জুতোয় রক্তের দাগ – ৭

৭.

মার্শাল-সাহেবের ঠিকানা পুলিশ অফিসারকে জানিয়ে ওরা যখন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এল, তখন আলো মরে গেছে কিন্তু অন্ধকার নামেনি। এর মধ্যে কখন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীটাকে আরও ঝকঝকে লাগছে। বাস-স্টপে এসে দাঁড়াতেই মেজর মুখ খুললেন। যেন এতক্ষণ কথা না বলতে পেরে দমবন্ধ হয়ে আসছিল ওঁর, “কী ব্যাপার বলো তো? আমি তো এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।”

অর্জুন বলল, “আমিও পারছি না।

“মিসেস গ্রান্ট গাড়ি চালিয়ে এদিকে এলেন, অ্যাক্সিডেন্ট করলেন, অথচ তাঁর জায়গায় অন্য মহিলা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রইল, তাজ্জব ব্যাপার। কিন্তু পুলিশকে আমাদের বলা উচিত ছিল যে, উনি মিসেস গ্রান্ট নন। তুমি চেপে যেতে বললে কেন?”

অর্জুন এই প্রশ্নটার জন্য তৈরি ছিল। জবাব দিল, “পুলিশ গাড়ির কাগজপত্র দেখে ধরে নিয়েছে, উনি মিসেস গ্রান্ট। যদি অন্য কারও সেই ধারণা হয়ে থাকে, তা হলে আমরা পুলিশকে জানালেই সেটা তাদেরও জানতে অসুবিধে হবে না। এইটে আমি এখনই চাইছিলাম না। তা ছাড়া যে ভদ্রমহিলা শুয়ে আছেন, তাঁকে আপনি কি আগে কখনও দেখেছেন?”

মেজর মাথা নাড়লেন, “না। অবশ্য ব্যান্ডেজ থাকায়…, তবু, না! কিন্তু কেন বলো তো?”

“সেই জন্যেই আমি বলিনি। আমার পরিষ্কার মনে হল, উনি মিসেস গ্রান্টের ব্ল্যাকপুলের বান্ধবী। খুব মিল আছে ওঁদের চেহারায়! আপনি এবার মনে করে দেখুন তো!”

মেজরের চোখে-মুখে দাড়ি সত্ত্বেও চিন্তিত ভাবটা পরিষ্কার ফুটল। তারপর তিনি ঘড়ি দেখে পা বাড়াতেই অর্জুন বাধা দিল, “আরে, কোথায় যাচ্ছেন?”

“তোমার কথা মনে হচ্ছে অর্ধেক ঠিক। আর একবার নিজের চোখে দেখে আসি।”

“পাগল হয়েছেন! এবার দেখতে চাইলে ওরা কারণ জিজ্ঞেস করলে কী জবাব দেবেন? তার চেয়ে আমাদের এখনই ব্ল্যাকপুলে ফিরে যাওয়া উচিত,” অর্জুন বলল।

‘ব্ল্যাকপুলে!” মেজর আঁতকে উঠলেন, “পাগল! দুপুর থেকে মার্শাল আমার অপেক্ষায় বসে আছে। জীবনে এই প্রথমবার আমি সময় রাখতে পারলাম না। আমাকে ওর কাছে যেতেই হবে।”

অর্জুন অনেক দূরে বাসের হেডলাইট দেখতে পেল, “আপনার বান্ধবীর ঠিক কী হয়েছে, তা না জেনেই চলে যাবেন? আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়?”

“কী কাজ?” মেজরও বাসটাকে দেখতে পেয়েছিলেন।

“আপনি আজ চলে যান মার্শাল-সাহেবের কাছে। আমি ব্ল্যাকপুলে ফিরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে কাল আপনার কাছে আসছি।”

“মাথা খারাপ! তুমি ইংল্যান্ডের কিস্সু চেনো না। তারপর যখন মনে হচ্ছে কেউ বা কারা আমাদের পেছনে লেগেছে, তখন একা যাওয়া উচিত হবে না।”

“আপনি আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন।”

“বলছ?” কথা বলতে-বলতে বাসটা এসে দাঁড়াল স্টপে। মেজর দু’পা এগিয়ে আবার পিছিয়ে এলেন, “না হে। তোমাকে ছেড়ে আমি একা যেতে পারব না।”

ব্ল্যাকপুলে যখন ওরা ফিরে এল তখন ঘড়িতে রাত বেশি না হলেও শহরটার দিকে তাকিয়ে মনে হল মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। একটিও মানুষ নেই রাস্তায়। দোকানপাট বন্ধ। এমনকী গাড়ির চলাচল খুব কমে এসেছে। বাস টার্মিনাল থেকে বের হওয়া মাত্র ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হল। প্রচণ্ড কাঁপুনি দিয়ে ঠাণ্ডা নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মেজর বললেন, “আগের হোটেলটা অনেক দূরে, কাছে-পিঠে কোথাও ওঠা যাক।”

কয়েক-পা এগিয়েও যখন কোনও সাইনবোর্ড চোখে পড়ল না, তখনই বৃষ্টির দাপট বাড়ল। কোনও রকমে একটা ছাউনির তলায় মাথা বাঁচাতে ঢুকে গেল ওরা দুজনে। মেজর বাইরের বৃষ্টি, অন্ধকার-নামা নির্জন রাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আইডিয়াল নাইট ফর ক্রাইম।

এই সময় দুটো হেডলাইট বৃষ্টির ফোঁটা কাটাতে কাটাতে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছিল ওপাশের রাস্তা ধরে। গাড়িটা ওদের পাশ কাটিয়ে সমুদ্রের দিকে চলে গেল। তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করে স্থির হয়ে রইল। মেজর বললেন, “মনে হচ্ছে পুলিশের জিপ। রোঁদে বেরিয়েছে।

পুলিশ শব্দটা শুনে অর্জুন ভাবল তা হলে ওদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে হয়, কাছাকাছি ভাল হোটেল আছে কি না। তারপরেই মনে হল জিপটা আলো নিভিয়ে চুপচাপ জলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে কেন? আর তখনই জিপের হেডলাইট দু’বার জ্বলল এবং নিভল। অর্জুন ধন্দে পড়ল। সমুদ্রের জলের ওপর হেডলাইটের আলো সাঙ্কেতিকভাবে ফেলার কোনও মানে আছে কি?

পুলিশ হলে এমন কাজ করবে কেন? কয়েক মিনিট বাদেই একটা মোটরবোটের আওয়াজ পাওয়া গেল। সমুদ্রের ওপর অন্ধকার এবং বৃষ্টি মেশামেশি হওয়ায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই মোটর-বোটের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই জিপ পাক খেয়ে শহরের দিকে ফিরে গেল দ্রুতগতিতে। মেজরও যেন ততক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। অর্জুনের হাত আঁকড়ে ধরে বললেন, “পুলিশ নয়। এরা কিছু পাচার করল বলে মনে হচ্ছে। দেখবে নাকি?”

“এখন দেখে আর কী হবে?” অর্জুন উৎসাহিত হচ্ছিল না।

মিনিট-দশেক পরে ওরা একটা গেস্ট হাউসের নোটিস-বোর্ড দেখতে পেল। গেট খুলে বাঁধানো চাতাল ডিঙিয়ে কাঠের বাংলো টাইপ বাড়ির দরজায় মেজর আঘাত করলেন। অর্জুন বলল, “কলিং বেলের বোতামটা টিপুন।”

কিন্তু বলার সঙ্গে-সঙ্গেই ওপাশের একটা জানলা খুলে গেল। একজন বৃদ্ধা চিৎকার করে উঠলেন, “হু ইজ দেয়ার? ওঃ! চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে দুটো শার্কের পেট ভরে যাবে, কিন্তু মাথায় ঈশ্বর পুঁটিমাছের খাবারও দেয়নি? বোতামটা দেখতে পাচ্ছ না?”

“কী? আমি শার্ক?” মেজর হুঙ্কার ছাড়লেন বাড়ি কাঁপিয়ে।

অর্জুন খপ করে মেজরের হাত ধরল, “না, না, আপনাকে উনি শার্ক বলেননি?”

বৃদ্ধা বললেন, “বলাই উচিত ছিল। না বলে ভুল করেছি। গলার স্বর দ্যাখো, জীবনে মিষ্টি কী জিনিস বোধহয় চেখেও দ্যাখোনি।”

মেজর বললেন, “মিষ্টি? মিষ্টি দেখাচ্ছেন আমাকে? আপনার গলা কী? পিলে চমকে যায়। চলো, অর্জুন! এখানে থাকব না। অভদ্র, সভ্যতা শেখেনি।”

অর্জুন তখনও হাত ছাড়েনি, বলল, “উনি একজন মহিলা, কী বলতে কী বলেছেন।”

বৃদ্ধা চিৎকার করে উঠলেন, “ঠিক বলেছি। তবে শার্ক বলিনি। শার্কের খাবার বলেছি।”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “শুনলেন তো। আপনাকে শার্ক বলেননি। “অ।”

মেজর একটু বিচলিত হলেন, “শার্কের খাবার! শার্কের খাবার আবার কী? কী খায় শার্ক?”

“আচ্ছা জ্বালা। এই হুমদো লোকটার সঙ্গে কে কথা বলতে চাইছে! এই যে খোকা, তোমাকে বলছি, দয়া করে বলবে রাত দুপুরে দরজা ভাঙতে চাইছ কেন?” বৃদ্ধার গলার স্বর নীচে নামল।

অর্জুন বলল, “ওই সাইনবোর্ডটা দেখতে পেলাম দিদিমা, আমাদের থাকার ঘর চাই।”

“তাই বলো। এই ছোট্ট কথাটা ছোট্ট করে বললেই হয়। শরীর বড় হলেই যে বেশি কথা বলতে হবে এমন দিব্যি কে দিয়েছে। একটা ঘর হলেই চলবে? সকালে ব্রেকফাস্ট পাবে রুটি ডিম জ্যাম কর্নফ্লেক্স আর দুধ। ব্যস। মাথা-পিছু আট পাউন্ড।”

মেজর বোধহয় শরীর নিয়ে কথা বলায় আবার মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অর্জুন তার আগেই বলে উঠল, “খুব ভাল। আপনার মতো মানুষ হয় না দিদিমা।”

“সে-কথা বলো। গজগজ করতে-করতে বৃদ্ধা দরজা খুলে একবার আড়চোখে মেজরকে দেখে বাঁ হাত তুলে ঘরটা দেখিয়ে দিলেন। বাড়িতে আর কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। কাঠের সিঁড়ি ভেঙে ওরা ঘরে ঢুকতেই মেজর বললেন, “অন্য সময় এবং পরিস্থিতি এরকম না হলে আমি কিছুতেই এখানে থাকতাম না। যাক, দুটো বিছানা আছে তা হলে।”

ঘরটি চমৎকার। কাচের জানলায় দাঁড়ালে সমুদ্র দেখা যাবে, যদিও এই বৃষ্টির রাত্রে বাইরেটা ঘষা অন্ধকার। অর্জুন তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে ভেজা জামা পালটে নিয়ে মাথা মুছে নিল। এইসময় বাইরে বৃদ্ধার গলা বাজল, “সেই ভাল ছেলেটা কোথায়?”

মেজর জবাব দেওয়ার আগেই অর্জুন বেরিয়ে এল। এসে হাঁফ ছাড়ল। মেজর ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন। বৃদ্ধা প্রশ্ন করা সত্ত্বেও চোখ খোলেননি। অর্জুনকে দেখে বৃদ্ধা বললেন, “হুট করে ঢুকে গেলেই তো চলবে না। এই খাতায় লিখতে হবে কোত্থেকে এসেছ, নাম-ধাম। এত রাত্রে কোত্থেকে উদয় হলে?”

মেজর বললেন, “জাহান্নাম থেকে।”

“তা বুঝেছি। সেটাই তো উপযুক্ত জায়গা।”

অর্জুন বলল, “আমাদের এক পরিচিতা মহিলার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে খবর পেয়ে সাত-তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছি বোস্টন থেকে। আমি সই করলেই হবে তো?”

“বোস্টন থেকে হঠাৎ এত লোকজন এখানে আসছে?”

“আরও লোক এসেছে বুঝি?”

“ওই তো প্রোফেসর হ্যাচ এবং তাঁর বন্ধু জিপ নিয়ে এসেছেন।”

“জিপ নিয়ে?”

“হ্যাঁ। কীসব রিসার্চের ব্যাপার।”

সইটই হয়ে গেলে বৃদ্ধা আর-একবার মেজরের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে দুজনের পেটে কিছুই পড়েনি।”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। আমাদের কিছুই খাওয়া হয়নি।”

“আমার কিছু করার নেই। কাল ব্রেকফাস্ট অবধি না খেয়ে থাকো।” বৃদ্ধা চলে গেলেন কাঠের পাটাতনে শব্দ করে।

মেজর এবার উঠে বসলেন, “এ-ঘরে টেলিফোনও নেই। মিসেস গ্রান্টের খবর নেবার জন্যে আমরা ব্ল্যাকপুলে ফিরে এসেছি—ওই বুড়ির গালাগাল শুনতে নয়।”

অর্জুন বলল, “কিন্তু এত রাত্রে যাবেন কী করে? রাস্তায় তো কোনও গাড়ি নেই।

মেজর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে কাঁধ নাচালেন। তারপর উঠে বাথরুমে চলে গেলেন। খাবারের কথা ওঠার পর অর্জুনের খিদেটা যেন চাগিয়ে উঠল। সিগারেট ধরাতে আরও বিস্বাদ লাগল সেটা। শীত বেড়েছে বেশ। সে এপাশের জানলায় এল। হলদে আলোয় পোর্টিকোটা দেখা যাচ্ছে। তার এক কোণে একটা জিপ। হঠাৎ অর্জুনের মনে হল অধ্যাপক হ্যাচ নামের লোকটা বোস্টন থেকে জিপে এসেছে এখানে বন্ধুকে নিয়ে। এই লোকটা কে? অধ্যাপকরা কি এদেশে জিপ চালান?

আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ার মিনিট-তিনেক বাদেই মেজরের নাক ডাকতে লাগল। পেটে খাবার না পড়া সত্ত্বেও একটি মানুষ এত তাড়াতাড়ি কী করে ঘুমোতে পারে? অর্জুনের কিছুতেই ঘুম আসছিল না। মিসেস গ্রান্টের নিশ্চয়ই এমন কোনও বিপদ ঘটেছে যা জানাতেই ওঁর বন্ধু মার্শাল-সাহেবের কাছে যাচ্ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই জেনেছিলেন অর্জুনরা মার্শাল-সাহেবের কাছেই গিয়েছে। নইলে ওই রাস্তায় ভদ্রমহিলার যাওয়ার কোনও অর্থ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী ঘটেছে মিসেস গ্রান্টের?

বেশ কিছুক্ষণ উসখুস করল অর্জুন। আর এইসময় অমল সোমের কথা মনে পড়ল। অমলদা কি এখনও জলপাইগুড়িতে? এই পরিস্থিতিতে পড়লে অমলদা কী’ করতেন? অর্জুন চোখ খুলল। তারপর তড়াক করে উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। সমস্ত বাড়ি অন্ধকারে চুপচাপ। সে বাথরুমে ঢুকে পড়ল আলো না জ্বেলে। এদিকে একটা দরজা দেখেছিল খানিক আগে। জমাদারের জন্যেই সম্ভবত করা হয়েছে। সেইটে খুলে ও নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল। ঠাণ্ডা যেন শরীরে করাত চালাচ্ছে। পোর্টিকো ডিঙিয়ে অর্জুন জিপের গায়ে পৌঁছে গেল। ওপরে শেড থাকা সত্ত্বেও জিপের শরীরে জল। তার মানে এটি বেশি আগে ফেরেনি। চাকায় হাত দিয়ে সমুদ্রের বালি পেল অর্জুন। জিপের ভেতরে উঁকি মারতে গিয়ে চমকে উঠল সে।

গাড়ির সিটের ওপর রাখা একটা বেতের ঝুড়ি থেকে হিসহিস শব্দ বের হচ্ছে।

অর্জুন চারপাশে তাকাল। বৃষ্টি থেমে গেছে। পৃথিবীতে ঘন কুয়াশা নেমে এসেছে। আর একমাত্র গাড়ির ভেতর থেকে ছিটকে আসা ক্রুদ্ধ শব্দ ছাড়া কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। অর্জুন কেঁপে উঠল। যতটা না ঠাণ্ডার কারণে ঠিক ততটাই ওই শব্দের তীব্রতায়। সে বুঝতে পারছিল না ঝুড়িতে কী রয়েছে? প্রোফেসর হ্যাচ কেন এইরকম বেতের ঝুড়ি সিটের ওপর রেখে যাবেন যার ভেতর একটি রাগী প্রাণী গর্জে যাচ্ছে! নাকি অর্জুনের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই গর্জন বাড়ছে?

টুক করে একটা আলো জ্বলে উঠল দোতলার জানলায়। কুয়াশা মাখা কাচে আলো ঝাপসা দেখাচ্ছে। অর্জুন চট করে সরে এল গাড়িটার কাছ থেকে। গ্যারাজের থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে দ্বিতীয়বার জানলার দিকে তাকাতেই একটা অস্পষ্ট মূর্তি দেখতে পেল। সে সরে আসায় ঝুড়ির ভেতরের আওয়াজ কমে এসেছে। এখন পনেরো ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়েও সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে না। এর পরেই কাঠের দরজা খোলার শব্দ হল। অর্জুন আর ঝুঁকি নিল না। যতটা নিঃশব্দে সম্ভব ততটা আওয়াজ বাঁচিয়ে সে ঘরে ফিরে এল। দরজা বন্ধ করে জানলার কাছে আসতেই সে লোকটাকে দেখতে পেল। লম্বা ঝাপসা মূর্তি। আধা অন্ধকারে মুখ দেখার কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু সে শিস শুনতে পেল। ছায়ামূর্তি যেন শিস দিয়ে প্রাণীটিকে শান্ত করতে চাইছে। তারপর লোকটা কয়েক পা এগিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল। সম্ভবত জরিপ করতে চাইল চারপাশ। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে অর্জুন লোকটাকে যখন ফিরে যেতে দেখল, তখন ঘড়িতে অনেক রাত।

মেজর জানান দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। বেশি খিদে পেলেও যে মাঝে-মাঝে গভীর ঘুম আসে তা এখন ওঁকে দেখলে বোঝা যাবে। এই মাঝরাতে মেজরকে জাগিয়ে ঘটনাটা বলা ওঁর খিদে-বোধটাকে আবার ফিরিয়ে আনা। অৰ্জুন নিজের বিছানায় ফিরে এল। কিন্তু ঘুমের কোনও চিহ্ন নেই। এখন মাথার ভেতরে প্রশ্নগুলো কিলবিল করছে। মিসেস গ্রান্টের গাড়ি নিয়ে তাঁর বন্ধু ওই হাইওয়ে ধরে কোথায় যাচ্ছিলেন? ভদ্রমহিলা কি সত্যিই মিসেস গ্রান্টের বন্ধু? কারণ ব্যান্ডেজের ফাঁকে খুব অল্পই সে দেখতে পেয়েছিল। কাল সকালেই মিসেস গ্রান্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সমুদ্রের ধারে ওইরকম রহস্যজনকভাবে প্রোফেসর হ্যাচ নামক ভদ্রলোকটি কেন তাঁর জিপ নিয়ে গিয়েছিলেন? সেই জিপের মালিক যে প্রোফেসর হ্যাচ তার অবশ্য প্রমাণ নেই। জিপের চাকায় এ-অঞ্চলের বালি লাগতেই পারে। কিন্তু ভদ্রলোক গাড়ির সিটে একটি ক্রুদ্ধ প্রাণীকে ঝুড়িতে বন্দী করে রেখেছেন কেন? সাপ কিংবা বেজি ঝুড়িতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো কি এদেশে বেআইনি নয়? অধ্যাপকরা এসব পুষবেন কেন? তা ছাড়া উনি এসেছেন বোস্টন থেকে। একই সঙ্গে ওঁর আসাটা কি কাকাতালীয়? আর তারপরেই খেয়াল হল প্রাণীটি যে স্বরে গর্জন করছিল তাতে তো কারও ঘুম ভাঙেনি। ছায়ামূর্তি যদি প্রোফেসর হ্যাচ হন, তা হলে ওঁর ঘুম ভাঙল কী করে? ওঁকে কেন এই শীতের মধ্যেও মাঝ রাতে যেতে হল খোঁজখবর করতে? কী করে ভদ্রলোক বন্ধ ঘরে বসেও এই শব্দ শুনতে পেলেন। এই মুহূর্তে অমল সোমের কথা মনে পড়ে গেল তার। অমলদা থাকলে যে কী ভাবে এগোতেন কে জানে! অর্জুন খুব অসহায় বোধ করছিল।

ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে। কম্বল সরিয়ে অর্জুন দেখল মেজর বিছানায় নেই। বিদেশে এসে তাকে কতগুলো নিয়মে অভ্যস্ত হতে হয়েছে যা জলপাইগুড়িতে কোনওদিন চিন্তাও করেনি। যেমন বাথরুমের মেঝেতে জল ফেলা যাবে না, কারণ তাতে কার্পেট ভিজবে। স্নান করতে হলে পরদা টেনে বাথটাবে উঠে পড়ো। কিন্তু আরামে ঠাণ্ডা-গরম জল মিশিয়ে স্নান করার কথা সে কি কখনও ভেবেছিল! আর এদেশের বাথরুমের কায়দাকানুন মাথা খারাপ করে দেয়। আমেরিকায় একবার টয়লেটে ঢুকে ফ্ল্যাশের বোতাম খুঁজে পেতে তাকে কি কম নাজেহাল হতে হয়েছিল? অথচ জিনিসটা ছিল পায়ের তলায়, একটু চাপ দিতেই হুড়মুড়িয়ে জল নেমেছিল।

একেবারে স্নান করে বাইরে বেরোতেই শরীর বেশ তাজা লাগল। এবং তখনই দরজায় শব্দ বাজল! চুল আঁচড়ানো নেই। তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে সেটাকে ভদ্রস্থ করে দরজা খুলতেই বৃদ্ধাকে দেখতে পেল সে। এখন বৃদ্ধার স্কার্টের ওপর একটা সাদা অ্যাপ্রন বাঁধা। হেসে বললেন, “গুড মর্নিং! বাঃ, তোমার স্নান হয়ে গেছে! বাইরে চমৎকার রোদ উঠেছে। আমার তো বেরিয়ে পড়তে খুব ইচ্ছে করছিল। তা কাল রাত্রে ঘুম হয়েছিল তো? হবে কী করে! তোমাদের ব্রেকফাস্ট তৈরি! দয়া করে ডাইনিং রুমে চলো এসো।”

কথাগুলো এমন তোড়ে বলে গেলেন যে, বোঝা গেল উত্তরের জন্য তিনি অপেক্ষা করেন না। ভদ্রমহিলা ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। তাঁর নজর পড়েছে মেজরের বিছানার পাশে ছোট টেবিলের ওপর রাখা চুরুটের প্যাকেটের ওপর। সঙ্গে-সঙ্গে খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি, “ইশ। কীভাবে বোকা লোকগুলো পয়সা আর শরীর নষ্ট করে। ওগুলো নিশ্চয়ই তুমি খাও না?”

অর্জুন মাথা নাড়ল। ভদ্রমহিলা বললেন, “কক্ষনো খেয়ো না। তোমাকে দেখলে বেশ ভাল ছেলে বলে মনে হয়। এবার তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো।”

অর্জুন কিন্তু-কিন্তু করে বলল, “দিদিমা…।” সঙ্গে-সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিয়ে মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন, “কাল থেকে শুনছি তুমি দিদিমা-দিদিমা করছ! আমার নাম এলিজাবেথ, তুমি আমাকে লিজা বলে ডাকতে পারো। অবশ্য অনেকেই আমায় মিসেস ব্রাউন বলে ডাকে।”

ষাট বছরের একজন মহিলাকে সে নাম ধরে ডাকবে কী করে? বরং মিসেস ব্রাউন বলে ডাকা অনেক বেশি সুবিধেজনক। কাল রাত্রে যাঁকে অনেক বেশি বয়স্কা বলে মনে হচ্ছিল আজ সকালে ততটা মনে হচ্ছে না। তবে এদেশের বৃদ্ধারা নিজেদের যতটা শক্ত-সমর্থ রাখতে চান ততটা আমাদের দিদিমা-ঠাকুমারা চান না। অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “মিসেস ব্রাউন! আমার সঙ্গী মেজরকে কি আপনি আজ সকালে দেখেছেন?”

