চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ১০

॥ দশ।।

আসনে গিয়ে বসতেই বাস ছাড়ল। বিষ্টুসাহেব অর্ধেক চোখ খুলে বললেন, “ঠিক আছে।” তারপর উদাস চোখে সামনের দিকে তাকালেন, যেখানে জোড়া-টুপি বসেছিল। আসন দুটো ফাঁকা। সঙ্গে-সঙ্গে তড়াক করে চলন্ত বাসে উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে উচ্চারণ করলেন, “যাঃ।”

“কী হল?” অর্জুন প্রথমটা ঠাওর করতে পারেনি।

“নেই। পাখি উড়ে গেছে। উড়ল কখন? আমি তো সারাক্ষণ তক্কে তক্কে ছিলাম। এখন তোমার দাদাকে কী কৈফিয়ত দেব। আঃ, বুঝতে পারছ না? আমি জোড়াটুপির কথা বলছি। আই অ্যাম শিওর দে আর পাস। ঠিক আছে?”

অর্জুন এবার হেসে ফেলল, “আপনি তাহলে ভাল সন্ধানী হতে পারবেন না।”

“নো। নেভার। কক্ষনো হতে চাই না। কিন্তু তুমি হাসছ কেন?”

এবার ওই অসুস্থ মানুষ দুটির নেমে যাওয়ার ঘটনাটা জানাল অর্জুন। সন্দেহ করতে-করতে এটা খুব বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বিষ্টুসাহেব বললেন, “তুমি কোনওদিন গোয়েন্দা হতে পারবে কি না সন্দেহ হচ্ছে!”

অর্জুন অবাক হয়ে তাকাতে তিনি মাথা নাড়লেন, “হয়তো ওরা পঙ্গু নয়, ভান করেছে। আর ওই নান্ নিশ্চয় ওদেরই লোক। তুমি নানের চুল লক্ষ করেছ?”

অর্জুন ভেবে পেল না। নানদের মাথায় একটা সাদা কাপড় থাকে, চুল দেখার সুযোগ কোথায়? বিষ্টুসাহেব নিশ্বাস ছাড়লেন, “কে জানে! হয়তো তোমাকে বোকা বানিয়ে গেল অভিনয় করে। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে ছিলাম, উঠলেই ধরব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি।”

খুব সিরিয়াস দেখাচ্ছিল বিষ্টুসাহেবকে। অর্জুন এবার হাসি চাপল।

বাস মোটামুটি জোরেই ছুটছে। বাইরে এখন অন্ধকার। কুলু থেকে মানালি বেশি সময় লাগে না। পথও মাণ্ডির মতো বিপজ্জনক নয়। কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে মোটেই ভাল লাগে না। তা ছাড়া এখন পায়ে বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। এইসময় কণ্ডাক্টর তার আসন ছেড়ে পেছনের দিকে এগিয়ে এল। তারপর একজন যাত্রীর দিকে হাত বাড়াল, “আপকা টিকিট?”

“নো মানি।”

জড়ানো গলায় উচ্চারণ শুনে অর্জুন চমকে পেছনে তাকাল। আর তাকাতেই তার চক্ষুস্থির। একটি বছর পঁচিশের যুবক দুটো কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসল। তার গায়ে একটা পাতলা পুলওভার, আর মুখভর্তি দাড়ি। অগোছালো রুখু চুল আর শরীরে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। এবং লোকটির কাঁধে একটা ঝোলা। লালচে দাঁত বের করে লোকটি বলল, “নো মানি।”

“রুপিয়া নিকালো।” কণ্ডাক্টর খিঁচিয়ে উঠল। তার চড়া ভাষায় বোঝা গেল, এইসব ঝুট-ঝামেলা এই লাইনে লেগেই আছে। টিকিট চাইলেই বলবে পয়সা নেই। অথচ মানালিতে গেলেই দেখা যাবে চুটিয়ে নেশা করছে। সে এই লোকটির কোনও কথা শুনতে রাজি হচ্ছিল না। বাসে যে ক’জন যাত্রী আছেন, তাদের বেশ মজা লাগছে ঘটনাটা দেখতে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার ক্লান্তি যেন এই রঙ্গে সামান্য দূর হচ্ছে।

কণ্ডাক্টরের কথায় জানা গেল, লোকটি উঠেছে কুলু থেকে। তার উচিত ছিল ওঠার সময়েই বাধা দেওয়া। সে কঠোর গলায় জানাল, টিকিট না কাটলে এই বরফের মধ্যে সে সাহেবকে নামিয়ে দিয়ে যাবে। আট টাকা তার চাই।

বরফ শুনে চমকে উঠল অর্জুন। সে জানলা দিয়ে বাইরে চট করে দেখার চেষ্টা করেও বিফল হল। তারা কি বরফের রাজত্বে চলে এসেছে! তার খেয়াল হল বাস এখন আদৌ দ্রুত চলছে না। সেটাও কি বরফের জন্যে?

