চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ৮

।। আট।।

ছবিটা রায়সাহেবের সামনে রেখে অমলদা জিজ্ঞেস করলেন, “এদের চেনেন?”

ক্লান্ত ভঙ্গিতে রায়সাহেব একবার তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, “ইয়েস, আমার প্রতিবেশী মিস্টার মুরহেডের ছেলেমেয়ে। সীতার সঙ্গে পড়ত। দুজনেই খুব ভাল স্টুডেন্ট ছিল। বাট্…।”

“এরাও পা হয়ে গিয়েছে।” অমলদা যেন কথাটা সম্পূর্ণ করলেন। “হাউ ডু য়ু নো?” বিস্মিত চোখে তাকালেন রায়সাহেব।

ঠিক তখনই মিসেস রায় পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। এখন ওঁর পরনে সুন্দর জামরঙের শাড়ি। ওপরে শাল। রায়সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বললেন, “তুমি কিন্তু অনেকক্ষণ কথা বলেছ।”

এ-কথায় সামান্য গুরুত্ব না দিয়ে রায়সাহেব হাত নেড়ে স্ত্রীকে বললেন, “অমলবাবু জানেন জন আর জিনার কথা। স্ট্রেঞ্জ!”

মিসেস রায় এমন ভাবে তাকালেন যে, তিনিও যে অবাক হয়েছেন, তা বোঝা গেল।

অমলদা হাসলেন, “মিস্টার মুরহেড নিশ্চয়ই ছেলেমেয়ের জন্যে বিব্রত!”

“অবশ্যই।”

“তাই ওঁরা বিলকে এ-দেশে পাঠিয়েছিলেন ওদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে?”

“এ-দেশে? জিনারা এদেশে আছে?”

অমলদা নীরবে ঘাড় নাড়লেন।

“আপনি জানলেন কী করে?” দ্বিতীয়বার এই প্রশ্নটা করলেন মিসেস রায়।

“সেটা অন্য কথা। আপনি শুধু মিস্টার মুরহেডকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে কথাটা যাচাই করে নিন। এটা জানা আমারও দরকার। অমলদা পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন, “সীতার ব্যাপারটা বলুন।

রায়সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকাতে তিনি এবার চেয়ার টেনে বসলেন। “আমিই বলছি। আমার মেয়ে পাঙ্কুদের সঙ্গে মিশে যখন স্পয়েলড্ হয়ে যাচ্ছিল, তখন পুলিশের হেল্প নিয়ে রায় ওকে এ-দেশে নিয়ে আসে। শি ওয়াজ আন্ডার-এজ অ্যাট দ্যাট টাইম। ওরা কালিম্পংয়ে সেটল করে। আমি আমেরিকায় থেকে গিয়েছিলাম সম্পত্তি ব্যবসাপত্র ক্লোজ করার জন্যে। কিন্তু তখন চিন্তা করিনি সীতার জন্যে ওরা কালিম্পংয়েও হানা দেবে। তখন মেয়ে আমাদের ওপর বিরূপ ছিল। কোনও কথা শুনত না। পাঙ্কদের দলে ফিরে যাওয়ার জন্যে ছটফট করত। সেই সময়ের কথা আপনি জানেন। আমি শুনেছি অৰ্জুন আপনাকে খুব সাহায্য করেছিল। তারপর রায় মন চেঞ্জ করে। ও মেয়েকে নিয়ে এখানে চলে আসে। চণ্ডীগড় নির্ঝঞ্ঝাট জায়গা। কালিম্পংয়ে চারপাশে পাহাড় থাকায় ঝুঁকি ছিল থাকার। এখানে ফাঁকা বলে আক্রমণের আশঙ্কা কম। তা ছাড়া এখানকার প্রশাসনে ওঁর পরিচিত মানুষ আছেন। এইসময় আমি আমেরিকার পাট চুকিয়ে এখানে চলে এলাম। এসে দেখলাম মেয়ে বেশ শান্ত। ও আমেরিকায় জন্মেছে, বড় হয়েছে। ইন্ডিয়ান হ্যাবিট এবং কালচার ওখানে জানা সম্ভব নয়। স্বীকার করছি, আমরাও ওকে তেমন সাহায্য করিনি। কিন্তু চণ্ডীগড়ে আসার পর ওর খুব পরিবর্তন দেখলাম। অনেক শান্ত, ভারতবর্ষ সম্পর্কে কৌতূহলী এবং বেশ কো-অপারেটিভ। ভাবলাম, মেয়ে পাল্টে গেছে, সুমতি হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন ও উধাও হয়ে গেল।

