জুতোয় রক্তের দাগ – ১১

১১.

ব্রেকফাস্টের পর মার্শাল ওদের নিয়ে বের হলে। ব্রাউনের যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। মার্শালের অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করল সে, “জলের নীচে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। হোক না সাবমেরিন, তবু জলের নীচে তো বটে। অনেকের যেমন বেশি উঁচুতে উঠলে মাথা ঘোরে, তেমনই জল আমি সহ্য করতে পারি না। মেজর খুশি হলেন ব্রাউন যাচ্ছে না বলে। দু’পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললেন, “বাহাদুর বটে।”

তাঁবুতে ফেরার আগে ব্রাউন অর্জুনকে চাপা গলায় জানিয়ে দিগে গেল, “পৈতৃক প্রাণটা হারাতে চাই না ভাই। ওই বিশাল হাঙরটার মুখোমুখি হলেই তোমার গিয়েছ। তোমার দেশে কাকে কী খবর দিতে হবে তা একটা কাগজে লিখে দিয়ে গেলে বুদ্ধিমানের কাজ করবে।”

অর্জুন হেসে বলেছিল, “হাঙরটা বোধহয় হিংস্র নয়। দাঁড়টানা নৌকোকে যখন কিছু বলেনি, তখন সাবমেরিনকে কেন বলবে।

পাহারাদারদের সঙ্গে সমুদ্রের ধারে চলে এল ওরা। কাল যেদিকে গিয়েছিল অর্জুন, এটা তার ঠিক উলটো দিক। সাবমেরিন এখন জলের ওপর ভাসছে। ওরা ভেতরে ঢুকে গেলে সেটি দরজা বন্ধ করল। খুব ছোট হলেও বড় কাজের, তথ্যটা জানাল মার্শাল। ওরা যেখানে বসেছিল তার তিন পাশে বুলেটপ্রুফ-জাতীয় কাচ। ধীরে-ধীরে যান নীচে নেমে যাচ্ছে। অর্জুনের এই অভিজ্ঞতা প্রথম। মেজর বললেন, “এটা আমার তৃতীয়বার। একবার অতলান্তিকে ছিলাম দিন-তিনেক। ফ্যান্টাস্টিক।”

জলের নীচের জগৎটা কি জলের ওপরের জগতের চেয়ে বেশি রহস্যময়! এখন ওরা যে-স্তরে রয়েছে সেখানে সূর্যের আলোর প্রতিফলন পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে একটার পর একটা ঝাপসা দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ছে। ইঞ্চি থেকে এক-হাতি মাছেরা সঙ্গ ছাড়ছে না। খুব মজা লাগছিল অর্জুনের। সাবমেরিনটি চালাচ্ছিল যে লোকটি তাকে মার্শাল মাঝে-মাঝে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। এবার ঘুরে বসে বললেন, “তোমরা কি জানো, কীভাবে ঝিনুকের বুকে মুক্তো জন্মায়!” মেজর বললেন, “কীভাবে আর, প্রকৃতি দিয়ে দেয়।”

মার্শাল মাথা নাড়লেন, “না। মুক্তো শরীরে আসে বাইরে থেকে। অবশ্য আসার সময় তা মুক্তো থাকে না। ঝিনুকের শরীর খুব নরম। সেটাকে বাঁচাতে কনচিওলিন নামক এক পদার্থ দিয়ে সে তার খোলটি তৈরি করে। ঝিনুক যখন খাবার খায়, তখন ওই খোলের ফাঁক দিয়ে যদি কোনও কাঁকর ঢুকে পড়ে তখন তার শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। সেই কাঁকর বা বালিকণাকে ঘিরে ফেলতে সে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের তরল রস ঢালতে থাকে। অনেকটা আবরণ পড়ে গেলে তার ব্যথা কমে আসে আর কার্বনেটের আবরণ জমে জমে বালিকণাটি একসময় মুক্তোয় পরিবর্ধিত হয়। শুধু বালিকণা নয়, যে-কোনও জিনিস ওই শরীরে ঢুকলেই এমন কাণ্ড ঘটতে পারে। পারস্য উপসাগর আর মান্নার উপসাগরে মুক্তো বেশি পাওয়া যায়। ওখান থেকে আমি প্রচুর পিঙ্কটাডা ভালগারিস ঝিনুক আনিয়েছি এখানে। এই প্রজাতির ঝিনুকে বেশি মুক্তো পাওয়া যায়। মেক্সিকোতেও এক ধরনের ঝিনুক পাওয়া গেছে, যার মুক্তোর রং উজ্জ্বল কালো।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “সব ঝিনুকে মুক্তো হয় না কেন?”

মার্শাল বললেন, “মুক্তোওয়ালা ঝিনুকের চেহারা হল বাঁকাচোরা। নদী বা পুকুরে যেসব ঝিনুক পাওয়া যায় তা হল ইউনিও গোষ্ঠীর।”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “লাল রঙের মুক্তো চাইছ কেন?”

“টকটকে লাল মুক্তো নেই বলে। মেক্সিকোতে কালো মুক্তো, অস্ট্রেলিয়ান মুক্তো রুপোলি, জাপানি মুক্তো সাদাটে-সবজে, ভারতীয় মুক্তো হালকা গোলাপি। কিন্তু টকটকে লাল কোথাও নেই। কীভাবে করছি জানতে চেও না। তবে এখনও কয়েকটা বড়-বড় খাঁচা দেখবে। বাঁ দিকে, হ্যাঁ। দেখতে পারছ? ওই খাঁচায় আমার ঝিনুকরা রয়েছে। তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে ওদের শরীরে মুক্তো দেখার জন্যে।”

“তিন বছর? সে তো অনেক সময়।” মেজর বলে উঠলেন।

“তার অনেকটাই তো পার করে দিলাম।” বলতে-বলতে চিৎকার করে উঠলেন মার্শাল। জলের ভেতর শেকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে খাঁচাগুলো। হয়তো বয়া জাতীয় কিছু দিয়ে তাদের ভাসিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু বেশ কয়েকটা খাঁচা ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। তার ভেতরে একটিও ঝিনুক নেই। উত্তেজিত মার্শালের নির্দেশে চালক সাবমেরিনটি নিয়ে গেল খাঁচার পাশে। চটপট পাশের ঘরে চলে গেলেন মার্শাল। তারপরই সাবমেরিন দুলে উঠল। অর্জুন লক্ষ করল ডুবুরির পোশাক পরে মার্শাল সাঁতরে ভাঙা খাঁচাগুলোর কাছে পৌঁছে গিয়েছেন। সাধের জিনিস নষ্ট হয়ে গেলে মানুষের যে অবস্থা হয় মার্শালের এখন সেই অবস্থা। নিশ্চয়ই সেই হাঙরটা আবার হানা দিয়েছে এখানে।”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “হাঙরটা আবার এখন আসতে পারে না?”

চালক মাথা নাড়ল, “পারে। মিস্টার মার্শাল ঝুঁকি নিচ্ছেন। সে ধীরে-ধীরে যানটি নিয়ে এল খাঁচার পাশে। মার্শাল অদৃশ্য হয়ে গেলেন চোখের সামনে থেকে। এবং তার এক মিনিটের মধ্যেই সেই ডুবুরির পোশাকেই মুখোশ খুলে ঘরে ঢুকে চেঁচাতে লাগলেন, “উই মাস্ট কিল হিম। কাল রাত্রে এসে আবার নষ্ট করে গিয়েছে। আমার পেছনে লেগেছে জানোয়ারটা। একবার যদি সামনে পেতাম তা হলে দেখিয়ে দিতাম বাছাধনকে। উঃ, ভাবতে পারো আমার এতদিনের পরিশ্রমের অর্ধেকটা এইভাবে বানচাল করে দিল হাঙরটা!”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “ভাঙা খাঁচায় একটাও ঝিনুক নেই?”

“তুমি তো বেজায় আহাম্মক! পাখির খাঁচা খোলা রাখলে সে তোমার জন্যে সেখানে বসে ডিম পাড়বে? জলের মধ্যে ছাড়া পেয়েছে ঝিনুক, সে কি আর থাকে? প্রতিটি ঝিনুককে কী সুন্দর অপারেশন করে মুক্তো তৈরি করার ব্যবস্থা করেছিলাম। দিব্যি বেঁচে ছিল ওগুলো।

মার্শাল কথা শেষ করতেই চালক চিৎকার করে উঠল, “হে বস্। লুক। হি ইজ দেয়ার।”

ওরা জলের মধ্যে দেখতে পেল হাঙরটাকে। এত বিশাল এবং বীভৎস হাঙর স্বপ্নেও দ্যাখেনি অর্জুন। হাঙরটা রয়েছে একশো ফুট ওপরে। তাই ঝাপসা লাগছে ওর শরীর। কিন্তু জল পরিষ্কার থাকায় আদলটা বোঝা যাচ্ছে। চুপচাপ সেটা যেন লক্ষ করছে এই যানটাকে। মার্শালসাহেব সঙ্গে সঙ্গে পাগল হয়ে গেলেন যেন। চালককে বললেন, “আমি যেভাবে বলব সেইভাবে চালাবে।” তারপর দৌড়ে ঢুকে গেলেন পাশের ঘরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নির্দেশ এল, “কোনাকুনি ওর দিকে চলো।

চালক বলল, “বস। ইট উইল বি ডেঞ্জারাস। “যা বলছি তাই করো।”

অতএব আমাদের যানটি কোনাকুনি চলল। হাঙরটির হাঁ-মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখ জ্বলছে। বাঘ যেমন শিকারের ওপর লাফাবার আগে শরীর টানটান করে নেয়, এও কি তাই করছে? হঠাৎ জলের ভেতর তীব্র কম্পন উঠল। হাঙরটা সামান্য নড়ল মাত্র। পর পর দু’বার। চালক বলল, “বস, গুলি করে খেপিয়ে দিচ্ছেন।”

এবার হাঙরটি এগোতে লাগল। সেই বীভৎস মুখগহ্বর মৃত্যুর আগেও ভুলতে পারবে না অর্জুন। মেজর চিৎকার করে ভিরমি খেয়েছেন। সঙ্গে-সঙ্গে যান ঘুরিয়ে তীব্র বেগে পেছন ফিরেছে চালক। মার্শালের আদেশের জন্য সে আর অপেক্ষা করেনি। কিছুটা পথ তাড়া করে এসেছিল হাঙরটা। তারপর পলায়নকারীর প্রতি নিতান্ত অবহেলাতেই সে থেমে গেল। যাওয়ার আগে জলে যেভাবে আলোড়ন তুলল তাতে জানিয়ে দিল শক্তির বিচারে একটা কুকুর হাতির সঙ্গে লড়তে গিয়েছিল।

সাবমেরিন থেকে লঞ্চে উঠে তাঁবু পর্যন্ত মেজর কথা বলার শক্তি হারিয়েছিলেন। মার্শাল গুম হয়ে রইলেন। শুধু শেষ মুহূর্তে চালককে ডেকে বলেছিলেন, “থ্যাঙ্কস। কিন্তু এই ঘটনার কথা আর কেউ জানতে না পারে। মনে রেখো।”

তাঁবুতে ঢুকে মার্শাল কাঁচা ব্রান্ডি মেজরকে দিলেন গ্লাসে ঢেলে, নিজেও নিলেন। অর্জুনকেও অফার করেছিলেন তিনি, কিন্তু সে মাথা নেড়ে খাবে না বলল। এই সময় ব্রাউন এসে দাঁড়াল তাঁবুর দরজায়, “ও, সেলিব্রেট করা হচ্ছে। আমি কি বাদ যাব?”

