৬.
হোটেলে ফিরে মেজরের ঘুম ভাঙাতে ভাল পরিশ্রম করতে হল। চেন না খুলে সামান্য ফাঁক করে ওকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মেজর বললেন, “ওঃ, তুমি! আমি ভাবলাম আবার কেউ ঘর ভুল করল বুঝি?”
ঘরে ঢোকার পর অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “কী ব্যাপার বলুন তো?”
“আর বোলো না। অন্তত তিনবার দরজায় ধাক্কা দিয়েছে কেউ-না-কেউ। ঘরের নম্বর জিজ্ঞাসা করেছে। আমি খুলিনি। শুয়েই ছিলাম।”
“খুব ঘুম পেয়েছিল বুঝি!”
“না, না। ওরা ভুল নম্বর বলছিল। ষোলো নম্বর ঘর চাইছিল।”
অর্জুন চমকে উঠল, “আমাদের এই ঘরটাই তো ষোলো নম্বর।”
“অ্যাঁ।” মেজর চোখ পিটপিট করলেন। তাঁর বিশাল শরীরটাকে জবুথবু দেখাল, “বড্ড ভুল হয়ে গেছে হে। আমি ভেবেছিলাম সতেরো। লোকগুলোকে কষ্ট দিলাম অনর্থক। ছি ছি ছি।”
বিছানায় ঢোকার সময় অর্জুন শান্ত গলায় বলল, “না জেনে হয়তো ঠিক কাজই করেছেন। জানার পর আবার দরজা খুলতে যাবেন না।”
“মানে?” মেজর ওর বিছানার কাছে এগিয়ে এলেন।
“প্রতি মুহূর্তে কেউ-না-কেউ আমাদের অনুসরণ করে থাকে।”
দুপুর নয়, ওরা হোটেল ছেড়ে মার্শালসাহেবের উদ্দেশে বের হল যখন, তখন ভর-বিকেল। অবশ্য সময়ের এই ভাগটা করতে হয় ঘড়ি দেখে। রোদ না থাকায় সকাল আর দুপুরকে বিকেলের থেকে আলাদা করা অসম্ভব।
ট্যাক্সি নয়, ব্ল্যাকপুলের বাস টার্মিনাস থেকে বাসে উঠেছিল ওরা। জলপাইগুড়ির বাস যদি এমন হত! ড্রাইভারের সিটের পাশ দিয়ে ওঠার সময় টিকিট নিয়ে ভেতরের আরামদায়ক আসনে গিয়ে বোসো। জিনিসপত্র রেখে দাও লাগেজ-বক্সে। কারও সঙ্গে কারও শরীর ঠেকছে না। একটুও ঝাঁকুনি না দিয়ে মসৃণ গতিতে গাড়িটা চলেছে সমুদ্রের ধার-ঘেঁষা রাস্তা দিয়ে। এর মধ্যে মেজর ড্রাইভারকে বলে এসেছেন মার্শালসাহেবের কাছে পৌঁছতে, যেখানে ওদের বাস থেকে নামতে হবে সেখানে মনে করে নামিয়ে দিতে। অর্জুনের হঠাৎ মনে হল, পৃথিবীর সর্বত্র মানুষের আচরণ অনেকটাই একরকম। দেশ এবং জাতিভেদে ভাষা এবং জীবনযাত্রার তারতম্যে যে-প্রভেদটা প্রথমেই নজরে আসে, সেটাকে উপেক্ষা করলে দেখা যাবে প্রত্যেকে একই গলায় সুখ-দুঃখ অথবা উদ্বেগের কথা বলে। জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার পথে অনেক মানুষ বারংবার কণ্ডাক্টরকে মনে করিয়ে দেয়, তাকে ফাটাপুকুরে অথবা বেলাকোবায় নামিয়ে দিতে।
মেজর একটু ঝুঁকে বললেন, “ব্যাঙ্কের ব্যাপারটা মিটিয়ে গেলে হত হে। বড্ড কৌতূহল হচ্ছে।”
অর্জুন বলল, “আমাদের লকার-রুমে ঢুকতে দিত না।
“কেন? চাবি নিয়ে গেলে দেবে না কেন?”
“ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম। দেখে সন্দেহ হল, ওই ব্যাঙ্কে কোনও ভারতীয়ের অ্যাকাউন্ট নেই। সবাই আমার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়েছিল। লকারের খোঁজ করলে ওরা নিশ্চয়ই গোপনে পুলিশকে খবর দিত।”
অর্জুন কাচের জানলায় চোখ রেখে সমুদ্র দেখতে-দেখতে কথাগুলো বলতেই মেজর মাথা নাড়লেন, “তা হলে তো মুশকিল হয়ে গেল।”
“মিসেস গ্রান্টকে দায়িত্বটা দিতে হবে। ওঁকে কেউ সন্দেহ করবে না।”
কথাটা মেজরের মনে ধরল, “ঠিক বলেছ। মিসেস গ্রান্টকে তোমার কেমন লাগছে?”
“খুব ভাল।”
“আমি যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব তারা ভাল না হয়ে যায় না।”
এই সময় বাঁক ঘুরতে-ঘুরতে ড্রাইভার আচমকা ব্রেকে পা দিতেই বাস গতি হ্রাস করতেই মেজর সামনে ঝুঁকে পড়তে-পড়তে চিৎকার করলেন, “ননসেন্স। কী ধরনের গাড়ি চালানো হচ্ছে, অ্যাঁ?”
প্রশ্নটির উত্তর দেবার সময় হল না কারও। কারণ প্রত্যেকের চোখ সামনের রাস্তায়। সেখানে পুলিশ কর্ডন করে রেখেছে একটি প্রাইভেট গাড়িকে। গাড়িটির চারটে চাকাই পাশ থেকে ওঠা। বোঝাই যাচ্ছে দ্রুতগতিতে চালাতে গিয়ে কন্ট্রোল হারিয়ে চালক অ্যাকসিডেন্টটা করেছেন। যেভাবে গাড়িটি পাশ ফিরে আছে তাতে আরোহীদের মৃত্যু অস্বাভাবিক হবে না।
চোখ বন্ধ করে মেজর মাথা নাড়লেন, “এসব দেশে রাস্তায় এত স্পিড-রেস্ট্রিকশন থাকা সত্ত্বেও কেন যে অমন জোরে গাড়ি চালায়।”
পুলিশ ততক্ষণে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিচ্ছে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে। এদের বাস যখন ডান পাশ দিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে তখন অর্জুন লাফিয়ে উঠল, “রোকে, রোকে।” পরক্ষণেই দেশটা মনে পড়ায় চিৎকার করল, “স্টপ, স্টপ।”
মেজর হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল তোমার?”
সিট ছেড়ে প্যাসেজে চলে এসেছিল ততক্ষণে অর্জুন। মুখ ফিরিয়ে উত্তেজিত গলায় সে জবাব দিল, “ওটা মিসেস গ্রান্টের গাড়ি।”
ওদের নামিয়ে দিয়ে বাসটা চলে যাওয়ার পর মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “দেখতে যদিও একরকম, তবু তুমি কী করে বুঝলে ওটাই মিসেস গ্রান্টের গাড়ি?”
“নাম্বার প্লেট।” অর্জুন হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে গাড়িটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। দু’জন পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল গাড়িটার সামনে। পাশেই তাদের মোটরবাইক। একজন অবাক গলায় প্রশ্ন করল, “কী চাই এখানে?”
বেশি উত্তেজিত হলে ইংরেজি বলতে এখনও অসুবিধে হয় অর্জুনের। সে কিছু জবাব দেওয়ার আগেই মেজর তাঁর আইডেন্টিটি কার্ডটা দেখালেন। তাতে অভিযাত্রী হিসেবে আমেরিকান অভিযাত্রী সঙ্ঘের স্বীকৃতি রয়েছে ছবিসমেত। পুলিশের একাংশ বোধহয় পৃথিবীর সব দেশেই অজ্ঞতায় ভোগে, নইলে যে ভঙ্গিতে লোকটি কপালে হাত ছোঁয়াল তাতে মেজরই ঘাবড়ে গেলেন যেন।
“কী হয়েছে এখানে?” মেজরের গলার স্বর খুব ভারিক্কি শোনাল।
“অ্যাক্সিডেন্ট স্যার।” পুলিশটি জবাব দিল, “স্কিভ্ করে এপাশে চলে এসেছে।”
মেজর মাথা নাড়লেন। অর্জুন ততক্ষণে সুটকেস নামিয়ে রেখে চলে গেছে গাড়ির গায়ে। ভেতরে কেউ নেই। মিসেস গ্রান্টের ফ্লাস্কটা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল। এতক্ষণ বারংবার মনে হচ্ছিল নম্বরটা মনে রাখতে সে ভুল করেছে কি না। ভুল হলে ভাল লাগত। এখন ওই ফ্লাস্ক সব গোলমাল করে দিল।
এইসময় দ্বিতীয় পুলিশটি এগিয়ে এল, “এখানে আপনাদের প্রয়োজনটা জানতে পারি?”
