॥ সাত।।
আকাশে বেশ মেঘ। কখন মেঘ জমল তা টের পায়নি অর্জুন। হাঁটতে হাঁটতে সে পুরো ব্যাপারটা ভাবার চেষ্টা করছিল। যারা শহরে এসেছে তারা নিশ্চয়ই স্থানীয় কাউকে সঙ্গী করেছে। না হলে এত স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতে পারত না। এই লোক্যাল লোকটি কি সেই ড্রাইভার? তাকেই কি আজ তারা গাড়িটা চালিয়ে যেতে দেখল? সামচিতে যাচ্ছে ওরা। সামচি হল জলপাইগুড়ি থেকে মাইল চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ দূরের ভুটান বর্ডার। নাম শুনেছে, কিন্তু কখনও যাওয়া হয়নি। গাড়িতে দূরের ভুটান বর্ডার। নাম শুনেছে, কিন্তু কখনও যাওয়া হয়নি। গাড়িতে ঘণ্টা দেড়েক লাগে। সুধাময় সান্যালের কথা যদি ঠিক হয় তা হলে ওরা আজ রাত্রেও এই শহরে থাকছে। এখন ওদের অস্তিত্ব একমাত্র অর্জুন ছাড়া এই শহরের কেউ জানে না। অতএব নিশ্চিন্ত ওরা। কিন্তু আজ রাত্রে কী কাজ ওদের? আবার তার লাইটারটার কথা মনে পড়ল। দু’ নম্বর বোতামটা টিপলেই চার্জ হবে এবং তখন ছুঁড়ে দিলে দশ সেকেন্ডর মধ্যেই যে বিস্ফোরণ ঘটবে তাতে একটা হাতি মরে যাবেই। কিন্তু ওই লাইটারটাই যে সেই কর্মটি করবে তা প্রমাণিত হল কই; জেমসের কাছ থেকে চেয়ে আনলে ভাল হত। কথায়-কথায় ওটার কথা আসবার সময় একটুও খেয়াল ছিল না।
জলপাইগুড়ির একমাত্র হোটেলটির সামনে পৌঁছে অর্জুনের মনে হল ভেতরে গিয়ে সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবরটা দিয়ে আসে। গতকাল ভদ্রলোক খুব ক্ষুব্ধ ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের ব্যবহারে। তাকে দেখেই ভদ্রলোক বললেন, “কী খবর। সব ভাল? কালকের লোকটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। শুনলাম তিনি নাকি মারা গিয়েছেন? আত্মহত্যা? যা রাগী লোক। আরে ভাই, এই হোটেলের কেউ কোনও বদনাম কখনও করেনি। এই তো এক সাহেব আজ বিকেলে চলে গেলেন, তিনি তো কোনও বদনাম করেননি।
কোনও মানুষ মারা গেলেও যারা তার সম্পর্কে রাগ পুষে রাখে তাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না অর্জুনের। তবু সে বলল, “আপনার হোটেলে আজকাল খুব সাহেব-মেম আসছে বুঝি?”
মেম না শুধু সাহেব। কাল একজন আমেরিকান ছিলেন, আজ চলে গেছেন। আর একজন চাইনিজ এসেছেন। খাওয়াদাওয়ার হেভি ঝামেলা ওদের।
“আমেরিকান ভদ্রলোক? কী নাম বলুন তো?”