মেজর কথা বলছেন না, মার্শালের মেজাজ খুব খারাপ থাকারই কথা, তিনি বোতলটা ছুঁড়ে দিলেন ব্রাউনের দিকে। দক্ষ গোলকিপারের মতো ব্রাউন সেটাকে ধরে ফেলল। তারপর ছিপি খুলে খানিকটা ঢেলে দিল গলায়। অর্জুন মেজরের দিকে তাকাল। এখনও মুখের চেহারা স্বাভাবিক হয়নি। ব্যাপারটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। তার ওপর মার্শাল তাঁকে আহাম্মক বলে গালাগাল দিলেন, একটা প্রতিবাদ করেননি মেজর। এটাও অস্বাভাবিক। হাঙরটার বিশাল চেহারা, বীভৎস হাঁ যেন অর্জুনের চোখের সামনে বারংবার ঘুরে আসছিল। ইচ্ছে করলে প্রাণীটি এতক্ষণে তাদের গিলে ফেলতে পারত।

মার্শাল ব্রান্ডি শেষ করে বললেন, “আমি আজই পোর্ট পুলিশের কাছে যাব। ওটাকে মারতেই হবে।”

“আপনি কি গুলি করেছিলেন?” অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ। দু’বার। যেন লোহাকে গুলি করছি। কী ভয়ঙ্কর, এর পর তো ওখানে গিয়ে কাজ করাই অসম্ভব হয়ে গেল। একটা খাঁচা এখনও আস্ত আছে, তাও নষ্ট করবে ব্যাটা।”

“কিন্তু পোর্ট পুলিশের দিকে যেতে হলে তো এদিকের সমুদ্র ডিঙোতে হবে।” আচমকা বলে উঠল ব্রাউন। তার হাতে এখনও ব্রান্ডির বোতল।

“ওপাশের সমুদ্রে কোনও ভয় নেই।”

“আপনারা কি দানবটাকে দেখেছেন আজ?”

অর্জুন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই খুব খুশি হল ব্রাউন, ভাগ্যিস যাইনি। তখনই আমার মন কু গাইছিল। কিন্তু মিস্টার মার্শাল এখানে আসার সময় ওই সমুদ্রেও আমরা হাঙরের পাখনা দেখেছি। ভয় নেই বলবেন না।

কথাটাকে সমর্থন করল অর্জুন, “হ্যাঁ। একটা হাঙরকে জলে যেতে দেখেছি। তবে সেটা এইটে কি না জানি না।”

মার্শালসাহেব চিন্তিত হলে, “এখানে এখন একটাই হাঙর ঘুরছে। তবে ও এখনও পর্যন্ত কোনও নৌকো অথবা লঞ্চ আক্রমণ করেনি। আমাকে যেতেই হবে।”

মার্শাল বোধ হয় তার প্রয়োজন করতেই বেরিয়ে গেলেন। মেজরের গ্লাস খালি হয়ে গিয়েছে। ব্রাউন এগিয়ে এসে তাতে আবার খানিকটা ঢেলে দিল। অর্জুন আপত্তি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেজর তাকে বাঁ হাত তুলে থামালেন, “আই নিড ইট। একেবারে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলাম। ওঃ, কী ভয়ঙ্কর। ব্রাউন, তুমি যদি জন্তুটাকে দেখতে।

“আমি দেখতে চাই না। তবে ভগবানকে ধন্যবাদ যে, তোমরা দেখেছ। নইলে এই ব্রান্ডি কপালে জুটত না। কিন্তু আমি এখানে আর থাকতে চাই না। তোমরা কেউ বলতে পারো হাঙররা বালির ওপরে উঠে আসতে পারে কি না?”

ব্রাউনের কথা এর মধ্যেই সামান্য জড়িয়েছে। হঠাৎ মেজর বললেন, “সত্যি, আমাদের আর এখানে থাকার কোনও মানে হয় না। ওই দানবটার সঙ্গে লড়াই করার কোনও ক্ষমতাই আমাদের নেই। আর একটু ব্রান্ডি!”

ব্রাউনের দিকে গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরলেন মেজর। অর্জুন তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল।

বালিতে একা অন্যমনস্ক অর্জুন হাঁটছিল। দেখল মার্শাল ফিরে আসছেন। মুখোমুখি হতেই মার্শাল বললেন, “গত রাত্রে কেউ আমাদের এক পাহারাদারের

মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করেছে। বেচারা এখনও কথা বলতে পারছে না। ওকে নিয়ে বন্দরে যাচ্ছি। একইসঙ্গে জলে আর ডাঙায় আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে দেখছি।” হনহনিয়ে নিজের তাঁবুর দিকে চলে গেলেন মার্শাল।

অথাৎ কেউ তাদের কাল রাত্রে বাইরে যাওয়ার কথা ফাঁস করেনি। কিন্তু অর্জুনের খুব খারাপ লাগছিল। কে এত জোরে মেরেছে? লোকটা এমন অসুস্থ হোক তা তো সে চায়নি। কিন্তু অবস্থা এমন যে, এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। মার্শাল এটাকে ডাঙায় বাইরের আক্রমণ বলে ভাবছেন! হঠাৎ অর্জুনের মাথায় অন্য চিন্তা এল। এই দ্বীপের উলটো দিকে যারা দিনে লুকিয়ে থাকে রাত্রে কুকুর নিয়ে পাহারা দেয় দাঁড়টানা নৌকোয় স্বচ্ছন্দে সমুদ্রে ঘোরাফেরা করে, তারা কী করে হাঙরের উৎপাত থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে? যেখানে দানবটা মার্শালের মুক্তোর খাঁচা তছনছ করছে সেখানে ওরা স্বচ্ছন্দে দাঁড় বাইছে? হাঙরটার সঙ্গে এমন সমঝোতা হল কী করে?

সে দৌড়ে মার্শালের তাঁবুতে ফিরে এল। মেজর তখন তুরীয় মার্গে বিচরণ করছে। নেশা হয়েছে ব্রাউনেরও। পোশাক বদলে এসে মার্শাল বললেন, “আমার অভিযাত্রী-বন্ধুকে বলো সন্ধের মধ্যে আমি ফিরে আসব।”

মেজর মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, “কী, আমাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে? বেশ, আই উইল নেভার গো ব্যাক। আমি হাঙরটাকে মারব। হাঙর দেখানো হচ্ছে আমাকে!”

মার্শাল কাঁধ ঝাঁকালেন। টেবিল থেকে একটা ব্যাগ তুলে নিলেন, “ব্রাউনকে নিয়ে তুমি তোমার তাঁবুতে ফিরে যাও। মেজর এখানেই থাকুক।”

“যাচ্ছি। কিন্তু মিস্টার মার্শাল, আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।” অর্জুন অত্যন্ত নম্র গলায় বলল।

মার্শাল ঘুরে দাঁড়ালেন, “বলো।”

“তার আগে বলুন, যারা আপনাকে এখানে থেকে চলে যাওয়ার জন্যে শাসাত তারা এখন আর কিছু বলছে না?” অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

“না। হঠাৎই তারা চুপ করে গিয়েছে। বোধ হয় জেনে গেছে হাঙরটার কথা। ওদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এক শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়েছে আমাকে।”

“দ্বীপের উলটো দিকটায় যান না কেন আপনারা?”

“আমি শুধু এই দিকটায় কাজ করব বলে সরকারের অনুমতি নিয়েছি।”

“আপনি যদি আমাকে ওইদিকে যাওয়ার অনুমতি দেন তা হলে হয়তো আমি কোনও সূত্র খুঁজে পেতে পারি।” অর্জুন উৎসুক চোখে তাকাল।

“হাঙর যে উভচর জন্তু তা ওরা বলতে পারে, কারণ নেশা করেছে। তুমি বলছ কী করে? ঠিক আছে, যা ইচ্ছে করো, আমি প্রহরীদের বলে দিচ্ছি।” হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন মার্শাল।

অর্জুন এখন অত্যন্ত উল্লসিত। তার মন বলছে দিনের আলোয় দ্বীপের উলটো দিকে সে কোনও সূত্র খুঁজে পাবেই।

বুনোগাছে লতা ঝুলছে। ঝোপঝাড় দ্বীপটাকে ঘিরে রেখেছে। মাঝে-মাঝে খানিকটা জায়গায় বালির ঢিপি আর সমুদ্রের

এলোমেলো হাওয়া ছাড়া দ্বীপটার কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। অর্জুন সতর্ক হয়ে হাঁটছিল। মার্শালসাহেবের এলাকা সে ছাড়িয়ে এসে একটা ঝাকড়া গাছের তলায় এখন দাঁড়িয়ে আছে। সামনেই সমুদ্র। শান্ত, চুপচাপ। অথচ এই জলের গভীরে সেই দানব-হাঙর ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ অর্জুনের মনে হল, দানবটা মার্শাল সাহেব ছাড়া আর কারও ক্ষতি করছে না। কেন? ওর সমস্ত রাগ কি কেবল ঝিনুক-চাষির বিরুদ্ধে? ব্যাপারটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। হাঙরটাকে দেখলে বেশ খুনে বলেই মনে হয়। যারা নৌকোয় সমুদ্রে ঘোরে তাদের ছেড়ে দেবার পাত্র ও নয়। অথচ তাই ঘটছে। নাকি জলের ওপরে যারা থাকে তাদের নিয়ে মাথা ঘামায় না দানবটা? হাঙরের চরিত্র নিয়ে সে কখনও পড়াশুনো করেনি, অতএব মাথা ঘামিয়ে কোনও ফল হবে না।

গত রাত্রে তারা এই পথ দিয়েই এসেছিল। অর্জুন সতর্ক পায়ে এগোল। বালিতে জুতোর ছাপ পড়ছে। পথ চিনে ফিরতে অসুবিধে হবে না যদি হাওয়ায় দাগ না মুছে যায়। গতরাত্রে ব্রাউন যে গাছে আশ্রয় নিয়েছিল সেটাকে দেখতে পেল সে। ব্রাউনের কথা যদি সত্যি হয় তা হলে এখানেই তাকে মারার জন্যে গুলি ছুঁড়েছিল কেউ। অর্জুন মাটিতে বসে পড়ল। চারপাশে সতর্ক চোখে তাকাল। কোনও সন্দেহজনক উপস্থিতি চোখে পড়ছে না। কেউ তাকে লক্ষ করছে কি না তাও বুঝতে পারছে না। সে মাথা নিচু করে হেঁটে একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ল। মিনিট-তিনেক সেখানে অপেক্ষা করার পর বুঝতে পারল ধারেকাছে কেউ নেই। অতএব তাকে যেতে হবে সেই খাঁড়ির দিকে যেখানে গতরাত্রে গিয়েছিল।

