জুতোয় রক্তের দাগ – ৯

৯.

সন্ধের পর মার্শাল মেজর এবং অর্জুনকে বোঝাচ্ছিল, তোমরা আমাকে ভুল বুঝো না। আমি যখন প্রথম এই দ্বীপে আসি, তখন আমার সঙ্গে জনাচারেক সহযোগী ছিল। জলের তলায় মুক্তো নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম আমরা। তীরের লোকজনও সেই খবর জানত কিন্তু কেউ বিরক্ত করেনি। এরপর হঠাৎই আমাদের হুমকি দেওয়া হল উড়ো চিঠিতে, যেন অবিলম্বে এই দ্বীপ ছেড়ে চলে যাই। প্রথমে ব্যাপারটাকে পাত্তা দিইনি। হঠাৎ একদিন সমুদ্র থেকে ফিরে এসে দেখি কেউ এসে আমাদের টেন্ট জ্বালিয়ে জিনিসপত্র ভেঙে রেখে গিয়েছে। বাধ্য হয়ে পুলিশকে খবর দিলাম। তারা তাদের মতো তদন্ত করল। করে জেটির একজন গুণ্ডাকে ধরল। সে বলেছিল এই কাজ করার জন্যে তাকে টাকা দেওয়া হয়েছে কিন্তু বিনিয়োগকারীকে সে চেনে না। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর লোকটার মৃতদেহ সমুদ্রের জলে পাওয়া গেল। এরপর এক রাত্রে আমার এক সহকারীকে গুলি করা হল। গুলি ভেসে এসেছিল দ্বীপের বাম প্রান্ত থেকে। ছেলেটির হাতে গুলি লাগে। তখন আমি একটা এজেন্সির শরণাপন্ন হলাম। এখানে যে সমস্ত গার্ড দেখছ, তারা ওই এজেন্সির লোক। কয়েকবার এদের সঙ্গে গুণ্ডাদের লড়াই হয়েছে। তারা এগোতে পারেনি। এদের আমি যে হুকুম দিয়েছি তা আমাকেও মান্য করতে হবে, এজেন্সির সঙ্গে আমার চুক্তি সেইরকম। ওরা তোমাদের কীরকম পরিস্থিতিতে বাধা দিয়েছে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ। কিন্তু ব্রাউন লোকটাকে ওরা এসকর্ট দিয়ে বাইরে পাঠিয়েছিল আমার বিশেষ বন্ধু ভেবে ভুল করে। একে যেতে নিষেধ করো। নইলে ওর জীবন বিপদগ্রস্ত হতে পারে।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “এই গুণ্ডাগুলো কারা?”

“ব্যাপারটা রহস্যময়। মনে হচ্ছে এই সমুদ্রে আমি কাজ করি ওরা চায় না। হয়তো ভেবেছে সমুদ্রের তলায় প্রচুর মুক্তো আছে। আমাদের তাড়ালেই সেগুলো পাবে।”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “সমুদ্রে মুক্তো পাচ্ছ না?”

“আরে না। আমি সেই চেষ্টাও করিনি। এখানকার সমুদ্রের জলে মুক্তোর শার্পনেস বেড়ে যায়। আর্টিফিসিয়াল মুক্তোর চাষ পৃথিবীর সব দেশেই হয়। আর্টিফিসিয়াল মুক্তো আর অরিজিনাল মুক্তোর মধ্যে গুণগত পার্থক্য আছে।

মুক্তো নিয়ে যারা চাষ করেন, তাঁরা এসব জানেন। সাধারণ মানুষের কাছে কিন্তু এখনও অরিজিনাল মুক্তোর দামই বেশি। আমি ঝিনুকের বুকে মুক্তো জন্মাবার আগেই একটা রিঅ্যাকশান সৃষ্টি করতে চাইছি, যার ফলে মুক্তোর রং পালটে যেতে বাধ্য। রেড পার্ল-এর রং টকটকে লাল করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হতে যাচ্ছে। কিন্তু গুণ্ডাদের উপদ্রব যেই কমল, অমনি আর-এক ঝামেলা শুরু হয়েছে। সমুদ্রে কখনও শার্ক কেউ দ্যাখেনি। একটি অতিকায় শার্ককে প্রায় ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। আজ দুপুরেই সেইরকম খবর পেয়ে আমি সমুদ্রে নেমেছিলাম।”

অর্জুন মন দিয়ে শুনছিল। জিজ্ঞেস করল, “আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?”

