ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার
Detective Tarinicharan by
Kaushik Majumdar
প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০২৪
প্রচ্ছদ : কামিল দাস
অলংকরণ : গৌতম কর্মকার
কৃতজ্ঞতা
অরুন্ধতী মজুমদার, অরুণ নাগ, কামিল দাস, গৌতম কর্মকার, জীবনানন্দ দাশ, তনুময় রায়, তুষার মাজি, প্রদীপ গরাই, রণিতা চট্টোপাধ্যায়, রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
মূল বইয়ের পিডিএফে ছাপার অস্পষ্টতার জন্য কিছু বানানভুল থাকতে পারে
.
এই পুস্তকের মধ্যে চারখানি অতি অদ্ভুত রহস্য আছে। চারখানিই নানা ঘটনা-বৈচিত্র্যে-পরিপূর্ণ। পাঠকদিগকে ইহাই বলিলে যথেষ্ট হইবে যে, ইহা ডিটেকটিভ ইনস্পেক্টর শ্রী প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এবং সুনিপুণ, অদ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ শ্রী তারিণীচরণ রায়ের আর একটি নূতন ঘটনা—সুতরাং ইহা যে গ্রন্থকারের সেই সৰ্ব্বজন সমাদৃত তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। পাঠকালে যাহাতে শেষ পৃষ্ঠা পর্য্যন্ত পাঠকের শাগ্রহ ক্রমশঃ বৰ্দ্ধিত হয় ; এইরূপ রহস্য-সৃষ্টিতে গ্রন্থকার বিশেষ সিদ্ধহস্ত তিনি দুর্ভেদ্য রহস্তাবরণের মধ্যে হত্যাকারীকে এরূপভাবে প্রচ্ছন্ন রাখেন যে, পাঠক যতই নিপুণ হউক না কেন,যতক্ষণ গ্রন্থকার নিজের সুযোগমত সময়ে স্বয়ং ইচ্ছাপূর্ব্বক অঙ্গগুলি নির্দেশে হত্যাকারীকে না দেখাইয়া দিতেছেন, তৎপূৰ্ব্বে কেহ কিছুতেই প্রকৃত হত্যাকারীর স্কন্ধে হত্যাপরাধ চাপাইতে পারিবেন না। অমূলক সন্দেহের বশে পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদে কেবল বিভিন্ন পথেই চালিত হইবেন; এবং ঘটনার পর ঘটনা যতই নিবিড় হইয়া উঠিবে, পাঠকের হৃদয়ও ততই সংশয়ান্ধকারে আচ্ছন্ন হইতে থাকিবে। ইহাতে এমন একটিও পরিচ্ছেদ সন্নিবেশিত হয় নাই, যাহাতে একটা-না-একটা অচিন্তিতপূর্ব্ব ভাব অথবা কোন চমকপ্রদ ঘটনার বিচিত্র-বিকাশে পাঠকের বিস্ময়-তন্ময়তা ক্রমশঃ বৰ্দ্ধিত না এবং যতই অনুধাবন করা যায়, প্রথম হইতে শেষ পৃষ্ঠা পর্য্যন্ত রহস্য কেবল নিবিড় হইতে নিবিড়তর হইতে থাকে—গ্রন্থকারের রহস্য-সৃষ্টির যেমন আশ্চৰ্য কৌশল, রহস্যভেদেরও আবার তেমনি কি অপূর্ব্ব ক্রম-বিকাশ। পড়ুন -পড়িয়া গন্ধ হউন। চিত্র-পরিশোভিত, পুরম্য বাঁধান
শ্রী কৌশিক মজুমদার প্রণীত

ডিটেকটিভ তারিণীচরণ রায়ের একমাত্র লভ্য ছবি। তারিণীর বয়ঃক্রম তখন আন্দাজ চল্লিশ হইবে। কাঠখোদাই শ্রী প্রিয়গোপাল দাস।
.
