৩.
চারটে মেয়ে একঘরে বসেই ব্রেকফাস্ট করল। জঙ্গলের এত ভেতরে এমন ভাল খাবার ওরা মোটেই আশা করেনি। নন্দিনী বলল, “চল, একটা চক্কর দিয়ে আসি।’
টিনা চশমা ঠিক করতে করতে বলল, “আমাদের গাইড কী বলে দ্যাখো।।”
চিঙ্কি ঠোঁট বাঁকাল, “আমরা বাচ্চা নাকি? এমনিতে মাঝরাত্রে ঘুম ভাঙাল ফালতু ভয় দেখিয়ে। আমরা এখানে কোনও বিপদে পড়ব না। শুধু জঙ্গলের বেশি ভেতরে না গেলেই হল।”
চারজন ঘর থেকে বেরিয়ে অর্জুনের ঘরের দিকে তাকাল। দরজা ভেজানো, কিন্তু সে দিকে ওরা পা বাড়াল না। নীচে নেমে ওরা বাংলো থেকে বেরিয়ে উলটো দিকের রাস্তাটা ধরল। সুনসান নির্জন পথ, পাখির চিৎকার ছাড়া এখন বাতাসের শব্দ বাজছে গাছের ডালে-ডালে, পাতায়-পাতায়। রোদ-ছায়ায় জাফরি-কাটা পথে হাঁটতে ওদের খুব ভাল লাগছিল। দেখতে দেখতে বাংলো এবং আশেপাশের কোয়াটার্স চোখের আড়ালে চলে গেল। এখন শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। ওরা একটা ছায়াঘন কালভার্টের ওপর এসে দাঁড়াল। নন্দিনী বলল, “কী দারুণ রোমান্টিক জায়গা!”
চিঙ্কি বলল, “আমি একটা গান গাইব?”
টিনা বলল, “গাইলে হিন্দি ছবির হিরোইনের মতো নেচে-নেচে গাইতে হবে।”
পুনম কালভার্টের তলা দিয়ে বয়ে-যাওয়া সরু কালো জলের ধারাটিকে দেখল। জঙ্গলের অন্ধকারে যেখানে ধারাটি ঢুকে গেছে সেখানে বাঁশের জঙ্গল, পাতাগুলো জল ঢেকে রেখেছে। কেমন গা-ছমছমে রহস্য ওখানে।
চিঙ্কি ততক্ষণে লাফ দিয়ে কালভার্টের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছে। তারপর এক হাত আকাশে তুলে একটি জনপ্রিয় হিন্দি ছবির গান ধরল। অবিকল নায়িকাদের ভঙ্গি করে সে এমনভাবে নাচতে লাগল নিজের গানের সঙ্গে যে, মেয়েরা হাততালি দিয়ে তাকে উৎসাহ জানাচ্ছিল। নাচতে নাচতে, গাইতে গাইতে চিঙ্কি নানান জায়গায় দৌড়াচ্ছিল। শেষে তরতর করে নেমে গেল পাথরে পা ফেলে ঝোরার জলের ধারে। তার ভঙ্গি এখন নায়িকাদের গানের শেষ পর্বের মতো। শরীর টো-এর ওপর রেখে শরীর ঘোরাচ্ছে সে। মেয়েরা কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে চিঙ্কিকে উৎসাহ দিচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে চিঙ্কি কালভার্টের নীচের দিকে তাকাতেই তার গলার গান বন্ধ হয়ে গেল। হাত উঠল মুখের ওপর, চোখ বিস্ফারিত হল, কিন্তু সেটা মাত্র দু’-তিন সেকেন্ডের জন্য। আচমকা একটা তীব্র চিৎকার ছিটকে এল তার গলা থেকে। নন্দিনী চেঁচিয়ে উঠল, “কী হল? এই চিঙ্কি?”
ভূত দেখার মতো দৌড়ে চিহ্নি পাথরগুলো ডিঙিয়ে ওপরে উঠে এল। তার মুখ এখন একদম সাদা। বন্ধুরা দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। নন্দিনী ওর মুখ ধরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
চিঙ্কির কথা বলতে সময় লাগল। সে কোনও মতে বলতে পারল, “ভূত।”
“ভূত?” হ্যাঁ হয়ে গেল তিনজন, নন্দিনী জিজ্ঞেস করল, “কী যা তা বলছিস?”
চিঙ্কি বাঁ হাত বাড়িয়ে ঝোরাটাকে দেখাল, “ওই যে ওখানে!”
ওরা কালভার্টের তলা দিয়ে বয়ে-যাওয়া কালো জলের ঝোরা দেখল। নন্দিনী হেসে উঠল, “দুর! ভূত বলে কিছু আছে নাকি?”
চিঙ্কি তখন ঢোঁক গিলছে। কথা বলার ক্ষমতা ভাল করে পাচ্ছে না বেচারা। একটু আগে যে মেয়ে নাচ-গান করছিল, সে এখন রক্তশূন্য।
পুনম জিজ্ঞেস করল, “ভূতটা কোথায়?”
চিঙ্কি কাঁপা গলায় জবাব দিল, “নীচে, কালভার্টের নীচে।”
ওরা তিনজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর চিঙ্কিকে ওপরে রেখে পাথরে পা ফেলে নীচে নামতে লাগল। ওরা কেউ কোনও কথা বলছিল না। গম্ভীর মুখে জলের ধারে পৌঁছে মুখ ফেরাতেই হতভম্ব হয়ে গেল তিনজনে। কালভার্টের নীচে একটা মানুষ বসে আছে পাথরে হেলান দিয়ে। সে যে মৃত, তা বলে দেওয়ার দরকার হয় না। সঙ্গে-সঙ্গে পুনম আর টিনা ছুটতে লাগল ওপরে। নন্দিনী সাহস করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। লোকটার শরীরের নিম্নাংশ জলের মধ্যে, স্রোত বয়ে যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। ঊর্ধ্বাঙ্গ শুকনো। পরনে খুব মলিন ধুতি আর গেঞ্জি। এ দিকের কোনও শ্রমিক হবে। মুখ-চোখ বাঙালি বলে মনে হচ্ছে না। নন্দিনী চার পাশে তাকাল। কোথাও কেউ নেই। জঙ্গলের জীবন নির্বিঘ্নে চলছে। সে ধীরে-ধীরে উপরে উঠে আসতেই পুনম বলল, “লেটস্ গো ব্যাক।
নন্দিনী বলল, “আমাদের উচিত এখনই পুলিশকে খবর দেওয়া।”
“পুলিশ? পুলিশ কোথায় পাব?”
“কেন? সেই যে অফিসার—যিনি রেঞ্জারের সঙ্গে তখন ছিলেন।”
ওরা কেউ আর ওখানে দাঁড়াতে চাইছিল না। দ্রুত সবাই হাঁটতে লাগল ট্যুরিস্ট বাংলোর দিকে। মোড় ঘোরার আগে নন্দিনী একবার পেছন ফিরে তাকাল। জঙ্গল চিরে পেছনে পড়ে থাকা পথটা চমৎকার শান্ত। চোখ ফিরিয়ে নেবার আগে সে চমকে উঠল। চিৎকার করে বলল, “লুক্।”
ওরা তিনজনেই ভয়ার্ত চোখে পেছন ফিরল। কিন্তু ততক্ষণে প্রাণীটি রাস্তা পার হয়ে ওপারে চলে গিয়েছে। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে, তার দেড়শো গজ দূরে ঘটনাটা ঘটল। টিনা জিজ্ঞেস করল, “কী বল তো?”