“হ্যাঁ। তার চেহারা এত বিশাল যে, ছোট লঞ্চকেও ডুবিয়ে দিতে পারে। আমরা সহযোগীরা মানুষকে ভয় পায়নি কিন্তু ওই দানবটার ভয়ে চট করে কেউ জলে নামতে চাইছে না।”

“আপনি কীভাবে জলের নীচে কাজ করেন?”

“আমার একটা ছোট্ট সাবমেরিন আছে। নীচে নেমে যাওয়ার পর ডুবুরির পোশাক পরে অক্সিজেন মাক্স নিয়ে কাজ শুরু করি।

অর্জুন ভাবল মার্শালকে ব্রাউনের দেখা শার্কটার কথা বলবে কি না। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা গোপন রাখাই ঠিক করল। সে জিজ্ঞেস করল, “পুলিশকে জানাননি কেন?”

“জানাতে পারতাম। তবে সে-ক্ষেত্রেও আর-এক ধরনের লোভ কাজ করছে?”

“লোভ?”

“হ্যাঁ। মেজর জানে আমি আসলে অভিযাত্রী। এতবড় একটা শক্তি আমার কাছাকাছি ঘুরছে, যার অস্তিত্ব কয়েকশো বছর আগে ছিল, তাকে পুলিশ দিয়ে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে না। দানবটাকে যদি আমি জ্যান্ত ধরতে পারি তা হলে সবচেয়ে খুশি হবে।”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “সেই চেষ্টা করেছ?”

“করেছি। কয়েকবার ঘুমপাড়ানি বুলেট ছুঁড়েছি। দানবটার চামড়া এত শক্ত যে, বুলেটে কোনও কাজই হয়নি। চোখে মারতে পারলে হত। কিন্তু অত সুন্দর দানবের চোখ যদি নষ্ট করে দিই, তা হলে ওর কী থাকল। যা হোক, তোমরা কি আমার সঙ্গে জলের নীচে নামতে চাও?”

মেজর বুক ফুলিয়ে বললেন, “অবশ্যই।”

“মৃত্যুভয় আছে কিন্তু।” সতর্ক করল মার্শাল।

“ওটা আমাকে দেখিও না।” মেজর হাসলেন, “দানবটাকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব।”

অর্জুন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। আজ রাত্রেই একবার ব্রাউনকে নিয়ে দ্বীপের ওদিকটায় যেতে হবে। গুণ্ডারা থাকলে শার্ক কেন আসবে? ব্যাপারটা কি নেহাতই কাকতালীয়?

প্রোফেসর হ্যাচ মূর্খ মানুষ নন। সাপ পোষেন। সেই সঙ্গে শক্তিমান মানুষজন। তিনি কেন এই সমুদ্রসৈকতে আসবেন? শুধু অর্জুনদের অনুসরণ করে এলে নিশ্চয়ই তাদের পেছনে রেখে আগে এখানে আসতেন না। সেই হোটেল থেকে অর্জুনরা অন্য কোথাও চলে গেলে অধ্যাপক তার খোঁজ পেতেন না। উনি নিশ্চয়ই সন্দেহ করেছেন, তাদের কাছে এমন কিছু জিনিস আছে যা তাঁর খোঁজার পরিশ্রম লাঘব করে দিতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, একমাত্র ব্ল্যাকপুলের রাস্তা থেকে ব্রাউনকে মেজর ভেবে তুলে নেওয়া ছাড়া তিনি কখনওই সরাসরি আক্রমণ করেননি।

কিন্তু এই সমুদ্রে কেন প্রোফেসর হ্যাচ আগ বাড়িয়ে এলেন? পাল-তোলা নৌকোর দৃশ্যটা মনে পড়তেই উত্তেজিত হল অর্জুন। সঙ্গে-সঙ্গে অমল সোমের সতর্কবাণী স্মরণে এল, কোনও ঘটনার দ্বারা বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন হতে দিও না। কিন্তু তা হত্ত্বেও ওর মনে হল, মার্শাল এখানে মুক্তো নিয়ে গবেষণা করুক তা যারা চায় না, তাদের মধ্যে হ্যাচও আছেন। হয়তো এই সমুদ্রে তারা নিরিবিলিতে কোনও কাজ করতে চায়। অবশ্য এসবই সত্যি হবে যদি মার্শাল মিথ্যে না বলে। অর্জুন কোন কূল পাচ্ছিল না।

রাত দশটা বাজলে দ্বীপে কোনও মনুষ্য-কণ্ঠ শোনা গেল না। শুধু হাওয়ার সঙ্গে গাছপাতার সংঘাতের শব্দ দ্বিগুণ হয়ে বাজছিল। রাতের খাওয়া শেষ করেই ব্রাউন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। লোকটাকে তখন কিছু বলেনি অর্জুন। চারপাশ আরও শব্দহীন হয়ে এলে সে ব্রাউনের ঘুম ভাঙাল। কম্বল সরিয়ে অবিকল মেজরের মতো মুখভঙ্গি করে ব্রাউন জিজ্ঞেস করল, “কী হল, অ্যাঁ?”

