ভীম – ২

খেলাধুলো অনেক হল। এবারে একটু পড়াশুনো না করলে অভিজাত ক্ষত্রিয়-ঘরে চলে কী করে?: পুঁথিগত বিদ্যার পালা অল্পদিনেই শেষ হল। তারপর আরম্ভ হল ক্ষত্রিয়দের আসল যে বিদ্যা—অস্ত্র শিক্ষা। গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে ভীম এবং দুর্যোধন—দুজনেই গদাবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন; দ্রোণাচার্য প্রধানত তীর-ধনুকের প্রযুক্তিতে অদ্বিতীয় ছিলেন। কিন্তু অস্ত্রশিক্ষার আসরে যেহেতু সব বিদ্যাই শিখতে হয়, তাই ভীম এবং দুর্যোধনকে যেমন দ্রোণাচার্য গদাঘাতের শিক্ষা দিলেন, তেমনই ভীম দুর্যোধনরও প্রধানত গদায় নিপুণ হওয়া সত্ত্বেও তীর-ধনুকের প্রযুক্তিটাও শিখে নিলেন দ্রোণাচার্যের কাছে। এই শিক্ষার মধ্যে গভীরতা তত ছিল না বলেই দ্রোণাচার্যের পাখির চোখ-বিঁধানোর পরীক্ষায় ভীম এবং দুর্যোধন—দুজনেই ফেল করেছিলেন এবং দ্রোণাচার্যের কাছে বকুনিও খেয়েছিলেন।

মুশকিল হল দ্রোণাচার্য গদাশিক্ষার কোনও পরীক্ষা নেননি। তীর-ধনুকের সূক্ষ্ম প্রযুক্তি নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত ছিলেন, অতএব তীর-ধনুকের পারদর্শিতাই তাঁর কাছে অস্ত্রশিক্ষার শেষ কথা বলে মনে হত। ভীম আর দুর্যোধন দুজনেই তাই গালাগালি খেলেন গুরুর কাছে। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম অস্ত্রের প্রয়োগ যেমন অনেক সময় জরুরি হয়ে ওঠে, তেমনই অস্ত্রের ভারবত্তাও একেক সময় দারুণ প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। গদা এইরকমই একটি অস্ত্র এবং ভীমের গায়ে অমানুষিক শক্তি ছিল বলেই প্রধানত তিনি গদার মতো একটা বিশাল এবং ভারী অস্ত্রের ব্যবহারে আকর্ষণ বোধ করেছিলেন।

ভীম এবং দুর্যোধন গদাবিদ্যায় কতটা পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন, সেটা তাঁর সেই পক্ষিবেধের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়নি বলেই আমাদের সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হল, যেদিন বিশাল প্রান্তরে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন রাজবাড়ির ছেলেদের শিক্ষাসিদ্ধির বিবরণ শোনার জন্য। ধারা-বিবরণী দিচ্ছিলেন বিদুর। সভা পরিচালনা করছিলেন কৃপাচার্য।

রথ-চালানো, ঘোড়া-চালানো কি হাতি-চালানোর মতো সাধারণ বিষয়ে রাজকুমারেরা খানিকটা করামতি দেখিয়েই তলোয়ার-চালানোর মতো কঠিন বিদ্যায় নিজেদের ক্ষিপ্রতা প্রদর্শন করলেন। ঠিক তারপরেই ভীম আর দুর্যোধন দুজনে এক সঙ্গে উঠলেন নিজেদের ক্ষমতা দেখানোর জন্য।

