॥ নয়।।
হাতকাটা লোকটি হঠাৎ গতি কমাতেই অর্জুনের পাশাপাশি হয়ে গেল। এবং তখনই অর্জুন চাপা গলা শুনতে পেল, “এই লোকটা বহুত বদমাস। দুজনের একসঙ্গে যাওয়া উচিত হবে না ভাই।”
এবং তখনই শিষ্যটাকে একটা গ্যারাজের মধ্যে ঢুকে যেতে দেখা গেল। গ্যারাজের ভেতর কড়া আলো জ্বলছে। বাইরে গোটা তিনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে। অর্জুন হাতকাটা লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমাকে চেনেন?”
ঘাড় কাত করে হাসল লোকটি, “বা, ট্রেনে দেখা হয়েছিল তো। একসঙ্গে দিল্লি-কালকায় এলাম। তোমরা ফার্স্ট ক্লাসে, আমি সেকেন্ডে।”
“আপনি কেন এসেছেন এখানে?”
“তুমি জানো না?”
“না।”
“তাহলে আমার বলা ঠিক হবে না। তুমি দাঁড়াও এখানে, আমি আসছি। মুহূর্তেই লোকটা উধাও হয়ে গেল। ওর যাওয়ার ভঙ্গিটা চিতাবাঘের মতো দ্রুত। কথা বলতে-বলতে যে গ্যারাজের পেছনটা লক্ষ করেছে, তা অর্জুন টের পায়নি। লোকটি যেদিকে গেল, সেদিকটায় আলো নেই। বাজারের শেষপ্রান্ত বলে তেমন লোক চলাচল নেই এপাশটায়। অর্জুন একটা থামে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতেই খেয়াল করল এটা ঠিক নয়। যে-কোনও মানুষের নজরে পড়বে এই রকম ভঙ্গিতে দাঁড়ালে। সে আর-একটু সরে গ্যারাজের দিকে তাকাল। হাতকাটা লোকটিকে দেখা যাচ্ছে না। গ্যারাজের আলোকিত অংশে কোনও আলোড়ন নেই। হাতকাটা লোকটিকে এখানে দেখবে, অর্জুন তা ভাবতেই পারেনি। চোখের সামনে দার্জিলিং মেলের কামরাটা ভেসে উঠল। চোরাই জিনিসপত্র টয়লেটে কী নিপুণ ভঙ্গিতে ওরা লুকিয়ে রাখছিল। এই হাতকাটা ছেলেটা ওদের পরিচালনা করছিল। সে-সময় ওর ভয়ে কামরায় কোনও প্রতিবাদ ওঠেনি। অর্জুনের মনে পড়ল, নিরিবিলি হয়ে পড়লে অমলদা উঠে গিয়ে হাতকাটার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তাহলে কি সেইসময়….? অর্জুন মাথা নাড়ল। এটা ভাবতে খুব অদ্ভুত লাগছে যে, এই হাতকাটা লোকটিকে অমলদা চণ্ডীগড়ে আসতে বলবে। কিন্তু এটা মিথ্যে ভাবারও তো কোনও কারণ নেই। উত্তরবঙ্গের একটা স্মাগলার ছেলের সঙ্গে পাঙ্কদের কোনও সম্পর্ক থাকতেই পারে না।
একটু-একটু করে অর্জুনের মনে ভার জমছিল। ‘অমলদা আজকাল তার সঙ্গে কোনও আলোচনাই করেন না। ওই বাজে লোকটাকে দলে টানার পরেও তো তাকে জানাতে পারতেন। ঠিক এইসময় অন্ধকার ফুঁড়ে হাতকাটা লোকটা ফির এল, “তাড়াতাড়ি কেটে পড়ো এখান থেকে। ওরা বোধহয় সন্দেহ করছে।
দ্রুত পা চালিয়ে ওরা বাজারে ফিরে এল। হাতকাটা লোকটা নিশ্বাস ফেলে একটা বিড়ি ধরানো মাত্র অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি জানেন অমলদা কোথায় উঠেছেন?”