চিঙ্কি অস্ফুটে বলল, “গোরিলা। আই অ্যাম শিওর। ত”
পুনম বলল, “ভ্যাট! ইন্ডিয়ার ফরেস্টে গোরিলা পাওয়া যায় না। বোধ হয় ভালুক।”
নন্দিনী যতটুকু দেখেছে, ওরা তা দেখেনি। ভালুক হলে কি ওভাবে হাত তুলে দৌড়ে যায়? প্রাণীটি কালচে লোমশ। কিন্তু দৌড়োবার ভঙ্গিতে নিজেকে গোপন করার প্রয়াস আছে। তা ছাড়া লম্বায় অতটা উঁচু কি ভালুক হয়? যদিও এত দূর থেকে উচ্চতা মাপা শুধু দৃষ্টি দিয়ে অসম্ভব। কিন্তু এই জঙ্গলে যদি একটা অচেনা প্রাণী ওই চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তা হলে নিরস্ত্র হয়ে হাঁটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ট্যুরিস্ট বাংলোর সামনে এসে পুনম বলল, “চল, অৰ্জুনকে বলি।”
নন্দিনী মাথা নাড়ল, “হোয়াই? আমরাই তো রেঞ্জারকে রিপোর্ট করতে পারি।”
বাকি রাস্তাটুকু চুপচাপ কাটিয়ে ওরা গেট খুলে রেঞ্জারের অফিসে ঢুকল। এখন আর সকাল নেই। ডুয়ার্সের দুপুর মোটেই আরামদায়ক নয়। চার পাশে জঙ্গল থাকায় অবশ্য একটা ছায়া-ছায়া প্রলেপ তার ওপর পড়েছে। রেঞ্জার নেই। এক অল্পবয়সী ভদ্রলোক বাসি খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ওদের দেখে আমতা-আমতা করে বললেন, “স্যার নেই। মাদারিহাটে গিয়েছেন।”
“কখন ফিরবেন?” নন্দিনী জিজ্ঞেস করল।
“বিকেলে।”
“মাদারিহাট মানে যে রাস্তা দিয়ে আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমাদের যে খুব জরুরি কথা বলার ছিল। এখনই!”
লোকটি উঠল। রেঞ্জারের টেবিলে একটা টেলিফোন রয়েছে। সেটির রিসিভার তুলে ঘন ঘন ট্যাপ করতে করতে অপারেটরকে পেল। একটা নম্বর পেয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে হাসল, “কপাল ভাল থাকলে স্যারকে পেয়ে যাব। হ্যালো, হলং রেঞ্জ অফিস থেকে বলছি। রেঞ্জার সাহেব আছেন? নেই। বেরিয়ে গিয়েছেন? কোথায়? আরে, হ্যালো, হ্যালো!” লোকটি কিছুক্ষণ চিৎকার করল। তারপর রিসিভার নামিয়ে মাথা নাড়ল, “নাঃ, স্যার বেরিয়ে গিয়েছেন!”
“তা হলে আপনি চলুন। আপনি তো এখানে কাজ করেন?” নন্দিনী বলল।
“হ্যাঁ। কিন্তু কোথায় যাব?”
“জঙ্গলে।”
“জঙ্গলে? না, না, হাতির পিঠে ছাড়া জঙ্গলে যাবেন না। তা ছাড়া এখন জঙ্গলে খুব গোলমেলে ব্যাপার হচ্ছে। হুটহাট যাবেন না।”
“কী গোলমাল?”
“রাষ্ট্রবিরোধী সমাজবিরোধীরা জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছে।’
মেয়েরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। নন্দিনী বলল, “শুনুন, আমরা একটু আগে বাংলোর পিছন দিকের রাস্তায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। যেতে-যেতে যে কালভার্টটা পড়ে, তার নীচে একটা ডেডবডি দেখতে পেয়েছি। মনে হচ্ছে, লোকটাকে কেউ খুন করেছে। এই ব্যাপারটা আপনাদের জানাতে এসেছিলাম।”
“কী? খুন? আবার?” লোকটি হাঁ হয়ে গেল।
“মানে? এখানে কি এর আগেও খুন হয়েছে?”
“হ্যাঁ। দিন-দশেক আগে জঙ্গলের ও পাশে একটা গ্রামের লোককে কেউ খুন করে ফেলে দিয়ে যায়। একটা বুড়ো বাঘ তার পেটের কিছুটা খেয়ে রেখে যায়।”
“তা হলে তো বাঘে মেরেছিল।” পুনম বলল।
“না, ম্যাডাম। লোকটার গলা ছুরি দিয়ে অর্ধেক কাটা ছিল। কোথায় বললেন? কালভার্টের নীচে? আবার ঝামেলা শুরু হল।” লোকটা এগিয়ে গিয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুলল, “হ্যালো অপারেটার, থানায় দিন। জলদি। হ্যালো, থানা, বড়সাহেব আছেন? নেই? শুনুন হলং রেঞ্জ অফিস থেকে বলছি। আবার একজন খুন হয়েছে। তিন নম্বর কালভার্টের তলায় ডেডবডি। একজন না চারজন মহিলা, না না মহিলা খুন হয়নি, দাঁড়ান….” রিসিভারে হাত-চাপা দিয়ে লোকটা জিজ্ঞেস করল, “যে খুন হয়েছে, সে ছেলে না মেয়ে?”
“আপনাকে তখন বললাম একটা লোক পড়ে আছে।” নন্দিনী গম্ভীর মুখে বলতেই সে আবার রিসিভার থেকে হাত সরাল, “ছেলে। ছেলে খুন হয়েছে।”
রিসিভার নামিয়ে রেখে লোকটা যেন কিছুটা স্বস্তি পেল। তারপর বলল, “একটা খুন মানে কত ঝামেলা জানেন? ঘন ঘন পুলিশ আসবে। আপনাদের কাছেও যাবে। আচ্ছা, আপনাদের সঙ্গে কোনও গার্জেন নেই?”
“আছেন। তিনি বাংলোতে বসে আছেন।”
“তিনি দ্যাখেননি ডেডবডি? তা হলে পুলিশকে আমি আর আপনাদের কথা না বলে তাঁর নাম বলে দিতাম। পুলিশ আর আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদ করত না?”
নন্দিনী বলল, “না, তিনি দ্যাখেননি। আচ্ছা, আর-একটা কথা বলুন তো। এই জঙ্গলে প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা কালো লোমশ কোনও প্রাণী আছে, যে দু’পায়ে হাঁটতে পারে? খুব জোরে হাঁটে?”
লোকটি আঙুল তুলে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো জীবজন্তুর ছবি দেখাল, “এই সব প্রাণী এখানকার জঙ্গলে আছে।”
ওরা উৎসুক হয়ে তাকাল। বাঘ, বাইসন, গণ্ডার, বুনো শুয়োর, হাতি থেকে আরম্ভ করে বন-মুরগি, সাপ ছড়িয়ে আছে জঙ্গলে, কিন্তু সেই বিদ্ঘুটে প্রাণীর ছবি দেওয়ালে টাঙানো নেই। নন্দিনী মাথা নাড়ল, “এই ছবির বাইরের কোনও জন্তু জঙ্গলে নেই বলতে চাইছেন?”
লোকটি বলল, “ম্যাডাম, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট যে সব জন্তুর ছবি পাঠিয়েছে, তার বাইরে কিছু না থাকারই কথা। তবে কাউকে যদি না বলেন যে আমি বলেছি—তা হলে বলতে পারি, আছে। এ রকম গভীর জঙ্গলে অনেক রকম জন্তু হঠাৎ-হঠাৎ দেখা যায়, যার নাম খাতায় লেখা নেই।
“যেমন?”
“একটা জন্তু আছে জানেন, যার গায়ে বড়-বড় আঁশ, গড়িয়ে গড়িয়ে চলে, কী নাম জানি না। বুনো কুকুর আছে কয়েকটা। খুব ভয়ঙ্কর।”
লোমশ প্রাণী মানুষের মতো হাঁটে—তেমন কিছু?”
“মাহুত একবার বলেছিল, কিন্তু আমরা কেউ চোখে দেখিনি।”
“কী বলেছিল মাহুত?”