কণ্ডাক্টরের শাসানি শুনে লোকটা উঠে দাঁড়াল। তারপর বাসের যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেউ আমাকে আট টাকা দিতে পারো?”

কোনও যাত্রী এর উত্তর দিল না। লোকটা খানিক চেয়ে থেকে কাঁধ নাচাল। এটা বোধহয় ওর মুদ্রাদোষ। তারপর ঝোলা থেকে বাঁশির সাইজের একটা লাঠি বের করে চিৎকার করল, “লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমার সঙ্গে বিক্রি করার মতো কিছুই নেই। এই ছোট্ট লাঠিটা কেউ আট টাকায় কিনবে?”

অর্জুন দেখল। লোকটা বোকাসোকা গোছের নাকি। ওই ছোট্ট লাঠি কেউ আট টাকায় কিনবে কেন? বিষ্টুসাহেব মাথা নেড়ে বললেন, “ঘুরে-ঘুরে ব্যাটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আহা।”

কেউ সাড়া দিচ্ছে না দেখে হতাশ ভঙ্গিতে লোকটা কণ্ডাক্টরকে বলল, “বেশ, এই লাঠিটা নিয়ে তুমি আমাকে টিকিট দাও।”

কণ্ডাক্টর খুব রেগে গিয়ে বলল, “যার দাম চার আনাও হবে না, তাই দিয়ে তুমি আট টাকার টিকিট চাও? সাপের পাঁচ পা দেখেছ?”

লোকটা লাঠিটা নাচাল, “এটা তুমি নেবে না?”

কণ্ডাক্টর মাথা ঝাঁকাতেই অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। লাঠির যে প্রান্ত লোকটার হাতে ধরা ছিল, সেখানে কিছু কায়দা করতেই একটা সরু এবং ধারালো ইস্পাতের ফলা বেরিয়ে এল। সেটি লম্বায় অন্তত ইঞ্চি-দশেক হবেই। বাসের আলোয় সেটিকে চকচকে এবং হিংস্র দেখাচ্ছিল। লোকটির মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল, “নাউ, হোয়াট ডু য়ু ওয়ান্ট? এটাকে নিতে ইচ্ছে করছে?”

কণ্ডাক্টর তো বটেই, বাসের সমস্ত যাত্রী এই ম্যাজিক দেখে হাঁ হয়ে গেল।

লোকটা এমন ভঙ্গিতে তার অস্ত্র ধরে আছে যেন সে কাউকে পরোয়া করে না।

বিষ্টুসাহেব বলে উঠলেন, “ডেঞ্জারাস।”

সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বলল, “নট অ্যাট অল।” আর চকিতেই ইস্পাতের ফলাটা সুড়ুত করে লাঠির মধ্যে মিলিয়ে যেতেই লোকটি নিজের আসনে শান্ত ভঙ্গিতে বসে পড়ল। কণ্ডাক্টর এবার হাসল, “দিজিয়ে।” সে একটা টিকিট ছিঁড়ে লোকটির দিকে বাড়িয়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা ঘাড় নাড়ল, “নো! এখন এর দাম একশো টাকা। তার এক পয়সা কম নয়। তখন নিলে আট টাকায় হয়ে যেত। আট টাকা কেটে নিয়ে বিরানব্বুই দিয়ে এটা নিতে পারো। ও. কে.!”