“কী ভাবে?”

“ও নর্মাল দেখে মাঝে-মাঝেই ওকে নিয়ে বের হতাম। সেভেনটিন্‌থ সেক্টরে যে মার্কেট আছে, সেখানে গিয়েছিলাম আমরা। ভিড়ে লক্ষ রাখিনি। হঠাৎ দেখি, নেই। অনেক খুঁজেছি, কিন্তু পেলাম না। পুলিশের কাছে জানালাম, বাট নো ট্রেস।”

মিসেস রায় শূন্যদৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকালেন।

অমলদা জিজ্ঞেস করলেন, “ঘটনাটা কতদিন আগে ঘটেছে?”

রায়সাহেব সময়টা জানালে অমলদা বললেন, “বিল খুন হওয়ায় বুঝতে পারছি ওরা এখানেই আছে। হয়তো ঠিক চণ্ডীগড় শহরে নয়, তবে আশপাশেই দেখা যাক।”

রায়সাহেব অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, “মিঃ সোম, আমি আমার মেয়েকে ফেরত চাই। আপনি টাকার জন্যে চিন্তা করবেন না?”

কিন্তু সেইসময় মিসেস রায় জিজ্ঞাসা করলেন, “বিল কে?” অমলদা হাসলেন, “বিল একজন সত্যসন্ধানী। আমেরিকা থেকে এসেছিল। আজ সকালে সে আমাদের বাসের মধ্যেই খুন হয়ে যায়। মিসেস রায়, আপনার মেয়ে যাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তারা অত্যন্ত হিংস্র প্রকৃতির। সামান্য বাধা সহ্য করবে না। অতএব আমার এখানে থাকা উচিত হবে না। নিজেকে শত্রুর সহজ টার্গেট করে তুলতে চাই না।”

রায়সাহেব বললেন, “আপনারা আমার এখানে থাকবেন না?”

অমলদা বললেন, “বিষ্টুসাহেব আর অর্জুন থাকছে। আপনার বাড়িতে ফোন আছে বুঝতে পারছি। নাম্বারটা কত?”

মিসেস রায় জবাব দিলেন, “থ্রি নাইন ডাব্‌ল ও ফাইভ।”

অর্জুন খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। অমলদা তাকে একটিবারও জানাননি যে, তারা চণ্ডীগড়ে আলাদা থাকবে। তার মনের কথা বিষ্টুসাহেবের মুখে বেরিয়ে এল, “এটা কেমন হল?”

অমলদা হেসে বললেন, “ঠিক আছে।”

ভঙ্গিটা নিজের মত বলে বিষ্টুসাহেব ঢোঁক গিললেন। অমলদা বললেন, “আমরা তিনজনেই এই বাড়িতে থাকলে ওদের সুবিধে হবে। কারণ আমার নিশ্চিত ধারণা রায়সাহেবের বাড়ির ওপর ওদের নজর আছে।”

“ফর হোয়াট?” উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন রায়সাহেব, “আমার মেয়েকে ওরা নিয়ে গেছে। আর কী দরকার আমার এখানে নজর রাখার?”

