চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ৬

।। ছয়।।

সমস্ত শরীরে তীব্র কনকনানি, যেন হাড়ের গায়ে কেউ টোকা মারছে, অৰ্জুন লাফিয়ে উঠে বসল। দিল্লি ছাড়ার পর যে ঘুমটা এসেছিল, তা এখন উধাও। কামরার মধ্যে সাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা জমাট হয়ে রয়েছে। এত শীতে কেউ ঘুমোতে পারে না। কম্বলটাকে এখন ভীষণ পাতলা বলে মনে হচ্ছে। নীল আলোয় অর্জুন দেখল বিষ্টুসাহেব শরীরটাকে ছোট্ট করে শুয়ে আছেন। আর তখনই খেয়াল হল, ট্রেনটা চলছে না। কোথাও কোনও শব্দ নেই।

একটু হাঁটাচলা করলে আরাম হতে পারে। অর্জুন বার্থ থেকে নামতেই বিষ্টুসাহেবের গলা পেল। কম্বলের তলায় মুখ রেখে কথা বললেন, কিন্তু দাঁতে দাঁত ঠুকে যাওয়ার শব্দ হল, “এমন শীত কালিম্পংয়েও পড়ে না। অতি অভদ্র। উঃ। চললে কোথায়?”

“হাঁটব।” কথাটা বলে অর্জুন দরজা খুলে করিডরে এল। জোরে হাঁটলে শীত কমতে বাধ্য। গত সন্ধ্যায় দিল্লিতে ঠাণ্ডাটা এমন ছিল না। প্লাটফর্মে পা দেওয়া মাত্র সমস্ত ইতিহাস বইটা চোখের সামনে চলে এসেছিল। কিন্তু অত অল্প সময়ে প্লাটফর্মের বাইরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তা ছাড়া সেই ক্যাসেট হারানো নিয়ে মনটা খারাপ হয়ে ছিল। কেউ যে ওটাকে রেকর্ডার থেকে বের করে নিয়ে যাবে, ভারতেই পারেনি সে। খবরটা শুনে অমলদা হেসেছিলেন। তারপর বিষ্টুসাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “গান কেমন লাগল?”

“গান?”

“ক্যাসেটে যে গানটা ছিল শোনেননি?”

“হ্যাঁ। আমার এক বাউণ্ডুলে বন্ধু আছেন কলকাতায়। ওঁর কাছে পৃথিবীর প্রায় সবরকম গানের কালেকশন আছে। মজার ব্যাপার, ওর বাড়িতেও গত পরশু চোর এসেছিল। পাঙ্কদের গানের ক্যাসেটটা তেমন শ্রাব্য নয় বলে র্যাকে রেখে দিয়েছিল। শ্রীমান তস্কর ক্যাসেট-অ্যালবাম হাতড়ে কিছু না পেয়ে ওগুলোকে মেঝেতে ছড়িয়ে কেটে পড়েছিলেন। বন্ধুটি অবাক, তার বাড়িতে ওই প্রথম চোর ঢুকল।”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওঁর কাছে যে পাঙ্কদের গানের ক্যাসেট আছে তা চোর জানল কী করে? মানে কলকাতা শহরে এত মানুষ….”

“কলকাতায় কিছু মানুষ আছেন যাঁরা উদ্ভট নেশার জন্যে বিখ্যাত। কয়েন কালেক্টার হিসেবে যাঁদের নাম প্রথমে আসবে, তাঁদের মধ্যে একজন বিখ্যাত অভিনেতা আছেন। কিউরিও ভ্যালু আছে, এমন জিনিস জমান ঠাকুর পরিবারের একজন। তেমনি যে-কোনও সঙ্গীতপ্রেমিক জানেন আমার বন্ধুটির খেয়ালের কথা। যারা খুঁজতে চায়, তাদের খোঁজ পেতে কোনও অসুবিধে হয় না।” অমলদা হাসলেন, ‘আমি নতুন দুটো ক্যাসেটে গানগুলো রি-রেকর্ড করি। একটা কাল হারিয়েছ, অন্যটা আমার পকেটে আছ। আমি যেটা ভেবেছিলাম সেটা সত্যি হল।”

অর্জুন হতাশ গলায় বলেছিল, “আমরা বন্ধ কুপেতে বসে গান শুনছিলাম, ভেবে পাচ্ছি না ওরা টের পেল কী করে?”