লক্ষণীয় বিষয় হল—সেই জন্মের সময় থেকে খেলাধুলার সময় এবং খেলা থেকে এই অস্ত্র পরীক্ষার প্রদর্শনী পর্যন্ত মহাভারতের কবি প্রায় এক নিঃশ্বাসে ভীম আর দুর্যোধনের প্রসঙ্গ টানছেন, প্রায় একই সঙ্গে তাঁদের নাম উচ্চারণ করছেন। এই দুয়ের জন্ম-শত্রুতা দেখানোর জন্য আজ এই অস্ত্র—প্রদর্শনীর দিনে কবি মন্তব্য করেছেন—দুজন এক সঙ্গে তাঁদের মঞ্চ থেকে নেমে এলেন অস্ত্র-প্রদর্শনীর প্রাঙ্গণে। দুজনেই পরস্পরের প্রতি সদা-বিদ্বেষ। দুজনের হাতেই গদা। দুজনেই নিজের নিজের পৌরুষে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, দুজনেই ভাবছেন—জয় হবে আমারই—পৌরুষে পর্যবস্থিত।

দুজনকে দেখাচ্ছিল যেন চূড়া সমেত দুটো পাহাড় নেমে এসেছে ভূঁয়ে। আর দুজনেই এমন পরস্পর-বিধ্বংসী হাঁক-ডাক করছিলেন যেন মনে হচ্ছিল—একটা মাদি হাতি তার কামনার সুগন্ধ ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর পরস্পর-বিদ্বেষী দুটি মদ্দা হাতি সবৃংহনে আক্রোশ প্রকাশ করছে মাদিটার দখলদারির জন্য—বৃংহন্তৌ বাসিতাহেতোঃ সমদাবিব কুঞ্জরৌ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এঁদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হল সেই মাদি হাতিটি—যার জন্য যে কোনও সময়, যে কোনও পরিবেশে ভীম আর দুর্যোধন কোমর বেঁধে নেমে পড়তে পারেন যুদ্ধের জন্য। নেমে পড়লেনও।

দুজনে দুটো গদা হাতে পরস্পরকে আঘাত করার জন্য ডাইনে-বামে এমন দুর্মদভাবে ঘুরতে লাগালেন যে দর্শকদের মধ্যেও একটা ভাগাভাগি হয়ে গেল। যারা দুর্যোধনের পক্ষে, তারা বলতে লাল-জিও দুর্যোধন, জিও। আর যারা ভীমের পক্ষে, তারা বলতে লাগল—জিও ভীমসেন, জিও—জয় হে কুরুবাজেতি জয় হে ভীম ইত্যুত। এই দুইজনের পারস্পরিক গদাপ্রহারের নিরিখে রঙ্গভূমির সমস্ত দর্শকদের মধ্যেও একটা ‘টেনশন’ তৈরি হচ্ছিল। দ্রোণাচার্য সেটা অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ করছিলেন। শেষে এই দুজনকে কেন্দ্র করে যদি সাধারণ সমর্থক জনের মধ্যে একটা ছোট-খাটো লড়াই লেগে যায়—সেই আশঙ্কায় পুত্র অশ্বত্থামাকে তিনি ডেকে বললেন—অশ্বত্থামা! এই দুজনকেই তুমি থামাও। এদের গায়ের শক্তিও যেমন, অস্ত্রের শিক্ষাও তেমনই। শেষে এদের কেন্দ্র করে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যেও একটা খণ্ডযুদ্ধ না হয়ে যায়—মা ভুদ্ রঙ্গ-প্রকোপো’য়ং ভীম-দুর্যোধনোদ্ভবঃ।

অশ্বত্থামা গুরুপুত্র এবং ব্রাহ্মণ। বায়ুক্ষুব্ধ তরঙ্গসংকুল দুটি সমুদ্রের মতো ভীম আর দুর্যোধন যখন পরস্পরের ওপর আছড়ে পড়ছিলেন, তখন অশ্বত্থামা তাঁদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। থামল পরস্পরের সংঘাত। অসীম শক্তি সম্পন্ন এই দুই বীর এই মুহূর্তে থেমে গেলেও একটু পরেই তাঁদের আর আটকানো যায়নি। মহারথী কর্ণ যখন উন্মুক্ত রঙ্গস্থলে অর্জুনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলেন, কৃপাচার্য তখন সেই দ্বন্দ্বযুদ্ধ বন্ধ করে দিলেন সামান্য অছিলায়। কর্ণ সূতপুত্র, অতএব রাজবংশের ছেলে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করার তিনি যোগ্য নন।

