১০. চার্জশিট
বাইরে বেরিয়েও তারিণীকে গম্ভীর দেখে প্রিয়নাথ শুধালেন, “তোমার আবার কী হল?”
“আজ্ঞে ছোটো মুখে বড়ো কথা, দোষ নেবেন না, তবে আপনিও জানেন, আমিও জানি, গণপতি এই কাজ করতে পারে না।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“আমি নিশ্চিত। কেন, আপনি নন?”
বিকেল থেকে আকাশ বেশ মেঘলা করেছে। সূর্য না ডুবলেও সন্ধ্যা নামবে খু দ্রুত। উত্তর থেকে শনশনিয়ে একটা বাতাস বয়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। আর তারই সঙ্গে অচেনা একটা বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে নাকে। মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে ফিরে জানান দিচ্ছে। প্রিয়নাথ তারিণীর কাঁধে হাত রাখলেন। এ হাত অভিভাবকের হাত। একটু আগেই যে প্রিয়নাথকে দেখে রীতিমতো ভয়ই পেয়ে গেছিল তারিণী, সে যেন অন্য কোনও মানুষ। দূরাগত কেউ
পথের পাশেই পাথরের একটা চ্যাটালো চাঁই। পিছনে কাঁটাবন। প্রিয়নাথ সস্নেহে তারিণীকে নিয়ে সেই পাথরে গিয়ে বসলেন।
“তোমাকে তামাটুলিতে নিয়ে আসার বিশেষ কিছু কারণ আছে। আগে সবটা বলিনি, এখন বলা প্রয়োজন। এই গোটা কেসটা যতটা সরল ভাবছ ততটা নয়। এর সঙ্গে আমাদের মহামান্য ইংরেজ সরকারের ভবিষ্যৎ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তামাটুলি আর তার আশেপাশের গোটা জায়গা বিপ্লবীদের ঘাঁটি হয়েছে। শুধু তাই না, তাদের অনেকে সরাসরি জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। কংগ্রেস সরাসরি এতে মদত না দিলেও পরোক্ষ উসকানি যে নেই, তা বলা যায় না। ব্রিটিশ পুলিশবাহিনীর প্রতিটি ভুল, প্রতিটা ব্যর্থতাকে বড়ো করে দেখিয়ে তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠানোর মতো কিছু অভিজাতও আছেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্যালিসবেরির শত্রু কম নেই। কিছু হলেই মহারানি ভিক্টোরিয়ার কানে দেবে যে এই কলোনি আমরা চালাতে পারছি না। ভারত থেকে রেভিনিউ যায় সবচেয়ে বেশি। তাই মহারানিও ইন্ডিয়ার ব্যাপারে স্পর্শকাতর। সেখানে যদি জানা যায়, আমাদের একজন স্পাই আর এক সুপারিনটেন্ডেন্ট একই রাতে খুন হয়েছেন, তবে প্রধানমন্ত্রীর উপরে যে চাপ নেমে আসবে, তাতে তিনি আমাদের চাকরি খেয়ে নেবেন এটুকু নিশ্চিত। বিপ্লবীরাও নতুন উদ্যমে আক্রমণ শানাবে। যদিও ভালো খবর একটাই। এখনও পর্যন্ত এই ব্যাপারটা আমরা চেপে রাখতে পেরেছি।”
“সেটা কীভাবে বুঝলেন?”
“দেশীয় সমিতি কিংবা কংগ্রেসেও আমাদের গুপ্তচর আছে। এই খবর বেরোলে আমাদের কাছে সে সংবাদ আসত।’
“কিন্তু গণপতির ব্যাপারে আপনি এত নিশ্চিত কীভাবে?”
প্রিয়নাথের হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ ছিল। শিকলি আঁটা। সেটায় দুবার চাপড় মেরে প্রিয়নাথ বললেন, “এতে কী আছে জানো? চার্জশিট। এই হার্পার ছোঁড়ার বয়স কম, কিন্তু কাজ শিখেছে ভালোই। গণপতির বিরুদ্ধে প্রায় ওয়াটার টাইট চার্জ লাগিয়েছে। কেটে বেরুনো মুশকিল।
“যেমন?”
“গণপতির দলের বিভিন্ন জনের জেরা থেকে জানা যাচ্ছে, এখানে আসার পর থেকেই অজিত থুড়ি ভূপেনের আচার আচরণে কিছু পরিবর্তন আসে। আগে সে গণপতির তাঁবুতে যেত না, বা গণপতির সঙ্গে যথেষ্ট সম্ভ্রম নিয়েই কথা বলত। এখানে আসার পর থেকেই আচমকা সে গণপতির সঙ্গে ইয়ার দোস্তের মতো মিশতে থাকে। এমনকী রসালো ঠাট্টাও চলত। দলের কেউ কেউ আপত্তি জানানোয় সে বলেছিল, ‘গণা আমায় কিচ্ছু বলবে না।’ দলের এক খেলোয়াড়, নাম বিপিন, একদিন গণপতির তাঁবুর পাশ দিয়ে যাবার সময় দুজনের তীব্র বাদানুবাদও শুনতে পায়। তাঁবু থেকে বেরোনোর সময় ভূপেন জোর গলায় বলেছিল, ‘চাকর চিরকাল চাকরই থাকে। মালিক হবার সুযোগ পেলেও হয় না।”
শো যেদিন হবে, সেদিন সকাল থেকেই গণপতি নাকি কিছুটা অস্থির ছিল। জমিদারের পাইক জানিয়েছে, টেলর সাহেব কখন আসবেন সেটা সে বার দুই জিজ্ঞেস করেছে। শো শুরুর ঠিক আগে গণপতি আধঘণ্টার জন্য বেপাত্তা হয়ে যায়।”
“কী বলছেন?”