“ব্যাপারটা আমাকে বুঝতে দিন। তা ছাড়া এখনই কিছু বলা উচিত হবে না।” অমলদা খুব শীতল গলায় জবাব দিয়েছিলেন।

চণ্ডীগড়ে শীতকালের বিকেল মোটেই ভাল নয়। দুপুর শেষ হতে না-হতেই বিকেল মুখ থুবড়ে রাতের কোলে ঢলে পড়ে। অর্জুন দোতলার ব্যালকনিতে এসে দেখল চারধারে কেমন বিষণ্ণ ছায়া নেমেছে। এই রকম সময়ে অকারণেই মন খারাপ হয়ে যায়।

ঘরে বসে থাকতে অর্জুনের ভাল লাগছিল না। দুপুরে খাওয়ার পর বিষ্টুসাহেব কম্বল মুড়ি দিয়ে সেই যে শুয়েছেন, আর ওঠার নাম নেই। এমন কী, শুয়ে-শুয়েই বিকেলের চা খেয়েছেন। ডাকলেই বলছেন, “বড্ড ধকল গেছে। তা ছাড়া হোটেলে এর চাইতে বেশি আরাম পাওয়া যেত! ঠিক আছে?”

কথাটা যে অমলদাকে ঠেস দিয়ে বলা সেটা পরিষ্কার। অমলদার অমন করে চলে যাওয়াটা মোটেই পছন্দ হয়নি অর্জুনের। উনি একটু পরামর্শ করতে পারতেন তার সঙ্গে। হাজার হোক, সে তো সহকারী। অর্জুন ঠিক করল, বাড়িতে বসে না থেকে একটু বাইরে বেরিয়ে ঘুরে আসবে। বিষ্টু সাহেবকে বলেছিল সে, তিনি বিছানায় সেঁটে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে জানিয়েছিলেন, “উরে বাবা, বড্ড শীত!”

মিসেস রায় লনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভদ্রমহিলাকে সত্যি সুন্দর দেখতে। সুন্দরী এবং ব্যক্তিত্বময়ী। ওকে দেখা মাত্র সামান্য মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “হা-ই।” এটা দীর্ঘকাল আমেরিকায় থাকার অভ্যেস। অর্জুন খুব স্মার্ট গলায় বলল, “হা-ই।”

মিসেস রায় জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?”

“না। ভাল আছি। আমি এখন একটু বেরুব।

“কোথায়?”

“জাস্ট…” বলে কাঁধ নাচাল অর্জুন।

“ওই ঘটনার পর আমরা খুব শেকি হয়ে আছি। আমি অবশ্য সেভেনটিনে যাচ্ছি। ইচ্ছে হলে আসতে পারো।” এইসময় একটা ফিয়াট বেরিয়ে এল ওপাশের গ্যারাজ থেকে। অর্জুন বেঁচে গেল। অচেনা জায়গায় একা-একা কতক্ষণ ঘোরা যেত? গাড়িতে গেলে অনেকটা দেখা যাবে। ওর মনে পড়ল সেভেনটিন সেক্টরের বাজার থেকেই সীতা উধাও হয়েছিল। অতএব জায়গাটাও দেখা যাবে।

ড্রাইভার একজন প্রৌঢ় পাঞ্জাবি। মিসেস রায় সামনের সিটে জানালায় মুখ রেখে বসেছেন। ওই বসার ভঙ্গিতে একটা নিয়মিত অভ্যাস এবং কর্তৃত্ব রয়েছে। বাড়ি থেকে বের হওয়া মাত্র যে-দোকানটা প্রথমে নজরে এল, সেটা একটা মিল্ক-বার। এ ছাড়া কাছাকাছি দোকান বা ঘিঞ্জি এলাকা বলতে কিছু নেই। পরিষ্কার মসৃণ রাস্তা দিয়ে ফিয়াট ছুটছিল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে মিসেস রায় জিজ্ঞেস করলেন, “বিল নামের লোকটা যে খুন হয়েছে, তা তোমরা জানলে কী করে?”