দুর্যোধন কর্ণকে সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গরাজ্যের রাজত্বে অভিষিক্ত করেন এবং অভিষেক-আর্দ্র-শির কর্ণ যখন সূত-পিতা অধিরথকে সেই রঙ্গস্থলের মধ্যেই পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন, তখন ভীমকে আর বাগ মানানো গেল না। একে দুর্যোধনের ওপর তাঁর জাতক্রোধ, তাতে সভ্য-ভব্য মানুষের সূক্ষ্ম রুচিও তাঁর ছিল না। কর্ণ আর অধিরথের সম্পর্কটি আবিষ্কার হওয়া মাত্রই ভীমের মুখ ছুটে গেল। অবশ্য আমি বিশ্বাস করি—ভীম কর্ণকে যা বলেছেন, তা দুর্যোধনের ওপর রাগেই বলেছেন ; কর্ণকে অঙ্গরাজ্য দেওয়ার উদারতা তাঁর কাছে আদেখলেমির মতো ঠেকেছে। রঙ্গভূমিতে কর্ণ অর্জুনকে সবার সামনে অপমান করেছেন—তাও ভীমের সহ্য হয়েছিল, কিন্তু অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুর্যোধন যে কর্ণকে খানিকটা তোল্লাই দিয়ে তাঁকে রাজা করে দিলেন—এটা তাঁর কাছে বাড়াবাড়ি লেগেছে। আর বাড়াবাড়ি যখন হয়েছে, সেখানে ভীম চুপ করে থাকবেন কী করে? পিতা অধিরথের সামনেই তাই ভীম কর্ণকে অপমান করে বললেন—ওরে সারথির পো! অর্জুনের হাতে তুই মরবি, এমন ভাগ্যি তোর হবে না। বরং তোর জাত-বংশে যা চলে, সেই ঘোড়া-চালানোর চাবুক ধরাটাই তোর বেশি ভাল হবে—কুলস্য সদৃশস্তূর্ণং প্রতোদো গৃহ্যতাং ত্বয়া। ভীম থামলেন না।। বললেন—ওরে নরাধম! কুত্তা যেমন যজ্ঞের ঘি খাবার উপযুক্ত হয় না, তুইও তেমন অঙ্গরাজ্য ভোগ করার উপযুক্ত নয়।

জাত-বংশ নিয়ে এইসব কথাবার্তা কর্ণের মর্মে গিয়ে বিঁধেছিল। তিনি কোনও রকমে সুর্যের দিকে তাকিয়ে নিজের ক্রোধ শান্ত করেছেন। ভীম যে দুর্যোধনকেও এক হাত নিয়েছেন—সে কথা পরিষ্কার হয়ে গেল অঙ্গরাজ্যের কথায়। দুর্যোধন অবশ্য ভীমকে ছেড়ে দেননি। কর্ণকে পুরো সমর্থন করে অনেক উদাহরণ দিয়ে তিনি ভীমকে বলেছেন—তোদের জন্ম কীভাবে হয়েছে, আমি জানি—ভবতাঞ্চ যথা জন্ম তদপ্যাগমিতং ময়া। আরও পাঁচটা কথা শুনিয়ে দিয়ে দুর্যোধন প্রধানত ভীমের উদ্দেশ করেই একটা হুঙ্কার আকাশে উড়িয়ে দিলেন—আমার এই কাজ যদি কারও পছন্দ না হয়, তো সে রথে উঠে ধনুকের ছিলায় টান দিক একটা।

সমর্থক জনগণের সাধুবাদ অথবা বিপদের সম্ভাবনায় অনেকের হাহাকারের মধ্যেই সেই দিনটা শেষ হয়ে গেল। কারণ সূর্য অস্ত গেছে। যুদ্ধ লাগার কোনও সম্ভাবনাই রইল না। কিন্তু এই প্রতিস্পর্ধী দুই বীর যুদ্ধের অপূর্ণ সাধ মনে রেখে কোমর বেঁধেই রইলেন।