একাদশ অধ্যায়–দাম্পত্য আলাপ
৩১ মার্চ, বুধবার। অদা অতি প্রাতে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইয়াছি। আকাশমণ্ডলে মেঘের কণামাত্র উদয় হয় নাই। সুনীল নভঃস্থানে ভগবান মরীচিমালী সগর্বে উত্থান এবং তীক্ষ্ণ রশ্মি রাশি বিকীর্ণকরতঃ ধরাতলস্থ করিতেছেন দেখিয়া মুগ্ধ হইলাম। টাইগার হিলে সে এক অপূর্ব দৃশ্য নয়নগোচর হইল। দূরে তুষারমণ্ডিত একটি পর্বতশৃঙ্গ প্রদীপ্ত সুবর্ণরাশি সদৃশ শোভা পাইতেছে। ভূগোলবেত্তাগণ ইহাকে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ বলেন, কিন্তু ভুটিয়ারা বলে ইহার নাম”খাচেনঝঙ্গা”: খাচেন মহাতুষার, ঝ শৃঙ্গ, ঙ্গা পঞ্চ, অর্থাৎ মহাতুষারমণ্ডিত পঞ্চশৃঙ্গ। কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ভুটিয়াগণ দেবতা বলিয়া বিশ্বাস করে। ইনি মনুষ্যের প্রতি অসন্তুষ্ট হইলে ঝড়-বৃষ্টি প্রেরণ করিয়া গৃহ ও শস্যক্ষেত্র বিনষ্ট করেন। শাক্যমুনি ইঁহার শিষ্য ছিলেন। ক্রমে রৌদ্রের তেজ বৃদ্ধি হইল। দুইজনে নগর-দর্শনে বহির্গত হইলাম। মাখনের নানাপ্রকার বিপণির প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ। তাই তাহার মন রক্ষার্থে বিপণিমালা দেখিতে দেখিতে ‘চৌরাস্তায়’ উপনীত হইলাম। তথায় দাণ্ডি হইতে অবতরণ করিয়া ‘মল’ (Mall) পরিভ্রমণ করিতে লাগিলাম। মহাকাল পাহাড়ের নিম্নভাগ বেষ্টন করিলাম। ‘মলের’ এক স্থান হইতে পুনর্বার ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ দেখিতে পাইলাম। তখনও তাহার সৌন্দর্যের হ্রাস হয় নাই। প্রাতঃকালে এই স্থান হইতে এই পর্বতশৃঙ্গটি অতীব সুন্দর দেখায়। এখান হইতে লিবঙ্গের সমতল ভূমি এবং ভুটিয়া বস্তিটিও দেখিতে পাইলাম। অনেক সাহেব মেম এই রাস্তায় বেড়াইতেছিলেন। একে তো এখানে তাঁহাদের অভাব নাই, তাহাতে আবার ছোটোলাট বাহাদুরের শৈল-বিহারের সময়; দলে দলে শ্বেতাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গীগণ কিলবিল করিতেছেন।
.
সূর্যের গড়িয়ে আসা সোনালি আলোতে গোটা ম্যাল এখন ভেসে যাচ্ছে। উত্তর থেকে বইছে তিরতিরে এক ঠান্ডা বাতাস। ছোটো ছোটো টাট্টু ঘোড়া চেপে ঘুরছে উলের পোশাকে জড়ানো দিশি-বিলেতি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা। ম্যালের ধারে এক কাঠের বেঞ্চিতে তারিণী আর মাখন চুপটি করে বসে আছে প্রায় মিনিট পনেরো হল। তারিণীর কপালে ভ্রূকুটি, চোখমুখ গম্ভীর। দেখেই বোঝা যায় কোনও ভীষণ চিন্তা দিনরাত তার মনকে কুরে খাচ্ছে। মাখন খানিক ম্যালের শোভা দেখল। ঘাড় ঘুরিয়ে কাঞ্চনজঙ্গাকে দেখার চেষ্টা করল। তারপর স্থির তাকিয়ে রইল তার বরের মুখখানির দিকে। তারিণী বয়েসে তার থেকে কিছু বড়ো। কিন্তু ঝাঁকড়া চুল, বড়ো বড়ো দুটো চোখ নিয়ে তারিণী যখন একমনে কোনও কিছু ভাবে, তখন তাকে একেবারে সদ্য কিশোর বলে ভ্রম হয়। মাখনের ভারী মায়া হল। বিয়ে হয়ে ইস্তক এই লোকটিকে সেভাবে চিনতে পারেনি। তবু কোনও অজানা কারণে এক অদ্ভূত বন্ধন যেন তাকে তারিণীর সঙ্গে বেঁধে ফেলছে। যতদিন যাচ্ছে, এ বক্ষন জোরালো হচ্ছে। সে বুঝতে পারে। তার দেশের বাড়ির গঙ্গাজল সই বলত, একেই নাকি ভালোবাসা বলে। মাখন ভালোবাসা বোঝে না। বুঝতে চায়ও না হয়তো। কিন্তু এই তাচেনা পুরুষটিকে এক মুহূর্ত না দেখার বেদনা, প্রতি মুহূর্তে নতুন করে কাছে পাবার আকাঙ্ক্ষা, তার মধ্যে সুখের মতো যে ব্যথা জাগায়, তা সে আগে কোনও দিন উপলব্ধি করেনি। তারিণী মাটির দিকে তাকিয়ে। গালে হাত। দেহ স্থির, অচঞ্চল।
“কী ভাবচেন অমন করে?” নীরবতা ভাঙল মাখনই।
যেন গভীর ঘুম থেকে কেউ ডেকে দিল, এমনভাবে চমকে তাকাল তারিণী। শূন্য দৃষ্টি। মাখনের কথা শুনতেই পায়নি।
“কী বললে?”
