৮. হরিমতী

৮. হরিমতী

সুখরিয়ার আনন্দ ভৈরবী মন্দির থেকে সামান্য দূরে মেলার মাঠে অট্টালিকার সমান বিরাট এক সার্কাসের তাঁবু ফেলা হয়েছে। আশেপাশের শ্রীপুর, বলাগড়, জিরাট থেকে লোক ভেঙে পড়েছে এই সার্কাস দেখতে। রিফ্রেশমেন্ট রুম, গ্রিনরুম, টিকিটঘর, ঘোড়ার আস্তাবল, সোডা, লেমোনেড, পান ইত্যাদির আট-দশখানি দোকান আর আশেপাশে ছোটো ছোটো তাম্বুতে দর্শকদের মনোরঞ্জনের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। আজকেই ‘আখরি তামাশা’। সার্কাসের মালিক প্রিয়নাথ বোস তাই এখন ভয়ানক ব্যস্ত। রাত নটা। থার্ড বেল বেজে গেছে। একটু বাদেই ঢং ঢং শব্দে গং বেজে উঠবে। তারপরেই গোটা তাঁবু কেঁপে উঠবে ড্রামের শব্দে। ঠিক সাতবার ড্রাম বাজার সঙ্গে সঙ্গে দশজন অশ্বারোহী সাদা ঘোড়ার উপরে দাঁড়িয়ে, তালে তালে নাচতে নাচতে প্রবেশ করবে এরিনায়। শুরু হবে দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের আরও একটা অপূর্ব শো। শেষবারের মতো বাইরে সবটা দেখে প্রোফেসর বোস তাঁবুতে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় কোটের ল্যাজে একটা টান পড়তেই পিছনে ফিরে তাকালেন প্রিয়নাথ। ছেঁড়া জামা আর ইজের পরা কুচকুচে কালো এক মেয়ে তাঁর লম্বা ইভনিং কোটের একপ্রান্ত টেনে ধরেছে। বয়স খুব বেশি হলে এগারো কি বারো হবে। চোখদুটি দেখলে বড়ো মায়া হয়। এই মেয়ে এখানে কেন? ভিখারি নাকি?

প্রিয়নাথ বালিকার হাত থেকে কোট ছাড়াতে চান। পারেন না। নিচু হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “কে রে তুই? কী চাস? পয়সা নিবি?” বলে পকেট থেকে কিছু তামার পয়সা বের করে মেয়েটির হাতে দিতে যান। সে হাত গুটিয়ে নেয়।

“পয়সা নিবি না তো কী নিবি? খিদে পেয়েছে? শ্যামচাঁদকে বলি তোকে কিছু খেতে দিতে।”

মেয়েটি মুখে কিছু বলল না। মাথা নেড়ে না করল।

“কী মুশকিল! তবে?”

রিনরিনে গলায় মেয়েটা বলে ওঠে, “আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

ততক্ষণে গ্রামের মুরুব্বি গোছের দু-তিনজন আশেপাশে জমা হয়ে গেছে। তাদেরই একজন বলে উঠল, “নিয়ে যান স্যার ওকে। খুব ভালো মেয়ে। কিন্তু বড়ো দুঃখী। আপনার কাছে ভালো থাকবে।

“এর বাবা মা নেই?”

“বাবা তো বছর তিনেক হল মরে গেছে স্যার। মা-টা কুলটা। অন্য পুরুষের সঙ্গে ভেগেছে। শুনি এখন কলকেতায় সোনাগাজিতে কোঠা বানিয়েছে। এই মেয়ে জনমদুঃখী। গাঁয়ের এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। আমরা দুটি খেতে দিলে খায়। এর বাড়ি ওর বাড়ি ঘুমায়। এতদিন ছোটো ছিল, তাও একরকম। এখন এই মেয়েও সোমত্ত হচ্ছে। কেউ এখন আর একে ঘরে রাখতে চাইছে না। কী বলুন তো স্যার, গাঁ-গঞ্জের ব্যাপার, বদনামের ভয় তো সবারই আছে।”

প্রিয়নাথ বোস বাইরে যতই কঠিন হোন, তাঁর ভিতরটা ফুলের মতো নরম। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “নাম কী রে তোর?”

“হরিমতী। হরিমতী রাজবংশী।”

সেদিন সার্কাসের গং বাজতে পাক্কা আধঘণ্টা দেরি হল।

.