মেজর বললেন, “এই গাড়িটা আমার এক বান্ধবীর। বাসে যেতে-যেতে ওঁর গাড়িটাকে দেখে আমরা নেমে পড়েছি। কখন হয়েছে ঘটনাটা?”
“কয়েক ঘণ্টা আগে। এতক্ষণে এটাকে ক্লিয়ার করা উচিত ছিল।” পুলিশ জবাব দিল।
অর্জুন এবার উদ্বেগ চেপে রাখতে পারল না, “মিসেস গ্রান্ট, মানে যিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তিনি, তাঁর অবস্থা কীরকম?”
“ওঁকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবস্থা আমি জানি না, কারণ দুর্ঘটনার সময় আমি এই স্পটে ছিলাম না।”
“হসপিটালটা কোথায়?”
“এখান থেকে মাইল তিনেক গেলে সাইনবোর্ড দেখতে পাবেন।”
বোঝা গেল, এঁদের কাছে এরচেয়ে বেশি খবর পাওয়া যাবে না। জায়গাটা জনমানবশূন্য। কাছাকাছি একটা বাড়িও চোখে পড়ছে না। একপাশে সমুদ্র অন্যদিকে সবুজ ঢেউ-খেলানো মাঠ। মেজর জিভে শব্দ করে বললেন, “হুট করে বাস থেকে নেমে বড় ভুল হয়ে গেল হে। আবার কখন বাস আসবে তার তো ঠিক নেই।”
যেন নাগরাকাটা অথবা ওদলাবাড়িতে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন মেজর, বলে মনে হল অর্জুনের। জায়গাটা যে খোদ সাহেবদের দেশ এবং সব-কিছু নিয়মে চলে এত বছর আমেরিকায় বাস করেও এই মুহূর্তে তিনি ভুলে গেছেন।
অর্জুন সময় নষ্ট না করে রাস্তাটা দেখছিল। যদিও কয়েক ঘন্টা আগে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তবু চাকার দাগ রাস্তা ছাড়ার পর ঘাসের বুকে বসে আছে। মিসেস গ্রান্ট নিশ্চয়ই খুব জোরে ব্রেক কষেও সামলাতে পারেননি। গাড়ি যখন নীচে নামে অথবা সমান্তরাল পথে জল থাকলে চাকার গতি নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। কিন্তু যেখান থেকে মিসেস গ্রান্ট ব্রেক কষেছেন সেখানে গাড়ি সামান্য ওপরের দিকে উঠছিল। রাস্তাটা বাঁক ঘোরার পরেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এরকম জায়গায় লোকে সাবধানে গাড়ি চালাবে। মিসেস গ্রান্টের চালানো সে দেখেছে। তাঁর পক্ষে গতি হারানো বিস্ময়কর।
সে ঝুঁকে গাড়ির চাকা দেখতে লাগল। কোথাও কোনও সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ছে না। অবশ্য যন্ত্রের কথা বলা যায় না, ওপরে ওঠার সময় ব্রেক ফেল করতেও পারে। গাড়িটাকে সোজা করলে সেটা পরীক্ষা করা যেত। কিন্তু পুলিশ দুটো গাড়িটাকে ছুঁতে দেবে বলে মনে হচ্ছে না। অর্জুন আর-একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল ভারী দুটো চাকা ওপাশের ঘাস ছেড়ে পিচের রাস্তায় উঠে এসেছে। যেখান থেকে দাগটা শুরু হয়েছে সেখানে মাঠের ভেতরে যাওয়ার মেঠো রাস্তার মুখ। এই দুটো দাগের সঙ্গে মিসেস গ্রান্টের গাড়ির দুর্ঘটনার কোনও সম্পর্ক আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, তবে দাগটা যে বেশি পুরনো নয় তা পরিষ্কার।
এই সময় দ্বিতীয় পুলিশটি হেঁকে উঠল, “ও কী করছে ওখানে?”
