লাইটার – ৩

।। তিন।।

শিল্পসমিতিপাড়ায় হেঁটে আসতে বেশ সময় লাগল। রায়দের বাড়ি এই শহরের সবাই চেনে। এখন রাস্তাঘাটে তেমন মানুষ নেই। দোকানপাটও এই শহরে সাততাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। তা ছাড়া সিকদারবাড়ি ছাড়ালে দোকানও বেশি নেই। হরিপ্রসাদ রায়কে সে চেনে না। কিন্তু ভদ্রলোক থাকেন আমেরিকা। এই গল্প সে জানে। মেমসাহেব বিয়ে করেছেন বলে বাড়িতে খুব ঝামেলাও হয়েছে। ওঁর বাবা খুব কনজারভেটিভ। অর্জুন ঠিক করেছিল হরিপ্রসাদ রায়কে অনুরোধ করবে তাঁর লাইটারটি দেখাতে। দুটো জাল জিনিসে কতটা তফাৎ দেখতে ইচ্ছে করছিল।

হরিপ্রসাদ রায় বাড়িতে নেই। দরোয়ান বলল, ‘সাহেব কখন ফিরবেন বলে যাননি।’ অর্জুন হতাশ হল। সিনেমা দেখবে বলে সাইকেল না নিয়ে বেরিয়ে এখন পা টনটন করছে। তবু ওর মনে হল যার লাইটার তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই ভাল। জাল জিনিস বয়ে বেড়ানোর কোনও মানে হয় না। কিন্তু সেই লোকটা এখন কোথায়?

জলপাইগুড়ি শহরে হোটেল বলতে একটাই। হোটেল না বলে একটা ভাল মেস বলাই সঙ্গত। আর আছে কয়েকটা বাংলো এবং জলপাইগুড়ি ক্লাব। শেষেরটার অবস্থা খুবই খারাপ। কিন্তু সেখানে থাকতে গেলেও কোনও মেম্বারের সুপারিশ দরকার হয়। তিস্তা বাংলোটার অবস্থা খুব ভাল। যদিও খাবার আগে থেকে না বললে পাওয়া যায় না। যে মানুষ বিকেলে এসেছিলেন তাঁর পক্ষে এই শহরে থাকতে গেলে ওখানেই থাকতে হবে।

তিস্তা বাংলোটা শহর ছাড়িয়ে রেসকোর্সের ওপারে। অর্জুন দ্রুত হাঁটছিল। লোকটা খুব সাধারণ নয়। কথাবার্তায় ঔদ্ধত্য আছে। ওইভাবে বলাই সম্ভবত অভ্যেস। কিন্তু উনি নকল লাইটার নিয়ে এই শহরে আসবেন কেন বুঝতে পারছেন না সে। পথে সেই হোটেলটা পড়েছিল। ম্যানেজারকে চেনে অর্জুন। তিনি বললেন, ওই বর্ণনার একটি লোক গাড়ি নিয়ে এখানে এসে খুব বাজে ব্যবহার করেছেন। তিনি নাকি বলেছেন, ‘এটাকে হোটেল বলে? আপনাদের ব্যবসা চালাতে কী করে লাইসেন্স দেয় কে জানে!’

ম্যানেজার এ-কথায় খুব আঘাত পেয়েছেন। না-হয় একটু নর্দমার গন্ধ ঢোকে, বেডকভার রোজ পালটানো হয় না, তাই বলে এমন কথা! লোকটা গাড়ি নিয়ে এখান থেকে তিস্তা বাংলোর দিকে গিয়েছে।

অর্জুন যখন সেখানে পৌঁছল তখন রাত ন’টা। এখন এলাকায নিশুতি রাত। গেট পেরিয়ে বিরাট বাংলোটাকে দেখল সে। আলো জ্বলছে। ঝকঝকে ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলোর সামনে কোনও গাড়ি দাঁড়িয়ে নেই। হতাশ হল সে। ভদ্রলোক হয়তো এখানে এসে কোনও ঘর খালি না পেয়ে শিলিগুড়িতে চলে গিয়েছেন। মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ। অনেক ভাল হোটেল আছে সেখানে। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই সে লোকটাকে দেখতে পেল। হাতে একটা জ্যান্ত মুরগি নিয়ে ঢুকছে। কাছাকাছি এসে সে লোকটাকে চিনতে পারল। এই বাংলোর বাবুর্চি। তাকে ওখানে দাঁড়াতে দেখে বার্বুচিও একটু অবাক হয়েছিল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের বাংলোর সব ঘর ভর্তি হয়ে গিয়েছে?”

লোকটা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ সাব।” মুরগিটা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “এত রাত্রে মুরগি আনলে কেন?”

লোকটা বলল, “সাবলোককো মর্জি অ্যাইসাই হোতা হ্যায়। ছে বাজে ইহা রুম লিয়া আউর এক ঘণ্টা পহেলে অর্ডার দিয়া মুরগি চাহিয়ে। আভি কাঁহা মিলেগা চিকেন? এক দোস্তসে লিয়া হ্যায়, দাম জাদা দেনে পড়েগা।”

অজুন সচেতন হল, “আচ্ছা। যে সাহেব বিকেলে এসেছে তার গাড়ি ছিল না?”

“হাঁ, থা।”

তোমাদের এখানে গ্যারেজ আছে?”