কণ্ডাক্টর কিছুক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করল। কিন্তু লোকটি কিছুতেই রাজি হল না। অর্জুন লক্ষ করছিল এখন কণ্ডাক্টর সেই দাপটের গলায় কথা বলছে না, লোকটিকে নেমে যেতে বলছে না। লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে লাঠি ঝোলায় রেখে বসে আছে। কণ্ডাক্টর বেচারা মন খারাপ করে ফিরে যেতে যেতে অর্জুনকে বলল, “নসিব! এই হিপিদের কে বুঝবে বলো? আগে যদি জানতাম তাহলে কি দাঁওটা ছাড়তাম।”

অর্জুন লোকটিকে দেখল। এক ফোঁটা মেদ নেই। এই আমেরিকান যুবকটি সত্যিকারের হিপি তো! পাঙ্কদের বর্ণনার সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। একমাত্র নোংরা এবং অগোছালো চেহারা ছাড়া একে হিপি ভাববারও কোনও কারণ নেই।

মানালিতে যখন বাসটা থামল, তখন ঘড়িতে রাত আটটা। দরজা খুলতেই তাতার-দস্যুর মতো ঠাণ্ডা ঝাঁপিয়ে পড়ল বাসের ভেতরে। বিষ্টু সাহেব একটা বাঁদুরে-টুপি মাথায় গলিয়ে নিয়ে বললেন, “এ যে দেখছি উত্তর মেরু।”

লাইনে দাঁড়িয়ে বাস থেকে নামতে হল। এবং মাটিতে পা দিয়েই অন্যরকম অনুভূতি হল। পায়ের তলায় কাঁচের মতো চকচকে কিছু! সামনে পেছনে সর্বত্র একটা সাদাটে ভাব। আর ঠাণ্ডাও তেমনি। সন্ধেবেলায় এখানে বরফ পড়েছে নতুন করে, এরকম কথাবার্তা শোনা গেল। সেই হিপিটি নামতেই বিষ্টুসাহেব এগিয়ে গেলেন, ‘হেলো মাই বয়। আই ওয়ান্ট দ্যাট।”

এর মধ্যে কখন যে তিনি একশো টাকার নোট বের করেছেন দ্যাখেনি অর্জুন। এখন সেটা লোকটির নাকের ডগায় নাচালেন বিষ্টুসাহেব। সাহেবেরও বোধহয় ঠাণ্ডাটা সহ্য হচ্ছিল না। তবু উৎসুক চোখে একবার তাকিয়ে ঝোলায় হাত ঢুকিয়ে লাঠিটা বের করে বিষ্টুসাহেবের হাতে ধরিয়ে দিতে তিনি নোটটা হাতছাড়া করলেন। এবার বেশ বিজয়ীর ভঙ্গিতে ফিরে এলেন অর্জুনের কাছে। “দারুণ দাঁও মারলাম, ঠিক আছে? খুব প্রয়োজনীয় জিনিস। নাউ আই ফিল রিয়েল স্ট্রং। পা-ফাদের কেয়ার করি না, এলেই গুপ্তি চালাব।”

“গুপ্তি?”

“ইয়েস। গুপ্ত অস্ত্ৰ।”

এই সব কথাবার্তা যখন হচ্ছিল তখন ঠকাঠক শব্দ কানে আসছিল। অর্জুন নিজের দাঁতের ওপর দখল রাখতে পারছিল না। যাত্রীরা দ্রুত যে যার নিজের জায়গায় চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু দালাল লেগে গিয়েছিল বিভিন্ন হোটেলের বার্তা শোনাতে। এদের মধ্যে একজন বঙ্গসন্তানও আছে। অর্জুন তাকে জিজ্ঞেস করল, “পালবাবুর হোটেলের রাস্তাটা কোনদিকে?” নাম শুনে বঙ্গসন্তান মাথা নাড়ল, “খবরদার যাবেন না স্যার, অত্যন্ত ওঁচা হোটেল। খাবারদাবার খুব খারাপ। তারপর শোয়ার ব্যবস্থাও মোটেই ভাল নয়। তার চেয়ে চলুন হোটেল শান্তিনিকেতনে। মন ভরে যাবে।”

“শান্তিনিকেতন? আপনার হোটেল?” বিষ্টুসাহেব নাম শুনে পুলকিত হলেন।

হ্যাঁ স্যার। আমিই পার্টনার। দু’পাও হাঁটতে হবে না। এই বাস স্ট্যান্ডের ওপরেই।”

অর্জুন বিষ্টুসাহেবকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে লাগল। তাদের পালবাবুর হোটেলে ওঠার কথা, অন্য হোটেল যত ভালই হোক, শুনে কী হবে? পালবাবুর হোটেলের হদিস জেনে নিয়ে ওরা ওপরে উঠছিল। পায়ের তলায় যে বরফের আস্তরণ, এই রাত্রেও যে চারধারে সাদাটে দেখাচ্ছে বরফ পড়ার কারণে, তা বুঝে রোমাঞ্চিত হল অর্জুন। এতকাল শুধু বরফ পড়ার গল্প শুনে এসেছে, বিদেশি ছবিতে দেখেছে, এখন চোখের সামনে সেই একই দৃশ্য। সে বলল, “কী সুন্দর, না?”