“না দেখলেই ভাল হত। দিনটা যে কেমন যাবে তাই ভাবছি।” মিসেস ব্রাউন মুখ ঘোরালেন।

অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। সকালে উঠে কারও-কারও মুখ দেখা নাকি অযাত্রা, এমন বিশ্বাস ভারতবর্ষের মানুষের থাকে। কিন্তু সেটা ইংল্যান্ডের একজন বয়স্কা মহিলাও যে বলবেন তা কে জানত।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল আবার, “উনি কি কিছু বলে গিয়েছেন? আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম।”

“হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করল ব্রেকফাস্ট কখন পাওয়া যাবে! আমি বললাম, আটটা থেকে ন’টা পর্যন্ত এখানে ব্রেকফাস্ট পাওয়া যায়। সঙ্গে-সঙ্গে উনি রওনা হয়ে গেলেন। যতই পেটে খিদে থাকুক অত সকালে কোনও ভদ্রলোক খেতে পারে বলে আমার ধারণা ছিল না।” মিসেস ব্রাউন কয়েকবার মাথা নাড়লেন।

অর্জুন বলল, “কিন্তু আমাকে তো ওঁর জন্যে অপেক্ষা করতে হবে, মানে ব্রেকফাস্টের জন্যে।”

মিসেস ব্রাউন এগিয়ে এলেন কয়েক পা, “আমি তোমার ভদ্রতাবোধের প্রশংসা করছি, কিন্তু এর দাম দিতে তুমি আজ সকালের ব্রেকফাস্টটা মিস করতে পারো।” কথা শেষ করে প্রায় ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেলেন মহিলা।

অর্জুন বুঝতে পারছিল না কী করবে। খিদে লেগেছে খুব। গায়ে জল পড়ার পর সেটা আরও চিড়বিড়ে হয়েছে। মেজর যে কোথায় চলে গেলেন না জানিয়ে! হঠাৎ মনে পড়তেই সে দৌড়ে জানলার কাছে ছুটে গেল। জিপটা নেই। বোকার মতো সে কিছুক্ষণ শূন্য পার্কিং প্লেসটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

মিনিট পাঁচেক পরে সেজেগুজে অর্জুন ঘরের বাইরে পা রাখল। সদর দরজার পাশেই যে খাওয়ার ঘর, তা কাল রাত্রে বুঝতে পারেনি। সেখানে এখন দুটো পরিবার খাবার খাচ্ছে। মাঝখানের টেবিলে অনেকগুলো প্লেটে পাউরুটি, জেলি, মাখন, মাংস সেদ্ধ, দুধ, কর্নফ্লেক্স, হ্যামের ফালি এবং আপেল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দেখামাত্র জিভে জল এল এবং সেইসঙ্গে মেজরের ওপর রাগ। ভদ্রলোক না জানিয়ে নিজে খিদে মেটাতে চলে গেলেন। এই নিজের খাবার নিজে নাও কায়দাটা খুব ভাল। যত ইচ্ছে খাওয়া যায়, চাইবার লজ্জাটা আসে না। অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে দরজার দিকে পা বাড়াতেই খুশি হল অর্জুন। শিস দিতে-দিতে মেজর ফিরছেন। মাথায় টুপি, সমস্ত শরীর অলেস্টার জাতীয় পোশাকে ঢাকা। ওকে দেখামাত্র হাত নেড়ে চিৎকার করলেন, “সুপ্রভাত।”

অর্জুন মাথা নেড়ে অভিযোগটা জানাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মেজর বললেন, “মিসেস গ্রান্টের কিছু হয়নি।”

থতমত হয়ে গেল অর্জুন, “আপনি গিয়েছিলেন?”

মেজর দাড়িতে হাত বোলালেন, “নো। টেলিফোনে কথা বললাম। আমরা এখনও এখানে আছি শুনে উনি অবাক। ভদ্রমহিলা তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। যাচ্ছ কোথায়?”

“আপনাকে খুঁজতে। মিসেস গ্রান্টের বান্ধবী…?” অর্জুনের প্রশ্নটা শেষ করা হল না। তার আগেই মিসেস ব্রাউন উদিত হলেন, “এই যে, বয়সের সঙ্গে যে বোধবুদ্ধি চলে যাবে এটা কেমন কথা? এই বাচ্চা ছেলেটা কাল থেকে না খেয়ে রয়েছে সেটা মনে নেই? নিজের তো খেতে যাওয়া হয়েছিল, আর এ এত ভাল যে একা খেতে যাচ্ছে না। যাও বাছা, তুমি বসে পড়ো।” শেষের কথাগুলো অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে।

কিন্তু ততক্ষণে মেজর তিড়বিড়িয়ে উঠেছেন, “কী? আমি খেয়ে এলাম? আপনি দেখেছেন আমাকে খেতে? আমি গিয়েছিলাম মিসেস গ্রান্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে। এমন একটা জায়গা করেছেন যেখানে টেলিফোনও নেই। মিসেস গ্রান্ট তো আপনারই বয়সী অথচ কত নরম মনের মানুষ।

“এখানে টেলিফোন নেই? আমার অফিস-ঘরে টেলিফোন নেই? কিন্তু সেটা আর আপনাকে ব্যবহার করতে দেব না। শুনুন, আপনি নিশ্চয়ই অবিবাহিত?” চোখ ছোট করলেন মিসেস ব্রাউন।

“হ্যাঁ, তাতে কী হল?” মেজর এবার স্তিমিত।

“ঠিক ধরেছি। অবিবাহিত বুড়োগুলো এই রকম হয়। আমাকে মিসেস গ্রান্ট দেখাচ্ছে! মিসেস গ্রান্ট? নামটা বেশ চেনা লাগছে। ও, প্রোফেসর হ্যাচ ওর বন্ধুকে বলছিল।” মিসেস ব্রাউন চোখ বন্ধ করে বললেন।

অর্জুন উৎসাহিত হল, “প্রোফেসর হ্যাচ কী বলছিলেন মিসেস ব্রাউন?”

“বেশি কিছু শুনিনি। প্রোফেসর বলছিলেন, ভদ্রমহিলার খবর নিতে। আমাকে দেখে আর কথা বাড়াননি।”

“প্রোফেসর হ্যাচ কোথায়?”

“খুব ভাল মানুষ। আজ অবধি সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিয়ে চলে গেছেন। বলেছেন, ফিরলে আবার আমার এখানেই থাকবেন। কেউ একবার এখানে থাকলে তো আর অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না।”

মেজর খপ করে অর্জুনের হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়ে এলেন খাওয়ার ঘরে। ব্যাপারটা সরাসরি মিসেস ব্রাউনকে উপেক্ষা করা। অর্জুনের খারাপ লাগল। কিন্তু এক্ষেত্রে তার কিছু করার নেই। সে শুধু মেজরকে বলল, “আপনি ওঁকে পছন্দ করছেন না কেন?”

“পছন্দ? আমি করছি না? তুমি কি অন্ধ? দেখলে না আমাকে দেখামাত্রই উনি কীভাবে বাঁকা-বাঁকা কথা বললেন? কালরাত্রে দ্যাখোনি? নাও, খাওয়া শুরু করা যাক।”

একে ব্রেকফাস্ট না বলে লাঞ্চ বলাই ঠিক। যে পরিমাণ খাবার মেজর নিয়েছেন তা দুপুরেও খেতে পারত না অর্জুন। অবশ্য সে নিজেও কম নেয়নি। এবং বিকেলের আগে খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এই খাবারটা ঘর-ভাড়ার মধ্যেই পড়ছে। কিন্তু অর্জুনের আর তর সইছিল না। মেজর মুখভর্তি খাবার নিয়ে চোখ বন্ধ করে চিবিয়ে যাচ্ছেন।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “মিসেস গ্রান্টের বান্ধবীর খবরটা উনি জেনেছেন?” দু’বারের চেষ্টায় মেজর কথা স্পষ্ট করলেন, “টেলিফোনটা তো সেই মহিলা প্রথমে ধরেছিলেন।”

অর্জুন হাঁ হয়ে গেল, “মিসেস গ্রান্টের বান্ধবী?”

মাথা নাড়লেন মেজর। খাবারটা গলা দিয়ে নামিয়ে বললেন, “উনিই তো মিসেস গ্রান্টকে ডেকে দিলেন।”

“তা হলে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যিনি শুয়ে আছেন তিনি কে?”

“নামটা জানি না। তবে তিনিই মিসেস গ্রান্টের গাড়িটা চুরি করেছেন। “গাড়ি চুরি? এদেশে হয়?”

এবার মেজর এমন জোরে হেসে উঠলেন ওপাশের টেবিলের মানুষেরা চমকে এদিকে তাকাল। মেজর বললেন, “পৃথিবীর সব দেশের চোর-ডাকাত-খুনির চেহারা একরকমের। যা হোক, মিসেস গ্রান্ট পুলিশের কাছে নালিশ করেছিলেন। কাল মাঝরাত্রেই পুলিশ খবরটা ওঁকে পৌঁছে দিয়েছে। উনি একটু বাদেই এখানে আসছেন। তোমার দেখছি স্নানটান হয়ে গিয়েছে। আমি খেয়েদেয়ে আধ ঘন্টার মধ্যে তৈরি হয়ে নিচ্ছি।”

“মিসেস গ্রান্ট এখানে কেন আসছেন?”

“বাঃ। উনি দেখতে চান কে চুরি করেছে। গাড়িটাও ফিরিয়ে নেওয়া দরকার। আমরা ওই পথে যাব যখন, তখন উনি আমাদের সঙ্গে যেতে পারেন।” মেজর এবার খাওয়ায় মন দিলেন।

অর্জুন ঠিক করল মিসেস গ্রান্ট এলে ওঁকে নিয়ে প্রথমে ব্যাঙ্কে যাবে। লকারে কী আছে না জেনে ব্ল্যাকপুল ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে না।

খাওয়া শেষ করে মেজর নিজের ঘরে চলে গেলে অর্জুন বাইরে বেরিয়ে এল। মেয়ে গাড়ি-চোর কেন মিসেস গ্রান্টের গাড়ি চুরি করে ওই পথে যাবে এবং কে তাকে দুর্ঘটনার মধ্যে ফেলল এই রহস্য সেই মহিলার সঙ্গে কথা না বললে জানা যাবে না। হয়তো এটা চোরদের রেষারেষি। জিপটা গত রাত্রে যেখানে ছিল সেখানে দাঁড়িয়ে নীচে তাকাল সে। জায়গাটা বাঁধানো না হওয়ায় জিপের চাকার দাগ এখনও রয়ে গেছে। সে মন দিয়ে চাকার দাগগুলো লক্ষ করল। ডান দিকের একটা চাকার তলায় নিশ্চয়ই খানিকটা অংশ কাটা রয়েছে কোনও কারণে। ছাপটা পড়ার সময় সেই অংশ মাটিতে চেপে বসেনি।

অর্জুন ধীরে-ধীরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। এই সকালেও চমৎকার ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। রোদ উঠেছে বেশ মিঠে। এমনকী, সমুদ্রটার চেহারাও ঝকঝকে দেখাচ্ছে। ওদিকের ফুটপাথ ধরে একজন সর্দারজি স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে হাঁটছেন। ওদের দেখে বড় লাগল অর্জুনের। এই বিদেশে একজন ভারতীয়কে দেখলে আত্মীয় বলে মনে হয়। চণ্ডীগড় আর জলপাইগুড়ি যেন পাশাপাশি হয়ে যায়।

পেট ভর্তি, শরীরে আরাম, অর্জুন একটা সিগারেট ধরাল। তারপর পায়চারি করার মতো হাঁটতে-হাঁটতে একটা প্লে হাউসের সামনে এসে দাঁড়াল। এই সকালেই বেশ ভিড় জমে গেছে সেখানে। ভেতরে ঢুকে মজার খেলাগুলো দেখতে লাগল সে। একটা বক্সের মধ্যে ছোট-ছোট নানান প্রয়োজনের জিনিস আছে। একটা দশ পেনির কয়েন গর্তে ফেললে চিমটে নেমে আসবে। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে চিমটে দিয়ে যে-কোনও একটা জিনিস তুলে নাও। চিমটেটা আপনি উলটো দিকে চলে গিয়ে গর্ত দিয়ে জিনিসটা বের করে দেবে। দেখা যায় যেসব জিনিসের দাম দশ পেনির কম সেগুলোকেই ধরা সম্ভব হয়। বেশি দামের জিনিসগুলোকে স্পর্শ করেই চিমটেটা পিছলে যায়। অর্জুন সরে এল। একটা বিরাট টেবিল টেনিসের মতো বোর্ডে দশটা প্লাস্টিকের ঘোড়া একসঙ্গে দৌড়চ্ছে। দশ পেনি ফেলে পছন্দমতন ঘোড়ার নাম্বারের বোতাম টিপে দেখতে হবে কে জিতছে। জিতলে এক-দেড় পাউন্ড পর্যন্ত পাওয়া যাবে। যন্ত্রচালিত এই ঘোড়দৌড় দেখতে বেশ ভিড়।

এইসময় অর্জুন মেয়েটিকে দেখতে পেল। সেই মেয়েটি যে সমুদ্রের ধারে তাকে সতর্ক করে দিয়েছিল। কালো মেয়েটি ওর দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে বসে আছে একটা চেঞ্জ কাউন্টারে। যাদের দশ পেনির দরকার তারা ওর কাছে গিয়ে পাউন্ড ভাঙিয়ে নিচ্ছে। কাউন্টার ফাঁকা হতে অর্জুন এগিয়ে গেল। গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন?”

মেয়েটি গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “ভাল। কত পাউন্ড ভাঙাবেন আপনি?”

“একটাও না। সেদিন আমাকে সাবধান করে দেবার জন্য ধন্যবাদ।”

“আমি যা শুনেছিলাম তাই বলেছি। লোক দুটোকে আজ সকালেও আমি দেখেছি। ইয়েস স্যার?” মেয়েটি পাউন্ড ভাঙাতে আসা এক বৃদ্ধের দিকে হাত বাড়াল। অর্জুন সরে এল। দু’ পকেটে হাত ঢুকিয়ে বেরিয়ে এসে চারপাশে তাকাল। কোনও সন্দেহজনক মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ল না।

মিসেস গ্রান্ট পৌঁছবার আগেই ওরা ভাড়া মেটাতে মিসেস ব্রাউনের অফিস-ঘরে পৌঁছল। গম্ভীর মুখে নোটগুলো নিয়ে মহিলা অর্জুনকে বললেন, “আজ তোমরা বোস্টন ফিরে যাচ্ছ?”

অর্জুন জবাব দিতে গিয়ে মুখ তুলতেই চমকে উঠল। দেওয়ালে একটা বাঁধানো ছবি। সে না জিজ্ঞেস করে পারল না, “ছবিটা কার?”

মিসেস ব্রাউন কাঁধ ঝাঁকালে, “লোকটার সঙ্গে এককালে আমার বিয়ে হয়েছিল।”

“উনি।” ইতস্তত করল অর্জুন।

“না-না। সেটা হলে তো খুশি হতাম। জোচ্চুরি করে জেলে গিয়েছিল। ছাড়া পাওয়ার পর আমার এখানে এসেছিল। আমি ঢুকতে দিইনি। ওরকম হাড়বজ্জাত লোক আমি জীবনে দেখিনি।”

মেজর হতভম্ব হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখ গোল হয়ে এসেছিল। অর্জুন তাঁর কনুই ধরে প্রায় টানতে-টানতে বাইরে বের করে আনল। মেজর বললেন, “আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছে।”

অর্জুন হাসল, “তা হলে বুঝলেন, উনি খামোখা আপনাকে অপছন্দ করেননি।”

“হ্যাঁ হে। অবিকল আমার মতো দেখতে?”

“গায়ের রংটা ছাড়া।

“তুমি ভাবতে পারো, আমার মতো দেখতে একটা লোক পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে?”

প্যাসেজের দিকে তাকিয়ে অর্জুন বলল, “সামনের দিকে নয়, আমাদের সামনেই।”

লোকটি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তার চোখ মেজরের দিকে। মেজর যেন কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। আর অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। দুটো মানুষ প্রায় এক রকমের দেখতে হয় কী করে? স্বাস্থ্য, দাড়ি, চশমা। শুধু চুলের স্টাইল আর গায়ের রংটাই যা আলাদা। মানুষটি কিন্তু কথা বলল না। মেজরকে দেখতে-দেখতে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল। এবং তারপরেই মিসেস ব্রাউনের চিৎকার শোনা গেল, “আবার এসেছ? কতবার বলেছি যে, তোমার ছায়া মাড়াতে চাই না। না, না, একটা পেনিও পাবে না। জোচ্চোরদের সঙ্গে আমি কথা বলি না। এটা আমার পয়সায় কেনা, তোমার কোনও অধিকার নেই এখানে।

মেজর মাথা নাড়লেন, “এখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাই চলো। অর্জুন বলল, “বেরিয়ে যাবেন কি? মিসেস গ্রান্টের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে না?”

“অ। তা হলে তুমি একটা কাজ করো। আমাদের জিনিসপত্র বাইরে নিয়ে এসো। চমৎকার রোদ উঠেছে। সমুদ্রের হাওয়াটাও বেশ ভাল। আমি ওখানে দাঁড়াচ্ছি।” মেজর কথা শেষ করেই হনহনিয়ে এগিয়ে গেলেন।

অনেক কষ্টে হাসি চাপল অর্জুন। মেজর মিসেস ব্রাউনের ভয়ে আর গেটের এপাশে থাকতে চাইছেন না, অথচ মুখে সেটা স্বীকার করবেন না। এদিকে মিসেস ব্রাউন তখনও চিৎকার করে যাচ্ছেন। নিজেদের ঘরে যাওয়ার পথে অর্জুন দেখল ডাইনিং রুমের সামনে সেই লোকটি দাঁড়িয়ে। একা। যেন ওখানে দাঁড়িয়েই গালাগালগুলো শুনছে। অর্জুনকে দেখে লোকটা হাসল, “গুডমর্নিং। পাকিস্তানি?”

“নো, ইন্ডিয়ান।” অর্জুনের ইচ্ছে হল লোকটার সঙ্গে কথা বলতে।

“দিস ইজ মিস্টার ব্রাউন। হোয়াট ইজ দি নেমে অব ইওর ফ্রেন্ড?”

“মেজর।”

“মেজর। মিলিটারি ম্যান?”

“হি ওয়াজ!”

লোকটা, যার নাম মিস্টার ব্রাউন, চোখ বড় করল। আর সেই সময় মিসেস ব্রাউন বেরিয়ে এলেন, “ওঃ! তুমি আবার ওই ভাল ছেলেটার মাথা খাচ্ছ?” প্রশ্নটা শেষ হবার আগেই মিস্টার ব্রাউন সুড়সুড় করে গেটের দিকে হাঁটতে লাগল। মিসেস ব্রাউন কোমরে হাত দিয়ে যেন পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকলেন।

আড়চোখে মেজর মিস্টার ব্রাউনকে বেরিয়ে আসতে দেখে পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সমুদ্রের গা ঘেঁষে একটা ট্রাম হুহু করে বেরিয়ে গেল। ঠিক তারই মতন দেখতে একটা লোক এই শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেই ভাল নয়। ব্রাউন যে সোজা তার সামনে এসে দাঁড়াবে, তা তিনি ভাবেননি, “হ্যালো, তোমার বয়স কত?”

খুব খেপে গেলেন মেজর, “কেন? আমার বয়সে তোমার কী দরকার? এটা একটা প্রশ্ন হল?”

“তুমি দেখছি বেশ মেজাজি লোক। আমি না চেষ্টা করেও রাগ করতে পারি না।’

মেজর মুখ ফেরালেন। সত্যি, মনে হচ্ছে তিনি যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্রাউন হাসল, “আমার বউটিকে দেখলেন? ও খুব রাগী। তবে ব্যবসাটা ভাল বোঝে। আপনি যে আমার লাইনের লোক সেটাও কিন্তু ওই চেহারার মিলের মতো তাজ্জব ব্যাপার।”

“লাইনের লোক? কে লাইনের লোক? আমি জোচ্চোর? জেল খেটেছি? অ্যাঁ? এ বলে কী?”

“আমার বউ-এর মতো চেঁচাচ্ছেন কেন? লাইনের লোক না হলে দুটো টিকটিকি কাল থেকে তোমাকে ফলো করছে কেন? সাধারণ লোককে কেউ ফলো করে?” ব্রাউন দাড়িতে হাত বুলিয়ে হাসল।

“বাঃ। কী মজা! তোমাকে কে না কে ফলো করেছে আর আমি লাইনের লোক হয়ে গেলাম?”

“দ্যাখো বাপু, আমি মিথ্যে বলছি না। গত এক বছরে কোনও জোচ্চুরি করিনি। আগের সব ঝামেলা অনেকদিন আগেই চুকিয়ে ফেলেছি। ফলো করার মতো গুরুত্ব কেউ আমায় দেবে না। হঠাৎ গতকাল থেকে দেখছি আমার পেছনে টিকটিকি লেগে আছে। এখন কারণটা বুঝতে পারছি। ওরা আমাকে তুমি বলে ভুল করেছে। তুমি লাইনের লোক না হলে ওরা তোমায় খুঁজবে কেন?” পিটপিট করে তাকাল ব্রাউন। মেজর মুখে হাত বোলালেন। দাড়ি অসমান হয়ে গেছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ওদের কোথায় দেখেছ?”

“এই তো, পথে এসো ব্রাদার। একটা ফাইভি ছাড়ো আগে।”

“ফাইভি?” মেজর হাঁ।”

“বেশি বলিনি। মাত্র পাঁচ পাউন্ড। বউয়ের কাছে গিয়েছিলাম, হাত উপুড় করল না।”

“আমি তোমাকে খামোখা পাউন্ড দিতে যাব কেন?”

“এক লাইনের দোস্ত বলে। কেসটা কী? কী ফাঁসিয়েছ? যদি একা না সামলাতে পারো তো আমাকে বলো। এ-তল্লাটের সব দু-নম্বরিদের সঙ্গে আমার জানাশোনা আছে।” ব্রাউন মাতব্বরের মতো জানাল।

এইসময় জিনিসপত্র নিয়ে অর্জুন বেরিয়ে এল। মালপত্র তেমন ভারী নয়, কিন্তু দুটো এক রকমের মানুষকে দূর থেকে কথা বলতে দেখে সে ওগুলোকে নীচে নামিয়ে রেখে একমুহূর্ত দেখল। মেজর তাকে দেখামাত্র দ্রুত দূরত্ব কমিয়ে ফেললেন, “এই ব্রাউন লোকটা একটা জোচ্চোর। কিন্তু ও বলছে আমি ভেবে কারা নাকি ওকে অনুসরণ করছে।”

অর্জুন আবার ব্রাউনের দিকে তাকাল। লোকটা পকেটে হাত রেখে এইদিকে বোকা-বোকা মুখে তাকিয়ে আছে। ওর মনে হল ব্যাপারটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। মেজর এবং তাঁর সম্পর্কে যারা কৌতূহলী তারা তো ব্রাউনকে দেখে ভুল করতেই পারে। এক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট হচ্ছে যে, কৌতূহলীরা ব্ল্যাকপুলের লোক নয়, তা হলে এই ভুল সহজে করত না।

অর্জুন কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই মিসেস গ্রান্ট এসে গেলেন। তিনি এলেন তাঁর বান্ধবীর গাড়িতে চেপে। ওঁদের দেখে দরজা খুলে কাছে এসে বিহ্বল গলায় বলে উঠলেন, “কী সর্বনাশের ব্যাপার বলো তো! কে না কে মেয়ে আমার গাড়ি চুরি করে অ্যাকসিডেন্ট করল? মেয়েটার নাকি এখনও জ্ঞান ফেরেনি। চলুন, আর দেরি করে লাভ নেই।”

অর্জুন গাড়িটার কাছে এগিয়ে গেল, “আপনার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।”

মিসেস গ্রান্ট অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে গুরুত্বটা অনুমান করে নীচে নেমে এলেন। মিনিট-তিনেক কথা বলার পর তিনি রাজি হলেন, “আমার বান্ধবীকে বলছি। ওর সঙ্গে ওই ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের ভাল আলাপ আছে। লকার খুলতে গেলে খাতায় সই-সাবুদ করতে হয়। সমস্ত ব্যাপারটা ম্যানেজারকে জানিয়ে করাই ভাল।”

অর্জুনের ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছিল না। ম্যানেজারকে জানালেনই তিনি পুলিশ ডাকতে পারেন। পুলিশ তখন জানতে চাইতে পারে, কেন এতসব ঘটনার কথা তাদের জানানো হয়নি? লকারে কী রয়েছে সেটাও তারা ইচ্ছে করলে জানতে না দিতে পারে। সে এব্যাপারটা বলতে মিসেস গ্রান্ট বললেন, “চলো, আগে আমরা ব্যাঙ্কে যাই, তারপর অবস্থা দেখে ঠিক করা যাবে।”

অর্জুন এবার তার আপত্তির কথা জানাল, “আমি ব্যাঙ্কটা চিনি। আপনারা গাড়িতে যান, আমি হেঁটে যাচ্ছি। বেশি দূর নয়, ঠিক পৌঁছে যাব।”

“সে কী! গাড়ি থাকতে তুমি হাঁটবে কেন? এ কেমন কথা?”

অর্জুন তখন ইশারায় দূরে দাঁড়ানো ব্রাউনের প্রতি ওঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। করা মাত্রই মিসেস গ্রান্টের চোখ গোল হয়ে গেল। তিনি দ্রুত মেজরের দিকে তাকালেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই মেজরের মুখটায় একটা নার্ভাস ভাব ফুটে উঠল। অর্জুন তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আমি ওঁর সঙ্গে হেঁটে যাব। মেজর আপনাকে যেতে-যেতে ওর গল্প বলবেন।”

মেজরের ইচ্ছে ছিল না অর্জুনকে একা ব্রাউনের সঙ্গে ছেড়ে দিতে। ওই জোচ্চোরটার সঙ্গে অর্জুনের যাওয়ার প্রয়োজনই বা কী তা ওঁর মাথায় ঢুকছিল না! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মালপত্র গাড়িতে চাপিয়ে মিসেস গ্রান্ট এবং তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে ব্যাঙ্কের দিকে রওনা হলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, “আমি যাচ্ছি, কারণ আমি খুব উত্তেজিত। ক’দিন একদম ভুলে থাকতে চেষ্টা করেছি লকারে কী আছে। কিন্তু এখন আর তর সইছে না। সাবধানে এসো। লোকটাকে একটাও পয়সা দেবে না।”

গাড়িটা বেরিয়ে যাওয়ার পর অর্জুন ব্রাউনের পাশে দাঁড়াল, “মিস্টার ব্রাউন, আপনি কি এখন খুব ব্যস্ত?”

“মোটেই না। তোমার বন্ধুরা সব কোথায় গেল, তুমি গেলে না?”

“না। ওদের কাজের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।” অর্জুন হাসল, “আমি একটু শহরটা ঘুরে দেখতে চাই।”

ঠোঁট ওলটাল ব্রাউন, “শহরটা দেখার মতো নয় হে। এই সমুদ্রের ধারের রাস্তা আর দোকানপাট, ব্যস্, এই হল ব্ল্যাকপুল। স্টেশনটাও দেখার মতো নয়। তুমি কি চাইছ আমি তোমার সঙ্গে যাই?”