প্রস্তাবনা
বাংলা ভাষায় গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছিল বেশ ঢিমেতালে। বেশ দাদা-কাকা-মামা-দাদু-দিদি-মাসিমা গোছের গোয়েন্দারা শারদীয় সংখ্যার পাতা ভরাচ্ছিলেন। এই লেখাগুলির চলনটি চেনা—গোয়েন্দা উপন্যাস কম, ভ্রমণকাহিনি বেশি; বহুমূল্য কোনও বস্তু খোয়া যাবে, পার্শ্বচরিত্রটি খুন হবে, গোবেচারা পুলিশ পারিবারিক-গোয়েন্দাটিকে ডাকবে, এবং গোয়েন্দা মেসো/ মাসিটি শেষদৃশ্যে একঘর লোকের সামনে রহস্য ফাঁস করে দেবে। এই লেখালিখির উৎস কোথায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না, কিন্তু শরদিন্দু-সত্যজিতের চেনা ছকের মধ্যে লেখার (এবং রহস্যের) যে মাধুর্য ছিল, তা অনুগামীদের অনুশীলনে আসেনি! এই চেনা ছকের বাইরে ব্যতিক্রমী দু-একজন লেখক মেপে পা ফেলার চেষ্টা করেও ফিরে এসেছেন। নারায়ণ সান্যাল অবশ্যই এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, কিন্তু যেইমাত্র তিনি ভাবলেন যে—ফোন করলে লাইন কানেক্ট হবে না, ট্যাক্সিওলা প্যাসেঞ্জার ফিরিয়ে দেবে (স্মৃতি থেকে লিখলাম)—এসব গোয়েন্দা উপন্যাসে লেখা যাবে না, বা লিখলে সমস্যা আছে—সেইমাত্র বস্তুত তিনি পূর্বের চেনা ছকে ফিরে এলেন। একটি সামগ্রিক ভিশাস সার্কেল শুরু হল যে চক্রে যারা লিখছে, যারা পড়ছে, এবং যারা সমালোচনা করছে—তারা স্বর্ণযুগের ব্রিটিশ-কমনওয়েলথের গোয়েন্দা লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত (কোনান ডয়েল, ক্রিস্টি, খানিক চেস্টারটন, মার্শ, পরবর্তীর পিডি জেমস প্রমুখ)।
বাংলাদেশের রহস্যকাহিনি এই ছকের খুব বাইরে বেরোতে পেরেছে তা নয়, কিন্তু সেখানে ‘থ্রিল’-এর উপাদান বেশি। অব্রিটিশ, অ-ইংরিজি, অ-স্বর্ণযুগের গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাসের যে বিপুল বদল ঘটে গেছে বিগত অর্ধশতাব্দীতে; গোয়েন্দা গল্প উপন্যাসের গা থেকে খসে পড়েছে ভিক্টোরিয়ান আবহ, ধাঁধাসুলভ রহস্য, এবং গোয়েন্দা গল্প উপন্যাস হয়ে উঠেছে আরও বাস্তব-অনুসারী, ভয়ংকর-রক্তাক্ত, ব্যক্তিগত, সময় ও স্থান নির্ভর, গোয়েন্দার ব্যক্তিজীবন অনুসারী, ফলত শারদীয় পেজফিলার থেকে আক্ষরিক গোয়েন্দাসাহিত্য, তা যেন বঙ্গোপসাগরের এক কোণের গোয়েন্দা লেখকরা জানতে পারেননি, বা জানলেও চেনা ছককে উপেক্ষার সাধ্য তাঁদের ছিল না।
এমন নয় যে বাঙালি গোয়েন্দা লেখক-পাঠক-সমালোচকরা আমেরিকান হার্ডবয়েল পড়েননি, ফরাসি নুয়া, বা আধা-নুয়া লেখক জর্জ সিমেন সম্পর্কে অবহিত নন। মিউজিয়ামের লাগোয়া ফুটপাথের ইংরিজি বইয়ের দোকানে একোর গোলাপের নাম সহজলভ্য, তাহলে বাংলা গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাসের পালটে যেতে বাধলটা কোথায়? উত্তর আমার জানা নেই, কিন্তু অনুমান আছে—প্রাতিষ্ঠানিকতা! কিন্তু ‘পালটে যাওয়া’ মানে কোন অর্থে পালটে যাওয়া তার ধারণা দিতে পারি