ঠকঠকে আওয়াজ দাঁতে নিয়ে বিষ্টুসাহেব বললেন, “ঠিক আছে।”

চওড়া রাস্তাটার ওপরে ওঠার সময় অর্জুন দেখতে পেল, বিশাল একটা গাছের তলায় আলো জ্বলছে। আলোটা বাঁধানো গোল বেদীর ওপরে। সেই আলোকে ঘিরে জোর বাজনা চলছে। দুরন্ত নাচ নাচছে কিছু মানুষ। তারা ছেলে না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। লাল আলো তাদের শরীরে পিছলে পিছলে যাচ্ছে। এই দারুণ ঠাণ্ডার তোয়াক্কা করছে না তারা। বিষ্টুসাহেব হাঁ হয়ে গেলেন দেখে। সংখ্যায় জনা আটেক হবে। ওদের দাঁড়াতে দেখে একজন চিৎকার করে উঠল নাচতে নাচতে, “হা-ই!”

বিষ্টুসাহেব সসঙ্কোচে বললেন, “ঠিক আছে।”

.

পালবাবুর হোটেল মাঝারি মানের, কিন্তু মোটেই ওঁচা নয়। খোঁজ করতেই শোনা গেল, ওদের জন্যে একটা ডাবল-বেড ঘর রাখা আছে, যার জানলা খুললেই বরফের চূড়াগুলো ঘরে ডুকে পড়ে। পালবাবুর বয়স চল্লিশের আশেপাশে, কিন্তু প্রথমত দর্শনেই মনে হল, চমৎকার ফূর্তিবাজ মানুষ। বললেন, “এই ঠাণ্ডায় যারা আসেন তাঁরা পাগল। আর পাগল ছাড়া ভগবানকে কে দেখতে পায়!”

বিষ্টুসাহেব ঘরের আরামে একটু ধাতস্থ হয়ে শুধোলেন, “ভগবান?”

পালসাহেব হাসলেন, “জানলা খুলে তাকান, দেখতে পাবেন।”

খাওয়াদাওয়া শেষ করে লেপের তলায় ঢুকে অর্জুনের মনে হল, পৃথিবীতে এর চেয়ে আরামদায়ক আর কিছুই নেই। আর ঠিক সেই সময়েই জানলায় শব্দ হল। খুব সন্তর্পণে কেউ আঙুলের ডগায় সঙ্কেত করছে। বিষ্টুসাহেব তখনও বিছানাতে বসে বোধহয় কোনও প্রার্থনা করছিলেন, চোখ খুলে বললেন, “কে কোথায়?”

অর্জুন লেপটা মুখের ওপর থেকে নামিয়ে জানলার দিকে তাকাল। চকিতে বিষ্টুসাহেব ব্যাগটা টেনে নিয়ে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লাঠিটা বের করে আনলেন। শব্দটা তখন থেমেছে। বিষ্টুসাহেব লাঠিটা অর্জুনকে দেখিয়ে বললেন, “আর কোনও ভয় নেই। পাস কিংবা রঘুডাকাত, আই ডোন্ট কেয়ার! ঠিক আছে?”

এই সময় আবার জানলায় শব্দ হল। এবার একটু ব্যস্ততা ফুটল আওয়াজে। জানলার এপাশে পর্দা থাকায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লাঠিটা বাগিয়ে বিষ্টুসাহেব উঠলেন। অর্জুন উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঘাড় নেড়ে বললেন, “আমি একাই দেখছি। হুঁ!”

পর্দা সরাবার পর দেখা গেল কাঁচের গায়ে জল জমে থাকায় বাইরেটা অস্পষ্ট। বিষ্টুসাহেব সন্তর্পণে ছিটকিনি সরাতে সরাতে লাঠিটার মুখ টিপলেন কিন্তু কোনও পরিবর্তন হল না সেটার। এবার জানলা ছেড়ে বারংবার সেটা নিয়ে ঝাঁকাতে লাগলেন তিনি। অর্জুন দেখল জানলাটা খুলে গেল। এবং ঘরের মধ্যে একজন মানুষ সন্তর্পণে ঢুকে জানলা বন্ধ করতে-করতে বললেন, “এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নাকি?”