“আপনার যদি খুব আপত্তি না থাকে। একজন পরিচিত মানুষ সঙ্গে থাকলে ভাল লাগবে।”

“আরে বাবা, আপত্তি করতে যাব কেন? তুমি আমাকে একটা লেট ব্রেকফাস্ট খাওয়াবে নিশ্চয়ই। লাঞ্চের আগে ঘোরা শেষ হবে না। আর বিকেলে নিশ্চয়ই দশটা পাউন্ড হাতে না দিয়ে তুমি পারবে না। চলো যাচ্ছি। আচ্ছা, এই যে প্লে হাউসগুলো দেখছ, খবরদার ঢুকো না। খাঁটি জোচ্চুরির জায়গা। দশ পি দশ পি করে এক পাউন্ড খরচ হয়ে যাওয়ার পর তুমি হয়তো দশ পি ফেরত পেলে। কফি খেলে কেমন হয়?”

ডান দিকেই একটা কফি কর্নার। পঁয়তাল্লিশ পেনি দিয়ে এক কাগজের কাপ কফি পাওয়া যায়। ভারতবর্ষে ওই টাকায় দশ কাপ কফি পাওয়া যেত। তা ছাড়া খানিক আগে খাওয়া হয়েছে, অর্জুনের মোটেই ইচ্ছে ছিল না। সে দোকানদারকে একটা কফি দিতে বললে দোকানদার চোখ কুঁচকে ব্রাউনের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যালো স্যাম, কিছু করছ মনে হচ্ছে?”

ব্রাউন চটপট জবাব দিল, “এই আর কি। ট্যুরিস্টদের গাইড করছি।”

লোকটা যেন কথাগুলো পছন্দ করল না। কিন্তু আর কথা বাড়াল না। দাম মিটিয়ে কফিটা ব্রাউনকে নিতে দিল অর্জুন। আর তখনই ব্রাউন বলল, “তোমাদের বন্ধুটি, ওই যাকে আমার মতো দেখতে, তার ব্যবসাটা কী বলো তো?”

“ব্যবসা? উনি তো ব্যবসা করেন না?”

“করে। তুমি চেপে যাচ্ছ। টিকটিকি ঘুরছে পেছনে। এমনি-এমনি?” লোকটা কফি শেষ করল, “শোনো, আমার একটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে। তোমরা যদি আমার সঙ্গে হাত মেলাও, তা হলে ভাল কামানো যেতে পারে।

অর্জুন হেসে ফেলল, “কী ভাবে?”

“আমার ব্যবসায় ওকে সবাই আমি বলে ভুল করবে। সেই ফাঁকে বাইরে থেকে আমি কাজটা করলেও কেউ আর আমাকে সন্দেহ করবে না।” কথাগুলো বলতে-বলতে ব্রাউন ফুটপাথ ঘেঁষে হাঁটছিল, “তবে ওকে চুরুট খাওয়া ছাড়তে হবে। আমার লাইনের সবাই জানে আমি চুরুট খাই না। যা হবে তার অর্ধেক আমার, অর্ধেক তোমাদের। মনে-মনে আচমকা হিসাব করতে লাগল ব্রাউন। রাস্তাটা পার হবার জন্যে অর্জুন পা বাড়িয়েছিল, হঠাৎ মনে হল, একটা গাড়ি খুব দ্রুত ছুটে আসছে। কিছু বোঝার আগেই সে দু’পা পিছিয়ে আসতে গাড়িটা ব্রেক কষল। চাকাটা ইচ্ছেকরে ডান দিকে বেঁকতে-বেঁকতে বাঁ দিকে মোড় নিতেই ব্রাউন পড়ে গেল মাটিতে। কিছু বোঝার আগেই লোক দুটো নেমে এল জিপ থেকে। ব্রাউনকে তুলে নিল ধরাধরি করে। চিৎকার করে বলল, “হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি।” তারপরে উধাও। ব্যাপারটা পরিষ্কার হতে অর্জুনের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।

প্রচণ্ড গতিতে ছুটে যাওয়া জিপটার দিকে তাকিয়ে থেকে অর্জুনের তখনও মাথা ঝিমঝিম করছিল। এত বড় একটা কাণ্ড ঘটে গেল অথচ সমুদ্রের ধারে বেড়াতে আসা মানুষেরা সামান্য চঞ্চল হল না। শুধু একটা বিশাল চেহারার পুলিশ সামনে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমার বন্ধু?”

কী উত্তর দেবে ঠাহর করতে পারল না অর্জুন। শেষ পর্যন্ত মাথা নেড়ে বলল, “না। একটু আগে আলাপ হয়েছে।

পুলিশটা কাঁধ নাচাল, “হি ইজ লাকি। কেন যে লোকে অন্ধ হয়ে রাস্তা পার হয়।” উদাস-উদাস মুখ করে লোকটা আবার চলে গেল পকেট থেকে রুমাল বের করে এই ঠাণ্ডাতেও মুখ মুছল অর্জুন। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে ব্রাউনকে ওরা জোর করে ধরে নিয়ে গেল। ওরা যদি ব্রাউনের পুরনো শত্রু হয় তা হলে বলার কিছু নেই। কিন্তু যদি মেজর ভেবে ব্রাউনকে নিয়ে যায়? চিন্তাটা মাথায় আসামাত্র সে কেঁপে উঠল। ভুলটা ওদের খুব শিগগির ধরা পড়বে। অর্জুন দ্রুত রাস্তার ওপারে চলে এল। ট্রামটা থামতেই তাতে সে উঠে বসল। বসার জায়গা পেয়েও বাইরের দৃশ্য দেখার মতো মন ছিল না। যারা তাদের পেছনে লেগেছে তাদের চেহারা বা হদিস জানা নেই। প্রোফেসর হ্যাচ নামক মানুষটি যে এই ঘটনার সঙ্গে কতটা জড়িত তাও তো বোঝা যাচ্ছে না। সে কি ভুল করল? পুলিশটাকে কি জানানো উচিত ছিল ওরা ব্রাউনকে ইলোপ করেছে? লোক দুটো কি শুধু জিপে চেপে তাদের অনুসরণ করেছে, নাকি রাস্তাতেও ওদের কেউ-কেউ ছিল! অর্জুন কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না। দূর থেকে ব্যাঙ্কটাকে দেখতে পেয়ে সে নেমে পড়ল।

ব্যাঙ্কের সামনের পার্কিং লটে মিসেস গ্রান্টের বান্ধবীর গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। তার খানিকটা পেছনে মেজর দুটো বাচ্চা ছেলের সঙ্গে ফুটবল খেলছেন রবারের বল নিয়ে। অর্জুনকে দেখে খেলা ছেড়ে এগিয়ে এলেন হাসতে-হাসতে, “এককালে খেলতাম, বুঝলে।”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওঁরা কোথায়?”

“ব্যাঙ্কের ভেতরে। তোমার সঙ্গীটিকে দেখছি না?”

অর্জুনের ব্রাউনের ব্যাপারটা বলতেই মেজরের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, “সর্বনাশ! তুমি পুলিশকে কিছু বলোনি? অতবড় একটা হুমদো লোককে দিনদুপুরে ধরে নিয়ে গেল?”

হুমদো শব্দটা কানে যাওয়ামাত্র অর্জুনের হাসি পেল। শব্দটাতো মেজরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চেহারা যেহেতু দুজনের একইরকম। মেজর বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি হাসছ? হাসতে পারছ?”

তখনই মিসেস গ্রান্ট তাঁর বান্ধবীকে নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে এলেন। অর্জুনের বুকের ভেতর ড্রাম বাজতে লাগল। দুই প্রৌঢ়া কাছে এসে দাঁড়াতেই অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

মিসেস গ্রান্টের বান্ধবী বলল, “ম্যানেজার খুব ভাল মানুষ। তিনি বললেন অন্যের লকার আমরা খুলতে পারি না। কিন্তু যেহেতু লকারের মালিক গতবছর ভাড়া দেননি তাই ওঁরা তাঁকে চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠি ফেরত এসেছে। এ-অবস্থায় ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে তিনি লকার খুলছেন। কিন্তু কিছু দিতে পারবেন না সেখান থেকে। আমরা কেন ইন্টারেস্টেড তাও জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, ভদ্রলোক মিসেস গ্রান্টকে ওই চাবি দিয়ে এসেছিলেন বোস্টনে গিয়ে।”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”

মিসেস গ্রান্ট পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন, “লকারে কোনও টাকাকড়ি-গহনা ছিল না। শুধু একটা কাগজ ছিল। আমি সেটাকে কপি করে নিয়ে এসেছি।”

হঠাৎ অর্জুনের নজর পড়ল একটা জিপ বাঁক ঘুরে এ-পথে আসছে। সে চিৎকার করে মেজরকে বলল, “চটপট গাড়ির পেছনে চলে যান।” প্ৰায় মেজরের হাত ধরে সে টেনে নিয়ে এল গাড়ির পেছনে।

মিসেস গ্রান্ট কী করবেন ঠিক করার আগেই জিপটা তীব্র গতিতে বাঁক নিয়ে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে অর্জুন ভদ্রমহিলার হাসি শুনতে পেল। মুখ বের করে সে দেখতে পেল জিপের আরোহী এক মহিলা এবং দুটি বাচ্চা। সে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই মিসেস গ্রান্ট হাসতে-হাসতে বললেন, “জিপটাকে এত ভয় পেলে কেন?” অর্জুন লজ্জা পেল, “ঠিক এইরকম জিপ খানিক আগে মিস্টার ব্রাউনকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। আমাদের বোধহয় এখানে বেশিক্ষণ থাকা উচিত হবে না।”

অতএব ওরা রওনা হল। মিসেস গ্রান্ট তাঁর বান্ধবীকে নিয়ে যাবেন হাসপাতাল পর্যন্ত। সেখানকার থানার অফিসারের সঙ্গেও দেখা করবেন তাঁরা। মেজর আর অর্জুন বাস ধরবেন ওখান থেকে। জিপের আতঙ্ক থেকে মেজর খুব গম্ভীর হয়ে গিয়েছেন। পেছনের সিটে অর্জুনের পাশে বসে চুপচাপ ইংল্যান্ডের গ্রাম, খামার, মাঠ দেখছিলেন। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিচু গলায় মাতৃভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, ওরা আমাকে ইলোপ করতে চাইবে কেন? আমি ওদের কোনও পাকা ধানে মই দিয়েছি?”

অর্জুন কোনও উত্তর দিল না। মেজর একটা নিশ্বাস ফেলে পেছনের দিকে তাকালেন। ব্ল্যাকপুল ছেড়ে গাড়ি এবার হাইওয়ের দিকে এগোচ্ছে। ওদের পেছনের গাড়িগুলোকে খুব নিরীহ দেখাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছিল, মেজর কাউকে সন্দেহের বাইরে রাখছিলেন না। ব্যাপারটা মিসেস গ্রান্টও লক্ষ করেছিলেন। মুখ ফিরিয়ে তিনি অর্জুনকে ইশারা করলেন। ব্যাপারটা বোঝার আগেই অর্জুন শুনল মিসেস গ্রান্ট মেজরকে বলছেন, “আমি জানতাম আমি অভিযাত্রী। কোনও কিছুতেই ভয় পান না। কিন্তু এখন দেখছি আপনি খুব ভিতু।”

“আমি ভিতু!” মেজর হঠাৎ হাহা করে এমন হেসে উঠলেন যে, মিসেস গ্রান্টের বান্ধবী পর্যন্ত চমকে উঠলেন। মেজর বললেন, “একমাত্র আরশোলা আর টিকটিকি ছাড়া আর কিছুতেই আমার ভয় নেই।

সঙ্গে-সঙ্গে মিসেস গ্রান্টের চোখ বিস্ফারিত হল, “মাই গড। মেজর একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, “তার মানে?”

মিসেস গ্রান্ট অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও অর্জুন, ইউ মাস্ট হেল্প হিম। তুমি ওর পাশে বসে আছ। ওর পকেট থেকে প্রাণীটিকে বের করে দাও।” কথাটা কানে যাওয়ামাত্র মেজরের দাড়ি ঠেকল বুকে। আর সঙ্গে-সঙ্গে তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। তাঁর শরীর শক্ত হয়ে গেল, চোখ বিস্ফারিত। অর্জুন ব্যাপারটা বুঝতেই পারল না। মেজরের বুকে শুধু কলমের মাথা ছাড়া অন্য কোনও বস্তুর অস্তিত্ব সে দেখতে পেল না। ততক্ষণে মেজর কথা বলছেন। গলার স্বর ভয়ে বিকৃত, “অ-অ অর্জুন, টিকটিকিটাকে পকেট থেকে ফেলে দাও!” বলতে-বলতে তিনি উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন। অর্জুন মিসেস গ্রান্টের দিকে তাকাল। ওঁর মুখে দুষ্টুমির হাসি। আর তখনই কাণ্ডটা করলেন মেজর। বাঁ হাতের এক থাবায় কলমটাকে তুলে বাঁ দিকে ছুড়ে ফেললেন জানলা গলিয়ে। গাড়ি চলছিল জঙ্গুলে এলাকা দিয়ে। মিসেস গ্রান্ট চিৎকার করে উঠলেন, “আরে আরে, আপনি কলমটাকে ফেলে দিলেন?”

“কলম! আমার বুক পকেটে টিকটিকি উঁকি মারছিল আর আপনি বলছেন কলম?”

খেঁকিয়ে উঠলেন মেজর। মিসেস গ্রান্টের বান্ধবী ততক্ষণে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছেন। অর্জুন হেসে ফেলল, “আপনার বুক পকেটে টিকটিকি আসবে কেমন করে?”

“সেটা অবশ্য একটা কথা, কিন্তু এসেছিল তো!”

“না, আসেনি। আপনার কলমটাকে উনি ম্যাজিকে টিকটিকি বানিয়ে দিয়েছিলেন।”

তৎক্ষণাৎ আঁতকে উঠলেন মেজর। বাঁ হাতে বুক পকেটটা চাপড়ে নিলেন। তারপর দরজা খুলে গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লেন। মেজরকে পেছনের দিকে ছুটে যেতে দেখে অর্জুনও নামল। খুব নির্জন জায়গাটা। জঙ্গুলে এবং ওপাশে তাকালে জনবসতির চিহ্ন দেখা যায় না। মিসেস গ্রান্ট চেঁচিয়ে বললেন, “আই অ্যাম সরি। মেজরকে তাজা করার জন্যে কাণ্ডটা না করলেই হত। আমরা একটু এগিয়ে পার্কিং প্লেসে গাড়িটা রাখছি। এখানে থাকলে পুলিশ ধরবে।”

অর্জুন হাত নাড়তে গাড়িটা ফার্লং-দুই এগিয়ে রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াল। হুশহাশ করে গাড়ি যাচ্ছে। পাশাপাশি আটটা বিপরীতমুখী গাড়ি ছুটে যাচ্ছে মসৃণভাবে। এমন দৃশ্য পশ্চিমবাংলায় চিন্তা করা যায় না। এখানে কেউ আচমকা গাড়ি ঘুরিয়ে ট্র্যাফিক জ্যাম করে না, পার্কিং প্লেস ছাড়া গাড়ি দাঁড় করায় না। অর্জুন দেখল মেজর প্রায় মাটি হাতড়ে কলম খুঁজছেন। পাশে দাঁড়িয়ে নজর বোলাতে বোলাতে সে জিজ্ঞেস করল, “খুব দামি কলম?”

মেজর মুখ না তুলে জবাব দিলেন, “কলম ইজ কলম। কিন্তু এরকম বোকাটে রসিকতা করার কোনও মানে হয়?” ছোঁড়ার সময় যাকে টিকটিকি মনে হয়েছিল, ঝোপেঝাড়ে তাকে খুঁজে পাওয়া যে রীতিমত কষ্টকর তা বুঝতে সময় লাগল মেজরের। শেষে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে হতাশ গলায় উচ্চারণ করলেন, “যা, অত রেয়ার পয়জনটা হারিয়ে ফেললাম।”

“পয়জন? আপনি কি বিষের কথা বলছেন?”

“হ্যাঁ হে। আমি একটা অন্ধ, প্যাঁচা, বুদ্ধু বোকা।” বিড়বিড় করলেন মেজর। ওঁর দাড়ি এখন অবিন্যস্ত। তাতে মোটা আঙুলগুলো সাঁতার কাটছে।

অর্জুন এবার হতভম্ব, “কলমে বিষ মানে?”

“খুব সিম্পল ব্যাপার। আমি কলমের ভেতরে বিষ রেখেছিলাম। বছর-দুয়েক আগে আমাজনে নৌকো বাইতে বাইতে দেখেছিলাম একটা হাতি মরে পড়ে আছে তীরে। কাছে গিয়ে কোনও ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেলাম না। অথচ হাতিটা খুবই কম বয়সী। আমার আদিবাসী গাইড বলল, ওটা মরেছে র‍্যাটল স্নেকের কামড়ে। অনেক চেষ্টার পর আমি বিশ ফোঁটা র‍্যাটল স্নেকের বিষ জোগাড় করেছিলাম। খুব দামি জিনিস হে। কোথায় যে ফেললাম!”

মেজরের নিশ্বাস পড়ল শব্দ করে।

“কিন্তু অত দামি জিনিস কলমের ভেতরে রাখতে গেলেন কেন?”

“সিম্পল ব্যাপার। আত্মরক্ষার অস্ত্র। মুখটা খুলে নিবটা যদি শত্রুর শরীরে ঢুকিয়ে দিই, তা হলেই সে ঢলে পড়বে। ওই কলমে আমাকে কখনও লিখতে দেখেছ? নেভার।”

জীবনে এরকম অস্ত্রের নাম শোনেনি অর্জুন। এবং এটা মেজরের মাথাতেই আসা সম্ভব। ওদিকে তখন মিসেস গ্রান্টের গাড়ি থেকে হর্নের আওয়াজ ভেসে আসছে। অর্জুন বলল, “চলুন।”

“যাব মানে? কলমটাকে ফেলে রেখে যাব?” বলতে-বলতে মেজরের চোখের দৃষ্টি স্থির হল, “অর্জুন, দ্যাখো তো ওটা কী?”

মুখ তুলে অর্জুন দেখতে পেল একটা গাছের ডালে কলমটা আটকে আছে। মেজর চলন্ত গাড়ি থেকে যাকে ছুঁড়েছিলেন, সে মাটিতে পড়েনি। অর্জুন ঘাড় নাড়তেই মেজর ছুটে গিয়ে গাছটাকে ঝাঁকাতে লাগলেন। আর এই সময় প্রচণ্ড শব্দ করে একটা কালো পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল পাশের হাইওয়েতে। চটপট দুটো পুলিশ অফিসার নেমে পড়ল, “এই যে কী করছ তোমরা? এদিকে এসো। কে তোমরা? ধান্দাটা কী বলো?” ওরা এগিয়ে এল কাছে।

মেজর তেমন পাত্তা না দিয়ে হাত তুলে ওপরের ডালটা দেখালেন, “আমার কলমটা ওখানে?” অফিসার দুজন মুখ তুলে কিছু না দেখতে পেয়ে নিজেদের মধ্যে ইশারায় কথা বললেন। তারপর একজন জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী বললে? কলম?”

গাছ ঝাঁকাতে-ঝাঁকাতে মেজর বললেন, “ঠিকই শুনেছ। কলম।

দ্বিতীয় অফিসার হুকুমের ভঙ্গিতে বলল, “অ্যাই, উঠে এসো। তোমাদের থানায় যেতে হবে।” মেজর তখন হতাশ চোখে ওপরের দিকে তাকাচ্ছেন। এত ঝাঁকুনিতেও কলমটা পড়ছে না। মুখ নামিয়ে খিঁচিয়ে উঠলেন, “মামার বাড়ি আর কি! কোনও অপরাধ করিনি আর থানায় নিয়ে যাবেন! কার পাকা ধানে আমরা ম‍ই দিয়েছি হে?”

“হাইওয়ের পাশে নেমে যাওয়া বেআইনি। তার ওপর কোনও মতলবে গাছ ঝাঁকাচ্ছ তাও জানতে হবে। একটু আগে তোমার মতো একটা লোককে…। অফিসার থেমে গেল, কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে কলমটা নেমে এল। সোজা মেজরের কাঁধে লেগে ছিটকে পড়ল অর্জুনের সামনে। মেজর ‘পেয়েছি’ বলে চিৎকার করে কয়েক পা লাফিয়ে এসে ওটাকে তুলে নিলেন। তাঁর মুখে এবার খুশি। একবার কাঁধটা হাতের টোকায় ঝেড়ে নিয়ে বললেন, “ভাবো অর্জুন, কলমটা মুখ-খোলা অবস্থায় ওপর থেকে এখানে পড়েছিল। ওঃ। এতক্ষণে সব শেষ। জীবন বড় ছোট হে। চলো, অনেক দেরি হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় অফিসারটি দ্রুত এগিয়ে এলেন কাছে। তারপর মুখ লাল করে বললেন, “দেখি কী জিনিসের বাহানা করছিলে?”

মেজর সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় নাড়লেন, “না। এটা দেওয়া যাবে না।”

“যখন আইন কিছু দেখতে চায় তখন তুমি দেখাতে বাধ্য।” অফিসার তার কোমরের রিভলভারে হাত দিল। মেজর অর্জুনের দিকে তাকালেন। প্ৰথম অফিসারটি ওপর থেকে চিৎকার করল, “বব, ব্রিং দ্যাট পেন। মনে হচ্ছে ওর ভেতর কোনও রহস্য আছে।”

কলমটা হাতে নিয়ে দু-একবার উলটে-পালটে দেখে অফিসার ওদের ইঙ্গিত করল অনুসরণ করতে। অর্জুনের হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছিল। এর মধ্যে তার নজরে এসেছে, যে-আঙুলে কলমটাকে ধরেছে অফিসার, তার ওপরে সদ্য শুকিয়ে-আসা একটা ক্ষতের দাগ। যদি নিব ওখানে লাগে অথবা কলমে লিক থাকে ত হলে আর দেখতে হবে না। এই সময় মিসেস গ্রান্ট গাড়িটা নিয়ে পিছিয়ে এলেন, “কী হল আপনাদের? কলমটা পেলেন?”

অফিসার জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডামের পরিচয়?”

মিসেস গ্রান্ট নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “এঁরা আমার বন্ধু।”

“হতে পারেন। কিন্তু এঁদের আমরা থানায় নিয়ে যাচ্ছি।”

মিসেস গ্রান্টের কোনও কথাই ওরা শুনল না। পুলিশের গাড়ির বদলে অবশ্য মিসেস গ্রান্টের গাড়িতে ওদের উঠতে দেওয়া হল। মিসেস গ্রান্ট কালো গাড়িটাকে অনুসরণ করলেন। মেজর খুব উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মিসেস গ্রান্ট, হাইওয়ে থেকে নেমে আমরা কি কোনও অন্যায় করেছি বলে মনে হচ্ছে আপনার?”

মিসেস গ্রান্ট মাথা নাড়লেন, “মোটেই না। তবে ওরা আপনাকে গাছ ঝাঁকাতে দেখে হয়তো সন্দেহ করেছে।

“সন্দেহ? কিসের সন্দেহ! ইংল্যান্ডে গণতন্ত্রের, মানুষের স্বাধীনতার সম্মান দেওয়া হয় বলে এতদিন জানতাম। এ যে দেখছি ফ্যাসিস্ট সরকারের চেহারা।” মেজর হুঙ্কার ছাড়লেন। মিসেস গ্রান্ট বোঝাবার চেষ্টা করলেন, “কোথাও কোনও ভুল হয়েছে। একটু অপেক্ষা করুন, দেখাই যাক না কী বলেন ওঁরা!”

“আমাদের সময়ের কোনও দাম নেই? কী ভেবেছে ওরা? আমরা ক্ষতিপূরণ চাইব। মেজর বিড়বিড় করলেন। কিন্তু অর্জুনের চোখে তখন অফিসারের আঙুলের শুকনো ক্ষত ভাসছিল। র‍্যাটল স্নেকের বিষ যদি ওখানে লাগে! সে নিচু গলায় মেজরকে সে-কথা বলতেই তিনি সোজা হয়ে বসলেন। তারপর বাংলায় বললেন, “তুমি শুকনো ক্ষত দেখেছ?”

অর্জুন মাথা নাড়ল। মেজর বললেন, “আমাদের উচিত এখনই লোকটাকে সতর্ক করে দেওয়া।”

“কিন্তু কলমের মধ্যে বিষ আছে জানতে পারলে ওদের সন্দেহ আরও বেড়ে যাবে।” অর্জুন জানাল।

“বেড়ে যাবে? জেল হয়ে যাবে হে। যদি বলি কলমটা আমার অস্ত্র, তা হলে ওটা বেআইনি অস্ত্র। কোনও লাইসেন্স নেই। যদি বলি, র‍্যাটল স্নেকের বিষ রেখেছিলাম শখে পড়ে, তা হলে জিজ্ঞাসা করবে এয়ারপোর্টে ডিক্লেয়ার করেছিলাম কি না? উত্তর শুনে সঙ্গে-সঙ্গে জেলে পাঠিয়ে দেবে আমাকে। মেজর অত্যন্ত বিষণ্ণ গলায় কথাগুলো বলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। যেহেতু কথাবার্তা বাংলায় হচ্ছিল, তাই মিসেস গ্রান্টের পক্ষে মানে বোঝা সম্ভব নয়। তিনি এবার মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “আমি সত্যি খুব দুঃখিত। আপনার সঙ্গে টিকটিকির রসিকতা না করলে এমন ফ্যাসাদে পড়তে হত না।”

এটা সম্ভবত মেজরের মনের কথা, তাই তিনি কোনও প্রতিবাদ করলেন না। পুলিশের গাড়িটার নির্দেশ অনুসরণ করে ওরা শেষ পর্যন্ত পুলিশ-স্টেশনে পৌঁছে গেল। অর্জুন দেখল লোকটা এখনও মরেনি, তবে কলমটা হাতেই ধরে রেখেছে। ওই কলম খুলে লিখতে গেলে কাগজে কীরকম দাগ পড়বে? বিষের রং তো নীল হয়। তা হলে নীলচে লেখা ফুটবে?

