॥ এগারো।।
মেয়েটি এবার বাঁ দিকে বাঁক নিতেই অর্জুন বুঝল, ডানদিকেই বাস স্ট্যান্ড। কিন্তু এই রাত্রে মানালির পথে একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। দু’পকেটে হাত ঢুকিয়ে মেয়েটি হেঁটে যাচ্ছে মাথা ঝুঁকিয়ে। কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না তা মোটেই ভাবছে না।
খানিকটা যাওয়ার পর একটা গর্জন কানে এল। চাপা কিন্তু গম্ভীর। এবং তারপরেই সে দেখতে পেল নদীটাকে। এই শীত এবং বরফ-জমানো ঠাণ্ডাতেও জল পড়ছে পাথরের ওপর আছড়ে। শব্দ হচ্ছে তাই। নদী মোটেই চওড়া নয়, কিন্তু তার জলের গতি খুব। বোধহয় সেই কারণেই নদী বরফ হয়ে যাচ্ছে না।
মেয়েটি বাঁক নেবার মুখে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর সন্তর্পণে পেছন ফিরে তাকাল। অর্জুন তৈরি ছিল। মেয়েটি দাঁড়ানো মাত্র সে একটা গাছের আড়ালে চলে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারল, মেয়েটি সন্দেহ করেছে। কিংবা এমনও হতে পারে, শুধু সতর্কতার জন্যে পেছন ফিরে তাকিয়েছে।
অর্জুন দেখল মেয়েটি আবার হাঁটা শুরু করেছে। নদীর ওপর সেতু, মেয়েটি সেতুর ওপর দাঁড়াল। যেন মুগ্ধ হয়ে নির্জন নিসর্গ দেখল। তারপর দ্রুত হাঁটতে লাগল ওপাশের পাহাড়ের রাস্তায়। এই পথটুকুতে কোনও আড়াল নেই। নদীর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অথচ মেয়েটি বেশি দূরে চলে গেলে অনুসরণ করা বিফলে যাবে।
অর্জুন ঝুঁকি নিল। মাথা নিচু করে সে দ্রুত চলে এল সেতুর ওপরে। কী প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এখানে। অর্জুনের মনে হল ওর মুখ অসাড়। তারপর সামনের পথে পা দেওয়ামাত্র মেয়েটিকে দেখতে পেল। বাঁ দিকের একটা বিশাল কাঠের বাড়ির মধ্যে যেন মুহূর্তেই উবে গেল সে। বাড়িটার গায়ে কয়েকটা ভাঙাচোরা কাঠের দোকান আছে। দোকানগুলোকে এখন ভুতুড়ে বলে ঠেকছে। এখানে আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এবং তারপর অমলদার নির্দেশমতো ফিরে যাওয়ার কথা। পাহাড়ের একটা খাঁজ দেখে অর্জুন যতটা সম্ভব নিজেকে আড়াল করে দাঁড়াল।
পেঁজা বরফ খুব নিঃশব্দে পড়ে না। কান পেতে শুনলে তারও একটা মৃদু শব্দ পাওয়া যায়। যতক্ষণ হাঁটাহাঁটি ছিল, ততক্ষণ এরকম, দাঁড়ানোর পর ঠাণ্ডা দ্বিগুণ হল। পকেটে হাত ঢুকিয়ে কাঁপছিল অর্জুন। এমন সময় সেতুর ওপর দুজন মানুষ দেখা গেল। সেই দুজনের পেছনে আরও দুজন। চারটে চলন্ত কালো দাঁড়ি যেন। ক্রমশ ওরা সামনে এগিয়ে এল। প্রথম দু’জন যে পুরুষ, তা বোঝা যায়। পেছনের একজন মহিলা এবং …অর্জুন ঢোঁক গিলল। এরাই তাহলে জন আর জিনা। হুবহু এক মুখ, যেরকমটা ফোটোগ্রাফে দেখেছিল। যমজ ভাইবোন। লোকদুটোর সঙ্গে হেঁটে বাড়িটার মধ্যে ঢুকে গেল।