ঝোপঝাড় আড়ালে রেখে এগোতে অর্জুনের সময় লাগল। মাঝে-মাঝে যখন ন্যাড়া বালি আসছিল তখনই বিপত্তিতে পড়ছিল সে। অনেক সময় নিয়ে চারপাশ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়ে সে দ্রুত খোলা জায়গাটা পার হচ্ছিল। এখন সমুদ্রের গর্জন আরও বেড়েছে। হাওয়াতেও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি। হঠাৎ অর্জুন স্থির হয়ে গেল। তার চোখ লোকটার পিঠে আটকে গেল। দ্বীপের দিকে পেছন ফিরে লোকটা সিগারেট খাচ্ছে একমনে। সে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল। ওপাশে যেতে হলে ওই লোকটাকে না ডিঙিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এবং তারপরেই লোকটার কোলের ওপর রাখা মেশিনগানের মুখ চোখে পড়ল তার। ঝোপের মধ্যে মেশিনগান নিয়ে যে বসে থাকে, সে কখনও মিত্র হতে পারে না। পাহারাদারির কাজে যখন মেশিনগান লাগছে তখন প্রতিপক্ষ নিজেদের কাজটাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্জুন দেখল লোকটা সিগারেটে শেষ টান দিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর মেশিনগান নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ শক্ত চেহারা। দেখলেই মনে হয় পুলিশ কিংবা মিলিটারিতে চাকরি করত নির্ঘাত। লোকটা মুখ ঘুরিয়ে চারপাশে দেখল। অর্জুন বসে আছে ঠিক হাত-দশেক দূরে। তার সামনে ঝোপের আড়াল। নিচু হয়ে এগিয়ে না এলে দেখার সম্ভাবনা কম। এবং এখন মোটেই নড়াচড়া করা চলবে না। লোকটা মেশিনগানের স্ট্র্যাপ কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। এবং তখনই অর্জুন ঠিক পায়ের পাশে সরসর আওয়াজ শুনতে পেল। মুখ ঘুরিয়ে বালির দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। চোখ বিস্ফারিত এবং প্রতিটি নার্ভ আচমকা অবশ হয়ে গেল। পায়ের ঠিক এক হাত দূরে বালিতে গর্ত ছিল। সেই গর্ত থেকে সরসর করে কুৎসিত চেহারার সাপ বেরিয়ে আসছে। সাপটা অর্ধেক শরীর বের করে তাকে দেখতে পেয়ে একটু স্থির হল। অর্জুনের চোখ থেকে চোখ সরাল না কিছুক্ষণ। খুব ছিপছিপে আর সর্বাঙ্গে কালচে চাকা দাগের সাপটা হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে শরীরটাকে টেনে বের করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

অর্জুনের ধাতস্থ হতে সময় লাগল। এরকম সাপ সে কখনও দ্যাখেনি। চেহারা দেখে বিষধর কি না বোঝা মুশকিল। কিন্তু অর্ধেক বেরনো অবস্থায় সাপটা যদি ওকে কামড়াত তা হলে হয়তো ভয়েই মরে যেত। এই ঠাণ্ডাতেও শরীর ঘামে নেয়ে উঠেছিল। স্নায়ু অবশ হয়ে আসতে ঠাণ্ডা বাতাসে শীতভাবটা ফিরে এল দ্বিগুণ হয়ে। পরিত্যক্ত গর্তটা দেখল সে। ওর কোনও সঙ্গী যদি ভেতরে থাকে এবং এখন তার বেরনোর সময় হয়ে পড়ে তা হলে সে অর্জুনকে দয়া দেখাবেই এমন কথা নেই। সাপের গর্তের পাশ থেকে সরে যাওয়া দরকার। অর্জুন সামনের দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেল। লোকটা অনেকটা এগিয়ে এসে উবু হয়ে বসেছে। বসে মেশিনগানটা আকাশের দিকে উঁচিয়ে উড়ন্ত সি-গালকে টিপ করছে। একঘেয়েমিতে ভুগলে মানুষ কত কী না করে। লোকটা টিপ করছে, কিন্তু গুলি ছুঁড়ছে না। অর্জুন অতি সন্তর্পণে ডান দিকে সরে যেতে লাগল। তারপরে আর-একটা ঝোপের আশ্রয় নিতেই সে সাপটাকে দেখতে পেল। শরীর বেঁকিয়ে সেটা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। এবং একসময় খোলা জমিতে লোকটার সামনে গিয়ে পড়ে থমকে দাঁড়াল সাপটা। লোকটা তখনও আকাশে নজর করছে। ওকে সতর্ক করা দরকার। হাজার হোক, একটা মানুষ অজান্তে সাপের কামড়ে মারা যাবে এটা কাম্য নয়। এইরকম ভাবতে-না-ভাবতেই অর্জুন অভাবনীয় দৃশ্যটি দেখল। আচমকা লেজের ডগায় শরীরের ভর রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল সাপটা। প্রায় এক মানুষ লম্বা হয়ে বিশাল ফণা ছড়িয়ে নিয়ে হিসহিস শব্দ করে দুলতে লাগল। সেই শব্দেই সম্ভবত লোকটা চোখ নামাল। এবং সাপটা যখন ছোবল মারার জন্যে মুখ নামাচ্ছে তখনই সে ট্রিগার টিপল। ফটাফট-ফটাফট গুলির আওয়াজে নির্জন দ্বীপটার নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল। আর সাপটা ছিটকে পড়ল একপাশে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল লোকটা। ওই মুখে এখনও রক্ত নেই। কিন্তু সাপটাকে দেখামাত্র যেভাবে সে ট্রিগার টিপেছে তাতে গুলি চালানোর ব্যাপারে খুব প্রফেশনাল বলে মনে হল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে পা দিয়ে সাপটাকে লাথি মারতেই সেটা চিত হয়ে গেল। মেশিনগানের নল দিয়ে সাপটাকে টেনে তুলে লোকটা ডান দিকে হাঁটতে লাগল। অর্জুন চটপট ওকে অনুসরণ করছে। যে ভঙ্গিতে বাঘ মারার পর শিকারি শিকারের সামনে দাঁড়িয়ে ফোটো তোলে প্রায় সেই ভঙ্গিতেই লোকটা সাপটাকে ঝুলিয়ে নিয়ে হাঁটছিল। ফলে কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না তা দেখার মতো হুঁশ তার ছিল না। মিনিট-তিনেক হাঁটার পর লোকটাকে শিস দিতে শুনল। এবং তখনই ওপাশ থেকে কেউ চিৎকর করে উঠল, “কী হয়েছে? গুলি চালালে কেন?”

অর্জুন দেখল লোকটা নীচে নেমে যাচ্ছে। একেবারে শেষ আড়ালের আশ্রয় নিয়ে অর্জুন খাঁড়িটাকে দেখতে পেল। খাঁড়ির ভেতর নামতে-নামতে লোকটা জবাব দিল, “খুব অল্পের জন্যে বেঁচে গেছি। দ্যাখো এটাকে। মেশিনগান নেড়ে সে মরা সাপ ছুঁড়ে ফেলল। লাফিয়ে সরিয়ে নিল প্রশ্নকারী নিজেকে। তারপর সাপটাকে দেখে বলল, “ইউ আর লাকি, বাড়ি।”

“ওখানে নিশ্চয়ই ওর জোড়া আছে।”

“তা থাকুক, কিন্তু বস্ খুব রেগে গিয়েছে ফায়ারিং-এর জন্যে। শব্দ করতে নিষেধ করেছিল।”

“আই উইল ফেস হিম। .নাউ, ইট’স ইওর টার্ন। আমার ডিউটি আওয়ার্স শেষ।” লোকটা এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয়জনকে মেশিনগান দিল। তারপর কোনও কথা না বলে খাঁড়ির ভেতর গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে গেল। দ্বিতীয় লোকটি ঝুঁকে আর একবার সাপটাকে দেখল। মুখে অস্বস্তির চিহ্ন ফুটে উঠল। তারপর হেলতে-দুলতে অর্জুনকে বাঁ দিকে রেখে মিলিয়ে গেল লোকটা জঙ্গলের ভেতরে। এখন কী করা যায়? খাঁড়ির মধ্যে ঢুকলে লুকোবার কোনও জায়গা থাকবে না। সাধ করে ধরা দেওয়ার কোনও মানে হয় না। অর্জুন কাছাকাছি একটা ঝাঁকড়া গাছ দেখে উঠে বসল তাতে। যতটা সম্ভব উঁচুতে উঠে দুই ডালের জোড়ে শরীর রেখে দুপাশে পা ঝুলিয়ে দিল। ওপাশের একটা ডালকে টেনে এমনভাবে নীচে নামিয়ে আনল যাতে মাটি থেকে মুখ তুলে কেউ তাকে দেখতে না পায়। এবার সামনের পাতাগুলো সুবিধেমতো সরিয়ে নিল সে। খাঁড়ির মুখ এবং জল পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এইভাবে বসে সারাদিন থাকলেও কোনও অসুবিধে হবে না।

এখন দুপুর বারোটা। ব্রাউনের উপদেশমতো বেশ কয়েকটা চিজের টুকরো নিয়ে এসেছিল পকেটে করে। তারই একটা মুখে দিল। সমুদ্র এখন সামনে। সাপটা কি সমুদ্রে যাচ্ছিল? গর্ত থেকে বেরোবার সময় যদি ফণা তুলত, তা হলে তার এ-জীবনে জলপাইগুড়িতে ফিরে যাওয়া ঘুচে যেত। সাপগুলো কেমন লেজের ওপর দাঁড়ায়! একটু সচকিতে হয়ে গাছটাকে দেখল। সাপ তো গাছেও ওঠে। দ্বিতীয়বার যে ভাগ্য তার ওপর সদয় হবে এমন আশা করা উচিত হয়।

পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ, অর্জুন দিক চিনতে পারল। তার সামনের সমুদ্রই উত্তর দিকের। ছোট-ছোট ঢেউ। এখান থেকে যদি কেউ দাঁড়টানা নৌকোয় সোজা যাওয়া শুরু করে তা হলে কি সেই জায়গাটা খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে মে মাসে সূর্য ঠিক মাথার ওপরে আসে বেলা বারোটায়। মে মাসের সময় পাওয়া গেলে আগুপিছু মাসগুলোর হিসেব বের করে নেওয়া অসুবিধের কিছু নেই। লকারে পাওয়া লেখাটার সূত্র যাই থাক না কেন সেটা যে এই পয়েন্ট থেকে শুরু করতে হবে তার প্রমাণ তো এখনও পাওয়া যায়নি। অমল সোম থাকলে মাথা নাড়তেন, “সত্যসন্ধানী না হয় ফুটপাতে খাঁচায় পাখি নিয়ে গিয়ে বসো। পৃথিবীতে যেন আর সমুদ্র নেই আর তাতে উত্তর দিক বলে কিছু নেই। তোমার যে জায়গাটা ইচ্ছে হল সেটাই সঠিক জায়গা? প্রমাণ নেবে না?”