“এসে অবদি দেখচি আপনি একেবারে আনমনা। একন তো আর কেউ নেই। আমায় বলবেন কী হয়েচে?”
“কিছু না… এসব তুমি বুঝবে না।”
“কেন? মুখ্যু বলে? নাকি মেয়েমানুষ বলে?” মাখনের চোখ আবার জলে ভরে এল। তারিণী এমনিতে বেশ ডাকাবুকো, কিন্তু এই চোখের জলে তার বড়ো ভয়। সে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, “আহা! তা কেন হবে? আসলে আমি ডিটেকটিভ কিনা, তাই খুনখারাপি নিয়েই আমার কারবার। তোমাকে আর এসব পাঁকে জড়াতে চাইনে। তুমি ঘুরতে এসেছ, আনন্দে ঘোরাঘুরি করো।”
“আহা! কত যেন আনন্দে আচি! যে মেয়ের স্বামী তাকে দেখে মুখ ভার করে রাকে, সে মেয়ের কপাল পোড়া। সে মেয়ের মরে যাওয়াই ভালো।” মাখনের চোখের জল গড়িয়ে এবার গাল বেয়ে টপটপ করে পড়তে লাগল। তারিণী ব্যস্তসমস্ত হয়ে”এহ! এ দেখি কথায় কথায় কাঁদে… কেঁদো না। আরে কেঁদো না… সবাই দেখছে যে”, বলতে বলতে মাখনের চোখের জল শাড়ির কোল ভিজিয়ে দিল।
“আচ্ছা, আচ্ছা। সব বলছি তোমায়। আগে লক্ষ্মী মেয়ের মতো চোখ মোছো দেখি”, পকেট থেকে একটা নকশাকাটা রুমাল বার করে দিল তারিণী। মাখন বিনাবাক্যব্যয়ে চোখের জল মুছে লাল লাল ফোলা ফোলা চোখে তার দিকে চেয়ে রইল। তারিণী বুঝল আজ আর রেহাই নেই।
“তুমি অভিশাপে বিশ্বাস করো?”
“কে আপনাকে অভিশাপ দিয়েচে?”
“হা কপাল! আমাকে কেন দেবে? এখানে চা বাগানে এক কার্মি মেয়ের বর অভিশাপ দিয়েছিল, সেই মেয়ে নাকি পেতনি হয়ে তার মৃত্যুর শোধ নেবে। পরপর তিন বছর তিনজন মারা যাবে। একই দিনে। আর কিমাশ্চর্য! সেটাই হল। প্রথম বছর নলিনীবাবুর স্ত্রী সাবিত্রী দেবী, পরের বছর একই দিনে ডাক্তার হান্টারের স্ত্রী, নাম জানি না, আর সেদিন ওফেলিয়া উইলিয়ামসন। তিনজন মহিলার মৃত্যু একই দিনে, যাদের তিনজনের বরকে অভিশাপ দিয়েছিল সেই কার্মি সর্দার। আমি আগের দুটো দেখিনি, কিন্তু ওফেলিয়ার মৃত্যু দেখেছি। এতে যাই হোক, কোনও অলৌকিকের হাত নেই। আমি নিশ্চিত। মুশকিল হল, যখনই এই মৃত্যুকে আগের মৃত্যু দুটোর সঙ্গে মেলাতে চাইছি, সব হিসেব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। একটা, বড়োজোর দুটো কাকতালীয় হতে পারে। কিন্তু তিন-তিনটে!!”
“তা তো হয়নি!” মাখনের কথায় চমকে উঠল তারিণী।
“কী বলছ তুমি?”
“আমি যে কল্যাণীর কাছে তাই শুনলুম। নলিনী কাকাবাবু বলেন বটে, কিন্তু তিনজন একই দিনে দেহ রাকেননি।”
“তবে?”