অর্জুনের এবার সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল। এই ঠাণ্ডা, এবং ঘটনা যেভাবে বাঁক নিচ্ছে, তাতে, ও খুব নাভার্স হয়ে পড়ছিল। চারধারে একটা পানসে আলো, যাতে সব কিছু রহস্যময় মনে হচ্ছে। ঠিক তখনই একটা আর্ত চিৎকার বাড়িটা থেকে ভেসে আসতে গিয়েই যেন থমকে গেল। চিৎকারটা এমন যে, বুকের মধ্যে কিছু ছটফটিয়ে উঠল। তারপরেই অর্জুনের খেয়াল হল চিৎকারটা কোনও মেয়ের গলা থেকে বেরিয়েছে।
অর্জুন বাড়িটার দিকে তাকাল। প্যাগোডা ধরনের কাঠের বাড়ি। ছাদও কাঠের। এবং সমস্ত বাড়ির গায়ে তুষারের আস্তরণ। বাড়িটার গায়েই একটা কাঠের দোকান। হঠাৎ অর্জুনের মনে হল, দোকান এবং বাড়িটার মাঝখানে কিছু একটা নড়ল। যেন কেউ ঢুকে খুব দ্রুত ছায়ার মধ্যে মিশে গেল। আর্তনাদটাকে স্তব্ধ করার পর আর কোনও আওয়াজ বাড়ি থেকে বের হয়নি। রাস্তার এপাশ থেকে ওটাকে নিরীহ এবং ঘুমন্ত বলে ঠেকছে।
ছায়া থেকে একটা দড়ি ছিটকে বেরিয়ে ওপারের কাঠে লেগে গেল হুকের কল্যাণে। অর্জুন শক্ত হয়ে দাঁড়াল। কাঠের ওপর তুষার ছিল, কিন্তু তবু অর্জুনের মনে হল সে একটা শব্দ শুনেছে। দড়িটা যে ছুঁড়ল, ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকায় তাকে দেখা যাচ্ছে না। অর্জুন বুঝল প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে লোকটা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই ঠাণ্ডায় প্যাগোডা-বাড়ির ছাদে দড়ি ছুঁড়তে যাচ্ছে কেন লোকটা? তাহলে কি ওই বাড়ির বাসিন্দাদের বিরোধী কেউ?
অর্জুন আরও একটু অপেক্ষা করার পর একটা লোককে এবার স্পষ্ট দেখতে পেল। লোকটির আপাদমস্তক মোড়া। দড়িটা পরখ করছে। তারপাশে আর-একজন এসে দাঁড়াল নিঃশব্দে। খানিকটা তাকানোর পর দাঁড়াবার ভঙ্গিতে অর্জুন চমকে উঠে সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে দৌড়তে লাগল রাস্তাটা পেরোবার জন্যে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অমল সোমের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল সে। ঘন তুষারের ওপর দিয়ে দৌড়নো যে কী মারাত্মক, এর মধ্যেই টের পাওয়া গেছে। একটা রিভলভার এবং একটা চুরি ওর দিকে উঁচিয়ে আছে। সে কোনরওরকমে বলল, “আমি অর্জুন।
অস্ত্রগুলো নামল। অমলদা চাপা গলায় বললেন, “এভাবে দৌড়ে এলে কেন?”
“কেউ নেই।” অর্জুন চাপা গলায় বলল।”
“ইউ ডোন্ট নো। অমলদা যে বিরক্ত হয়েছেন, তা স্পষ্ট বোঝা গেল। “কেউ হয়তো ঘাপটি মেরে রয়েছে। কিছুক্ষণ দেখা যাক।”
অর্জুন নিশ্বাস চেপে অন্য লোকটির দিকে তাকাতে সে হাসল। হাতকাটা স্মাগলার। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচবার জন্যে আপাদমস্তক মুড়েছে। শুধু তুষারপাতের শব্দ চলছে। অর্জুন অমল সোমকে বলল, “জন আর জিনা এই বাড়িতে ঢুকেেছ।”
“স্বাভাবিক।” অমল সোমের ঠোঁট দুটো নড়ল, “তুমি পারবে?”
“কী?”