মাত্র! আমাদের গোয়েন্দারা কম বাঙালি নন, বাঙালিয়ানা তাঁদের মধ্যে ঠুসে ভরা আছে, যা নেই তা হল, সামগ্রিক ‘বাংলা গোয়েন্দা উপন্যাস’, যে উপন্যাসের চরিত্র, ঘটনাপরম্পরা ও রহস্য সামগ্রিকভাবে বাংলাভাষীদের চরিত্র বহন করে। যেভাবে ‘বাংলা ভূতের গল্প’, একানড়ে, পেতনি, মামদো, তাদের মাছপ্রীতি ইত্যাদি নিয়ে এক চরিত্র নির্মাণ করতে পেরেছে, অনধিক পঞ্চাশ বছরের গোয়েন্দালেখাচর্চা সেই চরিত্র নির্মাণ করতে পারেনি।
বাংলা গোয়েন্দা উপন্যাসের চরিত্রনির্মাণ শুরু হয়েছে হালে, গুটিকয় তরুণ লেখকের হাত ধরে, তাদের মধ্যে পুরোধা কৌশিক মজুমদার এবং সম্ভবত জনপ্রিয়তম, এবং পরিচিততম!
প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার আনুগত্য নেই, লেখার আবহ ও চরিত্রদের নির্মাণ ও বাঁকবদল সম্পর্কে সম্যক ধারণা আছে, অ-ইংরিজি গোয়েন্দা সাহিত্যকে গুলে খেয়েছেন, এবং বৃহৎ স্কেলে ছকের বাইরে ভাবার ক্ষমতা রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হরেক ননফিকশন নিয়ে সারাবছর পড়াশোনা এবং লেখালিখি। জনাস্তিকে বলি, আমি ও আমার একাধিক তরুণ বন্ধু, কৌশিকের ম্যাসন সিরিজ পড়ার পর রেট্রো-গোয়েন্দা কাহিনি লেখার বাসনাটি পাকাপাকিভাবে ত্যাগ করেছি। ম্যাসন সিরিজের মধ্য দিয়ে কৌশিক ‘বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যকে’ প্রথম আন্তর্জাতিকতার স্বাদ দিয়েছেন। কী নেই এই সিরিজে—রেট্রো সেটিং, নানা জঁরের মিশ্রণ, হার্ডবয়েল বর্ণনা, ইস্যুযুক্ত গোয়েন্দা/রা, ম্যাজিক, ইতিহাস, এবং সর্বোপরি সময়! কৌশিককে কিছু সমালোচনা শুনতে হয়েছে তাঁর ইনফো ডাম্পিং-এর জন্য, যা তিনি তাঁর অমায়িক স্বভাবে রক্ষণের চেষ্টা করেননি। লেখক হিসেবে (পাঠক হিসেবে নয়), আমার মনে হয়েছে ম্যাসন সিরিজে এই ইনফো ডাম্পিং জরুরি ছিল, এবং তা সিরিজটির চরিত্র নির্মাণে সহায়ক হয়েছে। আরে বাবা, একো যে পাতার পর পাতা ফ্রান্সিসকানদের সঙ্গে বেনেডিক্টানদের তুলনামূলক আলোচনা করলেন, কই তাতে তো লর্ড বাস্কারভিল কুপিত হননি! যাই হোক, আসল কথায় ফিরি, দীর্ঘ সিরিজ অনেকসময় লেখককে দীর্ঘ একাকিত্বে ফেলে দেয়, কিন্তু সিরিজের জনপ্রিয়তা লেখককে তার চরিত্রদের বেশিদিন ফেলে রাখতে সায় দেয় না। ফলে, স্পিন অফে জাবর-কাটার আশঙ্কা থেকে যায়। ঠিক এইখানে কৌশিক আর-একটি গুগলি ফেলেছেন, দীর্ঘ লেখার থেকে বেরিয়ে এসে শারদীয়র মাপে তাঁর গোয়েন্দাটিকে ফেলেছেন। শারদীয় সংখ্যার লেখা হয়েও যে উপন্যাসগুলি পারিবারিক-গোয়েন্দা হয়ে ওঠেনি, তার কারণ কৌশিক তাঁর ‘বাংলা গোয়েন্দা উপন্যাসে’র সার্বিক আবহকে বিসর্জন দেননি, উলটে শারদীয়ের শব্দসংখ্যাকে ‘ফর্ম’ হিসেবে ধরে তাঁর নিজস্ব স্টাইলে একাধিক বদল ঘটিয়েছেন। বহুরৈখিক ম্যাসন সিরিজ থেকে গল্প এখানে সরলরৈখিক, নির্দিষ্ট চরিত্রদের উপর ফোকাসড, আউটডোর এবং ক্লোজ ডোরের অনায়াস যাওয়া-আসা, ইমপসিবল মিস্ট্রির অনবদ্য প্রয়োগ, হাতে ধরে গোয়েন্দার নির্ণয় পাঠককে বোঝানো এবং অতিসামান্য ইনফো ডাম্পিং। সব মিলিয়ে মৃগতৃষ্ণা, ভস্মবহ্নি এবং গোধূলিসন্ধি হয়ে উঠেছে খোলতাই-তর, এবং স্পিন-অফের মেদবর্জিত। প্রসঙ্গত জানাই, আমি প্রথম দুটি উপন্যাস শারদীয়ের পাতাতে পড়েছি (এবং কিনে), তৃতীয়টি পড়লাম পাণ্ডুলিপিতে।