মনে-মনে একটা প্রমাণ মাথা চাড়া দিচ্ছে। মার্শালসাহেব এসেছেন মুক্তো নিয়ে গবেষণা করতে। কিন্তু এই গুণ্ডাবাহিনী এসেছে কী উদ্দেশ্য! অথচ এক দ্বীপে থেকেও সরাসরি সংঘর্ষে যাচ্ছে না। যেভাবে এরা নিজেদের গোপন করে রাখছে, তাতে স্পষ্ট হচ্ছে যে, এদের কোনও গুপ্ত উদ্দেশ্য রয়েছে, যার গুরুত্ব কম নয়। সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলে লোকগুলো খামোকা এখানে এসে লুকিয়ে থাকবে কেন? অর্জুন যখন এইসব ভাবছিল, তখন খাঁড়ির ভেতর থেকে কয়েকজন লোক উত্তেজিত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এল। প্রথম লোকটাকে চিনতে পারল অর্জুন। ওকে সাপটা আর একটু হলেই ছোবল মারত। উত্তেজনা ওরই বেশি। দ্বিতীয়, তৃতীয় লোকটির সঙ্গেও অস্ত্র রয়েছে। চতুর্থ লোকটিকে দেখে চমকে উঠল সে। ব্ল্যাকপুলে প্রোফেসরের সঙ্গে যে শক্তিশালী লোকটিকে সে দেখেছিল, মোটেলে যাওয়ার আগে সুপার মার্কেট থেকে প্রোফেসরের সঙ্গে বের হতে যাকে দেখেছিল, সেই লোকটি গম্ভীরভাবে এদের অনুসরণ করছে। উত্তেজিত প্রহরী খানিক হেঁটে হাত বাড়িয়ে সাপটাকে দেখাল। অর্জুন বুঝল গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারে তদন্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যবান লোকটা দু’হাতে বুকে ভাঁজ করে সাপটাকে দেখল। তারপর ঝুঁকে পড়ে ওটার লেজ ধরে টেনে তুলে আবার খাঁড়ির ভেতরে জঙ্গলের আড়ালে চলে গেল। বাকি দলটি এবার ওকে অনুসরণ করল। প্রহরীটিকে এখন বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছে।

অর্জুনের মনে পড়ল প্রোফেসর হ্যাচের জিপে একটা ঝুড়ির মধ্যে সাপ ছিল। সাপ পোষার বাতিক আছে লোকটার। বালির গর্ত থেকে উঠে-আসা সাপ নিশ্চয়ই প্রোফেসরের পোষা নয়। প্রোফেসর তাঁর সঙ্গী নিয়ে এই দ্বীপে এসেছেন। এখন তো পরিষ্কার যে, হাইওয়ের ডিপার্টমেন্টাল শপের সেকেন্ডহ্যান্ড কাউন্টারে পুরনো জুতো কেনার চেষ্টা থেকে পর পর ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে প্রোফেসরের উদ্দেশ্য কী! এত জায়গা থাকতে প্রোফেসর এই দ্বীপকে বেছে নিয়েছেন, তখন লকারের কাগজের লেখাটাকে এখান থেকেই প্রয়োগ করা উচিত। অন্তত প্রোফেসর হ্যাচের উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে। তারপরেই মনে হল প্রোফেসর কী করে জানবেন লকারের কাগজের সাঙ্কেতিক শব্দাবলীর কথা! জুতোর পকেটে কাগজ দেখে পোড়ো বাড়ির গাছের কোটর থেকে লকারের চাবি সংগ্রহ করে ব্যাঙ্ক থেকে লকার খুলিয়ে অর্জুনরা সাঙ্কেতিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। এগুলোর কোনওটাই প্রোফেসর হ্যাচ পাননি, তা হলে তিনি এখানে কী করছেন। উদ্দেশ্য কি অন্য-কিছুর?

সারাটা দিন গাছের ওপর কাটল অর্জুনের। এর মধ্যে একবার মাত্র প্রহরী পালটেছে। বিকেল নাগাদ একটা দাঁড়টানা নৌকো ফিরে এল সমুদ্র থেকে। তাতে দু’জন দাঁড়ে রয়েছে, একজন মাঝখানে পায়ের ওপর পা তুলে বসে। সমুদ্র থেকে খাঁড়ির মধ্যে ঢুকে গেল সেটা। লোকটাকে চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না অর্জুনের। প্রোফেসর হ্যাচ। অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে রয়েছেন। যদি কোনও উপায় থাকত তা হলে অর্জুন খাঁড়ির ভেতরে ঢুকত। কিন্তু সে সাহস পাচ্ছিল না। অমল সোম বলতেন, পরিণতি জেনেও দুঃসাহস দেখায় নির্বোধরা।

সন্ধে হওয়ার আগে গাছ থেকে নামবে না বলে ঠিক করেছিল অর্জুন। দিনের আলোয় অযথা ঝুঁকি নেওয়ার কোনও মানে হয় না। আকাশে এখন মেঘ জমছে। বৃষ্টি নামলে নিউমোনিয়া হবেই। কী করা যায় ঠাওর করতে পারছিল না সে। হঠাৎ একটা অতি চিৎকারে সে প্রবলভাবে নাড়া খেল। শব্দটা আসছে খাঁড়ির ভেতর থেকে। কারও ওপর সাঙ্ঘাতিক অত্যাচার না করলে এই ধরনের আর্তনাদ করা সম্ভব নয়। বাইরের লোক তো কেউ ওখানে ঢোকেনি। অর্জুন আর্তনাদের মাথা-মুণ্ডু বুঝতে পারছিল না। কয়েকবার হয়ে সেটা থেমে গেল। প্রোফেসর হ্যাচের ফেরার পর যখন ঘটনাটা ঘটল, তখন তিনি কাউকে শাস্তি দিলেন। এই সময় প্রথম প্রহরী টলতে-টলতে বাইরে বেরিয়ে এল। তার কপালের কিছুটা তখনও রক্তাক্ত। দাঁড়াতেও পারছে না সঠিকভাবে। আর ওর পেছনে সেই বলবান লোকটি।

ধমকের গলায় সে হুকুম করল, “যাও। ওকে চলে আসতে বলো। রাত দুটো পর্যন্ত তুমি আবার ডিউটি করবে। তোমার ভাগ্য ভাল যে, প্রোফেসর আজ অল্পের ওপর ছেড়ে দিলেন।”

লোকটা ঘুরে দাঁড়াল, “কিন্তু আমি গুলি না করলে সাপটাই আমাকে যে খতম করত।”

“করলে করত। তুমি নিজেকে অন্যভাবে বাঁচাবার চেষ্টা করোনি কেন? সাপ প্রোফেসরের প্রিয় জীব। সাপ মেরে তুমি তাঁর কাছ থেকে বাহবা পেতে পারো না। চোদ্দ পুরুষকে ধন্যবাদ দাও এখনও বেঁচে আছে বলে। গো। কুইক।” আহত প্রহরী হড়বড়িয়ে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলে বলবান মানুষটি ফিরে গেল। আরও মিনিট-তিনেক পরে দ্বিতীয় প্রহরীটি খালি হাতে ফিরে এল। অর্জুন পাথরের মতো বসে ছিল গাছের ডালে। সাপকে মেরে ফেলার জন্যে প্রোফেসর হ্যাচ নিজের দলের লোককে এমন শাস্তি দিলেন? মানুষের প্রাণ ওঁর কাছে সাপের চেয়ে মূল্যহীন। এই মানুষ তো যা-ইচ্ছা তাই করতে পারে। কিন্তু কুকুরটা কোথায়? এত কাণ্ড হয়ে যাচ্ছে অথচ কুকুরটার ডাক একবারও কানে আসেনি।

অর্জুন ধীরে-ধীরে গাছ থেকে নামল। এখন অন্ধকার নেমে আসছে। যেভাবে এসেছিল ঠিক সেইভাবে সে ফিরে যাচ্ছিল। সমুদ্রের ধারের ঝোপগুলোকে আড়াল করে সে হাঁটছিল। হঠাৎ খাঁড়ির মুখে একটা তীব্র আলোড়ন হল। যেন জলের তলায় বিরাট কিছু নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। তারপর সেটা জলের আড়ালে থেকেই সমুদ্রের জলে মিলিয়ে গেল। প্রায় মিনিট-তিনেক বাদে অর্জুন প্রহরীটিকে দেখতে পেল। আবছা অন্ধকারে একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে রয়েছে। মেশিনগান কোলের ওপর রাখা। লোকটাকে খুবই কাহিল দেখাচ্ছিল। নিঃশব্দে ওর পেছন ঘুরে জায়গাটা পেরিয়ে এল অর্জুন। সারাদিন গাছের ওপর বসে থাকার জন্য এখন খুব কাহিল লাগছে। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে।

মার্শালসাহেবের অনুরোধে গতকাল জল-পুলিশ এ-তল্লাট চষে বেড়িয়েছে, কিন্তু কোথাও হাঙর তো দূরের কথা, ভয়ঙ্কর কোনও জলজন্তুর সন্ধান পায়নি। মার্শালের তাই মন খারাপ। পুলিশ-সুপার তাকে অনুযোগ করে গেছেন এমন বেহিসেবী অভিযোগ করার জন্যে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথাটা পরিষ্কার হল অর্জুনের। চা খাওয়ার পর বিছানায় ফিরে এল সে। একটা সিগারেট ধরিয়ে পুরো ব্যাপারটা যখন ভাবতে চেষ্টা করছে, তখনই ব্রাউন এল, “কাল তো আমি ভাবলাম তোমার ডেড বড়ি খুঁজতে বের হতে হবে। আচ্ছা ব্যাপারটা কী বলো তো? রহস্যটা খুব দানা বেঁধেছে অথচ কূল পাচ্ছি না। তুমি যাদের দেখতে গিয়েছিলে তারা কে?”

“খুব নিষ্ঠুর লোক। সাপ মারলে মানুষকে শাস্তি দেয়।

“সে কী! এত সাপের বন্ধু! তোমাকে মেজর একবার তাঁবুতে ডাকছেন “কেন?”

“আরে কাল সন্ধে হয়ে গেলেও তুমি ফিরছ না দেখে সব কথা ওদের বলতে বাধ্য হলাম। হাজার হোক তোমার জন্যেই কয়েকদিন ভালমন্দ খেতে পাচ্ছি। তোমার কোনও খারাপ হোক এ তো আমি চাইতে পারি না। ধর্মে সইবে না।” ব্রাউন বলল।

“মিস্টার মার্শালকেও আপনি পরশু রাতের কথা বলেছেন?”