বেড়ালের মতো ওই দড়িটা বেয়ে ছাদে উঠে যেতে হবে। সামান্য শব্দ যেন না হয়। ছাদের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট জানলা…” অমলদা চাপা গলায় কী করতে হবে জানিয়ে দিলেন। আর অর্জুনের মনে হল, এই প্রথম সে ঠিক কাজের মতো কাজ পেল। সে ওই মুহূর্তে ভুলে গেল, এসব কাজের জন্যে তার কোনও ট্রেনিং নেওয়া নেই। অমলদার ইতস্তত ভাবটাকে সে জেদের বশে উড়িয়ে দিল। সেই মুহূর্তে অমলদাদের সমস্যা ছিল ওপরে ওঠা নিয়ে। হাতকাটা ছেলেটির পক্ষে ব্যালান্স রাখা মুশকিল বলে অমলদা নিজেই উঠবেন ঠিক করেছিলেন। অর্জুন আসায় সমস্যা সরল হল।
ছাদের প্রথম পাটে পা রাখার পর অর্জুনের মনে হল, কলজে ফেটে যাবে। দম বন্ধ হয়ে আসছে, শীত উধাও। দড়ি বেয়ে খাড়া ওঠা যে কঠিন কর্ম, তা স্বীকার না-করে উপায় নেই। শুধু উঠলেই চলবে না, নিঃশব্দে থাকতে হবে। অর্জুন ঝুঁকে দেখল, অমলদারা নেই। সে এবার ওপরের দিকে তাকাল। কাঠের ওপর বরফ, খাঁজে খাঁজে পরিষ্কার। এই খাড়াই ছাদে হাঁটা যাবে না। দড়িটাকে গুটিয়ে নিয়ে ছাদ থেকে খুলতেই সে হুকটাকে দেখতে পেল। স্টিলের ছোট হুকের গায়ে রবার মোড়া।
ক্রল করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে থমকে গেল অর্জুন। একটা ঘষটানির শব্দ হচ্ছে। এই শব্দ বেশি হলে বাড়ির ভেতরের মানুষ সন্দেহ করবে। সোজাসুজি পা ফেলা শক্ত। বরফের পিছলে যাবার সম্ভাবনা খুব বেশি, এবং তা হলে শুধু যে হাড়গোড় ভেঙে সে পড়ে যাবে, তা নয়, সমস্ত পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে। কিন্তু এ ছাড়া তো উপায় নেই।
অর্জুন সামান্য দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ওপরের কার্নিস স্পর্শ করল। তারপর শরীরটাকে শূন্যে ঝুলিয়ে ওপরে উঠে এসে সতর্ক চোখে তাকাল। চারিদিকের জমাট সাদার ফাঁকে ফাঁকে তুষার জমেনি এমন সব জায়গা উঁচিয়ে আছে। সেগুলোকেই কালো দেখাচ্ছে। বিদেশি ছবির মতো ছায়া এবং আঁধার মাখা দৃশ্য সামনে। হঠাৎ নীচে শব্দ হল। অর্জুন বুঝল দরজা খুলল। একটা আলো বাইরে এসেই মিলিয়ে যেতে অর্জুন কার্নিসের ভাঁজে শুয়ে পড়ল। এবং এই প্রথম সর্বাঙ্গে তুষার মাখল তার। শরীরের তলায় এবং ওপরে।
তারপরেই সে লোকটাকে দেখতে পেল। লম্বা ঢ্যাঙা লোকটা বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মিনিটখানেক দাঁড়াবার পর সে বাড়িটার দিকে তাকাল। অর্জুনের বুকে দুরমুশ পিটছিল কেউ। নিশ্বাস বন্ধ করে পড়ে ছিল। লোকটা যদি খেয়াল করে, তাহলে ধরা না পড়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু বাড়ির যেদিকটায় অমলদারা ছিল, লোকটা সেদিকে এগিয়ে গেল পকেটে হাত রেখে। অর্জুন জানে, অমলদা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। লোকটা কাউকেই খুঁজে পাবে না।