কেউ একদিনে অসাধারণ লেখক হয়ে ওঠে না, প্রতিটি লেখায় আমরা শিখি, পরবর্তী বইগুলিতে আগের বইয়ের ক্ষত মেরামত হয়। কৌশিক তাঁর প্রতিটি গোয়েন্দা উপন্যাসে একজন আন্তর্জাতিক মাপের লেখক হয়ে উঠছেন, নির্মাণ করছেন ‘বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য’কে। যদি আমেরিকার একজন জোনাথান লেথেম থাকে, ফরাসিদের সিমেন, ব্রিটিশদের পিডি জেমস, ইতালিতে ক্যামিলেরি, ব্রাজিলের আলবের্তো মুসা, কিউবার পাদুরো, তাহলে আমাদের একখানা কৌশিক মজুমদার আছেন। ঈর্ষা ব্যতীত তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো আমার আর কিছু নেই!
ধন্যবাদান্তে,
রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
.
লেখকের কথা
অথবা
কেন ম্যাসন সিরিজ না পড়লেও এই বই পড়া যাবে?
শ্রীতারিণীচরণ রায়। আদি নিবাস চুঁচুড়া। প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। বাঙালি পাঠকের সঙ্গে তারিণীচরণের প্রথম পরিচয় ম্যাসন সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘সূর্যতামসী’-র সপ্তম পরিচ্ছেদে। ১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯২-এর কনকনে শীত কুয়াশার মাঝে চীনেপাড়ায় ভয়াবহ খুনের সাক্ষী গণপতি চক্রবর্তী যখন পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেল, তখন প্রায় শেষ রাত।”সাত-পাঁচ ভেবে গণপতি আর দর্জিপাড়ার দিকে গেল না। বাকি রাত ক্লাইভ স্ট্রিটে তারিণীর অফিসেই কাটিয়ে দেবে। তারিণী নতুন অফিস খুলেছে। ডিটেকটিভ এজেন্সি। সারা দিনরাত ওখানেই পড়ে থাকে। বিয়ে করেনি। বাড়িতে বিধবা মা ছাড়া কেউ নেই। ইচ্ছে হলে এক-দুই দিন চুঁচুড়ায় দেশের বাড়িতে গিয়ে থেকে আসে।”
এই অধ্যায়েই তারিণী সম্পর্কে আরও কিছু খবর জানা যায়।”চুঁচুড়া থেকে কলকাতায় এসে তারিণী প্রথমে নানারকম কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কিছুদিন রাধাবাজারে এক দোকানে খাতা লেখার কাজ করে। সেখানে বড্ড কম মাইনে দিত। খাটনিও বেশি। বুদ্ধিমান তারিণী নতুন চাকরি পেয়ে গেল। চাঁদপাল ঘাটে এক গুদামে মালের হিসেব রাখার কাজ। বেশ কিছু বছর আগে চন্দ্রনাথ পাল নামে একজন মুদির দোকানদার ছিলেন। যেসব ব্যবসায়ী আর দোকানদারেরা এখানে নৌকা থেকে নামতেন, তাঁরা ওই দোকান থেকে জিনিস কিনতেন। তাঁর নামেই এই ঘাটের নাম হয় চাঁদপাল ঘাট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদস্থ কর্মচারীরা এই ঘাটেই নামলে তাঁদের সম্মানে তোপধ্বনি করা হত