দেড়দিন – ৫

৫.

রাত পৌনে ন’টায় মেয়েরা তৈরি। নন্দিনী খুবই উত্তেজিত। সে নাকি সন্ধে থেকে দোতলার সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েছিল। প্রায় আধঘন্টা বাদে সেই বিশেষ ঘরের দরজা খুলে যে লম্বা মহিলাটি বেরিয়ে এসেছিল, তিনি সাত-জন্মেও মিসেস ভার্মা নন। এই সময় এক পাঞ্জাবি যুবক বাংলোয় উঠে আসতে, ভদ্রমহিলা তার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। ওদের কথায় উত্তেজনা ছিল। সে আর-একটু সাহস দেখিয়ে দরজার দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় অন্ধকার থেকে এক ভদ্রলোক ওর দিকে এগিয়ে চাপা গলায় ইংরেজিতে বলেছেন, ‘গো ব্যাক টু ইওর রুম, ডোন্ট ইনভাইট ট্রাব্‌ল।” কথাটা শোনার পর নন্দিনী আর সেখানে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। কিন্তু নন্দিনী ভাবতে পারছে না, ভার্মা আঙ্কেল কেন অন্য মহিলাকে আন্টি সাজিয়ে এখানে নিয়ে আসবেন। অর্জুনের মাথায় অন্য চিন্তা ঢুকল। যে ভদ্রলোক নন্দিনীকে সাবধান করে দিয়েছেন, তিনি কে? আর এই পাঞ্জাবি যুবকের নাম কি বলদেব?

অর্জুনরা বাংলোর বাইরে এসে অপেক্ষা করছিল যেখানে হাতির পিঠে ওঠার সিমেন্টের সিঁড়ি রয়েছে। চিহ্নি এবং টিনা সিঁড়ির ধাপে উঠে বসে ছিল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “যে লোকটা আপনাকে সাবধান করল, তাকে দেখতে কেমন?”

“অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারিনি। গলা শুনেই আমার বুক টিপ-টিপ করছিল।”

ঠিক ন’টা বাজতেই দুটো জিপ এসে দাঁড়াল বাংলোর সামনে। পেছনেরটা পুলিশে ভর্তি। মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “কী, এখনও বলুন যেতে পারবেন কি না?”

“পারব না কেন?” নন্দিনী জিজ্ঞেস করল।

“সেকেন্ড থটে যাওয়া ক্যানসেল হলেও হতে পারে। চলুন, উঠে পড়ুন বেশ কষ্ট করেই ওরা জিপে উঠল। কারণ পেছনেও দুজন পুলিশ অস্ত্র নিয়ে বসেছেন। মিস্টার আহমেদ বললেন, “আপনাদের সাহস খুব। দেখবেন, রাত্রে ওপর থেকে নীচে নামতে চেষ্টা করবেন না। একমাত্র সাপ ছাড়া কোনও বন্যজন্তু আপনাদের নাগাল পাবে না ওপরে বসে থাকলে।”

পুনম চিৎকার করে উঠল, “সাপ? ও মাই গড”

আহমেদ বললেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাপেদেরও কাজকর্ম আছে। সঙ্গে একটা লাঠি রাখলেই চলবে।”

মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “ওয়াচ টাওয়ারে লাঠি পাবেন, মশালও।”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার আহমেদ, বলদেব নামের কোনও পাঞ্জাবি ছেলেকে আপনি চেনেন?”

“কোন বলদেব?”

“ঠিক জানি না। মালবাজারেও যার যাতায়াত আছে।

“ও, সাপ্লায়ার বলদেব। কেন বলুন তো?”

“লোকটি কী রকম?”

