কালিম্পঙে সীতাহরণ

কালিম্পঙে সীতাহরণ

একবার মেঘ জমলে কোনও আলোর ক্ষমতা নেই তাদের ঝেঁটিয়ে দূর করে। ওদের দেখলেই হরিমাধবের ষাঁড়ের দলটার কথা মনে পড়ে যায়। হরিমাধব ষাঁড় পোষে। জলপাইগুড়ি শহরে এক প্রান্তে হরিমাধবের ঠাকুরবাড়ি। মদনমোহন আছেন সেখানে। আর আছে গোটা কয়েক জবরদস্ত ষাঁড়। ঘাড়ে গর্দানে মাংস চর্বি থিকথিক করছে, তেল চুকচুকে শরীর। প্রত্যেকটা ষাঁড়ের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। কোনও কর্ম করে না সেগুলো। শুধু দিনরাত জাবর কাটে। ঠাকুরবাড়ির একটা ছোঁড়া ছ’টা দড়িতে ওগুলোকে বেঁধে বিকেলে বেড়াতে নিয়ে যায় পাশের মাঠে।

ভূভারতে কেউ ষাঁড় পোষে এমন খবর শোনেনি অর্জুন। হরিমাধব বলে, খাস কৃষ্ণের জীব। ওদের দেখলেই প্রভুর কথা মনে পড়ে যায়। তা সেই ষাঁড়গুলো যখন রাস্তায় এসে দাঁড়ায় ছোঁড়াটার সঙ্গে তখন কার সাধ্য পথ চলে। সম্রাটের মতো এপাশ ওপাশ তাকায়, হাঁটে কি হাঁটে না! এই বর্ষায় মেঘগুলোও ঠিক তেমনি। যেন ইচ্ছে না হলে ওরা আকাশ থেকে নড়বে না। আলোয় ঝিলিক দেবে দিনদুপুরে, চলতে চলতেও থমকে যাবে। জলপাইগুড়ি শহরের বর্ষার চরিত্রটাই এমন। একবার চললে আর রক্ষে নেই। তা নইলে হরিমাধবের ষাঁড়।

অর্জুন দ্রুত পা চালাল। ওদের গলির মুখেই বুড়িদের বাড়ি। আজ বুড়িদিকে দেখতে আসবে শিলিগুড়ি থেকে। সেই খুঁটিমারির জঙ্গল থেকে আনা শেকড় ঘষে এখন বুড়িদির মুখ চমৎকার পরিষ্কার, বিদ্ঘুটে মেচেতার দাগগুলো মিলিয়ে গেছে। অর্জুনের ইচ্ছে করছিল বুড়িদির সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু আকাশটার দিকে তাকিয়ে তার সাহস হল না। বৃষ্টি নামবার আগেই অমলদার বাড়িতে পৌঁছতে হবে।

অর্জুন দ্রুত পা চালালো। অমল সোমের বাড়ি হাকিমপাড়ায়। অনেকটা পথ যেতে হবে। রিক্সায় চড়লে, না, খামোকা পয়সা নষ্ট করে কী লাভ! এইসময় মুকুন্দদার দোকানটার দিকে নজর পড়ল ওর। মুকুন্দদা আসেন সাইকেলে, ওটা এখন দোকানের পাশে তালামারা। তাকে দেখতে পেয়ে মুকুন্দদা হাসলেন, ‘এই যে অর্জুনবাবু, কি খবর?

‘ভাল।’

‘ওহো, তোমার বউদি বলছিল একবার বাড়িতে আসতে।’

‘কেন?’

‘আর বলো না, প্রায়ই কিছু না কিছু চুরি যাচ্ছে। সেদিন তোমার বউদির একটা কানের দুল উধাও। আমাদের বাড়িতে কোনও বাইরের লোক কাজ করে না যে সন্দেহ করব। পুলিশে খবর দিয়েছি তো তারা গুরুত্বই দিচ্ছে না। তাই তোমার বউদি বলল, অর্জুন ঠাকুরপোকে ডাকো। নিশ্চয়ই বিহিত করতে পারবে।’ মুকুন্দদা হাসলেন।

অর্জুন বলল, ‘সেকি? আমি কি ভগবান?’

‘তা জানি না ভাই। দু-দুটো রহস্যের কিনারা করে তুমি শহরে হিরো হয়ে গেছ।’

অর্জুন হাসল, ‘কিনারা করতে পারব কিনা জানি না তবে বউদিকে বলবেন একদিন যাব। আমি আপনার সাইকেলটা একটু নিতে পারি? খুব দরকার।

মুকুন্দদা মাথা নেড়ে বললেন, ‘বেলা একটার মধ্যে ফেরত দিলেই চলবে।’

সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে অর্জুনের খুব ভাল লাগল। সত্যি সে শহরে বেশ বিখ্যাত। সবাই তার দিকে সমীহ করে তাকায়। খুঁটিমারির জঙ্গলে যে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটা শহরের লোক জানতে পেরেছিল বটে, তবে কালিম্পং-এ যেসব খুন-খারাপি হয়েছিল সেটা জানার কথা নয়। কিন্তু সব জানাজানি হয়ে গেল সমরেশদার জন্য। সমরেশদা জলপাইগুড়ির ছেলে, কলকাতায় থাকেন। অমল সোমের বন্ধু। অমলদার মুখে ওসব গল্প শুনে ‘খুন-খারাপি’ নামে যে বইটা লিখে ফেললেন তারপর থেকেই এই অবস্থা! সমরেশদাকে কোনও দিন চোখে দ্যাখেনি অর্জুন। তবে বইটা পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল অন্য গল্প পড়ছে যেন।

করলা গার্লস স্কুলের সামনে দিয়ে পাঁই পাঁই করে সাইকেল চালাচ্ছিল অর্জুন। করলা নদীর শরীর থেকে উঠে আসছে আঁশটে গন্ধ। বিবৰ্ণ বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পাকা ব্রিজে উঠতেই দাদুর চানাচুরের দেখা পেল সে। সাটিনের হলদে পাজামা পাঞ্জাবি পরে কপালে তিলক কেটে সুদর্শন ফেরিওয়ালা হাসলেন, ‘এই যে গোয়েন্দাদাদু, মেঘ মাথায় করে চললে কোথায়?’

‘অমলদার বাড়িতে।’ গতি হ্রাস করল সে সাইকেলের। ‘আপনি?’

‘আমিও সেখান থেকে।’ মুচকি হেসে তিনি নেমে গেলেন থানার রাস্তায়। অর্জুন ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না। চানাচুরদাদু অমলদার বাড়িতে কেন যাবে? নয়াবস্তি থেকে হাকিমপাড়ায় কেউ বিনা দরকারে যায় না। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মানুষটাকে সে ওই একই রকম চেহারা আর হাসিতে দেখে আসছে। অমলদাদের সঙ্গে ওর কী দরকার পড়ল?

তিস্তার বাঁধের গায়ে ছোট্ট বাগান ঘেরা কাঠের দোতলা বাড়িটা অমল সোমের। অমলদা একা থাকেন ওখানে। ত্রিভুবনের কোনও আত্মীয়স্বজন নেই ওঁর। শুধু একটা বোবা চাকর আছে কাজকর্ম করার জন্য। লোকটার গায়ে খুব শক্তি। নাম, হাবু।

বাগানের গেট খুলতেই হাবুকে দেখতে পেল অর্জুন। কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। ওকে দেখে একগাল হেসে আঙুল দিয়ে দোতলাটা ইশারা করল। অর্থাৎ অমলদা এখন সাধনার ঘরে। ওখানে ঢুকলে কেউ বিরক্ত করতে পারবে না ওঁকে। ফ্যাসাদে পড়ল অর্জুন। খুব জরুরি সমস্যা না থাকলে অমল সোম সাধনা গৃহে ঢোকেন না। ওখানে কোনও দিন ওঠেনি সে। অমল সোম একদিন হেসে বলেছিলেন, ‘ওই ঘরে ঢুকলে মনটা বেশ হালকা হয়ে যায়।’

এখন সে কী করবে! সে হাবুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কখন ঢুকেছে?’ ঘাড় নাড়ল হাবু। একটু বেশি করে। মানে অনেকক্ষণ, কিন্তু তাই বা কী করে হবে? দাদুর চানাচুর তো একটু আগে এখান থেকে চলে গেছে। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘সকালে কেউ এসেছিল?’

সঙ্গে সঙ্গে ওপরে নীচে মাথা দোলাল হাবু, হ্যাঁ।

সাইকেলটাকে বারান্দার সঙ্গে লাগিয়ে একতলার বসার ঘরে ঢুকল অৰ্জুন। চারটে চেয়ার এবং একটা কাঠের টেবিল ছাড়া আর কোনও আসবাব নেই। এমন কী দেওয়ালে কোনও ছবি পর্যন্ত নেই। বড় ঘরটা কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া দেখায়। পাশের ঘরে অমল সোম থাকেন। অর্জুন একটা চেয়ারে বসে দুবার টেবিলে তবলা বাজাতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। তড়াক করে লাফিয়ে বারান্দায় এসে অর্জুন দেখল, না, সাইকেলে বৃষ্টির ছাঁট লাগছে না। এতক্ষণ গলা সাধার পর যে গান শুরু হল তা সত্যি ভয়াবহ। চারধার সাদা হয়ে গেছে জলের ধারায়। আকাশটা যেন আচমকা গলে পড়ছে মাটিতে। ঠিক সেই সময় একটি গাড়ির আওয়াজ কানে এল। বৃষ্টির পর্দার আড়াল ভেদ করে অর্জুন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলো একটা নীল অ্যাম্বাসাডার ঠিক গেটের মুখটায় এসে দাঁড়িয়েছে।

হাবু এখন বাগানে নেই। বৃষ্টি পড়তেই নিশ্চয়ই পিছনের রান্নাঘরে ঢুকেছে। অমলদার কাছে লোকজন প্রায়ই আসে। কিন্তু এই বৃষ্টি মাথায় করে গাড়িতে চেপে কে আসবে! একটু ইতস্তত করল বোধহয় আরোহী। কারণ মিনিট দুয়েক পরে দরজাটা খুলল পিছনের। তারপর ফোল্ডিং ছাতা খুলে জোরে জোরে পা ফেলে এগিয়ে এলেন ভদ্রলোক। তাঁর কায়দার ছাতা জলের ধারাকে রুখতে পারছিল না। বারান্দায় উঠে যখন ছাতা নামালেন উনি তখন শরীরের অর্ধেকটা ভেজা। সিল্কের পাঞ্জাবির নীচে চোস্ত পাজামা পরা মানুষটার বয়স চল্লিশের নিচে নয়। চোখের তলায় কমলা লেবুর কোয়ার মতো ফোলা মাংস। মাথায় বেশ বড় টাক। ধবধবে গায়ের রঙের সঙ্গে বেশ মানানসই চর্বিওয়ালা পেট। ছাতাটা বারান্দায় নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা অমল সোমের বাড়ি তো?’ উচ্চারণে অবাঙালির টান স্পষ্ট।

অর্জুন মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। আসুন।’

ঘরে ঢুকে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে অর্জুন লক্ষ করল বাঁ হাতে নটা আংটি। বুড়ো আঙুল ছাড়া প্রত্যেকটায় দুটো করে। লোকটি বলল, ‘এই বৃষ্টি কখন থামবে কে জানে! জান কয়লা করে দিল। অমলবাবুকে একটু খবর দিন।’

‘একটু অপেক্ষা করতে হবে।’

‘অপেক্ষা করব? কেন? আপনি বললেন যে তিনি বাড়িতেই আছেন।’ ভদ্রলোকের মুখ-চোখে বিরক্তি স্পষ্ট হল, গলার স্বরে ঝাঁঝ।

‘আছেন, তবে একটু ব্যস্ত। আমি খবর দিচ্ছি।’ লোকটার মেজাজ দেখে কথাটা বললেও অর্জুনের মনটা ভাল লাগছিল না। তাকে দেখে যে চট করে তুমি বলেনি এইটে কম কথা নয়। সে পর্দা সরিয়ে ভেতরের ঘরে এল। এইটে অমল সোমের শোওয়ার ঘর। একটা খাট আর বড় আলমারি ছাড়া দেওয়ালগুলো বইপত্তরে ভর্তি। এই সব বই নাকি অমলদার পড়া। বিষয় বেশ মজার। আফ্রিকার কোন পাখি তার এক মাসের জীবন কিভাবে কাটায় সেই বিষয়েই একটা গোটা বই লেখা। কোনটায় আমেরিকার পাক্ সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা। ওপরে একটি পা মেয়ের ছবি ছাপা। থাই অবধি কালো লম্বা জুতো, মিনি প্যান্টের ওপরে লাল জ্যাকেট, কানের দু’ পাশ থেকে মাথার মধ্যিখানের দেড় ইঞ্চি বাদ দিয়ে পরিষ্কার কামানো; আর সেই দেড় ইঞ্চি চুলটায় নানান রঙ করা। উদ্ভট দেখতে সেই মেয়েটির চোখের মধ্যে কেমন একটা হিংস্র চাহনি। অর্জুনের অনেকবার মনে হয়েছে অমলদার কাছ থেকে বইটা চেয়ে নিয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় লেখা একটা গোটা বই কখনও পড়েনি সে। ভয় হয় যদি বুঝতে না পারে। অমলদা বলেন ইংরেজি-ভীতিটা অবশ্যই কাটানো উচিত। না হলে সমস্ত পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার অজানা রয়ে যাবে। উনি বলেছেন খবরের কাগজ পড়তে। ইংরেজি কাগজ পড়তে পড়তে ভয়টা কেটে যাবে। অর্জুন তাই করছিল। আজ ঠিক করল যাওয়ার সময় বইটা চেয়ে নিয়ে যাবে।

দরজায় হাবু দাঁড়িয়েছিল। ওকে দেখে মুখ হাঁ করল দু’বার। তার অর্থ, চা খাবে? মন্দ হয় না। তা ছাড়া বাড়িতে একজন অতিথি এসেছে। সে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলতেই হাবু বৃষ্টির মধ্যে রান্নাঘরে চলে গেল। এই সময় কানে তালা লাগিয়ে বাজ পড়ল কোথাও। এত শব্দ যে কাঠের বাড়িটাই যেন কেঁপে উঠল। আর ঠিক তখন অমল সোম নেমে এলেন ওপর থেকে। সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্জুনকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন তিনি, ‘আরে কখন এলে?’

‘এইতো কিছুক্ষণ। আপনি ওপরে ছিলেন বলে ডিস্টার্ব করিনি।’ অর্জুন হাসল।

‘ভালই করেছ। তা এই অসময়ে, মতলবটা কী?’

এই ধরনের কথাবার্তা মোটেই পছন্দ হয় না অর্জুনের। সে অনেকবার বলেছে চাকরি-বাকরি যদি না জোটে না জুটুক, অমল সোমের সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারলে সে আর কিছু চায় না। অমলদা এই প্রস্তাবটা একদম গা করেন না। তিনি বলেন, ‘এটা কি লন্ডন-ন্যুয়র্ক? মফঃস্বলের একটা ছোট্ট শহরে কখন কী কেস আসবে তার ঠিক নেই!’ এখন তার আসার কারণটা বলতে গিয়ে অর্জুনের খেয়াল হল, বাইরের ঘরে সেই লোকটা বসে আছে। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘আপনার একজন গেস্ট এসেছেন।

‘তোমার সঙ্গে?’

‘না, আমার পরে।

অমল সোমের পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। খদ্দরের। সেই অবস্থায় তিনি পাশের ঘরে গিয়ে বললেন, ‘কই, কেউ নেই তো।’ অর্জুনের সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। সেও তাজ্জব হয়ে গেল। ঘর ফাঁকা, লোকটা নেই। কী আশ্চর্য ব্যাপার! অমলদার সঙ্গে দেখা করতে এসে আবার এই বৃষ্টি মাথায় করে চলে গেল। যাওয়ার সময় গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায়নি। অর্জুন দ্রুত বাইরে এল। ছাতাটা নেই এবং এখন গেটে গাড়িটাকে দেখা যাচ্ছে না। লোকটা এলই বা কেন চলে গেলই বা কেন? অমল সোম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ঠিক কী হয়েছিল বল তো?’

অর্জুন বিশদে বলল। লোকটা যে খুব বিরক্ত হচ্ছিল তাও মনে হয়ে ছিল।

অমল সোম বললেন, ‘মাথা ঘামানোর কোনও দরকার নেই। যদি প্রয়োজন থাকে তা হলে আবার আসবেন ভদ্রলোক।’ তারপর চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘এটা কী?

টেবিলে যে একটা কার্ড পড়ে আছে সেটা নজরে আসেনি এতক্ষণ। অমল সোম সেটাকে তুলে নিতে অর্জুন পিছনে এসে দাঁড়াল। সাদা কার্ডের পিছনে লেখা, ‘প্লিজ কল মি।’ তারপর জলপাইগুড়ি এক্সচেঞ্জের একটা ফোন নম্বর। কার্ডটা ওল্টালে নামটা দেখা গেল, ইউ. এন. রায়। আর কিছু নেই। শুধু নামটাই সোনালি কালিতে ছাপা

অমল সোম চোখ বন্ধ করল, ইউ. এন। উঁহু। এত বছর জলপাইগুড়িতে আছি, কই এ নামের তো কাউকে চিনি বলে মনে পড়ছে না। ইউ. এন। কী হতে পারে ইউ. এনে?’

আকাশ-পাতাল ভাবছিল অর্জুন। কোন বাঙালি নামের প্রথম অক্ষর ইউ? এন-এ না হয় নাথ বোঝা গেল। শেষ পর্যন্ত মাথায় এসে গেল, সে হেসে বলল, ‘উত্তম নাথ রায়।’

‘উত্তম? হতে পারে। তবে তার সঙ্গে কি নামটা চলে? উত্তম নারায়ণ? কিন্তু লোকটার যা বয়স বলল সেই সময়ে উত্তম নামটা রাখার চল ছিল না। এবং উজ্জ্বলনারায়ণ চলতে পারে। যা হোক, লোকটা খুব ডিস্টার্বড্, মন ঠিক রাখতে পারছে না এবং ধৈর্য নেই। এসবের কারণ লোকটার মাথার ওপর বিপদের খাঁড়া ঝুলছে। কিন্তু আমার খবর কী করে পেল? এমনভাবে ফোন করার হুকুম দিয়ে গেছে যে মনে হয় শরীরে জমিদারি রক্ত আছে। ঠিক আছে, লোকটা অন্তত যাওয়ার আগে তোমাকে বলে যাওয়ার ভদ্রতাটুকু করতে পারত। অবশ্য মাথার ঠিক না থাকলে—।’ অমল সোম যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছিলেন।

অর্জুনের তখন মাথায় অন্য চিন্তা। অমল সোমের বাড়িতে টেলিফোন নেই। কাছাকাছি কার বাড়িতে টেলিফোন আছে, সেই কথা ভাবছিল সে। এই সময় অমল সোম বললেন, ‘তারপর অর্জুনবাবু, আর কী সংবাদ?’

তখনই খেয়াল হল। অর্জুন চেয়ার টেনে বসে বলল, ‘আপনার একটা চিঠি আছে।’

‘আমার চিঠি? কে দিয়েছে!’

‘কালিম্পং-এর বিষ্টু সাহেব।’

‘বুঝলাম না। বিষ্টু সাহেব কেন আমার চিঠি তোমার কাছে পাঠাবেন?’

‘বিষ্টু সাহেব সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।’ অর্জুন পকেট থেকে একটা বড় খাম বের করল।

খামের মধ্যে একটা চিঠি আর তার সঙ্গে আর একটা ছোট মুখবন্ধ খাম। চিঠিটা পড়ল অর্জুন, ‘স্নেহের তৃতীয় পাণ্ডব, আশাকরি কুশলে আছ। তোমার পত্র পাইয়াছি। গোয়েন্দা সাহেব তো পত্র লেখার প্রয়োজনই বোধ করেন না। যা হোক, তোমাদের জানাইয়াছিলাম যে কালিম্পং শহরে এখন ক্রিমিন্যাল থিকথিক করিতেছে। এখানে চেম্বার খুলিলে গোয়েন্দা সাহেবের টাকার পাহাড় জমিয়া যাইবে। বাঙালির তো কোনও কালে ব্যবসায় মন নাই। ভাল কথা শুনিবে কেন? যা হোক, একটি বিশেষ দরকারে এই পত্র লিখিতেছি। সঙ্গে একটি মুখবন্ধ খাম দেখিবে। উহা যথাশীঘ্র গোয়েন্দা সাহেবের হাতে পৌঁছাইয়া দিবে। সরাসরি তাহাকে পাঠাইলাম না, কারণ গোয়েন্দাদের প্রচুর শত্রু থাকে।

মধ্যপথে পত্র উধাও হওয়া বিচিত্র নয়। আশীবাদক, বিষ্ণুচরণ পত্রনবীশ ওরফে বিষ্টু সাহেব।’

অমল সোম ঠোঁট টিপে হেসে খামটা নিলেন! তারপর সেটা ছিঁড়ে চিঠিটা পড়ে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর ঠোঁট থেকে দুটো শব্দ বেরিয়ে এল আলতো করে, ‘তাই বলো।

অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল ওই চিঠিতে কী আছে জানতে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অমল সোম চিঠিটা পড়ে খুব নাড়া খেয়েছেন। এই সময় হাবু এসে দু’কাপ চা রেখে গেল টেবিলে। অমল সোমের মুখে হাসি ফিরে এল, ‘বাঃ, হাবুটার বেশ বুদ্ধি আছে তো। নাও, চা খাও।’

শব্দ করে চায়ে চুমুক দিলেন অমল সোম। তারপর বললেন, ‘আমরা মিছেই ভেবে মরছিলাম অর্জুন, লোকটার নাম উপেন্দ্রনারায়ণ রায়।’

অর্জুন দেখল, অমল সোম মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়ছেন। সে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না। বিষ্টু সাহেবের চিঠির সঙ্গে উপেন্দ্রনারায়ণ রায়ের কী সম্পর্ক! ইউ. এন. মানে যে উপেন্দ্রনারায়ণ সেই সূত্রটি কি ওই চিঠিতে আছে?

চিঠি পড়া শেষ হলে অমল সোম বললেন, ‘এই ব্যাপার!’ যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব। তারপর হেসে উঠলেন, ‘যাই বলো, বিষ্টু সাহেব খুব হেল্পফুল।’

একটু দ্বিধা নিয়ে অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘কী লিখেছেন বিষ্টু সাহেব?’

‘লিখেছেন কালিম্পং-এর নতুন প্রতিবেশীর নাম উপেন্দ্রনারায়ণ রায়। চিরকাল আমেরিকার সানফ্রান্সিসকো শহরে মানুষ। হঠাৎ দেশের জন্য টান বোধ করায় চলে এসেছেন কালিম্পং-এ। আদি বাড়ি জলপাইগুড়ি শহরের পাশে, নামকরা জমিদারদের বংশ। কালিম্পং-এ ভদ্রলোক ডেয়ারি খুলেছেন। একদম আমেরিকান কায়দায়। উনি খবর পেয়েছেন খোদ জলপাইগুড়ি শহরে এক ব্যক্তি ছয়টি সুগঠিত তরুণ ষাঁড়ের মালিক। উনি এই জীবগুলিকে কিনতে চান, অতএব আপনি যদি সাহায্য করেন তা হলে বাধিত হইব। উপেন্দ্রবাবুকে আপনার নাম বলিয়াছি। তিনি যে কোনও দিন তথায় যাইতে পারেন। চিঠি থেকে এটুকু পড়ে শুনিয়ে অমল সোম বললেন, ‘পুনশ্চ দিয়ে বিষ্টু সাহেব লিখেছেন, লোকটি সন্দেহজনক। সি আই এ-র চরও হইতে পারে। উহার একমাত্র কন্যা নাকি পাক্ সম্প্রদায়ভুক্ত। সেটি কী বস্তু, তাহা জানি না।’

চিঠিটা টেবিলে ফেলে দিয়ে অমল সোম বললেন, ‘এইটে ইনটারেস্টিং, ইউ. এন. রায়ের সঙ্গে আমি শুধু ওর মেয়ের জন্য আলাপ করতে পারি। পাঙ্করা আমেরিকায় এখন শক্তিশালী। এখন অবধি ওরা কোনও অ্যাকশনে নামেনি কিন্তু পাঙ্করা যে পাড়ায় থাকে সেখানে সাধারণ মানুষ হাঁটতে স্বস্তি পায় না। উপেন্দ্রনারায়ণের মেয়ে পাক্, একটা বাঙালি মেয়েকে ওই চরিত্রে ভাবতে বেশ মজা লাগছে!’

অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘পাঙ্করা কী করে—’

অমল সোম উঠলেন, ‘ও ঘরে একটা বই আছে। পড়ে ফ্যালো। আজকে আমি আর বেরুবো না। তুমি দুটো কাজ করো। ওই ইউ. এন. রায়কে টেলিফোন করে বলে দিও আমরা আজ সন্ধ্যাবেলায় দেখা করতে পারি। আর একবার মদনমোহন মন্দিরে গিয়ে হরিমাধবকে জিজ্ঞাসা করবে, সে ষাঁড়গুলো বিক্রি করবে কিনা। আমার ছাতা নিয়ে চলে যাও।’

অর্জুন বাইরে তাকাল। বৃষ্টি ধরার কোনও নামগন্ধ নেই। ওই বৃষ্টিতে ছাতা হাতে সাইকেল চালানো অর্থহীন। সে মাথা নাড়ল, ‘সঙ্গে সাইকেল আছে। ছাতায় কাজ হবে না। আমি বইটা পরে নেব।

‘সে কী? ভিজতে ভিজতে যাবে? না, না। তুমি বরং আমার বর্ষাতিটা নিয়ে যাও।’ পাশের ঘরের আলমারির গায়ে ঝোলানো বর্ষাতিটা বের করে দিলেন অমল সোম। বর্ষাতি পরলে বেশ থ্রিল লাগে অর্জুনের। হাঁটুর তলা অবধি ঢাকা, মাথা, কান আড়ালে। নিজেকে বেশ গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হয়।

বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অর্জুন। যতই বর্ষাতি গায়ে থাকুক ছাঁট আটকাচ্ছে না মোটেই। হাওয়ার দাপটে হ্যান্ডেল সোজা রাখাই মুশকিল। দিনবাজারের মুখটাতে ওর বন্ধুর বাবার দোকান। দু-দু’টো অ্যাডভেঞ্চারের পর ভদ্রলোক তাকে বেশ খাতির করেন। সেখান থেকে ইউ. এন. রায়ের নম্বরে টেলিফোন করল অর্জুন। খুব বিরক্ত গলায় এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে?’

‘এখানে কি ইউ. এন. রায় থাকেন?’

‘থাকেন। তিনজন ইউ. এন. রায় এই বাড়িতে থাকেন। আর একজন আজ এসেছেন। আপনি কোন ইউ. এন. রায়কে চান? উজ্জ্বল, উত্তম, উপল—।’

‘যিনি আমেরিকায় ছিলেন।’

‘ও, উপেন্দ্র। সে বাড়িতে নেই। এই নিয়ে অন্তত তিনটে ফোন এল তাঁর, কি ব্যাপার বলুন তো? কোনও কালে সে এখানে থাকত না। আজ সকালে আসামাত্র ঘন ঘন টেলিফোন আসতে লাগল!’

‘উনি কখন ফিরবেন জানেন?’

‘না।’

‘এলে বলবেন অমলবাবু বিকেলে দেখা করতে পারেন।’ রিসিভার নামিয়ে রেখে বন্ধুর বাবার সঙ্গে দু’-একটা মামুলি কথা বলে অর্জুন আবার সাইকেলে উঠল। বৃষ্টির চাপ সামান্য কমেছে। জলপাইগুড়িতে বৃষ্টি হলে রাস্তায় জল জমে না বটে, কিন্তু করলার জল রাস্তায় উঠে আসে। এরকম অপদার্থ নদী খুব কম শহরেই দেখা যায়। অর্জুন দেখল করলানদীর জল ডাঙা ছুঁই ছুঁই করছে। রাজবাড়িটাকে বাঁয়ে রেখে সে আরও একটু এগোতেই মন্দিরটাকে দেখতে পেল। মদনমোহন মন্দির। হরিমাধবের বেশ খ্যাতি হয়েছে শহরে। ভক্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু মন্দিরের কাছাকাছি হয়ে অর্জুনের মনে হল সেখানে বেশ ভিড় জমেছে এ জলেও। ছাতা মাথায় সবাই মন্দিরের পাশে ভিড় করেছে। আর একটু এগোতেই কান্নার আওয়াজ কানে এল। পুরুষ কণ্ঠে আকুলি-বিকুলি।

সাইকেল থেকে নেমে কয়েক পা এগোতেই দৃশ্যটা দেখতে পেল অর্জুন। মন্দিরের পাশে একটা আটচালার তলায় ঠ্যাং ছড়িয়ে শুয়ে আছে ষাঁড়গুলো। বিশাল নধর শরীর এখন পাহাড়ের মতো শক্ত। ছ’টা ষাঁড় পাশাপাশি মরে পড়ে আছে। আর তাদের মাঝখানে বসে হরিমাধব কপালে হাত চাপড়ে কেঁদে চলেছে সমানে।

একজন বলল, ‘গো-হত্যা মহাপাপ। কোন পাষণ্ড এমন কাজ করল!’

আর একজন বলল, ‘ছ’টা মহাপাপ। ছ’টা কৃষ্ণের জীবকে খতম করে দিল!’

তৃতীয় জন মিনমিনে গলায় জানালো, ‘ওরা তো ঠিক গো নয়। ষাঁড়। সমান মহাপাপ হবে কিনা কে জানে! তবে হ্যাঁ, প্রভু তো ওদের পিঠে বসতে বড় ভালবাসতেন।

দৃশ্যটা মোটেই ভাল লাগছিল না অর্জুনের। এমন স্বাস্থ্যবান ছ’টা প্রাণীর মৃত শরীর বড় পীড়াদায়ক। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এ হত্যাকাণ্ড। তারপরেই তার মাথার ভেতর একটা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। ইউ. এন. রায় এগুলো কিনতে নেমে এসেছেন পাহাড় থেকে। আর তার আগেই কেউ এদের খতম করে দিয়েছে। অর্থাৎ কেউ কিংবা কারা ইউ. এন. রায়কে বাগড়া দিতে চায়! ভদ্রলোককে কি সেই কারণে ছটফটে দেখাচ্ছিল?

সে সামনের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী করে হল?’

কাঁধ নাচালো লোকটি, ‘সকালেও ওরা ঠিক ছিল। এই খানিক আগে এক ভদ্রলোক গাড়িতে এলেন। বললেন, উনি ষাঁড়গুলোকে কিনতে চান, একটু দেখবেন। হরিমাধবদা তো অবাক। কেউ ষাঁড়, মানে ছ-ছ’টা ষাঁড় কিনতে চাইছে কেন? তা প্রাণ থাকতে তো তিনি বিক্রি করবেন না ওদের। কিন্তু ভদ্রলোক এমন চাপাচাপি করতে লাগলো যে দেখাতে হল। আর এসেই এই দৃশ্য।’

‘ভদ্রলোক কোথায়?’

‘উনি তৎক্ষণাৎ চলে গেলেন। ওহে, হরিমাধবদাকে একটু শান্ত হতে বলো। এ সবই প্রভুর ইচ্ছে। আমরা তো যন্ত্র মাত্র!’ লোকটি নির্বিকার মুখে বলল।

‘সেই লোকটিকে দেখতে কেমন?’ অর্জুন আবার খোঁচালো।

‘মাথায় টাক আছে। তুমি কে হে? এত প্রশ্ন করছ?’

‘থানায় খবর দিয়েছো?’

পাশ থেকে একজন বলল, ‘লোক গিয়েছে থানায়।’

অর্জুন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চুপচাপ সরে এল। সবাই এখন হরিমাধবকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। হরিমাধব যেন পুত্রশোকে কাতর

মেঘ এবং বৃষ্টিতে বেলা বোঝা মুশকিল। হাতেও ঘড়ি নেই। এই বর্ষায় রাস্তায় লোক দেখা যাচ্ছে না যে সময়টা জেনে নেবে। অথচ সাইকেলটাকে একটার মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার দরকার। কিন্তু একটা বড় রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ইউ. এন. রায়ের মেয়ে পাক্। সানফ্র্যানসিস্কোতে ছিল। ডেয়ারি করতে কালিম্পং-এ এসেছেন। একটা ডেয়ারির জন্য ছ’টা ষাঁড় কী দরকার? তা এখানে আসামাত্র ঘন ঘন ফোন এসেছে ওঁর ঠিকানায়। তারপর স্পটে পৌঁছানোর আগেই কেউ ষাঁড়গুলোকে মেরে ফেলল। এই কেউটা কে? এখনই খবরটা অমলদাকে জানানো দরকার। অথচ সাইকেল না ফিরিয়ে দিলে মুকুন্দদা খেতে যেতে পারবেন না দোকান বন্ধ করে। অর্জুন আর দ্বিধা করল না। দ্রুত প্যাডেল ঘুরিয়ে মুকুন্দদার দোকানে চলে এল।

মুকুন্দদা তখন গালে হাত দিয়ে কাউন্টারে বসে, ওকে দেখে বললেন, ‘যাক, ঠিক সময়ে এসে পড়েছ। যা বৃষ্টি, একটা খদ্দেরেরও দেখা নেই। ও বেলা যদি এই অবস্থা থাকে তা হলে দোকান খুলব না।’

‘ক’টা বাজে এখন?

‘পৌনে এক।’

সাইকেল ফিরিয়ে দিয়ে রাস্তায় নামল অর্জুন। মা নিশ্চয়ই খাবার নিয়ে বসে থাকবেন। কিন্তু সেটা শেষ করে অমলদার কাছে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ওর আর তর সইছিল না। রাস্তায় এখন রিক্সাও নেই। দেরি হয়েছে বলে বৃষ্টির দোহাই দেওয়া যাবে মায়ের কাছে। অমলদার বাড়ি হেঁটে ঘুরে আসতে গেলে আধ ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। দেড়টা নাগাদ বাড়ি ফিরতে খুব অসুবিধা হবে না। অর্জুন দ্রুত পা চালালো। সাইকেলের সিটে বসে থাকার সময় অনুভূতিটা হয়নি। এখন শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। অথচ গায়ে লাগছে না—এ এক অন্য রকমের থ্রিল। আধঘণ্টার পথ প্রায় কুড়ি মিনিটে পেরিয়ে আসছিল। কিন্তু থানার পাশ দিয়ে নামতেই চমকে উঠল। করলার জল রাস্তাটা ডুবিয়েছে। ঠিক এই জায়গায় কিছু দিন আগে রাহুত বাড়ির একটি ছেলে ডুবে গিয়েছিল। সঙ্গে সাইকেল ছিল তার। জলের তলায় রাস্তা দেখা মুশকিল। কিন্তু সেই নেতাজিপুল ঘুরে যেতে অনেক সময় লাগবে। সন্তর্পণে পা ফেলতে লাগল সে। প্যান্ট গোটানো যায় কিন্তু বর্ষাতি কিভাবে গোটাবে। একশ গজ জল ভাঙতেই ভিজে একাকার হয়ে গেল অর্জুন। প্রায় থাই অবধি জলের তলায়, মাথার ওপর আকাশ গলে পড়ছে।

অমল সোমের বাড়ির সামনে এসে সে চমকে গেল। নীল অ্যাম্বাসাডারটা ঠিক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কাচগুলো বন্ধ। শুধু ড্রাইভারের আসনে একটা ক্যাপ মাথায় নেপালি ছেলে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। বোধহয় বেশ ক্লান্ত, কারণ ওর চোখ দুটো বন্ধ! গেট খুলে বাগান পেরিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতেই অমল সোমের গলা শুনতে পেল সে, ‘কী খবর অর্জুন, পুলিশ এসে গিয়েছে?’

‘না, এখনও আসেনি।’ অর্জুনের আফশোস হচ্ছিল। এত বেলায় বৃষ্টিতে ভিজে এখানে না এলেও চলত। ইউ. এন. রায় খবরটা তো দিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সামনে চায়ের কাপ কিন্তু সেটায় চুমুক দেওয়া হয়নি। ফিনফিনে সর পড়ে গেছে এর মধ্যে। অমল সোম বললেন, ‘মিস্টার রায়, এর সঙ্গে আপনার আগেই আলাপ হয়েছিল। এরই নাম অর্জুন। খুব বুদ্ধিমান ছেলে, বিষ্টুসাহেব নিশ্চয়ই বলেছেন ওর কথা। এই আপনার ভাইপো হবে।’

‘হ্যাঁ! কিন্তু আমাকে ফিরে যেতেই হবে কালিম্পং-এ।’

‘নিশ্চয়ই যাবেন। তবে অর্জুন আপনার সঙ্গে যাবে। আপত্তি নেই তো?’

‘নট অ্যাট অল। তবে আপনি গেলে সুবিধে হত।’

‘আমি যাব। আমার চাকরটা তো কথা বলতে পারে না। ওর ওপর বাড়িটা ছেড়ে যেতে সাহস হয় না। একটা ব্যবস্থা করেই আমি রওনা হব। আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। অর্জুনের ওপর আমার আস্থা আছে।’ অমল সোম হাসলেন।

‘আমার মাথার ঠিক নেই মিঃ সোম। ব্যাপারটা ক্রমশ জটিল হয়ে পড়েছে। প্লিজ হেল্প মি।’ রাজকীয় চেহারার মানুষটিকে খুব অসহায় দেখালো।

এ কথার জবাব দিলেন না অমল সোম। ঘড়ি দেখে বললেন, ‘বেলা হয়ে গিয়েছে। আপনাদের এই বৃষ্টির মধ্যে কালিম্পং-এ যেতে হবে। আর দেরি করবেন না। আপনি কি আপনার ভাই-এর বাড়ি হয়ে যাবেন?’

ইউ. এন. রায় মাথা নাড়লেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কত অ্যাডভান্স দিতে হবে?’

‘এক পয়সাও না। আপনার কাজ কতটা করতে পারি আগে দেখি।’ অমল সোম ওকে বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন, ‘আপনি ড্রাইভারকে বলবেন ঠিক দুটোর সময় কদমতলার মোড়ে রূপমায়া সিনেমার সামনে গাড়ি দাঁড় করাতে। অর্জুন ওখান থেকে আপনার গাড়িতে উঠবে। গুড বাই।’

‘বাই।’ ভদ্রলোক ভাঁজ করা ছাতা খুলে বৃষ্টিতে নেমে গেলেন। অর্জুন এ সবের কিছুই বুঝতে পারছিল না। ইউ. এন. রায় নীল অ্যাম্বাসাডারে উঠে পড়লে অমল সোম পকেট থেকে তিনশো টাকা বের করে বললেন, ‘অর্জুন, আর দেরি কোরো না। এক্ষুনি বাড়ি গিয়ে খেয়ে-দেয়ে দুটোর মধ্যে কদমতলায় পৌঁছে যাও। মাসীমাকে বলো দিন কয়েকের জন্য তুমি কালিম্পং-এ যাচ্ছ।’

‘কেন?’ অর্জুনের হতভম্ব ভাবটা তখনও কাটেনি।

‘ওহো, তোমাকে তো কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু এখন আর সময়ও নেই। বিষ্টুসাহেব আমাদের বন্ধু, ওর অনুরোধ ফেলতে পারি না তাই এই কেসটা নিতে হল। তবে তুমি বিষ্টুসাহেবের বাড়িতে উঠবে না। তোমাকে থাকতে হবে ইউ. এন. রায়ের সঙ্গেই। তোমার কাজ হল চোখ খোলা রাখা। দিনের বেলায় ঘুমাবে আর রাত্রে জাগবে। দেখবে ওই বাড়িতে কেউ আসছে কিনা, এলে তারা কে কে? দ্বিতীয়ত, রায়সাহেবের মেয়ে বাড়ি থেকে বের হয় কিনা, তার প্রকৃতি কেমন, কে কে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রতিদিনের খবর তুমি একবার বিষ্টুসাহেবকে দিয়ে দেবে। তা হলে আমি পাব। তেমন কিছু না ঘটলে তুমি পাঁচ দিন বাদে ফিরে এসো। না হলে তোমার সঙ্গে সেখানে দেখা করার কোনও রকম বাড়তি কৌতূহল দেখাবে না। তোমার পরিচয় হবে রায়সাহেবের ভাইপো, উজ্জ্বলনারায়ণ রায়ের ছেলে, উপল। এখানকার কলেজে পড়ছ। টাকাটা রাখ, প্রয়োজনে খরচ করো। ও. কে!

অর্জুন জানে এই মুহূর্তে অমল সোমকে প্রশ্ন করা নিরর্থক। কালিম্পং-এ যেতে তার নিশ্চয়ই খারাপ লাগবে না, কিন্তু তাকে একবার প্রশ্নও করা হল না সে যেতে ইচ্ছুক কিনা। সে তো এখন বলতেই পারে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। অসুবিধে আছে। কিন্তু অমল সোমের মুখের দিকে তাকিয়ে অর্জুন সে সব কিছুই বলল না। অমলদা প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে ইউ. এন. রায়কে বলেছেন যে অর্জুন যাবে। এই আত্মবিশ্বাস পারস্পরিক সাহচর্যে গড়ে উঠেছে। তা ছাড়া যা শুনল তাতে মনে হচ্ছে কালিম্পং-এ তার জন্য বেশ ভাল রকমের রহস্য অপেক্ষা করছে। একমাত্র এই হুট করে যাওয়ার জন্য মা রাগারাগি করতে পারে। তবে অমলদার কথা বললে হয়তো নিমরাজি হবে।

সে টাকাটা নিয়ে বলল, ‘অমলদা, আমাকে বইটা দেবেন?”

‘কী বই?’

‘ওই যে পাঙ্কদের নিয়ে লেখা। ওটা এই সুযোগে পড়ে ফেলি।’

‘গুড। কিন্তু সাবধান। তোমাকে যেন কেউ ওই বই পড়তে না দ্যাখে। স্পেশ্যালি রায়সাহেবের মেয়ে। ওরা জানবে তুমি একটি গোবেচারা মফঃস্বলের ছেলে। পাঙ্ক শব্দটা তুমি জীবনে শোননি এবং তার অর্থ জানো না।’

বর্ষাতিটা অমল সোমকে ফেরত দিতে হয়নি। বইটা একটা রঙিন প্লাস্টিক জ্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে প্যান্টের মধ্যে কোমরে গুঁজে নিয়েছিল অর্জুন। মলাটের ছবিটার দিকে এক নজর তাকিয়েছিল জ্যাকেটে ঢোকানোর সময়। বীভৎস সাজটা চোখে লেগে আছে। ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি মেয়েটার। ইউ. এন. রায়ের মেয়েকে কি ওই রকম দেখতে? অর্জুন ভেবে পাচ্ছিল না।

এককালে এন-সি-সি করেছে অর্জুন। না হলে অত দ্রুত স্নান খাওয়া শেষ করে ব্যাগ গুছিয়ে নিতে পারত না। মাকে অনেক কষ্টে ম্যানেজ করা গেছে। অমলদা ওকে ক’দিনের জন্য কালিম্পং পাঠাচ্ছে জেনে আঁতকে উঠেছিলেন তিনি। কালিম্পং-এই তো সেবার অমন গোলাগুলি চলেছিল। অর্জুন আশ্বাস দিয়েছে সেরকম কিছু হবে না এবার, হলে অমলদা তাকে একা পাঠাতেন না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে অর্জুনের মনে হয়েছিল পৃথিবীর কোন দেশের গোয়েন্দাদের এই সমস্যায় পড়তে হয় না। তাদের মায়েরা সব সময় স্নেহ থেকে ভীতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন না। কিন্তু সে ছাড়া মায়ের তো আর কেউ নেই!

বারান্দায় বুড়িদি দাঁড়িয়ে। মাথায় একরাশ খোলা চুল ফুলে ফেঁপে দু’পাশে ছড়িয়ে। ওকে দেখে ঠোঁট দাঁতে কাটল বুড়িদি। এখন ওর মুখ প্রায় আয়নার মতো ঝকঝকে। বুড়িদি খুব নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

‘কালিম্পং। অ্যানাদার অ্যাডভেঞ্চার।’

‘সত্যি!’ বুড়িদির মুখে হাসি ফুটলো, ‘কী ব্যাপার রে?’

‘এখন বলার সময় নেই। ফিরে এসে বলব। তুমি এখনও সাজগোজ করোনি? তোমায় বর দেখতে আসবে কখন?’ অর্জুন হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল।

‘জানি না, আমার কিছু ভাল লাগছে না।’ কথাটা শেষ করেই বুড়িদি ভেতরে চলে গেল।

এই যাওয়ার ধরনটা দেখে অর্জুনের বেশ ভাল লাগল। এত দিনে বুড়িদির এবং ওদের বাড়ির মানুষদের মুখে হাসি ফুটেছে। মুখ ভর্তি কালো দাগের জন্য কোনও পাত্রপক্ষ বুড়িদিকে পছন্দ করছিল না।

রূপমায়া সিনেমার কাছে এসে অর্জুন দেখল নীল অ্যাম্বাসাডারটা দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছেন ইউ. এন. রায়। তাকে দেখতে পেয়ে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিতে সে দরজাটা খুলে দিল! টিপটিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল তখনও। কিন্তু ভেজা বর্ষাতি নিয়ে গাড়ির আসনে বসা যায় না। সেটাকে কোনও রকমে খুলে ভাঁজ করে পায়ের কাছে রেখে অর্জুন গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করল। ব্যাগটাকে রাখল তার আর ড্রাইভারের মাঝখানের আসনে। সে ঠিক হয়ে বসামাত্র গাড়ি চলতে শুরু করল। ইউ. এন. রায় তার সঙ্গে একটা কথাও বলেননি। অর্জুন সামনের কাচে দেখতে পেল ইউ. এন. রায় চিন্তিত মুখে জানলা দিয়ে কিছু দেখছেন অথবা কিছুই দেখছেন না। অর্জুনের মনে হল, তার ভদ্রতা করে কথা বলা উচিত। কী কথা বলবে ঠাওর না করতে পেরে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন?’

শব্দটাই কানে গিয়েছিল, বাক্যটা নয়। কারণ কিছুটা বিস্মিত হয়ে মুখ ফেরালেন রায়সাহেব। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল, ‘কিসের অপেক্ষা? ওহো, হ্যাঁ কিছুক্ষণ। তবে দুটো বাজেনি! আপনারা এর আগে মিস্ত্রী সলভ করেছেন?’