অমলদা সরল গলায় বললেন, “নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছিল। তবে এটা খুবই আনন্দের কথা ওঁদের কেউ-কেউ এই ট্রেনে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন।”

কথাটা মনে পড়তেই করিডরে দাঁড়িয়ে গেল অর্জুন। শুধু এই ট্রেন নয়, এই কামরায় চোর থাকবেই। কারণ রানিং ট্রেনে অন্য কামরা থেকে এসে চুরি করা সম্ভব নয়। সে কুপেগুলোর দিকে তাকাল। এর কোনটায় তিনি আছেন কে জানে! এমন ঠাণ্ডায় লোকটি কি ঘুমুচ্ছে? নাকি সেই সন্ন্যাসী আর তার শিষ্যরা? এমন সময় ঠুক করে একটা আওয়াজ হতেই অর্জুন ঘুরে দাঁড়াল। ওপাশের একটা কুপের দরজা খুলে যাচ্ছে। সে এখন করিডরের মাঝখানে, লুকোবার কোনও জায়গা নেই।

ডান হাতে স্যুটকেস, শরীরে হাঁটু-ঢাকা উঁচু কলারের মোটা কোট, মাথায় বারান্দা-টুপি পরে যে-লোকটা বের হল, তাকে চিনতে পারা শিবের অসাধ্য। লোকটা অৰ্জুনকে ভ্রূক্ষেপই করল না। সোজা দরজার দিকে চলে গেল। এবং দক্ষ হাতে দরজা খুলে বাইরে পা বাড়াল।

অর্জুন দ্রুত দরজার কাছে যেতে ঠাণ্ডাটা তিনগুণ বেড়ে গেল যেন। কুয়াশা ঢাকা একটা প্লাটফর্ম নজরে এল। কোনও প্রাণের চিহ্ন নেই। শুধু ইলেকট্রিক বাল্বগুলো ভূতের চোখের মত জ্বলছে। কুয়াশা তাদের আরও রহস্যময় করে তুলেছে। অর্জুন মাথা বাড়িয়ে সেই লোকটাকে দেখতে পেল না। বস্তুত প্লাটফর্মের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে না। এটা কোন্ স্টেশন?

দরজাটা বন্ধ করে নিজেদের কুপের সামনে ফিরে আসতেই বিষ্টুসাহেবের গলা পেল সে, “এখানে তো আমাদের নামার কথা নয়। ঠিক আছে?”

অমলদা বললেন, “না, ঠিক নেই। মিছিমিছি এই ঠাণ্ডায় বসে থাকার কোনও মানে হয় না। এই কুয়াশায় ট্রেন ছাড়তে হয়তো বেলাও হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চণ্ডীগড়ে পৌঁছতে নটা-দশটা বেজে যাবে। বুদ্ধিমান যাত্রীরা এখানে নেমে বাসে ওঠেন।”

“কিন্তু এ কী ঠাণ্ডা, বাপ্ রে বাপ! এর মধ্যে যদি নামতে হয় নির্ঘাত মারা যাব আমি। উঃ।” বিষ্টুসাহেবের গলার স্বরে কাঁপুনি এসেছে।

অমলদা হাসলেন, “আপনি তো ঠাণ্ডার পরোয়া করেন না।”

এইসময় অর্জুনকে দেখতে পেলেন অমলদা, “চটপট তৈরি হয়ে নাও, আমরা এখানে নামব ভোর হয়ে এল।”

“বাইরে খুব ঠাণ্ডা। তাছাড়া…”

“তাছাড়া কী?”

“ক্যাসেট যে চুরি করেছে, সে এই ট্রেনে যাচ্ছে।”

“একটা ক্যাসেটের জন্যে এত কষ্ট সহ্য করার কোনও মানে হয় না। ইংরেজি ভৌতিক ছবির এক-একটা দৃশ্য ঠিক এইরকম হয়। নীলচে কুয়াশা পাক খাচ্ছে সর্বত্র। প্লাটফর্মে পা দেওয়ামাত্র মনে হল শরীরে রক্ত নেই। বিষ্টু সাহেবকে এই পোশাকে অন্য সময় দেখলে হাসি পেত। ভদ্রলোকের চোখ দুটি ছাড়া কিছুই অঢাকা নেই। সঙ্গে যা ছিল, সবই চাপিয়েছেন, এমন কী কম্বলও। অমলদা ওভার কোটের তলায় কী পরেছেন টের পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু মাথায় ম্যাঙ্কিক্যাপ চড়িয়েছেন। অর্জুন দুটো সোয়েটার পরেছিল, তার ওপরে একটা শাল। তাইতেই মাথা ঢেকে নিয়েছিল। কিন্তু ঠাণ্ডা আসছে প্যান্টের নীচে। হাঁটু দুটো কনকন করছে।