“ভাল। গরিব-দুঃখীদের খুব সাহায্য করে। কারও কারও কাছে ও প্রায় দেবতার মতো। এখন পর্যন্ত নাথিং এগেইনস্ট হিম।”

অর্জুন আর কথা বাড়াল না। নিঃসাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দুটো জিপ ছুটে যাচ্ছিল। এবার পরিষ্কার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে তারা জঙ্গুলে পথ ধরল। বিশ্বাস বললেন, “আমাদের যেতে হবে এখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। তখন আলো জ্বালা চলবে না। আপনাদের জন্যে দুশ্চিন্তা থাকল। একটা কথা, সিঁড়ির একেবারে শেষ পাঁচটি ধাপ ইচ্ছে করলে খুলে নেওয়া যায়। যদি তেমন প্রয়োজন মনে করেন সেটা করবেন।”

জঙ্গলের ভেতরে খানিকটা খোলা জায়গার সামনে জিপ দুটো থামল। অর্জুন দেখল, তিনতলা উঁচু একটা ওয়াচ টাওয়ার। ওপরে ছাউনি রয়েছে। পাশ দিয়ে বাঁকানো সিঁড়ি পৌঁছে গেছে ছাউনিতে। মিস্টার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের কাছে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ আছে?”

অর্জুন বলল, “ছোট টর্চ আছে।”

“ওটা কাজে লাগবে না। আমাদের কাছে একস্ট্রা টর্চ আছে, এটা রাখুন। মেয়েদের নিয়ে অর্জুন সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেলে জিপ দুটো অন্ধকার চিরে ফিরে গেল। পুনম সঙ্গে দুটো চাদর এনেছিল। আট ফুট বাই সাত ফুট একটা ঘরে দুটো বেঞ্চি। ঘরের চার পাশে চারটে জানালা। অন্ধকার যতই গভীর হোক, কিছুক্ষণ তাকালে তার ভেতরে এক ধরনের আলো খুঁজে পায় চোখ। বেঞ্চিতে চাদর পেতে দিল পুনম। তারপর ব্যাগ থেকে মশার ধুপ বের করে দেশলাই ঠুকে জ্বেলে এক কোণে রেখে দিল। অর্জুন ব্যাপার দেখে বলল, “যথেষ্ট ধন্যবাদ এসব ভাবার জন্যে।”

পুনম বলল, “আপনাকে আমি ধন্যবাদ দেব, যদি সিঁড়ির ধাপটা খুলে রাখেন। অন্ধকারে যদি সাপ ওপরে উঠে আসে, দেখতেও পাব না।”

অর্জুন এগিয়ে সিঁড়ির মুখটায় গেল। ইচ্ছে করে সে টর্চ জ্বালছিল না। সিঁড়ির হাতল ধরে সে একটু টানাটানি করতে সেটা নড়ে উঠল। এবার আর-একটু শক্তি প্রয়োগ করতেই সেটা খুলে এল। অর্থাৎ, সিঁড়ির ফ্রেমগুলো খাপে-খাপে বসানো রয়েছে। খোলা ধাপগুলোকে সে ওপরে হেলান দিয়ে রাখল।

মেয়েরা ততক্ষণ আরাম করে বসেছে। টিনা বলল, “ফ্যান্টাস্টিক। আমার খুব উত্তেজনা লাগছে। ধরো, যদি একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার আসে—উঃ।”

চিঙ্কি বলল, “আমি ভাবছি, যদি এখন টারজান আসত। ভাবা যায় না। অর্জুন জিভে শব্দ করল, “কোনও কথা নয়। আপনাদের বাক্য শুনলে কোনও জন্তু-জানোয়ার এ-তল্লাটেই আসবে না। এই মশার ধূপের গন্ধটা ওরা না-পেলে বাঁচি। অবশ্য যেভাবে হাওয়া বইছে, তাতে গন্ধ মাটিতে নামবে না।”

অর্জুন নন্দিনীর পাশের বেঞ্চিতে বসল। প্রায় পনেরো মিনিট চুপচাপ কাটল, কোথাও কোনও শব্দ নেই শুধু বাতাস গাছগুলোর মাথায় বিলি কেটে যাচ্ছে। এবার পুনম কথা বলল, “দুর! আমার গান গাইতে ইচ্ছে করছে!”