“জঙ্গলের ভেতরে সকালে যখন ভিজিটার্সদের নিয়ে যায়, তখন একদিন হাতির পিঠে বসে একটা গোরিলার মতো প্রাণী দেখেছিল। এক পলক। সে কথা শুনে রেঞ্জার সাহেব বলেছিলেন, নির্ঘাৎ ভালুক। আমি অবশ্য এত দিন এখানে আছি, কিন্তু কোনও ভালুক দেখিনি।”
নন্দিনীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ঘড়িতে এখন প্রায় বারোটা। যদিও কারও খিদে পায়নি। এই জায়গাটায় সম্ভবত ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীদের বাড়ি-ঘর রয়েছে। ফলে একটা পাড়া-পাড়া ভাব। ওরা চুপচাপ হাঁটছিল। পুনম বলল, “বেশ থ্রিলিং ব্যাপার, না রে?”
টিনা বলল, “অদ্ভুত তো! একটা লোক খুন হল, আর তুই থ্রিলড্ হচ্ছিস?”
এই সময় ওরা অর্জুনকে দেখতে পেল। পায়ে চপ্পল, পরনে একই শার্ট-প্যান্ট। দূর থেকে তাকে দেখে নন্দিনী বলল, “গাইডবাবু। এখন খুঁজতে বেরিয়েছেন! নিশ্চয়ই আমাদের বলবেন, কেন ওঁকে না জানিয়ে বেরিয়েছি!”
মুখোমুখি হতেই অর্জুন কিছু বলার আগেই নন্দিনী বলল, “আচ্ছা মানুষ তো আপনি, ঘরের দরজা বন্ধ করে থেকে গেলেন?”
“দরজা বন্ধ? কই না তো! খোলাই তো ছিল!”
“কী করছিলেন এতক্ষণ?”
“আপনারা যে বেরিয়ে পড়বেন, তা বুঝিনি। কোথায় গিয়েছিলেন?” অর্জুন চট করে বলতে চাইল না যে, সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার বলার মধ্যে এমন সারল্য ছিল যে, নন্দিনী আর খেলাতে চাইল না। দু’ নম্বর কালভার্টের গায়ে হেলান দিয়ে বসে ওকে সব কথা খুলে বলল।
শুনতে শুনতে অর্জুনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে বলল, “আপনারা বড্ড বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছিলেন। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, রতনলালবাবুকে ফরেস্ট অফিসার আর ও.সি. বলেছিলেন, এখানকার আবহাওয়া ঠিক নেই। আমি একটু আগে বেয়ারাদের কাছে জানতে পারলাম, কিছু অ্যান্টি-সোশ্যাল এলিমেন্ট এই জঙ্গলে বাসা বেঁধেছে। তারা বাংলো পুড়িয়ে দেয়, ডাকাতি করে। তাদেরই কেউ হয়তো খুন হয়েছে। তাই ও রকম জায়গায় একা যাওয়া ঠিক হয়নি।”
“যে লোকটি খুন হয়েছে, সে নেহাতই গ্রাম্য মানুষ।”
“হতে পারে। এ-নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর কোনও দরকার নেই। অর্জুন বলল, “চলুন, স্নান করে খেয়েদেয়ে রেস্ট নিন। বিকেলের পর থেকে অনেক রকম জন্তু আসে সামনের ঘাসের জঙ্গলে নুন খেতে।”
ওরা হাঁটছিল বাংলোর দিকে। কিন্তু এরই মধ্যে অর্জুনের কৌতূহল হচ্ছিল। গ্রাম্য ঝগড়ায় অবশ্য কোনও গ্রামের মানুষ খুন হতে পারে, কিন্তু তার শরীর কেন জঙ্গলের ভেতরে কালভার্টের নীচে পাওয়া যাবে? খুনি কি হত্যাকাণ্ড লুকিয়ে ফেলতে লোকটাকে ওখানে নিয়ে এসে খুন করেছে? কিন্তু এত ঘন ঘন এখানে হত্যাকাণ্ড হবেই বা কেন? অর্জুন দাঁড়িয়ে পড়ল। নন্দিনী জিজ্ঞেস করল, “কী হল আপনার?”
“আমি একবার কালভার্টটার কাছ থেকে ঘুরে আসছি।” অর্জুন বলল।
টিনা মাথা নাড়ল, “না, প্লিজ, একা যাবেন না।”
অর্জুন হাসল, “আমার কিছু হবে না।”
“কিন্তু ওখানে নাম-না-জানা একটা বন্যজন্তু দেখেছি আমরা।”
“সেটাই আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে। জলদাপাড়ায় গণ্ডার, বাইসন, হাতি আর কয়েকটা বাঘ ছাড়া কোনও বড় প্রাণী নেই বলে শুনেছিলাম। আপনারা ঘরে গিয়ে স্নানটান করুন। আমি ঘুরে আসছি।”
টিনা বলল, “আপনার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের দেখাশোনা করা। ওখানে গিয়ে যদি কোনও দুর্ঘটনা হয়, তা হলে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।”
অর্জুনের মনে হল, কথাটা ঠিক। কিন্তু তার মেজাজ খিঁচড়ে গেল। কয়েকটা বাচ্চা মেয়ের গাইড হতে সে কি কখনও চেয়েছিল? ম্যানেজারি করা? মালবাজারে সোনার ব্যাপারটা, এখানে খুন—এ সব তাকে উপেক্ষা করে থাকতে হবে? একজন সত্যসন্ধানী হয়ে সেটা করা কতখানি বেদনাদায়ক, তা এরা বুঝবে কী করে? সে কাঁধ নাচিয়ে বাংলোর ভেতরে ঢুকল। মেয়েরা কলবল করতে-করতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। অর্জুন ঘাড় ঘুরিয়ে জিপটাকে দেখতে পেল। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসছিল সেটা। হঠাৎ বাংলোর মুখটায় দাঁড়িয়ে পড়ল। মিস্টার বিশ্বাস নেমে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও অসুবিধে হয়নি তো?”
জবাব না দিয়ে অর্জুন হাত তুলে দাঁড়াতে বলল। প্রায় দৌড়েই সে জিপের কাছে পৌঁছে বলল, “একটু আগে আপনাকে টেলিফোনে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল। ও, আপনিও আছেন?” জিপের ভেতরে বসা মিস্টার আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলল অর্জুন, “খুব ভাল হল, আপনাকে থানাতে ফোন করা হয়েছে।”
“কী ব্যাপার বলুন তো?” মিস্টার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে। “আপনাদের জঙ্গলে একটা ডেডবডি দেখেছে মেয়েরা।”
“ডেডবডি? কোথায়?” মিস্টার আহমেদ জিজ্ঞেস করলেন।
“তিন নম্বর কালভার্টের নীচে।”
“সে কী!” মিস্টার বিশ্বাস হতভম্ব, “মেয়েরা সেটা দেখল কী করে?”
“বেড়াতে বেড়াতে গিয়েছিল। তারপরেই আপনার অফিসে রিপোর্ট করেছে।”
“আপনিও দেখেছেন?”
“না। আমি তখন বাংলোয় ছিলাম।”
মিস্টার বিশ্বাস জিপে উঠে বসলেন, “ড্রাইভার, গাড়ি ঘোরাও।’
অর্জুন এগিয়ে গেল, “কিছু মনে করবেন না, আমি আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি?”
“আমরা অফিসিয়াল ডিউটিতে যাচ্ছি।”
“আমি জানি। আপনি বোধ হয় মিস্টার অমল সোমের নাম শুনেছেন! আমি তাঁর সহকারী। আমার নাম অর্জুন।
“অর্জুন?” মিস্টার আহমেদ বললেন, “আপনিই লাইটার প্রবলেম সলভ করেছেন? খুঁটিমারি রেঞ্জের প্রবলেমটাও কি আপনারই সলভ করা?”
অর্জুন বিনীত হাসি হাসল। মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “তাই বলুন। উঠে পড়ুন ভাই। আপনার পরিচয় তো জানতাম না। তা, এই মেয়েদের সঙ্গে কী করে এলেন?”
