চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ৩

।। তিন।।

অর্জুন ভেবেছিল বিষ্টুসাহেব নিশ্চয়ই সরাসরি চণ্ডীগড়ের টিকিট কেটেছেন। যদিও চণ্ডীগড়ে যাওয়ার কোনও ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ছাড়ে না, কিন্তু দিল্লিতে যাওয়া যায়। ভারতবর্ষের ম্যাপটা ওর মুখস্থ, দিল্লি থেকে চণ্ডীগড় তো বেশি দূরে নয়। কিন্তু বিষ্টুসাহেব বললেন, “ও ট্রেনের টিকিট পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা। তিন মাস আগেই রিজার্ভড হয়ে থাকে। আমরা কলকাতা হয়ে চণ্ডীগড়ে যাব। ঠিক আছে?”

ব্যবস্থাটা অমলদার মনঃপুত হয়নি, কিন্তু অর্জুনের ভাল লাগল। আজ অবধি সে কখনও কলকাতায় যায়নি। যায়নি, কারণ যাওয়ার দরকার পড়েনি। কিন্তু কলকাতা তাকে সব সময় টানে। ওই শহরে ব্যোমকেশ, কিরীটি রায় এবং ফেলুদার বাড়ি। কলকাতা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের শহর। কলকাতা শব্দটা উচ্চারণ করলেই নানান ছবি মনে ভেসে আসে। কিন্তু সন্ধেবেলায় দার্জিলিং মেলের একটি থ্রি-টিয়ার কামরায় বসে অমলদা বললেন, “সময় নষ্ট করার কোনও দরকার ছিল না। তা ছাড়া এই ট্রেনটার খুব দুর্নাম শুনেছি। আপনি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট পাননি?”

“উঁহু! ফার্স্ট ক্লাসে বেশি ভিড়। আমার এক পরিচিত ছোঁড়াকে বলতে সে এই তিনটে টিকিটের ব্যবস্থা করে দিল। হাই তুললেন বিষ্টুসাহেব, “একটা রাতের তো ব্যাপার, ঘুমিয়ে পড়লেই ভোর হয়ে যাবে। ঠিক আছে?”

অমলদা ট্রেন ছাড়ার পর থেকেই জানলার কাচ নামিয়ে সেখানে হেলান দিয়ে বই নিয়ে বসে ছিলেন, কথাটা শুনে হেসে বললেন, “ভাল হয়ে গেলে সেরে যাবে গোছের ব্যাপার! অর্জুন, চোখ-কান খোলা রেখো।”

একপাশের তিনটে বার্থ ওদের। মাঝখানে বিষ্টুসাহেব বসে। অর্জুন বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকাল। তারা যাচ্ছে চণ্ডীগড়ে। আশা করা যায়, সেখানেই রহস্য-টহস্য রয়েছে। দার্জিলিং মেলে বসে খামোকা চোখ-কান খোলা রেখে কী হবে? ও দেখল বিষ্টুসাহেবও কথাটাকে আমল দিচ্ছেন না। কারণ তিনি নিঃশব্দে ইশারায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন, চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়াই ঢের ভাল।

অন্ধকার দিয়ে ট্রেনটা এখন হু হু করে ছুটে যাচ্ছে। কামরার প্রতিটি জানলা বন্ধ রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কনকনে শীত চুঁইয়ে-চুঁইয়ে ঢুকছে ভিতরে। ট্রেনে ওঠার আগে ওরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে রাতের খাবার খেয়ে উঠেছিল। অর্জুনের মনে হচ্ছিল এই বেলা বিছানা করে শুয়ে পড়লেই ভাল হয়। যদিও রাত বেশি হয়নি, কিন্তু দারুণ শীতে কামরায় বেশ ঘুম-ঘুম ভাব এসে গিয়েছে। এই সময় বিষ্টুসাহেব ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “চণ্ডীগড় কী জন্য ফেমাস হে?”