“জন্তুরা গান বুঝবে না।” অর্জুন চাপা গলায় বলল।

“এখানকার জন্তুরা বেরসিক। টিভি-তে ওয়াইল্ড অ্যানিমাল সিরিজ দেখেছিলাম, একটার পর একটা বন্যজন্তু গান গাইছে! টারজান ছবির গান।”

নন্দিনী বলল, “তোর গান শুনে সাপ উঠে আসতে পারে।”

পুনম চুপ করে গেল। আরও অনেকক্ষণ। অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল সিগারেট খেতে। নাঃ, আজকাল খুব বেশি সিগারেট খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সে যদি দিনে পাঁচটা খায়, তা হলে ষাট বছরে পৌঁছে পনেরোটা খাবে। ইনজুরিয়াস টু হেলথ। আজ রাত্রে সে একটাও সিগারেট খাবে না।

হঠাৎ নন্দিনী তার হাতে মৃদু ধাক্কা দিল। হকচকিয়ে সে নীচের দিকে তাকাল। বড় বড় লাল চোখ জ্বলছে। চট করে মনে হয়, লাল ফুল ফুটে রয়েছে। অর্জুন টর্চ জ্বালল। সঙ্গে-সঙ্গে নীচের খোলা জমি আলোকিত—আর এক ডজন হরিণ অবাক চোখে এক পলক তাকিয়ে দে দৌড়-দৌড়! যেন রঙের বিদ্যুৎ বয়ে গেল। নন্দিনী বলে উঠল, “বিউটিফুল।” অর্জুন টর্চ নিবিয়ে ফেলল।

এমনি করে রাত বারোটার মধ্যে ঝিঁঝির ডাক শুনতে-শুনতে ওরা একটা ভালুক দেখল, একদল বাইসনকেও। বুনো শুয়োরগুলো ঝামেলা করল কিছুক্ষণ। সব-শেষে এক জোড়া গণ্ডার। গায়ে আলো পড়া সত্ত্বেও তারা নড়তে চাইছিল না। যেন পৃথিবীর কোনও বস্তুকেই তাদের ভয় নেই।

মেয়েরা এ সব দেখে খুব আনন্দিত। নন্দিনী বলল, “এ বার বাঘ এলে ষোলকলা পূর্ণ হয়। বাঘ আসবে মনে হয়?”

“এখানে খুব অল্প বাঘ আছে। দুটো শুনেছি বেশ বুড়ো।”

“উঃ, আপনি খুব বেরসিক।” নন্দিনী মন্তব্য করল।

রাত দেড়টা পর্যন্ত আর কোনও জন্তু এ-তল্লাটে এল না। অর্জুনের মনে হল, যারা টর্চের আলো দেখে গিয়েছে—তারা বাকি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে। হয়তো জন্তু-জানোয়াররা নিজেদের মধ্যে ইশারায় কথা বলতে পারে।

দেড়টার একটু আগে পুনম আর টিনা বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ল। ঘুমে নাকি ওদের চোখ জুড়ে আসছে। চিঙ্কি চাদরটা মেঝেতে পেতে বলল, তেমন কোনও ইন্টারেস্টিং জন্তু এলে ওকে যেন ডেকে দেওয়া হয়।

এখন ওয়াচ টাওয়ারে অর্জুন আর নন্দিনী জেগে আছে। চার পাশের অন্ধকার বেশ পাতলা হয়ে এসেছে। অর্জুনের মনে হল, কারও পায়ের আওয়াজ হল। অর্জুন টর্চ নিয়ে সজাগ হল। আওয়াজটা সামনে এলে সে সুইচ টিপবে। এত কাছ থেকে বন্যজন্তু দেখা খুবই রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আওয়াজটা এগিয়ে আসছে। সামনে আসামাত্র টর্চ জ্বালল অর্জুন। আর সঙ্গে-সঙ্গে জন্তুটা আলো লক্ষ্য করে ওপরের দিকে তাকাল। কিন্তু পাঁচ ব্যাটারির আলোর তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে সে মুখ নামিয়ে নিল। ততক্ষণে নন্দিনী অর্জুনের হাত আঁকড়ে ধরেছে। দু’ পায়ে দাঁড়িয়ে আছে যে জন্তুটা, সেটা গোরিলা নয়, কিন্তু বিশাল হনুমান বলতেই হবে। চোখে আলো পড়ায় জন্তুটা যেন হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। আর তখনই একটা শিসের আওয়াজ কানে এল। সুইচ অফ করে দিল অর্জুন। মুহূর্তেই অন্ধকার যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল চারধার থেকে। চাপা গলায় নন্দিনী বলল, “সেই জন্তুটা।”