“এটা একটা অ্যাসাইনমেন্ট।” গাড়িতে উঠতে-উঠতে অর্জুন বলল।
মিস্টার আহমেদ হাসলেন, “আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভাল লাগছে।”
বিশ্বাস বললেন, “তা তো হল। কিন্তু আবার কী ঝামেলায় পড়লাম বলুন তো!”
অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ক’ দিন আগে যে লোকটা খুন হয়েছে, তার কোনও কিনারা হল?”
মিস্টার আহমেদ চলন্ত জিপে বসে বললেন, “মনে হচ্ছে পলিটিক্যাল মার্ডার। এ সব এলাকায় প্রচুর উগ্রপন্থী শেল্টার নিয়েছে। নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ থেকে খুন হওয়া আশ্চর্যের নয়।”
অর্জুন কোনও কথা বলল না। আজকাল পলিটিক্যাল মার্ডার বলে অনেক খুনের তদন্ত চাপা দেওয়া যায়। আর তদন্ত করে সুরাহা না পেলে ওই শব্দ দুটো বলে পাশ কাটাতে অসুবিধে হয় না। দু’ পাশে জঙ্গল রেখে জিপ থামল তিন নম্বর কালভার্টের পাশে। টপাটপ জিপ থেকে নেমে পড়লেন অফিসাররা। অর্জুন তাঁদের অনুসরণ করল। পাথর ডিঙিয়ে-ডিঙিয়ে জলের কাছে পৌঁছে এপাশ-ওপাশ তাকিয়েও কোনও মৃতদেহের দর্শন পাওয়া গেল না। মিস্টার বিশ্বাস অর্জুনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কোথায় দেখেছিল বলুন তো?”
“কালভার্টের নীচে।”
“ওখানে তো কিছুই দেখা যাচ্ছে না।”
সত্যি কিছুই নেই। অর্জুন পাথরে পা ফেলে এগিয়ে গেল কালভার্টের নীচে। মৃতদেহ থাকলে তাদের দেখে লুকিয়ে পড়ত না। মিস্টার আহমেদ দূরে দাঁড়িয়ে হাসলেন, “আপনার সঙ্গিনীরা বোধহয় ‘হার্ডি বয়েস’ কিংবা ‘ফেমাস ফাইভ পড়ে খুব?”
অর্জুন প্রতিবাদ করল, “না। ওরা তেমন বাচ্চা নয়।”
“তা হলে হ্যাডলি চেজ কিংবা জেমস বন্ড?”
অর্জুন জবাব দিল না। মেয়েরা বলেছিল, মৃতদেহের অর্ধেকটা জলে ডোবা ছিল। সে এগিয়ে গেল জলের কাছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, একটা পাথরের অনেকটা ভিজে রয়েছে। আশে পাশের সব ক’টা পাথরের ওপরই শুকনো খটখটে। অর্জুন পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পাথরের ওপরের ধুলোয় একটা ঘষটানো দাগ। তারপরেই পায়ের ছাপ চোখে পড়ল। একটুখানি ধুলোমাটির ওপর একজোড়া পা। অর্জুন হাত নেড়ে অফিসারদের কাছে ডাকল। মিস্টার বিশ্বাস আসতে-আসতে বললেন, “কোনও লোক টায়ার্ড হয়ে হয়তো কালভার্টের ছায়ায় ঘুমোচ্ছিল, দড়িকে সাপ ভেবেছে মেয়েরা।”
অর্জুন মাথা নাড়ল, “কিন্তু এখান থেকে কাউকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মিস্টার আহমেদ, আপনি এই জায়গাটা ভাল করে দেখুন।” সে তার সন্দেহের কারণ আরও বিশদভাবে বলল। পুলিশ-অফিসার সেটা শুনে খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, “আপনার কথা সত্যি হলে এখানে একটা ডেডবডি ছিল এবং মেয়েরা আবিষ্কার করার পর কেউ সেটাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে।”
অর্জুন জলের ও পাশের জঙ্গলটাকে দেখছিল। ঝোরার জল খুব বেশি নয়। মাঝে-মাঝে হাঁটুর বেশি নয়। যে কেউ ও পার থেকে এসে…। না, ওপার থেকে নয়, মাটির দাগ বলছে যে কোনও ভারী জিনিসকে এ পাশেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ দিকে ঘাসের ওপর পায়ের চাপ এখনও মিলিয়ে যায়নি। সে ঘাসের দাগ দেখে আরও একটু এগোল। এখান থেকে হাঁটলে রাস্তায় গিয়ে উঠতে হবে। কোনও পথ নেই। লতা-ঘাস আর মাটির ওপর পায়ের ছাপ স্পষ্ট। পা বেশ গভীর হয়ে মাটিতে বসে ছিল। সে মিস্টার আহমেদকে সেখানে ডেকে দেখাল।
এবার ধীরে-ধীরে ওরা পাহাড়ে চড়ার কষ্ট করে রাস্তায় উঠে এল। মিস্টার আহমেদ বললেন, “কিন্তু অর্জুনবাবু, আমরা নিজেরাই এই পথে উঠতে যে কষ্ট করলাম, তাতে কি আপনার মনে হচ্ছে কেউ আর একটা ডেডবডি নিয়ে উঠতে পারবে?”
“লোকটা যদি প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়?”
“এ দিকের সমস্ত শক্তিশালী মানুষের ঠিকানা পুলিশের খাতায় লেখা আছে।”
“যদি মানুষ না হয়?”
“তার মানে?” এবার মিস্টার বিশ্বাস ঘুরে দাঁড়ান।
“আপনার জঙ্গলে এমন একটা প্রাণীকে মেয়েরা আজ দেখেছে, যার আকৃতি অনেকটা গোরিলার মতো, লম্বায় অন্তত ফিট পাঁচেক। ওরা অবশ্য অনেক দূর থেকে দেখেছে।
হোহো করে হেসে উঠলেন মিস্টার বিশ্বাস। সামনের একটা গাছ থেকে এক ঝাঁক টিয়া আকাশ সবুজ করে উড়ে গেল ভয় পেয়ে। বিশ্বাস বললেন, “এই জঙ্গলে গোরিলা? আপনার সঙ্গিনীদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। হনুমান ছাড়া কিছু নেই। আর হনুমানদের পক্ষে একটা মানুষের শরীর বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।”
অর্জুন কথাটার প্রতিবাদ করতে পারল না। সে জানে, ওই রকম জন্তুর এখানে থাকার কথা নয়। তবু রাস্তা পেরিয়ে ও জঙ্গলের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা করার পর মনে হল, জঙ্গল সরিয়ে কেউ হয়তো ও পাশে নেমে গিয়েছে। এখনও গাছপালা নিজেদের ডালপাতা স্বাভাবিক করেনি। সে দাগ লক্ষ করে নেমে পড়ল। বিশ্বাস বললেন, “ওভাবে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। সাপ থাকতে পারে।”
আহমেদ বললেন, “ওয়াইল্ড গুজ চেজ করছেন আপনি?”
কিন্তু চার-চারটে মেয়ে মিথ্যে দেখতে পারে না। মিনিট-পনেরো খোঁজাখুঁজি করার পর সে পাখিদের চিৎকার শুনতে পেল। একটা গাছের ডালে পাখিরা অনবরত চিৎকার করে যাচ্ছে। এখন অর্জুনের চার পাশে ঘন জঙ্গল। রাস্তা চোখের আড়ালে চলে যাওয়ায় সে অফিসারদের দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ মনে হল আশে পাশে কেউ আছে। এই মনে হওয়াটার কোনও কারণ নেই, কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন সাবধান করে দিচ্ছিল অর্জুনকে। সে ঘুরে দাঁড়াতেই ওপর থেকে একটা ভারী জিনিস ঝাঁপিয়ে পড়ল মাথার ওপরে। পড়ে যেতে যেতে অর্জুন পরিত্রাহি চিৎকার করল। চোখ বন্ধ হবার আগে একটা লোমশ পেট-বুক নজরে এল।
চোখ মেলতেই বিশ্বাসের মুখ দেখতে পেল অর্জুন। ঝুঁকে পড়ে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছিল আপনার?”