আচমকা এরকম প্রশ্নে অর্জুনের বেশ গুলিয়ে গেল। সে প্রাণপণে মনে করতে চেষ্টা করতে লাগল কী কারণে চণ্ডীগড় বিখ্যাত হতে পারে। ঠিক সেই সময় ট্রেনটা আচমকা স্পিড কমিয়ে থেমে গেল। জানলার কাচের আড়াল ভেদ করে কোনও আলো দেখা যাচ্ছে না। ট্রেনটা থেমে যাওয়ামাত্র দরজায় ঘন-ঘন শব্দ হচ্ছিল। বিটুসাহেব চমকে উঠলেন, “হোয়াটস্ দ্যাট? মাস্ট বি ডাকাত।”

“কী করে মনে হল?” বইয়ের পাতা থেকে চোখ না সরিয়ে অমলদা জিজ্ঞেস করলেন।

“বাইরে থেকে কীরকম অসভ্যের মতো ধাক্কা দিচ্ছে।” বিষ্টুসাহেব কথাটা শেষ করেননি, এমন সময় দরজার কাছে বসা যাত্রীরা চিৎকার করে উঠলেন, “আরে, করছ কী! খুলো না, খুলো না!”

অর্জুন মুখ বাড়িয়ে দেখল একটি অল্পবয়সী ছেলে দরজার লক খুলে দিতেই হুড়মুড় করে জনা ছয়েক উঠে এল কামরায়। প্রত্যেকের বয়স তিরিশের নীচে। ওরা বড়-বড় কয়েকটা গাঁটরি তুলে নিল নীচ থেকে। তারপর দরজা বন্ধ করে চারপাশে চোখ বোলাল। যে ছেলেটার একটা হাত কাটা, সরু প্যান্ট আর লাল সোয়েটারের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে উলের টুপি মাথায়, সে-ই যে নেতা, তা বুঝতে সময় লাগল না। কারণ হাতকাটা জিজ্ঞেস করল, “কোনও দু’ নম্বর মাল আছে গাড়িতে?”

যে ছেলেটি দরজা খুলেছিল, সে মাথা নাড়ল, “মনে হয় না।”

গাড়ি তখন আবার চলতে শুরু করেছে। গতি বাড়ছে চাকার। ছেলেটি খুব দেমাকি চালে কামরার মাঝখানে চলে এল, “শুনুন সবাই, আমরা আপনাদের একটু বিরক্ত করছি। ব্যবসার খাতিরে দুটো টয়লেট আমাদের দরকার হবে। আপনারা যে যেমন আছেন, তেমনি থাকুন এক ঘণ্টা। আমরা লোক খারাপ নই, কোনও ক্ষতি করব না আপনাদের। কিন্তু যিনি উল্টো কথা বলবেন, তাকে সিধে করে দেব। অলরাইট, ঘুমিয়ে পড়ুন।

ছেলেটি আবার দরজার কাছে ফিরে গিয়ে নির্দেশ দিল, “নে, হাত চালা, কুইক।”

থ্রি-টিয়ার কামরা হলেও টয়লেটের সামনে কিছু মানুষ শুয়ে-বসে রয়েছে। হাতকাটা তাদের সামান্য সরিয়ে দলটাকে মালসমেত দুটো টয়লেটে ঢুকিয়ে দিল। তারপর পেটের কাছে ভাল হাতটা সজাগ রেখে কামরার ওপর সতর্ক চোখ রাখল।

হঠাৎ যেন যাত্রীদের নিশ্বাসের শব্দ শোনা যেতে লাগল। কেউ কোনও কথা বলছেন না। যেন অবশ্যম্ভাবী একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, কিছুই করার নেই, এই রকম ভঙ্গিতে যে যার জায়গায় শুয়ে বসে রইল। অর্জুন ছেলেগুলোকে দেখছিল। চেহারা দেখে কাউকে বদলোক বলে মনে হচ্ছে না। বয়সও বেশি নয়। কিন্তু এরা খুব অন্যায় কিছু করছে তাতে সন্দেহ নেই। অন্যায়টা এরা জোরগলায় করছে।

এই সময় বিষ্টুসাহেব কথা বললেন। যদিও তাঁর গলার সুর শুকনো এবং ফ্যাঁসফেঁসে হয়েছে এই মুহূর্তে, তবু শোনা গেল, “টি. টি. কোথায়?”