অর্জুনের কোনও সংশয় ছিল না। ইনিই আজ সকালে গাছের ডাল থেকে তার ওপর লাফিয়ে পড়েছিলেন। হনুমান এত বড় হয়, তার জানা ছিল না। এই হনুমান কি সেই মৃতদেহটাকে রাস্তা পার করে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল? কার স্বার্থে? শিসটা এখন বেশ স্পষ্ট হচ্ছে। জঙ্গলে শব্দ হচ্ছে এগিয়ে আসার।

মানুষ আসছে। অর্জুন ঘুমন্ত মেয়েদের দিকে তাকাল। হঠাৎ যদি ঘুম ভেঙে যায় কারও, আর কথা বলে ওঠে, তা হলেই চিত্তির। নন্দিনী হাত সরিয়ে নিয়েছিল। সে ফিসফিস করে বলল, “অ্যালার্ট থাকুন, কথা বলবেন না।”

শিসটা খোলা জমিতে এসে থামল। অন্ধকার আবার মিইয়ে যাওয়ায় অর্জুন মানুষটার অবয়ব দেখতে পেল। এবং তারপরেই টর্চ জ্বলল। যে লোকটা টর্চ জ্বেলেছে, তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু হনুমানটা তার উত্তেজনা লোকটার কাছে প্রকাশ করে যাচ্ছে। এবং তখনই আলো নিবে গেল।

ওয়াচ-টাওয়ারটা মাটি থেকে যে উচ্চতায়, তাতে রাত্রের অন্ধকারে নীচ থেকে কেউ ওপরে আছে কিনা আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। টর্চ নিবে যাওয়ার পর জঙ্গল যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। যে এসেছিল, সে যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে এরই মধ্যে। অর্জুন কী করবে বুঝতে পারছিল না। তার অবশ্য কিছু করারও উপায় নেই, একমাত্র বসে লক্ষ করে যাওয়া ছাড়া। সে ঘুমন্ত মেয়েদের দিকে তাকাল। জেগে উঠলে ওরাই বিপদ ডেকে আনতে পারে।

নীচে কোনও শব্দ নেই। যদি সেই লোকটা এখনও আড়ালে অপেক্ষা না করে থাকে, তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, অন্ধকার জঙ্গলে পথ চলতে সে খুবই ওস্তাদ। এই মুহূর্তগুলো খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। যে জানান দেবে, সে ধরা পড়ে যাবে। নন্দিনী বসে আছে পাথরের মতো। ব্যাপারটা তারও নজরে পড়েছে। মেয়েটার নার্ভ আছে, মনে-মনে স্বীকার করল অর্জুন।

মিনিট-তিনেক বাদে নীচের সিঁড়িতে শব্দ হল। খুব হালকা। কেউ কি উঠে আসছে? সাপ? অর্জুন সন্তর্পণে মাথা নোয়াল। এখন যদি নীচ থেকে কেউ টর্চের ফোকাস ফেলে, তা হলে সে ধরা পড়বে। কিন্তু একদলা অন্ধকার নিঃশব্দে ওপরে উঠে আসছে। মাঝে-মাঝে থমকে দাঁড়াচ্ছে। বোধহয় সরাসরি উঠে আসতে সাহস পাচ্ছে না।

অর্জুন লম্বা লাঠিটা তুলে ধরল। যেই হোক, ওপরে উঠে এলেই আঘাত করবে। তার খেয়াল ছিল না যে, সিঁড়ির ওপরের কয়েকটা ধাপ খুলে রেখেছিল সে। ওই পর্যন্ত এসে জন্তুটা যেন থমকে দাঁড়াল। হনুমানটাকে এবার স্পষ্ট দেখতে পেল সে। এত বড় হনুমান কখনও দেখেনি সে। জন্তুটাও যেন তাকে লক্ষ করল। তার পর সরসর করে নীচে নেমে গেল। যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছে জন্তুটা।