অর্জুন মাথা তুলতে গিয়ে ঘাড়ে প্রচণ্ড বেদনা অনুভব করল। তবু সে উঠে বসল। ঘাড় এবং কোমরে ব্যথা। দাঁতে দাঁত চেপে অর্জুন সেটা সহ্য করতে চাইল। তাকে এখন তুলে নিয়ে আসা হয়েছে রাস্তায়। আর তখনই একটা জিপকে দ্রুত গতিতে আসতে দেখা গেল উলটো দিক দিয়ে। মিস্টার আহমেদ বললেন, “থানা থেকে ফোর্স আসছে মনে হচ্ছে।”
অর্জুন বলল, “প্লিজ, আপনারা এ পাশের জঙ্গলটা ভাল করে খুঁজে দেখুন। আমাকে আক্রমণ করা হয়েছিল। আচমকা আহমেদ সজাগ হলেন, “ক’জন ছিল?”
“একজনই। একটা লোমশ বুক-পেট। আর কিছু দেখতে পাইনি।’ জিপটা থামতেই আহমেদ তাদের নির্দেশটা জানিয়ে দিলেন। মিনিট-দশেকের মধ্যে পুলিশদের চিৎকারে জানা গেল, ওরা ডেডবডি খুঁজে পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটা লম্বা গাছের ডালে শরীরটাকে ঝুলিয়ে ওরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। পরিষ্কার রাস্তায় শুইয়ে দেওয়া হল মৃতদেহকে। কোনও লোমশ জন্তুর চিহ্ন এই জঙ্গলের ধারে-কাছে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিস্ময় বেড়ে যাচ্ছিল অর্জুনের। সে ভুল করছে না। জন্তুটা ওখানে ছিলই। নন্দিনীরা ঠিকই দেখেছিল। নিশ্চয়ই লোকজন দেখে সে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। জঙ্গলটা অনেকখানি জায়গা নিয়ে, যে-কোনও জন্তুর পক্ষে নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেতে অসুবিধে হবার কথা নয়।
মিস্টার বিশ্বাসের কথা কানে এল, “এই লোকটাকে এর আগে দেখেছি বলে মনে হয় না। আপনারা কেউ চিনতে পারছেন একে?”
পুলিশ কোনও উত্তর দিল না। আহমেদ জিপের ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন, ফরেস্ট অফিসের কোনও দারোয়ানকে তুলে আনতে। জিপ বেরিয়ে গেল।
অর্জুন দেখল, লোকটি এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের একজন। ওর ধুতি এবং পা এখনও ভিজে। তার মানে মেয়েরা ভুল দেখেনি। কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে মৃতদেহটাকে কালভার্টের নীচ থেকে ওই জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হল কেন? কে বা কারা এই কাজটা করল?
অর্জুন ভিড় থেকে সরে এল। ধীরে-ধীরে কালভার্টের সামনে দাঁড়াল। তিরতির করে ঝোরার জল বয়ে যাচ্ছে। এখানকার পৃথিবী বেশ শান্ত। খুনটা এখানে হয়নি। হলে মৃতদেহের আশ পাশে রক্তের চিহ্ন দেখা যেত। আচ্ছা, মৃতদেহে কি রক্তের দাগ রয়েছে? সে দ্রুত চলে এল মৃতদেহের পাশে। খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
আহমেদ জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছেন?”
‘লোকটা মরল কীভাবে?”
“বুঝতে পারছি না। অ্যাপারেন্টলি কোনও ক্ষত চোখে পড়ছে না।”
অর্জুন শরীরটার পাশে বসে পড়ল। মৃতদেহ দেখে মনে হচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা আগেও লোকটা বেঁচে ছিল। পচন শুরু হলেও সেটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কোথাও কোনও চিহ্ন নেই। পোস্টমর্টেম না করলে বোঝা যাবে না। এই জঙ্গলে সেটা ঠিক-মতো করার ব্যবস্থা আছে কি না কে জানে।
এই সময় জিপ ফিরে এল। ফরেস্ট অফিসের একজন গার্ড জিপ থেকে নেমে মিস্টার বিশ্বাসকে সেলাম করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “দ্যাখো তো, চেনো কি না?”
লোকটাও এ-দেশীয়। দু’ বার তাকাতে হল না তাকে, “হাঁ সাব। ওই উত্তর দিকের গ্রামে থাকে। হাটে-হাটে ঘুরে তামাক বিক্রি করে।”
“ওর সঙ্গে তোমার আলাপ ছিল?”
“দু’-একবার কথা বলেছিলাম।”
“এই জঙ্গলে ও কেন এসেছে বলতে পারো?”
“না সাব।
“ঠিক আছে, তুমি যাও।
মৃতদেহ তুলে নিয়ে গেল পুলিশ। আহমেদ যাওয়ার আগে বলে গেলেন যে, তিনি বিকেলে আসবেন একবার। বিশ্বাসের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে ফিরছিল অর্জুন। ওঁর ধারণা : জঙ্গলে আশ্রয় নিতে-আসা উগ্রপন্থীদের সঙ্গে গ্রামবাসীদের সংঘর্ষ ঘটায় ওরাই খুন করে রেখে গেছে। অর্জুন একমত হল না। সেরকম কিছু ঘটলে সামনাসামনি ক্ষত দেখা যেত, রক্ত ছড়িয়ে থাকত। কিন্তু মিস্টার বিশ্বাস অন্য কোনও যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। গ্রামবাসীদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হলে হত্যার জন্য জঙ্গলের এত ভেতরে আসার প্রয়োজন পড়বে না। তা ছাড়া ওই লোমশ জন্তুর গল্প নেহাতই গপ্পো। প্রতি বছর এই সব জঙ্গলে ভাল করে সার্ভে করা হয়। থাবা গুনে বাঘের সংখ্যা সঠিকভাবে যেখানে পাওয়া যায়, সেখানে অমন জন্তু সবার চোখের আড়ালে থেকে যাবে এমন হতেই পারে না। মেয়েরা ভুল দেখেছিল আর অর্জুন সেটা নিয়ে বেশি ভেবেছিল বলে একটা বড় হনুমানকেও ওই কল্পনায় এঁকে ফেলেছে। কিন্তু তার কাছে একটাই বিস্ময়, মৃতদেহটা জায়গা বদলাল কী করে? মেয়েরা যে ওটাকে কালভার্টের নীচে দেখেছিল, তা অস্বীকার করার তো উপায় নেই। ভদ্রলোক বললেন, “একেই হাজারটা ঝামেলা নিয়ে আছি, তার ওপর আর একটা যোগ হল।”
বাংলোর কাছাকাছি এসে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওই লোকটার গ্রামে কি খোঁজ-খবর করতে যাবেন? আমার এ-ব্যাপারে কৌতূহল হচ্ছে।”
“ওটা পুলিশের কাজ। আমার এলাকা নয়। তবে যখন আপনি ইন্টারেস্টেড, তখন আহমেদকে বলতে পারি আপনার কথা।’
মিস্টার বিশ্বাসের কাছে বিদায় নিয়ে বাংলোয় ঢুকল অর্জুন। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় দোতলার খোলা দরজাটি চোখে পড়ল। সেই মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। বাঁ-দিকের নীচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে এক-দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন অর্জুনের দিকে। অর্জুন মাথা নিচু করে ওপরে উঠে এল। এই ভদ্রমহিলা কে? উনি কি একা আছেন? কোনও পুরুষসঙ্গী ছাড়া এত গভীর জঙ্গলে কেউ বেড়াতে আসে না! মিস্টার বিশ্বাসকে পরে এঁর কথা জিজ্ঞেস করতে হবে। ইনি কেন সারাক্ষণ দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকবেন?