মিনিটখানেক কেটে যাওয়ার পর আবার লোকটাকে দেখা গেল। এবার সে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে গেল। অর্জুন ওপরে যাওয়ার জন্যে শরীর তুলতেই বুঝতে পারল হাত পা জমে গেছে, সাড় নেই।
প্রায় মিনিট দশেকের চেষ্টায় সে যখন ধোঁয়া অথবা আলোর জন্যে তৈরি কাচের জানলাটার পাশে এসে দাঁড়াল, তখন তার চেহারা চেনা শক্ত হত। সমস্ত শরীরে সাদা স্ট্যাম্প পড়ে গেছে। অর্জুন জানলার কাচে চোখ রেখে কিছুই দেখতে পেল না। ঝাপসা কাচটা ধরে একটু জোরে চাপ দিতেই সেটা নড়তে লাগল। কিছু তুষার ঝুপঝুপ করে গড়িয়ে পড়ল ছাদে। অর্জুন কিছুক্ষণ সিঁটিয়ে বসে থাকল। তারপর আবার কাচটা ধরে টানতে লাগল। হয়তো পুরনো বাড়ি বলে কিংবা ফ্রেমটা কমজোরি হয়ে আসায় হঠাৎ কাচ খুলে এল হাতে। সন্তর্পণে একটা খাঁজে কাচটাকে শুইয়ে রেখে অর্জুন মুখ ঢোকাল গর্তে।
অর্জুন চারপাশে আবার নজর বোলাল। সাদা লেপ মুড়ি দিয়ে রয়েছে মানালি। কোথাও কোনও শব্দ নেই। সে ধীরে-ধীরে গর্তের খাঁজে পা রাখল। জায়গাটা ঘুটঘুটি, অন্ধকার। তবু খাঁজে-খাঁজে পা রেখে সে অনেকটা নেমে আসতে পারল। আর তারপরই টের পেল পায়ের তলায় কিছু নেই। অর্থাৎ সে ঘরের ছাদের সীমায় চলে এসেছে। কোনওরকমে ঠেশ দিয়ে না-দাঁড়ানো না-বসা অবস্থায় অর্জুন নীচের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হল। কেউ দ্রুত হাতে দরজা খোলা মাত্র একটা আলো ঘরে এল। টাকমাথা কিংবা ন্যাড়া একটা শরীর সেই আলো নিয়ে দু’পা এগিয়ে জিজ্ঞেস করল, “হাই! হোয়াটস্ রং?”
নিশ্বাস বন্ধ করে শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় অর্জুন দেখল, ঘরে একজন শুয়ে আছে। প্রশ্ন করা সত্ত্বেও সে কোনও উত্তর দিল না। গলা শুনে ততক্ষণে অর্জুন বুঝে গেছে, প্রশ্ন যে করেছে, সে মেয়ে। মেয়েটি আর একটু আলো তুলে এগিয়ে এল, “আমি আর জন আজ এখানে পৌঁছে গেছি। তুমি কেন পাগলামি করছ? জীনটাকে উপভোগ করো। একটু পরেই একজন গুরু আমাদের হোলি লেকচার দেবেন, তুমি শুনবে?”
উত্তর না পেয়ে মেয়েটি রাগত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। ও যদি একবারও ওপরের দিকে তাকাত তাহলে আর রক্ষে থাকত না। অর্জুন এবার প্রচণ্ড হাততালির শব্দ শুনতে পেল। আশপাশের কোনও ঘর থেকেই ওই শব্দটা এল। জন এবং জিনা। এই মেয়েটি তাহলে জিনা। এরাই পঙ্গু সেজে এল? মাথা আগেই কামানো ছিল? নিজেকে খুব বোকা মনে হল।
মিনিট তিনেক যাওয়ার পর অর্জুন কোমর থেকে দড়িটা খুলে হুকটা জড়িয়ে রাখল গর্তে খাঁজে। তারপর দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল নীচে। স্বচ্ছেন্দে তার পা ঠেকে গেল নীচের কাঠের মেঝেতে। দড়িটা ওপর থেকে ঝুলছে, লুকোবার কোনও জায়গা নেই।
ঠিক তখনই ইংরেজিতে প্রশ্ন হল, “কে?” খুব ক্ষীণ গলার স্বর। অর্জুন আবছা শরীরটার কাছে পৌঁছে চাপা গলায় বলল, “সীতা! আমি অর্জুন।”
“হু দ্য হেল আর য়ু?” এবার কন্ঠস্বর তীক্ষ্ণ।
“সীতা! তুমি সীতা নও?”