স্টেশনটার নাম আম্বালা। এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় জংশন। অথচ এখন একটা হকার পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। বিষ্টুসাহেব কিছু কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। শুধু দাঁতের বাজনা শোনা গেল। অর্জুন মুখ ফিরিয়ে দেখল, দিল্লি-কালকা মেল একটা মৃত অজগরের মতো প্লাটফর্মের ধারে পড়ে আছে। তার প্রায় প্রতিটি দরজা জানলা বন্ধ। মানুষের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে না।

গেটে হাত বাড়িয়ে টিকিট নেওয়ার মতো কেউ নেই। বিষ্টুসাহেবের গলায় আক্ষেপ শোনা গেল, “এঃ!”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

“টিকিট ফেরত না দিতে পারলে খুব খারাপ লাগে। তোমার দাদার মতলবটা কী বলো তো? মেরে ফেলবে নাকি?”

হাঁটতে শুরু করার পর থেকেই অর্জুনের ঠাণ্ডাটা সামান্য কমেছিল। অমলদাকে দেখে কী হচ্ছে বোঝার উপায় নেই। বেশিক্ষণ ব্যাগ ডান হাতে রাখায় ওটা যখন অসাড় হচ্ছে, তখন অমলদার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনও কারণ নেই। স্টেশনের বাইরে খোলা আকাশের নীচে আসতেই ধোঁয়াটে আকাশ দেখা গেল। টুপটাপ শিশির ঝরছে। আম্বালা পাঞ্জাবে। অর্জুনের মনে বেশ আনন্দ হল। ছেলেবেলা থেকে এই পাঁচ নদীর দেশের কত গল্প শুনেছে, পাঞ্জাবের কত বীর, কত আত্মত্যাগ ইতিহাসের কথায় পড়েছে সে। আর আজ সেই পাঞ্জাবের মাটিতে পা দিয়েছে ভোর রাত্রে। কিন্তু ঘন কুয়াশায় বেশি দূর দৃষ্টি যায় না, তবু যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট যে, কলকাতা জলপাইগুড়ি আর আম্বালার মাটি এবং প্রকৃতির মধ্যে প্রচুর মিল আছে। মনে হচ্ছে না অচেনা একটা দেশে এলাম।

এবার কিছু আলো দেখা গেল। এবং অনেকগুলো জানলাবন্ধ বাস। ওই ঠাণ্ডায় কয়েকটা গলা যেন ওদের দেখেই চিৎকার করে উঠল বিভিন্ন জায়গার নাম ধরে। জলপাইগুড়ির বাস টার্মিনাসে ঠিক এমনটা হয়। তবে এখানকার নামগুলো খুব ইন্টারেস্টিং। লুধিয়ানা, জলন্ধর, চণ্ডীগড়, অমৃতসর।

চণ্ডীগড়ের বাসে তিনটে জায়গা নেওয়ার পর দেখা গেল যাত্ৰী আছে জনা-দশেক। গাড়ি ছাড়বে মিনিট কুড়ি বাদে। যাত্রীরা সবাই এমন ঢেকেঢুকে বসে আছে যে, কারও চেহারা বোঝা যাচ্ছে না।

গাড়ির ভেতরে একটা মৃদু আলো জ্বলছে। প্রথম কথা বললেন বিষ্টুসাহেব “যত্ত অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড!”

“অদ্ভুতুড়ে!”

“নয়? বেশ ট্রেনে শুয়ে চলে যেতাম। তা না, এই বরফের মধ্যে টেনে-হিঁচড়ে নামানো হল। তিন ঘণ্টা আগে গিয়ে কি রাজ্যলাভ হবে? ঠিক আছে?” বাসের সিটে গুটিয়ে বসে একটু উত্তাপ সন্ধান করছিলেন বিষ্টু সাহেব।”

অমলদা দাঁড়িয়ে ছিলেন। “ট্রেনে তো শুয়ে থাকতেন। নতুন জায়গায় এসেছেন বাসের জানলা খুলে প্রকৃতি না-দেখলে চলে? চা খাবেন?”

“নো।”

“অর্জন?”