কেল্লা থেকে। পরে লটারি কমিটি গঙ্গার ধার বরাবর পাকা রাস্তা বানিয়ে নাম দেয় স্ট্র্যান্ড ব্যাংক। এখন অবশ্য সবাই একে স্ট্র্যান্ড রোডই বলে। একপাশে সারি সারি গুদাম। সেখানেই একদিন ড্রিসকল সাহেবের সঙ্গে আলাপ। সাহেব তখন লালবাজারের পুলিশ ইনস্পেক্টর। তাঁর কাছে খবর ছিল বেআইনি পথে আফিম পাচার করা হচ্ছে কোনও একটা গুদাম থেকে। তিনি তারিণীকে পুলিশের খোচড় হওয়ার প্রস্তাব দেন। ভালো দস্তুরি। তারিণী চিরকাল অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে। সেও রাজি হয়ে যায়। কিছুদিন বাদেই বুঝতে পারে প্রদীপের তলাতেই অন্ধকার। সে যে গুদামে কাজ করে, সেখানেই তার নাকের ডগা দিয়ে নুনের বস্তায় আফিম পাচার হচ্ছে। যথারীতি ড্রিসকল সাহেবকে খবর দেওয়ায় তিনি গুদামের মালিককে বমাল গ্রেপ্তার করেন। তারিণী কুড়ি টাকা বকশিশ পেলেও তার চাকরিটা যায়। ভালো দিক একটাই। ড্রিসকল সাহেবের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে সে। এরপর প্রায় দুই বছর পুলিশের খোচড় হিসেবে কলকাতা, চন্দননগর, চুঁচুড়া, কালনা, কোথায় না গেছে? সাহেব চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ক্রিক রো-তে নিজের ডিটেকটিভ এজেন্সি খোলেন। তারিণী বছর দু-এক তাঁরই সহকারী হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু সাহেবের শরীর ভেঙে যেতে থাকল। মেমসাহেব মারা গেলেন। ছেলেরা ইংল্যান্ডে চলে গেল। সাহেব গেলেন না। রয়ে গেছেন এই দেশ আঁকড়ে। তবে এখন আর বেশি কেস নেন না। তিনিই নিজের হাতে তারিণীকে অফিস সাজিয়ে দিয়েছেন। এমনকী, তারিণী যে সুন্দর কাঠের চেয়ারটায় বসে, সেটাও সাহেবেরই দেওয়া। রোজ সকালে উঠে চেয়ারটাকে ভালো করে ন্যাকড়া দিয়ে মুছে তারপরই সে বসে।”
১৮৯২ থেকে ১৮৯৬ সাল অবধি তারিণীর নানা কার্যকলাপ ম্যাসন সিরিজের তিনটি বই (সূর্যতামসী, নীবারসপ্তক আর অগ্নিনিরয়)-এর পাতায় পাতায় বলা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, আমার অজান্তেই তারিণী কখন যে পাঠকদের এতটা প্রিয় হয়ে উঠেছে, বুঝতে পারিনি। ২০২০-র সেই ভয়ানক করোনাকাল থেকে শুরু করে ২০২২-এর জানুয়ারি অবধি, প্রতি বছর একটি করে প্রকাশিত হয়েছিল ট্রিলজির তিনটি বই। এরপর তারিণীকে নিয়ে আর কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু লেখকের ইচ্ছেয় কবেই বা কী হয়েছে? ‘অগ্নিনিরয়’ শেষ হলে পাঠকরা জিজ্ঞেস করলেন সেই চিরন্তন প্রশ্ন, “তারপর কী হল?” তারিণীর মতো একজন বুদ্ধিমান ডিটেকটিভ কোনও কারণ ছাড়াই গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেবে, তা তো হতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে তারিণীর অন্য অভিযানগুলোকেও পাঠকের সামনে আনা হোক। এই দাবিতে আরও হাওয়া দিলেন ‘অন্তরীপ’ পত্রিকার তরুণ সম্পাদক শ্রী তনুময় রায়। ‘অন্তরীপ’ খুব অল্প সময়েই বাংলা সাহিত্যে নিজের জায়গা কায়েম করেছে। সেই পত্রিকার সম্পাদক যখন প্রতি বছর পুজোসংখ্যায় তারিণীর একটা স্পিন অফ লিখতে বলেন, তখন সে লোভ সামলানো দায় হয়ে পড়ে।