প্রশ্নটা খুবই আকস্মিক তবু চটপট ঘাড় নাড়ল অর্জুন, ‘হ্যাঁ। অমলদা খুব বিখ্যাত।’

‘উনি নিজে এলে ভাল করতেন।’ কথাটা বলে সিটে শরীরটাকে এলিয়ে দিলেন রায়সাহেব। তাঁর চোখ বন্ধ হল। কথাটা মোটেই ভাল লাগল না অর্জুনের। যেন সে একদম ফেকলু। তার যাওয়ার কোনও মানে হয় না। অমলদা বলেছেন বলে রায়সাহেব তাকে বাধ্য হয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তার দ্বারা কোনও কাজ হবে না। একটু উষ্ণ হয়ে অর্জুন বাইরে তাকাল। ডান দিকে মাসকলাই বাড়ির শ্মশানটা পেরিয়ে গেল সাঁ করে। তারপরেই সে মনে মনে হেসে ফেলল। কথাটা একদম অসত্য নয়। রায়সাহেব স্বচ্ছন্দে এ রকম ভাবতে পারেন। সে নিজেও জানে না ওঁর কতখানি উপকার করতে পারবে। সামান্য পেন্সিল কাটার ছুরি পর্যন্ত তার কাছে নেই। অমলদা না বললে তাকে উনি নিয়ে যাবেনই বা কেন? কিন্তু অর্জুন ঠিক করল, যেমন করে হোক রায়সাহেবকে দেখাতে হবে সে কতটা কাজ করতে পারে। সে যে ফেকলু নয় এটা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব মাথায় না আসায় সে ব্যাগে হাত দিল। জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ির রাস্তাটা বারংবার দেখার কোনও আকর্ষণ নেই। তার চেয়ে অমলদার বইটা পড়া যাক।

রঙিন প্লাস্টিকের কভার থাকায় কেউ বুঝতে পারবে না ওটা কী বই। প্ৰথম পাতা উল্টে অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল একবার প্রচ্ছদের ছবিটা দেখতে। কিন্তু নিজেকে সংযত করল সে। প্রথম প্রথম সামান্য অস্বস্তি হলেও শেষ পর্যন্ত বইটার মধ্যে ডুবে গেল সে। পাঙ্ক সম্প্রদায় সম্পর্কে নানান তথ্য অনেকটা গল্পের ভঙ্গিতে লেখা। কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের মানে বুঝতে না পারলেও তার তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না। হিপিদের পরে এখন আমেরিকার নব্যসমাজে পাঙ্ক হবার তীব্র প্রবণতা দেখা দিয়েছে। পাঙ্কদের প্রথম বক্তব্য হচ্ছে পুরনো সংস্কার বা রীতিনীতি ওরা মানে না। চিরকাল মানুষকে একই নিয়মের মধ্যে বাস করতে হবে কেন? এই সব ভাবনা যাদের মাথায় তারা দলে দলে বেরিয়ে আসে গৃহ ছেড়ে। সাধারণত নিউইয়র্ক, সানফ্র্যানসিস্কো প্রভৃতি ঘনবসতি অঞ্চলে এদের প্রচুর পরিমাণে দেখা যাচ্ছে। হিপিদের থেকে এদের পার্থক্য হল এরা ভবঘুরে টাইপের নয়। সাধারণত যে এলাকা এরা দখল নেয় সেই এলাকাটায় ওদের কথাই চূড়ান্ত। এদের দলে আঠারো থেকে পঁচিশের মধ্যে ছেলেমেয়ে আছে। এরা খুবই নির্দয় এবং পাষণ্ড টাইপের। প্রয়োজনে এবং সুবিধে পেলে পথচারীর জিনিসপত্র ছিনতাই করতে দ্বিধা করে না। সব সময়ে মানুষকে ব্যঙ্গ করে কথা বলে। ছেলে মেয়ে উভয়েই কানের দুই ইঞ্চির ওপর পর্যন্ত মসৃণভাবে কামিয়ে ফেলে। মাথার মাঝখানের চুল ছেঁটে তাতে নানান রকমের উজ্জ্বল রঙ মাখিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরা চামড়ার জ্যাকেট পরতে খুব ভালবাসে। প্রয়োজনে ভিক্ষে করতেও দ্বিধা করে না। এই দলে যেসব পরিবারের ছেলেমেয়ে যোগ দিয়েছে তাদের অনেকেই বেশ বড়লোক। কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে এরা অনিশ্চিত জীবনে পা বাড়িয়েছে স্বেচ্ছায়। অনেকেই মুখে নানান রঙ মাখে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চায়। সবরকম শুকনো মাদক এরা নেশা হিসেবে ব্যবহার করে। পাঙ্করা ইচ্ছে করেই ভাল কথা বলে না এবং ভাল ব্যবহার করে না। কারণ তাতে পুরনো সংস্কারকে মর্যাদা দেওয়া হয়।

একটার পর একটা কেস-হিস্ট্রি পড়তে পড়তে অর্জুন তন্ময় হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ গাড়ির হর্ন, মানুষের গলা পেয়ে চোখ তুলে দেখল শিলিগুড়ি শহরে ঢুকে পড়েছে তাদের গাড়ি। সামনের কাচে রায়সাহেবের মুদিত চোখ দেখা যাচ্ছে। সে ড্রাইভারের দিকে তাকাল। নেপালি ছেলেটা রোবটের মতো স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে। অর্জুন বইটাকে ব্যাগে পুরে রাখল।

মেঘলা দিন। যদিও এখন বৃষ্টি ঝরছে না তবু আকাশ মুখ হাঁড়ি করে থাকায় দিনের আলো মরে গেছে। বেশ ছায়া ছায়া চারধার। শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে আসার পর আর বই মুখে নিয়ে বসে থাকার মানে হয় না। পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দৃশ্যগুলো এখন পর পর সাজানো। ডান দিকে সেবক রেলওয়ে ব্রিজের কাছে আসতেই গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। লেবেল ক্রসিং। বোধহয় এক্ষুনি কোনও ট্রেন যাবে তাই রাস্তায় বন্ধনী নেমে আসছে। ড্রাইভার গাড়ির হৃদপিণ্ড থামিয়ে দিলেই অর্জুনের মনে হল একটু নেমে দাঁড়ানো যাক। সে দেখল রায়সাহেব একটুও নড়ছেন না। সন্তর্পণে দরজা খুলে পিচের রাস্তায় নামতেই এক ঝলক টাটকা ঠাণ্ডা হাওয়া শরীরে লাগল। অর্জুন খুব জোর নিঃশ্বাস নিল। আঃ, ফুল অফ অক্সিজেন। সে দু’-এক পা এগিয়ে পিছনে তাকাতেই মনে হল কেউ একজন থতমত খেয়ে একটা গাড়ির আড়ালে চলে গেল। লোকটার ভঙ্গি এত অস্বাভাবিক যে অর্জুন বেশ অবাক হয়ে গেল। তাদের গাড়ির পিছনে ইতিমধ্যে গোটা সাতেক গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। তার একটিতে লোকটি আড়াল নিল। অর্জুন নিঃসন্দেহ হল, যে লুকিয়েছে সে তার মুখোমুখি হতে চায়নি। যে এক ঝলক চেহারাটা নজরে এসেছিল তাতেই বোঝা যায় লোকটা বেশ শক্তিশালী, মাথার চুল সম্পূর্ণ কামানো এবং গায়ের রং ধবধবে ফর্সা। পরনে চৌকো ছাপমারা জামা আছে। অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল পিছিয়ে গিয়ে লোকটাকে ভালভাবে দেখতে। এই ফাঁকা জায়গায় গাড়িগুলোর আড়াল ছেড়ে নিশ্চয়ই কোথাও যেতে পারবে না। কিন্তু তারপরেই অমল সোমের কথা মনে হল। তাকে একজন মফস্বলের ছেলের মতো বোকা বোকা হয়ে থাকতে হবে। সে যে লোকটাকে দেখে সন্দেহ করছে এটা ওকে বুঝতে না দেওয়ারই ভাব। যদি কোনও কারণে লোকটা রায়সাহেবের পিছু নিয়ে থাকে তবে এখন অন্তত ও এই ভেবে নিশ্চিত থাকুক, তাকে কেউ লক্ষ করেনি।

একটা কয়লার ইঞ্জিন মালগাড়িগুলোকে টেনে নিয়ে যাওয়ার পর লেবেল ক্রসিংয়ের বাঁধন খুললো। নিজের আসনে বসেও অর্জুনের অস্বস্তি যাচ্ছিল না। অত ফর্সা রং কোনও ভারতীয়ের হওয়া সম্ভব নয়। সিকিমিজ বা নেপালি হতে পারে। তবে ওদের রঙে একটা হলদে ভাব মিশে থাকে। যদিও দূর থেকে দেখা কিন্তু অর্জুনের মনে হচ্ছিল লোকটা এদেশি নয়। সে সামনের কাচে দেখলো রায়সাহেব তেমনি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছেন।

আর একটু বাদেই অর্জুনের মনটা ভাল হয়ে গেল। ডান দিকে অনেক নীচে তিস্তা আর তার ওপরে সেই বিখ্যাত করোনেশন সেবক ব্রিজ। নিস্তব্ধ এই পরিবেশে ব্রিজটাকে চমৎকার দেখাল। দুটো পাহাড়কে অর্ধবৃত্তের আকারে ব্রিজটা বেঁধে রেখেছে। ওর একদিকে দুটো পাথরের সিংহ, অন্য দিকে দুটো বাঘ থাবা মেলে বসে আছে। ব্রিজটাকে ডান দিকে রেখে ওদের গাড়ি পাহাড়ি পথে এঁকে বেঁকে উঠতে লাগল। ঘড়িতে এখন মাত্র সাড়ে তিনটে কিন্তু দিনের আলো খুব দ্রুত কমে যাচ্ছিল। অর্জুন বাইরে ঝুঁকে দেখল পিছনে গাড়ির সংখ্যা আরও বেড়েছে। তবে বাঁক থাকায় তাদের সম্পর্কে ধারণা করা যাচ্ছে না। হঠাৎ গর্জন কানে এল একটা এবং তারপরেই চোখে পড়ল বাঁ দিকের পাহাড় থেকে বিশাল জলরাশি আছড়ে পড়ছে রাস্তায়, সাদা ফেনা তুলে ছিটকে যাচ্ছে নীচের খাদে যেখানে তিস্তা বয়ে যাচ্ছে। স্রোত এত প্রবল যে সামনের গাড়িগুলো খুব দ্রুত জায়গাটা পেরিয়ে যাচ্ছিল।

শব্দ শুনে উঠে বসেছিলেন রায়সাহেব। সামনের দৃশ্য না দেখে বললেন, ‘বিউটিফুল! কাল যাওয়ার সময় তো এটাকে দেখিনি।’

নেপালি ড্রাইভার এই প্রথম কথা বলল। ‘পাহাড়ে বৃষ্টি হলে পাগলাঝোরা এইরকমই খেপে ওঠে।’

পাগলাঝোরা পেরিয়ে আসার পর অর্জুন কথা বলল, ‘রায়সাহেব, আপনি কি জানেন কোনও বিদেশি আপনাকে অনুসরণ করছে কিনা।’

‘বিদেশি? হোয়াট ডু ইউ মিন?’

‘আমি আপনার কেসটা অমল সোমের কাছ থেকে শোনার সময় পাইনি। কিছু না জেনেই জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি কোনও বিদেশির কাছ থেকে বিপদ আশঙ্কা করছেন?’

‘প্রায় তাই। বাট হাউ ডু ইউ নো?’

‘আমার বিশ্বাস কেউ এই গাড়িকে ফলো করছে। লেবেল ক্রসিং-এ যখন আমরা দাঁড়িয়েছিলাম তখন একটি বিদেশি চেহারার ন্যাড়া মাথার মানুষকে দেখলাম আমাদের গাড়ির দিকে আসতে আসতে চট করে লুকিয়ে পড়ল।’

‘তুমি ঠিক দেখেছ?’ এইবার স্পষ্ট তুমি বললেন রায়সাহেব।

‘হ্যাঁ।’

‘কী রকম দেখতে লোকটাকে?”

‘লম্বা, স্বাস্থ্য ভাল, মাথা কামানো আর চৌকো ছাপমারা জামা পরনে।’

রায়সাহেবের মুখটাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। হঠাৎ অর্জুনের মাথায় একটা মতলব এসে গেল। সে বলল, ‘সামনেই কালিঝোরা নামে একটা ঝরনার পাশে ডাকবাংলো পড়বে। ওখানে গাড়ি পার্ক করার জায়গা আছে। আমরা ওখানে অপেক্ষা করে পিছনের গাড়িগুলোকে দেখতে পারি, যদি আপনার আপত্তি না থাকে।’

রায়সাহেব মাথা নাড়লেন, ‘না। তার দরকার নেই। আমি তাড়াতাড়ি কালিম্পং-এ ফিরে যেতে চাই। আই ওয়ান্ট টু সি মাই ডটার ফার্স্ট, ও অনেকক্ষণ একা আছে।’

অর্জুনের আফশোষ হচ্ছিল। এইরকম একটা সুযোগ পাহাড়ি পথে বড় একটা পাওয়া যায় না। তার সন্দেহটা সঠিক কিনা যাচাই করা যেত। চোখের সামনে দিয়ে কালিঝোরা বাংলোটাকে বেরিয়ে যেতে দেখল সে। ছবির মতো বাংলো। গতবার যাওয়া-আসার পথে এটাকে দেখে খুব লোভ হয়েছিল একবার ভেতরে যাওয়ার। ফেরার সময়ে দেখা যাবে।

তিস্তাবাজার হয়ে কালিম্পং-এ পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধে হয়ে গেল। বৃষ্টির জন্যই বোধহয় গাড়ির কাচ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বেশ ঠাণ্ডা আসছিল। অর্জুন ব্যাগ খুলে একটা পুলওভার শরীরে চাপিয়ে নিল। বাজার এলাকা ছাড়িয়ে গাড়িটা হঠাৎ বাঁদিকে মোড় নিল। অর্জুনের ভাল লাগছিল। এই রাস্তাটা সে চেনে। এখান থেকে মাইল পাঁচেক দূরে সেই দূরবীন দাঁড়া যেখানে খুনখারাপির অমন কাণ্ডটা ঘটেছিল। মিনিট দশেক যাওয়ার পর বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকের একটা ছোট রাস্তায় ঢুকে পড়ল গাড়ি। তারপর একটা বিরাট গেটওয়ালা অন্ধকার বাড়ির সামনে গিয়ে দু’বার হর্ন বাজাতে কেউ গেট খুলে দিল। সামনে গাছপালা একটু বেশি মাত্রায় থাকায় আলো দেখা যাচ্ছিল না। বাগান ঘুরে গাড়িটা দোতলা প্রাসাদ টাইপের বাড়ির নীচে দাঁড়াতে অর্জুন বুঝলো রায়সাহেব প্রকৃতই বড়লোক। প্রচুর টাকা না থাকলে এমন বাড়ি চট করে কেনা যায় না। বিদেশ থেকে এসে এইরকম বাড়ির সন্ধান পাওয়াও কম কথা নয়।

গাড়িটা থামতেই একটা দারোয়ান টাইপের লোক ছুটে এসে দরজা খুলে দিতে রায়সাহেব মাটিতে পা দিলেন। অর্জুন গুনল, ড্রাইভারকে ধরলে এটি তিন নম্বর কর্মচারী। রায়সাহেব বললেন, ‘এসো। জিনিসগুলো ওরাই ঘরে পৌঁছে দেবে।’

বাইরে বেশ ঠাণ্ডা কিন্তু রায়সাহেব গরমজামা পরেননি। অর্জুন ওঁর পিছনে হেঁটে একটা চমৎকার ড্রইংরুমে চলে এল। সবুজ কার্পেটে ঢাকা ঘরটায় প্রচুর দামী আসবাবপত্র, দেওয়াল সাজাবার মধ্যে শৌখিনতা স্পষ্ট। রায়সাহেব বললেন, ‘বসো।’ তারপর চাপাগলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সব ঠিক আছে?’

প্রশ্নটা যার উদ্দেশে তাকে এতক্ষণ দেখতে পায়নি অর্জুন। একটি শীর্ণ বৃদ্ধা আড়াল ছেড়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। গায়ের রঙ আর মুখের গড়ন দেখে বোঝা যায় না মহিলা কোন দেশের মানুষ। স্মিত হেসে তিনি জানালেন, ‘এভরিথিং পারফেক্ত।’

উচ্চারণটা অদ্ভুত, ট-কে উনি ত বললেন।

‘ওয়েল।’ রায়সাহেবকে বেশ নিশ্চিন্ত দেখাল এতক্ষণে, ‘এর নাম হল উপল-নারায়ণ। আমার ভাইপো। খুব সিম্পল ছেলে। ও এখানে কিছুদিন থাকবে।’

রায়সাহেব মহিলাকে ইংরাজিতে কথাগুলি বলতেই তিনি হাসলেন অর্জুনের দিকে তাকিয়ে। তারপর ফিরে গেলেন পিছনের দরজায়। এবার সামনের সোফায় বসে রায়সাহেব নিচুগলায় বললেন, ‘শোন, তোমাকে দুটো কথা বলে দিচ্ছি। আমার মেয়ে খুব হিংস্র টাইপের। ওটা ও ইচ্ছে করেই করে। অতএব সব সময় চেষ্টা করবে ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে। আর তুমি কি সিগারেট খাও?’

দ্রুত মাথা নাড়ল অর্জুন। তার সিগারেটের নেশা নেই, মাঝে-মধ্যে খায় শখ হলে। ‘গুড। এই বাড়িতে আমরা কেউ কোনও নেশা করি না। এসো আমার সঙ্গে।’

রায়সাহেব ওকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নিয়ে এলেন। লম্বা করিডোরে আলো জ্বলছে। কোণের দিকে একটা ঘর দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘ওই ঘরটা তুমি ব্যবহার করবে। আর দিনের বেলায় যতটা পারো ঘর থেকে কম বেরিও।’

রায়সাহেব তাকে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে চলে যেতে অর্জুন পদাটা তুলল। ঘরে আলো জ্বলছে। তার ব্যাগটা টেবিলের ওপর। পায়ের তলায় কার্পেট, বাহারি পর্দার ওপাশে জানালা বন্ধ। চারজনের বসার মতো সোফা রয়েছে একপাশে। ডানদিকের দেওয়াল জুড়ে সমুদ্রতীরের বাঁধান ছবি। বিছানাটা ধবধবে। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতেই অর্জুন বুঝল এইরকম আরামদায়ক বিছানায় সে কখনও শোয়নি। শুধু বিছানায় কেন, এইরকম সাজানো ঘরে সে কোনওকালে বাস করেনি। রায়সাহেব যে প্রকৃতই অবস্থাপন্ন তাতে আর কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না।

ডানদিকের ছবির পাশে যে দেওয়াল আলমারি সেখানে ব্যাগটাকে ঢুকিয়ে রেখে বাথরুমে ঢুকল অর্জুন। জলপাইগুড়িতে কারও বাড়িতে এমন বাথরুম আছে কিনা সে জানে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। পুরো ঘরটাই সাদা পাথরে ঢাকা। একদিকের দেওয়াল জুড়ে আয়না, উল্টোদিকে ছোট আয়নার গায়ে কত রকমের শ্যাম্পু, তেল, পেস্ট ও নতুন ব্রাশ। ওপাশটা পর্দা দিয়ে ঢাকা। সেটা সরিয়ে একটা শাওয়ার সমেত বাথটব আর কমোড দেখতে পেল সে। দুটো নতুন তোয়ালে রাখা আছে র্যাকে।

পরিষ্কার হয়ে এসে জানালায় দাঁড়াল অর্জুন। খুব সাবধানে পাল্লাটা খুলে দিতে ঘরের আলো ঝাঁপিয়ে পড়ল বাইরের গাছের ডালপাতায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাগান ঢাকা। এই সময়ে কেউ যদি ওখানে যাওয়া-আসা করে তা হলে টের পাওয়া মুশকিল।

দরজায় মৃদু শব্দ হতে অর্জুন পিছনে ফিরে দেখল একটি লোক, বয়স্ক, একটা ট্রে হাতে নিচু মাথায় ঘরে ঢুকে টেবিলে রেখে চুপচাপ বেরিয়ে গেল। ট্রের ওপর কাজ-করা ঢাকনা। তাতে সুন্দর টি-পট, কাপডিশ, চিনি, দুধ আর একটা প্লেটে বড় কেক রয়েছে। এসব দেখেই খিদে পেয়ে গেল অর্জুনের। তাড়াহুড়োয় দুপুরের খাবার ভাল করে খাওয়া হয়নি। এই প্রথম সে নিজে চা বানিয়ে খেল।

চা খাওয়া শেষ হতে অর্জুন সোফায় গিয়ে বসল। জানলা দিয়ে হিম ঢুকল খুব। কিন্তু সোয়েটার থাকায় বেশ ভালই লাগছে। ঠিক সেই সময় একটা মেয়েলি চিৎকার কানে বাজতেই অর্জুন প্রায় লাফিয়ে উঠল। এরকম ধারালো চিৎকার সে কোনও কালে শোনেনি। চিৎকারটা একবার হয়েই আবার সব চুপচাপ। শব্দটা এমন আকস্মিক ছিল যে অর্জুনের বুকের ভেতরটা তখনও কাঁপছিল। সে উঠে জানলা বন্ধ করল। তারপর ধীরে ধীরে দরজায় এসে দাঁড়াল। লম্বা করিডোরে আলো জ্বলছে। একটি লোক সিঁড়ির মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে ভাবলেশবিহীন মুখে মাথা নোয়ালো। লোকটা কি পাহারাদার? সে ওর সামনে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিসের চিৎকার?’

লোকটা একবার বোবাচোখে ওর দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। অর্জুন বুঝল ও কথা বলতে চাইছে না, হয়তো সেইরকম নির্দেশ আছে ওর ওপর।

কিছুটা কৌতূহলী হয়ে অর্জুন নীচে নেমে এল। সে লক্ষ করল, প্রত্যেক বাঁকে আলোর ব্যবস্থা আছে। এই বাড়ির কোথাও অন্ধকার নেই অথচ বাইরে থেকে গাছপালার আড়াল থাকায় সেটা একটুও টের পাওয়া যায় না।

নীচের ঘরে এসে অর্জুনের বিষ্টুসাহেবের কথা মনে পড়ল। বিষ্টুসাহেব এর পাশেই থাকেন। আগের বার সময় না থাকায় বিষ্টুসাহেবের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। এই যোগাযোগটা উনিই যখন করিয়ে দিয়েছেন তখন একবার দেখা করাটা ভদ্রতা। যদিও এখন সামান্য রাত হয়েছে তবুও—। অর্জুনের মনে পড়ল অমল সোমের নিষেধাজ্ঞার কথা। কিন্তু সেটা তো শুধু ওঁর বাড়িতে যেন সে রাত্রে না থাকে এই পর্যন্তই। একবার দেখা করলে ক্ষতি কী! তার মনে হচ্ছিল বিষ্টুসাহেবের কাছ থেকে কিছু নতুন খবর পাওয়া যাবে। ওইরকম হঠাৎ-চিৎকারের রহস্যটা জানতে খুব ইচ্ছে করছিল।

ঠিক এইসময় রায়সাহেব নেমে এলেন। এখন ওর অঙ্গে হাল্কা পোশাক। একটু গম্ভীর মুখ। অর্জুনকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এনি প্রবলেম?’

‘তেমন কিছু নয়। ভাবছিলাম একবার বিষ্টুসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাব কিনা!’ অর্জুন বিনীত গলায় বলল। সঙ্গে সঙ্গে রায়সাহেব ঠোঁট কামড়ালেন। তারপর নিচুগলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বিষ্টুসাহেব মানে বিষ্ণুচরণ পত্রনবীশ?’

‘হ্যাঁ। ওঁকে আমরা ওই নামেই ডাকি।’

‘কিন্তু তুমি ওকে চিনলে কী করে?’

‘চিনব না মানে? উনি তো—।’ অর্জুনকে ইশারায় থামিয়ে দিলেন রায়সাহেব। তারপর আরও নিচু গলায় বললেন, ‘উপল, তুমি জলপাইগুড়ির কলেজে পড়~~তাই না? বিষ্ণুবাবু কালিম্পং-এ থাকেন। তাই তো?’

এবার ইঙ্গিতটা ধরতে পারল অর্জুন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের বোকামির জন্য লজ্জা পেল ও। বিষ্টুসাহেব তার পরিচিত কিন্তু উপলনারায়ণের নয়। এখন যদি সে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যায় তাহলে সবাই সন্দেহের চোখে দেখবে। সে নীরবে মাথা নাড়তেই রায়সাহেব বললেন, ‘একটু আগে আমি বিষ্ণুবাবুকে কল করেছিলাম। ওঁকে বলেছি জলপাইগুড়ি থেকে আমার ভাইপো এসেছে, ক’দিন থাকবে। তো উনি বলেছেন কাল সকালে একবার এখানে বেড়াতে আসবেন। আর হ্যাঁ, তোমাকে একটা কথা বলতে একদম ভুলে গিয়েছিলাম। রাত্রে আমাকে না বলে কখনওই বাড়ির বাইরে বাগানে পা দেবে না। আমার চারটে পোষা হাউন্ড আছে। সাতটার পর ওদের ছেড়ে দেওয়া হয়। খুব হিংস্র।’

‘হাউন্ড?’