নন্দিনীরা নিজেদের ঘরেই ছিল। ওদের বিরক্ত না করে অর্জুন নিজের ঘরে ঢুকল। শরীরে ঘাম জমছে। ব্যাগ থেকে পাজামা-পাঞ্জাবি বের করে সে বাথরুমে ঢুকে গেল। বেশ বড় বাথরুম। শাওয়ার রয়েছে। পাশে খোলা জানালা দিয়ে জঙ্গলটা দেখা যাচ্ছে। খুব কাছে। দাড়ি কামাতে-কামাতে অর্জুন জন্তুটার কথা ভাবছিল। মৃতদেহকে ও-ই সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে সন্দেহ নেই। অর্থাৎ, মেয়েরা মৃতদেহ আবিষ্কার করার পর জন্তুটা সেটাকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। এ রকম অদ্ভুত ব্যাপার সে আগে কখনও শোনেনি। মৃতদেহ খেতে আগ্রহী জন্তুরা কি দুই পায়ে চলে, যত দূর মনে পড়ছে, দুই পা যারা ব্যবহার করে, তারা নিরামিষাশী হয়। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করেছিল সে। খামোকা জড়িয়ে যাচ্ছে কি কোনও ঝামেলায়? সে এসেছে চারটে মেয়েকে গাইড করতে। এ সব কেস নিয়ে মাথা ঘামাতে সে আসেনি। স্নান শেষ করে মাথা মুছতে-মুছতে সে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। জঙ্গলের ওপরে এখন কড়া রোদ। হঠাৎ অর্জুন চমকে উঠল। তার মনে হল, সামনের গাছগুলোর আড়াল থেকে কেউ বেরিয়ে এসেছিল, তাকে দেখামাত্র চট করে সরে গেল। সে ঠিক দেখেছে। কেউ একজন—তার চেহারা স্পষ্ট হয়নি, কিন্তু সে ধরা দিতে চায়নি। এখনই যদি দৌড়ে ওখানে যাওয়া যেত তা হলে…না, জামাকাপড় পরতে-পরতে ও উধাও হয়ে যাবে। ব্যাপারটা মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছিল না। একটা লোক খামোকা কেন তাকে দেখে লুকোতে যাবে? ও কি লুকিয়ে কাউকে দেখতে এসেছিল? এখানকার সাধারণ মানুষ জঙ্গলের এত গভীরে আসে না। যে এসেছে, তার নিশ্চয়ই বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। সেটা কী? একবার মনে হল মেয়েদের সাবধান করা দরকার। এই সময় বাইরের দরজায় শব্দ হল। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বাইরে বেরিয়ে এল অর্জুন। দরজা খুলে দেখল, লাঞ্চের ট্রে হাতে বেয়ারা দাঁড়িয়ে আছে, “সব কোই কো খানা হো গিয়া সাব।”
“ওই মেমসাহেবরা খেয়েছে?”
“জি সাব।”
লোকটা টেবিলে খাবার রাখল। চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “তুমি এই বাংলোয় কদ্দিন আছ?”
“পাঁচ সাল সাব।” লোকটা জবাব দিল।
“আচ্ছা, দোতলায় এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম। উনি কি একা আছেন?”
“হাঁ সাব। মেমসাব এক সাব কা সাথ আয়া থা। সাব গিয়া শিলিগুড়ি। মেমসাব ইহাঁ আকেলা হ্যায়। ঘরসে নেহি নিকলাতা।”
“কোত্থেকে এসেছেন উনি?”
“নেহি জানতা সাব।”
“আচ্ছা, আর একটা কথা, গত পাঁচ বছরে এই বাংলোয় কোনও গোলমাল হয়েছে? এই ধরো চুরি-চামারি, খুন-খারাপি?”
‘নেহি সাব। বিলকুল নেহি হুয়া।”
“ঠিক আছে, তুমি পরে এসে ট্রে নিয়ে যেও।”
খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে বিছানায় শুয়ে যেই সে সিগারেট ধরিয়েছে, অমনি মেয়েরা এল। নন্দিনী বলল, “বেয়ারার কাছে শুনলাম ভোরবেলায় হাতির পিঠে জঙ্গল ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা যাব।”
“যাবেন।”
“আগে থেকে সেটা জানাতে হবে না?”
“জানিয়ে দেব।”
চিক্কি বলল, “আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ডেডবডি দেখতে।”
“ও, আপনি তো গোয়েন্দা।
“না, আমি সত্যসন্ধানী।”
নন্দিনী বলল, “আপনি কি ওই রেঞ্জারের দেখা পেয়েছিলেন?”
“ওঁর সঙ্গেই গিয়েছিলাম। কিন্তু উনি বলছেন, আপনারা যে লোমশ প্রাণীটিকে দেখেছেন—এই জঙ্গলে সে রকম প্রাণী নেই।”
“মিথ্যে কথা।” ফুঁসে উঠল নন্দিনী, “আমরা স্পষ্ট দেখেছি।”
“যাক। এ নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও দরকার নেই।”
“কিন্তু আমরা এখানে খুব বেশি বোর হচ্ছি।” পুনম বলল।
“মানে?”
“চার পাশে জঙ্গল। ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে। এ জন্যে নিশ্চয়ই দিল্লি থেকে এত দূরে আমরা আসিনি। এর চেয়ে বেশি পয়সা দিয়ে দার্জিলিং-এ গেলে আমরা বেশি আনন্দ পেতাম। সেখানে অনেক-কিছু দেখার আছে।”
“অবশ্যই। দার্জিলিং হলং-এর থেকে অনেক বেশি আকর্ষক। তবে এখানে যে জন্তু-জানোয়ার দেখতে পাবেন, তা কিন্তু দার্জিলিং-এ নেই। আর হ্যাঁ, একটা কথা বলব, যে-খুনটা আজ এখানে হয়েছে, আজই হয়েছে ধরে নিচ্ছি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের কোনও এসকর্ট ছাড়া জঙ্গলে ঢুকে পড়া ঠিক হবে না।”
নন্দিনী ভূ কোঁচকাল, “কেন?”
“জঙ্গলে কিছু উগ্রপন্থী আশ্রয় নিয়েছে। তারা বোধহয় আপনাদের উপস্থিতি ভাল চোখে নেবে না। তা ছাড়া, ওই মৃতদেহটি নিশ্চয়ই আরও অনেক ঝামেলা ডেকে আনবে।”
টিনা বলল, “তা হলে আজই এই জঙ্গল ছেড়ে আমরা শহরে চলে যাচ্ছি না কেন?”
“আপনারা যদি যেতে চান, তা হলে আমি নিশ্চয়ই নিয়ে যাব।”
“না।” মাথা নাড়ল নন্দিনী, “এখানে এসে আমার খুব ভাল লাগছে। তোরা কি একটা অ্যাডভেঞ্চার করতে ভয় পাচ্ছিস?”
অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “অ্যাডভেঞ্চার মানে?”
নন্দিনী বলল, “বাংলোর বেয়ারার কাছে জানতে পারলাম, এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে। সেখানে রাত কাটালে নানা রকম জীবজন্তুকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়, যাদের দিনের বেলায় দেখতে পাওয়া অসম্ভব। আজ রাত্রে আমরা সেখানে যাব।
চিল্কি বলল, “লেটস্ গো।”
মেয়েরা ঘাড় নেড়ে দরজার দিকে এগোতে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছেন?”
“একটু হাঁটব।” নন্দিনী ঘুরে দাঁড়াল, “জঙ্গলে এসে ঘরে বসে থাকব নাকি?”
সে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল, “অত ভোরে উঠেছেন, তার ওপর আজ রাত্রেও জেগে থাকতে হবে, দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিলে শরীর ঠিক থাকত!”