মেজর গর্বিত গলায় জানালেন, “ওর নাম অর্জুন। বিখ্যাত ডিটেকটিভ। ও অবশ্য নিজেকে সত্যসন্ধানী বলে। আমেরিকায় পুরস্কৃত হয়েছে। সম্ভবত খুঁজে দেখছে এটা অ্যাক্সিডেন্ট কি না।”
কথাটা শোনামাত্র পুলিশটি এগিয়ে এল অর্জুনের কাছে, “হেই মিস্টার! তোমার লাইসেন্স দেখতে চাই।” লোকটা হাত বাড়াল।
“আমার তো কোনও লাইসেন্স নেই।”
“মাই গড। লাইসেন্স ছাড়া তুমি কোনওরকম ইনভেস্টিগেশন করতে পারো না। গেট লস্ট ফ্রম হিয়ার।” লোকটার ভঙ্গি দেখে অর্জুনের মনে হল, ও যেন কোনও অপরাধীর সঙ্গে কথা বলছে।
অর্জুন কোনওমতে বলতে পারল, “আমার মনে হচ্ছে এটা ঠিক দুর্ঘটনা নয়।”
“তোমার কী মনে হচ্ছে, তা জানার কোনও প্রয়োজন আমার নেই। লাইসেন্স ছাড়া কোনও প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন এ-দেশে অ্যালাউ করা হয় না। তোমরা যদি এখনই এখান থেকে দূর না হয়ে যাও, তা হলে আমি তোমাদের অ্যারেস্ট করতে পারি।”
মেজর তাঁর জিনিসপত্র তুলে নিয়েছিলেন। অতএব অর্জুনকেও তাই করতে হল। মেজর বললেন, “কী বুঝছ?”
অর্জুন বলল, “আগে হাসপাতালে গিয়ে মিসেস গ্রান্টের খবর নেওয়া দরকার।”
“সে তো নিশ্চয়ই, কিন্তু এ-জায়গাটা ছেড়ে গেলে পরের বাস কি আমাদের জন্যে দাঁড়াবে? নেক্সট বাস স্টপ কোথায় তা তো জানি না।” ওঁকে খুব কাহিল দেখাচ্ছিল।
অর্জুন মুখ ফিরিয়ে ক্রুদ্ধ পুলিশটিকে দেখে হাঁটতে শুরু করল।
পাশাপাশি চলতে-চলতে মেজর বললেন, “ভুলেও নিচে পা রেখো না। গাড়ি চাপা পড়লে ড্রাইভারের দোষ হবে না।”
হেসে ফেলল অর্জুন। চাপা পড়ার পর কাউকে দোষী করে কী লাভ!