‘খুব হিংস্র প্রাণী। আমাদের নিরাপত্তার জন্য এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ওরা ছাড়া এই বাড়িতে আরও পাঁচজন গার্ড আছে। খুব রিলায়েল। তবু আমি অস্বস্তি বোধ করছি।’ রায়সাহেব অন্যমনস্কভাবে তাঁর চুলে হাত বোলালেন।

অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল রহস্যটা কী তা জানতে। রায়সাহেবের অস্বস্তির কারণ কী? কাকে ভয় করছেন তিনি? কিন্তু এত বয়স্ক একটা মানুষকে সরাসরি প্রশ্ন করার যোগ্যতা তো তার নেই। সে শুধু বলল, ‘অমলদা এলে নিশ্চয়ই উপকার হবে।’

‘তাই তো মনে হয়েছে। কিন্তু উনি আসতেই চাইলেন না। যা হোক, আজ রাত্রে তুমি একা খেয়ো। আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব। তোমার যদি বইপত্র দরকার হয় তা হলে দোতলার সিঁড়ির ডানদিকের ঘরে যেয়ো। সেখানে কিছু বই আছে। গুড নাইট।’

রায়সাহেব আবার দোতলায় উঠে গেলেন।

অর্জুন দরজার দিকে তাকাল। সেটা ভেতর থেকে তালা বন্ধ। একটি মানুষ তার সামনে টুলে বসে। যে পাঁচজন গার্ড আছে এ তার একজন। স্বাস্থ্যবান নেপালি। কিছুক্ষণ বসে থেকে অর্জুন ওপরে উঠে এল। সেই পাহারাদারটি ওখানে ঠিক একই ভঙ্গিতে রয়েছে। অর্জুনকে ভ্রূক্ষেপ করছে না সে। রায়সাহেবের নির্দেশমতো ঘরটায় ঢুকে বেশ ভাল লাগল। প্রচুর বই আলমারিগুলোয়। তন্ময় হয়ে বইগুলো দেখছিল অর্জুন। সবই ইংরেজিতে লেখা। একটা আলমারিতে ভারি ভারি প্রবন্ধের বই। আর একটায় বিখ্যাত সব ক্লাসিক। চার নম্বর আলমারিতে ক্রাইমের ওপর লেখা বই দেখতে পেয়ে সে দাঁড়াল। সেই সময় পিছন থেকে কেউ শিষ দিয়ে উঠল মৃদুস্বরে। ঠিক সাপের শিষের মতন।

চমকে উঠে মুখ ফেরাতে অর্জুন অবাক হয়ে গেল। অপূর্বসুন্দরী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। তার পরনে পা ঢাকা ম্যাক্সি, ঘন কালো চুল কাঁধ অবধি, নাক ঠোঁট এবং চিবুকে চমৎকার সৌন্দর্য কিন্তু চোখ দুটো ধকধক করে জ্বলছে। হিংস্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে সে অর্জুনের দিকে—সে চাহনির সামনে দাঁড়িয়ে কেঁপে উঠল অর্জুন। তারপর যেন নিজেকে ধাতস্থ করতেই বোকার মতো হাসল।

‘হু দ্য হেল য়ু আর?’

মেয়েটির ঠোঁট থেকে এই বাক্যটি বেরিয়ে এলেও অর্জুনের মনে হল এমন উচ্চারণ সে জীবনে শোনেনি। কেমন যেন জড়ানো জড়ানো। মাঝের দু-একটা শব্দ অনুমান করে নিতে হয়। কিন্তু বলার ভঙ্গিতে যে আদেশ আছে তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। মেয়েটি ততক্ষণে আরও খানিকটা এগিয়ে এসেছে। তার মুখে এখন কয়েকটি কঠিন রেখা ফুটে উঠল, ‘কে তুমি বল, নইলে আমি চেঁচাবো!’ কথাগুলো স্বচ্ছন্দ নয়, উচ্চারণে পরিষ্কার বিদেশি টান আছে।

এবার অর্জুন সোজা হল, এবং তার মনে পড়ল কী পরিচয় দিতে হবে, ‘আমার নাম উপলনারায়ণ রায়। আমি আপনার কাকার ছেলে। খুড়তুতো ভাই।’

‘ভাই?’ মুখ বিকৃত করল মেয়েটি, ‘তুমি আবার কোত্থেকে জুটলে?’

‘আপনার বাবা আমাকে নিয়ে এসেছেন এখানে।’

‘আমার বাবা?’ খিল খিল করে হেসে উঠল মেয়েটি, ‘হাউ ডু য়ু নো হি ইজ মাই ফাদার? তুমি জানো আমি কে?’

এবার চমকে উঠল অর্জুন। সত্যিই তো সে জানে না এই মেয়েটি রায়সাহেবের মেয়ে কিনা? এই বাড়িতে রায়সাহেবের মেয়ে আছে জেনেই সে অনুমানে ওকে ওই পরিচয়ে ভেবেছে। কয়েক মুহূর্ত দেরি হয়েছে, এর মধ্যেই মেয়েটি চিৎকার করে উঠল, ‘ভূতের মতো বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না, টেল মি।’

এই সময় সেই শীর্ণ মহিলা দরজায় দেখা দিলেন, ‘ওঃ, সীতা, প্লিজ শান্ত হও।’

ইংরেজিতে অনুরোধ করলেন তিনি।

‘নো। কী ভেবেছ তোমরা? যাকে তাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবে? এই লোকটা কে আমি জানতে চাই।’ আঙুল তুলল সীতা।

‘ওয়েল, হি ইজ ইওর ব্রাদার। তোমার বাবার ভাই-এর ছেলে। মফস্বলে থাকেন।’

‘আই সি। ওকে একটা ভূতের মতন দেখতে। ডাল্।’

‘ঠিক আছে, তুমি এখন ঘরে চল। এত এক্সাইটমেন্ট ভাল নয়।’

‘দ্যাটস নট ইওর বিজনেস।’ বলেই সে অর্জুনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, ‘ভূত ইউ আর মাই ব্রাদার?’

অর্জুন নীরবে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। মেয়েটির ভাব-ভঙ্গিতে সে অবাক হয়ে যাচ্ছিল। কোনও স্বাভাবিক প্রকৃতির মেয়ে এই রকম আচরণ করে না।

মেয়েটি বলল, ‘দেন ইউ শ্যড নো। এরা আমাকে বন্দী করে রেখেছে। কিন্তু আমি এখানে থাকব না। ওরা আমাকে উদ্ধার করবেই। আই মাস্ট গো ব্যাক টু সানফ্র্যানসিসকো। এ সব তোমাকে কী বলছি, তুমি তো গ্রামের ভূত, তুমি এর কী বুঝবে!’

বিকারগ্রস্ত গলায় মেয়েটি কথা বলছিল। ওর সমস্ত শরীর কাঁপছিল। অর্জুন লক্ষ করল ওর ঠোঁট থরথর করে নড়ছে, নাকে এই ঠাণ্ডাতেও ঘাম জমেছে। এবার ওই বৃদ্ধা এগিয়ে এসে মেয়েটির দুটো কাঁধ ধরলেন, ‘সীতা, শান্ত হও, ও তোমার ভাই। ওর সঙ্গে ওই ভাবে কথা বলা উচিত নয়।’

‘আই ডোন্ট কেয়ার। এতদিন আমি একা ছিলাম, কোত্থেকে এই ভাই এসে জুটলো! আর এত কথার দরকার কী? আমি দেশে ফিরে যেতে চাই।’ এক ঝটকায় বৃদ্ধার হাত সরিয়ে দিতে চাইল সীতা কিন্তু সক্ষম হল না। কিন্তু অর্জুন লক্ষ করছিল এতটা উত্তেজিত হওয়ার ফলেই বোধহয় সীতা আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ছে। সে ধীর গলায় বলল, ‘আপনি মিছামিছি রাগ করছেন।’

মেয়েটি কিছু কড়া কথা বলতে গিয়ে যেন পারল না। ওর চোখের পাতা একবার খুলেই বন্ধ হয়ে এল।

বৃদ্ধা দু’হাতে ওকে জড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওরা চলে যাওয়ার পর অর্জুনের ধাতস্থ হতে বেশ সময় লাগল। সে আর আলমারিতে হাত দিল না।

নিজের ঘরে এসে সোফায় শরীর এলিয়ে বসে পড়ল অর্জুন। সমস্ত ঘটনাগুলো সে এবার মনে মনে সাজাতে লাগল। অমলদা বলেছেন ভাল সত্যসন্ধানী বারংবার ঘটনাগুলোকে নানান দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ করে থাকেন। কখনওই একটা অর্থের ভার পিঠে টেনে নেন না। তাঁকে রাখতে হবে চোখ খোলা এবং মন পরিষ্কার। কিন্তু এসব করেও সে নিজে মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারল না। অমলদা বলেছিলেন রায়সাহেবের মেয়ে পা হয়ে যাওয়ায় তিনি ওকে জোর করে এদেশে নিয়ে এসেছেন। পাঙ্ক-এর যে ছবি সে বই-এর প্রচ্ছদে দেখেছে তার সঙ্গে বিন্দুমাত্র মিল নেই মেয়েটির। ওকে তো বেশ সভ্যভব্য মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। শুধু সানফ্র্যানসিসকো শহরে ফিরে যাওয়ার দাবি ছাড়া অন্য কোনও ইচ্ছাও ব্যক্ত করেনি মেয়েটি। দ্বিতীয়ত, ওকে একটুও সুস্থ বলে মনে হয়নি অর্জুনের। এ রকম অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে রায়সাহেবের অন্য আশঙ্কা হবেই বা কেমন করে!

অর্জুন আরও বিশদভাবে ঘটনাগুলো চিন্তা করছিল। রায়সাহেব কালিম্পং শহরে প্রাসাদের মতো একটি বাড়ি কিনেছেন। আমেরিকান টাকায় সেটা তিনি কিনতেই পারেন। সরকার যদি আপত্তিকর কিছু না পায় তা হলে কেনাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই বাড়িটাকে পাহারা দিতে পাঁচজন গার্ড রাখতে হয়েছে ওঁকে। কেন? প্রত্যেকটা ঘরের আসবাব ওঁর সম্পদের পরিমাণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু নেহাৎ চোর-ডাকাতের ভয়ে এই রকম কড়া পাহারার ব্যবস্থা হতে পারে না। হাউন্ডদের ছেড়ে দেন বাগানে। হাউন্ডরা খুব হিংস্র হয়। কোনও ভাবেই তাদের প্রলুব্ধ করা যায় না। ওদের এড়িয়ে এই বাড়িতে কোনও মানুষের পক্ষে ঢোকা অসম্ভব। হাউন্ডদের রাখা হল কেন? তা ছাড়া ওই বৃদ্ধাটিকে রায়সাহেব নিশ্চিত বিদেশ থেকে এনেছেন। প্রথমে যতটা বৃদ্ধা মনে হয়েছিল একটু আগে ততটা মনে হয়নি। মহিলার শরীরে বেশ শক্তি আছে। ওঁকে কেন নিয়ে এলেন রায়সাহেব? শুধু মেয়েকে একজন নার্সের কাছে রাখতে হবে এই যুক্তিতে বিদেশ থেকে কাউকে আনা হাস্যকর। কিন্তু মহিলা বেশ ভদ্র এটুকু বোঝা যাচ্ছে।

অর্জুন বুঝতে পারছিল এই বাড়িতে সন্দেহজনক অনেক কিছু রয়েছে কিন্তু সে তার কোনও সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না। অমল সোমের সহকারী হিসেবে সে যদি সত্য সন্ধানের কাজে নামে তা হলে এই না বুঝতে পারাটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। তাকে যেমন করেই হোক এই পাঁচদিনে এই সবের উপযুক্ত ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু সেই সঙ্গে আর একটা সমস্যার কথা তার মনে উদয় হল। অমল সোম তাকে বলেছেন দিনের বেলায় ঘুমোতে আর রাত্রে জাগতে। রাত্রে এই বাড়িতে কেউ আসে কিনা, এলে তারা কে, সে বিষয়ে নজর রাখতে। কিন্তু যে বাড়ির বাগানে হাউন্ডরা ঘুরে বেড়ায় সেই বাড়িতে কেউ প্রাণ হাতে করে রাত্রে ঢুকবে না। তা হলে সে কার ওপর নজর রাখবে রাত জেগে।

তবু অর্জুন ঠিক করল অমল সোমের নির্দেশ প্রথমে রাত্রে মানতেই হবে। কেউ আসুক বা না আসুক তাকে লক্ষ রাখতে হবেই। আগামীকাল বিষ্টু সাহেব এলে এমন ব্যবস্থা করে নেবে যাতে অমলদাকে নিয়মিত খবর পাঠাতে পারা যায়। সে রাত জাগেনি এই খবরটা অমলদার নিশ্চয়ই পছন্দ হবে না। অমলদা একবার বলেছিলেন, মনে রেখ অর্জুন, বুনো হাতি বল আর চালাক বাঘই বল, এ সবের চেয়ে একটি ধূর্ত মানুষ অনেক বেশি শক্তিশালী। কারণ মানুষের মাথায় যে বুদ্ধি খেলে তার সঙ্গে পাল্লা দেবার সামর্থ্য ঈশ্বরেরও নেই!

পাজামা পাঞ্জাবি আর চাদর জড়িয়ে আবার সোফায় বসল সে। পাঞ্জাবিটা খদ্দরের। অমলদার দেওয়া। এই কাপড়ের একটা পাঞ্জাবি ওঁর আছে। অর্জুন আলমারি খুলে ব্যাগ থেকে বইটা বের করল। এখন তার আর ইংরেজির খটমটো শব্দগুলোয় অসুবিধে হচ্ছে না। শব্দের অর্থ না বুঝলেও পুরো বাক্যটা থেকে মোটামুটি একটা অর্থ অনুভব করা যাচ্ছে। তাতে বুঝতে পারছে বইটা খুব ইন্টারেস্টিং। অর্জুন ক্রমশ পাঙ্ক বই-এর পাতায় ডুবে গেল। পাঙ্করা খুব দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে। ওদের একটা সতর্ক চেষ্টা থাকে যাতে পুলিশের সঙ্গে কোনও সংঘর্ষ না হয়। প্রত্যেকটা পাক্ মাদকদ্রব্যের শিকার। তাদের মাদক-অভ্যাস এমন মারাত্মক যে কেউ কোনও অবস্থায় দল ছেড়ে যেতে সাহস করে না। কারণ দলের বাইরে গেলে ওই মাদক পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজনে সেই মাদক না পেলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই তারা যে করে হোক দলে ফিরে যেতে চায়।

এইখানে অর্জুন সোজা হয়ে বসল। সীতা যে অসুস্থ তা এখন স্পষ্ট। সে নিশ্চয়ই মাদকদ্রব্যের শিকার। ওর ওই সানফ্র্যানসিস্কো ফিরে যাওয়ার বাসনা শুধু দলের সঙ্গে মিলতে পারবে বলেই। একবার দলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেলে নিশ্চয়ই আর মাদকদ্রব্য পেতে কোনও অসুবিধে হবে না। সিদ্ধান্ত নিয়েই থমকে গেল অৰ্জুন।

না, তার ভাবনাটা একপেশে হয়ে যাচ্ছে। অমলদার নির্দেশমতো তাকে মন খুলে রাখতে হবে। সে আবার বই-এর পাতায় মন দিল। এর পরের পাতাগুলোয় পাঙ্কদের নানারকম অত্যাচারের বিবরণ। পাঙ্করা যে ভদ্রতার ধার ধারে না, কুকথা তাদের জিভে থুতুর মতো লেগে আছে এই সব বিবরণ। একজন সাংবাদিক একটি পা মেয়ের ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে কী রকম নাজেহাল হয়েছিলেন সেই ঘটনাটা পড়ল অর্জুন। সাংবাদিক পরে বলেছিলেন, একটি অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়ে যে অমন নোংরা কথা অকারণে বলতে পারে তা আমার ধারণায় ছিল না।

ঠিক এইসময় দরজায় শব্দ হতে অর্জুন চমকে বইটা আড়াল করার চেষ্টা করল। না, যে লোকটা চা দিয়ে গিয়েছিল তখন সেই ঢুকছে খাবারের ট্রে নিয়ে। চুপচাপ টেবিলে ওগুলোকে নামিয়ে যখন লোকটা ফিরে যাচ্ছে তখন অর্জুন ওকে ডাকল, ‘এই যে, শুনুন।’

ইচ্ছে করেই আপনি বলল অর্জুন। কারণ যে-কোনও বয়স্ক মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বললে তারা যে খুশি হয় এটা সে জেনেছে। লোকটি মুখ নিচু করে দাঁড়াল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘রায়সাহেবের খাওয়া হয়ে গিয়েছে?’ লোকটি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। ‘হ্যাঁ।’ এই লোকটি নেপালি কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে ও ভাল বাংলা বোঝে। উত্তর দেওয়া হলে লোকটি চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালে অর্জুন আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার নাম কী ভাই?’

এবার সরাসরি চোখ তুলে তাকাল লোকটি। তারপর কোনও কথা না বলে ঘর ছেড়ে চলে গেল দ্রুত পায়ে। অবাক হয়ে গেল অর্জুন। লোকটাকে দেখে বেশ সরল-স্বভাবের মনে হয়েছিল। এইরকম অভদ্রভাবে চলে যাওয়ার কোনও কারণ প্রথমে পেল না সে। তারপরেই মনে হল ওর ওপর কি নির্দেশ আছে কোনও প্রশ্নের উত্তর যেন না দেয়! রায়সাহেব কি তার কাছ থেকে এই বাড়ির রহস্য লুকিয়ে রাখতে চান? তাই যদি হয় তা হলে তিনি তাকে নিয়ে এলেন কেন এখানে? অর্জুনের খুব রাগ হচ্ছিল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল রায়সাহেব তাকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অমলদা এলে নিশ্চয়ই এরকম ব্যবহার করার সাহস করতেন না ভদ্রলোক। সে এই লোকটিকে কী আর এমন জিজ্ঞাসা করতে পারত। এখন যদিও অনুমান করতে পারছে তবু সঠিক হবার জন্যে জানতে চাইতো ওরা এই বাড়িতে আসার পর ওরকম তীক্ষ্ণগলায় কে চিৎকার করে উঠেছিল এবং কেন করেছিল? কোনও গোপনীয়তা না থাকলে উত্তরটা দিতে কী অসুবিধে হত লোকটার!

অর্জুন খাবারের টেবিলে উঠে এল। ভাত, তন্দুরি রুটি, মাংস আর দুধ, সামান্য জমানো। সম্পূর্ণ দিশি খাবার। রায়সাহেব কি সাহেবি খাবার খান না? স্বাদ বড় মনোরম, যে রান্না করে তার এলেম আছে। খিদেও পেয়েছিল বেশ। খুব দ্রুত খাওয়া শেষ হয়ে গেল অর্জুন বাথরুমে ঢুকল। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সে অবাক হল। টেবিলে কোনও এঁটো বাসন নেই। তার অনুপস্থিতিতেই ওগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। লোকটা বোধহয় তার মুখোমুখি হতে চায়নি।

ঘড়িতে এখন মাত্র সাড়ে ন’টা। কিন্তু এতদূর গাড়িতে আসার জন্যেই হোক কিংবা অনেকক্ষণ পরে পেটে ভাল খাবার পড়ার জন্যেই হোক, অর্জুনের শরীর আরাম চাইছিল। সাদা বিছানার দিকে তাকাল সে। একবার ওখানে শরীর এলিয়ে দিলে রাতটা চোখের নিমেষে শেষ হয়ে যাবে।

আলো নেভাবার আগে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে অবাক হল অর্জুন। কোনও ছিটকিনি বা খিল নেই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা যাবে না। ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু সে বুঝতে পারছিল না। শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করার কোনও ব্যবস্থা থাকবে না? সে ভাল করে লক্ষ করল। না, কখনও সে রকম কিছু ছিল বলে মনে হচ্ছে না। এই ঘরটা কি সব সময় এমনি খোলা থাকে? এই বাড়ির প্রতিটি ঘরেই কি এক ব্যবস্থা? অর্জুন হতাশ হল। তারপর ঘরের মাঝখান থেকে বড় টেবিলটাকে অনেক কষ্টে টেনেটুনে দরজার গায়ে আঁটকে দিল। এখন যদি কেউ এই ঘরে আসতে চায় তাকে ওই টেবিল গায়ের জোরে সরিয়ে ঢুকতে হবে। এবং তাতে টের পেয়ে যাবে সে।

আলো নিভিয়ে দিল অর্জুন। তারপর সন্তর্পণে জানলা খুলল। বাইরে শুধুই ঘন অন্ধকার। প্রথমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না সে পরে টের পেল একটা ঝাঁকড়া গাছ সামনে থাকায় দৃষ্টি আড়াল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ এখানে দাঁড়ালে কিছুই দেখতে পাবে না সে। পাশের জানলাটার অনেকখানি ওই গাছটা আড়াল করে রেখেছে। অতএব এই ঘর থেকে বাগানের কিছুই দেখা যাবে না। অর্জুন জানলা বন্ধ করে দিল। সামান্য সময় খোলা থাকায় ঘরে বেশ ঠাণ্ডা ঢুকেছে। অথচ ওরা যখন সন্ধ্যাবেলায় এখানে এসেছিল তখন এত ঠাণ্ডা ছিল না।

অর্জুনের খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। রায়সাহেব কি জেনে-শুনেই তাকে এই ঘরে থাকতে দিয়েছেন! উনি কি চান না অর্জুন কিছু জানতে পারুক? এতে ওঁর লাভ কী? উনি তো যেচে অমলদার কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন! হঠাৎ অর্জুনের মনে হল বাথরুমেও একটা জানলা দেখেছে। সে অন্ধকার হাতড়ে বাথরুমে চলে এল। তারপর সন্তর্পণে ছিটকিনি তুলতে চেষ্টা করল। সম্ভবত দীর্ঘকাল এই জানলা খোলা হয় না। প্রচণ্ড টাইট হয়ে আছে পাল্লাদুটো। বেশ কিছুক্ষণ চাপ দেওয়ার পর সামান্য শব্দ করে জানলাটা খুলল। শব্দটা এই রাত্রে বেশ কানে লাগতে অর্জুন স্থির হয়ে দাঁড়াল। মিনিট দুয়েক ধরে কোথাও কোনও প্রতিক্রিয়া না দেখতে পেয়ে সে নিশ্চিন্ত হল।

চাদরটায় অর্জুন মাথা ঢেকে নিল। ঠাণ্ডাটা বেশ কনকনে। সে টের পেল ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। এত পাতলা বৃষ্টি যে কোনও শব্দ হচ্ছে না। এই জানলার বাইরে কোনও আড়াল নেই। ঘন অন্ধকারে পরিষ্কার দেখতে না পেলেও বাগানটাকে আঁচ করতে পারল সে। সারাটা রাত তাকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ভেবে অর্জুনের অস্বস্তি হচ্ছিল। তার মনে পড়ল বাথটবের গায়ে একটা টুল দেখতে পেয়েছিল আগে। অন্ধকারে সেটাকে হাতড়ে খুঁজে পেল। টুলটাকে জানলার তলায় নিয়ে এসে বসতে বেশ আরাম লাগল। এখান থেকে মাথা বের করে সে সমস্ত বাগানটাকে দেখতে পাচ্ছে। ছায়া ছায়া একটু ঘোলাটে গাছপালা। অবশ্য সমস্ত বাগান বললে ভুল হবে—তিন ভাগের দু ভাগই তার নজরে আসছে। যেটা চোখের আড়ালে সেই দিকেই এই বাড়িতে ঢোকার সদর রাস্তা। হঠাৎ একটা খস খস শব্দ কানে আসতে অর্জুন সতর্ক হল। বাগানের ঘাসের ওপর এই বৃষ্টিতে একটা কালো ছায়া দৌড়ে গেল। অর্জুনের বুকের বাতাস এক লহমার জন্যে আটক ছিল। স্পষ্ট চেহারাটা না বুঝতে পারলেও ওটা যে সেই হাউন্ডগুলোর একটা তা টের পেয়ে নিঃশ্বাস ফেলল সে। তারপরেই আরও তিনটে ছায়া একই দিকে ছুটে চলে গেল, এই যাওয়ার ভঙ্গিতে বেশ ব্যস্ততা আছে। চারটে হাউন্ডই বিরাট বাগান থেকে চলে এল একই জায়গায়। কেন? হাউন্ডরা কি দলবদ্ধ হয়ে থাকতে ভালবাসে? এ বিষয়ে কিছুই জানে না অর্জুন। নিজের ওপর তার রাগ হচ্ছিল। ভাল সত্যসন্ধানী হতে গেলে সব বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। জ্ঞান না হলে দৃষ্টি পরিষ্কার হয় না। অমল সোম থাকলে এই মুহূর্তে কারণটা বলে দিতে পারতেন।

টিপ টিপ বৃষ্টিটা এবার সামান্য বাড়ল। চাদরের আড়ালে থেকেও তার শীত করছিল বেশ। সমস্ত বাড়িতে কোথাও সামান্য শব্দ নেই। এত রাত্রে কালিম্পং-এর মানুষ সাধারণত জেগে থাকবে না। রায়সাহেব তো সাততাড়াতাড়ি শুতে গিয়েছিলেন। হয়তো প্রহরীরা নিঃশব্দে জেগে আছে! যেমন সে এই জানলার পাশে বসে। অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল একটা সিগারেট খেতে।

সিগারেটে অর্জুনের নেশা নেই। গতবার পাশ করার পর বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দু-একবার টান দিয়েছিল মাত্র। কিন্তু সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে নিজেকে বেশ বড় বড় মনে হয়। সে কিছুদিন আগেও অ্যাথলেট ছিল, একশ, দুশো মিটার দৌড়াতো। সেই সুবাদে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের পক্ষে তার পড়াশুনা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দৌড় ছেড়ে দিয়ে চাকরি করে রাত্রের কলেজে পড়বে বলে ঠিক করেছিল অর্জুন। কিন্তু পরপর দুটো অভিযান তার মনে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে গোয়েন্দা হবার। যা হোক, একটা আঠারো বছরের ছেলে জলপাইগুড়ি শহরে লুকিয়েচুরিয়ে সিগারেট খেতে পারে। অর্জুনের বন্ধুরা যেমন খায়। কিন্তু তখন রায়সাহেবকে সে মিথ্যে কথা বলেছে বাধ্য হয়ে। একজন বয়স্ক গম্ভীর মানুষ যদি জিজ্ঞাসা করেন যে সিগারেট খায় কিনা তা হলে তাঁর মুখের ওপর হ্যাঁ বলা যায় না। অর্জুনের ব্যাগে একটা সিগারেটের প্যাকেট আছে। প্যাকেটটা তার কেনা নয়। অসীম চারটে সিগারেট কিনেছিল। ওর বাড়িতে প্যাকেট নিয়ে যাওয়া মুশকিল বলে অর্জুনকে রাখতে দিয়েছিল। সেই প্যাকেটে এখনও দুটো পড়ে আছে। দুটো সিগারেট আর একটা দেশলাই। আজ বেরোবার সময় ওগুলো বাড়িতে রেখে আসতে ভরসা পায়নি। মায়ের নজরে পড়ুক তা চায় না সে।

এখন একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে হল অর্জুনের। এই ঠাণ্ডায় সিগারেট খেলে নিশ্চয়ই আরাম হবে। তার মনে পড়ল রায়সাহেব বলেছেন এই বাড়িতে সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু এখন এই নির্জন রাত্রে বন্ধ ঘরে বসে সে যদি সিগারেট খায় তখন কারও পক্ষে টের পাওয়া সম্ভব নয়। অর্জুন টুল ছেড়ে ওঠার কথা ভাবতেই মনে হল বাগানের মধ্যে একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোটা জ্বলেই নিভল এবং সেই সঙ্গে বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে চাপা একটা শিষ মিশে গেল। মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেল অর্জুনের। এবার থেকে শিষটা পাঁচ সেকেন্ড অন্তর বাজছে। এবং প্রত্যেকটা শিষের মধ্যে একটা সুর লুকানো আছে বলে মনে হচ্ছে। অর্জুন দু’চোখ বড় করে জায়গাটা লক্ষ করার চেষ্টা করল। আলোটা যেখানে জ্বলেছিল, সেখানে ঝাউগাছের মতো কিছু গাছের ভিড়, ফলে অন্ধকারটা জমাট। হাউন্ডগুলোকে ওই দিকেই ছুটে যেতে দেখেছিল বলে মনে পড়ল। শিষটা ঠিক সময়ের ব্যবধানে বেজে যাচ্ছে। অর্জুন এসব ব্যাপারের মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছিল না। যে আলো জ্বালিয়েছে সে যদি এই বাড়ির লোক না হয় তা হলে তাকে তো এতক্ষণে হাউন্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে। এই বাড়ির কেউ হলে নিশ্চয়ই এমন বৃষ্টিতে বাগানের জঙ্গলে যাবে না। তা হলে শিষ দিচ্ছে কে?