বিষ্টুসাহেব একটা হেঁচকি তুললেন। তারপর ধপ করে বিছানায় বসে বললেন, “মাই গড়। এ কী হল!”

“কী ব্যাপার? হঠাৎ ভগবানকে ডাকাডাকি কেন?” মাথা এবং শরীর থেকে ভারী পোশাকগুলো খুলতে খুলতে অমলদা বললেন।

ততক্ষণে আবিষ্কার শেষ হয়েছে বিষ্টুসাহেবের। তারস্বরে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “চিট, চিট। ব্যাটাকে আমি পুলিশে দেব।” রাগের চোটে লাঠিটাকে ছুঁড়ে দিলেন দেওয়ালে। ধাক্কা খেয়ে সেটা মাটিতে পড়ার সময় দু’টুকরো হল। অর্জুন সেই খণ্ডদুটোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। একটা নিরীহ ফাঁপা লাঠি, তার মধ্যে কোনও অস্ত্র নেই।

অমলদা সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার?”

বিষ্টুসাহেবের কথা বলার অবস্থা ছিল না। টাকার শোকে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে নির্বোধ মনে হওয়ায় তিনি বাকশক্তিরহিত হয়ে পড়েছিলেন। অর্জুন ঘটনাটার কথা বলল। বাসে আসবার সময় হিপিসাহেব যে গুপ্তি দেখিয়েছিল, বিক্রি করার সময় সেটির বদলে মামুলি একটা লাঠি গছিয়ে দিয়েছে। নেওয়ার সময় তড়িঘড়িতে বিষ্টুসাহেব আর পরখ করে দ্যাখেননি, কারণ জিনিস দুটো একই রকম দেখতে।

অমলদা হাসলেন, “যাক, সাহেবরাও তাহলে এদেশের ব্যবসায় নেমে পড়েছে। তোমাদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে?”

অর্জুন ঘাড় নাড়ল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোত্থেকে এলেন?”

“জানলা দিয়ে, দেখতেই তো পেলে। হোটেলের সামনে একজন এখনও ঘোরাফেরা করছে। তাই আপেলবাগান ডিঙিয়ে এদিকে আসতে হল।”

“আপনার জিনিসপত্র?”

“শান্তিনিকেতন হোটেলে। এখন ক’টা বাজে?”

রাত বেশি হয়নি। ঘড়ির কাঁটা সবে দশটা পেরিয়েছে। কিন্তু এই তুষারস্নাত পার্বত্যশহরের কোথাও কোনও শব্দ নেই। সময়টা শোনামাত্র অমলদা বললেন, “তৈরি হয়ে নাও অর্জুন। বাইরে এখন খুব ঠাণ্ডা। অনেকটা পথ হাঁটাহাঁটি করতে হতে পারে।”

কথাটা শোনামাত্র অর্জুন উত্তেজিত হল। এবার জলপাইগুড়ি থেকে বেরিয়ে অমলদা তাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কোনও দায়িত্ব সে পাচ্ছে না। এরকম ভাল লাগে? তা ছাড়া অমলদার সঙ্গে কিছু কথা আছে যা বিষ্টু সাহেবের সামনে বলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না। যেমন হাতকাটা লোকটার কথা।

শীত খুব, কিন্তু কাজ করার সুযোগ পেলে ওসব মনে রাখা বোকামি। অর্জুন চটপট পোশাক পরে নিতে লাগল। বিষ্টুসাহেব তখনও চুপচাপ খাটের ওপর বসে আছেন। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, খুব আঘাত পেয়েছেন। মানুষ কেন এত অবিশ্বাসের কাজ করে? দু’বার এমন-কিছু বিড়বিড় করলেন।

অমলদা বললেন, “বিষ্টুসাহেব, আপনি আরাম করে শুয়ে পড়ুন। ভোরের মধ্যে যদি না ফিরি, তাহলে এখান থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে ট্যুরিস্ট লজ রেখে সোজা নীচে নেমে যাবেন। ডান দিকে বাস-স্ট্যাণ্ড, আপনি বাঁ দিকের বাস্তাটা নেবেন। কিছুদূর যেতেই আপনি বিয়াসের স্বর শুনবেন।

“বিয়াস?”