মাথা নেড়ে অর্জুন অমলদার অনুগামী হল। চায়ের দোকান এই রকম বাস স্ট্যান্ডে যেমন হয়। অর্জুন ভেবেছিল পাঞ্জাব যখন, তখন মাথায় পাগড়ি বাঁধা মানুষই হবেন সব। কিন্তু চায়ের দোকানে শুধু একজন বৃদ্ধের মাথাতেই পাগড়ি। চমৎকার হিন্দিতে কথা বলছে সবাই। কিছু লোক আগুন জ্বালিয়ে কান কাপড়ে ঢেকে বসে গল্পগুজব করছে। দুটো চায়ের নির্দেশ দেওয়ামাত্র অর্জুন সতর্ক হল। সেই লোকটা। খানিক আগে একেই সে দেখেছে তাদের কামরা থেকে নেমে যেতে মুখ টুপিতে আড়াল করে। এখনও লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। ওর হাতে চায়ের গ্লাস। স্টেশনের দিকে মুখ করে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে।

অমলদা পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এপাশ-ওপাশ তাকালেন। তারপর স্থির পায়ে এগিয়ে গেলেন লোকটির দিকে। অর্জুন শুনল অমলদা বললেন, “হা-ই!”

লোকটি চট করে ফিরল। তবু ওর চিবুক এবং ঠোঁটের অংশ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু একটা অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল, “হাই।

“দেশলাই আছে?”

লোকটি উত্তরে কাঁধ নাচাল। যার অর্থ, না।

অমলদা উদাস গলায় বললেন, “এবার শীতটা জব্বর পড়েছে। তাই না?”

লোকটি আবার কাঁধ নাচাল। তারপর শূন্য গ্লাস দোকানের টেবিলে রেখে যখন বেরিয়ে গেল তখন দেখা গেল একটা এক টাকার নোট তার পাশে পড়ে রয়েছে।

চা এসে গিয়েছিল। অমলদা গ্লাস হাতে নিয়ে বললেন, “আমেরিকানরা সচরাচর মিশুকে হয়। লোকটার বোধহয় মন খুব খারাপ।”

“আমেরিকান?” গরম গ্লাসভর্তি চা হাতে নিয়ে চমকাল অর্জুন।

“বুঝতে পারোনি?”

“না।”

“পোশাকের আদল, দাঁড়াবার ধরন আর চা খাওয়ার ভঙ্গিতে তো স্পষ্ট বোঝা যায় লোকটা ভারতীয় নয়। আমি যখন হা-ই বললাম, টেনে টেনে, ও চটপট জবাব দিল হাই বলে। এই সম্ভাষণ মার্কিনরাই করে। ইংরেজ কিংবা অন্য জাত যারা ইংরেজি শিখেছে ইংরেজদের কাছ থেকে, তারা হ্যালো বলবে। আমেরিকানদের একটা সচেতন চেষ্টা থাকে ইংরেজদের থেকে আলাদা হবার। চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো বললেন অমলদা।

“লোকটা কাছে সত্যি কি দেশলাই ছিল না।”

“হতে পারে। শুনেছি আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ সিগারেট বর্জন করেছেন। হয়তো এও সেইরকম।”

“তবে এত যে মাদকদ্রব্য খায় ওরা?”

“ওরা মানে কারা? কিছু বেয়াদপ ছেলেমেয়ে। পুরো জাতটা যদি তাই খেত, তাহলে পৃথিবীর এক নমবর শক্তি হত না।”

“লোকটাকে আমার সন্দেহ হচ্ছে অমলদা।”

“কী মনে হচ্ছে?”

“আমরা যাদের জন্যে এসেছি, ও তাদের একজন নয় তো?”

“সন্দেহ করার কী কী কারণ আছে?”

“ও আমাদের সঙ্গে একই ট্রেনে এসেছে। ট্রেন ছেড়ে আম্বালায় নেমেছে। ভাল করে কথার জবাব দিচ্ছে না। তার ওপর আমেরিকান।” অর্জুন ভেবে ভেবে বলল, “হয়তো ওর ব্যাগে ক্যাসেটটা পাওয়া যেতে পারে।”

অমলদা চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমার সন্দেহভজনের লিস্টে সেই সন্ন্যাসী এবং তার দুই শিষ্যও আছে বলে জানতাম। তাই না?”

অর্জুন অস্বস্তি নিয়ে তাকাল। এই আমেরিকানটির সঙ্গে ওই সাধুটিকে জড়াবার মতো কোনও ঘটনার কথা তার জানা নেই। তা ছাড়া ওই সাধুবাবা আম্বালায় নামেননি। হয়তো এখনও ট্রেনের কামরায় ঘুমুচ্ছেন। তা ছাড়া অমলদার তো ভুলও হতে পারে। লোকটার অস্ট্রেলিয়ান হওয়া অসম্ভব নয়। কোথায় যেন সে পড়েছিল, অস্ট্রেলিয়ানদেরও ইংল্যান্ডকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা আছে। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় একটা মতলব খেলে গেল। সম্ভবত আনন্দমেলার পাতায় সে পড়েছিল, আমেরিকানরা কখনওই ইংরেজি জেড্ শব্দ উচ্চারণ করে না। এরা জেড্ লেখে, কিন্তু সেটা উচ্চারণ করে জ্জি। লোকটা যদি আমেরিকান হয় তাহলে নিশ্চয়ই জেড্ বলবে না।