এই সময় ঝাউগাছের সামনে একটি মূর্তির উদয় হল। ছায়া ছায়া যে আকৃতিটাকে অর্জুন দেখতে পেল সে বেশ লম্বা। পরনে শরীর ঢাকা বর্ষাতি। মাথা টুপির আড়ালে এবং চেহারার কোনও বৈশিষ্ট্যই এখান থেকে নজরে আসছে না। লোকটার দুটো হাতই পকেটে ঢোকানো। বোধহয় চারপাশ সতর্ক চোখে জরিপ করে লোকটা সামান্য নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। ক্রমশঃ অর্জুনের চোখের আড়ালে চলে গেল সে। আর তখনই অর্জুন হাউন্ডগুলিকে দেখতে পেল। ছাগলের পালের মতো লোকটার পিছন পিছন যাচ্ছে ওরা। শিষটা মিলিয়ে যেতে অর্জুন একবার ভাবল চিৎকার চেঁচামেচি করে সবাইকে সতর্ক করে দেয়। রায়সাহেবের ঘুম ভাঙিয়ে বলে, একটা লোক তাঁর পাহারাদার হাউন্ডদের বশ করে ওই বাগানে শিষ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তখনই অমল সোমের নির্দেশ মনে পড়ল। অমলদা তাকে রোজকার রিপোর্ট পাঠাতে বলেছেন। এখনই চেঁচামেচি করলে ওই লোকটাকে চিরকালের জন্যে সতর্ক করে দেওয়া হবে। ওকে ফিরতে হবে এই পথেই। ততক্ষণ অপেক্ষা করা ভাল। এর মধ্যে বৃষ্টির তেজ বেড়েছে আরও। অন্ধকার ঘোলাটে হয়ে গেছে জলের ধারায়। তারই মধ্যে খুব কান খাড়া করে শিষের শব্দ পেল অর্জুন। শিষটার ছন্দ আছে। সুরটাকে মনে মনে তুলে নিল সে। লোকটা যেই হোক না কেন, এই পাহাড়ি রাত্রের বৃষ্টিতে চারটে শিকারী হাউন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে যখন তখন নিশ্চয়ই প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী। ঠিক সেই সময় একটা তীব্র চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিল। ধারালো করাতের দাঁতের মতো ওই শব্দ বোধের ওপর আঘাত করে। অর্জুন চমকে উঠল। এবং তখনই ছুটন্ত মূর্তিটাকে দেখা গেল। দৌড়বার সময়েও লোকটা শিষ দিতে ভোলেনি। কুকুরগুলো অনুগত ভঙ্গিতে ওর পিছনে ঝাউগাছের আড়ালে মিলিয়ে যাওয়ামাত্র একটা ঝাপসা আলো জ্বলে উঠে নিভে গেল।

তীক্ষ্ণ চিৎকারটা শেষ হতেই সীতার বিকৃত কণ্ঠ শোনা গেল, ‘আই মাস্ট গো ব্যাক, আই মাস্ট। ইউ কান্ট স্টপ মি।’ তারপর একটা ইংরেজি শব্দ। অর্জুনের মনে পড়ল পাঙ্ক বই-এ একটা তালিকা দিয়েছেন লেখক। তাতে তিনি পাঙ্করা যে সমস্ত শব্দ গালাগাল হিসেবে ব্যবহার করে তার একটা বিবরণ আছে। এই শব্দটা সে ওখানে দেখতে পেয়েছিল। শব্দটার মানে সে জানে না কিন্তু ওটা যে গালাগালি, তাতে তার সন্দেহ নেই।

কিন্তু তারপরেই সব চুপচাপ। কান পাতলো অর্জুন। এই চিৎকারের পরও বাড়িতে কারও সাড়াশব্দ নেই। রায়সাহেবের অস্তিত্বই টের পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কোন ঘরে শোন কে জানে। অর্জুন ভাবল একবার বাইরে বেরিয়ে খোঁজ করে ব্যাপারটা কী হয়েছে। তারপরেই খেয়াল হল সে মফঃস্বলের কলেজে-পড়া বোকা টাইপের ছেলে। ওরকম ছেলের এত কৌতূহল দেখানো শোভন নয়। রায়সাহেব তার এমন একটা পরিচয় খসড়া করেছেন যে সবরকম গতিবিধি এখন নিয়ন্ত্রিত। অর্জুন চুপচাপ বসে রইল। বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে সমানে। বাগানে আর কারও পায়ের চিহ্ন পড়ছে না। শুধু কুকুরগুলো দুবার পাক খেয়ে গেছে এর মধ্যে। এই লোকটা যেই হোক না কেন, হাউন্ডরা তাকে ভালো করে জানে। না হলে ওদের সামনে দিয়ে বাগানে বেড়াবার সাহস হত না লোকটার। আগামীকাল বিষ্টুসাহেবের মাধ্যমে তাকে যে রিপোর্ট পাঠাতে হবে তার বড় অংশ দখল করবে এই ঘটনাটা। অমলদাকে বোঝানো যাবে যে সে সহকারী হিসেবে যথেষ্ট উপযুক্ত।

রাত আড়াইটে নাগাদ অর্জুনের খুব ঘুম এল। এইভাবে ঠায় বসে থাকতে সে আর পারছিল না। তবু মন বলছিল আজ রাতে আর কেউ আসবে না। কিন্তু এখন শুয়ে পড়লে অমলদার কাছে দেওয়া কথার খেলাপ হবে। অন্ধকার এখন চোখ-সওয়া হয়ে গিয়েছে। অর্জুন নিশ্চিন্তে পা ফেলে ঘরে এল। তারপর ব্যাগটা খুলে একদম তলা থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করল। সিগারেটটা খুব সন্তর্পণে জ্বালিয়ে সে আবার বাথরুমের জানলায় ফিরে এল। তিন-চারবার ধোঁওয়া ছাড়তেই মনে হল ঠাণ্ডা গালে নাকে বেশ স্বস্তি হচ্ছে কিন্তু তারপরেই ওর গলা খুশ খুশ করে উঠতে সে চেষ্টা করেও কাশি থামাতে পারল না।

নিজেকে খুব গালাগাল দিতে ইচ্ছে করছিল। এখনও সিগারেট খেলেই তার কাশি হয়। অথচ বন্ধুরা নির্বিকার হয়ে টেনে যায়। সে সিগারেটটা ভিজিয়ে কমোডে ফেলে দিল। অর্জুন বুঝতে পারছিল আজকের রাত্রে জেগে থাকার কোনও মানে নেই। সে জানলা বন্ধ করল। তারপর বাথরুমের আলো জ্বেলে কমোডের ফ্ল্যাশ টেনে দিয়ে শোওয়ার ঘরে ফিরে এল। যদি কেউ লক্ষ করে তা হলে সে ভাববে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়েছিল। সাদা নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অর্জুনের মনে হল পৃথিবীতে এর চাইতে আরামদায়ক আর কিছু নেই।

.

দরজায় শব্দ হতে অর্জুনের ঘুম ভাঙল। এবং কয়েক মুহূর্তে জড়তা কেটে গেলে সে তড়াক করে উঠে বসল। তারপর দৌড়ে টেবিলটাকে সরিয়ে আনল দরজা থেকে যথাস্থানে। বাইরে আলো ফুটেছে কি ফোটেনি বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ঘুমে চোখ টানছে তার। এখন কটা বাজে কে জানে। অর্জুন দরজা খুলে দেখল কেউ নেই। বারান্দায় ভোরের আলো পড়েছে। তা হলে দরজায় শব্দ করল কে? অর্জুন আবার বিছানায় ফিরে গেল। এবং কম্বলটা টেনে নিতেই ঘুমে তলিয়ে গেল।

সকাল দশটা নাগাদ ঘুম ভাঙতেই অর্জুন অবাক হল। তার মাথার পাশে একটা টুলের ওপর রাখা ট্রেতে টিকোজিতে ঢাকা চায়ের পট এবং একটা কাচের পাত্রে কিছু জেলি আর বিস্কুট। এগুলো কখন কে দিয়ে গেছে সে জানে না, দরজাটা ভেজানো।

চা ঠাণ্ডা হতে হতেও হয়নি। পরিষ্কার হয়ে তাই খেয়ে অর্জুন বাইরে বেরিয়ে আসতেই কালকের লোকটিকে দেখতে পেল। একবার মনে হল জিজ্ঞাসা করে, কেন গতকাল অমন অভদ্র ব্যবহার করল। কিন্তু তারপরেই মত পাল্টাল সে। বরং রায়সাহেবের কথা জিজ্ঞাসা করা যাক। আর তখনই তার খেয়াল হল তার মুখে রায়সাহেব শব্দটা বেমানান। ভাইপো কখনও কাকাকে রায়সাহেব বলে ডাকতে পারে না। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল লোকটা তাকে দাঁড়াতে দেখে সুরুৎ করে সামনে থেকে সরে গেল। নীচে নেমে এল অর্জুন। রায়সাহেবকে সে দেখতে পেল না। দরজায় গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা যেন তাকে দেখেও দেখছে না। তাকে ক্যাবলা হতে হবে, ক্যাবলারা কখনও প্রশ্ন করে না। কচি কলাপাতার মতো রোদ উঠেছে। ভিজে গাছপালায় সেই রোদ পড়ে চমৎকার দেখাচ্ছে এখন। অন্যমনস্ক ভান করে অর্জুন তার বাথরুমের নীচে চলে এল। এখান থেকে মাথা তুললে তার বাথরুমের জানালাটা দেখা যায়। সে এবার সামনের দিকে তাকাল। আলোটা কোথায় জ্বলেছিল, হাউন্ডগুলো কোথায় ছুটে গিয়েছিল, সেই জায়গাটা খোঁজার চেষ্টা করল মনে মনে। তারপর একটা লক্ষ্য ঠাওর করে সে এগিয়ে গেল। ঝাউগাছগুলোর ফাঁক দিয়ে মানুষ স্বচ্ছন্দে যেতে পারে। গাছের আড়ালে এসে পাঁচিলটাকে দেখতে পেল। পাহাড়ের গায়ে উঁচু পাঁচিল গাঁথা মুশকিল। মাটি থেকে হাত দুয়েক একটা গাঁথুনি বোধহয় অনেককাল আগে গাঁথা ছিল। তার ওপর দশ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে নতুন। খুব ধারালো কাঁটা। কিন্তু লোকটা এই দিক দিয়ে আবার ফিরে গেছে। অর্জুন চট করে খেয়াল করতে পারল না প্রস্থানের পথটা কোথায়? নিশ্চয়ই এই তার ডিঙিয়ে লোকটা ফেরেনি।

এভাবে আড়ালে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। অর্জুন ফেরার জন্যে পা বাড়াতেই জুতোর ছাপ দেখতে পেল। কাঁচা ভিজে মাটিতে ছাপটা স্পষ্ট হয়ে আছে। বাকিগুলো ঘাসের ওপর থাকায় ধরা যায়নি এতক্ষণ। অর্জুন বুঝতে পারল লোকটার পায়ে চামড়ার জুতো ছিল না। ঘন খাঁজওয়ালা কেড্স পড়ে এসেছিল ও। আর তার বাঁ দিকটা একটু ক্ষয়ে এসেছে। এই ছাপটাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। অর্জুন মাটিতে পড়ে থাকা একটা বড় পাতা তুলে ওটাকে চাপা দিয়ে তার ওপর ইঁটের টুকরো বসিয়ে দিল। জুতোটার ছাপ বাঁ পায়ের।

বাকি বাগানটা খামোকাই হেঁটে অর্জুন গেটের দিকে আসতে বিষ্টুসাহেবকে দেখতে পেল। রোগা বেঁটে বিষ্টুসাহেব এই সাতসকালে কমপ্লিট স্যুট গায়ে ছড়ি হাতে পাহাড় বেয়ে আসছেন। বয়সে অমলদার চেয়ে অনেক বড় কিন্তু নিজেদের বন্ধু বলেন ওঁরা। এই মজার মানুষটি বিপদের সময়ে বাতাসের ঘূর্ণি টের পান।

গেটের কাছাকাছি এসে বিষ্টুসাহেব তাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই যে মধ্যম পাণ্ডব! রাতটা কেমন কাটল? ‘

অর্জুন চট করে চারপাশে তাকিয়ে নিল। তারপর দ্রুত কাছে গিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘এখানে আমার নাম উপলনারায়ণ রায়। ইউ এন রায়ের ভাইপো। আপনার সঙ্গে আলাপ নেই।’

‘ওহো। তাই তো। ভুলেই গিয়েছিলাম। তা এখানে কে শুনতে আসছে!’

‘উঁহু।’ অর্জুন মাথা নাড়ল, অমলদা বলেন গাছেরও কান আছে।’

‘তা আছে, রায়সাহেব কোথায়?’

‘জানি না। সকালে ওঠার পর দেখতে পাইনি।’

‘ডেয়ারিতে নেই তো?’

অর্জুন অবাক হল। তার মনে পড়ল ইউ এন রায় এখানে একটা ডেয়ারি ফার্ম করবেন বলে শুনেছিল। কিন্তু সেটা কোথায় জানা হয়নি। বিষ্টু সাহেব বললেন, ‘চল, ডেয়ারিটা ঘুরে আসি।’ এবং তারপরেই মত পাল্টালেন, ‘না, কাজের জায়গায় যাওয়া উচিত নয়। এসো আমরা এই বাগানেই খানিকক্ষণ বসি।’

অর্জুন লক্ষ করেনি বাগানের একপাশে একটা চত্বর বানানো, মাথার ওপরে ছাদ আর তলায় সিমেন্টের বেঞ্চি আছে। সেখানে আরাম করে বসে বিষ্টু সাহেব বললেন, ‘আঃ, কতদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা হল। এত যে লিখছি এখানে চলে এসো, দারুণ বিজনেস জমবে, তোমরা কানে তুলছ না। আরে কালিম্পং-এ ক্রিমিন্যাল থিক থিক করছে।’

অর্জুন হাসল। বিষ্টুসাহেবের বলার ধরনটা এমন যেন পুকুর ভর্তি মাছ, মুঠো করে তুলে নাও। জায়গাটা চমৎকার। আশেপাশে কেউ নেই এবং কথা বললেও কারও কানে যাবে না। রায়সাহেব আসার আগেই কালকের ঘটনাটা বলে দিতে হবে। উচিত ছিল লিখে দেওয়া। কিন্তু তার সময় নেই। সে বলল, ‘আপনাকে একটা উপকার করতে হবে। অমলদা বলেছেন প্রতিদিনের রিপোর্ট আপনার মাধ্যমে পাঠাতে। আজ লেখার সুযোগ পাইনি।’

বিষ্টুসাহেব বললেন, “মুখেই বল। আমার মেমারি খুব শার্প। টেপরেকর্ডারের মতো।’

অর্জুন হাসল। অমলদা বলেন প্রত্যেক মানুষের স্বভাব হল, যা শুনবে তা বলার সময় নিজের অজান্তেই দু-একটা শব্দ অতিরিক্ত ব্যবহার করবে। ঘটনা সম্পর্কে নিজের অনুভূতির অভিব্যক্তি সেটা। অতএব মুখের কথায় বিশ্বাস করা বড় মুশকিল। কিন্তু এখন তো অন্য কোনও উপায় নেই। সে গতকাল সেবক রেলক্রসিং থেকে শুরু করে রাত্রের চিৎকার পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা বিশদভাবে বিটুসাহেবকে বলল। বিষ্টুসাহেব চোখ বন্ধ করে ব্যাপারটা শুনছিলেন, অর্জুন থামতে বললেন, ‘আরে ব্বাস। এতো রীতিমতো থ্রিলার।’ তারপর কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা প্যাকেট বের করে হাতে জিনিসটা ঢেলে বললেন, ‘খাবে?’

অর্জুন দেখল, বিষ্টুসাহেবের হাতে চানাচুর। সে খানিকটা অবাক হয়ে হাত পাততে বিষ্টুসাহেব প্রসন্নমুখে চানাচুর দিলেন। মুখে দিতেই অর্জুনের কপালে ভাঁজ পড়ল। এই চানাচুরের গন্ধটা তার খুব চেনা। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোত্থেকে পেলেন?’

‘কেন?’ বিষ্টুসাহেব চোখ বড় করলেন, ‘আমাদের কালিম্পং-এ পাওয়া যায় না ভেবেছ?’

‘তা যাবে না কেন। কিন্তু একমাত্র দাদুর চানাচুরই এইরকম খেতে।’

অর্জুন বিশ্বাস করছিল না।

‘দিদিমনির সঙ্গে আজ দেখা হয়েছে?’

‘দিদিমনি?’ অর্জুন কথাটা বুঝতে সময় নিল, ‘ওঃ, না।’

‘ওই যে তিনি।’

বিষ্টুসাহেবের দৃষ্টি অনুসরণ করে অর্জুন প্রাসাদের একটা জানলার দিকে তাকাল। সীতা সেখানে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। সকালবেলায় মেয়েটিকে বেশ সুন্দরী দেখাচ্ছে। হঠাৎ বিষ্টুসাহেব ছাদের আড়াল থেকে বেরিয়ে মাথার টুপি হাতে নিয়ে সেটাকে ঘন ঘন দুলিয়ে চিৎকার করতে লাগলেন, ‘হাই, হাউ ডু য়ু ডু? এই যে দিদিমনি?’

চকিতে মুখ ফেরাল সীতা। তারপর রুক্ষ গলায় চিৎকার করল, ‘ডোন্ট কল মি দ্যাট। ননসেন্স।’ বিষ্টুসাহেব চাপা গলায় বললেন, ‘রোগীর কথায় একদম কান দিতে নেই। তারপর গলা তুললেন, ‘তোমার ভাই-এর সঙ্গে আলাপ করছি। খুব ভাল ছেলে।’

সীতা এর উত্তরে জানলা থেকে সরে গেল। বিষ্টুসাহেবকে কেমন ক্যাবলা ক্যাবলা দেখাচ্ছিল, ‘যাকগে! মেয়েটা তো কখনও আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করে না। সামথিং রঙ। ওই যে, রায়সাহেব আসছেন। নমস্কার মিঃ রায়। সব কুশল তো?’

ইউ এন রায়কে দেখা গেল। এই ঠাণ্ডায় একটা সাদা হাফ প্যান্ট আর স্পোর্টস জ্যাকেট পরে নীচ থেকে উঠে আসছেন। অর্জুন দেখল ওঁর পায়ে একটা সাদা কেড্স। সঙ্গে সঙ্গে কপালে ভাঁজ পড়ল ওর। রায়সাহেব বিষ্টুসাহেবের সঙ্গে করমর্দন করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কখন এসেছেন?’

‘এই কিছুক্ষণ। অর্জুন, আই মিন উপলনারায়ণের সঙ্গে আলাপ করছিলাম।

রায়সাহেব অর্জুনের দিকে তাকালেন, ‘হোপ ইউ এনজয়েড দ্য নাইট।’

অর্জুনের অস্বস্তি হল। কথাটার মানে কী? উনি কি টের পেয়েছেন যে সে আড়াইটে তিনটে পর্যন্ত জেগেছিল! রাতটাকে উপভোগ করা আর কাকে বলে? কথা বলতে হয় তাই সে বলল, ‘না, ভাল ঘুম হয়নি।’

বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘তা তো না হবার কথাই। নতুন জায়গায় গেলে আমিও ঘুমুতে পারি না। সেবার দিল্লীতে গিয়ে তিনরাত না ঘুমিয়ে ছিলাম।’

রায়সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোনও চিৎকার শুনেছ?”

‘চিৎকার!’ অর্জুন চট করে মিথ্যা কথা বলল, ‘হ্যাঁ, সেটা সন্ধেবেলায়। রাতে তো কোনও চিৎকার শুনিনি। কেন বলুন তো?’

রায়সাহেব এবার যেন স্বচ্ছন্দ হলেন, ‘না। আমিই তা হলে ভুল শুনেছি। বাই দ্য বাই, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, আমার বাড়ির সবকটা কাজের লোকই কথা বলতে পারে না। বুঝতেই পারছ নিরাপত্তার জন্যে এই রকম লোক রাখতে হয়েছে আমাকে। আসুন স্যার, আমার ঘরে গিয়ে বসি।’

বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘আপনার হাউন্ডগুলো কেমন আছে? ওগুলোর ভয়ে তো দিন-দুপুরেই এদিকে আসতে সাহস হয় না আমার।

‘ভাল। ওরা সত্যিকারের শিকারী।’

অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘হাউন্ডগুলোকে পেলেন কোথায়?’