“ওঃ, মিস্টার গাইড, আমরা কি খুব শিশু, কী মনে হয় আপনার?” কথাটা বলে নন্দিনী হাসতে-হাসতে মেয়েদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
বেশ রাগ হল অর্জুনের। অত্যন্ত অবাধ্য মেয়েগুলো। তার কথা যদি শুনতেই না চায়, তা হলে সে আছে কেন? অথচ ওরা বাইরে ঘুরবে আর সে ঘরে বসে হাই তুলবে তাও হতে পারে না। কিছু হলে অমলদাকে কৈফিয়ত তো তাকেই দিতে হবে। সেজেগুজে বেরিয়ে এল অর্জুন। দোতলায় নামার সময় সে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজাটার দিকে তাকাল। পরদা ফেলা, কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
লনে নামতে-নামতে সে মেয়েদের দেখতে পেল। যাক বাবা, ওরা ফরেস্ট অফিসের দিকে যাচ্ছে। ও দিকে কোনও বিপদ নেই। অর্জুন সেদিকেই হাঁটতে লাগল। মেয়েদের সঙ্গে তার দূরত্ব বেশ অনেকটাই। দু’ পাশে জঙ্গল। সামনে এক নম্বর কালভার্ট। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা লোক কালভার্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে মেয়েদের দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে যে, সন্দেহ না এসে যায় না। অনেক সময় কিছু বদ প্রকৃতির লোক এমন কাণ্ড করে, কিন্তু লোকটা তো নেহাতই গ্রাম্য মানুষ। অর্জুনের ঝাপসা মনে পড়ল, স্নান করার সময় এক ঝলকে যে লোকটা গাছের আড়ালে চলে গিয়েছিল তার পোশাকও এমন ছিল। অর্জুন চটপট একটা গাছের আড়ালে চলে গেল। লোকটা আর এগোচ্ছে না, কিন্তু দাঁড়িয়ে ভাবছে। এই সময় ফরেস্ট অফিসের দিক থেকে একটা গাড়ির আওয়াজ ভেসে আসতেই লোকটা তিড়িং করে কালভার্টের দিকে চলে গেল। অর্জুন তাকে এখনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
প্রাইভেট নয়, একটা ট্যাক্সি সোজা চলে গেল বাংলোর দিকে। পেছনে যে বসে আছে, তাকে স্পষ্ট দেখতে পেল না। মনে পড়ে যাওয়াতে ঘাড় ঘুরিয়ে সে আর-একবার নম্বরটা দেখতে চাইল। না শিলিগুড়ির সেই ট্যাক্সি নয়।
অর্জুন লোকটিকে দেখল। নেই। একটু আগে যে ওখানে দাঁড়িয়েছিল, তার চিহ্ন নেই এখন। ট্যাক্সির নম্বর দেখতে ঘাড় ঘোরাবার সময়েই লোকটা হাওয়া হয়ে গিয়েছে। তাজ্জব ব্যাপার। অর্জুন আরও খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে রইল গাছের আড়ালে। না, লোকটার কোনও চিহ্ন আর দেখা যাচ্ছে না। সে রাস্তায় নামল। সতর্ক চোখে কালভার্টটা পার হল। এটা বোঝাই যাচ্ছে, লোকটা রাস্তায় উঠে আসেনি। এখানে কালভার্ট ছাড়িয়ে ঝোরাটা বেশ চওড়া। পাশেই গভীর জঙ্গল। যে-কোনও মানুষ ওখানে নেমে গেলে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। ফরেস্ট অফিস পর্যন্ত হেঁটে এল অর্জুন। এখনই গাছের ছায়া ঘন হতে শুরু করেছে। তাদের আয়তনও বাড়ছে। কিন্তু আকাশে সূর্যদেব বহাল রয়েছেন। রেঞ্জারের অফিসে উঠে এসে অর্জুন দেখল, মিস্টার বিশ্বাস এর মধ্যেই স্নান করে ফিরে এসেছেন নিজের চেয়ারে। ফাইলপত্র খুলে লেখালেখি করছেন। জুতোর শব্দ শুনে মুখ তুলে বললেন, “আসুন। ভালই হল, খাতায় নামধাম লিখে দিয়ে যান।”
খাতাটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি, “এটা নিয়ম। তবে ধাম যে সবাই ঠিক লিখে যান, তা নয়। মাস-তিনেক আগে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন কলকাতা থেকে। সপ্তাহখানেক ছিলেন। পেমেন্ট করার সময় দেখা গেল দেড়শো টাকা কম পড়ছে। বললেন, গিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। সেটা আজও দিচ্ছেন। চিঠি দিয়েছি, ফেরত এসেছে।”
অর্জুন হেসে বলল, “না, আমরা পুরো পেমেন্ট করেই যাব।” নামধাম লিখে সে একটা নামের ওপর চোখ রাখল। মিস্টার পুরি। মালবাজারের সেই ভদ্রলোক, যিনি বেয়ারাকে ধমক দিয়েছিলেন দরজায় টোকা দেওয়ার জন্যে। ওই ভদ্রলোক এখানে কখন এলেন? সে প্রশ্নটা করল মিস্টার বিশ্বাসকে। তিনি বললেন, “ভদ্রলোক এই একটু আগে এসেছেন। ট্যাক্সিতে বাংলোর দিকে গেলেন।”
“এঁর ঠিকানা কী?”
“ওটা জিজ্ঞেস করবেন না। ব্যাপারটা সরকারি, এটুকু বলতে পারি।’ “সরকারি মানে?”
“কিছু-কিছু অফিসার অথবা সরকারের বড় কর্তার সুপারিশে কোনও-কোনও মানুষ আসেন, যাঁদের ডিটেলস আমরা ওই খাতায় লিখে রাখি না।”
অর্জুন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। আর যাই হোক, মিস্টার পুরি তা হলে সন্দেহভাজনদের লিস্টে পড়ছেন না। সে সিগারেট ধরাল, “আচ্ছা মিস্টার বিশ্বাস, এখান থেকে কিছু দূরে একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে, সেখানে রাত কাটাতে গেলে কী করতে হবে? শুনেছি, বন্যজন্তু দেখা যায় ওখান থেকে।”
“আপনারা যেতে চাইছেন ওখানে?”
“হ্যাঁ।”
“আজ রাত্রে আমি আপনাকে সিকিউরিটি দিতে পারব না।”
“ও।”
“আসলে আজ রাতে একটা বড় ধরনের রেইডের প্ল্যান আছে। মিস্টার আহমেদ আসবেন সন্ধের পরেই। বুঝতেই পারছেন!”
“কী ধরনের রেইড?”
“আমাদের কাছে ডেফিনিট ইনফরমেশন আছে, একটি বিশেষ এলাকায় কিছু উগ্রপন্থী ঢুকেছে। এরা এসেছে পাহাড় থেকে পালিয়ে। মাঝে-মাঝে গ্রামে গিয়ে ডাকাতি করে। জঙ্গলের কাঠ কেটে ফেলছে। এদের কাছে আধুনিক আর্মস প্রচুর পরিমাণে আছে। তবে যাওয়ার সময় আপনাদের আমরা ওয়াচ টাওয়ারে নামিয়ে দিয়ে যাব। একটাই শর্ত, সারা রাত আপনারা ওখানে বসে থাকবেন।”
“অসুবিধে হয় না তো?”
“মশার কামড় থেকে বাঁচবার জন্যে মলম নিয়ে যাবেন, ব্যস।”
অর্জুন ব্যবস্থাটা মেনে নিল। ওই মেয়েরা নিশ্চয়ই নাছোড়বান্দা হবে। অতএব এই ব্যবস্থাই ভাল। হঠাৎ তার মনে পড়ল। সে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মিস্টার বিশ্বাস, টুরিস্ট বাংলোর দোতলায় একজন অবাঙালি টাইপের দেখতে ভদ্রমহিলা রয়েছেন। উনি কে বলতে অসুবিধে আছে?”