“হুঁ! আচ্ছা, আবার দেখা হবে।” বলতে বলতে লোকটা উধাও হয়ে গেল।
আর এই লোকটাকে কাজে লাগাতে অর্জুন ধীরে ধীরে পার্কিং লটে ফিরে গাড়িতে বসে আছেন। মুখ গম্ভীর।
স্মাগলাররাই এই রকম অভদ্র হয়। অমলদা এতদূরে টেনে নিয়ে এলেন। আসতেই দেখতে পেল মিসেস রায় নির্ঘাত অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন। সে পেছনে উঠে বসামাত্র ড্রাইভার স্টার্ট নিল। আর মিসেস রায় গম্ভীর গলায় বললেন, “কেরানির চাকরিই করো কিংবা গোয়েন্দাগিরিই করো, সময়ের মূল্য যদি না বুঝতে পারো, তাহলে জীবনে উন্নতি করতে পারবে না।”
থতমত অর্জুন বলল, “সরি।”
মিসেস রায় কাঁধ নাচালেন। যার সঠিক মানে অর্জুন বুঝল না।
কাল সারা রাত বিষ্টুসাহেবের নাক ডেকেছে। সারা রাত বলাটা একটু বাড়াবাড়ি হল যদিও, কারণ অর্জুন সারা রাত জেগে থাকেনি। কিন্তু যখনই ঘুম ভেঙেছে, তখনই মনে হয়েছে একটা ছোটখাটো বাঘ ঘরে পায়চারি করছে। অর্জুন কোথাও পড়েছিল যে, দুর্বল মানুষের নাক বেশি ডাকে। সকালে ঘুম ভাঙা মাত্র আর-একটা শব্দ কানে এল। লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে বিষ্টুসাহেব টেপ রেকর্ডার চালিয়েছেন। যন্ত্রটি লেপের ভেতরেই। এবং সেখান থেকে পাঙ্কদের সঙ্গীত ভেসে আসছে। একেই পাঙ্কদের গান, তার ওপর লেপ চাপা থাকায় সেটি কোনও চেহারাই পাচ্ছিল না। বিছানায় উঠে বসে অর্জুন জিজ্ঞেস করেছিল, “ও কী করছেন?”
বিষ্টুসাহেব ধীরে-ধীরে মুখ থেকে লেপের আড়াল সরিয়ে নিলেন, “ভেতরটা ধুয়ে নিচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন গানের সুরে হৃদয় ধুয়ে যায়। তোমার ক্যাসেটে তো এ ছাড়া কোনও গান নেই। ঠিক আছে?”
“কাল রাত্রে আপনার খুব নাক ডেকেছে।”
“অসম্ভব।” অর্জুন হেসে ফেলল। যাদের নাক ডাকে, তারা নাকি টের পায় না। ঠিক এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। এই ঘরে একটা এক্সটেন্ডেড লাইন আছে। ‘জ্বালাল’ বলে বিষ্টুসাহেব হাত বাড়িয়ে শুয়ে শুয়েই রিসিভার তুলে হাঁকলেন, “হ্যালো! কে…অ্যাঁ? …ওহো! কী খবর?…
ঠিক আছে! খুব ঠাণ্ডা। …তাই নাকি! না না, আমার বরফ ভাল লাগে। …হ্যাঁ। ঘুমুচ্ছিল, উঠেছে। কথা বলুন।” ইঙ্গিতে ডাকলেন বিষ্টুসাহেব অর্জুনকে।
রিসিভার কানে ঠেকিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই অমলদার গলা শুনতে পেল। “অর্জুন, আজ সকালেই চণ্ডীগড় থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। ন’টার বাস। মানালিতে নেমে পালবাবুর হোটেল খুঁজবে। বিষ্টুসাহেব যদি ঠাণ্ডার জন্যে না যেতে চান তাহলে ওঁকে এখানেই থেকে যেতে বলো। বাস টার্মিনাসে এলেই টিকিট পেয়ে যাবে। বেশি সময় নেই।” কট্ করে লাইনটা কেটে গেল। অর্জুন ঘড়ির দিকে তাকাল। ন’টা বাজতে বেশি দেরি নেই। বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল অর্জুন, “নটায় মানালির বাস ছাড়বে। অমলদা বললেন, ইচ্ছে হলে এখানেই আপনি থাকতে পারেন।”
“হোয়াই? তোমরা কী ভাবো আমাকে? আমার কোনও দায়িত্ববোধ নেই?” ঝটপট লেপ সরিয়ে ফেলতে বিকট গলার গান সোচ্চার হল।
বিষ্টুসাহেব এক আঙুলে স্টপ বোতামটা টিপতেই অর্জুন বলল, “কিন্তু ওখানে শুনেছি বেদম ঠাণ্ডা।”
“হুঁ! ঠাণ্ডার ভয় দেখিও না আমাকে। আই অ্যাম ফ্রম কালিম্পং! ঠিক আছে।”
.