‘সানফ্র্যানসিস্কোতেই। মিস্টার মুরহেড বলে এক ভদ্রলোকের পোষা ছিল ওগুলো। আনতে অনেক খরচ হয়ে গেছে। এনে উপকারই হয়েছে।

‘ওগুলোকে একবার দেখতে পারি? আমি কখনও হাউন্ড দেখিনি।’ অর্জুন বলল।

রায়সাহেব একমুহূর্ত চিন্তা করলেন। তারপরে মাথা নেড়ে ওদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন প্রাসাদের ডান দিকে। সেখানে একটা লোহার গরাদ দেওয়া। ওদের দেখে চারটে হাউন্ডই বীভৎস ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়াল।

গতরাত্রের অন্ধকারে কিছু বোঝেনি অর্জুন, এখন দিনের আলোয় ওদের দেখে বুক হিম হয়ে গেল। ওরা চিৎকার করছে না কিন্তু চাহনি এবং মুখের ভঙ্গি বলে দিচ্ছে সামান্য সুযোগ পেলে শিকারকে ছিঁড়ে ফেলবে। বিষ্টু সাহেবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ঢোক গিলে বললেন, ‘ডেঞ্জারাস।’ রায়সাহেব হাসলেন, ‘এরা একটা সিংহের সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারে। ওদের ভরসায় রাত্রে নিশ্চিন্ত থাকি। আপনি কি শুনেছেন জলপাইগুড়িতে পৌঁছেই দেখি ছ’খানা ষাঁড় মেরে ফেলা হয়েছে। পেডিগ্রি ভাল নয় অবশ্য কিন্তু খুব হেলদি ছিল ওরা। আমার ডেয়ারিতে কাজে লাগত।’ তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘দে আর স্টিল অ্যাকটিভ।’

‘কিন্তু আপনি জানেন না ওরা কারা?’ বিষ্টুসাহেব হাউন্ডদের ওপর থেকে চোখ সরাচ্ছিলেন না। তাঁর গলার স্বরে কোনও তাপ নেই।

‘অনুমান করতে পারি।’

‘তা হলে পুলিশকে রিপোর্ট করা উচিত ছিল। স্ক্যান্ডাল বড় কথা নয়।’

‘আপনি তো সবই জানেন। এই কারণেই আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য চেয়েছি। বাট ইওর অমল সোম সামান্য কারণ দেখিয়ে এলেন না। বুঝতে পারছি না এই ছেলেটি কতখানি উপকারে লাগবে।’ মুখের ওপর বলে দিলেন রায়সাহেব।

বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘নিশ্চয়ই অমল সেটা জানে।’

অর্জুনের মেজাজ খারাপ লাগল। রায়সাহেব যে প্রথম থেকেই ওকে পছন্দ করছে না সেটা সে আন্দাজ করেছিল। সে কয়েক পা এগিয়ে গেল। হাউন্ডগুলো তাকে কাছাকাছি আসতে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে দাঁড়াল। যদিও মাঝখানে লোহার শিক রয়েছে কিন্তু অর্জুনের মনে হল এতটা কাছে এগিয়ে না এলেই ভাল ছিল। এই সময় রায়সাহেব পিছন থেকে বলে উঠলেন, ‘কাছে যেও না, ওরা একবার ধরতে পারলে বাঁচার কোনও চান্স নেই। একমাত্র সীতার আন্টি ছাড়া ওরা কারও কথা শোনে না।’

বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘উনিই কি ওদের বের করেন আর ঢোকান?’

‘হ্যাঁ। ভদ্রমহিলা কিছুদিন মিস্টার মুরহেডের কাছেও কাজ করেছেন।’

এবার বিষ্টুসাহেব ডাকলেন, ‘চলে এসো হে পঞ্চম—সরি, উপলনারায়ণ।’

অর্জুনের মাথায় হঠাৎ সেই সুরটা এসে গেল। সে খুব চাপা স্বরে শিষ দিল। ঠিক যেমনটি গতরাত্রে শুনেছিল ঠিক তেমনটি। সঙ্গে সঙ্গে কুকুরগুলোর সতর্ক ভঙ্গি উধাও হয়ে গেল। স্পষ্টত একটা আলিস্যি দেখা গেল ওদের শরীরে। চারজনই বেশ আদুরে ভঙ্গিতে রেলিং-এ শরীর ঘেঁষতে লাগল। এতে অর্জুনের সাহস বেড়ে গেল। সে শিষ বন্ধ না করে রেলিং-এর গায়ে চলে এল। কুকুরগুলোর মুখে সেই বীভৎস ভঙ্গিটা নেই। ওরা প্রায় বেড়ালের মতো আদর চাইছে। ভয়ে ভয়ে হাত বাড়াল অর্জুন! তারপর একটা হাউন্ডের পিঠে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্যে আঙুল বোলালো। তারপর শিষ দিতে দিতে পেছিয়ে এসে ওটা বন্ধ করতেই হাউন্ডগুলোকে ঘাবড়ে যেতে দেখল। এবং তারপরেই ওরা ছুটে এল রেলিং-এর দিকে এবং হিংস্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকল যেমন প্রথমে ছিল। অর্জুনের বুকের মধ্যে তখনও অস্থির হৃদপিণ্ড কিন্তু সে বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকিয়ে হাসল।

ওদের দু’জনের মুখের চেহারা পাল্টে গেল। বিষ্টুসাহেবের হাঁ এত বড়, জিভ দেখা যাচ্ছে। রায়সাহেবের চোখ বিস্ফারিত। সে এগিয়ে আসতে তিনি কোনও রকমে বললেন, ‘এটা কী করে সম্ভব হল?’

অর্জুন বলল, ‘আপনি যদি অনুমতি দেন তা হলে আমি ওদের নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারি। সারাদিন তালা বন্ধ হয়ে থাকে বেচারারা।’

‘বাট হাউ। কী করে তুমি ওই শিষটা শিখলে!’ রায়সাহেব উত্তেজিত।

অর্জুনের তখন যেন আত্মবিশ্বাস এসে গিয়েছে, ‘ভাল গোয়েন্দাদের এ সব জানতে হয়। অমলদার কাছে পৃথিবীর কুখ্যাত কুকুরদের চরিত্র নিয়ে একটা বই আছে। লাইফ পাবলিকেশন থেকে বেরিয়েছে। তাতে আছে কী করে হিংস্র কুকুরদের বশ করা যায়। এক এক জাতের কুকুরদের বশ করার পদ্ধতি এক এক রকম।’

‘বই আছে! বইতে কি শিষ লেখা আছে?’ রায়সাহেব হতভম্ব।

অর্জুনের মনে পড়ল বুড়িদির কাছে স্বরলিপির বই দেখেছে। তা দেখে সুর তোলে বুড়িদি। সে সহজ গলায় বলল, ‘সুরের স্বরলিপি আছে। আপনি দেখলে বুঝতে পারবেন।’

সঙ্গে সঙ্গে দু’হাতে মাথা চেপে ধরলেন রায়সাহেব, ‘তা হলে তো যে কেউ সেই বই থেকে ওটা শিখে এদের পোষ মানাতে পারে। ওঃ, এতদিন আমি মূর্খের স্বর্গে বাস করছিলাম। নাউ, হোয়াট টু ডু।’

এই সময় সেই বৃদ্ধা মহিলাকে এদিকে আসতে দেখা গেল। হাঁটুর নিচু ঢাকা স্কার্ট আর ফুলহাতা জামার ওপর বুক খোলা সোয়েটার। কাছে এসে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইজ দেয়ার এনি প্রব্লেম মিঃ রায়? আমি ওপরের জানলা থেকে দেখলাম এই হাউন্ডগুলোর সামনে আপনারা খুব উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন!

‘ইয়েস।’ চিৎকার করে উঠলেন রায়সাহেব, ‘দে আর ইউজলেস। ওদের অত টাকা দিয়ে কিনে আমি প্রচণ্ড ভুল করেছি। ওদের চেয়ে একটা বেড়াল পোষা ভাল ছিল।’

‘কেন? হঠাৎ আপনার ধারণা পাল্টালো কেন? আপনি ওদের চরিত্র জানেন না?’

‘জানতাম। কিন্তু সেটা মিথ্যে। এই যে, এইটুকুনি ছেলে ওদের বেড়াল বানিয়েছে।’ রায়সাহেব শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললেন। বৃদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে অর্জুনের মুখের দিকে তাকালেন, প্রচণ্ড বিস্ময় সেই দৃষ্টিতে। তারপর বললেন, ‘আপনার ভাইপো!’

‘হ্যাঁ। একটা মফস্বলের ক্যাবলা ছেলে ওদের পোষ মানিয়েছে। আই শ্যড রাইট টু মিঃ মুরহেড। কিন্তু তার আগে আমি কী করব!’ ছটফট করলেন রায়সাহেব।

বৃদ্ধা এগিয়ে এলেন, ‘কীভাবে পোষ মানিয়েছ ওদের—আমাকে দেখাও।’ অর্জুন টের পেল তার স্মার্ট ব্যবহার করা একদম চলবে না। এই মহিলার সামনে তাকে ক্যাবলা সাজতে হবে। সে বলল, ‘আমি শিষ দিলাম আর ওরা শান্ত হয়ে গেল।’

‘কী রকম শিষ? বাজাও তো দেখি।

অর্জুন চোখ বন্ধ করল। তারপর শিষ দেওয়া শুরু করল। কিন্তু ইচ্ছে করেই সে শিষের সুরটা পাল্টালো। মাঝে মাঝে সে অবশ্য সেই সুরের কিছু অংশ রাখছিল। আর যখন সে মূল সুরটা বাজাচ্ছিল তখনই কুকুরগুলো শান্ত হতে চাইছিল কিন্তু অচেনা সুর শোনামাত্র আবার তারা পূর্ব-অবস্থায় ফিরে যাচ্ছিল। বৃদ্ধা সতর্ক চোখে কুকুরদের পরিবর্তন লক্ষ করছিলেন। এবার বলে উঠলেন, ‘তুমি এই সুর কোথায় শিখলে?”

‘বই থেকে।

‘কী বই? তার নাম কী?’

অর্জুন বলল, ‘নামটা আমি ভুলে গিয়েছি।

‘হুঁ। কিন্তু তোমার সুর শুনে ওরা তো বেড়াল হল না! আপনি অযথা উত্তেজিত হয়েছেন। দেখলেন তো ওদের কোনও রি-অ্যাকশন হল না।’

‘কিন্তু শিষ দিতে দিতে ওই ছেলেটি হাউন্ডের পিঠে হাত দিয়েছে।

‘সত্যি?’ গালে হাত দিলেন বৃদ্ধা। চমক তাঁর কম নয়, ‘তুমি এই সুর বাজিয়েছিলে?’

‘অনেকটা এই রকম। তবে আমার ভুল হতে পারে। সুরটাকে আমি এখন মনে করতে পারছি না।’ অর্জুন বোকা বোকা হাসল। রায়সাহেব বললেন, ‘কাম অন। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।’

রায়সাহেব ঘুরে দাঁড়াতে অর্জুন তাঁর সঙ্গ নিল। বিষ্টুসাহেবের পাশাপাশি হাঁটতে সে আড়চোখে দেখল বৃদ্ধা সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন। সে বুঝতে পারল ভদ্রমহিলা অবশ্যই তাকে সন্দেহ করছেন। কিন্তু উনি নিশ্চয়ই কারণটা ধরতে পারছেন না। আর তাতেই বিস্ময়টা বেড়ে যাচ্ছে।

ড্রয়িং রুমে বসে বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘আমি আর বসছি কেন! একটু বাজারের দিকে যেতে হবে। সোফায় বসে একটা পায়ের ওপর পা তুলে দিতেই রায়সাহেবের জুতোর তলা দেখতে পেল অর্জুন। রায়সাহেবের বাঁ পায়ের জুতোর তলা অটুট। সামান্য ক্ষয়নি। তার মানে বাগানে পাতা চাপা দেওয়া জুতোর ছাপটা রায়সাহেবের নয়।

অর্জুন বিষ্টুসাহেবকে বলল, ‘আমি সেবার জায়গাটা ভাল করে দেখিনি। এবার আপনার সঙ্গে যেতে পারি?’

‘স্বচ্ছন্দে। কি রায়সাহেব আপনার আপত্তি নেই তো?’

‘আপত্তি? না, কিন্তু মিঃ সোম ওকে বাড়িতেই থাকতে বলেছেন পাঁচ দিন।’

চব্বিশ ঘণ্টা এই বাড়িতে বন্দী হয়ে থাকতে হবে এমন কথা হয়েছিল কিনা মনে পড়ল না, তবু অর্জুন ঠিক করল সে অবাধ্য হবে না। বিষ্টুসাহেব চলে গেলে সে দোতলায় উঠে এল। রায়সাহেবের অনেক কাজকর্ম আছে। ঘরে ঢুকে তার খুব মজা লাগছিল। হাউন্ডগুলোকে অত সহজে বশ মানানো যাবে তা ভাবতেই পারেনি সে। কিন্তু বৃদ্ধা কিছু আঁচ করেছে। অর্জুন ভাবল, বয়ে গেল। খোলা জানলা দিয়ে চমৎকার সূর্যের আলো এসেছে ঘরে। মনে হচ্ছে আজ দিনটা ভাল যাবে।

একটু বাদেই ব্রেকফাস্ট এসে গেল। এত ভাল খাবার সে কোনও কালে খায়নি। কাল রাত্রের লোকটাই এসেছিল কিন্তু আজ তার সঙ্গে কথা বলার একটুও চেষ্টা করল না অর্জুন! এই বাড়ির সবকটা চাকুরেই বোবা, একমাত্র বৃদ্ধা ব্যতিক্রম। এই সতর্কতা শুধু মেয়ের জন্যেই? তা হলে পুলিশে যাওয়ার কথা বাতিল করলেন কেন রায়সাহেব? বদনামের ভয় উনি করতে যাবেন কেন? রাত্রে এই বাড়িতে আগন্তুক আসে। তখনই মেয়েটি চেঁচায়। আগন্তুক হাউন্ডগুলোকে পোষ মানাতে জানে। আর জানে ওই বৃদ্ধা। বৃদ্ধার সঙ্গে আগন্তুকের কোনও সম্পর্ক নেই তো? অমল সোম থাকলে ঠিক বলতে পারতেন।

ব্রেকফাস্টের এঁটো প্লেটডিস লোকটা সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর অর্জুনের মনে হল এবার পাঙ্ক বইটা শেষ করা দরকার। দুপুরে খেয়ে-দেয়ে একটা লম্বা ঘুম দেবে যাতে আজ রাত্রে জেগে থাকতে পারে। সে আলমারি থেকে ব্যাগটা খুলতেই চমকে উঠল। এত অগোছাল ভাবে জিনিসপত্র রাখেনি সে। দ্রুত ব্যাগের ভেতর হাতড়েও সে বইটার কোনও হদিশ পেল না। অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল অর্জুন! বইটাকে সে এই ব্যাগের ভেতরেই রেখে গিয়েছিল। তবু ঘরের চারপাশে নজর বোলালো সে। তারপর ধীরে ধীরে সোফায় এসে বসল। তার অনুপস্থিতিতে কেউ এই ঘরে এসেছিল এবং সে-ই ব্যাগ হাতড়ে বইটাকে পেয়ে নিয়ে গিয়েছে। কে হতে পারে? যে চাকরটা ঘর পরিষ্কার করেছে সে কি এত সাহস পাবে? অর্জুনের মনে হল রায়সাহেবকে এক্ষুনি ব্যাপারটা জানানো দরকার। তার ‘পাক্’ বইটা ছিল এই খবর তো ইতিমধ্যে চোর জেনে গিয়েছে। এবং সেই সঙ্গে ফাঁস হয়ে গিয়েছে সে মফঃস্বলের নিরীহ ছেলে নয়। নইলে এই বাড়িতে ঢোকার সময় সে ওই বই সঙ্গে নিয়ে আসতো না। অর্জুনের নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল। সে যদি বইটার ব্যাপারে সামান্য সতর্ক হতো! তার মনে হল রায়সাহেবকে খবরটা দেওয়া যেত যদি বইটার নাম অন্যরকম হতো। সে এই বাড়িতে ওই রকম একটা বই এনেছে শুনলে ভদ্রলোক বিরক্তই হবেন। তার ওপর ওটা চুরি যাওয়া মানে শত্রুপক্ষের হাতে চলে যাওয়া। ফলে রায়সাহেবের এত সতর্কতায় চিড় ধরেছে বোঝা যাবে এবং তিনি আরও বিপন্ন বোধ করবেন। অর্জুন ঠিক করল কাউকেই জানাবে না। যে বই নিয়েছে তার নিশ্চয়ই একটা প্রতিক্রিয়া হবে, সেটাই দেখা যাক।

দুপুর অবধি কোনও কিছু ঘটল না। তার খাবার ঘরেই দিয়ে যাওয়া হল। চুপচাপ শান্ত হয়ে রয়েছে বাড়িটা।

দুপুর থেকেই সূর্যের আলো নিভে গেল। হঠাৎ প্রচণ্ড কালো হয়ে গেল আকাশ। ঘরের আলো সরে গেছে। আলো জ্বাললে ভাল হয়। অর্জুন বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। এ রকম দিনে ঘুম আসে চটপট। কিন্তু সেই সময় বাইরের বারান্দায় সীতার গলা পেল সে, ‘আই লাইক টু মিট মাই ব্রাদার, আন্টি!’

সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর কানে এল, ‘ওহো! কিন্তু সে হয়তো ঘুমাচ্ছে!’

‘এই দুপুরে কেউ ঘুমায় নাকি!’

‘ভিলেজ বয়রা ঘুমায়।’

‘ঠিক আছে, আমি দেখব। আফটার অল হি ইজ মাই ব্রাদার।’

তারপরেই ঘরের পর্দাটা নড়ল। বিছানায় শোওয়া অর্জুন টের পেল ওরা দু’জন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। বৃদ্ধা ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘দ্যাখো, আমি তোমাকে বলেছিলাম কিনা! ও ঘুমুচ্ছে। চল ফিরে যাই।’

‘নো!’ শব্দটা এত জোরে যে চোখ না খুলে পারল না অর্জুন। এবং খুলতেই দেখল সীতা তার সামনে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে; তার পিছনে বৃদ্ধা! সে একটু বিব্রত ভঙ্গিতে উঠে বসল। সীতা মুখ বিকৃত করে বলল, ‘কী ধরনের ছেলে তুমি? দুপুরে ঘুমাচ্ছ?’

বিছানা ছেড়ে উঠে বসল অর্জুন, তারপর লাজুক হাসল।

সীতা এবার বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নাউ য়ু মে লিভ আস। ‘বাট—।’ বৃদ্ধাকে স্পষ্টতই আপত্তির ভঙ্গিতে দেখল অর্জুন!

‘ওহো! ড্যাডি বলেছে আমি ওর সঙ্গে ইচ্ছে হলে কথা বলতে পারি। আমার ইচ্ছে হয়েছে।’

বৃদ্ধা নিতান্ত অনিচ্ছায় ঘর ছেড়ে গেলেন। যাওয়ার আগে তাঁর দুই চোখ অর্জুনকে জরিপ করে গেল যেন। এবং তখনই পৃথিবী কাঁপিয়ে বাজ পড়ল কালিম্পং-এর আকাশ থেকে। অন্ধকার নেমে এল দ্রুত ভরদুপুরেও। এবং সেই সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হল। একটু অস্বাভাবিক পায়ে সীতা জানলার কাছে পৌঁছে বলল, ‘ফ্যান্টাস্টিক।’

জলের গতি উল্টোদিকে হওয়ায় ভেতরে ছাঁট আসছে না। অর্জুন বুঝতে পারছিল না সে কী করবে? একজন ভাল সত্যসন্ধানী এই অবস্থায় কী আচরণ করত?

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল সীতা, ‘নাউ টেল মি, হু আর য়ু?’

‘মানে?’ হকচকিয়ে গেল অর্জুন। জানলার গায়ে সীতা, তার পিছনে সাদা বৃষ্টির ধারা।

‘ইটস সিম্পল। তুমি আমার ভাই নও।’

‘কে বলল তোমাকে?’ ইচ্ছে করেই তুমি বলল সে।

‘ড্যাডি বলেছে তুমি ভিলেজে থাকো, সেখানকার কলেজে পড়, শাই এবং আনস্মার্ট। কিন্তু এর কোনওটাই সত্যি নয়। ড্যাডি আমাদের কখনওই বলেনি

যে তার ভাইপো আছে। হঠাৎ পরশু কোথায় গিয়ে তোমাকে নিয়ে হাজির করল। নো, য়ু আর নট মাই ব্রাদার।’

কথা বলতে বলতে সীতা সোফার গায়ে এসে হেলান দিল।

‘কী করে মনে হল, তোমার ড্যাডির কথা মিথ্যে?

‘আনস্মার্ট ছেলে হলে হাউন্ডের পিঠে হাত দিতে না। য়ু নো দ্য ট্রিকস্।’

স্পষ্ট তাকাল সীতা, ‘এবং তুমি জানো আমি কে?

‘মানে!’ চমকে উঠল অর্জুন।

‘ওই বইটা তুমি কোথায় পেলে? হঠাৎ মুখ চোখ হিংস্র হয়ে উঠল মেয়েটার, ‘এই রকম বই কারও হাতে দেখলে সানফ্র্যানসিস্কোতে আমার বন্ধুরা তাকে খুন করে ফেলত। সমস্তটাই ইচ্ছাকৃত স্ক্যান্ডাল। তোমাদের ভিলেজে ‘পাঙ্ক” বই পাওয়া যায়?’

অর্জুনের চোয়াল শক্ত হল। সে বলল, ‘তুমিই তা হলে ওটা চুরি করেছ?’

‘দ্যাটস নট ইওর বিজনেস। হু ইজ অমল সোম?’

অর্জুন চমকে উঠল। অমলদার নাম এই মেয়ে জানল কী করে? তারপরেই খেয়াল হল বই-এর পিছনে মলাটে অমলদার নাম সই করা ছিল। সে বলল, ‘আমার বন্ধু।’

হঠাৎ পকেটে হাত ঢুকিয়ে সীতা সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করল, ‘ড্যাডি বলেছিল তুমি নাকি এত ভাল, স্মোক পর্যন্ত কর না। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। এই বাড়িতে আমি চেষ্টা করেও সিগারেট পাইনি। থ্যাঙ্কস।’ ফস করে সীতা দেশলাই ঠুকে সিগারেট জ্বালালো। তারপর এক মুখ ধোঁয়া গিলে বলল, ‘থ্যাঙ্কস্।’ খুব মৃদুভাবে টেনে নেওয়া ধোঁয়া তার নাক দিয়ে বেরুচ্ছিল। সীতার চোখ এখন সুখে বন্ধ। অর্জুন অসহায়। ওই সিগারেটের প্যাকেটটাও ব্যাগে ছিল। বই-এর সঙ্গে বেহাত হয়ে গিয়েছে। অর্জুন আড়চোখে দরজার দিকে তাকাল। সীতা তার ঘরে বসে সিগারেট খাচ্ছে এই খবরটা রায়সাহেবের নিশ্চয়ই ভাল লাগবে না। এবং সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়বে তার ওপরে। কিন্তু এখন কিছুই করার নেই। সীতার মুখ দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিন অভুক্ত থাকার পর কোনও পশু যেন খাবার পেয়েছে। খুব সামান্য সময়ে সিগারেটটা শেষ করে বাইরে ছুঁড়ে দিল সীতা ফিল্টারটাকে। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার কাছে আর আছে?’

মাথা নেড়ে না বলল অর্জুন।

এবার এগিয়ে এসে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে সীতা বলল, ‘ওই রকম পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থেকো না। কাম হিয়ার। ওখানে বসো।’

অর্জুন উল্টোদিকের সোফায় বসতে সীতা বলল, ‘আমি একজন পাক্। এবং তুমি সেটা জানো।’

এত সহজ গলায় বলল যে অর্জুন সামান্য নড়া ছাড়া কিছুই করতে পারল না।

সীতা বলল, ‘কিন্তু তুমি জানো না পাঙ্করা কী রকম ফেরোসাস হয়। আই মাস্ট গো ব্যাক টু সানফ্র্যানসিস্কো। ওটা একটা জীবন।’

‘তুমি কেন পাঙ্ক হয়েছ?’

‘কারণ আমি তোমাদের ঘেন্না করি। জীবনটাকে উপভোগ করতে হবে যা ইচ্ছে করে। পুতু পুতু করে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না। তোমার মতো বোকারা সেটা বুঝবে না। কিন্তু তুমি আমার ভাই নও। ইউ আর অ্যান অ্যাসিস্ট্যান্ট অফ এ প্রাইভেট ডিটেকটিভ।’

হি হি করে হেসে উঠল সীতা, ‘কি? খুব অবাক হচ্ছ, না? আই নো। পিটার আমাকে সব জানিয়েছে। ড্যাডি ওই অমল সোমের কাছে গিয়েছিল। কারেক্ট?’

অর্জুন মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না। এতখানি সত্যি সীতা কী করে বলছে? এই বাড়ির দোতলা থেকে সে কখনওই নামেনি এর মধ্যে। এই বাড়িতে অর্জুনের চব্বিশ ঘণ্টাও কাটেনি। অথচ সীতা সব জেনে গেল কী করে। পিটার কে?