“বিপাশা। পঞ্চনদীর একটি। শব্দ শুনলেই টের পাবেন। দেখবেন বিয়াসের ওপর একটা ব্রিজ রয়েছে। সেইটে পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর বাঁ দিকে কিছু দোকানপাট দেখতে পাবেন। সেখানে কেউনা-কেউ আপনাকে আমাদের খবর দিয়ে যাবে। মনে থাকবে পুরো ব্যাপারটা?”

অমলদা বাঁদুরে টুপি মাথায় পরে নিচ্ছিলেন।

“আমি এখন কী করব?” শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন বিষ্টুসাহেব।

“ঘুমুবেন।”

“আমি কি ঘুমুতে এসেছি?”

“বিষ্টুসাহেব, যদি আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হত, তাহলে নিশ্চয়ই নিয়ে যেতাম। তা ছাড়া একজনকে ঘাঁটি আগলে বসে থাকতে হয়। সেই কাজটা আপনি করুন।”

.

আপেলবাগান দিয়ে পেছনের রাস্তায় নামতে নামতে অর্জুনের মনে হল, তার শরীরের সমস্ত রক্ত যে-কোনও মুহূর্তে বরফ হয়ে যাবে। পৃথিবীতে এত ঠাণ্ডা পড়তে পারে ভাবা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে সে মনে করার চেষ্টা করল এই মুহূর্তে মেরু-অভিযাত্রীরা কীভাবে কাজ করছেন? এস্কিমোরা কেমন করে বেঁচে থাকেন? অতএব সে কেন পারবে না? নিজের মনের জোরে বাইরের শীত তাড়াতে চাইল সে।

দাঁতে দাঁত চেপে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

“বিয়াসের কাছে। নদীর নাম বিয়াস, সত্যিই চমৎকার। তোমার ঠাণ্ডা লাগছে?”

“সামান্য।”

“তুমি ইচ্ছে করলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে পারো। ওতে গরম হবে।”

অর্জুন চমকে গেল। অমলদা যে তাকে সিগারেট খাওয়ার কথা বলবেন, তা সে ভাবতেই পারেনি। সেটা অনুমান করে তিনি বললেন, “এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তুমি মাঝেমধ্যে যে খাও, তা আমি জানি।’

অর্জুন বলল, “না, মানে, আমার সেরকম দরকার নেই।”

ওরা ঢালু জমি দিয়ে নেমে আসছিল। এটা ঠিক রাস্তা নয়। পায়ের তলায় চকচকে বরফ।

গাছের আড়াল সরে যেতে অর্জুন চমকে উঠল। চারপাশের পাহাড় বরফ মেখে যেন হাতের কাছে নেমে এসেছে। তার সাদায় চোখ স্থির হয়ে যায়।

অমলদা ফিসফিস করে বললেন, “সুন্দর!”

কিন্তু অর্জুনের মনে হল আরও কিছু বলা দরকার। অন্য একটা শব্দ, যা ‘সুন্দর’কেও ম্লান করে দেয়। এইসময় অমলদা বললেন, “আমরা এবার পিচের পথটা ধরছি। যদিও ওখানে বরফ পড়েছে, তবু সহজে হাঁটা যাবে।”

মিনিট পাঁচেক যেতে না যেতেই বাজনাটা শুরু হল। তীব্র বাজনা। যে সুর জানে না, সেও বুঝবে উল্টোপাল্টা বাজছে। সেই সঙ্গে উল্লসিত চিৎকার। কিছুটা এগিয়ে ওরা সেই দৃশ্যটা দেখতে পেল। বাস থেকে নেমে হোটেলে যাওয়ার পথে ওরা এই জায়গা দিয়ে যখন গিয়েছিল, তখন আগুনের লাল আভায় যাদের দেখেছিল, তারা এখন আরও উদ্দাম হয়েছে। অর্জুন লক্ষ করল, তিনটি মেয়ে আছে ওদের মধ্যে। দুজনকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে তারা ভারতীয়। এবং এই দু’জন বাজনার তালে তালে বেশি লাফালাফি করছে।

অমলদা বললেন, নিচু গলায়, “বাজনাটা চিনতে পারছ?”