অর্জুনের উত্তেজনা সামান্য কমল। কয়েকটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেল। এই জন্তুটাকে চমৎকার ট্রেনিং দিয়েছে যে-লোকটা, সে নীচেই দাঁড়িয়ে আছে। মৃতদেহ রাস্তার এ পাশে বয়ে নিয়ে আসা অত বড় হনুমানের পক্ষেও সম্ভব কি না সেটা ভাবনার ব্যাপার, কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনও ব্যাখ্যা নেই। ওই মৃতদেহের সঙ্গে এই হনুমান এবং তার মালিক জড়িত। লাঠিটাকে হাতছাড়া করছিল না অর্জুন। সময় কাটছে। একটু-একটু করে এক ঘণ্টা কেটে গেল। জঙ্গলের যে সব শব্দ মরে গিয়েছিল, সেগুলো আবার জীবন্ত হল। অর্জুনের বিশ্বাস, ধারে-কাছে আর কেউ নেই। যে এসেছিল, সে সতর্ক হয়ে ফিরে গিয়েছে।

এবার নন্দিনী চাপা স্বরে বলল, “কী ব্যাপার বলুন তো?”

অর্জুন বলল, “আজ রাত্রে আর কিছু দেখা যাবে বলে মনে হয় না।”

কিন্তু দেখা গেল। ভোরের সামান্য আগে জঙ্গলে শব্দ হতে লাগল। পুনম, চিক্কি টিনা উঠে বসেছে। চিঙ্কি বলল, “আঃ, কী ফাইন আকাশ। ওইটে শুকতারা, না?”

নন্দিনী চাপা শব্দ করল। ওরা চুপ করে গেল তৎক্ষণাৎ। তারপরেই দেখা গেল একদঙ্গল হাতি জঙ্গল মাড়িয়ে খোলা জমিতে চলে এল। গাছের ডাল-পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে ওরা গভীর জঙ্গলের দিকে চলে গেল। পুনম বলল, “ফ্যান্টাস্টিক। এ রকম দৃশ্য দেখার জন্যে হাজার হাজার মাইল যাওয়া যায়।

নন্দিনী হাই তুলল, “তোরা তো সারা রাত ঘুমিয়েই কাটালি।” টিনা জিজ্ঞাসা করল, “আমরা কি কিছু মিস করেছি?”

“প্রচুর। দারুণ একটা নাটক হতে যাচ্ছিল। আমরা যে জন্তুটাকে কাল দেখেছিলাম, সেটা একটা হনুমান।”

“যাঃ।” তিনটে গলা থেকেই একসঙ্গে বিস্ময় ছিটকে এল।

ভোরের রোদ ফোটা মাত্র মিস্টার বিশ্বাস গাড়ি নিয়ে চলে এলেন। রাত জাগার চিহ্ন ওঁর সমস্ত শরীরে। সিঁড়ি লাগিয়ে সবাই নেমে আসতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী-কী জিনিস দেখতে পেলেন, বলুন!”

নন্দিনীরা উচ্ছ্বসিত গলায় জন্তুদের নাম বলে গেল। অর্জুন চুপ করে ছিল। মেয়েরা কথা শেষ করতে জিজ্ঞেস করল, “আপনার এক্সপিডিশনের খবর কী?”

“চারজন ধরা পড়েছে। ওরা প্ল্যান করেছিল, হলং ফরেস্ট বাংলোটাকে পুড়িয়ে দেবে। আপাতত আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চলুন ফেরা যাক।”

ভোরের জঙ্গলের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। রাত জাগার ক্লান্তি সত্ত্বেও সেটা বেশ ভাল লাগছিল। জিপ সোজা চলে এল বাংলোর লনে। মেয়েরা প্রথমে নামল। এবং তখনই নন্দিনী বলে উঠল, “মাই গড।”