“আমরা একসঙ্গে আসছিলাম।” অর্জুন উত্তরটা দিয়ে দেখল মিসেস রায়ের ঠোঁটের কোণে সামান্য ভাঁজ দেখা দিল। তিনি মুখ না ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বিল এখন কোথায়?”

“আমরা থানায় দেখে এসেছিলাম।”

“জন আর জিনার ফোটোগ্রাফ ওর কাছে ছিল?”

“হ্যাঁ।”

মিসেস রায় মুখ ফিরিয়ে বসলেন। তাঁকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল।

দেখতে দেখতে গাড়িটা চলে এল একটা জমজমাট এলাকায়। প্ল্যানমাফিক দোকানপাটে প্রচুর মানুষ কেনাবেচা করছে। দিনের আলো নিভে এসেছিল। কিন্তু সতেরো সেক্টরের আলো তার অভাব মিটিয়ে দিল। পার্কিং লটে গাড়িটা দাঁড় করালে মিসেস রায় বললেন, “আমার মিনিট-পঁচিশেক লাগবে। তুমি এর মধ্যে ফিরে এসো গাড়িতে। ও. কে-এ।” কথাটা শেষ করে একটা শৌখিন ব্যাগ নিয়ে তিনি নেমে গেলেন গাড়ি থেকে। হঠাৎ অর্জুনের মনে হল, ভদ্রমহিলা যেন হঠাৎ তাকে অপছন্দ করছেন। কিন্তু এর কী কারণ আছে, তা সে ঠাহর করতে পারল না।

আলোকিত দোকানগুলোর সামনে দিয়ে হাঁটছিল অর্জুন। বেশ ঠাণ্ডা। কিন্তু এতে যেন চণ্ডীগড়ের মানুষেরা কাবু নয়। এই শীতের সন্ধেবেলাতেও আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। একটা হিপি মেয়ে উদাস চোখে চলে গেল। অর্জুন সতর্ক চোখে তাকাল। নাঃ, এর সঙ্গে নিশ্চয়ই পাঙ্কদের কোনও সম্পর্ক নেই। অর্জুন লক্ষ করছিল, ক্রেতাদের চেহারা এবং পোশাকে বেশ সচ্ছলতার পরিচয় আছে। ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে একটা দোকানের সামনে এসে অর্জুনের বুক ধক করে উঠল। সেই ট্রেনের শিষ্য দুটো। ব্যাগ বোঝাই করে জিনিসপত্র কিনে দাম দিচ্ছে। অর্জুন চট করে চারপাশে তাকিয়ে নিল। না, ওদের গুরুদেব সেই সন্ন্যাসী কোথাও নেই। এদের তো আজ কালকায় যাওয়ার কথা। তাহলে চণ্ডীগড়ে বাজার করছে কেন? অর্জুন একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ করল, শিষ্য দুটো ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অর্জুন বেরিয়ে এল দ্রুত। এই লোকদুটোর ভাবভঙ্গি ভাল নয়। ওরা একটা কালো অ্যাম্বাসাডারের পেছনে জিনিসপত্র রেখে আবার ফিরে আসছিল দোকানের দিকে। তার মানে বেশ ক’দিনের রসদ নিচ্ছে ওরা।

ঠিক সেই সময় পেছন থেকে কেউ ডাকল, “অর্জুন না?”