বাধ্য না হলে এরকম ফাঁকা জায়গায় কেউ রাস্তার পাশ ঘেঁষে হেঁটে যায় না। ফুটপাথের প্রয়োজন হয়নি সেই কারণেই। হুশহাস গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “হাঁটতে তোমার কষ্ট হচ্ছে না তো? না-না, আমার কথা ছেড়ে দাও। অভিযাত্রী হিসেবে হেঁটে চলাই তো আমার নেশা। তবে সুটকেসের বদলে হ্যাভারস্যাক হলে ভাল হত।” মেজর ওটাকে হাতবদল করলেন। ওঁর কষ্টটা বুঝেও কোনও মন্তব্য করল না অর্জুন। তার মাথার ভেতরে যে চিন্তাটা পাক খাচ্ছে, তা হল ওটা কি সত্যিকারের দুর্ঘটনা? মিসেস গ্রান্ট কি বেঁচে আছেন? কিন্তু বিপরীত দিকের ঘাস চেপে বেরিয়ে আসা চাকার দাগগুলো মনের ভেতর বুজকুড়ি তুলছে।
ওরা যখন হাসপাতালের সামনে পৌঁছল তখন ঘড়ি অনুযায়ী দিন শেষ। যদিও আকাশের দিকে তাকালে সময় বোঝা যাবে না। বড় রাস্তা থেকে আর একটি ছোট রাস্তা ধরে ছবির মতো কয়েকটা কটেজ পেরিয়ে ওরা হাসপাতালের সামনে দাঁড়াল। সুন্দর লন, ফুলের বাগান এবং রঙিন বাড়িটি দেখে কিছুতেই অবশ্য অর্জুনের দেখা অন্য হাসপাতালের কথা মনে পড়ছিল না। ভেতরে ঢুকে বারান্দা পার হতেই ওরা রিসেপশন কাউন্টারে পৌঁছে গেল। একজন অল্পবয়সী মহিলা সেখানে বসে ছিলেন। ওদের দেখে হেসে বললেন, “গুড ইভনিং, এনি প্রব্লেম?”
মেজর সুটকেসটাকে মাটিতে রাখতে পেরে যেন বেঁচে গেলেন। হাতটাকে কয়েকবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে বললেন, “আমাদের বলা হয়েছে যে, আজ যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ড্রাইভার মিসেস গ্রান্ট এখানে ভর্তি হয়েছেন। তিনি কেমন আছেন?”
রিসেপশনিস্ট চট করে একটা রেজিস্টারে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ইনটারকমের বোতাম টিপে এমন নিচু গলায় প্রশ্ন করলেন যে, অর্জুন কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর দুঃখিত-দুঃখিত মুখ করে বললেন, “ওয়েল জেন্টলমেন, ওঁর অবস্থা ভাল নয়। ঠিক বলতে গেলে বলতে হয় খুবই খারাপ। অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। আপনারা এসে আমাদের উপকার করেছেন। কারণ ওঁর বাড়িতে খবর পাঠানো হলেও এখনও সেখান থেকে কোনও রেসপন্স আমরা পাইনি। ওঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে…।”
মেজর চটপট বললেন, “অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে? সর্বনাশ। কোথায় লেগেছে?”
‘হেড ইনজুরি। ঘণ্টাখানেক পরে ওঁকে অপারেশন টেবিলে নিয়ে যাওয়া হবে। বাট ইউ নো, ডাক্তাররা শুধু চেষ্টাই করতে পারেন।” ভদ্রমহিলার গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছিল মিসেস গ্রান্টের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। অর্জুনের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। মেজর চোখে রুমাল চাপলেন। তাই দেখে রিসেপশনিস্ট বললেন, “ইওর ক্লোজ রিলেশন?”
মেজর বললেন রুমাল সরাতে সরাতে “মোর দ্যান দ্যাট। উনি আমার বন্ধু। ইন ফ্যাক্ট আমাদের জন্যেই ব্ল্যাকপুলে এসেছিলেন উনি। না এলে…।”
মহিলা জানালেন যে, তিনি লোক্যাল থানায় খবর দিচ্ছেন। এসব ব্যাপারে পুলিশের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার থাকে।
মেজর যেন নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আমরা ওঁকে একবার দেখতে পারি? জাস্ট চোখের দেখা।”
রিসেপশনিস্ট বললেন, “দেখে কী করবেন? অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে বললাম তো। তা ছাড়া ও.টি-তে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে হয়তো ইতিমধ্যে।”
মেজর বললেন, “ও.টি. থেকে যখন বের হবেন, তখন শরীরে প্রাণ থাকবে কি না কে জানে। জীবিত মানুষটাকে চোখে দেখার সুযোগ দিন অনুগ্রহ করে।”
রিসেপশনিস্ট আবার ইন্টারকমে কথা বললেন। তারপর ওদের জানালেন অপেক্ষা করতে হবে।
সামনের সোফায় শরীর এলিয়ে দিলেন মেজর। অর্জুনের খুব খারাপ লাগছিল। অল্প আলাপেই মিসেস গ্রান্টকে ওর বেশ ভাল লেগেছিল। এরকম একটা দুর্ঘটনায় উনি আহত হয়ে মারা যাবেন ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতে গিয়েও থেমে গেল। এটা হাসপাতাল। এবং এই হাসপাতালের দিকে তাকালে এক চিলতে নোংরা ফেলতে ইচ্ছে করে না। জুতোর শব্দ কানে আসতেই সে দেখল, য়ুনিফর্ম পরা পুলিশ অফিসার এগিয়ে আসছেন। রিসেপশনিস্ট-মহিলা পুলিশ অফিসারদের প্রশ্নের উত্তরে মেজরকে দেখিয়ে দিতেই তাঁরা সামনে এসে দাঁড়ালেন।
পুলিশ অফিসারদের একজন প্রশ্ন করলেন, “এক্সকিউজ মি, আপনারা এদেশের নাগরিক?”