চণ্ডীগড়ের বাস টার্মিনাসটা খুব বড়। ওদিকে দিল্লি, এদিকে সিমলা, মানালি,
ওপাশে হরিদ্বার-দেরাদুন পর্যন্ত বাস ছুটছে। টার্মিনাস বিল্ডিংটা রেলওয়ে স্টেশনের মতন। স্কুটারে আসতে খুব ঠাণ্ডা হাওয়া লেগেছিল। বিষ্টু সাহেব দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছিলেন, “যাই বলো, ইন্ডিয়ান শাল না জড়ালে কোনও সুখ হয় না।”
অর্জুন কিন্তু অন্য কথা ভাবছিল। তারা যে মানালি যাচ্ছে সে-খবর রায়সাহেবরা জানেন। মূল টেলিফোনটা তো মিসেস রায় ধরেছিলেন। অতএব অমলদার কথাবার্তা ওঁরা শুনতেই পারেন। অতএব তাদের মানালিতে যাওয়া নিয়ে কোনও লুকোছাপা নেই। এইটে কেন অমলদা করলেন? মানালিতে সে কী কারণে যাচ্ছে তা অবশ্য জানে না, কিন্তু নিছক বেড়াতে যে যাচ্ছে না, তা তো বোঝাই যায়। রায়সাহেব নিশ্চয়ই কাউকে বলবেন না, কিন্তু মিসেস রায়কে বোঝা মুশকিল। তারা আসার পর থেকেই ভদ্রমহিলা যেন বেশ বিরক্ত।
চণ্ডীগড়ের বাস যেখানে দাঁড়ায়, সেখানে গিয়ে চমকে উঠল অর্জুন। একজন পাঞ্জারি বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটা লাঠির ডগায় পিনবোর্ড ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই পিনবোর্ডে লেখা আছে, ‘থার্ড পাণ্ডব অ্যান্ড বি.সি. পি।’ আশেপাশে যারা যাওয়া আসা করছে, তারা বেশ কৌতুহলী চোখে দেখছে ভদ্রলোককে। অর্জুন চারপাশে তাকিয়ে দেখল, অমলদার কোনও চিহ্ন নেই। বিষ্টুসাহেব ব্যাপারটা লক্ষ করে বললেন, “কোড ল্যাঙ্গুয়েজ? ইন্টারেস্টিং তোমার দাদা কোথায়?”
বাস ছাড়তে আর দেরি নেই। যাত্রীরা সবাই প্রায় বাসে উঠে পড়েছে। তবে বাসের ছাতে এখনও মালপত্র বাঁধা শেষ হয়নি। অর্জুন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, “আপনি কাউকে খুঁজছেন?” ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ। আপনাদের নাম?”
অর্জুন নিজের এবং বিষ্টুসাহেবের পরিচয় দিল। ভদ্রলোক ওদের ভাল করে দেখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কেথায় যাবেন?”
“মানালি।”
“কোথায় উঠবেন?”
