেখল, শিলিগুড়ির সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার কিচেনের দিক থেকে বেরিয়ে আসছে। কথা না বাড়িয়ে অর্জুন দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল। যেহেতু অন্ধকার নেমেছে এবং জলঢাকা থেকে পাওয়া বিদ্যুতের তেজ খুবই কম, তাতে লোকটা তাকে দেখতে পায়নি বলেই মনে হল তার। এখন দোতলার সেই ঘরটির দরজা বন্ধ। নিজের ঘরে ঢুকে স্বস্তি পেল সে। যদিও তার মনে হল, মেয়েদের বলে আসা উচিত ছিল, যে-যার ঘরে যেন ফিরে যায়। সে নিশ্চিত যে, মিস্টার ভার্মা তাদের খোঁজ পেয়ে এখানে আসেননি। তিনি যে মতলবেই শিলিগুড়ি শহরে গিয়ে থাকুন, মিসেস ভার্মা নামক মহিলাকে যেহেতু এখানে রেখে গিয়েছিলেন, তাই ফেরত আসতে হতই তাঁকে। ব্যাপারটা অদ্ভুত। মালবাজার ট্যুরিস্ট লজের সব ক’টি মানুষ যেন হলং-এ চলে এল কারও অদৃশ্য হস্তক্ষেপে।

খোলা জানালায় চেয়ার নিয়ে বসেছিল অর্জুন। আকাশটা যেন অন্য রকম। কেমন একটা আলো চুঁইয়ে আসছে সেখান থেকে। আজ কোন্ তিথি? এক-টুকরো চাঁদ সম্ভবত উঠে আসছে। ও পাশের জঙ্গলে নিশ্চিদ্র অন্ধকার। শুধু ঝিঁঝিঁ ডাকছে, হাওয়া বইছে। এই সময় দরজায় শব্দ হল। অর্জুন ঘরে ঢুকতে বললে দুপুরবেলার সেই লোকটা চায়ের ট্রে হাতে উদয় হল, ‘মেমসাব লোগ আট বাজে খানা খায়েগা। আপ?”

“সাড়ে আটটায়। কী খাওয়াবে?”

“চিকেন রোটি আউর ভাজি।”

“খুব ভাল। মিস্টার পুরি কোন্ ঘরে আছেন?”

“দোতলামে। উও আব্‌ভি আ গিয়া।”

“তুমি খুব ভাল মানুষ। আচ্ছা, এখানকার গ্রামগুলোতে তুমি যাও?”

“জি সাব।”

“আজ যে লোকটা খুন হল, তাকে চেনো?”

“জি সাব।”

“চেনো?”

“জি সাব। আচ্ছা আদমি থা। লেকিন দো-তিন মাহিনা সে উসকো দিমাগ খারাপ হো গিয়া থা।”

“কী রকম?”

“হামকো বোলা, বাংলোমে বড়া-বড়া আদমি আতা হ্যায়, উনলোগ পুরানা সোনা চাহে তো মিল যায়েগা। সস্তামে। হাম বোলা, তুম পাগলা হো গিয়া।”

“তারপর?”

“উসকো বাদ নেহি আয়া ও।”

“ঠিক আছে, যাও।”

লোকটি চলে গেল, কিন্তু অর্জুনের মন জুড়ে তখন উত্তেজনা। জগুদা তাকে মালবাজারে যে সোনা বাঁধা-রাখার গল্প বলেছিলেন, সেটার সত্যতা সে নিজের চোখে দেখে এসেছে। ব্যাপারটা মাদারিহাট, হলং-এ পৌঁছে গিয়েছে। অর্থাৎ, একটা বিরাট চক্র এর পেছনে কাজ করছে। কিন্তু যত সহজ মনে হচ্ছে ব্যাপারটা, ঠিক তত সহজ নয়। একজন বা একদল মানুষের হাতে যদি চোরাই বসোনা এসে থাকে, তা হলে তাদের জানা আছে ন্যায্য দামে কী করে তা বিক্রি করতে হয়। কম দামে বিক্রি অথবা অল্প টাকায় বন্ধক রেখে লোকসান করবে কেন তারা। ব্যাপারটায় ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। আর আজ যে লোকটার মৃতদেহ পাওয়া গেল! সে নিশ্চয়ই এই সোনাচক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল। কোনও রকম মতবিরোধ ঘটায় লোকটাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। কিন্তু সেই লোমশ জন্তুটাই সব হিসেবে গোলমাল করে দিচ্ছে।

অর্জুন সিগারেট ধরাল। চা খেতে খেতে বাইরের দিকে তাকাতেই দেখল, বাংলোর ওপর থেকে একটা সার্চলাইট ঝোরার ওপারের ঘাসের মাঠটাকে আলোকিত করছে—যেখানে নুনমাটি রাখা আছে। আর আচমকা আলো পড়ায় গোটা-বারো বিশাল চেহারার বাইসন মুখ তুলে তাকাল এ দিকে। আলোয় তাদের চোখ জ্বলতে লাগল। দৃশ্যটি সুন্দর। বাইসনগুলো এবার সরতে লাগল। যেন ছোট-ছোট টিলা ঢেউ-এর মতো চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে। তখনই আলো নিবে গেল।