ওদের থানার ভেতরে নিয়ে আসা হল। জলপাইগুড়ির থানার তুলনায় একে তো হোটেল-হোটেল মনে হচ্ছে। বাইরের বোর্ডে প্রচুর ছবি টাঙানো। ওপরে ‘ওয়ান্টেড’ লেখা। অফিসার-ইন-চার্জ-এর টেবিলে পৌঁছে দেখল রোগা, লম্বা এক ভদ্রলোক বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। কলমটা তাঁর সামনে রেখে পেট্রল-কারের অফিসার অভিযোগ পেশ করল, “সার, এই লোকটিকে লক্ষ করুন। তিন নম্বর হাইওয়ের পাশে একটা গাছ ঝাঁকাচ্ছিল গাড়ি থেকে নেমে। আমরা চার্জ করতে অজুহাত দিল ও নাকি এই কলমটাকে খুঁজছিল।”

অফিসার-ইন-চার্জ নির্লিপ্ত মুখে কলমটাকে দেখলেন, “এর মধ্যে কী আছে? হিরে না ড্রাগ?”

মেজর বললেন, “নাথিং। এটা একটা কলম। আর আমরা রেসপেক্টেবল ট্যুরিস্ট।”

“শো মি ইওর আইডি।” ভদ্রলোক হাত বাড়ালেন।

মেজর পকেট থেকে তাঁর পাশপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক অভিযাত্রী সঙ্ঘের কার্ড বের করে দেখালেন। সেটাকে উলটে-পালটে দেখে অফিসার-ইন-চার্জ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি গাছে কলম খোঁজার অভিযান করেন। ইনি কী করেন?” প্রশ্নটি অর্জুনকে দেখিয়ে। অর্জুন তার পাশপোর্ট বের করে টেবিলে রাখতেই মেজর যোগ করলেন, “ও খুব প্রতিভাবান প্রাইভেট ডিটেকটিভ।”

বাঁ হাত দিয়ে পাশপোর্টগুলো ঠেলে দিয়ে অফিসার-ইন-চার্জ বললেন, “এইসব ফালতু লোককে আমি আমার এলাকায় দেখতে চাই না। প্রাইভেট ডিটেকটিভ! তা হলে আমরা আছি কী করতে!”

তারপর তিনি কলমটা তুলে নিলেন। অর্জুনের বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগল। এই সময় মিসেস গ্রান্ট বললেন, “স্যার, আমি এই দেশের একজন নাগরিক, খবরের কাগজে আমার নাম ছাপা হয়। আমি বলছি এরা নির্দোষ এবং আমার বন্ধু।”

ততক্ষণে কলমটা খুলে ফেলেছেন ভদ্রলোক। অর্জুন দেখল সাধারণ চেহারার নিবওয়ালা কলম। তবে নিব পয়েন্টেড। একটা কাগজ টেনে নিয়ে অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, “মহাশয়ার পরিচয়?”

মিসেস গ্রান্ট যখন পরিচয় দিচ্ছেন, তখন কাগজে ফ্যাকাসে একটা রেখা তুলল নিব। পরিচয়টা শুনে মুখ তুললেন অফিসার-ইন-চার্জ, “ওঃ, আপনার নাম আমি শুনেছি। কিন্তু আপনি কী বলতে চান জানি না। খামোখা একটা বাজে কলমের জন্যে কেউ গাছ ঝাঁকায়?”

মিসেস গ্রান্ট বললেন, “কম দামি কখনও কারও প্রিয় হতে পারে। একটু ঝাঁকিয়ে নিন।” অফিসার-ইন-চার্জ মেঝেতে কলমটা ঝাঁকালেন। অর্জুনের মনে হল জলীয় কিছু ছিটকে পড়ল নীচে। সে মেজরের মুখের দিকে তাকাল। দাড়ি-গোঁফ থাকা সত্ত্বেও সেই মুখে যেন সন্তান-হারানোর বেদনার ছাপ। আমাজনের তীর থেকে সংগ্রহ করা বিষের কী দুর্দশা। অফিসার-ইন-চার্জ আবার লিখতে গেলে দাগ ফুটল না। রেগেমেগে কলমের মুখটা বন্ধ করে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন তিনি জানলা দিয়ে বাইরে। সঙ্গে-সঙ্গে মেজর উঠতে যাচ্ছিলেন। অর্জুন দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর পাশে। চটপট সে মেজরের হাত আঁকড়ে ধরতেই ভদ্রলোক কোনওমতে নিজেকে স্থির করলেন। অফিসার-ইন-চার্জ মিসেস গ্রান্টের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার দুই বন্ধুকে তাড়াতাড়ি দেশে ফেরত পাঠান। একবার ইংল্যান্ডে এলে তো কোনও ভারতীয় ফিরতে চায় না। এরা ক্রমশ বদলা নিতে ইংল্যান্ডকেই দখল করে নেবে। এই পেট্রল-কারের অফিসার এগিয়ে এসে ভদ্রলোকের কানে ফিসফিস করে কিছু বলতেই তিনি সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোখ এবার মেজরের ওপর। কিছুক্ষণ দেখার পর মাথা দুলতে লাগল, হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তিনি হাতের ইশারা করলেন মেজরকে, “ইউ ফলো মি।”

ব্যাপারটা এমন নাটকীয় যে, মেজর খুব ঘাবড়ে গেলেন। অর্জুনের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে তিনি উঠে দাঁড়াতেই অর্জুন বলল, “চলুন, আমিও সঙ্গে যাচ্ছি।”

ওরা এগিয়ে যেতেই আর-একজন অফিসার মিসেস গ্রান্টদের হাত তুলে অপেক্ষা করতে বললেন। ঘর থেকে বেরিয়ে এক সরু প্যাসেজ দিয়ে কিছুটা হেঁটে মাঝারি ঘরের সামনে ওরা পৌঁছে গেল অফিসার-ইন-চার্জের পেছনে-পেছন। ঘরটার দরজায় তালাচাবি লাগানো। দরজার ওপরে একটা চৌকো খোপ, তাতে শিক লাগানো। সেখানে মুখ লাগিয়ে অফিসার-ইন-চার্জ জড়ানো ইংরেজিতে ধমকালেন। অর্জুনের মনে হল, তিনি যেন কাউকে ডাকলেন। একটু বাদেই মিস্টার ব্রাউনের মুখ সেখানে দেখা গেল। কপালে শুধু একটা প্লাস্টার সাঁটা। ওদের দেখে খুব রেগে গেল লোকটা। আচমকা চিৎকার করে উঠল, “ইউ, ইউ, ফর ইউ দে হ্যাভ ডান দিস।”

অর্জুন ব্রাউনকে লকআপে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ব্রাউন যখন খুব উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বলছিল, তখন শিকের ফাঁক গলে থুতু এসে ছিটকে লাগল মেজরের মুখে। সঙ্গে-সঙ্গে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “কী! এত বড় স্পর্ধা! তুমি…তুমি থুতু ছিটোলে?”

“অ্যাঁ?” ব্রাউন চোখ পিটপিট করল, “আমি থুতু ছিটিয়েছি? কী মিথ্যুক লোক এটা?”

অর্জুনের হাসি পেয়ে গেল। দুটো মুখ দেখতে অবিকল একরকম। যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেজর কথা বলছেন। আর এইরকম উত্তেজনার মুহূর্তে মেজরকে দেখলে টিনটিন কমিকসের ক্যাপ্টেন হ্যাডকের কথা মনে আসে চট করে। হঠাৎ মেজর পরিষ্কার বাংলায় তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই উজবুকটা আমাকে অপমান করছে আর তুমি হাসছ অর্জুন?”

অফিসার-ইন-চার্জ হাত তুললেন, “তুমি এদের চেনো?”

ব্রাউন বলল, “দেখেছি। আমার বউয়ের হোটেলে ছিল। ওই ছেলেটা খুব ভাল। ওর সামনে থেকেই লোকগুলো আমাকে ইলোপ করেছিল। জিজ্ঞাসা করে দেখুন।”

“বাট হোয়াই? তুমি এমন কোনও ডিউক নও যে, তোমাকে কেউ ইলোপ করতে যাবে?”

“আমাকে করেছিল নাকি? ওই দেড়েলটাকে করতে গিয়ে আমাকে ভুল করে নিয়ে গিয়েছিল।”

“এ যা বলছে তা সত্যি জেন্টলম্যান?” অফিসার-ইন-চার্জ প্রশ্ন করলেন অর্জুনকে।

অর্জুন ধীরে-ধীরে মাথা নাড়তেই তিনি আবার ওঁকে অনুসরণ করতে বলে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। চেয়ারে বসে প্যাডের কাগজটা ছিঁড়ে দুটো ভাঁজ করে নৌকো বানাতে-বানাতে জিজ্ঞেস করলেন, “নাউ, তোমরা আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছ। পুরো ঘটনা খুলে বলো।”

মিসেস গ্রান্ট চুপচাপ বসে ছিলেন সেখানে। ভদ্রলোক যেভাবে কাগজ ভাঁজ করছেন, তাতে বুকের ধুকপুকুনি শুরু হয়ে গেল অর্জুনের। র‍্যাটল স্নেকের বিষ এত তীব্র যে, শুকনো অবস্থাতেও হাতে লেগে গেলে এবং সেই হাত জিভে ঠেকলে একই প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে শুনেছে সে। ওই কাগজে লেখার চেষ্টার সময় কি বিষ লেগে যায়নি? সে যতটা সম্ভব গল্পটা শোনাল। মিসেস গ্রান্টের গাড়িটাকে অ্যাকসিডেন্ট করতে দেখে তারা হাসপাতালে গিয়েছিল। সেখানে যে শুয়ে ছিল, তাকে দেখতে এই ভদ্রমহিলার মতো নয় বলে সন্দেহ হতে সে আর মেজর ব্ল্যাকপুলে ফিরে এসেছিল। এসে জেনেছে মিসেস গ্রান্টের গাড়িটা চুরি গেছে কিন্তু তাঁর কিছু হয়নি। সেই রাত্রে হোটেলে কিছু সন্দেহজনক লোককে দ্যাখে তারা। এবং এই ঘটনাটা জেনে গেছে বলে একদল লোক তাদের মুখ বন্ধ করতে চায় বলে সন্দেহ হয়েছিল। তারাই ব্রাউনকে মেজর বলে সন্দেহ করেছিল।

ঘটনাটা শুনে অফিসার-ইন-চার্জ জিজ্ঞেস করলেন, “এত ঘটনা পুলিশকে রিপোর্ট করেননি কেন?”

এবার মিসেস গ্রান্ট কথা বললেন, “ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখার জন্যে আমি ওঁদের রিপোর্ট নিয়ে ওই হাসপাতালে যাচ্ছিলাম।

অফিসার-ইন-চার্জ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবলেন, “ব্রাউনকে কিছুক্ষণ আগে আমরা ওই হাইওয়ের পাশে পেয়েছিলাম। ও অজ্ঞান হয়েছিল। একই গল্প শুনিয়েছে সে, অবশ্য প্রথমটা বলেনি জানত না বলে। কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না আপনার গাড়ি চুরি করে অ্যাকসিডেন্ট করিয়ে তার কী লাভ। অফিসার উঠে দাঁড়ালেন, “চলুন, আপনাদের নিয়ে ওই হাসপাতালে যাই। দেখি কে সত্যি বলছে।”

ওরা বাইরে বেরিয়ে এল। অফিসার নিজের গাড়ির দিকে যেতেই মেজর ছুটে চলে গেলেন জানলার নীচে। পড়ে থাকা কলমটিকে তুলে তৃপ্তির হাসি হাসলেন। তাই দেখে অফিসার মন্তব্য করলেন, “মনে হচ্ছে ওই বস্তুটির সঙ্গে আপনার কোনও স্মৃতি জড়িয়ে আছে।”

মেজর মাথা নাড়লেন, “অব কোর্স। আমাজন, আমাজন।” আর তখনই ঘরের ভেতর থেকে একটা সেপাই বারান্দায় বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলল, “অফিসার, আমাদের বেড়ালটা এই ঘরে এসে আচমকা মরে গেল।”

গাড়ি থেকে মুখ বার করে অফিসার-ইন-চার্জ ধমকে উঠলেন, “ফালতু কথা, বেড়াল আচমকা মরে নাকি!”

মেজর সঙ্গে-সঙ্গে কলমটা আঁকড়ে ধরলেন।

মৃত বেড়ালটাকে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা সেপাই। তাই দেখে অফিসার-ইন-চার্জ গাড়ি থেকে যেন ছিটকে দৌড়ে এলেন, “ও, মাই গড! হু কিলড্ হিম?” বেড়ালটাকে হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখলেন তিনি, “উন্ড-এর কোনও চিহ্ন নেই। কী ঘটেছিল ঠিকঠাক বলো তো?”

সেপাইটা বলল, “বেড়ালটাকে ঘরে ঢুকতে দেখেছিলাম। তারপর আর খেয়াল করিনি। হঠাৎ দেখলাম, পড়ে গিয়ে উলটে গেল। ডেড।”

“কোনখানটায়?” অফিসার-ইন-চার্জ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। “আপনার টেবিলের ঠিক পাশে।

বেড়ালটা ফেরত দিয়ে অফিসার-ইন-চার্জ বিড়বিড় করলেন, “বেড়ালও কি হার্টফেল করে? উঃ, আজ সকালে থেকে একটার-পর-একটা বেয়াড়া ব্যাপার হচ্ছে। ভাল করে এর সমাধির ব্যবস্থা করবে, বুঝলে। মন খুব খারাপ হয়ে গেল হে।”

মেজর এতক্ষণ অর্জুনের পাশে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে শুনছিলেন কথাগুলো। তাঁর বাঁ হাত সমানে বুকপকেটের কলমটাকে আঁকড়ে রয়েছে। একফাঁকে ফিসফিসিয়ে বললেন, “বরাত ভাল, তাই বেড়ালের ওপর দিয়ে ফাঁড়াটা গেল। আহা, অবোধ প্রাণীটা শহিদ হল।”

অফিসার-ইন-চার্জ সবাইকে ইশারা করে গাড়ির দিকে যেতে-যেতে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারকে হুকুম দিলেন, “ব্রাউনটাকে বের করে আনো তো! ওকেও সঙ্গে নিয়ে যাই।”

ব্রাউনকে হঠাৎ কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অর্জুন বুঝতে পারছিল না। মিসেস গ্রান্টের দিকে তাকিয়ে মনে হল, ভদ্রমহিলা ইতিমধ্যে বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। মেজরের সঙ্গেও আলোচনা করে কোনও লাভ হবে না। কিন্তু মেজরই বললেন, “ওই ফেরেব্বাজ লোকটাকে খামোখা লক-আপ থেকে কেন বের করল বলো তো? ঠিক তোমার মতো দেখতে আর-একটা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে ভাবতে পারো?”

অর্জুন কোনও জবাব দিল না। গাড়ি চলছে হাইওয়ে দিয়ে পুলিশ-কারকে অনুসরণ করে। বিপরীতমুখী গাড়ির ভিড় এখন বেড়েছে। কেউ-কেউ ক্যারিয়ারে নৌকা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যারাভান চোখে পড়ল কয়েকটা। রাস্তার পাশে লেখা রয়েছে, এদিকে বাঁক নিলে রেস্টুরেন্ট এবং পেট্রল-পাম্প পাবেন। এর খানিকবাদেই হাসপাতালের চিহ্নটা দেখতে পাওয়া গেল। পুলিশের গাড়িটা সেদিকে বাঁক নিতেই ওরাও হাইওয়ে ছেড়ে নেমে এল।

গাড়ি থেকে নেমে একজন অফিসার ছুটে গেল ভেতরে। অফিসার-ইন-চার্জ টেলিফোন তুলে গাড়িতে বসেই কারও সঙ্গে কথা সেরে নিলেন। ব্রাউন পেছনে চুপচাপ বসে। টেলিফোন নামিয়ে অফিসার-ইন-চার্জ বললেন, “এটা আমার জুরিসডিকশনে নয়। তোমাদের, মানে উনি যদি সত্যিকারের মিসেস গ্রান্ট হন, তবে ওঁকে লোকাল থানায় যেতে হবে। তার আগে আমার…।”

অফিসার-ইন-চার্জের কথা শেষ হবার আগেই সেই অফিসারটি ফিরে এল। এসে জানাল, “যার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, তাকে দেখতে হলে মর্গে যেতে হবে। বেচারা বেঁচে নেই।”

অফিসার-ইন-চার্জ বললেন, “এইমাত্র লোকাল থানা বলল সেই কথা। লেটস গো।”

জলপাইগুড়ির মর্গের ধারেকাছে গেলেই গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত উঠে আসবে পেটে থাকলে। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে পা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না অর্জুনের। মৃতা মহিলাটিকে দেখে তার কী লাভ? কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছিল না সে। অথচ যে-ঘরটায় তারা পৌঁছল তাকে মর্গ বলে কিছুতেই মনে হচ্ছিল না। ছিমছাম সুন্দর একটা কাচের এপাশে ওরা দাঁড়িয়ে। ওপাশে নম্বর-লেখা লকারের মতো ট্রে রয়েছে ঠাণ্ডা ঘরে। মর্গের ইন-চার্জ অফিসারের নির্দেশে বোতাম টিপতেই সেই ট্রে বেরিয়ে এল, যাতে মিসেস গ্রান্টের গাড়ি-চোর শুয়ে আছে। অফিসার-ইন-চার্জ তার সঙ্গীর দিকে তাকালেন। লোকটা চিনতে না পারার ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল। এবার তিনি মিসেস গ্রান্টকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি একে কখনও দেখেছেন?”

যদিও কোনও গন্ধ নেই এবং শায়িতা মেয়েটির মাথায় সুন্দর ব্যান্ডেজ করা, তবু মিসেস গ্রান্ট নাকে রুমাল চেপে রেখেছিলেন। সে অবস্থায় তিনি মাথা নেড়ে না বললেন। অর্জুন দেখল, মেয়েটির বয়স বেশি নয় এবং ঠোঁটের ওপরে একটা জঙুল আছে। এই সময় পেছন থেকে ব্রাউনের গলা ভেসে এল, “ও মাই গড।”

অফিসার-ইন-চার্জ ঘুরে দাঁড়ালেন, “ইয়েস? সামনে এগিয়ে এসো ব্রাউন। ডু ইউ নো হার?”

চোখ গোল করে ব্রাউন এগিয়ে এল কাচের দেওয়ালের সামনে। তারপর ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। অফিসার-ইন-চার্জ খুশি হলেন, যেন এই উদ্দেশ্যেই তিনি ব্রাউনকে লক-কাপ থেকে বের করে এনেছেন এই ভঙ্গিতে অন্য অফিসারকে নড করে ব্রাউনের কাঁধে হাত রাখলেন, “হু ইজ শি?”

ব্রাউন জিভ চাটল। নিশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “হার নেম ইজ স্ট্রেঞ্জি। আই মেট হার টোয়াইস।

“কোথায় ব্রাউন? বলে ফ্যালো চটপট।”

“একবার ম্যাঞ্চেস্টারে আর একবার এই দু’দিন আগে ব্ল্যাকপুলে।”

“কী করত ও?”

“যোগাযোগ।”

“কী ধরনের যোগাযোগ?”

“আমি ঠিক জানি না। দিব্যি করে বলছি। ও অনেক ওপরের ডালের পাখি ছিল।”

“ব্ল্যাকপুলে ওকে কার সঙ্গে দেখেছ?”

“ও একটা জিপে করে যাচ্ছিল। জিপের ড্রাইভারকে আমি চিনি না। ওকে দেখে আমার খুব আগ্রহ হয়। আমার কাছে একটাও পাউন্ড ছিল না, নইলে ট্যাকসি নিয়ে ফলো করতাম।”

ব্রাউনের কথা শেষ হতেই মর্গের কেয়ারটেকারকে ট্রে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবার ইঙ্গিত করে অফিসার-ইন-চার্জ ঘুরে দাঁড়ালেন, “লুক ব্রাউন। তোমার বিরুদ্ধে আপাতত আমার কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু তোমাকে দেখেই আমি গন্ধ পেয়েছিলাম, যা আমি অপরাধীদের গায়ে পেয়ে থাকি। তোমার কি খুব শখ হচ্ছে এখানকার কোনও খালি ট্রেতে শুয়ে পড়তে?”

“ও, নো।” ব্রাউন দ্রুত মাথা নাড়ল।

তোমার সম্পর্কে আমি জানতে পেরেছি কিছু জালিয়াতি আর জুয়ো খেলে পয়সা উড়িয়ে দেওয়া ছাড়া তেমন কোনও বড় কুকর্ম এখনও করোনি। অতএব ওই ট্রে’তে যদি শুতে না চাও তা হলে সত্যি কথাটা গুছিয়ে বলো।” বুকের ওপর দু’হাত ভাঁজ করলেন অফিসার-ইন-চার্জ।

ব্রাউন ঠোঁট চাটল। এটা সম্ভবত লোকটার মুদ্রাদোষ। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি এই হতচ্ছাড়া জায়গাটা থেকে বেরিয়ে যেতে পারি?”

মাথা নেড়ে অফিসার-ইন-চার্জ দলটাকে নিয়ে বাইরে এলেন। তারপর মিসেস গ্রান্টের দিকে তাকিয়ে বললেন, “গাড়িটাকে আপনি নিজে একবার শনাক্ত করে আসুন ম্যাডাম। ইনশিওরেন্স কোম্পানির সঙ্গে তো আপনাকেই কথাবার্তা বলতে হবে। লোকাল পুলিশ-স্টেশনে ওটা রাখা আছে। পরে যদি কোনও প্রয়োজন পড়ে তা হলে আমরাই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

মিসেস গ্রান্ট মেজরের দিকে তাকালেন। এখনও মেজরের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে তা বোঝেননি অফিসার-ইন-চার্জ। তিনি বললেন, “আপনি অফিসার, ইতিমধ্যে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমার বন্ধুদের অনেক দেরি করিয়ে দিয়েছেন। ওঁর সঙ্গে মিস্টার ব্রাউনের শুধু চেহারার মিল এবং উনি গাছ ঝাঁকাচ্ছিলেন এটা কোনওভাবেই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। উনি কি আমার সঙ্গে যেতে পারেন?”

“এক মিনিট!” বলেই অফিসার-ইন-চার্জ ব্রাউনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন, স্ট্রেঞ্জির পুরো নাম কী?”

“আমি জানি না অফিসার। লোকে ওকে ওই নামেই ডাকত। আসলে ও যাদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করত তারা অনেক গভীর জলের মাছ। আমার সাধ্য ছিল না ওর কাছে পৌঁছবার।” সরল গলায় বলল ব্রাউন।

“কাদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করত? নামগুলো বলো চটপট।

“একজনের নামই মনে আছে। কুঁজো-হ্যারিস। সাপের বিষের ব্যবসা করত সে।”

কথাটা শোনামাত্র মেজর আবার বুকপকেটে হাত দিলেন। অফিসার-ইন-চার্জ জিজ্ঞেস করলেন, “এই কুঁজো-হ্যারিসকে তুমি চিনলে কী করে?”

ব্রাউন হাসল। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাঠি বের করে দাঁতে চাপল, “ওকে সার ম্যাঞ্চেস্টারে সবাই চেনে। যারা সাপের বিষের ছোবল নিয়ে নেশা করে, তারা তো বেশি করে চেনে। ব্ল্যাকপুলে আমার যখন কিছু হল না তখন ম্যাঞ্চেস্টারে গিয়েছিলাম ভাগ্য ফেরাতে। কিন্তু পাত্তাই দিল না কেউ। তাই এবার ব্ল্যাকপুলে ফিরে এসে স্ট্রেঞ্জিকে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম আমি। মনে হল ওর সঙ্গে আলাপ জমাতে পারলে কাজের কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু পকেটে পয়সা ছিল না যে ফলো করব। তা ছাড়া জিপে কোনও মেয়ে বসে থাকলে আমার খুব অস্বস্তি হয়।”

“জিপটার মালিক কে তুমি জানো?”

“না। ব্ল্যাকপুলের কেউ নয়।”

এক মুহূর্ত ভাবলেন অফিসার, “ব্রাউন, তোমার কথায় যদি একটাও মিথ্যে থাকে, তা হলে একটা করে হাড় জমা রাখতে হবে তোমাকে। ওরা জিপে তুলে কী বলেছিল তোমাকে?”

ব্রাউন হাসল, “তিনবার বলেছি সার।” তারপরেই অফিসার-ইন-চার্জের মুখের দিকে তাকিয়ে চটপট গম্ভীর হয়ে গেল, “গাড়িতে তুলেই একজন আমার কোমরে নল ঠেকাল। চাপা গলায় বলল, চিৎকার করলেই পেট ফুটো করে দেবে। আর-এটা লোক ব্যস্ত হয়ে বলল, ছোকরাটাকে তুলে আনা হল না কিন্তু। ড্রাইভ যে করছিল সে বলল, ওকে নিয়ে মাথা ঘামাব কেন, এই সাহায্য করবে। তারপর ওরা আমাকে নিয়ে এল সমুদ্রের ধারে শহর ছাড়িয়ে। গাড়ি খামিয়ে লোকটা জিজ্ঞেস করল, আপনার পাশপোর্ট? আমি অবাক হয়ে বললাম, আমার কোনও পাশপোর্ট নেই। গলার স্বর শুনে সম্ভবত ড্রাইভারের সন্দেহ হল। সে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী? নাম বলতেই আমার দাড়ি ধরে টানল। আমি চিৎকার করে উঠতেই সে ছেড়ে দিয়ে আবার গাড়িতে উঠল। কোনও কথা না বলে হাইওয়েতে এসে এক ধাক্কায় আমাকে রাস্তার পাশে ফেলে দিতে বলল সঙ্গীদের। অন্য কেউ হলে মরে যেত। কিন্তু চলন্ত গাড়ি থেকে পড়েও আমি মরিনি একটু কায়দা জানার জন্যে। অবশ্য অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।”

অফিসার-ইন-চার্জ মৃদু হাসলেন, “নাঃ, তোমার স্মৃতিশক্তি দেখছি বেশ ভাল। প্রথমবারে যা বলেছ তা থেকে সরে আসোনি। কিন্তু স্ট্রেঞ্জি কেন মিসেস গ্রান্টের গাড়ি চুরি করতে গেলেন?”

