জুতোয় রক্তের দাগ – ৪

৪.

তখনও অন্ধকার। মিসেস গ্রান্ট গাড়ি চালাচ্ছিলেন। নিস্তব্ধ চারদিক। ঠাণ্ডার তুলনা নেই। আগেই কথা ছিল, তিনি সি-ফেস বাড়িটার আগেই থামবেন। একটু আড়ালে গাড়িটা রেখে তিনি নজর রাখবেন, আর কেউ আসে কি না। যদি সন্দেহজনক কিছু ঘটে, তিনি তিনবার হর্ন বাজিয়ে সাবধান করে দেবেন। তিনি বারংবার সতর্ক করে দিলেন, যেন ওরা পুলিশের হাতে না পড়ে। মাঝরাতে অন্যের বাড়িতে ধরা পড়লে ওদের নির্ঘাত হাজতবাস করতে হবে।

মেজর এবং অর্জুন মেন গেটে এসে দেখল, ওটা সহজেই খোলা যায়। ভেতরে পা দিতেই পাখিরা চিৎকার করে উঠল গাছে-গাছে। আবছা অন্ধকার চারপাশে। ওদের ধাতস্থ হবার সময় দিতে অর্জুন জায়গাটা জরিপ করল। এককালে বাগানটা সুন্দর ছিল। এখন অযত্নে আগাছায় ভরেছে। মেজর বললেন, “মানুষ আছে বলে তো মনে হয় না। কী করতে চাও?”

অর্জুন বলল, “আরও একটু ভেতরে চলুন। কথা বলবেন না। ওই ঝোপটার আড়ালে দাঁড়াতে হবে।”

ওরা সেখানে পৌঁছলে অর্জুন ঘড়ি দেখল। সূর্য উঠতে এখনও দেরি আছে। মেজরের পক্ষে এক জায়গায় অপেক্ষা করা মুশকিল। তিনি উসখুশ করছিলেন। আর অর্জুন কেবলই তাঁকে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে বলছিল। পাখিরা থেমে গেছে। পৃথিবীর কোথাও কোনও শব্দ নেই। ঠাণ্ডা যেন হাড়ের ওপর দাঁত বসাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত সূর্যদেব উঠলেন। যদিও ঘড়িতে এখন শেষরাত। একফালি রোদ এসে পড়ল ভুতুড়ে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বাড়িটার ওপর। চাপা গলায় অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি পপলার গাছ চেনেন?”

মেজর হাসলেন, “তা চিনব না! ওই তো ওখানে একটা, ওপাশে আর-একটা।”

অর্জুন গাছ দুটোকে দেখল। বাড়িটার পুব দিকে কোনও পপলার গাছ নেই। এ দুটো উত্তর দিকে। শ্যাডো কিস্ড দ্য পপলার। পশ্চিমে সূর্য ঢললে পূর্ব দিকে ছায়া পড়ে। সেদিকে পপলার না থাকায় দেখতে হবে পশ্চিমে সেই গাছ আছে কি না। কারণ উত্তরে ছায়া আসবে না।

অর্জুন মেজরকে ইশারা করে এগিয়ে যেতে লাগল সতর্ক পায়ে শিশির-ভেজা পাতাগুলোয় বেশি শব্দ হচ্ছে না। কিন্তু পাখিরা জাগছে। পশ্চিম দিকের বাউন্ডারি ঘেঁষে একটা পপলার দাঁড়িয়ে। আর কী আশ্চর্য, সূর্য এখনও নীচে বলে বাড়িটার ছায়া তার গোড়ায় পড়েছে। শ্যাডো কিস্ড দ্য পপলার।

বুকের মধ্যে ড্রাম বাজছে। অর্জুন গাছটার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। মেজরকে বলে গেল, “আপনি এখানে দাঁড়িয়ে লক্ষ রাখুন। কাউকে দেখলে সতর্ক করে দেবেন।”

সে মনে করল পরের শব্দগুলো। ফোর এল, টু ইউ। এল মানে লেফট, বাঁ দিকে। চার ফুট না চার হাত? চার ফুটে তো শেকড় থাকবে। তা হলে চার হাত। ‘টু ইউ’ মানে? ইউ কি আন্ডার? দু’ হাত নীচে?

সে চারপাশে তাকাল। তারপর জায়গা মেপে মাটিতে উবু হয়ে বসল। খুব শক্ত মাটি নয়। সে পকেট থেকে ছুরিটা বের করল। কোদাল বা শাবল পেলে ভাল হত। কী করা যাবে! সে ছুরি দিয়ে খানিকটা গর্ত করে এবার মাটি তুলতে লাগল হাতে। কাদা কাদা মাটি, সহজেই উঠে আসছে। প্রায় একঘণ্টা চেষ্টার পর মনে হল, হাত-দুয়েক গর্ত হয়েছে। কিন্তু কিছুই নেই তো! সে গর্তটাকে আরও একটু বাড়িয়েও কিছু পেল না। হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়াল অর্জুন। সে কি পুরো ব্যাপারটাই ভুল বুঝেছে! অমলদা থাকলে…। সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে এক ঝটকায় সোজা করল। সে নিজে ভুল করবে আর অমলদা তাকে শুধরে দেবেন, এ কতদিন চলবে? অর্জুন পপলার গাছটার দিকে তাকাল। ছায়াটা নেমে এসেছে অনেকটা। গোড়া থেকে অন্তত হাত-চারেক ওপরে এসে ঠেকেছে। অর্জুনের চোখ ছোট হয়ে এল। চারটে বড় ডাল গাছটার শরীর থেকে বেরিয়েছে। ফোর এল মানে কি ফোর লার্জ? সে ডালগুলো দেখল। তারপর ধীরে-ধীরে তার মুখে হাসি ফুটল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেজরকে ইশারায় ডাকল। মেজর এলে সে বলল, “কিছু মনে করবেন না, উবু হয়ে বসুন তো!”