জিপে বসেই অর্জুন দেখল, ভার্মা-সাহেব আর একটি পাগড়ি-পরা লোকের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে এগিয়ে আসছেন। নন্দিনীরা সঙ্গে সঙ্গে বাংলোর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। ভদ্রলোক বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। বিশ্বাস বললেন, “কী ব্যাপার বলুন তো?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। তা হলে আমার বাড়িতে চলুন। চা খেতে-খেতে শোনা যাবে।” জিপ চালু হতেই ভার্মা-সাহেব এ দিকে তাকালেন। জিপের ভেতর কারা আছে, তা তাঁর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় দূরত্ব এবং আড়ালের জন্য। কিন্তু অর্জুন ভার্মা-সাহেবের সঙ্গী পাঞ্জাবী যুবকটিকে দেখে নিয়েছে। ভার্মা-সাহেবকে যতটা চকচকে এবং টাটকা দেখাচ্ছে পাঞ্জাবি যুবকটিকে তার বিপরীত লাগছে। জামা-কাপড় এবং মুখে একটা তেলতেলে ধুলো মাখানো। রাত জাগলে যেমনটা হয়।

অর্জুন ঠোঁট কামড়াল।

মিস্টার বিশ্বাসের কোয়াটাসে পৌঁছে মুখ-হাত ধুয়ে ওরা বারান্দায় বেতের চেয়ার নিয়ে বসল। ‘ভদ্রলোক একাই থাকেন। কিন্তু ব্যাচেলররা সাধারণত যেমন অগোছালো হয়, এই ভদ্রলোক তেমন নন। ভৃত্যকে চায়ের হুকুম দিয়ে তিনি ভেজা সকাল, ছায়া-ছায়া রাস্তা আর গাঢ় জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিছু আবিষ্কার করলেন নাকি?”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “শেষ কবে জঙ্গলে জন্তু-জানোয়ারদের পায়ের ছাপ গোনা হয়েছে?”

“বছরখানেক তো বটেই।

“আপনি একটা খবর জানেন, এই জঙ্গলে এমন একটি হনুমান আছে, যে রোগা-পটকা মানুষের মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যেতে পারে।”

“ইমপসিবল।”

“অসম্ভব হলেও সেটা সত্যি।”

“আমি বিশ্বাস করি না। একটা গোরিলা, যেমন ধরুন গল্পের কিংকং যা পারে, কোনও হনুমান—তা সে যতই বড় হোক পারা সম্ভব নয়।”

“কিন্তু গতকাল মেয়েরা যে প্রাণীটিকে দেখেছিল, যে কিনা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে একটা ম্যাগনাম সাইজের হনুমান। রাত্রে তাকে আমরা ওয়াচ-টাওয়ারের সিঁড়িতে দেখতে পেয়েছি। হনুমানটা ট্রেইন্ড, একটি লোক ছিল সঙ্গে।”

“লোকটিকে চিনতে পেরেছিলেন?”

“না। হনুমানটা তাকে সতর্ক করে দিতেই সে আড়ালে চলে গিয়েছিল।

একটু ভাবলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, “এমন হতে পারে, মেয়েরা হনুমানটাকে ঠিকই দেখেছিল। সে রাস্তা পার হয়ে মৃতদেহটি ঠিক আছে কি না দেখেছিল। তারপর তার মানুষ মনিব এসে ওটাকে তুলে ও পারের জঙ্গলে লুকিয়ে রাখে। হতে পারে না?”

অর্জুনের মনে হল, হতেই পারে। সে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “এতে বোঝা যাচ্ছে, কারও ইন্টারেস্ট আছে। আপনি, মৃত লোকটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন?”

“মিস্টার আহমেদ কাল রাত্রে বললেন, ওকে ছিনতাই করতে গিয়ে খুন করা হয়েছে। ওর কাছে পরিবারের অনেক পুরনো একটা সোনার গহনা ছিল। সেটা বিক্রি করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। এ দিকের গরিব মানুষের কাছে সোনা থাকাও মুশকিল।

চা এসে গেল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার ভার্মা, যিনি লনে পায়চারি করছিলেন একটু আগে, তাঁর সঙ্গে যে লোকটি ছিল, তাকে চেনেন?”

“কেন বলুন তো?”  

“এই লোকটিও গত রাত্রে ঘুমায়নি। মিস্টার বিশ্বাস, আপনাকে একটু বিরক্ত করব?”