“খাতা দেখে বলতে হবে। হ্যাঁ, রবার্ট মিচেল। চা-বাগানের ব্যবসায় এখানে এসেছেন। খুব ভদ্রমানুষ।”
চা-বাগানের ব্যবসা এখানে আমেরিকানরা কখনও করেছে কি না অর্জুন জানে না। তবে রাস্তায় চলতে চলতে অর্জুনের মনে হল, রবার্ট মিচেল কেন ওই হোটেলে থাকতে গেলেন? তিনি তো টি প্ল্যান্টার্স ক্লাবেই স্বচ্ছন্দে জায়গা পেতে পারতেন।
বাড়ির সামনে এসে সে অবাক হল। তাদের বাইরের ঘরে আলো জ্বলছে। তার মানে কেউ দেখা করতে এসেছে। ইলেকট্রিকের বিল বেশি ওঠে বলে মা অকারণে বাইরের ঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখেন না। সে নক করতেই যিনি দরজা খুললেন তাঁকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল অর্জুন। দরজা খুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে চেয়ারে ফিরে গিয়ে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট পত্রিকা ওলটাতে ওলটাতে অমল সোম বললেন, “মাসিমা একা থাকেন। এত রাত পর্যন্ত বাইরে ঘোরার কী দরকার তা বুঝি না!”
অর্জুনের সময় লাগল স্থির হতে, “আপনি! আপনি কখন এসেছেন?”
“এই তো। হাবু বলল তুমি গিয়েছিল। তাই চলে এলাম। মাসিমা বললেন গতরাতেও তুমি বাড়ি ফিরতে দেরি করেছ।”
অর্জুন উলটো দিকের চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করল, “আপনি বোম্বে থেকে লিখেছিলেন কবে ফিরবেন জানেন না, আপনাকে দেখে খুব ভাল লাগছে।”
অমল সোম কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, “অর্জুন, তোমার বুদ্ধি আগের থেকে অনেক ধারালো, কিন্তু এখনও পুরো হয়নি। আমার চিঠির ওপরে পোস্টাল স্ট্যাম্প দেখেছ? ওগুলো বোম্বের নয়। যা হোক, হাবু বেচারা এখন হাসপাতালে। খুব সামান্য চোট লেগেছে যদিও। কিন্তু আমাদের বাইরের ঘরটা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তুমি আসার আধঘণ্টা বাদেই ব্যাপারটা ঘটে।”
অর্জুন চমকে উঠল আবার, “কী হয়েছে বাইরের ঘরে?”
“একজন নেপালি এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। হাবু তাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে আমি নেই। তখন সে তোমার কথা জিজ্ঞেস করে। হাবু যা বলে তা সে বোঝেনি। দরজা বন্ধ করার পর হাবু দেখেছে সে সিগারেট ধরাচ্ছে কিন্তু চলে যাচ্ছে না। মনে হয় লোকটা সন্দেহ করেছিল তুমি বাড়িতে আছ। ও বাইরের ঘরে পায়ের শব্দ পেয়েছিল, কিন্তু হাবু তখন পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তার ওই ঘরে শব্দ করা সম্ভব না। ঠিক তাই সে কিছু একটা ছুঁড়ে দেয় ঘরের মধ্যে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিস্ফোরণটা ঘটে। কী ছুঁড়েছে তা দেখবার জন্য এগিয়ে যেতে হাবু সামান্য আঘাত পায়। আর সেই সুযোগে লোকটা সরে পড়ে।”
অমলদা চুপ করলে অর্জুন উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঘরের ভেতরে কে শব্দ করেছিল?”
“আমি। তোমরা বেরিয়ে যাওয়ামাত্র আমি ফিরেছিলাম। হাবুকে আমি নিষেধ করি কাউকে আমার ফিরে আসবার খবর জানাতে। তার কিছুক্ষণ বাদেই ওই গাড়িটা নিয়ে নেপালি লোকটা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। এই নিয়ে ভাবনার কিছু নেই।”
“লোকটা কেন এমন করল আপনি অনুমান করতে পারেন?”
“হয়তো কোনওদিন ওকে কোনও অপরাধের জন্য ধরিয়ে দিয়েছিলাম, তার বদলা নিল। লোকটা লাইটার ছুঁড়তে যাচ্ছে দেখেই আমি দ্রুত পাশের ঘরে ছুটে যাই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যখন আমি বাড়ির পেছনে, তখনই বিস্ফোরণ ঘটল। লোকটাকে আমি চেষ্টা করলে ধরতে পারতাম। কিন্তু ও অত দ্রুত গিয়ে গাড়িতে উঠবে ভাবতে পারিনি। তা ছাড়া লাইটার থেকে বিস্ফোরণ তো কল্পনায় ছিল না।” কথা বলে কান খাড়া করলেন অমল সোম। চাপা গলায় বললেন, “দু’জন লোক বাইরে এসেছে। বাইরে গিয়েই কথা বল। আমি যে ভেতরে আছি তা জানানোর দরকার নেই!”