“ইয়া।”
“আমি অর্জুন। কালিম্পংয়ে তোমাদের বাড়িতে ছিলাম ক’দিন। তোমার বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তোমার কিছু মনে নেই?” অর্জুন যেন দিশেহারা।
‘আই সি! সেই অর্জুন! তুমি মহাভারত, আমি রামায়ণ, এক জায়গায় এলাম কী করে? দে উইল কিল য়ু। পালাও।”
“তোমার বাবা আমাদের ডেকেছেন তোমায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। কথা বলতে বলতে অর্জুন এবার বাঁধনগুলো দেখতে পেল। সীতার দুটো পা এবং হাত বাঁধা। আবছা আঁধারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু শরীরের আদল স্পষ্ট।
“তুমি এখানে কী করে এলে?” সীতার কন্ঠস্বর এবার অন্যরকম।
অর্জুন আর কথা না-বাড়িয়ে দ্রুত বাঁধন খুলে দিল, “তোমার এই অবস্থা কেন?”
“আজ শেষ দিন ছিল।”
“কিসের?”
“আমি যদি ওদের সঙ্গে ফিরতে না চাইতাম, তাহলে আজ রাত্রেই…”
সীতার গলা কেঁপে উঠল। অর্জুন ওকে ধরে দাঁড় করাল। দীর্ঘদিন শুয়ে থাকায় বেচারার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। ওকে বসতে বলে অর্জুন নিঃশব্দে দরজার দিকে এগোল। সামনেই লম্বা করিডর। একটা বড় মোমবাতি জ্বলছে। তারই কাঁপা আলোয় অর্জুন খানিকটা এগোতেই একটা দরজার পাশে দাঁড়াতে চমকে উঠল। বেশ বড় হলঘর। পাঙ্করা ঘরের মেঝেতে শুয়ে-বসে রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে মাদকদ্রব্য। এবং ঘরের এক প্রান্তে বেদীর ওপর যিনি বসে আছেন দুই শিষ্যসমেত, তাঁকে চিনতে অসুবিধে হল না। সাধুবাবা বেশ নেশাগ্রস্ত। শিষ্যরাও ঢুলুঢুলু। হঠাৎ একটা লম্বা ঢ্যাঙা ন্যাড়া মাথার পাঙ্ক উঠে দাঁড়াল, “বয়েস অ্যান্ড গার্লস! আজ আমাদের শেষ দিন। এই তিনটে লোককে আমরা বেশ মোটা টাকা দিয়েছি। এদের সাধু বলে। আমাদের শেল্টারের জন্যে এদের দরকার ছিল। কিন্তু আমরা এখন বর্ডার পেরিয়ে পাকিস্তানে ঢুকে পড়ব। করাচি এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের প্লেন ধরতে হবে। নাউ, সাধুবাবা, তুমি কিছু বলবে?”
সাধুবাবা নড়েচড়ে বসলেন, “খাও-পিও-আউর জিও।” একজন শিষ্য বাক্যটার ইংরেজি অনুবাদ করে দেওয়ামাত্র হুল্লোড় উঠল ঘরে। ঢ্যাঙা লোকটা তীব্র শিষ দিয়ে উল্লাস থামাল, “নো শাউট! আজ দুপুর থেকে আমরা অস্বস্তিতে আছি। আমাদের বন্ধুদের কালিম্পংয়ে যার জন্যে ঝামেলা সহ্য করতে হয়েছিল, সেই লোকটা আজ এখানে এসেছে। সে এসেছে একটা বালক আর এক বৃদ্ধকে সঙ্গী করে। বালকটিকে পাওয়া যাচ্ছে না, বৃদ্ধটিকে আমরা হোটেল থেকে তুলে এনেছি। ব্রিং হিম
অর্জুন হতভম্ব। একটি পাক্ যাঁকে সামনে নিয়ে এল, তাঁকে দেখে ওর জিভ শুকিয়ে গেল। বিষ্টু সাহেবের অবস্থা বলির পাঁঠার মতো। গায়ে তেমন গরমজামাকাপড় নেই। থরথর করে কাঁপছেন। কপালের ওপর রক্তের দাগ।
ঢ্যাঙা লোকটা ইশারায় ওঁকে দাঁড় করানোর জন্যে নির্দেশ দিতে ঘরে চিৎকার উঠল, “কিল হিম, কিল হিম।”
একটি পাঙ্ক মেয়ে উঠে তীব্র গতিতে ন্যাড়া মাথায় ঢুস দিতে বিষ্টু সাহেব কাঠের মেঝেয় পড়ে গেলেন ‘মাগো’ বলে। অর্জুনের খুব কষ্ট হচ্ছিল। এই ভালমানুষ লোকটাকে সাহায্য করা দরকার। কিন্তু আট ন’জন পাঙ্কের সঙ্গে সে একা পারবে কী করে?