অমলদা বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বললেন, “তাঁকে দরকার পড়ল কেন?”

“এটা অন্যায়। রিজার্ভড কামরায় উঠে ধমক দিচ্ছে। টি. টি. দেখবে না? দেশটার কী হল? ওরা তো এখন ছুরি দেখিয়ে সব কেড়ে নিতে পারে। মাই গড়!” বলতে বলতে বিষ্টুসাহেবের গলার স্বর ওঁর অজান্তেই চড়া হয়ে গেল। আশেপাশের যাত্রীরা কিঞ্চিৎ ভয় এবং সমীহের চোখে এ দিকে তাকালেন।

অমলদা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কি প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করছে?”

“নিশ্চয়ই। আমি চিরকাল পাহাড়ে কাটিয়েছি। অন্যায়ের সঙ্গে কোনও আপোস করিনি।” এই কথাগুলো বলতে বলতে উত্তেজনায় বিষ্টুসাহেব একটা হাত মুঠো করে শূন্যে ছুঁড়লেন।

অমলদা বললেন, “তা হলেও আইন নিজের হাতে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। চেকারসাহেব ওপাশে বসে আছেন। তাঁকে গিয়ে বলুন।”

শোনামাত্র বিষ্টুসাহেব উঠে দাঁড়ালেন স্প্রিংয়ের মতো। অর্জুনের মনে হল এই মুহূর্তে ওই ছোটখাটো মানুষটা বিশাল শক্তির অধিকারী হয়ে গেছেন। ছেলেগুলো যেখানে কাজ করছিল, তার বিপরীত দিকে সদর্পে এগিয়ে গেলেন বিষ্টুসাহেব চেকারের সন্ধানে। অর্জুনের উল্টো দিকে বসা একটা লোক বলল, খুব চাপা গলায়, “এরা খুব ডেঞ্জারাস। সঙ্গে আর্মস আছে। ওঁকে শান্ত হতে বলুন।

অর্জুন কথাটা শুনে অমলদার দিকে তাকাল। অমলদা এখন বই বন্ধ করেছেন। চোখাচোখি হতে বললেন, “বয়স্ক মানুষরা অল্পতেই উত্তেজিত হন। তা ছাড়া বিষ্টুসাহেব খুব সৎ মানুষ। তুমি কি তিন তলায় শোবে?

অর্জুন বলল, “যেখানে খুশি। কিন্তু এই ছেলেগুলো কী করছে?” ঠিক তখনই বিষ্টুসাহেব হড়বড়িয়ে ফিরে এলেন। এসে ওদের বার্থের সামনে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত গলায় বললেন, “লোকটা কী বলল জানেন? বলল, “ওসব দিকে নজর না দিয়ে নিজের বার্থে শুয়ে পড়ুন। ওরা তো আপনাকে ডিস্টার্ব করছে না।’ বুঝুন, সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের কী নমুনা! ঠিক আছে!”

এই সময় হাতকাটা ছেলেটি দৃপ্তভঙ্গিতে এগিয়ে এল এদিকে। অর্জুন লক্ষ করল, সে তার হাতটা পেটের কাছ থেকে সরাচ্ছে না। বিষ্টুসাহেবের সামনে এসে ছেলেটি বলল, “খুব কিচিরমিচির করছেন তখন থেকে। কেসটা কী?”