অর্জুন মাথা নাড়ল। না।

“এটাকে পাঙ্ক মিউজিক বলে।”

“কিন্তু ওদের তো পাঙ্কদের মতো দেখতে নয়।”

“না। কারণ, এখানে সেটা সম্ভব নয়। এরা হিপিদের মতো থাকতে চাইছে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে। ইন ফ্যাক্ট, মানালি হিপিদের জন্যেও বেশ নাম করেছে। কিন্তু আজ অনেক খোঁজ করেও আমি যমজ ভাইবোনের হদিস করতে পারিনি। বিল তাহলে চণ্ডীগড়ে কেন আসছিল?”

চকিতে অর্জুনের মনে জোড়া-টুপি ভেসে উঠল। তারা সেই যমজ ভাইবোন নয় তো? জিনা আর জিন। কিন্তু জিনা আর জিন তো পঙ্গু নয়। জোড়া-টুপি পঙ্গু ছিল। সেটা যদি অভিনয় হয়, তাহলে আলাদা কথা। সে ঘটনাটা নিচু গলায় অমলদাকে জানাল। অমল সোম উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা কুলুতে সন্ধেবেলায় নেমেছে? তুমি ওদের মুখ দেখেছ?”

“ভাল করে দেখিনি। একজনের টুপি পড়ে গিয়েছিল। ন্যাড়া মাথা। মুখের ভঙ্গিও স্বাভাবিক নয়! আসলে পঙ্গু বলে আমি ঠিক…..

অমলদা বললেন, “ইনভ্যালিড জোড়া-সাহেব কখনও ন্যাড়া হয়? তবে কথাটা যদি সত্যি হয় তাহলে জিন আর জিনা এখানে এসে পৌঁছে যাবে আজ রাত্রেই। অবশ্য আর তাদের ভেক্ ধরতে হবে না।

অনেকক্ষণ ধরে যে কথাটা পাক খাচ্ছিল, সেটাই জানতে চাইল অর্জুন। “অমলদা, সীতার খবর পেয়েছেন? ও কি এখানে আছে?”

অমলদা মাথা নাড়লেন, “সেইটে জানার জন্যে আজ রাত্রে বেরিয়েছি। অর্জুন আগুনের সামনে নৃত্যরত দলটাকে দেখল। এত রাত্রে এরা কী আনন্দে এমন ঠাণ্ডায় নেচে যাচ্ছে, তার তা মাথায় ঢুকছিল না। ভারতবর্ষের যে-কোনও জায়গার থেকে মানালি কেন এত প্রিয় হল ওদের, তাও বোঝা যাচ্ছে না। অর্জুন একটা উত্তর তৈরি করে নিল, মানালির আবহাওয়ার সঙ্গে বোধহয় ওদের দেশীয় আবহাওয়ার মিল আছে। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “পুলিশ ওদের নাচতে দিচ্ছে?”

“নাচা কি অপরাধ?”

অর্জুন বাসের সেই হিপিটিকে খুঁজল। লোকটা যা করেছে, তাতে পুলিশ ধরতে পারে অনায়াসে। কিন্তু লোকটা এখানে নেই। ঠিক সেই সময় একটি মেয়ে সরে এল দলের ভেতর থেকে। চুপিসারে। মনে হল, ও যে বেরিয়ে এল তা কাউকে লক্ষ করতে দিল না। অমলদা ফিসফিস করে বললেন, “ওকে অনুসরণ করো। যদি কোনও বাড়ির মধ্যে ঢুকে যায়, সেখানে আধঘণ্টা অপেক্ষা করবে, তারপর হোটেলে ফিরে যাবে।”

অর্জুন আর দাঁড়াল না। এই প্রথম সে একটা কাজের মতো কাজ পেল। মেয়েটি ততক্ষণে তরতর করে হেঁটে গেছে অনেকটা দূর। বোঝা যাচ্ছে, এখানকার পথঘাট ওর ভাল করে চেনা। অর্জুন দ্রুত পা চালাতে গিয়ে আছাড় খেতে-খেতে সামলে নিল। পায়ের তলায় বরফ জমছে। পেঁজা তুলোর মতো বরফ পড়ছে এখন। নিজের শরীরের দিকে এক পলক নজর যেতেই মজা লাগল। মোটা শীতবস্ত্রের ওপরটা সাদাটে হয়ে গেছে এতক্ষণে। কিন্তু বেশি জোরে হাঁটা যাবে না। সামনের মানুষটা যেন টের না পায় যে, তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে এই রকম ব্যবধান রেখে এগোতে হবে।