ঢ্যাঙা লোকটা বলল, “অ্যান্ড নাও দ্য মেইন প্রব্লেম। আমরা যাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছিলাম, সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সে ‘পা-জীবনের রীতিনীতি মানতে চাইছে না। তাকে সঙ্গে নিয়ে বর্ডার পার হওয়া অসম্ভব। আর, কোনও অবস্থায় আমরা তাকে এখানে ছেড়ে যেতে পারি না। তাহলে কী করা যেতে পারে?”
সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকার উঠল, “কিল হার, কিল হার।
ঢ্যাঙা লোকটা হাসল, “গুড। দেন, একটার পর একটা।”
অর্জুন দ্রুত ঘরে ফিরে এসে দেখল সীতা নেই। আবছা অন্ধকারে কোথাও সীতাকে দেখতে পেল না সে। তারপর নজরে এল ওপর থেকে ঝুলিয়ে রাখা দড়িটাকেও দেখা যাচ্ছে না। সে চাপা গলায় ডাকল, “সীতা!” কিন্তু কোনও সাড়া এল না।
অর্জুন ওপর দিকে তাকাতে আবছা শরীরটাকে দেখতে পেল। খাঁজে খাঁজে পা রেখে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। অর্জুন আবার ডাকল, “সী-তা…!” ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হতে সে দ্রুত দেওয়ালের পাশে চলে গেল। একটি ন্যাড়ামাথা বেঁটে ছেলে ঘরে ঢুকল। তারপর খাটের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কতদিন তোমাকে প্রপোজ করেছি, তুমি শোনোনি, আজ তার হিসেব চুকিয়ে দেব।” কথাগুলো জড়ানো ইংরেজিতে হলেও মানেটা ধরতে পারল অর্জুন। আর সময় নষ্ট না করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর। দু’হাত জড়ো করে ঘাড়ের ওপর আঘাত করতেই কাটা কলাগাছের মতো লোকটা মাটিতে লুকিয়ে পড়ল। এই আঘাত করার ধরনটা অমলদা শিখিয়েছিলেন তাকে। এতে অন্তত আট ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান ফেরার কথা নয়। লোকটাকে টেনে এক কোণে সরিয়ে রেখে সে আবার মাঝখানে চলে এসে ডাকল, “সীতা, দড়িটা ফেলে দাও।
“হাই রিক্, হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
আর-একটি শরীর দরজায় এসে দাঁড়াতে অর্জুন বুঝল আর পরিত্রাণ নেই। লোকটা কি তাকে দেখতে পাচ্ছে? নবাগত পাঙ্ক চটুল পায়ে ঘরে ঢুকে খাটের দিকে এগিয়ে যেতে অর্জুন ঝাঁপিয়ে পড়ল। আচম্বিতে লোকটা এমন অবাক হয়ে গেল যে, কোনও প্রতিরোধ করার কথা ভাবতেই পারল না। দ্বিতীয় লোকটিকে শুইয়ে দিয়ে অর্জুন অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস পেল। এই প্রথম সে দুটো মানুষকে পরাজিত করল। দুজনই আমেরিকান। কিন্তু আর সময় নেই। ওঘরে এখনও সাতজন আছে। সে গলা তুলল, “সীতা, দড়িটা ফেলে দাও!”