অমলদার এইভাবে ফিরে আসা এবং নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কথা বলা অৰ্জুনকে এমন অবাক করে দিয়েছিল যে, লাইটার সম্পর্কে অমলদা কতটা জানেন সেটা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেল। এই সময় দরজায় শব্দ হল। অর্জুন পরিচয় জানতে চাইলে ওপার থেকে উত্তর এল, “আমরা গদাই।”
সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল অর্জুন। পোড়া এবং কাটা-গদাই সামনে দাঁড়িয়ে। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “বল, কী খবর?”
কাটা-গদাই বলল, “লোকটার নাম মান সিং। নাথুয়া লাইনে বাস-ড্রাইভারি করত। কিন্তু বড় একটা চাকরি নিয়ে ও নাকি নেপালে চলে গিয়েছিল। অনেক বছর এখানে আসেনি। চার নম্বর গুমটির কাছে ওর বাসা ছিল। দু’দিনের জন্য নাকি বেড়াতে এসেছিল, আজ চলে গেছে ডুয়ার্সে। ওর এক ভাই এখনও আছে চার নম্বর গুমটিতে। সে বলল।”
পোড়া-গদাই বলল, “আমার খুব লজ্জা করছে। আমার দোষেই ব্যাগটা হারালাম।”
কাটা-গদাই বলল, “আমাদের দিয়ে যা সম্ভব, তাই করব। ব্যাগটা উদ্ধার না করা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না। চোরের ওপর বাটপাড়ি।”
অর্জুন বলল, “মাথা গরম কোরো না তোমরা। যারা ওই ব্যাগ সরিয়েছে তাদের কাছে খুব জোরালো অস্ত্র আছে। তোমরা যদি আমাকে সাহায্য করতে চাও, তা হলে খুশি হব। তোমাদের মধ্যে একজন তিস্তা বাংলোতে চলে যাও। সেখানে দেখবে এক দুই তিন চার নম্বরের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে কি না। যদি থাকে তো চলে এসো। কাউকে কিছু বোলো না। আর একজন এখানে অপেক্ষা করো। সন্দেহজনক কাউকে দেখতে পেলে আমাদের জানিয়ে দিও।”
‘আমাদের’ শব্দটা উচ্চারণ করে সচকিত হল সে। কিন্তু গদাইরা যে সেটা বুঝতে পারেনি তাতে সন্দেহ নেই। কাটা-গদাই বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে। অর্জুন আবার দরজা বন্ধ করে ভেতরে আসামাত্র অমলদা বললেন, “চমৎকার। তোমার উন্নতি দেখে আমার ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে, এই কেসটা তুমি নিজেই ট্যাকল করতে পারবে অর্জুন।”
অর্জুন অমলদার সামনে চেয়ার টেনে বসল, “আমি বুঝতে পারছি না আপনি কী করে এই কেসটার কথা জানলেন? কতটাই বা জানেন?”