একই ধরনের মুখের গড়ন এবং দাড়ি মাঝে-মাঝে অর্জুনকেও বিভ্রান্ত করে। সে গম্ভীর গলায় বলল, “চেঁচাবেন না। উঠে পড়ুন। চুপচাপ।”

ব্রাউনের তবু হুঁশ ঠিক হচ্ছিল না। মাথা তুলতে তুলতে বলতে লাগল, “এইসব ইয়ার্কির কোনও মানে হয়! সবে হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু দু-চোখ বুজেছি,আর অমনি….! না হয় আমি একটু গায়ে পড়েই দলে ঢুকছি, তা বলে মাঝরাত্তিরে ঘুমোতেও পারব না?”

কথা বলার ধরনে হাসি পাচ্ছিল অর্জুনের। সে জিজ্ঞেস করল, “হাড়ভাঙা খাটুনি কখন খাটলেন?”

“বাঃ। তোমরা যখন মার্শালের তাঁবুতে আড্ডা মারছিলে আমাকে বাদ দিয়ে তখন?”

“কীরকম?”

“আমি ওদের বললাম, জগিং করব।”

“কাদের?”

“এই মার্শালের পাহারাদারদের। বললাম জগিং না করলে শরীর খারাপ হয়। তা ওরা বলল, আমি এই তাঁবু থেকে কিচেন পর্যন্ত জগিং করতে পারি। মেনে নেমে নিলাম। একবার সেই ফাঁকে কিচেনে ঢুকে চিকেন স্যান্ডুইচ খাচ্ছি এমন সময় কুকটার নজরে পড়লাম। ও ব্যাটা আমাকে দেখে হতভম্ব। ম্যাঞ্চেস্টারের একটা রেস্টুরেন্টে রান্না করত। রেস্টুরেন্টের মালিক খুন হবার পর তিনজনের সঙ্গে পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করে। তিন বছর ঘানি ঘুরিয়েছে ব্যাটা। সেই শ্রীমান আমাকে দেখে হাতে-পায়ে ধরেছে। বলেছে যত ইচ্ছে খাও, কিন্তু মার্শালকে বোলো না। আমি এখন ভাল হতে চাই।”

“আপনি তো কিছু বলেননি?”

“না। ভেবে দেখলাম, মানুষকে ভাল হবার সুযোগ দেওয়া উচিত। এই যেমন তোমরা দিচ্ছ।”

ব্রাউন নিজের বুকের ওপর একটা আঙুল রেখেই মাথা নাড়ল, “কিন্তু তাই বলে ঘুম ভাঙানো ভারী অন্যায়।”

“খাওয়া তা হলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম?”

“না। কুক আমাকে নিয়ে গেল ওর তাঁবুতে। এখান থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে গেলে প্রথম তাঁবু। গিয়ে বলল, “আসুন আলুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে গল্প করি। সেটা যে কী পরিশ্রমের!”

“কী গল্প করলেন?”

“এই মার্শাল লোকটার সঙ্গে যারা আছে, তারা সবাই বড়লোক হতে চায়। ঝিনুকের এক্সপেরিমেন্ট সফল হলেই সব ক’টা ঝাঁপিয়ে পড়বে। খবরটা গুরুত্বপূর্ণ নয়?”

অর্জুন হাসি চাপল, “তা বটে। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যাপারে কিছু বলল না?”

“হ্যাঁ। ওকেও বন্দরে যেতে দেয় না। সমুদ্রে নামতে দেয় না দিনের বেলায়।”

“রাত্রে?”

“দেয়। একবার সব কাজ শেষ করে স্নান করতে দেয়।”

“সেটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে হয়ে গেছে।”

ব্রাউন কাঁধ ঝাঁকিয়ে নীরবে বলল, সে জানে না।

অর্জুন বলল, “উঠুন, বেরোব।”

“বেরোব? এত রাত্রে?”

“আপনাকে আমি বলেছিলাম।”

“হ্যাঁ। কিন্তু এখন কোথায় যাব আমরা?”

“যেখানে দিনের বেলায় গিয়েছিলেন। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলুন।”

“কিন্তু ওরা যে পাহারা দিচ্ছে!”

“দেখাই যাক না। পোশাক পরে নিন।”