“নো।” সীতার চাপা গলা শুনতে পেল, “আমি কাউকে বিশ্বাস করি না।” তারপর আর তাকে দেখা গেল না।
এই সময় বাইরে উত্তেজিত কন্ঠস্বর শোনা গেল। এবং তারপরেই গুলির শব্দ। অর্জুন দ্রুত দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখল ঢ্যাঙা লোকটা চিৎকার করছে, “পেছনের দিকে চলে যাও! পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। পেছনের দরজা দিয়ে যে যেখানে পারো পালাও।”
হুড়মুড় করে পাঙ্কুরা ছুটে গেল পেছন দিকে। এবং তখনই দরজা ভাঙার শব্দ হল। অর্জুন এই সময় কাঠের লম্বা টুলটাকে দেখতে পেল। টানতে টানতে সেটাকে ঘরের মাঝখানে নিয়ে এল সে। কথা ছিল এখানে আসার পনেরো মিনিটের মধ্যে সে যদি দরজা না খুলে দিতে পারে, তাহলে অমলদা আর অপেক্ষা করবেন না। এখন সামনে দিয়ে যাওয়া বিপদ। পুলিশ আর পাঙ্কদের লড়াইয়ের মাঝখানে পড়তে হবে। লম্বা কাঠের টুলটার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে কয়েকবার চেষ্টার পর সে সিলিংটা ধরতে পারল। তারপর শরীর ঝুলিয়ে অনেক কষ্টে ওপরের খাঁজে পা রাখতে পারা মাত্র নীচে আর্তনাদ শুরু হয়ে গেল।
ছাদের ঠাণ্ডায় শরীর বের করে অর্জুন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পুলিশ এবং অমলদা এতক্ষণে ভেতরে ঢুকে গেছেন। সে ধীরে ধীরে বাঁ দিকে তাকাতে দেখতে পেল, তুষারের ওপর একটা কালো বিন্দুর মতো কিছু ছুটে যাচ্ছে। সে দ্রুত নামতে গিয়ে অনেকটা পিছলে পড়তে পড়তে শেষ মুহূর্তে সামলে নিতে একটা ছুরি হাওয়া কেটে তার পাশে বিঁধল। ব্যালান্স না থাকায় শরীরটা সরে যাওয়ায় সে বিদ্ধ হয়নি। অর্জুন হতভম্ব হয়ে তাকাতে হাতকাটা লোকটাকে দেখতে পেল, “আমাকে মারলে কেন?”
“তুমি? যাব্বাবা। তুমি ওপর থেকে নেমে আসবে বুঝব কী করে?” ছুরিটা তুলে সে নীচে ছুঁড়ে দিতে অর্জুন লাফিয়ে নামল, “কতক্ষণ এখানে আছ?”
“এইমাত্র। এসেই দেখলাম ওপর থেকে একজন নামছে। ভাগ্যিস লাগেনি! আমি এই প্রথম টার্গেট মিস করলাম।” খুব আফসোস যেন গলায়।
অর্জুন কথা বাড়াল না। সে সাদা তুষারের ওপর দৌড়তে লাগল। বিন্দুটা মিলিয়ে যাচ্ছিল, আবার স্পষ্ট হল।
কাছাকাছি হওয়া গেল। কারণ এতদিনের দুর্বলতা এবং পায়ের তলার তুষার সীতাকে চলতে দিচ্ছিল না। অর্জুন চিৎকার করে ডাকল, “সী-তা।”
সঙ্গে সঙ্গে সীতা ঘুরে দাঁড়াল, “খবরদার, এসো না।”
‘কেন?” অর্জুন তবু এগিয়ে যাচ্ছিল।
“আমি কাউকে বিশ্বাস করি না।”
“কেন?”
“আমি বাঁচতে চাই বলে।”
“আমাকে বিশ্বাস করলে তুমি মরবে না।”
‘নো! আমি বিশ্বাস করি না।”
সীতা আবার দৌড়তে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই অর্জুন তাকে ধরে ফেলল। সঙ্গে-সঙ্গে সীতা প্রাণপণে অর্জুনকে কামড়াতে যেতেই ওর রাগ হয়ে গেল। যতটা জোরে সম্ভব সে সীতার গালে চড় মারল। “তুমি কি পাগল? ড্রাগ খেয়ে কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই, আর তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না?”
সীতা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকাল। অর্জুন বলল, “তুমি ভারতীয়, বাঙালি। সীতা, তুমি ভুলে যেও না, আমার কোনও স্বার্থ নেই। আমি তোমার বন্ধু।”
হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে উঠে দুই হাঁটু ভেঙে তুষারের ওপর বসে পড়ল সীতা। “আমি খারাপ হয়ে গেছি, খুব খারাপ।”
দু’হাতে সীতার কাঁধ ঝাঁকিয়ে দিয়ে অর্জুন বলল, “না। সীতারা কখনও খারাপ হয় না।”
***