‘কী করব! আমি যখন মেজরকে বলছিলাম তখন মার্শাল সেখানে ছিল তো। তা ছাড়া ওরই তো আগে শোনা উচিত। আমরা তো ওরই অতিথি। লোকটার মন খুব খারাপ। পুলিশ হাঙরটাকে কোথাও খুঁজে পেল না। এমন ট্রেইন্ড হাঙর আছে বলে কখনও শুনিনি।

ব্রাউনের কথা শেষ হওয়া মাত্র অর্জুন উঠে বসল। যে চিন্তাটা মাথায় পাক খাচ্ছিল অথচ স্পষ্ট হচ্ছিল না, ব্রাউন তা নিজের অজান্তেই বলে ফেলেছে। ট্রেইন্ড হাঙর। যে লোক সাপ পুষতে পারে সে তো হাঙরকেও পোষ মানাতে পারে। কাল সন্ধেবেলায় জলের তলায় তোলপাড় করে খাঁড়ি থেকে হাঙরটা বেরিয়ে যায়নি তো। আর খাঁড়ির ভেতরে লুকিয়েছিল বলেই জলপুলিশ সমুদ্রে ওকে খুঁজে পায়নি। উত্তেজিত হয়ে অর্জুন হাত বাড়িয়ে দিল, “থ্যাঙ্ক হউ, মিস্টার ব্রাউন। আপনি অনেক করলেন!”

হতভম্ব ব্রাউন হাত স্পর্শ করল, “আমি আবার কী করলাম?”

জবাব না দিয়ে অর্জুন বাইরে বেরিয়ে এল। মেজর আর মার্শাল ওঁদের তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। মেজর অর্জুনকে দেখে বললেন, “গতকাল তুমি খুব টায়ার্ড ছিলে বলে আর প্রসঙ্গ তুলিনি। কিন্তু অর্জুন, আমাকে না জানিয়ে তুমি অ্যাডভেঞ্চার করছ এটা ওই আরশোলার কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত শুনতে হল আমায়?”

“অ্যাডভেঞ্চার নয়, বিপদ আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে এখানে এসেছে। আপনাদের জানানোর আগে নিজে নিঃসন্দেহ হতে চাইছিলাম।” অর্জুন বলল।

“বিপদ? এখানে আবার কিসের বিপদ?” মেজর খিঁচিয়ে উঠলেন।

“মিস্টার মার্শাল, এখানে আপনি কতদিন আছেন?”

“বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল।”

“দ্বীপের ওপাশে যারা আছে তাদের সম্পর্কে আপনি নিরাসক্ত কেন?”

“আমার কী প্রয়োজন! আমি আমার কাজ করছি। ওরা সেই কাজে যতক্ষণ নাক না গলাচ্ছে, ততক্ষণ ওদের নিয়ে ভাবার কী আছে?”

“আপনি প্রোফেসর হ্যাচ নামের কাউকে চেনেন?”

মার্শালের কপালে একটু ভাঁজ ফুটল। তারপর মাথা নেড়ে হাসলেন, “না। অবশ্য পুরো নাম বললে সুবিধে হত। হ্যাচ নামে দু’জনকে চিনি। একজনের অভিযাত্রী হবার খুব শখ ছিল। সেটা অনেকদিন আগের কথা। আর-এক হ্যাচ বিমা কোম্পানির দালালি করে। কেন বলো তো?”

“না। কিছু নয়। আমি প্রোফেসর হ্যাচ নামের কাউকে খুঁজছি যিনি সাপ ভালোবাসেন, আবার হাঙরও ভালোবাসেন বলে মনে হচ্ছে।” অর্জুন যেন নিজের মনে বলল।

মার্শাল কাঁধ নাচালেন।

মেজর বললেন, “মার্শাল এখান থেকে ফিরে যাবে ঠিক করেছে। ওর সমস্ত কাজ ভণ্ডুল হয়ে গেছে। তুমি তৈরি হয়ে নাও। আমরা আজই এখান থেকে ফিরব।”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “না। মার্শালসাহেব যদি অনুমতি দেন, তা হলে আমি আরও দিন-তিনেক এখানে থাকতে চাই।”

অর্জুনের কথা শুনে মার্শালের চোখ ছোট হল, “তোমার উদ্দেশ্যটা কী? কেন এখানে থাকতে চাইছ?”

অর্জুন হাসল, “একজন সত্যসন্ধানী হিসেবে আমি সত্যের স্বরূপ দেখতে চাই।”

মার্শাল জিজ্ঞেস করলেন, “তার মানে? এখানে অসত্য কোথায়? আমার এতদিনের পরিশ্রম একটা হাঙর নষ্ট করে দিল। আমাকে বাধ্য করছে গবেষণা গুটিয়ে নিতে। জল-পুলিশকে জানিয়ে বেইজ্জত হলাম। এসব কি মিথ্যে?”

“না। আমি আপনার ব্যাপার নিয়ে কথা বলছি না।”

“তা হলে?”

“রহস্য নিশ্চয়ই আছে। আর সেটা আগে থেকে প্রকাশ করতে বলবেন না দয়া করে।”

এইসময় পেছনে দাঁড়ানো ব্রাউন বলে উঠল, “রহস্যের গন্ধ না পেলে কে আসত এখানে?”

“চোপ!” মেজর এবার বিরাট ধমক দিলেন, “তোমার জন্যেই ছেলেটা বিপদের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল। দ্বীপের ওপাশে হনুমানের মতো গাছের ওপর লেজ গুটিয়ে বসতে বলেছিল কে? গুলিটা গাছে না বিঁধে মাথায় ঢুকলে খুশি হতাম আমি।”

“কী, আমাকে হনুমান বলা হচ্ছে? মুখে যা আসছে তাই বলা? আমি হনুমান হলেও তুমিও তো তাই। যত্তসব বদমাশদের সঙ্গে সময় কাটাতে হচ্ছে আমাকে,” ব্রাউন বলল।

অর্জুন মার্শালকে বলল, “তিনদিন থাকতে দিন আমাদের। তিনদিন বাদে না-হয় ফিরে যাবেন। এই দ্বীপের ও প্রান্তে প্রোফেসর হ্যাচ কেন ঘাঁটি গেড়ে বসে আছেন, সেই সত্যটি আমায় উদ্ঘাটিত করতে হবে। একটা লোক দলবল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গাড়ির মধ্যে খামোখা থাকতে পারে না। তার ওপর লোকটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির।”

মেজর বললেন, “লেট্স গো। চলো, আমরা দলবেঁধে গিয়ে লোকটাকে ওর ধান্দার কথা জিজ্ঞেস করি। মার্শালের মন ভেঙে গেছে। এখন আর এখানে থাকার কোনও মানে হয় না।”

মার্শাল মাথা নাড়লেন, “না। ওদিকে যাওয়া চলবে না। তোমাদের কথাটা বলিনি। কিছুদিন আগে সরকারি দফতর থেকে আমাকে জানানো হয়েছিল, একজন অধ্যাপক দ্বীপের উলটো দিকে সমুদ্রের জল নিয়ে গবেষণা করবেন। তিনি সেটা নির্বিঘ্নে করতে চান। আমি বা আমার কেউ তার এলাকায় যেন প্রবেশ না করি, কারণ তিনি সেটা পছন্দ করছেন না। আর আমার গবেষণার কাজৌ তিনি ব্যাঘাত সৃষ্টি করবেন না। এই অবস্থায় আমি ওদিকে যেতে পারি না।”

শেষ পর্যন্ত মার্শাল স্থির করলেন, অর্জুনের কথামতো আরও তিনদিন এখানে কাটিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এখন ঘড়িতে ন’টা পনেরো। সে মার্শালকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার একটা দাঁড়-টানা নৌকো আমি ধার নিতে পারি?”

মার্শাল বললেন, “স্বচ্ছন্দে। কিন্তু হাঙরটার কথা ভুলে যেও না।”

দশটা নাগাদ অর্জুন রওনা হল। ব্রাউন দু’হাত নেড়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তার জীবনের দাম আছে। যেখানে হাঙরটা হাঁ করে আছে সেখানে যেচে সে তার মুখের ভেতর ঢুকতে চায় না। আর ব্রাউনের বক্তব্যই যেন মেজরকে উদ্বুদ্ধ করল অর্জুনের সঙ্গী হতে। নৌকোটা মাঝারি। মেজর আর অর্জুন দু’পাশে বসে দাঁড় টানছিল। কাজটা অর্জুন এই প্রথম করছে না। জলপাইগুড়ির করলা নদীতেও সে এর আগে নৌকো বেয়েছে। দিনবাজারে পুলের নীচ থেকে কিড সাহেবের ঘাট পর্যন্ত। কিন্তু এটা সমুদ্র এবং তলায় একটা দানব হাঙর রয়েছে। বুকের ভেতর শিরশিরে ভয় মুখ গুঁজেই ছিল। ঠোঁটে চুরুট চেপে দু’হাতে দাঁড় টানছিলেন মেজর। সেই অবস্থায় বললেন, “চেহারা একরকম হতেই পারে, কিন্তু অভ্যাস, সাহস ওই ছুঁচোটা পাবে কোত্থেকে? নৌকো চালানো আমার কাছে কিছু নয়। একবার ব্ল্যাক সি’তে একটানা ছত্রিশ ঘণ্টা নৌকো বেয়েছি। কিন্তু এবার বলো তো হে, আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

“আপনি একদম ভুলে গিয়েছেন। উত্তর দিকে একঘণ্টা যাত্রা। গতি দাঁড়-টানা নৌকোর। যেখানে মাটি যতদূর, আকাশ ততদূর! মে মাসে সূর্য ঠিক মাথার ওপরে আসবে সাড়ে বারোটায়।”

অর্জুনের কথা শেষ হওয়ামাত্র মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “ওই প্রোফেসর হ্যাচটা কি আমাদের বোল্টন থেকে ফলো করে আসছিল?”

“ব্ল্যাকপুলের পরে আর করেননি?”

“কিন্তু এটাই যে সেই সমুদ্র তা কী করে জানলে?”

“নিশ্চিত নই। তবে লক্ষণ দেখে অনুমান হচ্ছে মাত্র।”

“আমরা কি উত্তর দিকে যাচ্ছি।”

“হ্যাঁ। এবং এখনও কোনও হাঙর দেখিনি।”

“ইয়ে, মার্শালকে কি লকারের লেখাটার কথা বলব? ও আমাদের হোস্ট।”

“দাঁড়ান। সময় হোক। নিশ্চয়ই বলা যাবে। আপনি ডান দিকে ঝুঁকে বসবেন না। হ্যাঁ, ঠিক আছে। আজকের আবহাওয়াটা কিন্তু চমৎকার,” অর্জুন বলল।

মাঝখানে সরে এসে মেজর বললেন, “এখন কিন্তু মে মাস নয়।”

“তার জন্যে যোগ-বিয়োগের অঙ্কটা করতে হল। এবার বেশ বড় বড় ঢেউ আসছে।”

“ঢেউয়ের বিরুদ্ধে শক্তি দেখাতে নেই। জাস্ট নৌকোটাকে সোজা রাখতে চেষ্টা করো।”

প্রতি মুহূর্তে অর্জুনের মনে হচ্ছিল, ডুবে যাবে। একদম না ভেবেচিন্তে আসা হয়েছে। নৌকোটা জলের ওপর উঠছে আবার ঢেউয়ের টানে নেমে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরে শিরশিরে অনুভূতি। মিনিট-পাঁচেক যাওয়ার পর মনে হল, সমুদ্র আবার শান্ত হল। কিন্তু ওই পাঁচ মিনিট যেন কাটতেই চাইছিল না।

ঘড়িতে যখন নৌকো বাওয়ার সময় এক ঘণ্টা পার হল, তখন অর্জুন আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য মাথার ওপরে মোটেই নেই। ওপাশের দ্বীপের গাছপালা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওপাশে সমুদ্রের ওপরে যেন আকাশ খুব কাছাকাছি নেমে এসেছে। না। আরও যেতে হবে। এইবার মনে ভয় এল। হাঙরটা সামান্য ছুঁলেই দেখতে হবে না। হাঙরটা কি ওর স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করবে? জলের ওপরের কাউকেই তো আজ পর্যন্ত বিরক্ত করেনি। আর এমন হতে পারে, দানবটা এখন খাঁড়ির মধ্যে ঢুকে বিশ্রাম নিচ্ছে। ওকে ডিঙিয়ে যখন হ্যাচের নৌকো যাওয়া-আসা করে নির্বিঘ্নে, তখন নৌকোর ওপরে রাগ নেই বলেই ধরে নেওয়া যায়। হঠাৎ মেজর বললেন, “শাবাস বাঙালি!”