“আমি জানি না সার। বিশ্বাস করুন।

ব্রাউনকে ছাড়া হল না। কিন্তু মেজরকে আর ঝামেলায় পড়তে হল না। অফিসার-ইন-চার্জ শুধু বললেন তিনি যেন যখনই প্রয়োজন বোধ করবেন তখনই মেজরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এই কারণে মেজর যেখানে থাকবেন তার কাছাকাছি পুলিশ-স্টেশনের সঙ্গে সপ্তাহে একদিন নিজের অস্তিত্ব জানিয়ে কথা বলেন। যাওয়ার আগে ব্রাউন নিচু গলায় অর্জুনকে বলল, “এরা আমাকে ফরনাথিং হ্যারাস করছে। কিন্তু ইয়ং ম্যান, তুমি সাবধানে থেকো। সাম হাউ তোমাকে আমার ভাল লেগে গেছে বলে সাবধান করে দিচ্ছি।”

মেজরের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল তাঁর মাথা থেকে এক আকাশ ওজন যেন নেমে গেল। তিনি হাইওয়ের দিকে ছুটে-যাওয়া পুলিশের গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“কী বিড়ম্বনা বলো তো। ঠিক বললাম তো, কথাটা বিড়ম্বনাই তো?”

এই পরিস্থিতিতে একটি বাংলা শব্দের ঠিক প্রয়োগ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতে পারে? মেজরের দিকে তাকিয়ে অর্জুনের মনে হল, মানুষটির মন সত্যি শিশুর মতন। কিন্তু ওঁর পকেট থেকে বিষকলম সরিয়ে ফেলা উচিত। আবার কোত্থেকে ওটাকে কেন্দ্র করে বিপদ ঘাড়ে এসে পড়ে তা কে জানে! চোখের সামনে সেই মৃত বেড়ালটা যেন ঝুলছে। কিন্তু কথাটা সরাসরি বললেও বিপদ।

লোকাল পুলিশ-স্টেশনটিও আগেরটির প্ৰতিচ্ছবি। তবে এর অফিসার-ইন-চার্জ বেশ খোলামেলা লোক। মিসেস গ্রান্টের পরিচয় পেয়ে ভদ্রলোক বললেন,

“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন যে, আপনি ওই গাড়িতে ছিলেন না।

গাড়িটা রয়েছে পুলিশ-স্টেশনের পেছনে একটা চালাঘরের নীচে। সেদিকে তাকিয়ে মিসেস গ্রান্ট গালে হাত রাখলেন। ওঁকে এখানে অনেক সময় কাটাতে হবে এখন। কীভাবে গাড়ি চুরি গেল, কখন জানতে পারলেন, পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন কি না থেকে শুরু করে ইনশিওরেন্স কোম্পানি পর্যন্ত হাজার প্রশ্নের উত্তর লিপিবদ্ধ করাতে হবে তাঁকে।

অর্জুন আর ভেতরে গেল না। পুলিশ-স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে মেজর বললেন, “বেলা তো পড়ে আসছে। এবারে মার্শালের ওখানে যাওয়ার বাস ধরলেই তো হয়!”

অর্জুনও তাই চাইছিল। কিন্তু ব্যাঙ্কের লকারে যে বস্তুটি আবিষ্কার করে এনেছেন মিসেস গ্রান্ট, সেটির হদিস না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে যাওয়া উচিত হবে না। মিসেস গ্রান্ট ছাড়া না পাওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতেই হবে। কিন্তু সেটা করতে হলে সন্ধে হয়ে যাবেই। তার চেয়ে এখানে কোনও থাকার জায়গা আছে কি না খুঁজে-পেতে দেখা দরকার।

সেটার সন্ধান পাওয়া গেল। একজন কনস্টেবল জানাল, হাইওয়ের মুখেই ডান হাতে একটা মোটেল আছে। তবে সেখানে খাবারদাবার পাওয়া যায় না। মেজর কনস্টেবলকে বললেন, “দয়া করে মিসেস গ্রান্টকে বলবেন একটু অপেক্ষা করতে। আমরা পাশের সুপার মার্কেট থেকে ঘুরে আসছি।

গাড়িতেই জিনিসপত্র রেখে ওরা খালি হাতে বের হল। চারপাশ ফাঁকা। শেষ বিকেলের আলোয় হাইওয়ে-ফেরত গাড়িগুলোকে দেখা যাচ্ছে। সুন্দর রাস্তায় দু-তিনজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়ল না। এমনকী, সুপার মার্কেট যেন ফাঁকা। বোস্টনের সুপার মার্কেটের সঙ্গে এর কোনও পার্থক্য নেই। মেজর চলে এলেন রেডিমেড খাবারের ব্লকে। অর্জুন ঘুরে-ঘুরে দেখছিল। ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের পারস্পরিক বিশ্বাস কতটা থাকলে এমন দোকান চালানো যায়। পশ্চিমবাংলায় এইরকম অভ্যাস তৈরি করতে অনেক সময় লাগবে। এবং এইসময় সে জিপটাকে দেখতে পেল। মূল রাস্তা ছেড়ে বাঁক নিয়ে সোজা সুপার মার্কেটের সামনে পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে পড়ল। জিপের দরজা খুলে দু’জন লোক দু’পাশ থেকে নামল। একজন স্বাস্থ্যবান, মাথায় টাক, অন্যজন দোহারা লম্বা এবং মাথায় বাঁকানো ব্যালকনি-টুপি। গাড়ির দরজা চাবি দিয়ে লোক দুটো এগিয়ে আসছিল সুপার মার্কেটের দিকে। দোহারা চেহারার লোকটার হাঁটার ভঙ্গি দেখে অর্জুন দৌড়তে লাগল। প্রসাধনের ব্লক পেরিয়ে, কাঁচা সবজি ডিঙিয়ে সে মেজরের সামনে পৌঁছে গেল। মেজর ততক্ষণে ঝুড়ি-ভর্তি করে নানান খাবারের প্যাকেট নিয়ে কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছিলেন। ওকে দেখামাত্র বললেন, “একটু দুধও নিয়ে নিলাম, বুঝলে। চকোলেট দেওয়া।

অর্জুন ওকে টেনে একটা সেলফের আড়ালে নিয়ে এল, “সেই জিপের মালিক আর তার সঙ্গী এই সুপার মার্কেটে ঢুকছে। আপনাকে ওরা চিনতে পারবেই। তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়তে হবে।”

“অ্যা! ওরা এখানে?” মেজর প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “লুকোব কী হে? ব্যাটাদের ধরে পুলিশের কাছে তুলে দিই চলো। কোথায় ওরা?”

অর্জুন মেজরের কনুই ধরল, “ওসব করতে যাবেন না। ওদের বিরুদ্ধে আমরা কোনও প্রমাণ দাখিল করতে পারব না। আপনি ওই পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। আপনার দাড়ির জন্যে ওরা আপনাকে সহজেই চিনতে পারবে। আমি এগুলো নিয়ে কাউন্টারের দিকে যাচ্ছি।”

মেজর প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অর্জুন কান দিল না। শেষপর্যন্ত মেজর বাঁ দিকে পা বাড়ালে সে ট্রলিটাকে ঠেলতে ঠেলতে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে চলল। হয়তো এটা অসময়, তাই সুপার মার্কেটে ক্রেতা হাতে গুনে পাওয়া যাবে। অর্জুন দেখতে পেল লোক দুটো পাশাপাশি এগিয়ে আসছে প্যাসেজ দিয়ে। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে সামনের সেল্ফ থেকে কুকুরের খাবারের টিন তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। লোক দুটো ওর মুখ দেখতে পাবে না সরাসরি। তাকে আমলও দিল না ওরা। সোজা এগিয়ে গিয়ে রেডিমেড খাবারের ব্লকে গিয়ে থামল। কুকুরের খাবারের টিনটা হাতে নিয়ে অর্জুন আড়চোখে দেখল, দোহারা চেহারার লোকটির হাতের ছড়ি বারংবার পায়ের পাশে মৃদু আঘাত করে যাচ্ছিল। তার নির্দেশে টাক-মাথা খাবার নিচ্ছে। অর্জুন আর দাঁড়াল না। কাউন্টারে দাম মিটিয়ে ট্রলি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার মুখে আড়চোখে সে দেখে নিল ওরা এখনও কাজ শেষ করেনি। এবং ওখান থেকেই সে মেজরকে দেখতে পেল। দূরে দাঁড়িয়ে তিনি হাত নাড়ছেন। ওরা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেই দেখতে পাবে ওঁকে। অর্জুন হাত নেড়ে মেজরকে সরে যেতে বলতেই তিনি যেন থতমত হয়ে দ্রুত এগিয়ে পার্কিং লটের দিকে চলে এলেন। অর্জুন দেখল, ও একেবারে উলটো বুঝলি রাম-এর অবস্থা।

সে ট্রলির ঝুড়ি থেকে প্যাকেটগুলো বের করে হনহনিয়ে চলে এল পার্কিং লটে। এখানে এখন দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সংখ্যা গোটা পনেরোর বেশি হবে না। সে চিৎকার করে মেজরকে বলল, “ওই ভ্যানটার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকুন। ওরা আসছে।”

ঘাড় ঘুরিয়ে অবশ্য এখনও ওদের বেরিয়ে আসতে দেখল না।

মেজর তার কথা শুনেছেন। অর্জুন দেখল একমাত্র ভ্যানটার পেছনে যাওয়া ছাড়া এখানে ওদের নজর এড়িয়ে থাকা যাবে না। প্যাকেটগুলো নিয়ে সে চলে এল জিপটার পাশে। কাচের জানলা দিয়ে তাকাতেই সে চমকে উঠল। পেছনের সিটের ওপর সেই সাপের ঝুড়িটা রয়ে গেছে। অথচ আজ সে গাড়ির কাছে পৌঁছনো সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র আওয়াজ করছে না প্রাণীগুলো। ওরা কি তবে ঝুড়ির মধ্যে নেই? অর্জুন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল লোক দুটো সুপার মার্কেটের দরজা দিয়ে বের হচ্ছে। সে চটপট জিপের পিছনে চলে এল। মাল রাখার একটা খোপ পেছনে রয়েছে যা এখন তালাবন্ধ। ওরা নিশ্চয়ই কিনে আনা জিনিসপত্র রাখতে গাড়ির পেছনে আসবে। অর্জুন ঘুরে ডান দিকের চাকার কাছে চলে এসে বাতাস বের হবার মুখটা প্রাণপণে খুলতে লাগল। শেষ মুখটা ঘুরবার আগেই সে ছিটকে সরে এল পাশের গাড়ির পিছনে। ওরা ততক্ষণে চলে এসেছে। দোহারা লোকটা জিপের পেছনে এসে জড়ানো গলায় কিছু বলতেই প্যাকেট হাতে লোকটা চাবি ঘোরাল। অর্জুন যে গাড়ির পাশে লুকিয়েছিল সেটা খুব নিচু। হাঁটু মুড়ে বসতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল। দোহারা লোকটা চারপাশে তাকিয়ে দেখছে। অর্জুন যথাসম্ভব নিজেকে লুকিয়ে মাঝে-মাঝে নজর রাখছিল। খোপের দরজা খুলে লোকটা একটা সুটকেস বের করে নীচে রেখে খাবারের প্যাকেটগুলো সেটার ভেতর ঢুকিয়ে আবার ঢাকনায় তালা লাগাল। তারপর ফিরে যাওয়ার সময় সুটকেস তুলতেই ওটা চওড়াভাবে অর্জুনের চোখের সামনে এক মুহূর্তের জন্যে দেখা দিয়েই সরে গেল। ওরা সুটকেসটা সিটের পাশে রেখে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অর্জুনের বুকের ভেতর তখন ড্রাম বাজছে। সুটকেসের ওপর স্পষ্ট লেখা দেখতে পেয়েছে, স্ট্রেঞ্জি। ওটা স্ট্রেঞ্জির সুটকেস! স্ট্রেঞ্জির সুটকেস এদের সঙ্গে কেন? শুধু এই কারণেই তো ওদের ফাঁসিয়ে দেওয়া যায়! চাকার মুখ ভাল করে খোলা হয়নি, নইলে গাড়িটা দাঁড়িয়ে যেত এতক্ষণে, আর এইসময় অর্জুন পিঠে কারও হাতের ছোঁয়া পেল। মেজর মনে করে মুখ ফেরাতেই লোকটা চোখ ছোট করে তাকাল, “হোয়াট হ্যাপেনড মাই ডিয়ার বয়? আমার এলাকায় কেউ নাক গলাক তা আমি একদম পছন্দ করি না যে।”

বেশ রোগা, চোয়াল-ভাঙা লোকটার পরনের কোটটায় বেশ কয়েকটা ফাটল, রংচটা প্যান্ট আর পায়ের জুতোর অবস্থা খুবই করুণ। কিন্তু ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গি এবং কথা বলার মধ্যে দিব্যি মাতব্বরি। অর্জুন উঠে দাঁড়াল, “আমি তো কারও এলাকায় কিছু করতে আসিনি!”

হঠাৎ লোকটা খিকখিক করে হেসে উঠল, “ইয়ার্কি। নিজের চোখে দেখলাম, গাড়ির চাকার হাওয়া লোপাট করছ। কিন্তু কেন? কারও জানলা খোলা থাকলে খিদে পেলে আমি এক-আধটা প্যাকেট তুলে নিই, কিন্তু চাকার হাওয়া খুললে কী লাভ হবে বুঝতে পারছি না। যাহোক, এবার কেটে পড়ো চাঁদ। খুব ভাগ্য যে, টায়ার ফেঁসে যায়নি, নইলে ড্রাইভারকে বলে দিতাম তোমার কীর্তির কথা।

“কেন বলতেন?” অর্জুনের বেশ মজা লাগছিল লোকটার কথা বলার ধরনে।

“বকশিশ দিত।” লোকটা হাত বাড়াল, “সিগারেট আছে?”

আর এই সময় মেজর চলে এলেন কাছে। লোকটা দেখে একটুও পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “চলে যেতে দিলে কেন? ধরে পুলিশে হ্যান্ডওভার করার সুযোগটা হাতছাড়া করা উচিত হয়নি।”

অর্জুন বলল, “কিছু করার ছিল না। ওরাই যে আমাদের পেছনে লেগেছে, তার কোনও প্রমাণ নেই। অন্তত এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। চলুন।” ওরা কথা বলছিল বাংলায়। চোয়াল-ভাঙা লোকটা জুলজুল করে দেখছিল ওদের, এবং কথাবার্তার অর্থ অবশ্যই বুঝতে পারছিল না। এবার ওদের চলতে দেখে এগিয়ে এল চটজলদি, “হেই জেন্টলমেন, অন্তত একটা পাউন্ড ছাড়ো।”

মেজর প্রায় মারমুখী হয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, “কে হে তুমি? তোমাকে খামোখা পাউন্ড দিতে যাব কেন? যাও, নিজের কাজ করো গিয়ে।”

লোকটা পাশে দাঁড়িয়ে খিকখিক করে হাসল আবার, “ওই লোক দুটোকে দেখে অমন চোরের মতো লুকিয়েছিলে কেন? ঠিক আছে। আমি পুলিশ-স্টেশনে যাচ্ছি। গিয়ে বলব, তোমরা কী করছিলে।”

মেজর লোকটাকে পাত্তা না দিয়ে অর্জুনের সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন। কিন্তু অর্জুনের মনে হল, এই উটকো ঝামেলার জন্য পুলিশ-অফিসাররা তাদের সন্দেহের চোখে দেখবেনই। সে একটু নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমার কথা পুলিশ-অফিসাররা শুনবে বলে মনে করো?”

লোকটা সঙ্গে-সঙ্গে মাথা নাড়ল, “তা শুনবে না। আমাকে তো ওখানে ঢুকতে দিতেই চায় না। তবু বলব। চেঁচিয়ে বলব, যাতে ওরা তোমাদের ব্যাপারটা জানতে পারে।”

পুলিশ-স্টেশনের সামনে মিসেস গ্রান্ট এবং তার বান্ধবী দাঁড়িয়ে আছেন। রোদ নেই, ছায়া আরও ঘন হয়েছে। অর্জুন মুখ ফিরিয়ে লোকটাকে বলল, ‘চেঁচিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে বলে পাউন্ড পাবে?”

সঙ্গে-সঙ্গে মাথা নাড়ল লোকটা, “না। পাব না।”

মেজর খিঁচিয়ে উঠলেন, “কেন ওর সঙ্গে কথা বলে মেজাজ খারাপ করছ?” অর্জুন হাসল, “না, মেজাজ খারাপ হবে কেন? আপনি মিসেস গ্রান্টদের সঙ্গে কথা বলুন। আজ রাত্রে আমরা এখানকার মোটেলেই থাকব। আমি আসছি।”

মেজর খুব বিরক্ত মুখে এগিয়ে গেলে অর্জুন লোকটাকে বলল, “আমরা চোর-বদমাশ নই। তুমি সত্যি পাউন্ড রোজগার করতে চাও? আমি কাউকে ভিক্ষে দিই না। তবে তুমি যদি কাজ করে দাও, তা হলে আমি তোমাকে দুটো পাউন্ড দিতে পারি।”

“কাজ! না, না, পরিশ্রম করা আমার দ্বারা চলবে না।”

“সেটা তোমার সমস্যা! বুঝতেই পারছ, চোর হলে আমরা পুলিশ-স্টেশনে আসতাম না। এখন তুমি বলার আগেই আমরা মিথ্যে বলে তোমায় বিপদে ফেলতে পারি।”

লোকটা ঠোঁট ওলটাল। “বিপদে কী ফেলবে? পুলিশ যদি ক’দিন লক-আপে রাখে, তা হলে তো আমারই মজা। খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। তা কাজের কথাটা কী বলছিলে?”

অর্জুন লোকটাকে ভাল করে লক্ষ করল। প্রচণ্ড সেয়ানা। কিন্তু দাগি অপরাধী নিশ্চয়ই নয়, নইলে এই পুলিশ-স্টেশন পর্যন্ত আসতে সাহস করত না। সে বলল, “তুমি তো তখন আমাদের লক্ষ করছিলে, কিন্তু গাড়িতে যারা মালপত্র তুলল তাদের ভাল করে দেখছ?”

“তা দেখব না? লম্বা লোকটাকে মনে নেই, তবে ওর সঙ্গীটা, ওকে ভুলব না। আমাকে যদি একটা ঘুসি মারে নির্ঘাত উড়ে যাব।” লোকটা চোখ বন্ধ করে বলল, “আর হ্যাঁ, গাড়িটাকেও মনে রেখেছি।

“ভাল। আমার মনে হচ্ছে ওরা আজ এই অঞ্চলেই থাকবে। কোথায় আছে খোঁজ নিয়ে যদি আমাকে জানাও, তা হলে দু’ পাউন্ড পাবে। আমরা এখানকার মোটেলে উঠছি।”

লোকটা সেই বিরক্তিকর খিকখিক হাসিটা হাসল। “হেই মিস্টার, তুমি আমাকে খাটিয়ে কেটে পড়ার মতলব করছ না? এখানে তিনটে মোটেল আছে। তার কোল্টায় তোমরা থাকবে?”

অর্জুন বিপাকে পড়ল, “এখনও ঠিক করিনি ভাই।”

লোকটা মুখ এগিয়ে আনল, “তা হলে তোমাকে একটা কথা বলি। ভুলেও জ্যাকের ওখানে উঠো না। ও আমার কাজিন। আসলে সম্পত্তিটা আমারই ছিল, ও নিয়ে নিয়েছে। আমার ঢোকা নিষেধ। এবার রইল ‘রিসর্ট’ আর ‘ভ্যালি ভিউ’। রিসর্টে বড়লোকেরা ওঠে। তোমরা বরং ভ্যালি ভিউতে উঠো। চারজন আছ তো! ঠিক আছে, আমি খবর দিয়ে রাখছি।”

“না, না, তোমাকে খবর দিতে হবে না।”

“আশ্চর্য! তুমি তো খুব বাজে লোক! খবর দিলে তোমরা যে ভাড়া দেবে, তার একটা কমিশন মোটেলের মালিক ম্যাস আমাকে দেবে। তোমাদের কী ক্ষতি হল?” লোকটা পিছু ফিরে কয়েক পা হেঁটে চিৎকার করল, “হেই ম্যান, তোমার নামটাই তো জানা হয়নি।”

“অৰ্জুন।”

“ও-ও—!” লোকটাকে হতাশ দেখাল। তারপর বলল, “ওই মোটকাটার নাম কী? তোমারটা আমি উচ্চারণ করতে পারছি না।’

“মেজর!” উত্তর দিয়ে অর্জুন হেসে ফেলল। লোকটা এবার খুশি হল, “দ্যাটস গুড।”

মিসেস গ্রান্ট চাইলেন সেদিনই বোল্টনে ফিরে যেতে। কারণ তার বান্ধবীর পক্ষে বিনা নোটিসে বাইরে রাত কাটানো সম্ভব নয়। পুলিশ-স্টেশনের ঝামেলা আপাতত মিটলেও ওঁকে হয়তো আবার এখানে আসতে হবে। গাড়ি নিয়ে খানিকটা এগিয়ে তিনি রাস্তার একপাশে সেটাকে দাঁড় করালেন। এখন ঘড়ি অনুযায়ী রাত নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ নেভানো আলোয় পৃথিবী দৃশ্যমান থাকে। মিসেস গ্রান্ট তাঁর ব্যাগের ভেতর থেকে ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে-আসা কাগজটা বের করলেন, “ইটস রিয়েলি ইন্টারেস্টিং। মনে হচ্ছে, একটা ম্যাপ এবং কিছু কোড লেখা আছে এতে। তোমরা কি ইন্টারেস্টড?”

অর্জুন হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল। খুব আগ্রহ নিয়ে সে চোখ রাখল মিসেস গ্রান্টের কপি করে নিয়ে আসা লেখাটার ওপর। মেজর নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তার পাশে বসে ছিলেন। এমনকী, কাগজটার দিকে তাকাচ্ছিলেনও না। কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে অর্জুন ভাঁজ করে কাগজটা বুক-পকেটে রাখল। মিসেস গ্রান্ট সামনের সিটে বসে ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, “তোমরা কি আজ ব্ল্যাকপুলে ফিরে যাবে?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “না, না। আমরা আর পিছু ফিরব কেন? এখানে রাতটা কাটিয়ে কাল সকালে মিস্টার মার্শালের ওখানে চলে যাব।

“তা হলে তোমাদের জন্যে একটা হোটেলের ব্যবস্থা করতে হয়।” গাড়ি চালু করলেন মিসেস গ্রান্ট।

অর্জুন তাঁকে চটপট জানিয়ে দিল, “হোটেল নয়, মোটেল।

আসলে সে মোটেলে কোনওদিন থাকেনি। হোটেল এবং মোটেলের পার্থক্য নিজের চোখে দেখাও হয়নি। ভারতবর্ষে মোটেল বলে কোনও থাকার জায়গা চালু আছে কি না তাও তার জানা নেই। সে মিসেস গ্রান্টকে বলল, “এখানে তিনটে মোটেল আছে। আপনি ভ্যালি ভিউ-তে চলুন।”

এবার মেজর নড়েচড়ে বসলেন, “আরে! তুমি নাম জানলে কী করে?” অর্জুন হাসল, “জেনে ফেলেছি।”

মিসেস গ্রান্টের বান্ধবী বেশির ভাগ সময় চুপ করে থাকেন। এবার তাঁর বন্ধুকে বললেন, “শুনেছি এখানে একটা ভাল জায়গা আছে রিসর্ট নামে।”

অর্জুন বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু আমার মনে হয় ভ্যালি ভিউতে থাকাটাই সুবিধেজনক।” পথের পাশে লাগানো বোর্ডে চিহ্ন দেওয়া আছে আশেপাশে কী পাওয়া যাবে। কাউকে জিজ্ঞেস না করেই সেই চিহ্ন দেখে মিসেস গ্রান্টের গাড়ি এসে থামল ভ্যালি ভিউ মোটেলের সামনে। একটা ছোট লন, কিছু গাড়ি এবং দুটো ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। পেছনে একতলা আউট হাউস গোছের বাড়ি। ওপরে লেখা, ‘মোটেল ভ্যালি ভিউ’।

জিনিসপত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলে মিসেস গ্রান্ট বললেন, “আমি কাল সকাল ছ’টায় টেলিফোন করব। যদি কোনও সমস্যা হয় তা হলে আমাকে সঙ্গে-সঙ্গে জানাবে।” বলতে-বলতে তিনি ব্যাগ খুললেন, “ মেজর, আমার শুভেচ্ছার নিদর্শন তোমার বুকে রেখে দিও।”

অর্জুন দেখল, একটা লাল গোলাপ ভদ্রমহিলা মেজরকে দিলেন ব্যাগ থেকে বের করে। গাড়িটা চলে গেলে ওরা জিনিসপত্র নিয়ে মোটেলের অফিস-রুমে চলে এল। অর্জুন দেখল মেজর বারংবার গোলাপের ঘ্রাণ নিয়ে বলছেন, ‘বিউটিফুল’।

এই সময় একটা লোক হাহা করে হেসে উঠল। অফিসঘরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বিশাল চেহারার লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল। লাল গেঞ্জি, হাতে নানান উলকি। লোকটা হাসি থামিয়ে বলল, “হেই মিস্টার, প্যাকেটের বাইরে গন্ধ পাচ্ছ? দিনদুপুরে আর-একটা মাতাল এল।” মেজর খুব খেপে গেলেন, “কী, আমি মাতাল? আমাকে মাতাল মনে হচ্ছে?”