অর্জুন সতর্ক হল। অস্ত্র থাকুক কিংবা নাই থাকুক, ও যদি বিষ্টুসাহেবকে আঘাত করে, তা হলে সে ছেড়ে দেবে না। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল, বিষ্টুসাহেবের বিশাল হয়ে যাওয়া শরীরটা কুঁকড়ে যেন আরও ছোট হয়ে গেল। দু’বার কথা বলতে চেষ্টা করলেন। এই সময় অমলদা স্বাভাবিক গলায় বললেন, “ওঁর টয়লেটে যাওয়া দরকার।”

চকিতে মুখ ফিরিয়ে ছেলেটা অমলদাকে দেখে নিল, “ওপাশে দুটো আছে।

বিষ্টুসাহেব বললেন, “দুটোতেই লোক আছে। থাক, থাক, ঠিক আছে।”

যেন ছেলেটিকে বিদায় করতে পারলেই বেঁচে যান এই ভঙ্গিতে নিজের বার্থের দিকে এগোচ্ছিলেন বিষ্টুসাহেব, কিন্তু বাধা পেলেন। “থাকবে কেন? আপনি বুড়োমানুষ, আসুন আমার সঙ্গে। আসুন!” প্রায় ধমকেই বিষ্টু সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে গেল ছেলেটি।

বিটুসাহেবের যাওয়ার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। পিছন ফিরে কাতর দৃষ্টিতে দু’বার তাকিয়ে তিনি ছেলেটিকে অনুসরণ করতে বাধ্য হলেন। অর্জুনের মনে হচ্ছিল, ওঁর সঙ্গে যাওয়া উচিত। কিন্তু অমলদা নির্বিকার হয়ে বসে আছেন। এতগুলো মানুষের সামনে নিশ্চয়ই ওরা ক্ষতি করবে না বিষ্টুসাহেবের।

ছেলেটি টয়লেটের সামনে গিয়ে হুকুম করতেই দুটি ছেলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। ছেলেটি এবার বিষ্টুসাহেবকে বলল, “মাল সামলে যাবেন।”

বিষ্টুসাহেব প্রায় ঊর্ধ্ববাহু হয়ে কাঁপতে কাঁপতে চোখের বাইরে চলে গেলে অর্জুন অমলদাকে জিজ্ঞাসা করল, “কী হল বলুন তো?”

অমলদা এবার শোবার তোড়জোড় করছিলেন। বললেন, “যা স্বাভাবিক, তাই। শেষ মুহূর্তে বিষ্টুসাহেবের কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এল। ‘ঠিক আছে’ না-বললে উনি নর্মাল হন না।’

মিনিটখানেকও লাগল না, বিষ্টুসাহেব দ্রুত চলে এলেন। এসে বললেন, “অর্জুন, মাঝখানের বার্থটা তোলো, আমি শুয়ে পড়ব। ঠিক আছে।”

এবার হেসে ফেলল অর্জুন, “না, ঠিক নেই। আপনার মুখ-চোখ অমন দেখাচ্ছে কেন?”

“যেমনই দেখাক তবু ঠিক আছে। হাতকাটা ছোকরা বলে দিয়েছে, যা দেখবেন তা কাউকে বলবেন না। খারাপ হয়ে যাবে। দু-দু’টো গোয়েন্দা থাকতেও আমার নিরাপত্তা নেই। ঠিক আছে।”

অমলদা হাসলেন, “আবার ভুল করলেন। আমরা দেহরক্ষী কিংবা পুলিশ নই। সত্য সন্ধান করাই আমাদের কাজ। আপনি যা দেখে এলেন, তার মধ্যে অসত্য কিছু নেই। তাই সত্য সন্ধানের প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে আপনার শুয়ে পড়া উচিত। বড্ড ঘামছেন।”

রুমালে মুখ মুছতে মুছতে বিষ্টুসাহেব ধপ করে অর্জুনের পাশে বসে পড়লেন। তারপর বিশ সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর ফিসফিস করে বললেন, “ছাতা! লটস অব ছাতা! অল জাপানিস, চাইনিস। টয়লেটের পাটাতন সরিয়ে তার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখছে। সব কটা স্মাগলার। নো টক। ব্যাটা এদিকে আসছে। আমি তোমাকে কিছু বলিনি। ঠিক আছে!” ফিসফিসিয়ে কথাটা বলে চোখ বন্ধ করলেন বিষ্টুসাহেব ভাঁজ করা বাঙ্কে মাথা হেলিয়ে দিয়ে। অর্জুন দেখল সতর্ক ভঙ্গিতে ছেলেটি সামনে এসে দাঁড়াল, “আপনি ফালতু-ফালতু টয়লেটে গেলেন। আপনার যাওয়ার দরকার ছিল না।”