সীতা বলল, ‘আমি যদি পিটারকে বলি তোমার ব্যাগে ‘পাঙ্ক’ পাওয়া গেছে, হি উইল সিম্পলি কিল ইউ। পিটার এর আগে সাতটা খুন করেছে। বাট ইউ টেল মি, এসব কথা সত্যি কিনা?”

‘তুমি তোমার ড্যাডিকে জিজ্ঞাসা করছ না কেন?’

‘ফুল! ড্যাডি জানতে পারলে এই মুহূর্তে তোমাকে চলে যেতে বলবে। কিন্তু আমার কোনও লাভ হবে না। পিটারের সঙ্গে আমার যোগাযোগের পথটাও বন্ধ হয়ে যাবে। তা হলে তুমি স্বীকার করছ ইনফরমেশনগুলো সত্যি! ওয়েল। লিভ দিস প্লেস ইমিডিয়েটলি।’

‘কিন্তু কেন? আমি তো তোমার কোনও ক্ষতি করিনি।’

‘আই হেট স্পাইস।’

‘কিন্তু আমি তোমার উপকার করতে চাই।

‘ইজ ইট? দেন ব্রিং মি সাম স্মোক্‌স। কালিম্পং-এর বাজারে কি ড্রাগ পাওয়া যায়?’

‘জানি না।’

‘তুমি খোঁজ করে নিয়ে এস। আজই।’

‘এই বৃষ্টিতে?’

‘সো হোয়াট?’

‘রায়সাহেব বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করেছেন।’

ঠিক তখনই বৃদ্ধাকে দেখা গেল, ‘সীতা, তোমার ড্যাডি খোঁজ করছেন।’

‘হোয়াই?’

‘আই ডোন্ট নো।’

মুখ বিকৃত করল সীতা। তারপর হুট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বৃদ্ধা দরজা অবধি পৌঁছে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘সীতা কী বলছিল?’

‘এই এমনি, গল্প করছিল।’ অর্জুন হাল্কা হবার চেষ্টা করল।

‘তুমি কী করে জানলে ওই শিষটাকে? টেল মি?’

অর্জুন অবাক হয়ে তাকাল। এই মুহূর্তে বৃদ্ধাকে সাপের মতো দেখাচ্ছে।

‘আমি বই-এ পড়েছি।’

কথাটা শেষ হওয়া মাত্র বৃদ্ধা আর দাঁড়ালেন না। তারপর শুধু বৃষ্টির শব্দ, মাঝে মাঝে হাওয়ার বেগ এবং ঘর অন্ধকার করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই নেই। অর্জুন বুঝল তার আর কিছু করার উপায় নেই। সীতার কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। পিটার নামের লোকটাই সীতাকে জানিয়েছে। কী করে জানাল? কাল রাত্রে যে এসেছিল সে কি পিটার! সেই কি খবরটা দিয়ে গিয়েছে। যদি খবর দিতে পারে তো সীতাকেও নিয়ে যেতে পারত। মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। কিন্তু আর এই বাড়িতে থাকার কোনও মানে হয় না। নিজের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সে তো কোনও কাজই করতে পারবে না। কিন্তু সেই সঙ্গে তার খুব খারাপ লাগছিল। অমল সোমের কাছে মুখ দেখাবে কী করে? নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা যার নেই সে বড় গোয়েন্দা হবে কী করে? অমল সোম নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হবেন। কিন্তু তা হলেও এইভাবে আরও চার দিন বসে থাকার কোনও মানে হয় না। আর ঠিক তখনই দরজায় রায়সাহেবকে দেখা গেল।

‘শোন, আমি এই একটু আগে মেসেজ পেলাম। তোমাকে এক্ষুনি মিঃ পত্রনবীশের বাড়িতে চলে যেতে বলা হয়েছে। আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘কে পাঠিয়েছেন মেসেজ?’

‘মিঃ পত্রনবীশ।’

অর্জুন অবাক চোখে তাকাল। এটাকে কি টেলিপ্যাথি বলে। সে এইমাত্র এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়েছিল আর অমনি সেই একই খবর এসে গেল? যাক, এতে তার ভালই হল, অন্তত নিজের ব্যর্থতার কথা অমল সোমকে বলার লজ্জার থেকে আপাতত বাঁচা গেল। সে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি। বিষ্টুসাহেবের বাড়িটা কতদূর?

রায়সাহেব বললেন, ‘বেশি দূরে নয়, পাশেই। তবে এই বৃষ্টিতে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি। ইজ দেয়ার এনিথিং রং?’

অর্জুনের মনে হল সমস্ত ঘটনা রায়সাহেবকে জানানো দরকার। মেয়েকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে কুকুরগুলো, বৃদ্ধা মহিলাকে সরিয়ে ফেলা উচিত। কিন্তু অমল সোম তাকে এইরকম কোনও নির্দেশ দেননি। যা বলার একমাত্র অমলদাকেই বলবে সে।

দু’ মিনিটও লাগল না। অর্জুন জিনিসপত্র গুছিয়ে রায়সাহেবের সঙ্গে নীচে নেমে এল। সীতা কিংবা সেই বৃদ্ধাকে কোথাও দেখতে পেল না। দরজার বাইরে পোর্টিকোতে সেই নীল অ্যাম্বাসাডার দাঁড়িয়ে। সে যেতেই ড্রাইভার দরজা খুলে দিয়ে নিজের আসনে বসল। রায়সাহেব বললেন, “আমি বৃষ্টি থামলে যেতে পারি। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমাকে কোথায় নিয়ে যেতে হবে ড্রাইভার জানে।’ গেটের কাছে পৌঁছে অর্জুন সেই প্রহরীটাকে দেখতে পেল। একটা শেডের নীচে সজাগ চোখে তাকিয়ে আছে।

ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে গাড়িটা ওপরে উঠে এল। বিষ্টুসাহেবের ম্যাসেজ না রায়সাহেবের সিদ্ধান্ত সেটা না গেলে বোঝা যাচ্ছে না। বাঁ দিকে একটা ভ্যালি অনেক নীচে নেমে গিয়েছে। বৃষ্টির জন্য তার অনেকটা অস্পষ্ট। রাস্তা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে জল নামছে। অর্জুন বুঝতে পারল সে কালিম্পং বাজারের দিকে ফিরে যাচ্ছে। অথচ বিষ্টুসাহেব লিখেছিলেন যে রায়সাহেব তাঁর প্রতিবেশী। তাঁর বাড়িতে যেতে হলে বাজারের দিকে চলতে হবে কেন? সে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

‘মার্কেটমে সাব।’

দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল না সে। অপেক্ষা করাই ভাল। খামোকা কৌতূহলী হলে উত্তেজনা আসে। কথাটা একটা বইতে পড়েছিল অর্জুন। সে কাচের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকায়। অনেক নীচে দুটো ফিতের মতো ঝাপসা নদী। তিস্তা আর রঙ্গিত। বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের রাস্তায় চললে একটা আলাদা রূপ চোখে পড়ে। পৃথিবীটা রহস্যময় হয়ে যায়।

কালিম্পং-এর বাজার এলাকা খুব বড় নয় আবার একেবারে হেলাফেলা করাও যায় না। একটাই বড় রাস্তার দু’ধারে দোকানপাট, পিছনেও কিছু দোকান রয়েছে। গাড়িটা যেখানে দাঁড়াল, তার পাশের দোকানটার নাম এ. ডি. ওয়াং এন্ড সন্স।

ড্রাইভার বলল, ‘ওয়াং সাহাবকা দোকান আ গিয়া সাব।’

ওয়াং সাহেবের দোকানে তার কী দরকার? প্রশ্নটা করতে গিয়েও সামলে নিল সে। দেখাই যাক। দরজা খুলে দোকানে ঢুকতে ঢুকতে খানিকটা বৃষ্টির জল গায়ে লাগল। কি কনকনে ঠাণ্ডা রে বাবা। দোকানে একটাও লোক নেই। আর তখনই মনে পড়ল বর্ষাতিটাকে ফেলে এসেছে রায়সাহেবের বাড়িতে। চিন্তা এবং তাড়াহুড়োয় ওটার কথা খেয়ালেই ছিল না। অথচ এই বৃষ্টি দেখলে তো প্রথমেই বর্ষাতিকে মনে পড়া উচিত। নীল অ্যাম্বাসাডারটা চলতে শুরু করেছিল। অর্জুন চিৎকার করে তাকে থামিয়ে বর্ষাতির কথা মনে করিয়ে দিল। লোকটা মাথা নেড়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেল বৃষ্টির ভেতরে। অর্জুন এবার দোকানটার চেহারা দেখল। বেশ সাজানো গোছানো দোকান। কিউরিও শপ। পাহাড়ি অঞ্চলের মূল্যবান এবং বিরল জিনিসপত্র সুন্দর করে ডিসপ্লে করা হয়েছে। হঠাৎ ভেতরের দরজা খুলে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক কাউন্টারে এলেন।

চিনা, নেপালি, টিবেটিয়ান কিংবা সিকিমিজ যা হোক একটা কিছু হবে। চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে না। মাথার চুল এবং দাড়ির রঙ সাদা। আলখাল্লা জাতীয় পোশাক। একটা আঙুল তুলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়েস স্যার। নেম প্লিজ!’

‘অর্জুন।’

সঙ্গে সঙ্গে শব্দহীন হাসিতে ওঁর মুখ ভরে গেল। সেই সঙ্গে কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত দু-চার ঝাঁকুনি খেল। আর সেই সময় একটা জিপ এসে দাঁড়াল উল্টো ফুটপাতে। উইন্ডচিটারের ওপর টুপিপরা যে লোকটা লাফিয়ে রাস্তায় নেমে দোকানে ঢুকল তাকে এক ঝলক দেখতে পেল সে। টকটকে লাল রঙ। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে লেবেল ক্রসিং-এর স্মৃতি চমকে উঠল। লোকটার মুখ দেখা দরকার। সে দেখল লোকটা যে দোকানে ঢুকল সেটা একটা বড় টোবাকো শপ। দোকানে ঢুকে লোকটা একটানে টুপি খুলে জল ঝেড়ে ফেলতে চাইল হাত নাচিয়ে। এবং তখনই তার ন্যাড়া মাথা দেখতে পেল অর্জুন। লাল মাথা। লোকটা যে বিদেশি তা বোঝা যায়। বয়স বেশি নয়। এই কি সেই পিটার? অর্জুন শিহরিত হল। দু’ মিনিটের মধ্যে লোকটা আবার জিপে ফিরে গিয়ে মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। একটু সচকিত হয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই বৃদ্ধ বললেন, ‘দ্যাট হোটেল। রুম নাম্বার ফিফ্‌তিন।’ অর্জুন দেখল একটা বিশাল ছাতা নিয়ে বৃদ্ধ কাউন্টার ছেড়ে এগিয়ে আসছেন, ‘কাম, কাম। ছাতাটা খুললে মনে হল চারজন মানুষ স্বচ্ছন্দে ওই ছাতার তলায় হেঁটে যেতে পারে। বৃদ্ধের সঙ্গে রাস্তাটা পার হয়ে এল অর্জুন। হোটেলের দরজায় তাকে পৌঁছে দিয়ে সরল হেসে বৃদ্ধ আবার দোকানে গেলেন। অর্জুন বুঝতে পারছিল না এই হোটেলে তাকে আসতে হবে কেন? বৃদ্ধ যেভাবে নাম শুনে তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন তাতে বোঝাই যাচ্ছে আগে থেকে নির্দেশ ছিল। কিন্তু ড্রাইভারটা তাকে হোটেলে না নামিয়ে দোকানের সামনে নামাল কেন। বিষ্টুসাহেব কি এখন এই হোটেলে আছেন!

হোটেলটা পরিষ্কার। খুব উঁচুদরের নয় আবার হেজিপেজিও নয়। সে এগিয়ে যেতেই রিসেপশনে দাঁড়ানো সুবেশ পুরুষ জিজ্ঞাসা করল, ‘ইয়েস স্যার!’

‘রুম নাম্বার ফিফটিন।’ অর্জুন বলেই বুঝল এর বেশি সে জানে না।

‘ফার্স্ট ফ্লোর লেফট সাইড!’

দোতলায় উঠে এল অর্জুন। সিঁড়িতে কার্পেট পাতা, করিডোরেও। পনেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ। সামান্য ইতস্তত করে নক করল অর্জুন। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল আর বিষ্টুসাহেব একগাল হেসে বললেন, ‘কাম ইন।’

‘আপনি এখানে?’

‘কালিম্পং তো আমারই জায়গা। বসো বসো, যা বৃষ্টি। কিছু খাবে? চা বা কফি?’

বিষ্টুসাহেব দু’ হাত ছড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেও সেদিকে মন ছিল না অর্জুনের। ঘরে দুটো বিছানা। ব্যবহৃত হয়নি আদৌ। টেবিল বা অন্য কোথাও মানুষের বসবাসের কোনও চিহ্ন ছড়িয়ে নেই। সে মাথা নাড়ল, ‘না, কিছু খাব না। আপনি এখানে কেন?’

‘মাঝে মাঝে তো হোটেলে থাকতে ইচ্ছে হয়। এরা আমাকে খুব ভালবাসে। নাও, হাত পা ছড়িয়ে বসো। জানলাটা খুলে দিলে বৃষ্টি দেখতে পাবে। রবীন্দ্রনাথ কালিম্পং-এর বৃষ্টি দেখতে খুব ভালবাসতেন।’ চেয়ারে বসে পা দোলালেন বিষ্টুসাহেব।

অর্জুন বলল, ‘আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। ওখানে আমার পাঁচদিন থাকার কথা ছিল কিন্তু আপনি আজকেই ডেকে পাঠালেন। কী ব্যাপার?’

‘তুমি কিছু টের পাওনি? ওরা মানে আমাদের প্রতিপক্ষ সব জেনে গেছে। তুমি কে, কোত্থেকে এসেছ এ সব ওরা জেনে ফেলেছে, তুমি কী জানো?” বিষ্টুসাহেব তখনও হাসছিলেন।

‘কী করে জানল?’ অর্জুন হতভম্ব। এ খবর বিষ্টুসাহেবের কাছে এল কী করে?

‘সেটা আমিও জানি না। বসো, আরাম করো। যা হবার তা হয়েছে। অর্জুন বসল। বাইরে বৃষ্টির তেজ আরও বেড়েছে। বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘তোমরা এবার এমন সময়ে কালিম্পং-এ এলে যে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার উপায় নেই।’ কথাটা শেষ হতে জিভে একটা শব্দ করলেন তিনি, তাতে আফশোষ বোঝাল।

অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, এই ওরা কারা?’

‘জানি না ভাই। তবে শুনেছি খুব ডেঞ্জারাস।’

‘আপনি এই জন্যেই আমাকে ডেকে পাঠালেন?’

‘হ্যাঁ, বেঘোরে তোমার প্রাণ গেলে কি ভাল লাগবে?’

‘আপনি কি অমলদার কাছে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন?’

‘নিশ্চয়ই।’

‘তা হলে আমি কী করব? জলপাইগুড়িতে ফিরে যাব?’

‘যাবে কী করে? তিস্তাবাজারের আগেই বিরাট ধস নেমেছে, রাস্তা বন্ধ। মনে হচ্ছে পরশুর আগে নীচে গাড়ি নামবে না। যা বৃষ্টি।

অর্জুন হতাশ হল। ঠিক সেই সময় দরজায় শব্দ হতে বিষ্টুসাহেব তড়াক করে উঠে সেটাকে খুলতেই একটা হোটেল বয়কে দেখা গেল অর্জুনের বর্ষাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। একগাল হেসে নেপালি ছেলেটি বলল, ‘ওয়াং সাহেব পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

হাত বাড়িয়ে সেটাকে নিতে ছেলেটি চলে গেল। বিষ্টুসাহেব বললেন, ‘দোকানে ফেলে এসেছিলে বুঝি। গোয়েন্দাদের কিন্তু খুব সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু ওয়াং খুব ভাল লোক, আমার বন্ধু। আমি ওর কাছ থেকে মাঝে মাঝে বিরল জিনিস কিনি।’

অর্জুনের কিছুই ভাল লাগছিল না। সে উঠে দাঁড়াল, ‘আমি একটু ঘুরে আসছি।’

‘কোথায় যাচ্ছ? বাইরে ভীমবেগে জল ঝরছে।

বর্ষাতিটা দেখিয়ে অর্জুন বলল, ‘এটা আছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরব।’

বিষ্টুসাহেব বোধহয় আপত্তি জানাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল অর্জুন। কোথাও যাওয়ার নির্দিষ্ট ভাবনা মাথায় নেই, আসলে ওই ঘরে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন বিগড়ে যাচ্ছে। বিষ্টুসাহেব এত উৎসাহী হয়ে তাকে হোটেলে ডেকে আনলেন কেন? এটা সম্ভব, রায়সাহেব ওঁকে জানিয়েছেন অর্জুনের পরিচয় আর গোপন নেই। হয়তো সীতা তার বাবাকে বলেছে সেকথা। তাই তিনি বিষ্টুসাহেবকে বলেছেন ফিরিয়ে নিয়ে যেতে অর্জুনকে। কিন্তু তা হলে আসবার সময় রায়সাহেবকে ওরকম চিন্তিত দেখাচ্ছিল কেন? সেটা কি ওর অনুমান?

বর্ষাতিতে মাথা এবং শরীর ঢেকে অর্জুন রাস্তায় নেমে এল। ওপর থেকে নীচে চলে গিয়েছে চওড়া রাস্তা। দু’পাশে দোকান। বৃষ্টির জল ঝরনার মতো ধেয়ে যাচ্ছে নীচে। বর্ষাতি পরে বৃষ্টিতে হাঁটতে দারুণ লাগে। সূর্য নেই, বেলাও পড়ে এল, এখনই বেশ সন্ধে সন্ধে, রাস্তায় লোকজন নেই। অর্জুন হাঁটতে হাঁটতে টোবাকোর দোকানে চলে এল। একটি অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়ে কাউন্টারে বই পড়ছিল। সিগারেট ছাড়াও তামাক, চুরুট এবং পাইপ বিক্রি হয় এখানে, প্রচুর স্টক।

মেয়েটি ওকে দেখে হাসল। সঙ্গে সঙ্গে মতলব এসে গেল মাথায়। অর্জুন বলল, ‘আমাকে মিস্টার পিটার পাঠিয়েছেন। উনি কি দোকানে কিছু ফেলে গেছেন?’

‘পিটার? কে পিটার?’ মেয়েটি বিস্মিত।

‘আপনার দোকানে এসেছিলেন কিছুক্ষণ আগে। জিপ চালিয়ে।’

‘ওহো, সেই আমেরিকান ভদ্রলোক? ন্যাড়া মাথা? ওর নাম পিটার নাকি?’

অর্জুন মাথা নাড়ল। ওর ভয় ভয় হল মেয়েটা লোকটাকে কতটা চেনে। বেশি চিনলেই মুশকিলে পড়বে সে। মেয়েটিকে কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল, ‘আমাকে তো বলেছিল ওর নাম জন। পাশপোর্ট-এ যেন তাই লেখা আছে।’

‘আপনি পাশপোর্ট দেখেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। মানে উনি কিছু ডলার ভাঙিয়েছিলেন আমার ভাই-এর কাছে। ওর লাইসেন্স আছে। আমার ভুলও হতে পারে। হ্যাঁ, কী বলছিলেন যেন, ওহো, না, উনি তো কিছু ফেলে যাননি।’ মেয়েটি চারপাশে তাকাল।

অর্জুন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, ‘ঠিক আছে, আমি ওকে সে কথাই বলছি।’

দোকান ছেড়ে বৃষ্টিতে নামতেই পিছন থেকে ডাকল মেয়েটি, ‘আপনি এখনই উডল্যান্ডে যাচ্ছেন?

উডল্যান্ডটা কী বুঝতে না পারলেও মাথা নাড়ল অর্জুন। মেয়েটি বলল, ‘উনি আমাকে একটা বিশেষ তামাকের জন্য রিকোয়েস্ট করেছিলেন। তখন সেটা খুঁজে পাইনি। আজ বৃষ্টির জন্য আমি এখনই দোকান বন্ধ করব। আপনি কি দয়া করে প্যাকেটটা পৌঁছে দেবেন?

অর্জুন মাথা নাড়ল। মেয়েটি একটা ছোট্ট তামাকের কৌটো প্যাক করে তার হাতে তুলে দিতে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘দাম কত?’

‘উনি অ্যাডভান্স দিয়ে গেছেন।’

প্যাকেটটা নিয়ে রাস্তায় নেমে এল অর্জুন। ভেতরে ভেতরে সে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। পিটার কিংবা জন যাই হোক না কেন, লোকটার একটা জিনিস সে হাতিয়ে নিতে পেরেছে। বর্ষাতির পকেটে সেটাকে ঢুকিয়ে অর্জুন বাজারের দিকে এগিয়ে যেতেই চমকে উঠল। পিটার। সেই জিপটা চালিয়ে উত্তর দিকে চলে গেল। ভাগ্যিস একটু আগে লোকটা তামাকের জন্য দোকানে আসেনি, তা হলে যে কী হত কে জানে!

ঘণ্টাখানেকের আগেই হোটেলে ফিরে এল অর্জুন।

বৃষ্টিতে প্রথম কিছুক্ষণ ঘুরতে মন্দ লাগে না। তারপরই কেমন একঘেঁয়েমি এসে যায়।

ঘরের দরজায় নক করতেই বিষ্টুসাহেবের গলা কানে এল, ‘কাম ইন।’

ভেতরে পা দিতেই চমকে উঠল অর্জুন। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছেন অমল সোম। চোখ বোজা। শুধু পায়ের পাতা নড়ছে। সেই অবস্থায় তিনি বললেন, ‘খামোকা বৃষ্টিতে ভেজার কী দরকার ছিল। পাহাড়ের বৃষ্টির জল খুব খারাপ।’

অর্জুনের চমক ভাঙতে কয়েক মুহূর্ত লাগল। তারপর খুব দ্রুত স্মার্ট হবার চেষ্টা করল সে, ‘খামোকা নয়, এই তামাকটা নিয়ে এসেছি।

‘কী তামাক?’ অমল সোমের চোখ তখনও বন্ধ।

‘পিটার কিংবা জন অর্ডার দিয়েছিল, টোবাকোর দোকানে।’

‘জন স্নো।’ নির্লিপ্ত গলায় বললেন অমল সোম।

‘বোধহয় ডাকনাম পিটার।’

‘না। আমেরিকানদের লিমিটেড ডাকনাম থাকে। যেমন রবার্ট হল বব, উইলসন উইলি, এডওয়ার্ড হবে টেড, এইরকম আট-ন’টা।’

‘কিন্তু সীতা বলল, ওর নাম পিটার।’

এবার অমল সোম উঠে বসলেন, ‘আজকের খবর কী?’

অর্জুন সকাল থেকে যা যা ঘটেছিল সব খুলে বলল। অমল সোম একটু সময় নিলেন, ‘রায়সাহেবের সামনে কুকুরগুলোর পিঠে হাত দেবার কী দরকার ছিল?’

অর্জুন মুখ নিচু করল, ‘আমি তখন ঠিক বুঝতে পারিনি।’

‘ভুল, একটা ভুলই প্রচুর ক্ষতি করে দেয়। ওরা সন্দেহ করেছিল, নিশ্চিত হল! পিটার বা জনের সঙ্গে কার কার সম্পর্ক আছে ও-বাড়িতে? মানে, তোমার কী মনে হয়?’

‘সীতার আছে, হয়তো ওর সেই বুড়ি আন্টিরও আছে।’ কথাগুলো বলার সময় অর্জুনের বিস্ময় বাড়ছিল। এত কথা অমল সোম জানলেন কী করে?

এইসময় চা নিয়ে এল বেয়ারা। সে চলে যাওয়ার পর বিষ্টুসাহেব একটা প্লাস্টিকের কৌটো থেকে চানাচুর বের করে বললেন, ‘বৃষ্টির দিনে জমে ভাল। ক্লাস জিনিস। এর পরের বার একটু বেশি করে আনবেন তো?’