এইরকম গায়ে পড়া রসিকতায় অর্জুনও বিরক্ত হয়েছিল। কিন্তু মেজরের দিকে তাকিয়ে সে অবাক। এতক্ষণ মেজরের হাতে যা গোলাপ বলে মনে হচ্ছিল, তা লাল মোড়কের চকোলেটে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। এবং তখন মেজরও সত্যিটাকে আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অত্যন্ত অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তিনি অর্জুনকে বললেন, “যাওয়ার আগে এই ম্যাজিক-রসিকতা করে গেল? হাইওয়েতে শিক্ষা হয়নি। কিন্তু তুমি বুঝতে পেরেছিলে এটা ফুল নয়?” অর্জুন মাথা নাড়ল।

হোটেলের চেয়ে বেশ শস্তা। ওই উলকি-পরা লোকটাই ম্যানেজার। খাতায় নামটাম লিখে দেওয়াল থেকে একটা চাবি বের করে মেজরের সামনে রেখে সে বলল, “চারজন ইন্ডিয়ানের আসার কথা ছিল। যার একজনের নাম মেজর। দু’জন কমে গেল কেন? আমি ফোর-বেডেড রুম রেখেছিলাম।’

অর্জুন কিছু বলার আগেই মেজর ঝুঁকে দাঁড়ালেন টেবিলের ওপর, “আমার ডাকনাম জানলে কী করে হে? না অর্জুন, মনে হচ্ছে এখানেও গোলমাল আছে।”

অর্জুন হাসল, “আপনি কি স্যাম?”

“ইয়েস।” ম্যানেজার হাসল, “ইউ মেট টিম? টিম দ্য বেগার?” লোকটার নাম তা হলে টিম? অর্জুন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

স্যাম বলল, “টিম ফোনে তোমাদের কথা বলেছিল। কিন্তু দু’জন কমে যাওয়াতে আমার ঝামেলা বাড়ল। কবে যাবে তোমরা এখান থেকে?”

“কাল সকালেই।” অর্জুন জানাল। লোকটাকে ওইরকম চেহারা সত্ত্বেও তার মন্দ লাগছে না। “এদিকে ভারতীয়রা কদাচিৎ আসে। আমার মায়ের বাবা অনেকদিন সিমলায় ছিল। ইউ নো সিমলা। ইনফ্যাক্ট মাই মাদার ওয়াজ বর্ন দেয়ার। খোঁজ নিলে দেখবে আউট অব টেন ব্রিটিশ ফ্যামিলিজ অন্তত দুটো ফ্যামিলির লোক ইন্ডিয়ায় গিয়েছিল।” স্যাম হাসল। অর্জুনের একটু রাগ হল কথাটা শুনে। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখল করেছিল এই কথাটা কি একটু ঘুরিয়ে বলে লোকটা খোঁচা দিল। সে ওই কথা তুলতে স্যাম হাত নাড়ল, “আরে ম্যান, তোমার পূর্বপুরুষরা বোকামি করিেছল বলে আমার পূর্বপুরুষরা সুবিধে পেয়েছিল। তোমার পূর্বপুরুষরা ইউনাইটেড ছিল না বলেই অমন কাণ্ড ঘটেছিল। আমাদের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?”

চাবি নিয়ে নম্বর খুঁজে-খুঁজে শেষ ঘরটিতে যখন ওরা ঢুকল, তখন সন্ধে পেরিয়ে গিয়েছে। বাইরে পাতলা অন্ধকার ফিনফিনে মশারির মতো টাঙানো। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শুধু একটা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। ঘরের ভেতরটা আহামরি নয়। দুটো বিছানা আছে বটে, কিন্তু তার অবস্থাও জলপাইগুড়ির হোটেলের তুল্য। একটা রুম-হিটার রয়েছে। মেজর ধরাচুড়ো ছেড়ে বিছানায় শরীর ফেলতে সেটা প্রতিবাদ করে উঠল। গায়ে না মেখে মেজর বললেন, “খুব টায়ার্ড! আজ সারাদিন যা ধকল গেল! খাবারগুলো খেয়ে সাততাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া যাক।”

ক্লান্তি লাগছিল, কিন্তু তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল খাবারের। টয়লেটের বেসিনে হাত ধুতে গিয়ে গরমজলের দেখা পেয়ে খুশি হল অর্জুন। ঘরে ফিরে এসে সুপার মার্কেট থেকে কিনে আনা খাবারগুলো নিয়ে বসে সে মেজরকে জিজ্ঞেস করল, “মিসেস গ্রান্টের এনে দেওয়া কাগজটা সম্পর্কে আপনি তখন একটুও ইন্টারেস্ট দেখালেন না যে!”

একমুখ খাবার চিবোতে চিবোতে মেজর বললেন, “তোমার সেকেন্ড হ্যান্ড জুতো কেনার পর থেকেই একটার পর একটা ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে। মার্শালের কাছে আমার পৌঁছনোর কথা কবে আর আমি এখন কোথায় আছি!”

অর্জুন বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, তাঁর সঙ্গে ইন্টারেস্ট না নেওয়ার কী আছে?”

“আরে! জুতো কেনার পর থেকেই কেউ না কেউ আমাদের বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। তারা আছে অথচ সামনাসামনি তাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারছি না। এরকম কাঁহাতক ভাল লাগে!” মেজর খেয়ে যাচ্ছিলেন।

“আমি কিন্তু এখনও বুঝতে পারছি না।” শান্ত মুখে অর্জুন বলল।

“তোমাকে তো বুদ্ধিমান বলে জানতাম হে। আজ সুপার মার্কেটের সামনে বদমাশটাকে পেয়েও তুমি ছেড়ে দিলে কেন? ল্যাঠা চুকে যেত ওদের পুলিশের হাতে তুলে দিলে!” মেজরের মুখ এবার ভারী। দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল সত্ত্বেও সেই অভিব্যক্তি লুকিয়ে রাখতে পারলেন না তিনি।

“আপনাকে তো বলেছি কারণটা। প্রথমটা ওদের ধরা আমাদের দু’জনের পক্ষে কতটুকু সম্ভব হত, সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে যথেষ্ট। দ্বিতীয়ত, ওদের দোষী করার মতো কোনও প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।”

মেজর মাথা ঝাঁকালেন, “যাই বলো, তারপর থেকেই আমার খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল। কী লেখা আছে কাগজটাতে?”

অর্জুন বাঁ হাতে বুক পকেট থেকে কাগজটা বের করে সামনে রাখতেই মেজর এঁটো হাতে ছোঁ মেরে তুলে নিলেন। আলোর দিকে কাগজটা ধরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “ইউরেকা! এই লেখাটা নির্ঘাত ইন্ডিয়ায় গিয়েছিল। ইয়েস। ইন্ডিয়া, মানে, যদি বাংলাদেশে যায়, তা হলেও অবাক হবার কিছু নেই।”

অর্জুন হতভম্ব, “ওই কোড-ল্যাঙ্গুয়েজ পড়ে এত কথা জেনে ফেললেন?”

“ওহো অর্জুন, তুমি যদি পরিষ্কার দেখতে পাও, তা হলে আমার অভিজ্ঞতার দাম থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যে-অভিযাত্রী মানুষটি এই নোট লিখে গেছেন, তিনিও চাননি সাধারণ মানুষ চট করে বুঝে নিক তিনি কী বলতে চাইছেন।” মেজর ক্রমশ উত্তেজিত হচ্ছিলেন। কাগজটা হাতে নিয়ে প্রথমে জানলার দিকে তাকালেন, তারপর দরজার। এবার ঠোঁট চাটলেন। তারপর নিচু গলায় অনুরোধ করলেন, “অর্জুন, সাবধানের মার নেই। এসব নিয়ে আলোচনা করার আগে দরজা-জানলার ওপারে কেউ আড়ি পেতেছে কি না দেখে নেবে?”

অর্জুনের এবার মজা লাগল। এতক্ষণ বাদে মেজর যেন একটু ফর্ম ফিরে পেয়েছেন। সে উঠে জানলার ওপাশে কাউকে দেখতে পেল না। মেজর বলে উঠলেন, “দরজাটা, মনে হচ্ছে, দরজার বাইরে কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে।

হাসি চেপে অর্জুন দরজা খুলল। এবং তার নজরে এল লম্বা বারান্দা দিয়ে কেউ একজন হেঁটে আসছে। অর্জুনকে দেখতে পেয়ে লোকটা হাত তুলল, “হেই ম্যান?”

অর্জুন মাথা নেড়ে বলল, “হেলো!” ঘরের ভেতর থেকে মেজর বলে উঠলেন, “দ্যাখো, আমার সিক্সথ সেন্স বলছিল কেউ আড়ি পেতে শুনছে। লোকটা কে?”

ততক্ষণে টিম এসে পড়েছে কাছে, “এবার দুটো পাউন্ড দাও। অর্জুন বলল, “আগে কী কাজ করেছ বলো, তারপর ভাবা যাবে।” টিম হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠল, “ওসব ভাবাভাবির মধ্যে আমি নেই। তুমি আমাকে একেবারে সাপের গর্তে পাঠিয়েছিলে। তোমাদের কথা ওখানে বলে আমি আরও বেশি রোজগার করতে পারতাম। নেতাহ ওই মোটকাটা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলল। দাও, দাও।”

ততক্ষণে মেজর এসে দাঁড়িয়েছেন অর্জুনের পাশে। টিমকে দেখেই তাঁর মেজাজ চড়ল, “ও। তুমি? তখন থেকে আমাদের পেছনে লেগেছ। আড়ি পেতে কথা শোনা হচ্ছিল? তোমাকে আমি পুলিশের হাতে যদি না তুলে দিই!”

অর্জুন তাড়াতাড়ি বাধা দিল, “মেজর প্লিজ। ইনি আড়ি পাতেননি। আমিই একটা কাজে ওকে পাঠিয়েছিলাম। ঠিক আছে টিম, বলো কী খবর?”

“না। আর না। যথেষ্ট হয়েছে। এই দেড়েলটা আমাকে অপমান করেছে।”

“তুমি ভুল ভাবছ। আসলে উনি একটু উত্তেজিত ছিলেন।”

টিম হঠাৎ মেজরের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল। ওর দৃষ্টি মুখ থেকে সরছিল না। মেজর খুব অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আরে, আমার দিকে ওভাবে তাকাবার কী দরকার?”

টিম নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “আমি কাউকে বলব না। তোমার দাড়ি কি নকল?”

“নকল? আমার দাড়ি নকল? এ হতভাগা বলে কী?” মেজর আঁতকে উঠলেন।

টিম মাথা নাড়ল, “কিছুই বুঝতে পারছি না। ঠিক তোমার মতো দেখতে একটা লোককে আমি ‘ভিলেজ পাব’-এ দেখে এলাম। দুটো মানুষের চেহারা একরকম হয় না। নিশ্চয়ই একজন আর-একজনকে নকল করছে।”

অর্জুন বলল, “তা হলে পুলিশ ওকে আর ধরে রাখেনি। এ-দেশের পুলিশ দেখছি আগেই নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। ছেড়ে দাও এসব কথা, টিম, বলো কী খবর?”

“পাঁচ পাউন্ড লাগবে। তার এক পেনি কম নয়। এই লোকটা আমাকে অপমান করেছে।”

“পাঁচ পাউন্ড? মামার বাড়ি।” খেঁকিয়ে উঠলেন মেজর। অর্জুন অনেক চেষ্টায় মেজরকে শান্ত করে ভেতরে পাঠিয়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে টিম বলল, “আমাদের সরকারের কী হাল! নইলে এইরকম বদমেজাজি লোককে কী করে ভিসা দেয়! তুমি ভাল ব্যবহার করছ বলে কথা বলছি। পাঁচ পাউন্ড দাও, তারপর খবর শুনবে। আজকাল মানুষকে বিশ্বাস করি না।”

অর্জুন ঝুঁকি নিল। পাঁচটা পাউন্ড বের করে এগিয়ে ধরতেই ছোঁ মেরে নিয়ে নিল টিম। নোটটা দেখে ভাঁজ করে কোমরের কাছে তৈরি করা পকেটে গুঁজে ফেলল। তারপর বলল, “ওই ঢ্যাঙা লোকটা হল হ্যাচ। ও নাকি প্রোফেসর। ওর সঙ্গীটির পরিচয় জানি না। দু’জনে এক ঘরে ওঠেনি। গাড়ি থেকে মালপত্র নিয়ে সঙ্গীটা প্রোফেসরের ঘরে রেখে এসেছে।”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওরা কোথায়, মানে কোন হোটেলে উঠেছে?”

টিম হাসল। তারপর বলল, “একটু সামনে এগিয়ে বাঁ দিকে তাকালেই জিপটাকে দেখতে পাবে।”

অর্জুন অবাক হয়ে বলল, “তার মানে? এই মোটেলেই উঠেছে?”

টিম বলল, “চোখ মেলে হাঁটো ছোকরা। তা হলে অবশ্য আমি পাঁচ পাউন্ড পেতাম না। দশ আর এগারো নম্বর ঘর। কোথাও না পেয়ে তোমায় খবর দিতে এসে এখানেই পেয়ে গেলাম। গুড নাইট।” শিস দিতে-দিতে লোকটা চলে গেল।

দরজাটা বন্ধ করে অর্জুন বলল, “দারুণ ব্যাপার। যারা আমাদের অনুসরণ করছে, তারা এই মোটেলেই রয়েছে। ওদের নেতার একটা জিপ আছে, একটি স্বাস্থ্যবান দেহরক্ষী আর পোষা সাপ সঙ্গে রাখছে।”

মেজর মাথা নাড়লেন, “তা হলে এরা তারা নয়। “মানে?” অর্জুন মেজরের এত নিশ্চিন্ত হওয়ার কোন কারণ খুঁজে পেল না।”

“মনে করে দ্যাখো, বোল্টনের কাছে হাইওয়ের ডিপার্টমেন্টাল শপে দু’জন লোক জুতোর সন্ধানে এসেছিল। তাদের চেহারার সঙ্গে এদের কোনও মিল নেই। জিপে যে কাণ্ডটা ঘটল সেখানে আরও বেশি লোক ছিল। সেইরাত্রে সমুদ্রের ধারে আলোর সঙ্কেত দেখে তোমার কি মনে হয়নি একটা বড় দলের কাজ এটা?” দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে চোখ বন্ধ করে কথাগুলো বলছিলেন মেজর।

“কিন্তু মেজর, জিপটা প্রোফেসর হ্যাচের। তিনি মিসেস গ্রান্টের কথা বলছিলেন। ব্ল্যাকপুলের হোটেলে উনি বলেছেন যে, ওঁর বাড়ি বোস্টনে। সেই জিপের মধ্যে আমি সাপের গর্জন শুনেছি। এখন জিপটা দাঁড়িয়ে আছে, এই মোটেলের পার্কিং লটে।” অর্জুন বোঝাতে চাইল।

মেজর চোখ খুললেন, “তাও তো বটে। তোমার কথাটা মেনে নিলে বুঝতে হবে, একটা, বড় দল ওই জুতোর ভেতর রাখা কাগজটার জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাকিরা কোথায়?”

“এখানে কি থাকার জায়গার অভাব?”

“তা হলে তো পুলিশকে জানাতে হয়।”

কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন?” অর্জুন হাসল, “তার চেয়ে এক কাজ করুন। সোজা প্রোফেসরের দরজায় নক্ করে জিজ্ঞেস করুন যে, কেন তিনি আমাদের সঙ্গ ছাড়ছেন না?”

“মাথা খারাপ। ভদ্রলোক যখন সাপ পোষেন!”

“আপনি সাপকে খুব ভয় পান?”

“বিন্দুমাত্র নয়। আমার সঙ্গেই বিষ আছে দেখছ।

“তা হলে এসব কথা ছেড়ে দিন। এরা তো সরাসরি আমাদের ওপর হামলা করছে না! এবার আসুন, ওই কাগজটিতে কী লেখা আছে, শোনা যাক!”

‘কেউ যদি আড়ি পেতে শোনে?”

নিজের ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি আর কলম বের করে মেজরের দিকে এগিয়ে দিয়ে অর্জুন বলল, “বাংলায় লিখে দিন। এখানে কেউ পেলেও মানে বুঝতে পারবে না।”

খুশি হয়ে মিসেস গ্রান্টের কপি করে আনা কাগজটা সামনে রেখে কলম খুললেন মেজর। কিন্তু তারপরেই ওঁর মুখ বাচ্চা ছেলের মতো হয়ে গেল। তিনি বললেন, “কিন্তু, অর্জুন, বাংলা লিখতে গেলেই যে গোলমাল হয়ে যায় আমার। খুব বানান ভুল হয়।”

অর্জুনের হাসি পেল। মেজর দীর্ঘদিন বিদেশে আছেন, ভুল তো হতেই পারে। কিন্তু জলপাইগুড়ির অনেক শিক্ষিত মানুষ কোনও কিছু লিখতে গেলে বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সে বলল, “ভুল বানান বুঝতে আমার অসুবিধে হবে না।”

মেজর এবার একবার কাগজ দেখছেন, চিন্তা করছেন, তারপর সেটাকে নিজস্ব বাংলায় অনুবাদ করছেন। অর্জুন চুপচাপ দেখাচ্ছিল। মেজর যে-অর্থ তৈরি করছেন, সেটা সত্যি কি না তা এই মুহূর্তে বোঝার কোনও পথ নেই। থাকলে কপি করে আনা কাগজটা ছিঁড়ে ফেলা যেত।

ইশারায় মেজর এমনভাবে ডাকলেন যেন ঘরের মধ্যেই অনেকজোড়া কান খাড়া হয়ে আছে। অর্জুন উঠে ডায়েরিটা তুলে নিল। সমুদ্র বানানে দীর্ঘ-ঊকার আছে। লেখাটা ঠিকঠাক বুঝতে একটু সময় লাগল। সমুদ্র। বড় ঢেউ। উত্তর দিকে একঘণ্টা যাত্রা। গতি দাঁড়টানা নৌকোর। যেখানে মাটি যতদূর, আকাশ ততদূর। মে মাসে সূর্য মাথার ঠিক ওপরে আসে সাড়ে বারোটায়। ডুবুরি। পাথরটা নড়েনি নোয়ার আমল থেকে। জাহাজ-বাঁধা পাথর। সুড়ঙ্গটা তার তলায়। ঢুকবে একটা মানুষ।

দু’বার পড়ল অর্জুন। তারপর জিজ্ঞেস করল, “সমুদ্রটা কোথায়?”

“তা তো লেখা নেই। ফ্যাদম নটগুলো ফালতু লেখা। আসল মানেটা এই।”

“কিন্তু তা থেকে তো জায়গাটা বোঝা যাবে না। যিনি এত সতর্ক, তিনি এই সূত্র না রেখে যাবেন বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।” অর্জুন মাথা নাড়ল।

“তুমি কি বলতে চাইছ আমি অর্থ বুঝতে পারিনি। দ্যাখো অর্জুন, তোমার বয়স কম হলেও অনুসন্ধানের ব্যাপারটা ভাল বোঝো, কিন্তু সেই বোঝাটায় তো এখনও ম্যাচিওরিটি আসেনি। তুমি বলতে চাইছ আমার অভিজ্ঞতার কোনও দাম নেই?” মেজরকে খুব অখুশি দেখাচ্ছিল।

“আপনার অভিজ্ঞতাকে আমি অবজ্ঞা করব কেন? আপনি মিছিমিছি উত্তেজিত হচ্ছেন। পৃথিবীর কত রহস্যময় জায়গায় আপনি গিয়েছেন। আপনার কি কখনও মনে হয়েছে আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি না?”

“না, না। তা মনে হয়নি অবশ্য। কিন্তু ওই কাগজটায় যে কোডগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তা আমার খুব পরিচিত। তুমি মার্শালের সঙ্গে আলাপ হলে ওকে দেখিও, সে-ও একই কথা বলবে।”

অর্জুন আর কথা বাড়াল না। কিন্তু মেজরের ব্যাখ্যা সে মন থেকে নিতে পারছে না। একটি মানুষ কিছু দামি জিনিস কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন। তারপর তাঁর মনে হয়েছে, যদি পৃথিবীতে না থাকেন তবে একটা সূত্র রাখা দরকার সেটা উদ্ধার করার। তিনি সূত্রটি ব্যাঙ্কের লকারে রেখে লকারের চাবি নিজের বাড়ির বাগানে গাছের কোটরে রেখে দিয়েছেন, যাতে সহজে কারও হাত না পড়ে। এবার সেই গাছের কোটরের বিবরণ সাঙ্কেতিক ভাষায় লিখে নিজের জুতোর তলায় গোপন গর্ত করে রেখে দিয়েছিলেন। এত সতর্কতা যিনি পছন্দ করেছিলেন, তিনি চাননি চট করে কেউ ওই লকার পর্যন্ত পৌঁছে যাক। কিন্তু শেষপর্যন্ত যে লকারটার হদিস পাবে তাকেও তিনি বিভ্রান্ত করবেন কেন? অতগুলো পরীক্ষায় পাশ করে যে এল, তাকে তিনি নিশ্চয়ই জানিয়ে দেবেন গুপ্তধন পেতে গেলে কী করতে হবে। সমুদ্র। বড় ঢেউ। উত্তর দিকে দাঁড়টানা নৌকোয় এক ঘণ্টা যেতে বলেছেন তিনি। কিন্তু কোন সমুদ্র? তার কোন তট থেকে? এরকম ভুল কেউ করে? আর আকাশ এবং মাটি সমান দূরত্বে যে-কোনও সমুদ্রে গেলেই পাওয়া যাবে। মাথার ওপরে সূর্য আসার ব্যাপারটা কোনও মানে তৈরি করে না। শুধু সমুদ্রে ডুব দিয়ে একটা বিশাল প্রাচীন পাথরের সন্ধান করতে হবে যার তলায় সুড়ঙ্গ রয়েছে, এই খবরটাই ঠিকঠাক। কিন্তু শেষের এই খবর সম্বল করে তো এগোনো যায় না। হঠাৎ অর্জুনের মনে হল মিসেস গ্রান্টরা ব্যাঙ্কে যখন লকার থেকে মূল কাগজটা বের করে নকল করছিলেন, তখন কোনও শব্দ ভুল করে বাদ দেননি তো! ওর খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। মেজর এরমধ্যে প্রচণ্ড জোরে নাক ডাকছেন। অর্জুন উঠে নকল করে আনা কাগজটি আবার দেখল। টানা ইংরেজি নয়। যে-শব্দগুলো আছে তা ইংরেজির মতো, কিন্তু মেজর বলেছিলেন পুরনো ইংরেজি। একটা পালতোলা নৌকোর ছবি আঁকা আছে। টানা পড়তে চাইলে কোনও মানে তৈরি হয় না।

ঘুম ভাঙল নাক ডাকার শব্দেই। অর্জুন মুখ থেকে কম্বল সরিয়ে সময় বুঝতে পারল না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে অবাক। সাড়ে আটটা বাজে। এবং তখনই খিদেটাকে টের পেল। দরজা-জানলা বন্ধ, কিন্তু ঘরটাই যেন বরফ হয়ে আছে। সে বিছানা থেকে নেমে কাঁপতে কাঁপতে বাথরুমে গেল। বাথরুমের জানলার পরদা সরিয়ে মনে হল পৃথিবীটা ছায়া-ছায়া, কোথাও আলোর চিহ্ন নেই।

তৈরি হয়ে অর্জুনের মনে হল, মেজরকে আর একটু ঘুমোতে দেওয়া যাক। বয়স হয়েছে, এখন তো একটু বিশ্রাম দরকার। সে দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়াল। আকাশে চাপ-চাপ ময়লাটে মেঘ। গুঁড়ি-গুঁড়ি বৃষ্টিও হয়ে গেছে একটু আগে। সূর্যদেবের কোনও চিহ্ন নেই। কেমন একটা আলসেমিতে জড়ানো চারধার। জলপাইগুড়ির বর্ষাকালেও এমন ভিজে সকাল আসে না। কিছু খাওয়া দরকার এবং আসার সময় মেজরের জন্যে প্যাকেট নিয়ে আসতে হবে। মোটেল ছেড়ে বারটায় বেরোলেই চলবে। ওয়েদার খারাপ বলে নিশ্চয়ই এখানে বাস বন্ধ হয় না।

কয়েক পা হাঁটতেই পার্কিং লটটা নজরে এল। বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে, কিন্তু প্রোফেসর হ্যাচের জিপ নেই। অর্জুন চারপাশে তাকাল। তাদের অনুসরণকারীদের কথা সে একদম ভুলে গিয়েছিল। ওরা কি ভোরবেলায় চলে গেছে? ওরা কি টের পায়নি যে, একই মোটেলে তারাও আছে। সতর্ক পায়ে হাঁটতে-হাঁটতে সে রিসেপশনে এসে এক বয়স্কা মহিলাকে দেখতে পেল। রেজিস্টারে কিছু লিখছিলেন, ওকে দেখে হেসে বললেন, “গুড মর্নিং।

অর্জুন বলল, “গুড মর্নিং। আচ্ছা, এখানে খাবারের দোকান কোথায়?”

“কী খাবে?”

“ব্রেকফাস্ট।”

‘গেট পেরিয়ে বাঁ দিকে মিনিট-তিনেক গেলেই রেস্টুরেন্টের সাইন দেখতে পাবে।”

“কাল যে ভদ্রলোক রিসেপশনে ছিলেন, তিনি কখন আসবেন?”

“বারোটার পর।”

“ও। তার আগেই অবশ্য আমরা বেরিয়ে যাব। আচ্ছা, প্রোফেসর হ্যাচরা কি চলে গেছেন?”

“প্রোফেসর হ্যাচ?”

“যিনি জিপে এসেছিলেন?”

“ও। হ্যাঁ। একটু আগেই ওরা বেরিয়ে গেলেন।” মহিলা বললেন, “আপনি ওঁকে চেনেন?”

“না। তবে নাম শুনেছি।”

“ভদ্রলোক বেশ কিছুদিন পরে আবার এখানে এলেন।

আগে বুঝি খুব আসতেন?”