পেছন ফিরে তাকাতেই হতবাক্ হয়ে গেল সে। এমন একটা চমক যে, কথা বলতেই অসুবিধে হচ্ছিল। ততক্ষণে বুড়িদি এগিয়ে এসেছে। “ও মা, তুই এখানে! কী ব্যাপার? কবে এলি?” অর্জুনের দুটো হাত জড়িয়ে ধরল বুড়িদি।

“তোমার ঠিকানা আনতে ভুলে গিয়েছিলাম।” কথাগুলো বলতে-বলতে বুড়িদির মুখের দিকে ভাল করে তাকাল। প্যান্ট, পুলওভার এবং তার ওপর ওভারকোট পরেছে বুড়িদি। কনুই থেকে একটা সুদৃশ্য ব্যাগ ঝুলছে। এই বুড়িদির সঙ্গে জলপাইগুড়ির বুড়িদির পোশাকের কোনও মিল না থাকলেও হাসি ও কথায় যে উত্তাপ, তা একই আছে।”

বুড়িদি উচ্ছ্বসিত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কবে এসেছিস, কোথায় উঠেছিস?”

“আজই। আমাদের পরিচিত একটা বাড়িতে।” তারপর হেসে বলল, “এই পোশাকে তোমাকে চেনা খুব শক্ত হত। ভাবা যায় না।

বুড়িদি যেন একটু লজ্জা পেল। “যা ঠাণ্ডা এখানে, শাড়ি পরলে খুব অসুবিধে হয়।”

“তুমি বাড়িতে চিঠিপত্র দাওনি কেন? খুব চিন্তা করছে সবাই।

“যাঃ, আমি প্রত্যেক সপ্তাহে চিঠি দিচ্ছি। ডাকের যা গোলমাল হচ্ছে এখানে!”

বুড়িদির কথা শেষ হওয়ামাত্র এক সুদর্শন ভদ্রলোক পাশে এসে দাঁড়ালেন। বুড়িদি বলল, “চিনতে পারছিস?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। আমার নাম অর্জুন। জলপাইগুড়ি…।”

“ব্যস্, ব্যস্, চিনে গেছি ভাই। তোমার দিদির মুখের অন্ধকার তুমি দূর করেছ, তাই না? তুমি বললাম বলে কিছু মনে কোরো না।” ভদ্রলোকের গলা বেশ ভারী। ওঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছে মার্কেটিংয়ে এসেছেন। অর্জুন চট করে বুড়িদির মুখ দেখে নিল। নির্মেঘ। সেই মেচেতার দাগগুলো আর নেই।

বুড়িদি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠল, “আঃ, এখানে দাঁড়িয়ে কেন! চল, আমার বাড়িতে যাবি।”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “না বুড়িদি। আমি যাঁর সঙ্গে এসেছি, তিনি এখনই ফিরে যাবেন। তোমাদের ঠিকানাটা বলো, আমি পরে দেখা করব।

“কার সঙ্গে এসেছিস?”

“মিসেস রায়। ওঁরা আগে আমেরিকায় ছিলেন। এখন এখানে সেটেলড।”

“মিসেস রায়? যাঁর মেয়ে মিসিং?” বুড়িদির বর প্রশ্ন করলেন।

খানিকটা অবাক হয়েই মাথা নাড়ল, অর্জুন, “আপনি জানলেন কী করে?”

“আমার বন্ধুর মুখে শুনেছি। ও এখানকার পুলিশের বড়কর্তা। ওরও নাম অর্জুন, অর্জুন ভার্মা। মেয়েটিকে তো এখনও পাওয়া যায়নি।”

অর্জুন কিছু বলার আগেই বুড়িদি বললেন, “বুঝেছি, তাই তোরা এখানে এসেছিস, অমলবাবু এসেছেন নিশ্চয়ই।

“হ্যাঁ।” অর্জুন মাথা নাড়ল। “আর তোদের সেই বিষ্টু সাহেব?”

“হ্যাঁ। তিনি ঠাণ্ডায় ঘর থেকে বের হননি।”

.