“পালবাবুর হোটেলে!”
কথাটা শোনামাত্র লোকটি সহজ ভঙ্গিতে পকেট থেকে দুটো টিকিট বের করে বললেন, “এই বাসটার টিকিট আগে থেকে রিজার্ভ না করলে পাওয়া যায় না। যান, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন। এখনই ছেড়ে দেবে।”
হর্ন বাজছিল। কোনও প্রশ্ন করার সময় নেই। ওরা কোনওরকমে ছুটে এসে বাসের ভেতরে ঢুকে পড়তেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সিট দুটো জানলার পাশে। বিষ্টুসাহেব বললেন, “তুমি ধারেরটায় বোসো। পাহাড়-টাহাড় দেখতে পাবে। আমি সারা জীবন অনেক দেখেছি।”
খুব ভাল লাগল অর্জুনের। ঠিক জানলার গায়ে বসায় আনন্দ আছে। সে দেখল সমস্ত চণ্ডীগড় শহরটা পেরিয়ে বাসটা চমৎকার পিচের রাস্তায় ছুটে যাচ্ছে পঞ্জাবের গ্রামের ওপর দিয়ে। চারধারে কেমন একটা রুখ-রুখু ভাব। হঠাৎ কোমরে একটা খোঁচা খেতেই সে চমকে বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকাল। বিষ্টুসাহেব চেষ্টা করছেন নির্বিকার হয়ে বসে থাকতে। কিন্তু তাঁর চিবুক কাঁপছে। অর্জুন যে তাকিয়েছে, সেটাও লক্ষ না করে আর-একবার খোঁচালেন তিনি।
অর্জুন বিরক্ত হল, “কী হচ্ছে?”
নির্বিকার ভাব বজায় রেখে বিষ্টুসাহেব বললেন, “আস্তে কথা বলো। আমাদের বোধহয় ফলো করা হচ্ছে। সামনের যে কোনও স্টপে নেমে পড়তে হবে কায়দা করে।”
অর্জুন অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে ফলো করছে?”
“পাঙ্কস্!”
“পাঙ্কস্?”
“একজন নয়, দুজন। সামনের সিটে, ডান দিকে।”
অর্জুন এবার বাসের ভেতরে তাকাল। বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ রয়েছেন। ঠিক তাদের পাশেই এক বাঙালি পরিবার যাচ্ছে। দ্রুতগামী বাসে সবাই যে যার মতো বসে। অর্জুন সামনের ডানদিকে তাকাল। দুটো টুপি পরা লোক বসে আছে। বিষ্টুসাহেব বললেন, “একটু আগে দু’জনই টুপি খুলে ছিল। আমি দেখেছি। সেন্ট পার্সেন্ট ন্যাড়া সাহেব। ঠিক আছে?”
“ন্যাড়া সাহেব?”
“ইয়েস? সাহেবরা কখন ন্যাড়া হয়? বৈষ্ণব না হলে। বাট তখনও টিকি থাকবে। এই দু’জন উইদাউট টিকিস।”
“টিকিস?”
“হ্যাঁ। দুটো টিকি দুজনের। একমাত্র পাঙ্করাই ভারতবর্ষে এসে মাথা কামায়। তা ছাড়া চোখমুখের চাহনি খুব বিশ্রী। এরপরেই নেমে পড়তে হবে। ঠিক আছে?”
কেন?”