“ওই কার্মি মেয়েটা যবে মারা গেল, তার কিচুদিন পর ওর বর, সেই সর্দারও মারা যায়। খুন হয়। সর্দার মারা যাবার আগে থেকেই নাকি কাকাবাবু কেমনধারা হয়ে পড়েন। মাজে মাজেই কপাল চাপড়াতেন। বলতেন সর্দারের অভিশাপ ফলবেই। ঘরে তুকতাক, ওঝা, ঝাড়ফুঁক শুরু করেন। এই সবে ইন্ধন দিত এক নেপালি মেয়ে। এক বছর তিন মাসের মাথায় যেদিন কল্যাণীর মায়ের শূলের বেদনা উটল, কাকাবাবু নাকি বারবার বলচিলেন এমনটা হবারই কতা। তিনি নাকি ডাক্তার দেকাতেও চাননি। শেষে যকন ডাক্তার এল, আর কিচু করার নেই।”
“এ কী বলছ তুমি? এক বছর নয় তবে? আরও তিন মাস পরে?”
“কল্যাণী সেদিন কাঁদতে কাঁদতে তাই বলচিল কি না। তার হবু বর নাকি চোর। আর এসব হয়েছে তার বাপের পাপের ফলে।”
“কী পাপ?”
“অতশত জানিনে। আমি জিজ্ঞেস করিনি। কল্যাণীও বলেনি। যা শুনেচি, আপনাকে বললুম।”
“সেই নেপালি মেয়ের কী হল?”
“কল্যাণী তার মা চলে যাবার পরেই ওকে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করেছে।”
“আর ডাক্তার হান্টারের স্ত্রী?”
“কল্যাণীর না মারা যাবার সাত মাস পরে মারা যান। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে নিচে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেচিলেন। সেই জ্ঞান আর কেরেনি। তিনদিন বাদে সব শেষ।”
তারিণীর মাথা দ্রুত হিসেব করে চলছিল। কার্মি মেয়েটা মারা যাবার কিছুদিন বাদেই সর্দার মারা যায়। মেয়েটা মরার এক বছর তিন মাসের মাথায় নলিনীর স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। ডাক্তারের বউ দুর্ঘটনায় মরে এক বছর দশ মাসের মাথায়। কিন্তু নলিনী সবাইকে বলে বেড়ান একই দিনে পরপর দুই বছরে দুজন মারা গেছে। কেন? ওফেলিয়াও কি তবে… যেন তারিণীর মনের কথা বুঝতে পেরেই নাগন বলল, “এই যে মেমসাহেব মারা গেলেন, তাও কিন্তু সেই তারিকে না। এক নান বাদে। এদিকে আমি পষ্ট শুনেচি, কাকাবাবু ঘরে শুনিয়ে শুনিয়ে বলচেন তিনটেই নাকি একই দিনে হয়েচে। সেই অভিশাপের ফলে।”
“কল্যাণী তার বাপকে কিছু বলে না কেন?”
“ভয় পায় যে! যমের মতো! বলবে সে সাধ্যি কোতায়? আর কাকাবাবুও যে কেন এমন করেন…”
“মিথ মেকিং!” তারিণী বলে উঠল।
“কী বললেন? কিছু বুজতে পারলুম না।”
“দারোগা প্রিয়নাথবাবু আমায় শিখিয়েছিলেন। এর মানে কোনও পাপ কিংবা মিথ্যাকে চাপা দিতে অনেকসময় একজন বা একের বেশি মানুষ আরও একটা মিথ্যাকে ক্রমাগত সত্যি বলে চালিয়ে যায়। শুনতে শুনতে একসময় সবাই সেই মিথ্যেটাকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে। এমনকী যে মানুষ মিথ্যেটা ছড়াচ্ছে, সেও। কিন্তু একটাই প্রশ্ন, এখানে কোন পাপকে চাপা দিতে চাইছেন নলিনীবাবু ?”
মাখনের দুই কাঁধ ধরে চোখে চোখ রেখে খুব নরম গলায় তারিণী বললে, “মাখন, আমায় মাপ করো। আমি তোমায় অবলা মেয়েমানুষ ভেবে ভুল করেছি। যে জট আমি শত চেষ্টাতেও খুলতে পারতাম না, তা তুমি অনায়াসে সহজ করে দিলে। যে ভয়ানক কুয়াশা চারদিকে ঘিরে আমায় আচ্ছন্ন করেছিল, তা প্রায় গোটাটাই দূর হয়ে গেছে। এখন শুধু একটাই কাজ করতে হবে তোমাকে।
“কী কাজ?”
“যেমন করেই হোক, দুটো খবর কল্যাণীর থেকে জোগাড় করতে হবে। এক ভট্টবাবুর সঙ্গে কল্যাণীর বিয়ে কবে থেকে ঠিক হয়ে আছে। আর দুই, যে নেপালিটি নলিনীবাবুকে তুকতাকে উৎসাহ দিত, তার নাম আর বর্তমান ঠিকানা। যদি জানা থাকে। তবে খুব সাবধান। এমনভাবে জানতে হবে যাতে কল্যাণীর মনে কোনও সন্দেহ না হয়। কী? পারবে তো?”
“চেষ্টা করব।”
“এই না হলে আমার ওয়াটসন!” আনন্দে তালি দিয়ে উঠল তারিণী। পাশে ঘুরঘুর করা দুটো পায়রা ভয় পেয়ে উড়ে গেল তাতে। মাখন কিছু বলল না, কিছু বুঝল না। শুধু একটু ফিক করে হাসল।