“দু-তিন বছর আগে।

মহিলার কাছে বিদায় নিয়ে অর্জুন গেটের দিকে হাঁটা শুরু করতেই কনকনে হাওয়ার মধ্যে পড়ল। যদিও বৃষ্টি নেই, তবু ঠাণ্ডাটা যেন হাড়ের ভেতরে ঢুকছে। প্রোফেসর হ্যাচ দু-তিন বছর আগে খুব আসতেন এখানে। যে অভিযাত্রীটি গুপ্তধন রেখেছেন, তিনি গত হয়েছেন ওই সময়েই। তা হলে কি সমুদ্রটা এই তল্লাটেই। হ্যাচ যেটা আন্দাজ করতে পারছেন, কিন্তু সঠিক হদিস পাচ্ছেন না।

ব্যাপারটা ভাবতে-ভাবতে রেস্টুরেন্টের কাঁটা চামচের সাইনবোর্ড দেখতে পেল। রাস্তা ছেড়ে সে রেস্টুরেন্টে ঢুকল। এই ঠাণ্ডার সকালে কোনও খদ্দের নেই। বৃদ্ধ দোকানদার মাথা নাড়লেন। মেনুবোর্ড দেখে অর্জুন দু’পাউন্ডের মধ্যে খাবারের অর্ডার দিয়ে কোণার টেবিলে বসল। এখান থেকে রাস্তাটা পরিষ্কার দেখা যায়। এবং সেই ভিজে রাস্তায় একটিও মানুষ নেই। কাউন্টারে বৃদ্ধের মাথার ওপর টি-ভি চলছে। বিবিসির খবর হচ্ছে সেখানে। অর্জুন কিছুক্ষণ মন দিয়ে খবর শোনার চেষ্টা করল। রাজনৈতিক ব্যাপারগুলো তার মোটেই ভাল লাগে না। সে আবার রাস্তার দিকে তাকাল। এখানকার মানুষেরা কি কাজ আর বাড়ি ছাড়া কিছু বোঝে না? এইসময় খাবার দিয়ে গেলেন বৃদ্ধ। অর্জুন তাঁকে একই খাবার প্যাক করে দিতে বলল। খিদেটা জব্বর। খাওয়া প্রায় শেষ করে নিয়ে মুখ তুলতেই সে টিভিতে সমুদ্র দেখতে পেল। অস্থির ঢেউগুলো পেরিয়ে একটা স্পিড বোট ছুটে যাচ্ছে। তিনি খবর পড়ছিলেন, তাঁকে দেখা যাচ্ছে না এখন, কিন্তু গলা শোনা যাচ্ছে। স্পিডবোটটা গিয়ে একটা ছোট লঞ্চের গায়ে লাগল। বোট থেকে দু’জন সেখানে উঠে গেলেন। একজনের হাতে সানগান আর টেপ রেকর্ডার। অন্যজনের হাতে টিভি-ক্যামেরা। সংবাদপাঠককে বললেন, “আমাদের প্রতিনিধিরা মিস্টার মার্শালের সঙ্গে কথা বললেন। মিস্টার মার্শাল বললেন, “এবার টিভি-তে এক ইংরেজ প্রৌঢ়ের মুখ, ‘হ্যাঁ, শাক। এই তল্লাটের সমুদ্রে শার্ক এসেছে। প্ৰথম দিকে দিনের বেলায় আসত। এখন রাত্রে হানা দিচ্ছে। এর ফলে আমার গবেষণার কাজ খুব ব্যাহত হচ্ছে।”

প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার মার্শাল, আমরা জানি আপনি মুক্তো নিয়ে রিসার্চ করছেন। এত জায়গা থাকতে এই সমুদ্রকে বেছে নিলেন কেন?”

“আমার জানা ছিল এই সমুদ্রে কোনও সামুদ্রিক জন্তুর উৎপাত নেই। দাঁড়টানা নৌকোয় চেপে চমৎকার ঘুড়ে বেড়ানো যায়। কিন্তু হঠাৎ সেখানে কী করে শার্ক ঢুকল বুঝতে পারছি না।”

মিস্টার মার্শালের বয়স হলেও স্বাস্থ্যটি ভাল। মুখে চাপ লাল দাড়ি। সংবাদ-পাঠক অন্য বিষয় নিয়ে বলা শুরু করতেই প্রায় লাফিয়ে উঠল অর্জুন। ওই মার্শাল নিশ্চয়ই মেজরের বন্ধু। মেজর বলেছিলেন তাঁর বন্ধু মুক্তো নিয়ে গবেষণা করছেন। অর্জুন দ্রুত কাউন্টারে চলে গিয়ে দাম মিটিয়ে প্যাকেট নিয়ে প্রায় দৌড়তে-দৌড়তে চলে এল মোটেলে।

মেজর দাঁড়িয়ে ছিলেন বারান্দায়। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল খুব বিরক্ত। অর্জুনকে দেখামাত্র চেঁচিয়ে উঠলেন, “বাঃ। আমাকে কিছু না বলে তুমি উধাও?”

“আপনার জন্যে খাবার আনতে গিয়েছিলাম।”

“তা যাও। যাওয়ার আগে পকেটে পাউন্ড আছে কি না দেখে যাবে তো? হুটহাট বেরিয়ে গেলেই হল?”

অর্জুন কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “আমার মানিব্যাগ তো সঙ্গেই রয়েছে।”

মেজর এবার হো হো করে হাসলেন, “ও! আমার টাকায় খেতে ইচ্ছে করছিল বুঝি?”

“আমি আপনার কথার কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“বাঃ। তুমি এই নেংটি ইঁদুরটাকে পাঠাওনি আমার কাছ থেকে দশ পাউন্ড চেয়ে?”

“নেংটি ইঁদুর?”

“ওঃ। কাল যে তোমার দুতের কাজ করেছিল। লোকটা এসে বলল, “তাড়াতাড়ি দশ পাউন্ড দিন, উনি খাবারের দোকানে আটকে আছেন।

লোকটা বলল আর আপনি দিয়ে দিলেন?”

“মানে? তুমি ওকে পাঠাওনি দশ পাউন্ডের জন্যে?”

“না। আমি কাউকে পাঠাইনি।”

“সে কী! আমি তো ওকে সন্দেহ করিনি একফোঁটাও।”

দশ পাউন্ড কম কথা নয়। খাবার খেতে বসেও মেজরের চোখ দেখার মতো ছিল। বারংবার বলে যাচ্ছিলেন, “লোকটা বেমালুম ঠকিয়ে দিল আমাকে? বুঝলে হে, দেখার চোখটাই বড়, অভিজ্ঞতার বড়াই করে কোনও লাভ নেই। ও হ্যাঁ, দশ পাউন্ড নিয়ে চলে গিয়েও লোকটা আবার ফিরে এসেছিল। ওই খামটা দিয়ে গিয়েছে। বলেছে তুমি এলে তোমায় দিতে।”

টেবিলের ওপর রাখা ছোট খামটা দেখল অর্জুন। এই মোটেলের রিসেপশনে যে খামগুলো রাখা আছে তারই একটা দিয়ে গেছে লোকটা। অর্জুন এগিয়ে গিয়ে খামটা তুলে বুঝল ভেতরে কাগজ আছে। সে কাগজটা বের করতেই খুব খারাপ হাতের লেখায় লোকটার বক্তব্য পড়ল, “ডিয়ার মিস্টার ব্রাদার অব মেজর। তোমার দাদাকে ঠকিয়ে আমি দশ পাউন্ড নিয়ে যাচ্ছি না। তোমরা যাদের ভয় পাচ্ছ তারা আজ সকালেই সমুদ্রের দিকে রওনা হয়েছে। এই খবরটার দাম দশ পাউন্ডের বেশি হবে। কী বলো? নীচে কোনও নাম-সই নেই।” অর্জুন হেসে ফেলল। সুপারমার্কেটের সামনে যে লোকটা প্রায় ভিক্ষে করে কাটায়, তারও রসিকতা করার ক্ষমতা আছে। খেতে-খেতে মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “হাসছ যে?” অর্জুন চিঠিটা এগিয়ে দিল।

বাসে পাশাপাশি দুটো সিট পাওয়া যায়নি। মোটেল থেকে বেরোবার পথে অর্জুন মেজরকে বি বি সির খবরটার কথা বলেছিল। মেজর খবরটাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, “দুর! এখানে শার্ক আসবে কোত্থেকে? মার্শালের বড় সন্দেহবাতিক। আর ওকে তো আমি চিনি, সবসময় নিজের পাবলিসিটি চায়। তুমি ঠিক বুঝেছ ওই মার্শাল?”

অর্জুন বলল, “মুক্তোর গবেষণা করছেন। মুখে লাল দাড়ি, ভাল স্বাস্থ্য।”

“মিলছে। তা স্বাস্থ্য ওর কী এমন! পাঁচ বছর আগে আমাকে দেখলে বুঝতে পারতে স্বাস্থ্য কাকে বলে!” মেজর গর্বিত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলেছিলেন।

জানলা দিয়ে ইংল্যান্ডের গ্রামের খেত দ্রুত সরে-সরে যেতে দেখল অর্জুন। চুপচাপ বসে থাকতে-থাকতে হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ চলকে উঠল যেন। বিবিসির প্রতিনিধির কাছে মার্শালসাহেব আজ বলেছেন, “আমার জানা ছিল এই সমুদ্রে কোনও সামুদ্রিক জন্তুর উৎপাত নেই। দাঁড়টানা নৌকোয় চেপে চমৎকার ঘুরে বেড়ানো যায়।” দাঁড়টানা নৌকোর কথা হঠাৎ বললেন কেন মার্শালসাহেব! লকারের কাগজটিতেও তো দাঁড়টানা নৌকোর কথা বলা আছে। আজকের পৃথিবীতে যখন এতরকমের আধুনিক জলযান তৈরি হয়েছে তখন সমুদ্রে দাঁড়টানা নৌকোর ঘোরাফেরার কথাটা কি স্বাভাবিক? নাকি ওই অঞ্চলে দাঁড়টানা নৌকোয় ঘুরে বেড়ানোই রেওয়াজ! তা হলে মার্শাল সাহেব এখন যে সমুদ্রে মুক্তো নিয়ে গবেষণা করছেন সেই সমুদ্রের কথাই কি লকারে রাখা কাগজটাতে বলা হয়েছে। প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে সে একটু এগিয়ে বসা মেজরের দিকে তাকাল। মেজর এই দুপুর বেলাতেও ঘুমাচ্ছেন। পাশে বসা এক ভদ্রলোক আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও প্রবলেম?”

অর্জুন প্রশ্ন শুনে নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে বলল, “না, না তো।”

তখনই তার গুরু অমল সোমের একটা কথা খেয়াল হল। “কখনওই ওয়ান প্লাস ওয়ান করে কোনও সিদ্ধান্তে ঝাঁপ দিয়ে এগিয়ো না।” পৃথিবীর অনেক সমুদ্রেই হয়তো দাঁড়টানা নৌকো চলে। অর্জুন অলস হয়ে আবার বাইরের দিকে তাকাল। হঠাৎ দূরে সবুজ, জমাট সবুজের গালচে ছড়িয়ে রয়েছে বলে মনে হল। জানলার কাচ বন্ধ। বাস বাঁ দিকে যখন ঘুরছে তখন ওটা হারিয়ে যাচ্ছে। আবার ডানপাশে ফিরতেই ওটা অনেক কাছে এগিয়ে আসছে। সবুজ গালচে যে সমুদ্রের চেহারা তা বুঝতে পেরে উত্তেজনাটা আবার ফিরে এল। এত শান্ত সমুদ্র, যেন ব্ল্যাকপুলকেও হার মানায়। কিন্তু যত বাস এগিয়ে যাচ্ছিল, তত ছোট-ছোট ঢেউ দেখতে পেল সে। এবং সেই ঢেউয়ের পালতোলা দাঁড়টানা ছোট-ছোট নৌকো মোচার খোলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। বাসের টার্মিনাসে পৌঁছে গেলে যাত্রীরা যখন নামতে শুরু করেছে, তখন দুপাশে হাত ছুঁড়ে মেজর হাই তুললেন। তুলে ঘোষণা করলেন, “এসে গেছি, বুঝলে!”

অর্জুন খানিকটা পেছনে ছিল। মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখে ইশারায় কাছে ডাকলেন মেজর। বাসের প্রায় সব লোক নেমে গেছে। অর্জুন এগিয়ে মেজরের পাশে পৌঁছতেই তিনি বললেন, “একটু আগে একটা মারাত্মক স্বপ্ন দেখলাম। তাই, বলছি কি, লকারের কাগজে যাই লেখা থাক তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামিয়ে কী লাভ। আমরা তো ইংল্যান্ডে গুপ্তধন খুঁজতে আসিনি।”

“কী স্বপ্ন দেখেছেন?”

“খুব খারাপ। তারপর ধরো, স্বপ্নটাকে মিথ্যে করে আমরা এককাঁড়ি মণিমুক্তো পেলাম খুঁজে। কিন্তু লাভ হবে কিছু! এ-দেশের কাস্টমস তার একরত্তি নিয়ে যেতে দেবে না। শুধু-শুধু পরিশ্রমই সার হবে। তার ওপর জীবনের ঝুঁকি।” খুব গম্ভীরভাবে বুঝিয়ে বলছিলেন কথাগুলো মেজর। অর্জুন হাসল, “আমরা তো এখনও পর্যন্ত সমুদ্রটার হদিস পাইনি। অতএব ওসব চিন্তা করে লাভ কী? স্বপ্নে কি নিজেকে মৃত দেখলেন?”

করুণ ভঙ্গিতে দু’বার মাথা নাড়লেন মেজর।

অর্জুন বলল, “উঠুন, নিজের মৃত্যু স্বপ্নে দেখলে আয়ু বেড়ে যায়।”

“সত্যি বলছ? কিন্তু তা হলে তো সবাই নিজের মৃত্যু স্বপ্ন দেখত।”

অর্জুন হেসে ফেলল, “আপনি বুঝি ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখতে পারেন?”

“তা পারি না।” এবার মেজর লাফিয়ে উঠলেন সিট থেকে, “এত তাড়াতাড়ি মরব না বলছ?” সেই সময় একজন য়ুনিফর্মপরা লোক দরজায় মাথা গলাল, “জেন্টলমেন, টিকিটের দাম কি এখনও ওঠেনি বলে তোমাদের মনে হচ্ছে?”

তড়িঘড়ি মালপত্র নিয়ে নেমে এল ওরা। সামনেই একটা বাড়ি। সমুদ্র দেখা যাচ্ছে না। অর্জুন জিজ্ঞসা করল, “মার্শাল সাহেবের ওখানে পৌঁছতে গেলে কি করতে হবে জানেন?”

মেজর বললেন, “অবশ্যই। জেটিতে চলো।”

পা বাড়াতে গিয়েই অর্জুন মেজরের হাত শক্ত করে চেপে তাঁকে আটকে দিল, প্রোফেসর হ্যাচের জিপ সামনের রাস্তাটা দিয়ে তীরবেগে ছুটে গেল।

জিপটি হ্যাচের কি না সে-বিষয়ে যখন অর্জুন একটু দ্বিধাগ্রস্ত, ঠিক তখনই একজনের ওপর নজর পড়ল। এখানকার সমুদ্রের জল নীল নয়। একটা সবজে ছায়া যেন জলের ওপর নেতিয়ে রয়েছে। আর সেই কারণেই সমুদ্রটাকে কীরকম বিমর্ষ দেখাচ্ছে। হাওয়ায় ওঠা ছোট-ছোট ঢেউ যেন জলের ওপর গড়িয়ে চলেছে সমানে। সমুদ্র ঢুকে এসেছে অনেকটা ভেতরে।

যেন ইংরেজি ইউ অক্ষরের ভেতরের খালি জমিটা সমুদ্রের দখলে। নানান ধরনের পাল-তোলা নৌকো এই তিন দিক বন্ধ সমুদ্রের বুকে মহানন্দে ভাসছে। পাড়ে লোকজন বেশি নেই। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে এলোমেলো। অর্জুন লোকটাকে দেখেই এবার চিনতে পারল।

মেজরও দেখেছিলেন ওকে। দেখে বিড়বিড় করে বলেছিলেন, “হতভাগাটা এখানে এল কোত্থেকে? আবার হাত নাড়া হচ্ছে।

সত্যিই ব্রাউনকে দেখলে মেজর বলে চমৎকার ভুল হয়। শুধু চামড়ার রংটা যদি কিছুদিন হাজারিবাগে থেকে পালটে আনতে পারত, তা হলে আর কথাই ছিল না। বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছতেই ব্রাউন বলল, “মিসেস গ্রান্ট বললেন তোমরা এখানে এসেছ। পথে কোথায় ফেঁসেছিলে হে?”

মেজর চটপট ধমকে উঠলেন, “তাতে তোমার কী দরকার? আমরা যেখানে যাচ্ছি তোমার সেখানে যাওয়া আমি মোটেই পছন্দ করছি না। আর পুলিশগুলো হয়েছে এমন, হুট করে ছেড়ে ছিল দ্যাখো। আরও দিন-দশেক আটকে রাখলে কী ক্ষতি হত?”

ব্রাউন বলল, “হত। আমাকে দু’বেলা খাওয়াতে হত। আমি তো তাই চেয়েছিলাম, কিন্তু ওরা খরচ বাঁচাল। চারধারে এখন বাজেট কমানোর ব্যাপার চলছে।

অর্জুন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “এখানে আপনি কী করছেন মিস্টার ব্রাউন?”

“তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি। কাল থেকে এই বাসস্ট্যান্ডেই ঘোরাফেরা করছি।” …

“কিন্তু কেন?”

ব্রাউন তার দাড়িতে হাত বোলাল। চোখ পিটপিট করে মেজরকে দেখল। তারপর একটু গলা নামিয়ে বলল, “তোমাকে আমার বেশ ভাল লেগে গিয়েছে বলে বলছি। আমি টের পেয়েছি তোমাদের সঙ্গে একটা ক্রাইম জড়িয়ে আছে।”

“কী? আমরা ক্রিমিনাল?” মেজর চিৎকার করে উঠলেন।

হাত তুলে তাকে থামাল ব্রাউন। তারপর অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই শিশুটিকে কেউ কখনও শান্ত হয়ে থাকবার উপদেশ দেয়নি কেন বলো তো। আমি বুঝতে পেরেছি তোমাদের পেছনে নিশ্চয়ই কোনও ক্রিমিনাল গ্যাং লেগেছে। নইলে ব্ল্যাকপুলের রাস্তা থেকে একইরকম চেহারার জন্যে ভুল করে আমায় জিপে তুলে নিয়ে যেত না। ওদের কাছে রিভলভার ছিল। তারপর ধরো স্ট্রেঞ্জির কথা। স্ট্রেঞ্জিকে কেউ মেরে ফেলেছে। ম্যাঞ্চেস্টারে তো দেখেছি স্ট্রেঞ্জির কী খাতির! ও দলে থাকলেই পয়সা। পুলিশকে আমি বলিনি, কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে যারা মেরেছে তারা স্ট্রেঞ্জি ভেবে মারেনি। গাড়িটা যে স্ট্রেঞ্জি চালিয়ে যাচ্ছে তা তারা জানতই না। ওরা নিশ্চয়ই ভেবেছে মিসেস গ্রান্ট চালাচ্ছেন। কারণ মিসেস গ্রান্ট আমাকে গতকাল বলেছেন চুরি যাওয়ার আগে তিনি গাড়ি চালিয়ে একটা ডিপার্টমেন্টাল শপে গিয়েছিলেন লোশন কিনতে। অতএব ক্রিমিনালরা মিসেস গ্রান্টকেই মারতে চেয়েছিল। কেন? তার সঙ্গে ওদের কোনও শত্রুতা তো নেই। পরে বুঝলাম যেহেতু উনি তোমাদের বন্ধু এবং গাড়িটা নিয়ে এদিকেই আসছেন বলে মনে হয়েছিল, তাই অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটিয়ে দিল ওরা। আমার নাম যে কেন শার্লক হোমস্ হল না কে জানে!”

অর্জুন কিছু বলার আগেই মেজর বললেন, “অনেক বকেছ। এবার বিদেয় হও।”

“বিদায় হতে তো আসিনি এতদূর!”

“মানে? তুমি কি আমাদের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকতে চাও?”

ব্রাউন চোখ পাকাল, “দ্যাখো বুড়ো, আমাকে রাগিয়ে দিও না বলে দিচ্ছি। রেগে গেলে আমার কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। আমার হাতে কোনও কাজ নেই। যাকে বলে অখণ্ড অবসর। এইরকম সময়ে আমি ক্রাইমের গন্ধ পেয়েছি। এখন আমি তোমাদের ছেড়ে চলে যাই কী করে? তা ছাড়া তুমি তো খুব অকৃতজ্ঞ মানুষ। ছিছিছি।”

মেজর এবার একটু ঘাবড়ে গেলেন, “মানে? তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ হতে যাব কেন খামোখা?”

“একশোবার কৃতজ্ঞ হবে।” ধমকে উঠল ব্রাউন, “তোমার মতো দেখতে বলেই তো ওরা আমাকে জিপে তুলছিল, বন্দুক ঠেকিয়েছিল। তোমার জন্যেই তো গাড়ি থেকে পড়তে হয়েছিল আমাকে। অজ্ঞান না হয়ে আমি তো মরেও যেতে পারতাম। কৃতজ্ঞ হবে না? যদি আমার বদলে তোমাকে নিয়ে যেত ওরা, মানে আমি যদি না থাকতাম তা হলে এতক্ষণে তোমার সাইজের কফিনের বাক্স খুঁজতে হিমশিম হতে হত এই ছেলেটাকে, তা জানো?”

মেজরের মুখের চেহারা এখন এমন যে না হেসে পারল না অর্জুন। দু’জন প্রায় এক চেহারা এক উচ্চতার মানুষ মুখোমুখি স্থির। মনে হচ্ছে আয়নায় এ-ওকে দেখছে। সে বলল, “কিন্তু মিস্টার ব্রাউন, আমরা এখানে এসেছি মেজরের এক বন্ধুর অতিথি হিসাবে। তিনি সমুদ্রের জলে রিসার্চ করছেন। সেখানে আপনাকে নিয়ে যাওয়া কী করে সম্ভব?”

ব্রাউন চোখ ছোট করে তাকাল, “এর সেই বন্ধুটির সঙ্গে তোমার আলাপ আছে?”

“না, তা নেই।” অর্জুন মাথা নাড়ল।

“তিনি কি তোমাকেও নেমন্তন্ন করেছেন?”

“না তা করেননি।” সত্যি কথাটা না বলে পারল না অর্জুন।

“তোমাকে তো আমার বুদ্ধিমান বলেই মনে হয়েছিল। আরে তুমি যদি বিনা নেমন্তন্নে যেতে পারো, তা হলে আমি পারব না কেন? দু’জনের যেখানে জায়গা হয় তিনজনেরও হয়।”

মেজর এবার আপত্তি করলেন, “না, হয় না। অর্জুন আমার সঙ্গে যাচ্ছে। কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে যাব কেন, অ্যাঁ? চিনি না জানি না, রাস্তার লোককে নিয়ে যাব সঙ্গে?”

ব্রাউন দাড়িতে হাত বোলাল, “বড্ড কথা খরচ হচ্ছে। শোনো হে, ব্রাউন কখনও অপমান হজম করে না। শেষ নিশ্বাস যতক্ষণ না পড়বে ততক্ষণ আমি বদলা নেবই।”

মেজর এবার ঘাবড়ে গেলেন, “আমি আবার অপমান করলাম কখন?”

“তুমি কেন করবে? ওই লোকগুলো। খামোকা আমাকে জিপে তুলল, পিঠে নল ঠেকাল আর তারপর জিপ থেকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। এটা আমি এমনি-এমনি হজম করব? প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমি ছাড়ছি না।” ব্রাউন এমন জোরে কথা বলল যে ওপাশের ফুটপাথে দাঁড়ানো কয়েকটা বাচ্চা চমকে এদিকে ফিরল। মেজর বললেন, “বেশ তো, প্রতিশোধ নাও না, আমাদের সঙ্গে কেন?”

“কারণ তোমরা হলে টোপ। ওরা আবার তোমাদের ওপর আক্রমণ করতে আসবেই। আমি তোমাদের সঙ্গে থাকলে ওদের হদিস পাব। নইলে কোথায় খুঁজে মরব ওদের?”

ব্রাউনকে এতক্ষণে বেশ পছন্দ হল অর্জুনের। লোকটা একটু গোলমেলে, বউ তাড়িয়ে দিয়েছে ওকে, ছোটখাটো অপরাধ করেছে কিন্তু মানুষ হিসেবে মানিয়ে নেওয়া যেতে পারে। জলপাইগুড়ির অনেক ছোটখাটো ক্রিমিনাল তার সঙ্গে বেশ ভাল সম্পর্ক রাখত। তারা কোথায় কী করছে তারাই জানে, কিন্তু অনেক ব্যাপারে তাকে সাহায্য করত। সে মেজরকে অনুরোধ করল, “খুব অসুবিধে হবে কি মিস্টার ব্রাউন সঙ্গে গেলে?”

মেজর বললেন, “বুঝেছি। ক’বার তোমার প্রশংসা করতেই গলে গিয়েছ! আরে মার্শাল থাকে সমুদ্রের ধারে। হোটেলে তো নয়। বলছ যখন তখন চলুক। তুমি ছেলেমানুষ বুঝবে না যার বউ বাড়ির থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে তাকে বিশ্বাস করা ঠিক কি না…!”

মেজর কথা শেষ করার আগেই ব্রাউন অর্জুনের হাত জড়িয়ে ধরল, “আমি বাজি রেখে বলতে পারি এই লোকটা এখনও বিয়ে করেনি, না?” অর্জুন মাথা নাড়ল।

সঙ্গে-সঙ্গে গম্ভীর গলায় ব্রাউন ঘোষণা করল, “বিবাহিত মানুষদের ব্যাপারে আনাড়ি লোকের মন্তব্য করা আমার একেবারে অসহ্য!”