“বাঃ। বোকার মতো কথা বোলো না। পাঙ্করা খুব হিংস্র হয় বিল কীভাবে মরল দ্যাখোনি? তার ওপর তুমি জানলার ধারে বসেছ। ডেঞ্জারাস।”
হাসি চাপার জন্যে মুখ ফিরিয়ে নিল অর্জুন। বিষ্টুসাহেব কেন তাকে জানলার ধারের সিট ছেড়ে দিলেন, তা বোঝা যাচ্ছে। বিল এই জানলার পাশেই খুন হয়। কিন্তু এই লোকদুটো যে পাঙ্ক, সেটা স্পষ্ট নয়। ন্যাড়া-মাথার সাহেব মানেই যে পাঙ্ক ভাবতে হবে, এমন কোনও কারণ নেই।
অর্জুন বিষ্টুসাহেবকে কিছু বলল না। তিনি তখনও উত্তেজনা কমাতে পারেন নি। তবে নিজেকে আড়াল করতেই খানিকটা নীচে নেমে বসেছেন, যাতে চট করে তাঁকে না দেখা যায়। অর্জুন টুপি দুটোকে লক্ষ করল। সামনের কোনও আসন খালি নেই যে, এগিয়ে গিয়ে ওদের পাশে বসা যায়।
অর্জুনের মনে হল মানালিতে খুব চমকপ্রদ ব্যাপার ঘটবে। মানালির নামই সে শুনে এসেছে এতকাল। হিমালয়ের সবচেয়ে সুন্দর শহর। কিন্তু অমলদা যে-গলায় তাদের মানালিতে যেতে বললেন, যেভাবে বাস টার্মিনাসে টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, তাতে মনে হচ্ছে, মানালিতেই রহস্যের জট খুলতে পারে।
একটু পরেই বাস যে-জায়গায় থামল, তার নাম রোপার। কেউ নামল না, বরং কাউকে উঠতেও দেওয়া হল না। ড্রাইভারের বোধহয় কোনও কাজ ছিল, চটপট সেরে এল। অর্জুন দেখল, রোপারেও কিছু বাঙালি আছেন। এরপর বাস ওপরে উঠতে আরম্ভ করল। দার্জিলিং এবং কালিম্পংয়ের রাস্তার এবং পাহাড়ের চেহারা আলাদা। অত কাছাকাছি বলতে গেলে গায়ে-গায়ে থাকা সত্ত্বেও দুটো শহরে দু’রকম আবহাওয়া। আর এত দূরে, এই হিমালয়ের চেহারা যে অন্যরকম হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তবু, বাসের জানলা দিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে অর্জুনের মনে হচ্ছিল কালিম্পংয়ের পাহাড় অনেক বেশি সুন্দর। একথা বিষ্টুসাহেবকে জানাতে তিনি যেন টেনশন-মুক্ত হয়ে বললেন, “ঠিক আছে।”
বিলাসপুরের বাসস্ট্যান্ড বেশ বড়। ছোটখাটো এই পাহাড়ি শহরটায় বাসটা আধ ঘণ্টার জন্যে থামল, যাতে যাত্রীরা একঘেয়েমি কাটাতে পারে। স্ট্যান্ডে ঢুকতেই দেখা গেল, দূরপাল্লার কিছু বাস তখনও বিশ্রাম নিচ্ছে সেখানে। যাত্রীরা যখন নামছে তখন দেখা গেল, জোড়াটুপি উঠছে না। ওদের মুখ দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল অর্জুনের, কিন্তু ড্রাইভারের পেছনে যাওয়ার কোনও ছুতো পাচ্ছিল না। সে বিষ্টুসাহবকে জিজ্ঞেস করল, “নামবেন না?”