হরিমতী সার্কাসে এসেই বুঝতে পারল, বাইরে যতই প্রিয়নাথবাবুর বোলবোলাও থাকুক না কেন, আসল কর্ত্রী অন্য একজন। তাঁর বড়ো ভাই মতিলালের স্ত্রী সুশীলাসুন্দরী বসু। সুশীলা সত্যিই এক অসাধারণ মহিলা। জিমন্যাস্টিকসে তাঁর জুড়ি নেই। অ্যাক্রোব্যাটিক্স, কার্টহুইল আর ডেয়ারডেভিল-এর মতো খেলায় তিনি অনন্যা। ট্র্যাপিজে বিদেশি সার্কাস শিল্পীদের সমকক্ষ। তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব বাঘের খেলায়। বেঙ্গল সার্কাসের লক্ষ্মী আর নারায়ণ নামে দুই রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে নিয়ে সুশীলা হেলায় নানারকম খেলা দেখান। তিনি অবসরে বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকেন, আর তারাও পোষা বিড়ালের মতো সুশীলার গায়ে মাথা ঘষে। প্রিয়নাথও কখনোই তাঁর বউঠানকে অমান্য করেন না। হরিমতীকে দেখে সুশীলা প্রথম দিনই নাক কুঁচকে বলেছিলেন, “কোন ভাগাড় থেকে একে নিয়ে এলে গো ঠাকুরপো? কী বিচ্ছিরি কালো! ম্যাগো!” সুশীলা আর হরিমতীর বাকি জীবনের সম্পর্কের রসায়ন সেদিনই নির্ধারিত হয়ে গেছিল।

.

প্রিয়নাথ ঠিক করলেন হরিমতীকে প্লেয়ার বানাবেন। সুশীলার তাতে বিস্তর আপত্তি ছিল। একে তো হরিকে তাঁর অপছন্দ, দ্বিতীয়ত, তাঁর নিজের বোন কুমুদিনীও সদ্য সার্কাসে পা রেখেছে। সুশীলার ইচ্ছে, তাঁর পরে এই কুমুদিনীই স্টার হবে। এই অজ্ঞাতকুলশীলা মেয়েটি এসে তাতে বাধা না দেয়। তিনি ব্যাকস্টেজে নানা কাজে হরিকে ব্যস্ত রাখেন। একটা কাজ শেষ হলেই অন্য কাজের ফরমায়েশ করেন। প্যারালাল বারের খেলায় যেখানে কুমুদিনী বারবার ভুল করলেও শুধরে দেন, হরির ভুলে তিনি অকরুণ। ব্যঙ্গ করে বলেন, “এই খেলায় পা দুটো জোড়া রাখতে হয় বাছা। ফাঁক করতে নেই। কিন্তু সে আর তুমি কী বুঝবে? পা ফাঁক করা তো তোমার রক্তে।” হরিমতী সব বোঝে। চোখের জল গিলে চুপচাপ ঘোড়ার জাবনা দেয়, বাঘের খাঁচার নিচ থেকে মলমূত্র পরিষ্কার করে।

এভাবেই হয়তো জীবন চলত, একদিন সে একা একা বলের উপর ব্যালান্সের খেলা দেখানোর প্র্যাকটিস করছে, পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল, “বাহ! ভারি মজা তো!”

এক লাফে বল থেকে নেমে পিছনে ঘুরেই এক যুবককে দেখতে পেল হরিমতী। আগে কোনও দিন দেখেনি। যুবকের পেটানো ছাতি নিরাবরণ। পরনে হেঁটো ধুতি, হাতে রং মাখানো তুলি, মুখে অদ্ভুত এক হাসি।

“তুমি কে হে? আগে তো দেখিনি!”

“দেখবে কেমন করে? আমি যে নতুন এসেছি। আর্টিস্ট। সার্কাসের পোস্টার রং করতে, বাঘ সিংহ আঁকতে, বোসবাবু আমায় রেখেছেন। অন্য সময়ে ফাইফরমাশ খাটব বলে সাড়ে তিন টাকা আর দুই বেলা পেটেভাতের কড়ারে আছি। তুমি এখানে খেলা দেখাও বুঝি?”

“হ্যাঁ, তবে একা না। দলের সঙ্গে। সামনে সুশীলাসুন্দরী দেখায়। আমরা পিছনে থাকি।”

“নাম কী তোমার?”

“হরি…” বলেই মনে পড়ল, স্টেজে নামার দিন প্রোফেসর বোস তার নতুন নাম দিয়েছেন হিঙ্গনবালা। সে তার নাম বলার পর যুবকটিও নিজের পরিচয় দিল, “আমি গণপতি। ম্যাজিশিয়ান গণপতি চক্রবর্তী।”

“ম্যাজিশিয়ান? তুমি জাদু দেখাও?”

“দেখাই বই কি!” বলেই শূন্য থেকে হাতড়ে একটা বল নিয়ে এসে হাত একবার ঝাঁকানি দিতেই সেটা রানির মাথাওয়ালা বড়ো একটা রুপোর টাকা হয়ে গেল। আবার হাত ঝাড়তেই মিলিয়ে গেল হাওয়ায়।

“কোথায় গেল টাকাটা?”

“তোমার কাছে। লুকিয়ে না রেখে বার করে দাও দেখি!”

“এ মা! এমনি করে মিছে কথা কইতে হয় বুঝি? আমি কেন রাখতে যাব তোমার টাকা? আমি কি চোর?” বলতেই গণপতি তার খুব কাছে এসে হরিমতীর কানের পিছনে হাত দিয়ে সেই টাকা বার করে নিয়ে এসে বলল, “তাই বুঝি? এটা তবে কী?”