অর্জুনের কাছে স্পষ্ট হল। ওটা দাদুর চানাচুর। আজ সকালে বিষ্টুসাহেব তাকে যখন খাইয়েছিলো তখনই বোঝা উচিত ছিল। তার মানে চানাচুর অমলদা এনেছিলেন। অত ভোরে নিশ্চয়ই আসেননি। তা হলে কি অমলদা গতকাল ওদের পিছন পিছন রওনা হয়েছিলেন? আর আজ তাকে চলে আসতে বলাও নিশ্চয়ই অমলদার নির্দেশে।

চা খেতে খেতে অমলদা টোবাকোর প্যাকেটটা খুললেন। তারপর নাকের কাছে নিয়ে এসে নিঃশ্বাস টেনে বললেন, ‘চমৎকার।’

বিষ্টুসাহেব উল্লসিত গলায় বললেন, ‘এককালে আমি খুব পছন্দ করতাম পাইপ। মেড ইন কী দেখুন তো?’

‘কিউবা। এত বদ গন্ধ আমি জীবনে পাইনি।’ বলে হাতে সামান্য তামাক ফেলে চটকে নিয়ে জিভে ফেলতেই উঠে চলে গেলেন টয়লেটে। বেসিনে জল পড়ার আওয়াজ হল। ফিরে এসে টোবাকোর বাক্সটা বন্ধ করে বললেন, ‘কলজের জোর আছে।’

অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘কখন এসেছেন অমলদা?’

‘সন্ধেবেলায়। তোমরা চলে যাবার পর খবর পেলাম হরিমাধবের ষাঁড়গুলোকে মেরেছে একটা সাদা ন্যাড়া মাথা সাহেব। সে নাকি হরেকৃষ্ণ পার্টির লোক ধরে মন্দিরে এসেছিল। তারপর কৃষ্ণের জীবদের প্রসাদ খাইয়ে চলে গিয়েছে। একটা বুড়ি তখন গদগদ হয়ে দৃশ্যটা দেখেছিল, সেই পরে পুলিশকে বলে। আমার বাড়ির সামনেও নাকি ন্যাড়ামাথা সাহেব জিপ থামিয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাবুর বন্ধু অশ্বিনীকালী সে কথা বলল। তখনই বুঝলাম, যে এসেছিল সে রায়সাহেবকে ভালভাবে অনুসরণ করে গিয়েছে আর তোমার পরিচয় তার অজানা নয়। কারণ রায়সাহেবের ভাইকে টেলিফোন করে কেউ জিজ্ঞাসা করেছিল তিনি চলে গিয়েছেন কি না এবং গেলে সঙ্গে কে গেছেন? ভদ্রলোক জানিয়ে দিয়েছিল উনি একাই গেছেন। অতএব ওঁর ভাইপো হয়ে থাকা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং পত্রপাঠ তোমাকে ফিরিয়ে আনা দরকার।’

‘ওর নাম জন স্নো জানলেন কী করে?’

‘হোটেলে ওই নামে ঘর নিয়েছে। যাব। এখন একটু রেস্ট নাও সবাই। আমার মনে হয় বিষ্টুসাহেব, আপনার বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভাল। রাত হয়ে গেলে বৃষ্টির মধ্যে চলতে খুব অসুবিধায় পড়বেন।’ অমল সোম আবার শুয়ে পড়লেন।

‘কোনও অসুবিধে নেই। আমি তো পাশের ঘরটা বলে রেখেছি। শিবহীন চক্ষু হয়? এই কালিম্পং-এ এত বড় ঘটনা আজ রাত্রে ঘটবে আর আমি আরাম করে ঘুমাবো? ক্ষেপেছেন!

অমল সোম বোধহয় একটা রূঢ় কথা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে মত পাল্টালেন। কিন্তু অর্জুনের খুব কৌতূহল হচ্ছিল। কোন ঘটনা ঘটবে আজ রাত্রে? অমলদাকে জিজ্ঞাসা করা বোকামি হবে।

তেমন বুঝলে অমলদা নিজেই বলতেন। কিন্তু তার মনটা খুব বিষণ্ণ হয়ে গেল। অমলদা বিষ্টুসাহেবকে জানাতে পারেন আর সে হঠাৎ খুব দূরের লোক হয়ে গেল।

.

মাঝখানে বৃষ্টি থেমেছিল। আজ কালিম্পং-এ লোডশেডিং। ঘুটঘুটে অন্ধকার শহরটায় নেমেছে। মাঝে মাঝে অবশ্য বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অমলদা সেই যে টেনে ঘুম দিয়েছিল রাতের খাবারের আগে আর ওঠেনি। অর্জুনের চোখে সন্ধেবেলায় ঘুম আসেনি। যদিও কাল রাত্রে খুব কম সময় ঘুমিয়েছিল সে কিন্তু আজ বিছানায় শুয়ে খানিক বাদে উঠে পড়েছে। বিষ্টুসাহেব পাশের ঘরে ছিলেন। হোটেল থেকে বড় বড় কেরোসিনের বাতি দিয়ে গেছে। সে উঠে বাইরে বেরিয়ে বিষ্টুসাহেবের দরজায় নক্ করল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিল না। তিনবার শব্দ করার পর অন্ধকার হাতড়ে অর্জুন বুঝল ঘরের বাইরে থেকে তালা দেওয়া। তার মানে বিষ্টুসাহেব এখানে নেই।

রাত্রের খাবার ঘরেই সেরেছিল ওরা। অমলদা বললেন, ‘অর্জুন, বিটুসাহেবকে একটু ডাকো। কথাবার্তা বলা যাক।’

এতক্ষণ চুপচাপ খাবার খেয়েছে ওরা। অর্জুন ভেবেছিল আজ রাত্রে কী ঘটতে যাচ্ছে সেই ব্যাপারে অমলদা নিশ্চয়ই কথা বলবেন। কিন্তু মানুষটা এমনই যে সে-আশা ছেড়ে দিলো অর্জুন। এখন জবাবে বলল, ‘উনি তো ঘরে ছিলেন না।’

‘সেকি! বাড়ি ফিরে গেলেন নাকি?’

অর্জুন বাইরে বেরিয়ে এল। এবার দরজায় তালা নেই। শব্দ করতে ভেতর থেকে সাড়া এল, ‘হু ইজ দেয়ার।’ গলাটা কেমন সরু সরু।

‘বিষ্টু সাহেব?’

তারপরেই দরজা খুলে গেল। অর্জুন দেখল একটি টিবেটিয়ান ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। শরীরে পা ঢাকা ছুম্বা, মাথায় টিবেটিয়ান টুপি, চিবুকে সাদা সাদা দাড়ি আর চোখে স্টেনলেসের চশমা। ডান হাতে মোটা মালা নিয়ে লোকটা হাসতে অর্জুন বলতে যাচ্ছিল, স্যরি। সেই সময়েই লোকটা বলল, ‘খাওয়া হয়েছে? চিকেন?’

চমক কাটতেই অর্জুন হেসে বলল, ‘আরে আপনি? একদম চিনতে পারিনি।’

‘চেঁচিও না। হোটেলের অন্য লোকও আছে। হঠাৎ মাথায় মতলব খেলে গেল। ওয়াং-এর কাছে গিয়ে এগুলো ধার করে নিয়ে এলাম। আর ফলস্ দাড়িটা আমার কালেকশন। তোমরা তো কিছুতেই এখানে চেম্বার খুলবে না? চেনা যাচ্ছে?’

‘বিন্দুমাত্র না। আপনাকে অমলদা ডাকছেন।’

অমলদা পর্যন্ত বিষ্টুসাহেবকে দেখে অবাক। তারপর বললেন, “চমৎকার। এখন ন’টা বাজে। বৃষ্টিও নেই। আপনি তামাকের কৌটোটা নিয়ে সোজা উডল্যান্ড হোটেলে চলে যান। গিয়ে জন কিংবা পিটারকে বলুন আপনার মেয়ে এইটে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর চেষ্টা করবেন গল্প জুড়তে, অন্তত দশটা পর্যন্ত। পারবেন না?’

বিষ্টুসাহেব ঢোঁক গিললেন, ‘একাই যেতে হবে?’

‘হ্যাঁ। সঙ্গে আমরা গেলে ও বিশ্বাস করবে?’

‘তা করবে না। তবে ওরা তো খুব সাংঘাতিক।’

‘হোক না। আপনাকে তো কিছু করবে না। ওখান থেকে ফেরার সময় যা বলেছি তাই করবেন।’

‘অর্জুন আমার সঙ্গে চলুক। বাইরে অপেক্ষা করবে। বিপদ দেখলে—’

‘না, না, অর্জুনের অন্য কাজ আছে। আপনি যে মেক-আপ নিয়েছেন তাতে শিবের বাবাও টের পাবে না আপনি কে।

‘শিবের তো বাবা ছিল না কোনও কালে।’

ব্যাপারটা যে বিষ্টুসাহেবের একটুও মনঃপূত হয়নি বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু বাধ্য হয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। মিনিট পাঁচেক বাদেই অমল সোম বললেন, ‘এবার আমাদের তৈরি হতে হবে অর্জুন। এখান থেকে উডল্যান্ড হোটেল যেতে আসতে কম করে চল্লিশ মিনিট সময় লাগবে। আমি চাই না বিষ্টুসাহেবের কোনও ক্ষতি হোক।’

লোডশেডিংটা খুব বড় কারণেই হয়েছে আজ। ওরা যখন হোটেল ছেড়ে বের হল তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। রিসেপশনেও কোনও লোক ছিল না। এখন এই মুহূর্তে যদিও অন্ধকার কিন্তু অমল সোমকে চিনতে পারবে এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই। ন্যাড়া মাথা, শরীরে কালো বর্ষাতি। চুল সমেত একটি মানুষের মাথা মাত্র তিরিশ মিনিটে ন্যাড়া হয়ে গেল অর্জুনের সামনে। যতক্ষণ অমলদা মেক-আপ নিচ্ছিলেন ততক্ষণ তার কাজ ছিল শিষ দিয়ে যাওয়া, ঠোঁট সরু করে সেই সুরটি আধঘণ্টা ধরে বাজাতে হয়েছিল তাকে। মাঝে মাঝে জিভে ব্যথা হয়েছে, দম ফুরিয়েছে কিন্তু থামেনি। মেকআপ শেষ করে অমলদা বলেছিলেন, ‘গুড।’

হোটেল ছেড়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে রাস্তার বাঁকে একটা কাঠের দোতলা বাড়ি। বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে অমল সোম চাপাগলায় বললেন, ‘এটা ওয়াং-এর বাড়ি। ভারী ভাল মানুষ। জিপে উঠে পড়।

‘কার জিপ?’

‘ওয়াং-এর। আমি চাবিটি নিয়ে রেখেছি।’

হেডলাইট জ্বলতেই ঘুমন্ত শহরটা দেখা গেল। জনমানবশূন্য পথ খাঁ খাঁ করছে। অমলদার কিটস্ ব্যাগ ঠিক মাঝখানে। ওর মধ্যে যে কী নেই তাই বলতে পারা মুশকিল। পাহাড়ি রাস্তায় পাক খেতে খেতে জিপ উঠছিল। এবং তখনই বৃষ্টি নামল।

রায়সাহেবের বাড়ির অন্তত দুশো গজ দূরে গাড়িটাকে রাখলেন অমল সোম। এখানে রাস্তা সামান্য চওড়া, ডান দিকে একটু ঢুকে গেছে। গাড়িটাকে সেখানে রাখায় বড় রাস্তা থেকে নজর করা যাবে না। এখন জলের ফোঁটা আরও মোটা হয়েছে।

আলো নিভিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে অমল সোম বললেন, ‘আমাদের আজ মিথ্যাচরণ করতে হবে। কাল রাত্রে জন এসেছিল একটা নাগাদ। ও ভেতরে ঢুকেছে তারও অনেক পরে। আমার মনে হয় আজ ভোরের আগেই আসবে। কারণ মাঝ রাত্রে জিপ চালিয়ে ওর পক্ষে নীচে যাওয়ায় খুব ঝুঁকি থাকবে।’

অর্জুন বলল, ‘নীচে যাবে কী করে? রাস্তাতে ধস নেমে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’

অমল সোম চট করে মুখ ফেরালেন, ‘কথাটা একদম মনে ছিল না আমার। ইস, তা হলে তো আজ জন এদিকে নাও আসতে পারে।’

‘কাল তো এদিকে এসেছিল।’

‘কাল এসেছিল খবর দিতে। আজ আসবে ভেবেছিলাম নিয়ে যেতে।’ অমল সোম বললেন, ‘ভালই হল, নিশ্চিন্তে কাজ করা যাবে।

বৃষ্টির মধ্যেই ওরা নীচে নামল। ওয়াটারপ্রুফের তলায় সোয়েটার থাকা সত্ত্বেও অর্জুন কেঁপে উঠল। তারপর অমল সোমের সঙ্গে পা ফেলে বড় রাস্তায় চলে এল। চারপাশে কোনও প্রাণীর শব্দ নেই। কোনও গাড়ি আসছে না এই রাস্তায়। এক পাশে পাহাড় আর জঙ্গল। দূরে কিছু বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। অমল সোম বললেন, ‘কেমন লাগছে?’

অর্জুন বলল, ‘এবার পুলিশে খবর দেননি, না?’

‘না। ঘরের কেলেঙ্কারি বাইরে যাক রায়সাহেব চান না। যদি আমরা ব্যর্থ হই তা হলে বিষ্টুসাহেব তো রইলেনই পুলিশকে সব জানানোর জন্য।’

ওরা হাঁটতে হাঁটতে একটা মোড়ে এসে দাঁড়ালে অমল সোম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সোজা নেমে গেলে বাংলোর গেট, তাই না?’

অর্জুন মাথা নাড়ল।

অমলদা হঠাৎ ডান দিকে নেমে পড়লেন। নেমে বললেন, ‘সাবধানে এসো, জোঁক আছে।’

‘জোঁক বস্তুটার সঙ্গে খুঁটিমারি রেঞ্জে গিয়েই পরিচিত হয়েছিল অৰ্জুন। একবার ধরলে ছাড়ান মুশকিল। কিন্তু অমলদা এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? পথ নেই, জঙ্গল সরিয়ে পথ করে নিতে হচ্ছে। গাছের গায়ে জমে থাকা জল ছিটিয়ে পড়ছে সর্বাঙ্গে, তার ওপর সাপের ভয় আছে।

একসময় ওরা সেই পাঁচিলটার কাছে পৌঁছে গেল। আকাশে আজ এক ফোঁটাও আলো নেই। কিন্তু ঝাপসা বাংলো বাড়ি কিংবা প্রাসাদটাকে দেখা যাচ্ছে। কোনও ঘরে আলো জ্বলছে না। পাঁচিলটা এখানে বুক অবধি, তার ওপর কাঁটাতার লাগানো। চাপাগলায় অমল সোম বললেন, ‘আমরা এখানে অপেক্ষা করব। ওই ঝাঁকড়া গাছটার নীচে চল।’

ঠিক সেই সময় চাপা গর্জন কানে এল। চারটে জন্তু ভেতরে পাক খাচ্ছে, গন্ধ পেয়েছে ওরা কিন্তু বৃষ্টির জন্যই সঠিক হদিশ পাচ্ছে না। সে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কি ভেতরে ঢুকবেন?’

নীরবে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন অমলদা। আর সঙ্গে সঙ্গে শরীর হিম হয়ে গেল অর্জুনের। আজ সকালবেলায় খাঁচার বাইরে নিরপেক্ষ থেকে সে যা করেছিল তাতে অনেকটাই মজা ছিল। এখন খোলা আকাশের তলায় চারটে রাক্ষসের সামনে দাঁড়িয়ে সেই কাজটা যদি উল্টে যায়! ওরা যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে! জলে দাঁড়িয়ে শরীর অবশ হয়ে আসছিল। ওয়াটারপ্রুফের বর্ম ভেদ করে ঠাণ্ডা ঢুকছে ভেতরে।

হঠাৎ অমলদা বললেন, ‘শিষটা দাও।’

অর্জুন শিষ দিল। প্রথমে ভাল করে স্বর বের হল না! পরে সঠিক হতেই একটু শব্দ হল ওপাশের বাগানে। এবং তারপরেই জানোয়ার চারটে উদয় হল সামনে। উৎকীর্ণ হয়ে ওরা শিষ শুনছিল। অমলদা ব্যাগ খুলে চটপট কিছু বের করে ওটাকে অর্জুনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সাঁ করে অন্ধকারে মিশে গেলেন। অর্জুন সমানে সুরটা বাজাচ্ছিল। কুকুরগুলো নড়ছে না। এবং তার কিছুক্ষণ বাদেই আর একটা শিষ শুনতে পেয়ে অর্জুন থেমে গেল। কুকুরগুলো ছুটে গেল ওপাশে। অর্জুন দেখল একটা লোক যেন মাটি ফুঁড়ে ওপরে উঠে শিষ দিচ্ছে। সুরটা তার চেয়ে অনেক ভাল। কুকুরগুলো এবার চারপাশে চাকরের মতো দাঁড়িয়ে। সুর দিতে দিতে লোকটা এগিয়ে গেল বাংলোর দিকে।

কুকুরগুলো এবং মানুষটাকে আর দেখা গেল না। গাড়িটার আড়ালে ওরা মিলিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই গাছের ডালগুলো নড়ে উঠল। অর্জুন বুঝল কেউ আসছে। যে আসছে সে বেশ নিশ্চিন্ত, কারণ শব্দ করতে তার দ্বিধা হচ্ছিল না। অর্জুন কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। তবে বেশ ভারী পা এগিয়ে গেল পাঁচিলটার দিকে, যাওয়ার সময় তার শিষ বাজল। সেই সুর এবং স্পষ্ট। তারপরেই অর্জুন লোকটাকে দেখতে পেল। মাটি ফুঁড়ে সে বাগানে যেন উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে শিষ দিচ্ছে। বোধহয় কুকুরগুলোকে দেখতে না পেয়ে সে কিছুটা হতভম্ব। তারপর এক পা এগিয়ে আবার দাঁড়াল, পিটার কিংবা জন। অর্জুন এবার চিনতে পারল। ও আর একটু এগোলেই অমলদার দেখা পাবে। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলেও অমলদার ফেরার সময় মুখোমুখি হবে। অতএব যেমন করেই হোক ওকে ওখান থেকে সরানো দরকার। অর্জুন কিছু না ভেবে পেয়ে শিষ দিল। একই সুরে।

সঙ্গে সঙ্গে লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। ভীষণ চমকে উঠেছে সে। শিষটা কোত্থেকে আসছে ঠাওর করতে চাইল। তৎক্ষণাৎ চুপ করে গেল অর্জুন। পকেট থেকে কিছু একটা দ্রুত বের করে লোকটা এগিয়ে এল পাঁচিলের দিকে। অর্জুন গাছের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলল নিজেকে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে লোকটা বাংলোর দিকে ফিরে আবার শিষ দিতেই অর্জুনও শিষ দিল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা আবার ঘুরে দাঁড়াল। এবং তারপরেই একলাফে চলে গেল যেখান থেকে সে উঠে দাঁড়িয়েছিল সেখানে। বোঝা যাচ্ছে খুব ঘাবড়ে গেছে লোকটা। এবং সেই সময় একটা মূর্তিকে ছুটে আসতে দেখা গেল এদিকে।

লোকটি ঘুরে দাঁড়াল, ‘সীতা!’

‘নো।’ মেয়েটি থমকে দাঁড়াল।

‘সীতা, আমি পিটার।’

‘নো! পিটার ওখানে। কুকুরগুলোকে সামলাচ্ছে।’ মুখে হাত চাপা দিয়ে মেয়েটা দু’পা পিছিয়ে গেল। লোকটা এক পা এগোল, ‘কী যা-তা বলছ। আমাকে তুমি চিনতে পারছ না? আমি ভেতরে যাব কী করে?’

মেয়েটি এতক্ষণে বোধহয় ধাতস্থ হল, ‘কিন্তু ওই লোকটা কে? কুকুরগুলোর সঙ্গে আমার জানলার নীচে গিয়ে ডাকল যেমন তুমি ডাকো।’ সীতা এবার এগিয়ে এসে পিটারের পাশে দাঁড়াতেই অর্জুন শিষ দিল। সঙ্গে সঙ্গে পিটার মুখ ফিরিয়ে বাইরের জঙ্গলটাকে দেখল। তারপর বলল, ‘আমরা ফাঁদে পড়েছি। লেটস রান।’ সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেল পিটার এবং তারপর সীতা। অর্জুন বুঝতে পারছিল না যে এবার কী করবে। কারণ অমলদাকে দেখা যাচ্ছে না। এবং তখনই অমল সোম বেরিয়ে এলেন বাংলোর আড়াল থেকে। অর্জুন অনুমান করল পাঁচিলের নীচে নিশ্চয়ই গর্ত আছে। তৎক্ষণাৎ অমলদা চলে এলেন গাছের তলায়, ‘চল, আর দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে!’

অর্জুন উত্তেজিত গলায় বলল, ‘কিন্তু ওরা পালিয়েছে এদিক দিয়েই।’

‘জানি। কুকুরগুলোকে লক-আপে ঢোকাতে দেরি হয়ে গেল। চল।’

একদম ব্যস্ত না হয়ে অমলদা বড় রাস্তায় চলে এলেন। ওরা যখন সামনে তাকাল তখন একটা গাড়ি নীচে নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টিতেও তার আলো দেখা যাচ্ছিল। অর্জুন উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘অমলদা!’

‘তুমি তো বললে ধস নেমে পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই না?’

নিরুদ্বেগ পায়ে ওরা গিয়ে জিপে উঠল। অমলদা বলল, “পিটারের বিরুদ্ধে এতদিন কোনও অভিযোগ করলে আইনে টিকতো না। যে কোনও বিদেশি এখানে আসতে পারে অনুমতি নিয়ে। কিন্তু সঙ্গে অস্ত্র রাখতে পারবে না।’

‘ওর কাছে অস্ত্র ছিল।

‘সেটা এইমাত্র জানতে পারলাম। রায়সাহেবের মেয়েকে ও ইলোপ না করা পর্যন্ত কোনও চার্জ আনা যেত না। আর আজ সে এসেছিল সীতাকে জানাতে, দু’দিন অপেক্ষা করতে হবে পালানোর জন্য। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে ওকে আজ সীতাকে নিয়ে যেতে হল। চল থানায় যাই।’ অমলদা জিপটাকে চালু করলেন।

অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন?’

‘ওখানে বিষ্টুসাহেব আছেন। ওকে বলেছিলাম সেইখানেই থাকতে। থানার গায়ে বিরাট হ্যাজাক জ্বলছে। এবং গোটা তিনেক গাড়ি। অর্জুন অমলদার সঙ্গে ভেতরে ঢুকতেই বিষ্টুসাহেব এগিয়ে এলেন। ‘মেয়েটা যে কী কুৎসিত দেখতে কি বলব।’ অমলদা বললেন, ‘ও সি কোথায়?’

‘ভেতরে। ঠিক বাজারের মুখেতেই ওদের ধরে ফেলা হয়েছে। দু’বার গুলি চালিয়েছিল। একটা আমার ঠিক কান ঘেঁষে।’ মাথায় হাত বোলালেন বিষ্টুসাহেব! ‘গুলি করে উন্ডেড করতে ধরা দিল।’

এই সময় ও সি বাইরে বেরিয়ে আসতেই বিষ্টুসাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার নাম শুনেছি। সেই দূরবীন দাঁড়ার কেসটা তো। কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই স্বীকার করছে না ওকে ইলোপ করা হয়েছিল। কেস তো টিকবে না।’

অমলদা বললেন, “নিশ্চয়ই, পিটার গুলি চালিয়েছে, হত্যা করতে চেয়েছিল, বে-আইনি আর্ম রেখেছিল এটাই যথেষ্ট। মেয়েটিকে ওর বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। আপনার কেস পিটারের বিরুদ্ধে, মেয়েটির উল্লেখ না করলেই হল।’

ও সি বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। হেসে বললেন, “ঠিক আছে। রায়সাহেবকে বলবেন আমাদের কথা মনে রাখতে।’

ওঁর নির্দেশে একজন সেপাই সীতাকে নিয়ে আসতেই চমকে উঠল অর্জুন। মাথায় চুল নেই। সকালে যে লম্বা চুল দেখেছে সেটা কি পরচুল? এখন কানের ওপর থেকে অনেকখানি দু’পাশে কামানো। শুধু মাঝখানে সরু ছাঁটা চুল কুৎসিত করেছে মুখটাকে। অর্জুনকে দেখামাত্র তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। থুক করে থুথু ফেলল। সেপাইটা যখন তাকে জোর করে বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন অর্জুনের চোখের সামনে সেই ছবিটা ভেসে উঠল। পাক্‌ বইটার রঙিন প্রচ্ছদের মেয়েটিই যেন এইমাত্র হেঁটে গেল তার সামনে দিয়ে!