অমলদা চোখ বন্ধ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আমি চাই না ভারতবর্ষের মানুষের মন বিষাক্ত করতে বিদেশিরা সক্ষম হোক। একদল মতলববাজের হাতে ওই লাইটার তুলে দিতে আমি চাই না। জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি সম্পর্কে আমি যাবতীয় বৃত্তান্ত জানি। তোমাকে আমি বলেছিলাম, ভারতবর্ষে বেড়াতে যাচ্ছি। তাই ইচ্ছে ছিল। এই সময় আমেরিকা থেকে সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের একটি চিঠি আমি পাই। তিনি বিষ্টুসাহেবের বোনের কাছ থেকে আমার খবর পেয়েছন। নিউইয়র্ক টাইমসে পাঙ্কদের ঘটনাটা পড়েছেন। ব্যাপারটা জানিয়ে উনি আমাকে সাহায্য করতে অনুরোধ করেছেন। ওঁদের কাছে খবর ছিল এই গ্যাংটা কাঠমাণ্ডু হয়ে ডুয়ার্সে আসবে। আমি সুধাময় সান্যালকে লাইটারটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি। তিনি খুব উৎসাহিত হন সংগ্রহ করতে। ফলে আমার অজানা থাকল না ওই বস্তুটির বৈশিষ্ট্য। ভারতবর্ষের বদলে আমি চলে গেলাম কাঠমাণ্ডুতে।”
“আপনার সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। আমিই তাঁকে বলেছিলাম জলপাইগুড়িতে গিয়ে আমার খোঁজ নিতে। ওই লাইটার আমার বাড়িতে ফেলে আসতে আমি অনুরোধ করেছিলাম। আমার চিঠি পেলে তুমি লাইটার সম্পর্কে আগ্রহী হবে বলে আমার ধারণা ছিল।”
“চিঠিটা আপনি কোথায় পোস্ট করেছিলেন?”
“নিজের নামে আসা পুরনো খামের ভেতরে চিঠিটা ভরে দিয়েছিলাম। ওটা সত্যেন্দ্রনাথ নিজের হাতে নিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখেন। আসলে আমি চেয়েছিলাম আমার অনুপস্থিতিতে তুমি ওদের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ নাও।” অমল সোম উঠলেন।
“কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ মারা গেলেন সেটা আপনি এখানে থাকলে হয়তো হত না। তা-ছাড়া হরিপ্রসাদ রায় মারা গিয়েছেন ওদের হাতেই বলে আমার ধারণা;”
“এগুলো আমি ঠেকাতেও পারতাম না। আমাকে শিলিগুড়িতে থেকে যেতে হয়েছিল তোমার জেমসের জন্য। থেকে অবশ্য লাভই হয়েছে। আমি চলি।” অমলদা পা বাড়ালেন।
“আপনার সঙ্গে জেমসের পরিচয় হয়েছে?”
“বাঃ,কাঠমাণ্ডুতে একসঙ্গে একটি বেলা কাটিয়েছি আমরা, পরিচয় হবে না?”
“অমলদা, এরা খুব ডেঞ্জারাস। জেমস বলেছে, ওরা লাইটারে মিনি গ্রেনেড রাখতে পেরেছে। বোধহয় সেইটেই ছুঁড়েছিল বাড়ির ভেতরে। একটা লোক গাড়ি চালাতে চালাতে জেমসকে রিকশায় বসে থাকতে দেখেছিল। হয়তো ভেবেছিল আমি তখনও ওই বাড়িতেই আছি। ওরা আজকালের মধ্যে সামচিতে যাচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এখনও, এরা কারা? শুধু একটা নাম পেয়েছি মান সিং। আগে ড্রাইভারি করত, এখন নেপালের বাসিন্দা। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কোনও প্রমাণ নেই। থানায় গিয়ে যে ব্যাগ তুলে নিয়ে এসেছে পোড়া-গদাইকে অবশ করে, সে অন্য লোক।”
“তুমি জেমসকে নিয়ে সামচি রওনা হয়ে যাও। আর ও যদি একা যেতে চায় তো যেতে দাও। মনে হয় ভোরের আগেই তোমার ওখানে পৌঁছানো দরকার।”
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
“সহদেব বকসির কাছে।” অমলদা নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। অর্জুনের খুব রাগ হচ্ছিল। মাঝে-মাঝে অমলদা এমন ব্যবহার করেন যেন তিনি অর্জুনের কাছের মানুষ নন। এই যে এখন সমস্যার চূড়োয় তাকে রেখে কী নির্লিপ্তভাবে সরে দাঁড়ালেন!