হরিমতী ফিক করে হাসলে।

.

পরের কয়েক বছর ধরে পেশোয়ার, চিতোর, উজিরিস্থান, কাশ্মীর, বরোদায় ঘুরে বেড়াতে লাগল দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কার্স। হরিমতী চোখের সামনে দেখতে পেল, কীভাবে সার্কাসের এক্সট্রা থেকে ইন্টারভ্যালের ম্যাজিশিয়ানের পথ বেয়ে বেঙ্গল সার্কাসের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠল গণপতি। পোস্টারে এখন বড়ো বড়ো করে লেখা থাকে, ‘দি গ্রেট গণপতি’। ঠিক তার নিচেই ‘মিস সুশীলা’-র নাম। সুশীলার নাম এককালে সবার উপরে থাকত। এখন একধাপ নিচে নেমে যাওয়ায় তিনি বেজায় অসন্তুষ্ট হলেও মুখে কিছু বলতে পারেন না। পাবলিক ডিমান্ড বলে কথা। গণপতির আবদারেই এখন হিঙ্গনবালার জন্য সাত মিনিটের ব্যালেন্সিং-এর অ্যাক্টো রাখা হয়েছে। সুশীলা মনে মনে গজগজ করেন আর বলেন, “সার্কাসে এক নাগর ধরেছে কিনা, তাই এত গুমোর ওই মেয়েছেলের। কাল ওর নাগর ভাগলে পরদিনই ওই কেলে মাগিকে মুখে নুড়ো জ্বেলে বিদেয় করব। তখন গতর বেচে খেতে হবে।”

আর তাই মনেপ্রাণে গণপতিকে আঁকড়ে ধরেছে হরিমতী। সে জানে এই মানুষটিই তার অগতির গতি। প্রতি রাতেই আধোঘুমে প্রেতের মতো নিঃশব্দে গণপতি উপস্থিত হয় তার বিছানায়। ক্ষিপ্র হাতে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো খুলে নিতে থাকে হরিমতীর এক-একটা পোশাক। কেউ টেরটি পায় না। সব শেষ হয়ে গেলে বিছানাভরা ঘাম, প্রেম আর অনুতাপের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে হরিমতী বুঝতে পারে, ঘর থেকে জাদুকর অদৃশ্য হয়ে গেছে। বহুবার সে গণপতিকে বলেছে তাকে বিয়ে করে নিতে। বিয়ের কথা উঠলেই গণপতি অন্য কথা বলে। কথা ঘুরিয়ে প্রসঙ্গান্তরে যায়। হরিমতীর মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো কুমুদিনী, মৃন্ময়ীরাও গণপতির অঙ্কশয়ন করে। তাই গণপতি যখন সার্কাসের শো-এর বাইরে নিজের মতো ম্যাজিকের খেলা দেখাবে ভাবল, মেয়েদের মধ্যে একমাত্র হরিমতীই তার সঙ্গে এসেছে। পুরুষমানুষকে বিশ্বাস নেই। কবে কীসে মজে মন।

.

“আমার সর্বনাশ হয়ে গেল মা ঠাকুরান”, কাঁদতে কাঁদতে বলছিল হরিমতী। “সবই আমার এই পোড়া কপালের দোষ। শুনছি কোন এক সাহেব মরেছে, আর তেনাকে পুলিশে ধরেছে খুনি হিসেবে। সবাই বলছে ওনার নাকি ফাঁসি হবে। কিন্তু আমি তো তিন বছর ধরে ওনাকে চিনি। বললে বিশ্বেস করবেন না, উনি একটি মশাও মারতে পারেন না।”

“আসলে ওঁকে জড়িয়েই পরপর দুটো অস্বাভাবিক মৃত্যু কিনা। সেদিন মঞ্চে যা হল…” প্রতিমা বলল।

“মঞ্চে কী হল?” হঠাৎ প্রায় যেন ঝাঁজিয়ে উঠল হরিমতী।”নম্ভকে তো গুলি করেছে ওই সায়েব। তার বিচার কে করবে? নাকি আমরা নেটিব বলে আমাদের জানের দাম নেই? রোজ তো দাঁতে গুলি উনিই ধরেন। সেদিন নেহাত নস্তুবাবু জোরজার করলেন বলে… তা না হলে… আমি আর ভাবতে পারছি না মা ঠাকুরান”, বলে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

“তুমি কেঁদো না হরি”, মাখন সান্ত্বনা দিল।”আমার স্বামী খুব বড়ো ডিটেকটিভ। উনি গণপতিবাবুর বন্ধুও বটে। ওঁকে বাঁচাতেই উনি আমায় নিয়ে সাততাড়াতাড়ি তামাটুলি এসেছেন। উনি থাকতে তোমার বা গণপতিবাবুর কোনও অনিষ্ট হবে না।”

মাখন ঠিক করল, রাতে তারিণী ফিরে এলে তাকে সবটা গুছিয়ে বলতে হবে।

.