দেখা গেল ব্রাউন এই তল্লাটটা মোটামুটি চেনে। ক্রিমিনালদের খোঁজে গতরাতে এখানে এসে সে নাকি কোনও হোটেলে ওঠেনি। হোটেলের খরচ চালাবার পয়সা তার পকেটে নেই। রাত হলে একটা বাংলোবাড়ির দরজায় নক করেছিল। অর্জুনকে ব্রাউন বলেছিল, “এই ব্যাপারটা অনেক সময় খুব কাজে আসে। পাঁচটা দরজায় নক করলে একটা বাড়িতে ভাল ব্যবহার পাওয়া যায়। আমি তো ভাই পরিষ্কার বলি, এখানে এসে আমার পার্স হারিয়েছি, হোটেলে যাওয়ার উপায় নেই, রাতটা যদি দয়া করে থাকতে দেন তা হলে উপকৃত হব। তবে হ্যাঁ, বেশি রাত হলে লোকজন সন্দেহ করে। এসব করতে হয় সন্ধে-সন্ধে নাগাদ। বেশির ভাগই আউট-হাউসে থাকতে দেয়, কেউ-কেউ অবশ্য গ্যারাজে, যদিও কম্বল দেয় ঠাণ্ডার জন্যে। কপাল ভাল থাকলে খাবারও জুটে যায়।”

লোকটাকে ভাল লেগেছিল অর্জুনের। প্যাঁচানো লোক হলে এমন সরল গলায় নিশ্চয়ই কথা বলত না। অর্জুনের মনে হল একেই বলে ভ্যাগাবন্ড। ওরা জলের ধার দিয়ে যাচ্ছিল। মেজর সামনে হাঁটছিলেন। তাঁর হাতে একটা কাগজ। সম্ভবত সেইটাতে মিস্টার মার্শালের ঠিকানা লেখা। এরমধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছেন তিনি হদিস। ব্রাউন যতবারই ঠিকানা জানতে চেয়েছে তিনি নির্বাক থেকেছেন। ব্রাউনের সঙ্গে তিনি কোনও সমঝোতা করে চলবেন না এটা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

পালতোলা নৌকোগুলোর দিকে তাকিয়ে মেজর বললেন, “অর্জুন, এসো, টু-সিটার নৌকোটা ভাড়া করা যাক। মার্শালের কাছে পৌঁছতে হলে শুনলাম নৌকো ছাড়া কোনও উপায় নেই। ও নাকি একটা দ্বীপের মতো জায়গায় ক্যাম্প করেছে।”

অর্জুন হেসে বলল, “টু-সিটার কেন? মিস্টার ব্রাউন তো আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন।”

“টু-সিটারের ভাড়া কম হত।” উদাস গলায় জানালেন মেজর।”

“ছাই হত। ফুট কাটল ব্রাউন, “ওটা তো খেলনা। বন্দর থেকে বেরোলেই উলটে যায়। মিস্টার মার্শাল দ্বীপে থাকেন? এখানে তিনটে বড় দ্বীপ আছে। যে-কোনও এঞ্জিনওয়ালা নৌকো নিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে কোন দ্বীপে ভদ্রলোক আছেন। টু-সিটার নৌকোয় দ্বীপে যারা পৌঁছয় তাদের ট্রেনিং আলাদা। দাঁড়াও আমিই ডাকছি।” ব্রাউন একটানা কথাগুলো বলে চিৎকার-চেঁচামেচি করে একটা মোটরবোটওয়ালাকে ডাকল। লোকটার গায়ে ডোরাকাটা গেঞ্জি, মাথায় বারান্দাওয়ালা টুপি, বয়স হয়েছে। ব্রাউনের বক্তব্য শোনার পর লোকটা মাথা নাড়ল, “মার্শাল খুব কড়া লোক। আমাকে বলেছে ওই দ্বীপে যেন বিনানুমতিতে আমি এখান থেকে লোক নিয়ে না যাই। অফিসারদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক আছে ওর।

মেজর দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন উদাসীন ভাব দেখিয়ে। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, “কড়া মানুষ? কড়া? আমার চেয়েও? নেমন্তন্ন করেও নিয়ে যাওয়ার কোনও ব্যবস্থা রাখেনি, আমি ওকে কড়া হওয়া কাকে বলে দেখাব। বলো আমরা মোটরবোটে যাব!”

ড্রাইভার ইতস্তত করছিল, তাকে বুঝিয়ে বলা হল মেজর মিস্টার মার্শালের বন্ধু। অতএব লোকটা রাজি হল। দর-কষাকষি করে ব্রাউন ভাড়া কমিয়ে মেজরকে শুনিয়ে বলল, “আমি অন্তত পনেরো পাউন্ড বাঁচিয়ে দিলাম। এইটে খেয়াল রাখলেই খুশি হব।

মেজর জবাব দিলেন না। মোটরবোটে চারজন লোক চমৎকার বসতে পারে। মেজর একা একা বসেছেন, উলটো দিকে অর্জুন ব্রাউনের পাশে। সবুজ জলের তিন পাশে সাজানো রেস্টুরেন্ট, দোকনপাট দেখতে দেখতে ওরা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আকাশ এখন ঘোলাটে। নৌকোয় বসে থাকতে চমৎকার লাগছিল। হঠাৎ মেজর বললেন, “অর্জুন, তোমার ওই কোড ল্যাঙ্গুয়েজটা মনে আছে তো? চারপাশে নজর দাও। আমরা তো শুধু প্রকৃতি উপভোগ করব বলে ট্যুরিস্ট হিসেবে আসিনি।

মেজর এখানেই থামলেন বলে অর্জুন খুশি হল। মার্শালের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য যদি বেড়ানো, তা হলে এসব কথা কেন উঠছে, প্রশ্নটা করতেই পারে ব্রাউন। কিন্তু দু’জনের সম্পর্কটা এখন এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে কেউ কারও কথা তলিয়ে ভাবতে চেষ্টা করবে না।

অর্জুন লাইনগুলো আর একবার মাঝে-মাঝে আওড়ে নিল। সমুদ্র। উত্তর দিকে এক ঘণ্টা যাত্রা। গতি দাঁড়-টানা নৌকোর। যেখানে মাটি যতদূর, আকাশ ততদূর! মে মাসে সূর্য মাথার ওপরে আসে ঠিক সাড়ে বারোটায়। ডুবুরি। পাথরটা নড়েনি নোয়ার আমল থেকে। জাহাজ-বাঁধা পাথর। সুড়ঙ্গটা তার তলায়। ঢুকবে একটা মানুষ।

না। কোনও শব্দ সে ভুলে যায়নি। হাত বাড়িয়ে সমুদ্রের জল ছোঁয়ার চেষ্টা করল অর্জুন। সঙ্গে-সঙ্গে তাকে সতর্ক করল ব্রাউন, “না। ওটা কোরো না।”

ব্রাউন মুখ ঘুরিয়ে নিল, “কী দরকার।”

অর্জুন অবাক হল, “ওখানে তো কোনও হিংস্র জন্তু আছে বলে মনে হয় না।”

“জন্তুর কথা বলছি না।” ব্রাউন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল, “আমার ভয় লাগে। মানে এত ব্যস্ত ছিলাম যে, সাঁতারটা শেখার সময় পাইনি। ওই মাথামোটাটাকে খবরটা জানিয়ে দিও না।” অর্জুনের বেশ মজা লাগল। সাঁতার সে নিজেও জানে না। তিস্তানদীতে সাঁতার শেখার প্রশ্ন নেই। করলাতে অবশ্য শেখা যেত। কিন্তু জলের নাম শুনলেই মা আঁতকে উঠতেন। কিন্তু সে কিছু বলল না। এতক্ষণ তারা ইউ শেপের বাইরে চলে এসেছে। সমুদ্র এখানে শান্ত। তাদের মোটরবোট সশব্দে জল কাটতে কাটতে বেরিয়ে যাচ্ছে। পেছনে জলের ওপর যেন দাগ রেখে যাচ্ছে। সূর্য দেখা যাচ্ছে না। অর্জুন মেজরকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?”

মেজর চোখ বন্ধ করে বললেন, “উত্তর দিকে।” বলেই এমন ভাবে লাফিয়ে উঠে সমুদ্রের দিকে তাকাতে লাগলেন যে, নৌকোটা দুলে উঠল এবং ড্রাইভার চিৎকার করে উঠল। ব্রাউন কোনওমতে টলতে-টলতে সামলে নিয়ে বলে উঠল, “অদ্ভুত তো! উত্তর দিক বলেই পৃথিবীতে কেউ এমন লাফায় তা জন্মে শুনিনি। এখনই আমি জলে পড়ে যাচ্ছিলাম।”

মেজর যেন এসব কথা শুনতেই পেলেন না। এবার হতাশ গলায় বললেন, “সমুদ্র এত বড় যে, ঠিক কোনটা উত্তর দিক বোঝাই মুশকিল। সূর্যটা কোথায় বলো তো?” তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। ব্রাউন জবাব দিল, “সমুদ্রের ঠিক ওপরে।”

মেজর ঘুরে আঙুল তুললেন, “লুক, ওই ভাল ছেলেটার জন্যে তুমি আমার সঙ্গে আসতে পেরেছ। ক্রিমিনাল দেখতে চেয়েছিলে না? আমিই ক্রাইম করে তোমাকে দেখিয়ে দেব ক্রিমিনাল কাকে বলে। আমি যখন কথা বলব তখন একদম বকবক করবে না।”

“জলে না ডাঙায়?” ব্রাউন অত্যন্ত নিরীহ গলায় প্রশ্ন করল।

মেজর এর জবাব দিলেন না। পকেট থেকে চুরুট বের করে ধরাবার চেষ্টা করলেন কিন্তু হাওয়ার দাপটে কিছুতেই চুরুটে আগুন লাগছিল না।

এখন ওরা স্টিমারঘাটা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। সমুদ্রের রঙে অতি সামান্য নীল মিশেছে। আশেপাশে অবশ্য অনেক রঙিন পালতোলা নৌকো ভাসছে। ওপাশের আকাশ যেন জলেই ঢুকে গিয়েছে। স্টিমারঘাটা কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এটা কি যে গতিতে মোটরবোট ছুটছে তার কারণে? হঠাৎ অর্জুন বলে উঠল, “দাঁড়-টানা নৌকোয় এলে হত।”

মেজর মুখ ফেরালেন, “তখন তো বলেছিলাম টু-সিটার নাও। তুমি রাস্তা থেকে লোক ডেকে এনে ভিড় বাড়ালে আর দাঁড়-টানা নৌকোয় কী করে উঠবে?”

অর্জুন উত্তর দিকে তাকাল। দাঁড়-টানা নৌকোয় একঘণ্টা কাটালে মোটরবোটে কতক্ষণ লাগবে? এ হিসেব তার জানা নেই। সূর্য মাথার ওপরে সাড়ে বারোটায় আসবে কিন্তু যখন সূর্যকে দেখাই যাবে না তখন আর সেটা বোঝার উপায় কী! তা ছাড়া যে কোনও সমুদ্রের উত্তর দিকে চললেই যদি লকারে লেখাটা সত্যি হয়ে যেত তা হলে তো কথাই ছিল না।

হঠাৎ ড্রাইভার বলল, “ওই যে দ্বীপ।”

সমুদ্রের ওপর যেন পটলের মতো ডাঙা-জঙ্গল আচমকা আঁকা হয়েছে। অর্জুন দেখল দ্বীপটার কাছেপিঠে কোনও নৌকো নেই। দ্বীপে কোনও মানুষ আছে কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না। এখন বালির চর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মোটরবোট একটা বড় পাথরের গায়ে লাগিয়ে ড্রাইভার বলল, “এখানে আপনাদের নামতে হবে। পাথরগুলোর ওপরে পা ফেলে দ্বীপে নেমে যান।” সে হাত বাড়াল টাকার জন্য। মেজর বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মার্শাল এখানে ল্যান্ডিং-এর কোনও ব্যবস্থা করেননি?”

“করেছেন। তবে সেটা দ্বীপের ওপাশে। আমার স্টকে যা তেল আছে ওপাশে গেলে আর ফিরে যেতে পারব না।” টাকাটা গুনে নিয়ে ওদের পাথরের ওপর তুলে দিয়ে ড্রাইভার বোট নিয়ে ফিরে গেল। খুব সন্তর্পণে ভেজা পাথরের ওপর পা রেখে এরা এগোচ্ছিল। প্রথমে মেজর, মাঝখানে অর্জুন, শেষে ব্রাউন। পাথরগুলোর গায়ে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ায় জল ছিটকে উঠছে। হঠাৎ পেছন থেকে ব্রাউন প্রায় গোঁগোঁ করে চিৎকার করে উঠল। অর্জুন মুখ ফিরিয়ে দেখল ব্রাউন হাত তুলে একশো ফুট দূরের সমুদ্র দেখাচ্ছে। সেখানে একটা হাঙরের বিশাল পাখনা তখন জলে ডুবে যাচ্ছিল।

সঙ্গে সঙ্গে মেজর চিৎকার করে উঠলেন, “শার্ক, শার্ক! ওটা শার্ক।”

ব্রাউনের গলায় এবার শব্দ ফুটল, “ওই শব্দটা কিছুতেই মনে পড়ছিল না। শার্ক!”

ততক্ষণে জলের নীচে হারিয়ে গেছে জন্তুটা। সমুদ্রের চেহারা ওইখানে আবার নিরীহ। অর্জুন বলল, “বাস! কী বিশাল হাঙর। পাখনাটাই যদি অত বড় হয়!”

মেজর গম্ভীর হলেন, “সিনেমা দ্যাখোনি? হাঙরকে নিয়ে সিনেমা হয়েছিল। একটা ছোট লঞ্চ ডুবিয়ে দিয়েছিল। নৌকোফৌকো তো ওর কাছে খেলনা।”

অর্জুন দেখল তাদের মোটরবোট এখন দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয় হাঙরটা ওকে তাড়া করেনি। পাথর টপটে টপকে তীরে এসে মেজর বললেন, “ওই লোকটা তখন তোমার একটাই উপকার করেছিল। তোমাকে জলে হাত দিতে নিষেধ করেছিল। অবশ্য তারপর মেয়েদের মতো কানে-কানে কথা বলে আমার সিমপ্যাথি হারিয়েছে।”

ব্রাউন বলে উঠল, “হু কেয়ার্স! তোমার সিমপ্যাথির জন্যে যেন আমি বসে আছি!”

মেজর অবাক হয়ে বললেন, “তাজ্জব ব্যাপার তো। দয়া করে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি অথচ কোনও কৃতজ্ঞতাবোধ নেই। এ দেখছি সেই ছুঁচোর মতন।”

“ছুঁচো? কোন ছুঁচো?” ব্রাউন চোখ ছোট করল।

“বুঝলে অর্জুন, একবার আমি বেইরুটে মাসখানেক ছিলাম বাড়ি ভাড়া করে। হঠাৎ একদিন রাস্তায় একটা এই টাইপের লোক এসে বলল, ‘আপনাকে দেখে ভদ্রলোক বলে মনে হচ্ছে। আমি আপনার সঙ্গে যাব। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়।

“আপনি যেখানে যাবেন।

“আমি বাড়িতে ফিরছি।

“চলুন। আমিও যাই। আমার নাম ফুরাদ।

“তা বেশ, কিন্তু তুমি খামোকা আমার বাড়িতে যাবে কেন? আমি তোমাকে চিনিই না।

“তাতে কী! চিনে নিতে অসুবিধে নেই। ফুরাদ নির্বিকার হয়ে বলছিল।

“মনে হল লোকটা ঠাট্টা করছে। এ-দেশে বোধ হয় এই ধরনের ঠাট্টার চল আছে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে বাড়িতে এলাম। দেখি ফুরাদও আসছে। একদম বাড়ির দরজাতে ও পৌঁছে গেল। খুব চেঁচামেচি করলাম। লোক জমে গেল, কিন্তু ফুরাদ কোনও কথা বলছে না। এদিকে পাবলিক আমাকে বলতে আরম্ভ করেছে, “আপনি আচ্ছা লোক তো, একটা মানুষ আপনার কোনও ক্ষতি না করে সঙ্গে-সঙ্গে এসেছে, শুধু এই কারণে এমন খেপে গেলেন?

“একজন পুলিশ-অফিসার এসে জানতে চাইল আমার সমস্যা। তাকে সব বললাম। সে ফুরাদকে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই লোকটা যদি আপনাকে খারাপ কথা বলে থাকে, তা হলে এখনই ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাব।

“বলতে বাধ্য হলাম সে খারাপ কিছু বলেনি।

“অপমান করেছে?

“না।

“তা হলে দয়া করে রাস্তায় ভিড় জমাবেন না। এটাও একটা অপরাধ। সবাই চলে গেল, কিন্তু ফুরাদ রইল দাঁড়িয়ে। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সময় সে ঢুকতে চাইলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু জানলা দিয়ে দেখলাম সে বসে আছে দরজার সামনে আর রাস্তা দিয়ে যে মানুষ যাচ্ছে তাকেই বলছে, “কী করব ভাই, এই বাড়ির ভাড়াটে আমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছেন। ব্যবহারেই তো মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়।

“বোঝো অবস্থা। দশ-বারোবার একই কথা শুনতে-শুনতে মাথা গরম হয়ে গেল। শেষে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলাম, “ফুরাদ। কী চাও তুমি? ভেতরে গিয়ে আরাম করতে।”

“রাগের মাথায় ওকে ভেতরে আসতে বলতেই যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে বলল, “আপনি যদি চা বানান তা হলে আমারটাও নেবেন।

“তুমি আমার অবস্থা বুঝতে পারবে না অর্জুন। খুন না করলে ওর হাত থেকে যেন নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। ছুঁচোটাকে আমাকে বাধ্য হয়ে গিলতে হয়েছিল।’

মেজর থামতেই ব্রাউন বলল, “অনেকক্ষণ থেকে মনে হচ্ছিল, এবার বুঝতে পারলাম। তুমি ফুরাদকে খুন করেছ!”

‘তোমার মাথা! দ্বিতীয় দিন রাতে আমার জামাকাপড় ব্যাগে ভরে ফুরাদ যখন ঘুমোচ্ছে তখন বেরুইট থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। আর ওই শহরে ‘কখনও যাব না বলে প্রতিজ্ঞা করেছি। কিন্তু কি জানতাম ইংল্যান্ডেও আর এক ফুরাদ আমার জন্যে অপেক্ষা করছে!

অর্জুন বলল, “আপনার গল্পটা খুব সুন্দর। কিন্তু এখানে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব?”

অতএব বালির চর ভেঙে হাঁটা শুরু হল। বিচিত্ররঙা কাঁকড়াগুলো তাদের আওয়াজ পেয়ে ছোটাছুটি আরম্ভ করে দিল। অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। আর এই সময় সূর্যদেব দেখা দিলেন। ঠিক মাথার ওপরে নয়, তিনি এখন পশ্চিমে ঢলেছেন। চড়াই ভেঙে ওপরে উঠে এসে ওরা খানিকটা জঙ্গল এবং গাথুরে জায়গা দেখতে পেল। কোনও মানুষের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। মেজর বললেন, “মার্শালটা কোথায়? আমাদের ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে গেল তো? একবার প্রশান্ত মহাসাগরের খুনে দ্বীপে আমি সাতদিন আটকে ছিলাম।”

ব্রাউন হঠাৎ বলে উঠল, “নো মোর স্টোরিজ।”

মেজর থমকে দাঁড়ালেন। সম্ভবত আজ পর্যন্ত কেউ তাঁকে গল্প বলতে বাধা দেয়নি। হয়তো একটা বিস্ফোরণ ঘটত, তার আগেই জঙ্গল ফুঁড়ে একটি লোক বেরিয়ে এল। চেহারা দেখে মনে হয় পুলিশ কিংবা মিলিটারিতে কাজ করেছে কিছুদিন। লোকটা বেশ কঠোর মুখে ওদের দেখে বলল, “তোরা কেন এখানে এসেছ? অনুমতি ছাড়া এখানে প্রবেশ নিষেধ।”

অর্জুন বলল, “অনুমতি কার কাছে নিতে হবে?”

লোকটা তখন মেজর আর ব্রাউনের চেহারা দেখছে। উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “দুজনে এক মেক আপ নিয়েছ কেন? এটা কি নাটক করার জায়গা? নাউ, গেট লস্ট, এই দ্বীপ থেকে এখনই চলে যাও।”

এবার মেজর গলা তুললেন, “চলে যাব? চলে যাওয়ার জন্যে এত দুরে এসেছি! আমাকে নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে অপমান করা হচ্ছে? তুমি কে হে?”

“আপনাকে এখানে আসার জন্যে নেমন্তন্ন করা হয়েছে?” লোকটি যেন অবাক।

“আজ্ঞে হ্যাঁ। একবার বললে বুঝতে পারো না কেন?”

“বেশ। আপনি আমার সঙ্গে আসুন। এবং জেন্টলমেন, আপনারা দয়া করে এখানেই অপেক্ষা করুন। এই দ্বীপের ভেতর এলোমেলো ঘুরে বেড়াবেন না।” লোকটা ফিরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াল। মেজর অর্জুনের দিকে তাকালেন, তারপর চেঁচিয়ে বললেন, “আমাকে একা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন?”

“নিরাপত্তার প্রয়োজনে।” লোকটা উত্তর দিল।

অতএব ইচ্ছার বিরুদ্ধেই মেজর রওনা হলেন। ব্রাউন বলল, “এই জঙ্গলে না দাঁড়িয়ে চলো সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসি। যেমন তোমার মেজর আর তেমন তার বন্ধু।”

অর্জুনের এই ব্যাপারটা ভাল লাগল না। মেজরকে ওরা এভাবে ছেড়ে না দিলেই পারত। সে বলল, “মিস্টার ব্রাউন, যদি কিছু মনে না করেন তা হলে আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুরে আসছি।”

ব্রাউনকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মেজর যে-পথে গিয়েছিল, সে সেই পথে পা বাড়াল। শুকনো পাতা আর মাথা পর্যন্ত বেড়ে ওঠা গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে সে এগোতে লাগল। পায়ে চলার পথ একটা আছে বটে কিন্তু সেই পথেই লোকটা মেজরকে নিয়ে গিয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছিল না। মিনিশ-দশেক যাওয়ার পর লোকজনের গলা শুনতে পেল সে। পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখল একটা মাঠের মতো জায়গায় অনেকগুলো ক্যাম্প খাটানো রয়েছে। কিছু লোক এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মেজরকে নজরে পড়ল না। কয়েকটা ছোট-ছোট হালকা নৌকো মাটিতে রাখা আছে।

হঠাৎ ঘাড়ের কাছে প্রচণ্ড আঘাত পেতেই জিনিসপত্র নিয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে অর্জুন। উঠে বসার চেষ্টা করতেই কেউ তাকে পেড়ে ফেলল। অর্জুন দেখল শক্ত চেহারার একটা লোক তাকে মাটিতে চেপে ধরে চিৎকার করছে। সঙ্গে-সঙ্গে ক্যাম্প থেকে লোকজন ছুটে এল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্জুনকে ওরা নিয়ে এল ক্যাম্প চত্বরে। লোকগুলো নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত গলায় কথা বলছিল। ইতিমধ্যে তার জিনিসপত্র হাঁটকানো হয়েছে। পাশপোর্ট বের করে ওরা চেহারাটা মিলিয়ে নিল। এবং তখন সেই লোকটা সামনে এসে দাঁড়াল। অর্জুনকে দেখে খুব রেগে গিয়ে বলল, “আমি তোমাদের অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। কে তুমি? কার হয়ে এখানে এসেছ?” আর একটা লোক তার পার্শপোর্ট এগিয়ে দিল, “হি ইজ ইন্ডিয়ান।”

“আই সি। ওকে ভেতরে নিয়ে এসো।”

অর্জুন নিজেই উঠতে পারল। যদিও তার কাঁধে বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে, কিন্তু সেটাকে এই মুহূর্তে আমল দিল না। ওরা ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। মোটরবোটের ড্রাইভার তাদের সাবধান করে দিয়েছিল, এই দ্বীপে লোকজনকে নিয়ে আসার নিষেধ আছে। পাহারাদারির এই নমুনা সেই কথাটাকেই প্রমাণ করে। মিস্টার মার্শাল একজন অভিযাত্রী, বিজ্ঞানী। তিনি কেন এমন গোপনীয়তা অবলম্বন করবেন? হয়তো মোটরবোটের ড্রাইভার মার্শালের নামটা গুলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সেইসঙ্গে তার আর একটা কৌতূহল তৈরি হল। এই লোকগুলো এমন দ্বীপে গোপনে কী কাজ করছে?

তাঁবুর ভেতর ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেল অর্জুন। একটা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন মেজর। কিন্তু তাঁর মুখে প্লাস্টার আঁটা। হাত-পা বাঁধা নয় কিন্তু তিনি অসহায়ের মতো হাত নেড়ে বোঝালেন তাঁর কিছুই করার নেই। লোকটা বলল, “কোনও মানুষ যে এমন চেঁচাতে পারে আমার ধারণা ছিল না। তাই ওঁর মুখ বন্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু উনি যদি ওই চেয়ার ছেড়ে একবার ওঠেন তা হলে হাঙর দিয়ে খাওয়ানো হবে। মনে হচ্ছে তোমার মুখ বন্ধ করার কোনও প্রয়োজন হবে না। ওইখানে বসতে পারো।”

একটা কাঠের বাক্সর ওপরে বসিয়ে দিল ওরা অর্জুনকে। এইসময় মেজর কিছু বলতে চাইলেন কিন্তু নাক দিয়েই শব্দ বের হল। ওঠার চেষ্টা করেই আবার বসে পড়লেন। লোকটা এবার অর্জুনের সামনে এসে দাঁড়াল, “তোমার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী?”

অর্জুন বলল, “ওঁর বন্ধুর নেমন্তন্নে উনি এসেছেন, সঙ্গে আমাকে এনেছেন। মেজর কথাটা শুনে মাথা নাড়লেন। লোকটা জিজ্ঞেস করল, “বন্ধুর নাম কী?”

“পুরো নাম জানি না। উপাধি হল মার্শাল।”

উত্তরটা শুনে লোকটা তার সঙ্গীর দিকে তাকাল। তারপর বলল, “তোমাদের কিছুক্ষণ এই তাঁবুতেই থাকতে হবে। বাইরে বেরোবার চেষ্টা করলে বিপদে পড়বে।”