“কেন? কিছুই তো পেলে না!”

মেজর বসতেই সে দু’পা তাঁর মাথার দু’পাশে গলিয়ে বলল, “কিছু না মনে করে গাছটা ধরে উঠে দাঁড়ান।”

মেজর সোজা হতে চারটে ডালের ঠিক দু’ ফুট নীচে সে গর্তটাকে দেখতে পেল। সম্ভবত গর্ত করে পাথর দিয়ে মুখটাকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে টাইট করে। ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অর্জুন পাথরটাকে বের করতেই বাইরে তিনবার হর্ন বেজে উঠল। দ্রুত হাত চালাল সে। হাতের মুঠোয় একটা স্টেইনলেস স্টিলের কৌটো উঠে এল। লাফ দিয়ে মেজরের কাঁধ থেকে নেমে অর্জুন বলল, “দৌড়োন।”

হতভম্ব মেজর যখন তাঁর ভারী শরীর উত্তর দিকের ঝোপের আড়ালে নিয়ে আসতে পারলেন, তখন অর্জুন চারটে লোককে দেখতে পেল। গেট খুলে তারা ঢুকছে। দু’জনকে সে গতরাত্রে হোটেলে দেখেছে, বাকি দু’জনকে দেখলেই বোঝা যায়, খুন করতে ওদের হাত কাঁপে না।

ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে বাড়িটার দক্ষিণ দিকে চলে গেল। একটু পরেই বাড়ির পশ্চিম দিক থেকে একটি মানুষের অবাক-হওয়া চিৎকার ভেসে এল। মেজর বললেন, ‘চলো, পালাই।”

“পালাবেন, না লড়বেন?”

“লড়ব? বেশ, তা-ই হোক।

কথা শেষ হবার আগেই চারজনকে দৌড়ে গেটের কাছে পৌঁছতে দেখা গেল। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে গেট পরিষ্কার দেখা যায়। লোকগুলো খুব উত্তেজিত হয়ে চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলছে। এই সময় অর্জুন মিসেস গ্রান্টের গাড়িটাকে দেখতে পেল। গাড়িটা নজরে পড়তেই চারটে লোক একপাশে সরে দাঁড়াল। ওদের দু’জনের হাতে রিভলভার।

মেজরের কাঁপা গলা শুনল অর্জুন, “না। লড়াটা বোকামি হবে।

গাড়ি থেকে নামলেন মিসেস গ্রান্ট। তারপর সোজা লোকগুলোর দিকে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি সি-ফেস?”

একটা লোক কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন? এখানে কী দরকার?”

“আমি সাপের ব্যবসা করি। এখানে আমার দুটো সাপ ঢুকেছে। ওদের নেব।”

“সাপ?”

“হ্যাঁ। ওই তো। ওখানে।” মিসেস গ্রান্ট সরাসরি মেজরের দিকে আঙুল তুলতেই লোকগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তারপরে কোনওদিকে না চেয়ে ওরা দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।”

গাড়িতে বসে মেজর বললেন, “ওরা পালাল কেন বলুন তো?”

মিসেস গ্রান্ট বললেন, “ওরা আপনাদের সাপ বলে ভুল করেছিল।”

মেজর বললেন, “এটা ঠিক হল না। আপনি আমাদের সাপ বানালেন।

“ওদের কাছে। কিছু হল?”

শেষ প্রশ্ন অর্জুনের দিকে তাকিয়ে। সে হাতের মুখে খুলল। স্টেইনলেস স্টিলের কৌটোর মধ্যে একটা চাবি। চাবির গায়ে ব্যাঙ্কের চাকতি। সেখানে লেখা কোন্ ব্যাঙ্ক, লকারের নম্বর কত!

অর্জুন বলল, “এটার জন্যে ওরা মরিয়া হয়ে খুঁজছে। নিশ্চয়ই ওই লকারে খুব মূল্যবান কিছু আছে।”

মিসেস গ্রান্ট বললেন, “আমাদের এটা নিয়ে থানায় যাওয়া উচিত।”

অর্জুন বলল, “তা হলে পুলিশকে বলতে হবে আমরা কীভাবে চাবি পেয়েছি। তার চেয়ে লকার খুলে যদি দামি জিনিস দেখি, তা হলে পরিচয় না দিয়ে পুলিশকে ফোন করলেই চলবে।”

“দামি জিনিস মানে?” মেজর জিজ্ঞেস করলেন।

“সোনাদানা, টাকা।”

“যদি অন্যকিছু হয়। এই ধরো গুপ্তধনের ম্যাপ?”

অর্জুন হাসল। “তা হলে তো চমৎকার।”

মেজর উঠে বসলেন, “সোজা ব্যাঙ্কে চলো।”

অর্জুন আপত্তি করল, “না। মিস্টার মার্শাল আপনাকে আজ যেতে বলেছেন। আপনার তো হাঙর মারার কথা। আমরা সেটা দেখি আগে।”

মেজর আবার এলিয়ে পড়লেন গাড়ির সিটে, “ও। হাঙর! আমার কাছে কিছুই না। এখন আমি ইন্টারেস্টেড মানুষরূপী হাঙরে। হে ভগবান, লকারে যেন গুপ্তধনের ম্যাপ থাকে।”

অর্জুন চাবিটাকে পকেটে রেখে ভোরের সমুদ্রের দিকে তাকাল।