অবাক হয়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “তার মানে?”

“এই বয়সের এক বাঙালি তরুণ ইংল্যান্ডের সমুদ্রে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে, ভাবা যায়?”

“আপনি তো বাঙালি, কত অ্যাডভেঞ্চার করেছেন জীবনে!”

“হ্যাঁ। কিন্তু জানো, দেশের মানুষ আজ পর্যন্ত কোনও স্বীকৃতি দিল না। বড় দুঃখ হয়।”

অর্জুন ঘড়ি দেখল। বারোটা বাজতে পনেরো। এখন দ্বীপটাকে অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। এত বড় সমুদ্রে আর কেউ নেই। সময় মিলিয়ে ও শেষ পর্যন্ত মেজরকে নৌকো থামাতে বলল। এখন মাথার ওপরে সূর্য। মাটি যতদূরে, ওপাশের আকাশ ঠিক ততদূরে। অবশ্য এতেই আনন্দিত হবার কিছু নেই। পৃথিবীর যে-কোনও সমুদ্রে গিয়ে এইরকম জায়গায় পৌঁছনো যায়। সে মেজরকে বলল, “আপনার তো সমুদ্রের অভিজ্ঞতা আছে। এই জায়গাটা দ্বিতীয়বার আসতে পারবেন?”

“এই নৌকো বেয়ে? কক্ষনো না। মেজর ঘনঘন মাথা নাড়লেন।

“না, নৌকো বেয়ে নয়। ধরুন, লঞ্চেই এলাম। জায়গাটা চিনতে পারবেন তখন?”

মেজর চারপাশে মুখ ফেরালেন। বিড়বিড় করে কী সব হিসেব করলেন। তারপর বললেন, “পারব। কোনও গোলমাল নেই।”

“তা হলে চলুন ফিরে যাই।’

“সে কী! খুঁজবে না?”

“ডুবুরির পোশাক আনিনি। আর সেটা করায় বেশ ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যেত।”

“তা হলে ফালতু আনলে কেন?”

“জায়গাটাকে আবিষ্কার করতে। আবিষ্কার করে চিনে রাখতে প্রোফেসর হ্যাচ শুধু এই জায়গাটাকে খুঁজে বের করার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। এখানে আর বেশি সময় আমাদের থাকা উচিত হবে না। যদি কেউ দ্বীপ থেকে দূরবীনে আমাদের লক্ষ করে, তা হলে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারবে।”

অর্জুনরা ফেরার সময় আবার ঢেউয়ের পাল্লায় পড়ল। দু’জনেই ভিজে একশা হয়ে গেল। কিন্তু সেই জলদানবটা তাদের নৌকো উলটে দিল না। ওরা স্বচ্ছন্দেই তীরে ফিরে আসতে পারল। ব্রাউন আর মার্শাল দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওরা নৌকো থেকে নামতেই মার্শাল জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের মতলব কী ছিল বলো তো? এত কষ্ট করে অত দূরে গেলে আর ফিরে এলে, যাওয়ার দরকারটা কী ছিল?”

ব্রাউন হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠল, “কেমন শকুনভেজা ভিজেছে দ্যাখো।

দাড়ি থেকে জল মুছছিলেন মেজর। থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ভেজা? কাকভেজা বলে একটা কথা আছে জানতাম, শকুনভেজা জীবনে শুনিনি। দাঁড়াও, আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন।” মেজরের কথা শেষ হওয়া মাত্র ব্রাউন একেবারে পেছন ফিরে হাঁটা শুরু করল। অর্জুন মেজরকে বাধা দিল, “ছেড়ে দিন তো। আপনার ওষুধের স্টকে এর কোনও প্রতিবিধান আছে?” নিজের হাতের চেটো দেখাল অর্জুন। সেখানে বড়-বড় ফোসকা মাথাচাড়া দিয়েছে সবে। মেজর হাসলেন, “আছে। একটু জ্বালাবে। নভিসদের হয়।”

“আপনার হাতে হয়নি?”

“দ্যাখো। মেজর বীরত্বের ভঙ্গিতে দুটো হাত বাড়িয়ে দিয়ে চমকে উঠলেন, “সে কী!” তাঁর হাতেও ছোট-ছোট ফোসকা। কাঁধ ঝাঁকিয়ে মেজর বললেন, “আসলে দাঁড়টাই খারাপ ছিল। তাঁবুতে চলো, ওষুধ লাগাই।”

মেজরকে অনুসরণ করার সময় অর্জুন এক চোখে মার্শালকে দেখল। কোনও মানুষের অমন সন্দেহজনক দৃষ্টি এর আগে সে কখনও দ্যাখেনি।

সারাটা দিন শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিলেন মেজর আর পানীয় খেলেন। তাঁর গায়ে-হাতে নাকি বেদম ব্যথা। ব্যথার কারণেই ওই পানীয় দরকার। অনভ্যাসে অর্জুনেরও শরীরে ব্যথা হয়েছে। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর সে ওদিকের বালুতটেই ঘুরে বেড়াল। এখন প্রহরীরা আর তাকে বাধা দিচ্ছে না। কাজ বন্ধ করে ফিরে যাওয়ার হুকুম হওয়ায় তাদেরও কর্তব্য আর তেমন কঠোর নয়। ওপাশে, বন্দরের দিকে সমুদ্রে সারাদিন ছোট-ছোট নৌকো ভাসল। গরমের সময় ব্রিটিশরা নৌকো চড়তে খুব ভালবাসে। হাঙরটা জলের তলায় রয়েছে। জল-পুলিশ যাই বলুক, নিজের চোখকে তো অবিশ্বাস করা যায় না। অথচ জলবিহার করছে যারা, তারা কোনও দুর্ঘটনায় পড়ছে না। হোক ওটা বন্দরসংলগ্ন সমুদ্র, কিন্তু সেখানে পৌঁছতে তো হাঙরের সামনে কোনও বাধা ছিল না। এইটেই অর্জুনকে খুব ভাবাচ্ছিল। যে সাপকে পোষ মানাতে পারে সে কি হাঙরকেও পারে? পোষমানা হাঙরটা কি তাই খাঁড়ির মধ্যে থাকে? অর্জুনের সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। এরকম ঘটনা কে কবে শুনেছে?

সন্ধের মুখে মার্শাল এলেন হন্তদন্ত হয়ে। অর্জুন তখন সমুদ্রের ধারে চুপচাপ বসে ছিল। এসে বললেন, “ভেবেছটা কী? অ্যাঁ?”

অর্জুন লোকটার পরিবর্তন দেখে একটু অবাক হল। মার্শাল বললেন, “এইমাত্র আমি আমার বন্ধুর কাছে শুনতে পেলাম, কেন তোমরা সকালে নৌকোয় বেরিয়েছিলে। মেজর আমার কাছে এসব চেপে গিয়েছিল। নেহাত চেপে ধরতেই সব বলে ফেলল। তোমরা আমার কাছে বেড়াতে আসোনি। তোমাদের মতলব ছিল অন্যরকম।”

মেজরের ওপর প্রচণ্ড রেগে গেল অর্জুন। পানীয় মানুষের সর্বনাশ করে এটাও আর-একটা প্রমাণ। ব্যাপারটা তিনি ব্রাউনকেও বলে বসতে পারনে। মার্শাল তার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছেন, “বুঝতেই পারছ আমি খুব অপমানিত বোধ করছি। এই কারণেই তুমি আরও তিনদিন থেকে যেতে চাইছিলে? একা-একাই গুপ্তধন বের করতে পারবে? খুব সাহস তোমার, না?”

অর্জুন হাসবার চেষ্টা করল, “দেখুন, আপনি মিছিমিছি উত্তেজিত হচ্ছেন। মেজর আপনাকে যে কথাগুলো বলেছেন, তা নেশার ঘোরে বলেছেন। গুপ্তধনের একটা খবর আমরা পেয়েছি কিন্তু কোন সমুদ্রে সেই গুপ্তধন লুকোনো রয়েছে, তা জানি না।”

“তুমি খুব চতুর। তুমি ইন্ডিয়ায় থাকো। যদি কিছু লুকোতে হয় সেটা ইন্ডিয়ায় না লুকিয়ে ইংল্যান্ডে লুকোতে আসবে। যিনি কাণ্ডটা করেছেন তিনি এই অঞ্চলের লোক। একসময় আমরা কত অভিযানে বেরিয়েছি। এই সমুদ্র ছাড়া অন্য কোথাও সে লুকোতে যাবে না।”

অর্জুনের মাথার ভেতর বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে গেল যেন। সে হাসল, “ওঃ, খুব ভাল হল। আপনি যখন ওঁকে চিনতেন তখন খুব সুবিধে হবে যদি আমরা একসঙ্গে কাজ করি।”

একটু খুশি হলেন যেন মার্শাল, “চিনতাম মানে? ভাল করে চিনতাম। হ্যাঁ, আমিও শুনেছিলাম, সে কিছু দামি জিনিস কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। রাখতেই পারে। আমি কৌতূহলী হইনি। তা কোথায় রেখেছে, কী রেখেছে, বলো তো?”

“মেজর আপনাকে বলেননি?”