অনেক কষ্টে বুড়িদির কাছ থেকে ছাড়া পেল অর্জুন। এতদিন পরে দেখা, এত কাছের সম্পর্ক, চলে যেতেও খারাপ লাগছিল। বুড়িদির স্বামী বেশ ভাল মানুষ। ওদের ঠিকানা নিয়ে পা বাড়াতেই খেয়াল হল শিষ্য দুটোর কথা। যে দোকানটায় ওদের দেখা গিয়েছিল সেখানে ওরা নেই। ব্যস্ত হয়ে অর্জুন মার্কেট ঘুরে দেখতে লাগল। এখন ভিড় আর-একটু বেড়েছে। এখানকার মানুষরা সন্ধের পর বেশ সেজেগুজে বাজার করতে ভালবাসেন।

অর্জুনের খুব মন খারাপ হয়ে গেল। বুড়িদির সঙ্গে এমন সময়ে দেখা হল যে, সে লোকদুটোকে চোখে রাখতে পারল না। হঠাৎ পার্কিং লটটার কথা মনে পড়তেই সে দ্রুত পা চালাল। গাড়িটা নেই।

ঠোঁট কামড়ে পেছন ফিরতেই সে মিসেস রায়কে দেখতে পেল। মার্কেটিং সেরে মহিলা ফিরে আসছেন। অর্জুন এগিয়ে যেতে তিনি বললেন, “আমার আর-একটু দেরি হবে। একটা জিনিস সারাতে দিয়েছিলাম, লোকগুলো এমন অলস…”

ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। জিনিসপত্র সেখানে রেখে তিনি বললেন, “কফি খাবে?”

এই ঠাণ্ডায় কফি মন্দ হয় না। মিসেস রায়ের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে অর্জুন ঠিক করল আজ যেমন করেই হোক অমলদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। উনি যে-হোটেলে উঠেছেন, তার হদিস নিশ্চয়ই দেবেন। এই শিষ্য দুটোর সঙ্গে পাঙ্কদের নির্ঘাত যোগাযোগ আছে।

কফি কর্নারে কফি খেতে খেতে মিসেস রায় জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার সোম কোন হোটেলে উঠেছেন তুমি জানো?”

মাথা নাড়ল অর্জুন। সেটা দেখে খুশি হলেন না মহিলা। বললেন, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। উনি একা কী করে এই প্রবেলমটা সল্ভ করবেন? যাদের নিয়ে এলেন, আই মিন ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক তো শীতেই কাবু হয়ে থাকবেন। কিছু মনে কোরো না, তোমার বয়সও তো খুব অল্প। দিজ গাইজ আর ভেরি টাফ।”

অর্জুন কথাগুলো শুনতে শুনতে চটে যাচ্ছিল। তবু কোনও রকমে শান্ত গলায় উত্তর দিল, “অমলদা আজ পর্যন্ত বিফল হননি কোনও কেসে। তা ছাড়া রায়সাহেব না চাইলে আমরা আসতাম না। আপনি ভরসা রাখুন।”

কফির কাপটা নামিয়ে রাখতেই অর্জুনের বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল। সেই শিষ্য দুটোর একটা। হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে। ওর সঙ্গী ধারেকাছে নেই। অর্জুন মিসেস রায়কে দ্রুত গলায় বলল, “আমি আসছি।

হাত-পনেরো পেছন-পেছন লম্বা বারান্দা দিয়ে হাঁটছিল অর্জুন। শিষ্যটার কোনও দিকে নজর নেই। কিন্তু চলার ভঙ্গিতে বেশ গতি আছে। এবং তখনই অর্জুন আর-একবার চমকে উঠল। তার ঠিক সামনে, শিষ্য এবং তার মাঝখানে আর-একজন নিস্পৃহ ভঙ্গিতে হাঁটছে। লোকটার পরনে সোয়েটার প্যান্ট এবং ওপরে চাদর। কিন্তু চাদরটা টেনে ঠিক করতে যেতেই কাটা হাতটাকে বোঝা গেল। অর্জুনের কোনও সন্দেহ রইল না, একেই কলকাতায় আসবার সময় ট্রেনে স্মাগলিং করতে দেখেছে।