“বেশ তো। বলুন না।”

“মৃত মানুষটি যে-গ্রামে থাকে, সেখানে একবার যেতে পারি?”

“স্বচ্ছন্দে। হেঁটে যেতে অনেক সময় লাগবে। আপনি ব্রেকফাস্ট খেয়ে গাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। আমি ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু কী ব্যাপার বলুন তো?”

অর্জুন তাঁকে মালবাজারের ঘটনা, জগুদার কাছে শোনা কাহিনী খুলে বলল। মিস্টার বিশ্বাস শুনতে-শুনতে মাথা নাড়ছিলেন। অর্জুন শেষ করল, “ব্যাপারটা বুঝুন। ওই মিস্টার ভার্মা কি মিস্টার পুরি এই বাংলোতেই আমাদের সঙ্গে এসে জুটেছেন।”

“কিন্তু ভার্মা আসার আগেই খুনটা হয়েছে। আর ওঁর মতো একজন রেসপেক্টেড ভদ্রলোক জঙ্গলে ঢুকে গরিব মানুষকে খুনই বা করতে যাবেন কেন?”

“মিস্টার পুরি?”

“তিনিও তো বিকেল নাগাদ এসেছেন।

“এই পুরি ভদ্রলোক কি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন?”

“আমি জানি না। খবর নিতে হবে।”

অর্জুন উঠে পড়ল। জিপ আসবে দশটা নাগাদ। তার আগে একটু বিছানায় গড়িয়ে তাজা হয়ে নেওয়া দরকার। পাখি ডাকছে দু’ পাশের জঙ্গলে। নুড়ি-বিছানো পথ দিয়ে অর্জুন বাংলোর দিকে হাঁটছিল। এক নম্বর কালভার্টের কাছে পৌঁছে সে ঝোরার জলের দিকে তাকাল। তিরতিরিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্রোত। পৃথিবী এখন চমৎকার। এখানে যে লোকটা গতকাল মেয়েদের অনুসরণ করতে-করতে জঙ্গলে মিলিয়ে গিয়েছিল—তার সঙ্গে ভার্মা-সাহেবের সঙ্গে লনে কথা বলতে আসা লোকটার চেহারার কোনও মিল নেই। গতরাত্রে জঙ্গলের ভেতরে যে টর্চ নিয়ে হনুমানটার সঙ্গে এসেছিল, তারা চেহারাও ভাল করে দেখতে পায়নি সে। অর্জুন কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে একটু অপেক্ষা করল। তারপর বাংলোর দিকে পা বাড়াল।

লনে কেউ নেই। সেই ট্যাক্সি আর তার ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা অর্জুনকে দেখতে পেয়ে যে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছে, তা তার মুখ দেখে বোঝা গেল। কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করল না সে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে বেয়ারাটার সঙ্গে দেখা হওয়ায় বলে দিল চটপট ঘরে ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসতে।

রাত জাগলে ভোরবেলায় স্নান করলে শরীর অনেকখানি তাজা হয়ে যায়। ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে জামা-প্যান্ট খুলতে খুলতে সে কাগজটাকে দেখতে পেল। তিন ভাঁজ কাগজটা মাটিতে পড়ে আছে। সম্ভবত ওপরের ভেন্টিলেটারের ফাঁক দিয়ে কেউ ফেলে দিয়েছে ঘরে। ওটা তুলে নিল অর্জুন। ইংরেজিতে লেখা, ‘তুমি কেন শুরু থেকে আরম্ভ করছ না?’ হাতের লেখা চেনার উপায় নেই, কারণ প্রতিটি অক্ষরই ইচ্ছে করে ক্যাপিটাল হরফে লেখা হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার। সাধারণত শত্রুপক্ষের লোকেরা যদি অস্তিত্ব জেনে যায়, তা হলে হুমকি দেবার চেষ্টা করে। সরে না দাঁড়ালে মত্যু অনিবার্য—এমন কথাই লেখা থাকে। এ তো হুমকির বদলে উপদেশ। এই জঙ্গলে তার শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ আছেন নাকি? তিনি কেন চোরের মতো উপদেশ দেবেন?