অলস ভঙ্গিতে প্রথমে ‘না’ বলতে গিয়েই মত পাল্টে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি, “চলো।”
অবাক হয়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”
“নাঃ, স্টেট বাসে একা বসে থাকা সেফ নয়।”
বাইরে হাল্কা ঠাণ্ডা। চায়ের দোকানে বেজায় ভিড়। বাস এত উঁচু যে, নীচে নামার পর টুপি জোড়াকে দেখা যাচ্ছে না। চারপাশে তাকিয়ে দেখল সে। কোনও সন্দেহজনক চরিত্র নেই।
মাণ্ডিতেও লোকদুটো নামল না। দুজন মানুষ সকাল থেকে ঠায় বসে আছে, প্রাকৃতিক প্রয়োজনও তো হওয়া উচিত। মাণ্ডি ছাড়াবার পরই দম বন্ধ হয়ে আসছিল অর্জুনের। পাহাড় পেঁচিয়ে ওঠা রাস্তা এত সরু যে, প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে, বাসটা হড়কে পড়ল খাদে। আর সেই খাদের দিকে ঢললে বিধাতাও প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। ইঞ্জিনের টানা গোঙানি ছাড়া আর যে আওয়াজটা কানে আসছে, সেটা হল বিষ্টুসাহেবের নাসিকাগর্জন। মাণ্ডিতে পেট ভরে খাওয়ার পর সেই যে চোখ বন্ধ করেছেন, সম্ভবত কুলুর আগে খুলবেন না। অর্জুন বাসের অন্য যাত্রীদের দিকে তাকাল। কেউ কোনও কথা বলছে না। এখনও সন্ধে হতে দেরি, কিন্তু বেশ গাঢ় ছায়া নেমে গেছে ইতিমধ্যে। ঠাণ্ডা বাড়ছে। জানলা বন্ধ করে দিয়ে চোখ বুজল অর্জুন। যা হবার তা হোক।
কুলুতে যখন পৌঁছল ওরা, তখন হাল্কা সন্ধে। যদিও কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ঠাণ্ডাটা মালুম হল। কুলু ভারতবর্ষের সবচেয়ে সুন্দর উপত্যকা। কিন্তু এখন দাঁতালো হাওয়া বইছে এখানে। বাসটা যেখানে থামল সেটা বাজার এলাকা। কিছু যাত্রী নেমে যাচ্ছে এখানে। অর্জুন হাত-পায়ের জড়তা ছাড়াবার জন্যে নীচে নামল। বিষ্টুসাহেব আর সে কষ্ট করতে রাজি নন। তাঁর চোখ তখনও বন্ধ। অর্জুনের মনে পড়ল, মাণ্ডিতে বিষ্টুসাহেব দুটো বমি-নিরোধক বড়ি খেয়েছিলেন। ওতে বোধহয় ঘুম বেড়ে যায়। ভাগ্যিস সে খায়নি।
উল্টোদিকের একটা দোকান থেকে এক গ্লাস গরম চা নিয়ে অর্জুন দেখল রাস্তাঘাটে লোকজন কম। দোকানগুলোতে আলো জ্বলছে, কিন্তু খদ্দের নেই। কয়েকটা দালাল-টাইপের লোক বাস থেকে নামা যাত্রীদের হোটেলের খবর দিচ্ছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে অর্জুনের চোখে পড়ল একজন নান্ এগিয়ে আসছেন। তাঁর পেছনে দুটো হুইল-চেয়ার নিয়ে দুজন মানুষ। কণ্ডাক্টরকে কিছু জিজ্ঞেস করার পর নান্ লোক দুটির দিকে মাথা নাড়তেই তারা বাসের ভেতরে ঢুকে গেল। তারপরই অর্জুন চমকে উঠল। দুজন মানুষ প্রথমে যাকে বয়ে নিয়ে সাবধানে বাস থেকে নামল, তার দুটো পা নেই, খুবই শীর্ণ চেহারা। নামবার সময় টুপিটা পড়ে যেতে লোকটার ন্যাড়া মাথা দেখা গেল। ওকে হুইল-চেয়ারে চাপিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় জনকে নিয়ে এল লোক দুটো। এরও হাঁটা চলার শক্তি নেই। মুখের ভঙ্গিও স্বাভাবিক নয়। দুজনেই বিদেশি। কেউ হয়তো চণ্ডীগড়ে বাসে তুলে দিয়েছিল, এঁরা নামিয়ে নিচ্ছেন!
হুইল-চেয়ারে চড়ে জোড়া-টুপি চলে যেতে অর্জুনের মন খারাপ হয়ে গেল। অকারণে সে সবাইকে সন্দেহ করে। সত্যসন্ধান করতে গিয়ে অসত্যকে আঁকড়ে ধরার কোনও যুক্তি নেই। এই দুটি অসহায় মানুষের কাছে মনে-মনে ক্ষমা চাইল সে।