“আরে কী একটা কথা কবিতার মতো বলছিল। যার কোনও মানেই হয় না। নেশার ঘোরে ও কবিতাটাই সম্ভবত গুলিয়ে ফেলেছে। চিরকালই একরকম। তবে তুমি যদি আমাকে বলতে তাহলে সাহায্য করতে পারতাম। এদিকের সমুদ্র তো আমার জানা।” মার্শাল হাসলেন।

অর্জুন দ্বিধায় পড়ল। এখন এই ভদ্রলোককে না জানিয়ে উপায় নেই। সূত্র অনুযায়ী সন্ধান করতে গেলে ওঁকে জানিয়েই করতে হবে। অন্য কোনও একটা ভান দেখিয়ে করা যেত যদি মেজর নেশার ঘোরে ফাঁস না করে দিতেন। অতএব সে জুতো-রহস্য থেকে শুরু করল। কীভাবে বোল্টনে আসার পথে হাইওয়ের ওপর ডিপার্টমেন্টাল দোকানে জুতোটাকে পেয়েছিল। জুতোর লুকনো গর্ত থেকে কাগজ আবিষ্কার করেছিল। কাগজের সূত্র অনুসরণ করে একটি প্রায় পরিত্যক্ত বাগানবাড়ি থেকে লকারের চাবি উদ্ধার করেছিল এবং সব শেষে লকার থেকে জ্যাকের নির্দেশসূচক কাগজ নিয়ে এখানে এসেছে তার বিশদ জানাল। শুধু কাগজের নির্দেশের কথাগুলো একটু গোলমাল করে দিল। সমুদ্র। উত্তর দিকে একঘণ্টা যাত্রা। যেখানে মাটি যতদূর আকাশ ততদূর। নভেম্বরে সূর্য মাথার ঠিক ওপরে আসে বেলা বারোটায়। ডুবুরি। সুড়ঙ্গটা তার তলায়।

মে মাসের বদলে নভেম্বর, সাড়ে বারোটার বদলে বারোটা। নোয়ার আমল থেকে না-নড়া জাহাজ বাঁধা পাথরটার কথা সে উল্লেখই করল না। অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে শুনছিলেন মার্শাল। অর্জুন শেষ করতে তার মুখের আলো নিভে এল, “ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না হে।”

“আমি বুঝতে পারছি না। এখানে ডুবুরি আছে?”

“তা থাকবে না! বন্দরে গণ্ডায় গণ্ডায় ডুবুরি আছে। কিন্তু তারা কী করবে?”

‘সেটা একটা কথা।”

“তোমরা আজ সকালে নৌকো নিয়ে সমুদ্রের ওখানে গিয়ে কী করছিলে?”

“খুঁজছিলাম। জায়গাটা ঠিক কোথায় হবে…” অর্জুন কথা শেষ করতে পারল না। মার্শাল হেসে গড়িয়ে পড়লেন, “জলের ওপরে ভেসে তুমি নীচের ব্যাপার বুঝবে! আরে এই সমুদ্রের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি খুঁজে মরেছি আমি। বলেই থেমে গেলেন।

“প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে আপনি কী খুজেছেন?” অর্জুন চটপট প্রশ্ন করল।”

“মানে, যেখানে-সেখানে তো মুক্তোর চাষ হয় না। তার জন্যে ভাল জায়গা চাই, যেখানে ঝিনুকগুলো ভাল থাকবে। সেইজন্যেই জায়গা খুঁজতে হয়েছিল আমাকে। ঠিক আছে, মাথার মধ্যে নিয়ে নিলাম সূত্রটা। রাতভর ভেবে কাল সকালে তোমাকে বলব।” আচমকা আলোচনায় যবনিকা টেনে দিয়ে মার্শালসাহেব তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেলেন।

পরিবর্তনটা লক্ষ করে অর্জুনের মনে হল, মানুষের মনের চেহারাটা বোঝার মতো যন্ত্র যদি আবিষ্কার করা যেত তা হলে পৃথিবীর অনেক সমস্যার যেমন সমাধান হত, তেমনি সেটা বাড়তও। আর তখনই ব্রাউন ঢুকল। সটান অর্জুনের কাছে এসে নিচু গলায় বলল, “তুমি একটা হাঁদারাম। মার্শালকে সব কথা বলে দিলে? এখন বুঝবে মজা। এমন কাজ কেউ কখনও করে? আর ওই হুমদো গোরিলাটার অত পানীয় খাওয়া কেন, যদি নেশার ঝোঁকে পেট থেকে কথা চালান করে দেয়?”

“আপনি কী ব্যাপারে কথা বলছেন?” অর্জুন নিরীহ স্বরে প্রশ্ন করল।

“আঃ। ওই গুপ্তধনের ব্যাপারটা!” ব্রাউন হাসল, “আমার এখন মনে হচ্ছে মার্শালের ওসব মুক্তো-ফুক্তো ফালতু ব্যাপার। গুপ্তধনের সন্ধানেই এই দ্বীপে বাসা বেঁধেছে। আর শুধু মার্শালই নয়, ওই ওপাশে হ্যাচ না ফ্যাচ, কী নাম যেন বললেন, সেও দলবল নিয়ে একই ধান্দায় এসেছে। উঃ, রহস্যের গন্ধ গেলে আমার পাকস্থলী পর্যন্ত চনমনে হয়ে ওঠে।”

“অতসব কথা আপনি জানলেন কী করে?”

“তাঁবুর বাইরে থেকে তোমার আর মার্শালের কথা কান পেতে শুনে ফেললাম। তুমি বলতে পারো অন্যের কথা না বলে শোনা অন্যায়, কিন্তু না শুনলে তো তোমাকে সাবধান করতে পারতাম না। সবচেয়ে দুঃখের কথা কী জানো, ওই হাঁদারাম গোরিলাট। গুপ্তধন খুঁজতে এসে নাক ডাকাচ্ছে।কথাগুলো বলে ব্রাউন ফিসফিস করে বলল, “আমি বলছিলাম আজ রাত্রেই বেরিয়ে পড়া ভাল।”

“কোথায়?”

“গুপ্তধন খুঁজতে।”

“কীভাবে যাবেন! এখন তো মাথার ওপরে সূর্য নেই।”

অর্জুন আর কথা না বলে বাইরে বেরিয়ে এল। এখন বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে। পুরো ব্যাপারটা যেন ভণ্ডুল হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে মার্শাল জেনেছেন, এবার ব্রাউন জানল। এতগুলো লোভী লোককে সামলে গুপ্তধন খোঁজা সহজ কাজ নয়। সে অন্ধকারে পায়চারি করতে-করতে এগিয়ে যেতেই একটি শরীর দেখতে পেল। লোকটা বেশ হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। হাঁটার ভঙ্গি দেখে মার্শালকে চিনতে অসুবিধা হল না। অর্জুন সন্তর্পণে ওকে অনুসরণ করল। তারপরই দেখল, মার্শাল একা নন। ওঁর সঙ্গে একজন প্রহরীও রয়েছে। দুজনে একটা স্টিমবোটে উঠে ইঞ্জিন চালু করলেন। মুহূর্তেই বোটটা ঘুরে বন্দরের দিকে এগিয়ে চলল। যে মার্শাল নিজেই বলেছেন, সমুদ্রে এখন রাত্রে চলাফেরা ঠিক নয়, সেই মার্শাল চললেন কোন উদ্দেশ্যে! অর্জুন পেছনে নিশ্বাসের শব্দ পেয়ে দেখল, ব্রাউন এসে দাঁড়িয়েছে। ব্রাউন বলল, “আজ রাত্রে আর ঘুম হবে না দেখছি।”

“কেন?”

“মার্শাল বন্দরে কেন যাচ্ছে বুঝতে পারছ না? ডুবুরি আনতে।”

অর্জুন হেসে ফেলল। সে যে সূত্র দিয়েছে তাতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ব্যক্তিও জায়গা বুঝতে পারবে না। অতএব ডুবুরি আনিয়ে মার্শাল কিছুই করতে পারবেন না। ঘণ্টা-তিনেক বাদে মার্শাল ফিরে এলেন। সঙ্গে একটা কাঠের বাক্স। তৃতীয় কোনও ব্যক্তি নেই।

মার্শালের চেহারা যেন আচমকা পালটে গিয়েছে। বেশ হাসিখুশি, সেই চিন্তিত ভঙ্গিগুলো আর নেই। মেজরের সঙ্গে তো বটেই, অর্জুনকে ডেকে-ডেকে খোশগল্প করেছেন। তবে ব্রাউন সম্পর্কে উনি দূরত্ব রেখেই চলছেন। সম্ভবত, মেজর যেহেতু ব্রাউনকে পছন্দ করেন না, মার্শালও মেনে নিচ্ছেন না। এমনকী, আগামীকাল যে অভিযান হবে তার আলোচনাও এমনভাবে হল যখন ব্রাউন ধারে-কাছে নেই। আলোচনা শেষ হলে প্রশ্ন উঠল ব্রাউনকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে কি না। মেজর মাথা নেড়েছিলেন, “সঙ্গী নিয়ে যাওয়া উচিত হবে কি না। মেজর মাথা নেড়েছিলেন, “সঙ্গী হয়ে গেলেই ও ভাগ চাইতে পারে। একটা পথের উটকো লোককে খামোখা ভাগ দিতে যাব কেন?” মেজর এমনভাবে কথা বললেন যেন গুপ্তধন পেয়েই গেছেন। মার্শাল ইতিমধ্যে মেজরের কাছে বিশদ জেনেছেন। যদিও মেজর অর্জুনকে আলাদা বলেছেন ব্যাঙ্কের লকারে পাওয়া কাগজের লেখার সবটুকু তাঁর মনে নেই বলে তিনি মার্শাল অনেকবার জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়ার পথটা বলতে পারেননি পুরো। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, ব্রাউনকে বলা হবে তারা যাচ্ছে সেই হাঙরটাকে মারতে, যে মার্শালের মুক্তো নিয়ে গবেষণা বানচাল করে দিচ্ছে। এই ঝুঁকির কাজে যদি সে সঙ্গী হতে চায় তো আসতে পারে।

রাত্রে নিজের তাঁবুতে শুয়ে অর্জুন ব্রাউনের নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেল। ইতিমধ্যে সে বুঝে গিয়েছে লোকটা মোটেই ধূর্ত নয়, বোকা-চালাক বলা যেতে পারে। এবং বাউণ্ডুলে। কিন্তু মার্শালকে সে বুঝতে পারছে না। মেজরের মুখে ওই গোপন খবরটা শোনার পর লোকটা হাবভাবই পালটে গেল? মার্শাল বলেছেন যে, হাঙরটাকে জব্দ করতে এক কাঠের বাক্স অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন যার ফলে এগিয়ে যেতে অসুবিধে হবে না। তাই যদি হয়, মার্শাল এতদিন নিশ্চুপ ছিলেন কেন? তাঁর মুক্তো ধ্বংস করছে হাঙরটা অথচ তিনি অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধ করেননি কেন? একই দ্বীপের ওপাশে কিছু লোক মতলব নিয়ে সমুদ্রে ঘুরছে আর এপাশে মার্শাল মুক্তোর চাষ ছেড়ে নড়ছেন না। এ-দুটোর মধ্যে যোগসূত্র আছে কি?

রাত তিনটের সময় ঘুম ভাঙল অর্জুনের। ব্রাউন এখন নিঃশব্দে ঘুমোচ্ছে। সে জামাকাপড় পরে বাইরে বের হল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। মেজরদের তাঁবু ঘুমন্ত। এখনও সমুদ্রের ওপর অন্ধকার স্থির। মাথার ভেতরে টিপটিপে যন্ত্রণা হচ্ছে। অস্বস্তি বেড়ে গেলে এমন হয়। এই সময় একটি লোককে সমুদ্র থেকে উঠে আসতে দেখল। ওদিকটা উঁচু থাকার জন্য চট করে দেখা যায় না। লোকটা কাছে এলে সে মার্শালকে চিনতে পারল। পেরে সরাসরি বলল, “আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে!”