“নেহি।”

“কত নম্বর রুমে সেই সাহেব আছেন?”

“তিন।” লোকটা আর দাঁড়াল না। মুরগি নিয়ে কিচেনের দিকে ছুটল। রত্রের নির্জনতায় মুরগির প্রতিবাদ সোচ্চার হয়ে উঠছিল।

অর্জুন বাংলোটার দিকে তাকাল। বিকেলের আগন্তুকের যদি এখানে থাকেন তাহলে তাঁর গাড়ি কোথায় গেল? সে ধীরে-ধীরে বারান্দায় উঠে এল। কোলাপসিবল গেটটা টেনে দেওয়া কিন্তু এখনও তালা পড়েনি। চৌকিদারটা ধারেকাছে নেই। সোজা দোতলায় উঠে এল সে। লাউঞ্জের সোফায় বসে দু’জন ভদ্রমহিলা গল্প করছেন। অর্জুন উঠতেই তাঁরা একবার তাকিয়ে আবার কথা বলতে আরম্ভ করলেন। আগামীকাল তাঁরা জলদাপাড়ায় যাচ্ছেন গণ্ডার দেখতে।

অর্জুন তিন নম্বর ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল, সেটা বন্ধ। লাউঞ্জ থেকে সরে আসায় কাউকে চোখে পড়ছে না। সে দরজায় নক্ করল। ভদ্রলোকের যখন রাতের খাওয়া হয়নি তখন নিশ্চয়ই এখনই ঘুমিয়ে পড়েননি। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিল না। অর্জুন আর-একটু জোরে শব্দ করল। একটু অপেক্ষা সত্ত্বেও দরজাটা বন্ধই রইল। ভদ্রলোক যখন পরিশ্রান্ত তখন নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন। অর্জুন একটু অসহিষ্ণু হয়ে জোর চাপ দিতেই দরজাটা খুলে গেল।

একটু ইতস্তত করে অর্জুন ঘুরে ঢুকল। মোটামুটি সুন্দর সাজানো ঘর। শহরের হোটেলের চেয়ে ঢের আধুনিক। কিন্তু কেউ নেই এখানে। যদিও একটা স্যুটকেস আর ব্রিফকেস রয়েছে। কিছু কাগজপত্র এবং রুমাল রয়েছে টেবিলের ওপর। বিছানা দেখে মনে হয় কেউ শুয়ে ছিল। জুতো-জোড়া বিছানার নীচে খোলা। ভদ্রলোক গেলেন কোথায়?

অর্জুন অস্বস্তিতে পড়ল। মালিকের অনুপস্থিতিতে ঘরে ঢোকা অবশ্যই অন্যায়। সে বাইরে বেরিয়ে এসে চারপাশে তাকাল। কেউ নেই কাছাকাছি। সমস্ত ঘরের দরজা বন্ধ। আচ্ছা, ভদ্রলোক কি গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন? হয়তো অমলদার বাড়িতে গিয়েছেন লাইটারের খোঁজে। লোকটাকে দেখে অবশ্য মনে হওয়ার কোনও কারণ নেই যে, উনি জানেন না লাইটার জাল। কিন্তু কেউ কি ঘরের দরজা খোলা রেখে বাংলোর বাইরে যাবে? তা ছাড়া জুতো পর্যন্ত রয়েছে ঘরে। চিন্তাটাকে বাতিল করল অর্জুন। তারপর আবার ঘরে ঢুকল। সে ঠিক করল, চেয়ারে অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না ভদ্রলোক ফেরেন।

মিনিট দশেক পার হয়ে গেল। রাত হচ্ছে। বাড়িতে আরও দেরি করে ফিরলে মা চিন্তা করবেন। অর্জুন উঠল। এবং তখনই তার বাথরুমের কথাটা খেয়াল হল। ভদ্রলোক হয়তো পরিষ্কার হবার জন্য ওখানে গেছেন। আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল সে। এতক্ষণ তো কারও বাথরুমে থাকার কথা নয়। অর্জুন ধীরে-ধীরে উঠে বাথরুমের দরজায় হাত রাখল। একবার শব্দ করল। তারপর একটু জোরে ঠেলতে গিয়ে নজরে পড়ল এপাশ থেকে ছিটকিনি বন্ধ রাখা হয়েছে। বিস্মিত হয়ে সেটাকে খুলে দরজা ঠেলতে অবাক হয়ে গেল। ভদ্রলোক বাথরুমের মেঝেতে শুয়ে আছেন পাশ ফিরে। তাঁর পরনে পাজামা। ঠিক তাঁর ওপরে খোলা কল থেকে জল এসে পড়ছে শরীরের ওপরে। ফলে জলের শব্দ হচ্ছে না। কিন্তু বাথরুমটা ভেসে যাচ্ছে। অর্জুন ধীরে-ধীরে শরীরটার পাশে এসে দাঁড়াল। দুটো চোখ খোলা। হাতের শিরা দুটো কাটা। তা থেকে অনর্গল রক্ত বেরিয়ে জলের সঙ্গে মিশে গেছে। এখনও কালচে হয়ে আছে কিছু জায়গা। হাতের পাশে একটা ধারালো বিদেশি ব্লেড। দেখলেই বোঝা যায় উনি আত্মহত্যা করেছেন। অন্তত এক ঘণ্টা আগে তাঁর প্রাণ বেরিয়ে গেছে।