কিছু না ভেবেই ১৮৯৮ সালের প্রেক্ষাপটে ভস্মবহ্নি উপন্যাসটি লিখি, যা ২০২২ সালের শারদীয়া অন্তরীপে প্রকাশ পায়। আমি সৌভাগ্যবান, পাঠক এই উপন্যাসকেও সাদরে গ্রহণ করেন। এখানে শুধু একটি লাইন ছিল যে, তারিণী এখন বিবাহিত এবং তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হয়ে এক পিসির বাড়ি আছে। আবার কিছু পাঠক জানতে চান, “তারিণীর বিয়ে হল কবে? টেরই তো পেলাম না!” ফলে 2023 সালের মৃগতৃষ্ণা উপন্যাসে টাইমলাইন পিছিয়ে ১৮৯৭-তে নিয়ে তারিণীর বিবাহ ও তারপরে দার্জিলিং যাত্রার বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত উপন্যাস গোধূলিসন্ধি লেখার সময় আচমকা মাথায় হাই ভোল্টেজ স্পার্ক খেলে যায়। এই কাহিনিকে ১৮৯৯ সালের প্রেক্ষিতে লিখলে একদিকে যেমন কালানুক্রম বজায় থাকে, তেমনি ম্যাসন সিরিজের মতো এখানেও একটি কমন থিম-কে বজায় রাখা সম্ভব হয়, যা তিনটি উপন্যাসকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে। কী সেই থিম, শুরুতেই বলে দিচ্ছি না। ঘটনার কালানুক্রমে পরপর তিনটি উপন্যাস পড়লে পাঠক এমনিতেই তা ধরতে পারবেন। এই বইয়ের একটি উপন্যাস ভস্মবহ্নি কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে আমারই অন্য এক গল্পগ্রন্থ ‘আবার আঁধার’-এ পূর্বপ্রকাশিত। এখানে উপন্যাসটির প্রায় সম্পূর্ণ পরিমার্জন ও পরিবর্ধন সহ সহ একেবারে নতুন একটি পরিশিষ্ট রয়েছে, যা আগে অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
ম্যাসন সিরিজ পড়েননি, এমন পাঠকের কি এই বই পড়তে সমস্যা হবে? এই তিনটি উপন্যাসেই বেশ কিছু সত্যি আর কাল্পনিক চরিত্ররা এসেছেন। তবে হাতেগোনা কয়েকটি চরিত্রকেই তিনটি উপন্যাসে ঘুরে-ফিরে দেখা যাবে। মুখ্য চরিত্রপরিচয় বিভাগে তাঁদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এই চরিত্রগুলো বাদে কাহিনিগত দিক থেকে প্রত্যেকটি উপন্যাস স্বতন্ত্র এবং ম্যাসন সিরিজের সঙ্গে এদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাই ম্যাসন সিরিজ পড়া না থাকলেও এই তিনটি উপন্যাসের স্বাদ গ্রহণ করতে পাঠকের কিছুমাত্র সমস্যা হবার কথা না। তবে পড়া থাকলে তো পোয়াবারো।
এই বইটির ভূমিকা লেখার জন্য গোয়েন্দা কানাইচরণ খ্যাত ভ্রাতৃপ্রতিম শ্রী রাজর্ষি দাশ ভৌমিক ছাড়া কারও নাম মাথাতেই আসেনি। কানাইচরণ আর তারিণীচরণকে একত্রে দুই মলাটের মধ্যে আনার এই সুযোগ হাতছাড়া করা অসম্ভব। অনেক ধন্যবাদ তাঁকে, তিনি এত কাজের মধ্যেও অমন সুন্দর একটি ভূমিকা লিখে দিয়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশের সময় উপন্যাসের ছবিগুলো এঁকেছিলেন শিল্পী রঞ্জন দত্ত। এই বইতে সে