“ঠিকই বলছি। সে আসছে না দেখে হিঙ্গনবালা খেলা শুরু করে দেয়। খেলার একেবারে শেষের দিকে কোনওমতে হাঁফাতে হাঁফাতে সে ঢোকে। ভূপেন ব্যাকস্টেজে ছিল। সে গণপতির দিকে তাকায়। গণপতি রেগে প্রায় হিসহিসিয়ে বলে, ‘আজকেই তোর শেষদিন।’ এদিকে হিঙ্গনবালার খেলা সমাপ্ত হয়ে যাওয়ায় গণপতি স্টেজে উঠতে বাধ্য হয়। তারপরের ঘটনা তো তুমি জানোই।”
“কিন্তু গণপতি কোথায় গেছিল সেটা জানা গেল?”
“সরাসরি জানা যায়নি। তবে সে বেরিয়েছিল ছটার পরে, সাড়ে ছটার আগে। ফিরেছে সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে। সময়টা খেয়াল করো। যখন টেলর সাহেবের বাংলোর সামনের সেই সিপাই টপ হ্যাট আর মুখোশ পরা তালঢ্যাঙা সাহেবকে দেখেছিল।”
“যে সাহেব ঢুকে আর বেরোননি। কিন্তু গণপতিকে তো তালঢ্যাঙা বলা যায় না কিছুতেই। বলতে কি, সে আমার চেয়েও খাটো।”
“এইখানেই পরের মজা। গতকাল ঝিরনি নদীর ধারে একটা পুঁটুলিতে তিনটে অদ্ভুত জিনিস পাওয়া গেছে। আন্দাজ করো, কী কী?”
“একটা টপ হ্যাট, একটা মুখোশ আর…”
“একটা হাই হিল জুতো। পুরুষদের।”
“আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন?”
“আমি কিছুই বলতে চাইছি না। চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে, গণপতি সাহেব সেজে টেলরকে খুন করে অজ্ঞাত উপায়ে বেরিয়ে মুখোশ ইত্যাদি নদীর ধারে রেখে ম্যাজিক দেখাতে যায়। নক্ত হয়তো কিছু জানত, কিংবা ব্ল্যাকমেলের চেষ্টা করবে এই সন্দেহ করেছিল গণপতি। তাই সে বলে, ‘আজকেই তোর শেষদিন।’ আর কায়দা করে আর্থার সাহেবের হাত দিয়ে নস্তুকে খুন করায়।”
“সমস্যাটা ঠিক এখানেই দারোগাবাবু”, প্রিয়নাথের কথা শেষ হতে না হতে তারিণী বলে উঠল।”আমি ভূত মানি না। তাই ভরের কথা ছেড়েই দিলাম। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন, সেখান থেকে দুটো ব্যাপার পরিষ্কার। এক, প্রতিদিন গণপতি গুলি ধরার খেলা দেখায়। কিন্তু সেদিন নস্তু থুড়ি ভূপেন দেখিয়েছিল, এবং সেটা গণপতির কথায় নয়। স্বেচ্ছায়। একপ্রকার জোর করেই। তার প্রাণহানির বিন্দুমাত্র শঙ্কা থাকলে কি সে এটা করত? আবার ভেবে দেখুন, গণপতি তাকে হুমকি দিল, আজই তার শেষদিন। তারপরেও নন্তু এই খেলা দেখাল। দারোগাসাহেব, আমি নিশ্চিত সে জানত তার কিচ্ছু হবে না। যে যাই বলুক। এখানেই আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন। যিনি গুলিটা করলেন সেই আর্থার স্মিথকে কিন্তু ডেকে নিয়েছিল নন্তুই। স্বেচ্ছায়। কিন্তু কেন? কেন অন্য কেউ নন? নন্তু কি আগে থেকে স্মিথকে চিনত? আচ্ছা, আর্থার সাহেবকে জেরা করা হয়েছে?”
মাথা নাড়লেন প্রিয়নাথ।”তাঁকে জেরা করা অসম্ভব। তিনি কে জানো? রানির কোন দূরসম্পর্কের ভাই। মানুষ হিসেবে শুনেছি দিলখোলা। কিন্তু জেরা করতে গেলে চটে যাবেন। সেটা কেউই চাইছে না। এমনিতেই এই ঘটনা ঘটায় তিনি খুবই আপসেট।
যাই হোক, আজ সন্ধে পেরিয়ে গেছে। কাল এভিডেন্স রুমে সব প্রমাণ দেখব আমরা। আমি শুধু চার্জশিটে যা আছে বললাম। এখন ফিরে যাই চলো। বউমা আর খোকা হয়তো তোমাকে ছাড়া উতলা হয়ে উঠেছে।”
দুজনেই জমিদারবাড়ির দিকে পা বাড়াল। পথে কেউ আর একটা কথাও বলেনি।
.