মিস্টার বিশ্বাস মিটিমিটি হেসে ফেললেন, “এসেছেন মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এর মধ্যে মৃতদেহ আবিষ্কার করেছেন আবার এই ভদ্রমহিলাকেও দেখতে পেয়ে গেলেন!” ফাইল বন্ধ করলেন ভদ্রলোক, “ওঁদের নিয়ে বাংলোর লোকজনের কৌতূহল কম নয়। উনি মিসেস ভার্মা। দিল্লিতে বাড়ি। দিন-তিনেক আগে মিস্টার ভার্মার সঙ্গে এখানে এসেছেন বেড়াতে। এসেই প্রথম রাত্রে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল। ওটা বাংলোর বাবুর্চিরাও শুনতে পেয়েছিল। পরশু বিকেলে মিস্টার ভার্মা একটা জরুরি কাজে শিলিগুড়িতে চলে গিয়েছেন। আজই তো তাঁর ফেরার কথা।”
“ভদ্রমহিলা ঘর থেকে বের হন না?” অর্জুনের অস্বস্তি শুরু হল।
“না। বোধহয় একটু ভীরু প্রকৃতির মানুষ মিস্টার বিশ্বাস উঠে দাঁড়ালেন, “আমাকে একটু মাদারিহাট যেতে হবে, অর্জুনবাবু।”
“খুব ভাল হল। আপনি যদি মাঝ-রাস্তায় আমাকে নামিয়ে দেন…”
“চলুন। মাঝ-রাস্তায় কেন?”
‘মেয়েরা ওই পথেই গিয়েছে।”
“ওদের বলুন, ইচ্ছে করলে মাদারিহাটটা ঘুরে আসতে পারে। ফেরার সময় আমার গাড়িতেই ফিরবে। কোনও অসুবিধে নেই।”
ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়িতে চেপে পরিষ্কার রাস্তা দিয়ে অর্জুন যাচ্ছিল মিস্টার বিশ্বাসের সঙ্গে। দু’ পাশে জঙ্গল আছে বটে, কিন্তু তত ঘন নয়। অর্জুন সে দিক থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার বিশ্বাস, এ দিকে গ্রামের মানুষ অথবা স্টেডি চাকরি করে না এমন মানুষের জীবনে ইদানীং কোনও পরিবর্তন এসেছে কি?”
“কী ধরনের পরিবর্তন?”
“এই ধরুন, হঠাৎ অবস্থা পালটে যাওয়া, হাতে নগদ পয়সা আসা, বাড়িতে যে পারিবারিক সোনা ছিল তা ব্যাঙ্কে জমা রেখে ধার নেওয়া।”
“পারিবারিক সোনা? নাঃ। সে তো বহু বছর আগেই শেষ। এরা সোনা কী রকম দেখতে, তা-ই জানে না। এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন বলুন তো?”
“এমনি। মনে হল তাই।”
এই সময় মেয়েদের দেখা গেল। মাঝ-রাস্তা জুড়ে গান গাইতে-গাইতে চলেছে। গাড়ির আওয়াজ পেয়ে এক পাশে সরে দাঁড়াল। গাড়ি দাঁড়াতে অর্জুন মুখ বাড়িয়ে বলল, “মাদারিহাট বেড়াতে যাবেন? তা হলে ঘুরে আসতে পারেন।”
মেয়েদের দ্বিতীয়বার বলতে হল না। কলবল করে উঠে বসল। তারপরেই ওরা মিস্টার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে লাগল সমানে, মাদারিহাটে কী-কী দেখার আছে, কী জিনিস পাওয়া যায়? এখান থেকে ফুন্টসিলিং কত দূরে? আজ রাত্রে ওয়াচ টাওয়ারে যাবেই তারা।
এই সময় বিপরীত দিক থেকে একটা ট্যাকসি আসতে দেখা গেল। এদের ড্রাইভার গতি কমাল। মুখোমুখি হতেই অর্জুনের নিশ্বাস বন্ধ হল। ট্যাক্সির নম্বর তার চেনা। ড্রাইভার এবং ভাল করে দেখা না গেলেও, সওয়ারিকেও। পাশ কাটিয়ে ট্যাক্সিটা চলে গেল। জঙ্গল পেরিয়ে চেক পোস্টের কাছে পৌঁছতে চৌকিদার সেলাম করে খুলে দিল লোহার পথ-নিরোধক পাইপটা। অর্জুন তাকে জিজ্ঞেস করল, “একটু আগে কি মিস্টার ভার্মার ট্যাক্সি গেল?”
“জি সাব।” লোকটা মাথা নাড়ল।
মিস্টার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি মিস্টার ভার্মাকে চেনেন?”
“একটুখানি।” অর্জুন গম্ভীরমুখে জবাব দিল।
কথাগুলো শুনছিল মেয়েরা। নন্দিনী বলল, “স্ট্রেঞ্জ! উনি এখানেও?”
অর্জুন কথা বাড়াল না। মিস্টার বিশ্বাস ওদের মাদারিহাট বাজারের সামনে নামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি সাড়ে পাঁচটায় ফিরব। তখন আপনারা এখানে থাকবেন। নিয়ে যাব। মনে রাখবেন, সন্ধের পর জঙ্গল পেরিয়ে বাংলোয় ফেরার জন্যে কোনও গাড়ি পাবেন না।”
তিনি চলে যাওয়ামাত্র নন্দিনী জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার বলুন তো? আমরা যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই ভার্মা-আঙ্কল ধাওয়া করছেন কেন?”
“আমার মনে হয় উনি জানেন না, আপনারা এখানে আছেন। উনি এসেছেন ওঁর স্ত্রীর কাছে, যিনি আমাদের বাংলোর দোতলায় পরশু থেকে একা আছেন।
“ভার্মা-আন্টি?” অবাক হয়ে বলে নন্দিনী।
“আপনি তাঁকে চেনেন?”
“হ্যাঁ। আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছেন। উনি যে একই বাংলোয় আছেন, তা তো আমি জানি না। আমার সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক।”
ওই রকম চাউনির কোনও মহিলা ভাল সম্পর্ক রাখতে পারেন শুনে অবাক হল অর্জুন। নন্দিনী তখন তার বন্ধুদের বলছিল, “ভার্মা-আন্টি দারুণ রান্না করে। কিন্তু আমার ভাবতে অবাক লাগছে, আমরা একই বাংলোয় থেকেও সেটা জানি না।”
অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওঁকে দেখতে কী রকম?”
“ঠিক মা-মা ধরনের। আই মিন, মাদারলি। একটু পুরনো দিনের মানুষ।
“খুব সুন্দরী?”
“নট দ্যাট। শি ইজ নাইদার সুন্দরী নর স্মার্ট। আপনি আমাদের ঠাকুমা-দিদিমাদের দেখেছেন? ফুল অব স্নেহ!”
“বুঝতে পেরেছি।” অর্জুন মুখে কিছু বলল না। কিন্তু সে আরও ধন্দে পড়ল। ওই মহিলাকে দেখলে কোনও মতেই মা-মা বলে মনে হয় না। একটি স্মার্ট আধুনিকা—যিনি সমস্ত পৃথিবীকে সন্দেহ করেন, এমন একটা ছবি মনে আসে। তা হলে নন্দিনীর বর্ণনার সঙ্গে ওঁর কোনও মিল নেই। তা হলে কি ভার্মার্সাহেব নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এখানে আসেননি?
ওরা মাদারিহাটের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে ঘুরে বেড়াল। এখান থেকে বাস ডুয়ার্সের নানা অঞ্চলে যায়। শিলিগুড়ি কিংবা জলপাইগুড়ি শহরে ঘন ঘন বাস। আর ফুন্টসিলিং-এ পৌঁছতে পঁয়তাল্লিশ মিনিটও যাবে না। মেয়েরা বায়না ধরল ফুন্টসিলিং-এ যাওয়ার। কিন্তু অর্জুন আপত্তি করল। ওখানে গেলে মিস্টার বিশ্বাসের গাড়ির লিফট পাওয়া যাবে না।