“আরে তুমি? ঘুম ভেঙে গেল! একটু আগে দেখে এলাম ঘুমাচ্ছ!”

“আমাকে ঘুমন্ত দেখতে আসার কি কোনও কারণ ছিল?”

তোমাকে নয় হে! তাঁবুতে তো আর একজন আছে। আসলে আমি আমার সাবমেরিনে অভিযানের মালপত্র তুলে দিলাম। ব্রাউন সেটা দেখুক। আমি চাইনি।”

অন্ধকারে লোকটার অভিব্যক্তি ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “সাবমেরিন থেকে জলের তলায় হাঙরটার সঙ্গে কীভাবে লড়াই করবেন?”

“সেইটেই সমস্যা। আমারটা যাকে বলে ফাইটার সাবমেরিন নয়। ভেবেছি ওটাকে দেখলেই ওপরে উঠে আসব চটপট। তাড়া করে যেই ও জলের ওপরে মাথা তুলবে তখনই গ্রেনেড ছুঁড়ব। আমার সাবমেরিনের ছাদটা খুব দ্রুত খোলা যায়।”

“গুলি চালানো যাবে না ভেতর থেকে?”

“কী করে যাবে? বললাম না, ওটা ফাইটার নয়।

“যদি হাঙরটা ওপরে না উঠে আসে?”

“হুঁ। সেটাই সমস্যা। যাক, সমস্যা নিয়ে আগেই মাথা ঘামিয়ে কোনও লাভ নেই। আচ্ছা, কোড ল্যাঙ্গুয়েজটা ঠিক কী ছিল বলো তো?” মার্শাল আচমকা প্রশ্ন করলেন।

“কেন?” অর্জুনের গলার স্বর পালটে গেল।

“না, মানে, শুনলাম জুতোর গর্ত থেকে কাগজটা বের করেছিলে তুমিই। যা কিছু পরের ঘটনা তা তোমার জন্যেই ঘটেছে। আর আমি তোমাদের এই দ্বীপে আশ্রয় শুধু দিচ্ছি না, অভিযানেও সাহায্য করছি। তা হলে দাঁড়াল, তুমি আর আমি মুখ্য ভূমিকা নিচ্ছি। অতএব আমাদের মধ্যে একা আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকা ভাল।”

“কিছু মনে করবেন না, আমি তো আপনাকে ভাল করে জানি না।”

“অ।”

“তা ছাড়া শুধু মুক্তো নিয়ে আপনি এখানে গবেষণা করছেন এটাও অবিশ্বাস্য।”

“কেন?”

“এই সমুদ্রের জল ও ব্যাপারে আপনাকে খুব বেশি সাহায্য করবে না। হঠাৎ মার্শালের গলায় বরফ মিশল, “তুমি ওদের সঙ্গে কথা বলেছ?”

“কাদের সঙ্গে?”

“এই দ্বীপের ওপাশে যারা ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে!”

“না। কিন্তু আপনারা একই দ্বীপে এইরকম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আছেন কী করে? আপনারা দু’দলই কি সমুদ্রের তলায় কিছু খুঁজছেন?”

মার্শাল হাসলেন, “বয়সের তুলনায় তুমি দেখছি বেশি বুদ্ধি ধরো। তবে কথা হল কোনও কিছুরই বেশি ভাল নয়। মেজরকে কথা দিয়েছি যখন তখন কাল অভিযানে যাব। তবে সেটা শুধু কালকের জন্যেই। তোমরা বিকেলেই ফিরে যাও।” মার্শাল কথাগুলো বলে চলে যাচ্ছিলেন, অর্জুন তাকে পিছু ডাকল, “মিস্টার মার্শাল, কাল নয়, আমরা আজই অভিযানে যাচ্ছি। ভোর হতে যখন বাকি নেই তখন আপনাদের মতে তো ‘আজ’ শুরু হয়ে গিয়েছে।”

মার্শাল কোনও জবাব না দিয়ে নিজেদের তাঁবুর দিকে চলে গেলেন।

অর্জুনের আর সন্দেহ রইল না। দ্বীপের ওপাশে প্রোফেসর আর এপাশে মার্শালসাহেব সমুদ্রের মধ্যে যা খুঁজছেন সেটার সূত্রই সে লকারে পেয়েছে। কিন্তু এই সমুদ্রই যে ওই অনুসন্ধানের জায়গা তা নিয়ে অর্জুনের ধন্দ ছিল। অন্তত এখন এদের খোঁজাখুঁজি দেখে সেটা কমে গেল। অত সাবধানে যিনি লকারে কাগজ রেখেছিলেন তিনি প্রোফেসর এবং মার্শালসাহেবের পরিচিত ছিলেন? ওর ওই কাণ্ডকারখানার খবর কি এঁরা দু’জনেই রাখতেন? ফলে লোকটির মৃত্যুর পরে এঁরা অনুসন্ধানে নেমে পড়েছেন? লোকটি অভিযাত্রী ছিল। মেজরের কথা মানলে মার্শালসাহেবও অভিযাত্রী। অতএব যোগসূত্র থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। অবশ্য শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা বোকামি হবে। জলপাইগুড়িতে অমলদা এইরকম ভাবতে দেখলে কিছু বলতে না কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছলে হাসতেন।

তাঁবুতে ঢুকে অর্জুন দেখল ব্রাউন তখনও ঘুমোচ্ছে। অনেক বড় চেহারার মানুষও ঘুমোলে ছেলেমানুষের ভঙ্গি করেন। হঠাৎ ওর মনে হল ব্রাউন কি প্রোফেসরের লোক? তাদের ওপর নজর রাখার জন্যে প্রোফেসর ওকে পাঠিয়েছেন? মিসেস ব্রাউনের হোটেলেই তো সে প্রোফেসরকে প্রথম দেখে। তা হলে মেজর ভেবে ভুল করে ব্রাউনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার গল্প সাজানো? মাথার ভেতরে সব কিছু উলটো-পালটা হয়ে যাচ্ছিল। অর্জুন সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে ব্রাউনের বোঁচকাটায় হাত দিল। তাঁবুর ভেতর যে আলোটা জ্বলছে তার শক্তি খুবই কম। বোঁচকাটা পরীক্ষা করলে ব্রাউনের পরিচয় পাওয়া যাবে। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই সে হাত সরিয়ে নিল। ব্রাউন যদি প্রোফেসরের চর হয় তা হলে কিছুতেই কথায়-কথায় মেজরের সঙ্গে ঝামেলা করত না। মেজরের সঙ্গে ভাব জমাবার কোনও চেষ্টা তো নেইই, বরং একই চেহারার মানুষ তাকে শাসাচ্ছে এটা ব্রাউন সহ্য করতে পারে না। বিশেষ উদ্দেশ্য থাকলে সেটা পারত।

অর্জুন ব্রাউনকে ডাকল, “মিস্টার ব্রাউন!”

দ্বিতীয় ডাকেই চোখ খুলল ব্রাউন, “ও, তুমি! সকাল হয়ে গিয়েছে?”

“না। আপনার সঙ্গে কথা ছিল।”

“ভীষণ ঠাণ্ডা বাইরে, আমি যদি এভাবে শুয়ে শুয়েই কথা বলি?”

“ঠিক আছে। শুনুন, আমরা সকাল আটটায় অভিযানে বের হচ্ছি।”

“ওই হাঙরটাকে মারতে? আমি ওর মধ্যে নেই। ডাঙায় যে-কোনও ব্যাপারে আমাকে পাবে, কিন্তু জলে? অসম্ভব?” ব্রাউন পিটপিট করে তাকাল কথাগুলো বলে।

“কিন্তু আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন। যদিও বাকি দু’জন সেটা চাইছে না।”

“চাইছে না? গুড। ওরা দেখছি আমার প্রকৃত হিতৈষী। “আপনি ব্যাপারটা মন দিয়ে শুনুন। আমার মনে হয়েছিল আপনি আমাকে একটু স্নেহের চোখে দেখেছেন। আপনি না গেলে আমি বিপদে পড়ব।”

“তা হলে যাওয়ার কী দরকার, যেও না। চুকে গেল।”

অর্জুন ফাঁপরে পড়ল। লোকটাকে সব কথা খুলে বলা উচিত নয়। আবার না বললেও সাহায্য পাওয়া যাবে না, যেভাবে হাঙরভীতিতে রয়েছে। মেজর আছেন, কিন্তু আর একজন সঙ্গী চাই মার্শালের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্যে।

সে বলল, “মিস্টার ব্রাউন, আমরা হাঙর শিকারে যাচ্ছি না।”

“তা হলে? যাচ্ছ কোথায়? কাল মার্শাল একটা বাক্স এনেছে, জানো? তাতে কী আছে বলো তো? ওই হাঙরটাকে বধ করবার অস্ত্রশস্ত্র।”

“হতে পারে। কিন্তু আমরা যাচ্ছি অন্য উদ্দেশ্যে।

এবার উঠে বসল ব্রাউন, “তাই বলো। আমি গোড়া থেকেই রহস্যের গন্ধ পাচ্ছিলাম। কিন্তু ভাই, এই বালি আর জলে মালকড়ি আমদানির সম্ভাবনা যখন নেই, তখন আমিও নেই। কাল ফিরে যাওয়ার পর তো তোমরা হাওয়া হয়ে যাবে আর আমি আবার ভাসব। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসব কথাই ভাবছিলাম।

“ভাগ্য যদি ভাল হয় তা হলে আপনাকে আর ভাসতে হবে না।”

“মানে?” এক লাফে বিছানা থেকে নেমে এল ব্রাউন। এইসময় ঠাণ্ডার চিন্তাও তার মাথায় রইল না। অর্জুন হাসল, “আপনাকে এর বেশি কিছু বলব না।”

হঠাৎ অর্জুনের হাত ধরে প্রায় কেঁদে ফেলল ব্রাউন, “ব্রাদার, আমার খুব কষ্ট। কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না। আমার স্ত্রী তো নয়ই। জীবনে একবার অবিশ্বাসের কাজ করে ফেলেছিলাম বলেই এই দুর্দশা। কাউকে দোষ দিই না আমি। কিন্তু আজ এখানে কাল ওখানে করে ভেসে বেড়াতে ভাল লাগে, বলো? প্রায়ই আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়। সেদিন আর সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী’র কাছে ফিরে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম আমাকে থাকতে দিলে প্রমাণ করব আমি মানুষটা খারাপ নই। তা সে কথাই শুনতে চাইল না। তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ আর ভেসে বেড়াতে হবে না!”

“না, আমি কথা দিচ্ছি না। তবে ভাগ্য ভাল হলে ওরকম আশা করতে পারেন। কিন্তু একটা কথা, এই অভিযানে বিপদ আছে।”

“বিপদ? আমাকে বিপদের ভয় দেখিও না ব্রাদার। যে উনুনের আগুনে পুড়ে মরছে তাকে গরম তেল আর কী করতে পারে। ঠিক হ্যায়, আমি আছি।