ড্রাইভার হর্ন পর্যন্ত দিল না। ওরা বাসে ফিরে আসামাত্র গাড়ি ছেড়ে দিল। তিনটে সিট পাশাপাশি। বিষ্টুসাহেব বাসের ভেতরে বোধহয় আরাম পেয়েছেন, কারণ তাঁর চোখ বোঁজা, মুখ সামান্য হাঁ।

অমল সোম নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “লক্ষ করেছ?”

অর্জুন চটপট চারপাশে তাকিয়ে নিল। এখন যাত্রীর সংখ্যা জনা-পনেরো। পেছন দিকটা একদম ফাঁকা। কিন্তু এবার নজরে পড়ল টুপিটা। একদম শেষ সিটে জানলার ধারে একা বসে আছে সেই লোকটা। আর আশ্চর্য ব্যাপার, এই ঠাণ্ডাতেও লোকটা জানলা খুলে রেখেছে। একটু ঝুঁকে থাকায় ওর মুখ দেখা যাচ্ছে না। হুহু করে হাওয়া ঢুকছে পেছনে।

অমলদা বললেন, “চণ্ডীগড়েই যাচ্ছে মনে হচ্ছে।”

অর্জুন খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। লোকটাকে যাচাই করার এটা সুযোগ। কিন্তু আজ অবধি কখনওই সে কোনও বিদেশির সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলেনি। কেমন আড়ষ্ট আড়ষ্ট লাগছে। তা ছাড়া জেড্ অক্ষরটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করাটা কী রকম বোকা-বোকা ব্যাপার।

বাইরে এবার আলো ফুটছে। বাস ছুটছে বেশ জোরে। পাঞ্জাবের পথঘাট বেশ ভাল। সূর্য নিশ্চয়ই উঠেছে, কিন্তু কুয়াশা থাকায় এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। অমলদা হাত বাড়িয়ে জানলার কাঁচ নামিয়ে দিতেই ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকল বটে, কিন্তু চোখের আরাম হল। বিষ্টুসাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি একবার বিরক্তিতে ‘উঃ’ বলেই চোখ খুলে মাথা নাড়লেন, “বিউটিফুল, ঠিক আছে।”

পাঞ্জাবের গ্রামের মধ্যে দিয়ে বাস ছুটছে। সদ্য-ঘুমভাঙা মানুষরা একটু রোদের আশায় পথের ধারে গল্পগুজব করতে বসেছে। সাধারণ চাষি সম্প্রদায়। মাঠঘাট এখন শস্যহীন। এদের কাজকর্মে তাই সাময়িক বিরতি।

হালকা রোদ টর্চের আলোর মতো পৃথিবীতে ছড়াল। বিষ্টুসাহেব বললেন, “চা খেয়েছেন?”

অমলদা বললেন, “হ্যাঁ।”

“আমি খেলাম না।

“কেন?”

“চায়ের চেয়ে ঘুমটাকে বেটার বলে মনে করলাম।

“তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

“এবার চা খেতে ইচ্ছে করছে।

কথা বলার ভঙ্গিতে অর্জুন হেসে ফেলল। বাইরের দিকে তাকিয়ে বিটুসাহেব বললেন, “ভারতবর্ষ সত্যি সুন্দর জায়গা। এখানে ক্রিমিন্যাল থাকতে পারে বলে মনে হয়? আই মিন এই পাঞ্জাবে?”

“পাঞ্জাবটা ভারতবর্ষের বাইরে নয়।”

অমলদার কথা শেষ হওয়ামাত্র পেছন থেকে চিৎকার উঠল। ওরা চমকে পেছন ফিরে তাকাতেই কন্ডাক্টরের ভীত মুখ দেখতে পেল। অমলদার পিছু-পিছু অর্জুন দু’পাশের আসনগুলোর মধ্যে দিয়ে কন্ডাক্টরের পাশে পৌঁছতে দৃশ্যটা দেখতে পেল। লোকটা হেলান দিয়ে রয়েছে জানলায়। তার কানের নীচ থেকে একটা রক্তের ধারা বেরিয়ে বুকের ওপর নেমে এসেছে। চোখ বন্ধ। শরীর স্থির।