দায়িত্ব নিয়েছেন শিল্পী গৌতম কর্মকার। প্রচ্ছদ রূপায়ণে আগের মতোই শিল্পী কামিল দাস। এঁদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অবধি নেই। ধন্যবাদ জানাই অস্তরীপের সম্পাদক তনুময় রায়কে, যাঁর উৎসাহে এই উপন্যাসগুলো লেখা। ধন্যবাদ বুক ফার্মের দুই কর্ণধার শ্রী শান্তনু ঘোষ ও শ্রী কৌশিক দত্তকে, যাঁরা এই উপন্যাসত্রয়ীকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সাহস দেখিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে বড়ো ধন্যবাদ প্রাপ্য পাঠক বন্ধুদের, যাঁদের ক্রমাগত আগ্রহ, জিজ্ঞাসা, প্রশংসা আর সমালোচনায় প্রতিদিন ঋদ্ধ হয়ে বছর বছর তারিণীকে নিয়ে লেখার তাগিদ জন্মেছে। এই বই আর কারও না। এই বই আসলে আপনাদের…
কৌশিক মজুমদার
.
মুখ্য চরিত্র পরিচয়
তারিণীচরণ রায়-কলকাতার প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ম্যাসন সিরিজের অন্যতম প্রধান চরিত্র।
মাখনলতা রায়-তারিণীর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী।
তুর্বসু রায়—তারিণীচরণের প্রপৌত্র। পেশায় প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ম্যাসন সিরিজের আরও এক প্রধান চরিত্র। নির্জন স্বাক্ষর ও নিরভিসন্ধি গল্পদুটির নায়ক
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়-কলিকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক ও লালবাজার থানার গোয়েন্দা বিভাগের দারোগা। তবে তিনি বাঙালির কাছে পরিচিত তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা কাহিনির সিরিজ”দারোগার দপ্তর”-এর জন্য।
গণপতি চক্রবর্তী—আধুনিক জাদুবিদ্যার পথিকৃৎ। জাদুকর পি সি সরকারের গুরু। গণপতি প্রিয়নাথ বসুর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে যোগ দেন এবং কৌতুক অভিনয় ও মজাদার খেলা দেখিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
.
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KMS-এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক।
জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা (২০১৮), মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯), নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০), নীবারসপ্তক (২০২১), এই সব দিনরাত্রি (২০২২) ও ধন্য কলকেতা সহর (2022), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪) সুধীজনের প্রশংসাধন্য।
বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত প্রকাশ পায় তাঁর বই, লেখা। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০), একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত (২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪)।






ধন্যবাদ আপনাদের।।। অনেকদিন এই বইটির প্রতীক্ষায় ছিলাম।। অবশেষে পেলাম।।