মেজর মাথা নাড়লেন, “না। আমরা বেড়াতে এসেছি।”
“অ্যাক্সিডেন্ট যাঁর হয়েছে সেই মিসেস গ্রান্টকে আপনারা চেনেন?”
“হ্যাঁ। উনি আমার বন্ধু। অনেকদিনের আলাপ।
“আপনাদের সঙ্গে ওঁর শেষ দেখা হয়েছিল কখন?”
“আজ সকালে, আমার হোটেলে। তারপর উনি ওঁর বান্ধবীর বাড়িতে যাবেন বলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান।
“বান্ধবীর বাড়িটি কোথায়?”
মেজর মোটামুটি জায়গাটা জানালেন। পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, “সকালে ঠিক কখন উনি আপনাদের কাছ থেকে চলে এসেছিলেন?”
“ঘড়ি দেখিনি। তবে দশটার এদিকে নয়।”
“অথচ ওঁর দুর্ঘটনা ঘটে বিকেলে। সরাসরি চলে এলে ওই স্পটে ওঁর আসতে এত দীর্ঘ সময় লাগে না। তা ছাড়া ওঁর বান্ধবীর বাড়ি যে দিকটায় বললেন, সেদিকে উনি যাননি। এই রাস্তা তার উলটো দিকে। ওঁর জ্ঞান না ফিরলে আমরা কিছু জানতে পারছি না। কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে আশা করি সহায়তা পাব।”
“নিশ্চয়ই। কিন্তু আপনার কথা শুনে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। মেজর বললেন।
দ্বিতীয় অফিসার ওদের পাশপোর্ট দেখতে চাইলে সেগুলো বের করে দেওয়া হল। ভদ্রলোক ওই দুটো উলটে-পালটে দেখে নম্বর নোট করে নেওয়া মাত্র একজন নার্স দরজায় এসে দাঁড়ালেন। রিসেপশনিস্ট বললেন, “আপনারা ওঁর সঙ্গে গিয়ে ঠিক তিরিশ সেকেন্ডের জন্যে চোখের দেখা দেখতে পারেন।”
পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, “ওঁর সেন্স কি ফিরেছে?”
নার্স মাথা নেড়ে নীরবে না বললেন। পুলিশ অফিসার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, এবার হতাশায় কাঁধ ঝাঁকালেন। অর্জুন আর মেজর প্রায় নিঃশব্দে নার্সকে অনুসরণ করে অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে ইমার্জেন্সি লেখা একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই নার্স তাদের কাচের জানলার কাছে যেতে ইঙ্গিত করলেন।
দুটো সাদা ধবধবে বিছানা। একটিতে একটা বাচ্চা ছেলে শুয়ে আছে। অপরটিতে মিসেস গ্রান্ট। মাথায় ব্যান্ডেজ। কিন্তু তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই অর্জুনের মুখ থেকে বিস্ময়সূচক শব্দ ছিটকে উঠল। যদিও মাঝখানে জানলার পরিষ্কার কাচ, তবু দেখতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হচ্ছে না। মেজর অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন, “আরে এ কী!”
অর্জুন ওঁর হাত আঁকড়ে ধরল। তারপর নিচু গলায় বলল, “চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে চলুন।”
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বিছানায় যিনি অজ্ঞান হয়ে রয়েছেন সেই মহিলা কোনওকালেই মিসেস গ্রান্ট নন।