অর্জুন অবাক হয়ে বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকিয়ে দেখল, তিনি চোখ বন্ধ করেই আছেন। কথাটা শোনার পর ওঁর মুখের পেশী সামান্য কাঁপল, “ঠিক আছে।” এবার ছেলেটি মুখ ঘুরিয়ে কামরার যাত্রীদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, “আমাদের কাজ হয়ে গিয়েছে। এবার আপনারা টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন।”

হঠাৎ অমলদা বললেন, “তোমরা তো খুব দ্রুত কাজ সারতে পারো।”

ছেলেটি হাসল, “তা না হলে বিজনেসের বারোটা বেজে যাবে। আমরা কোনও প্যাসেঞ্জারকে ট্রাবল দিতে চাই না। আপনি দেখবেন চব্বিশ ঘণ্টা টয়লেট খোলা থাকলে কারও সেটা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু দরজা বন্ধ হলেই প্রত্যেকের প্রয়োজনটা বেড়ে যায়। আমরা তাই চেষ্টা করি তাড়াতাড়ি কাজ সারতে।”

“এটা অন্যায়, খুব অন্যায়।” বিষ্টুসাহেব আচমকা নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন।

সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি। “এই যে দাদু, কী বললেন? অন্যায়? একদম জ্ঞান দেবেন না। ওসব দিতে এলে ফাঁসিয়ে দেব!” তার হাতটা পেটের ওপর গুঁজে রাখা একটা কিছুর হাতল ধরল যেন।”

হঠাৎ বিষ্টুসাহেব মরিয়া হয়ে গেলেন, “জোরজবরদস্তির যুগ পড়েছে, ফাঁসাবে তো ফাঁসাও। চোখের সামনে স্মাগলিং করছ আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছি।

অর্জুন স্মাগলিং শব্দটা শোনামাত্র আশঙ্কা করছিল—এবার কিছু একটা ঘটবে। কিন্তু ছেলেটা কিছুই করল না। সে বিষ্টুসাহেবের উল্টোদিকের লোকটাকে ইঙ্গিতে সরিয়ে মুখোমুখি বসল, “আমরা স্মাগলিং করছি কেন দাদু?”

“কেন করছ তোমরা জানো। কিন্তু এতে দেশের সর্বনাশ হচ্ছে। বিষ্টুসাহেব এতক্ষণে ভয়-দ্বিধা কাটিয়ে উঠেছেন।”

“শুনুন। দিনের পর দিন আমি চাকরি পাইনি। পকেটে পয়সা নেই যে, ব্যবসা করব। আমরা যখন না খেয়ে ছিলাম, তখন তো আপনি এসে বলেননি এটা অন্যায়! আমরা ভিক্ষে চাইলে কেউ একটা পয়সা দেবে না। তা হলে আমরা কী করতে পারি? এই কামরায় উঠে একটা চাকু দেখালে আপনারা সুড়সুড় করে সব মাল আমাদের হাতে তুলে দিতেন। সেটা ভাল হত?” ছেলেটা ছোট চোখে তাকাল।

বিষ্টুসাহেব চাপা গলায় বললেন, “ঠিক আছে!”

“না, ঠিক নেই। লটকে লট ছাতা আমরা নিয়ে যাচ্ছি কলকাতায়। কালই এসপ্লানেডে সেগুলো বিক্রি হবে ডাবল দামে। আর আপনারাই ফরেন গুডস্ বলে হাসিমুখে কিনে নিয়ে যাবেন বাড়িতে। আপনারা অন্যায় করছেন না?”

“নিশ্চয়ই।” বিষ্টুসাহেব মাথা নাড়লেন।

“সেই কেনার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করছেন?”

“না।”

“যে কোনও মধ্যবিত্ত বাঙালির বাড়িতে গিয়ে দেখুন, একটা না একটা ফরেন জিনিস পাবেন। যার অনেক কিছুই বেআইনি। তাতে দোষ নেই?”

“নিশ্চয়ই।” বিষ্টুসাহেব মাথা নাড়লেন।

“আমরা কমিশনে মালটা নিয়ে যাচ্ছি। জিনিস অন্য লোকের, ডেলিভারি নেবে অন্য লোক। আমরা সামান্য টাকা পাব। এই টাকা না পেলে…” হাতকাটা ছেলেটি এক মুহূর্তের জন্য যেন অন্যরকম হয়ে গেল।

অর্জুনের মনে হল ছেলেটা মিথ্যে কথা বলছে না। এরা নিশ্চয়ই অন্যায় করছে। কিন্তু সেই অন্যায়ের সঙ্গে না জেনে হাত মিলিয়েছেন অনেক সাধারণ মানুষ। তাঁরা লোভে পড়ে বিদেশি জিনিস কিনছেন। আর এরা পেটের দায়ে এই সহজ পথ বেছেছে। আসল অন্যায় করছে সেই সব ব্যবসায়ী, যারা এদের দিয়ে এই কাজ করাচ্ছে। আজ যদি দেশের মানুষ চোরাই বিদেশি জিনিস কেনা বন্ধ করে দিত, তা হলে ওই ব্যবসায়ীরা জব্দ হত।

হঠাৎ অমলদার গলা শুনতে পেল অর্জুন। নির্লিপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হাতটার ওই অবস্থা হল কী করে?”

“গুলি লেগেছিল। বাদ দিয়ে দিল ডাক্তাররা। ছেলেটা এবার উঠে দাঁড়াল। “নিন, শুয়ে পড়ন আপনারা। ফালতু বকালেন।

বিষ্টুসাহেব বললেন, “ঠিক আছে।’

অমলদা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কলকাতায় যাচ্ছ?”

ছেলেটা হাসল, “না। আমার দল মাল নিয়ে কলকাতার আগেই নেমে যাবে। আমি নামব উল্টোডাঙায়।

“ক’দিন থাকবে ওখানে?”

“দেখি। এখন তো আর অর্ডার হাতে নেই। চলি।”

ছেলেটি চলে গেলে বিষ্টুসাহেব বললেন, “যাই বলো, এ মানা যায় না। পুলিশের উচিত ওদের অ্যারেস্ট করা। এই কামরায় পুলিশ থাকলে আমরা কমপ্লেন করতাম।

রাতের দার্জিলিং মেল অদ্ভুত একটা শব্দ তুলছিল। কামরায় এখন গভীর ঘুম। অর্জুনের মনে পড়ল সেই কবিতাটা, এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি, দিল পাড়ি…। এই নিস্তব্ধ চরাচরে অন্ধকার কেটে কেটে একটি দুরন্ত ট্রেন কয়েক শো মানুষকে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে একা-একা। তার চলার ছন্দে নানান কথা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয় বাঙ্কের ওপর শুয়ে ঘুম আসছিল না অর্জুনের। বারংবার তার ছেলেটার কথা মনে পড়ছিল। ওদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা যায় না? সে মুখ ফিরিয়ে দেখল, কামরায় এখন নীল আলো জ্বলছে। প্রতিটি বার্থের মানুষ এখন ঘুমিয়ে কাদা। কোনও মানবিক শব্দ নেই। নীচে শুধু বিষ্টুসাহেবের নাক ডাকছে। হঠাৎ সে দেখল, টয়লেটের সামনে হাতকাটা ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। তার চোখ বন্ধ। সঙ্গীদের দেখা যাচ্ছে না। বোধহয় পাহারার দায়িত্ব ওর।

এই সময় নীচে সামান্য শব্দ হল। তারপর অর্জুন বিস্মিত হয়ে দেখল, অমলদা একটা চাদর জড়িয়ে বার্থ থেকে নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন টয়লেটের দিকে। সে দেখল অমলদা ছেলেটির মুখোমুখি। অমলদা চাপা গলায় কিছু বলছেন, আর ছেলেটি তা মন দিয়ে শুনছে।