১. ভোজবাজি
আচমকা গলার স্বর বদলে গেল গণপতির…
“এবার আপনাদের যে খেলা দেখাব, তা মঞ্চে খুব কমই দেখাই। জাদুজগতে এই খেলাকে সবাই অভিশপ্ত ভোজবাজি বলে। এই খেলা আজ অবধি কতজনার প্রাণ নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তবু শ্রী শ্রী পোড়ামাতার নাম স্মরণ করে এ খেলা আপনাদের দেখাব আমি। দয়া করে গোটা অ্যাক্টো চলার সময় আমার অনুমতি ছাড়া কেউ টু শব্দটি করবেন না। তাহলে সব গোলমাল হয়ে যাবে।”
মঞ্চের নিচের ফুটলাইট তখন প্রায় নিভু নিভু। আলো বলতে দুইদিকে ঝোলানো খান আষ্টেক হ্যাজাক লন্ঠন। তাদেরও ফিলামেন্ট ফুরিয়ে এল বলে।
পুজো শেষ হতে না হতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পশ্চিমের এই জেলা শহরটাতে শিরশিরে ঠান্ডা পড়ে যায়। বিকেল ফুরোতেই সূর্য দ্রুত ঢলতে থাকে টিলার আড়ালে। সন্ধ্যা নামে গোলাপি পাথরের তেওর, দুধিয়া, বলমিয়ার অদ্ভুত গম্বুজাকার পাহাড়ের খাঁজে। শীতঘুমে ঢলে পড়ার আগে শুকিয়ে যেতে থাকে পাহাড়ি নদী। তার মোরামের বাঁকের ধারে জমা হয় আদিম ডায়নোসরের ডিমের মতো বোল্ডার। ধুলোয় ঢাকা লাল কাঁকর বিছানো পথে, ছাগল চড়ানো উলঙ্গ শিশুদের পায়ের ছাপে শেষ হয় আরও একটা দিন। তারপরেই নামে সেই হিম ঠান্ডা। কানের লতিতে প্রথম চিনচিনানি। দূরের শালবন থেকে কুয়াশা মাখা যে হাওয়া আচমকা এসে কাঁপুনি ধরিয়ে যায়, সেও এবার অন্যবারের চেয়ে আগেই এসে গেছে। সবাই বলছে এবার শীত নাকি বড়ো দীর্ঘ হবে। দীর্ঘ আর বিষণ্ণ।
ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে এখানে যাতায়াতের জন্য সরাসরি কোনও ট্রেনলাইন নেই। হাওড়া থেকে রানিগঞ্জ অবধি রেলপথে এসে ইনল্যান্ড কোম্পানির স্পেশাল ডাকগাড়ি চেপে নদী পেরিয়ে হাজারিবাগের বন। সেখান থেকে পালকি চেপে গহিন অরণ্যে ঢাকা ছোটোনাগপুরের এই শহর তামাটুলি। মাঝে মাইল মাইল জঙ্গল পেরিয়ে ওপারে নাকি আরও একখানা রেলগাড়ির ইস্টিশান আছে। জিরনিয়া। রামচরিতমানসে এরই নাম জীর্ণারণ্য।
তামাটুলিতে বড়ো বাড়ি বলতে গোপীনাথ চৌধুরীর জমিদারবাড়িখানা। বিরাট মাঠের মাঝে চুন সুরকি দিয়ে গাঁথা দোতলা বাড়িটা মাথা উঁচিয়ে রয়েছে। পাশেই বিরাট চণ্ডীমণ্ডপ আর আটচালা ঘর। তামাটুলির একমাত্র দুর্গাপুজোটা এই বাড়িতেই হয়। সারাদিনে প্রায় দুশো লোকের পাত পড়ে পাঁচদিন ধরে। কোমরে ঘুনসি বাঁধা কঙ্কালসার ল্যাংটো ছেলে, রুগ্ন বুড়ো থেকে পাশের গির্জের পাদরি সাহেব, পাঠশালার ছাত্ররা আর হাসপাতালের সাহেব-মেমসাহেবদের সবার ঠাইদাঁড়াও কদিন এই বাড়িতে।
প্রতিবার দশমীর পর ঝিরনি নদীতে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে গেলে গোটা তামাটুলিতে এক অনস্ত বিষণ্ণতা নেমে আসে। আলকাতরা মাখা ঝুপড়ি দোকান, ধোঁয়ার কুণ্ডলীঘেরা উনুন আর কাকভোরে পাতায় মোড়া মাঠা তোলা মাখনে আড়মোড়া ভাঙে তামাটুলির জনপদ। শীত পড়তে না পড়তে শহুরে কিছু চেঞ্জার বাবুরা এসে এই উষ্ণ চুলা ঘিরে হাত সেঁকবে, বনমুরগির দরদাম করবে আর দেহাতের হাটে দোকানে গিয়ে হাঁকবে”ড্যাম চিপ! ড্যাম চিপ!” স্থানীয় লোকমুখে এরাই ড্যাঞ্চিবাবু।
এবার অবশ্য পুজো শেষ হবার পরেও উৎসাহে ভাটা তো পড়েইনি, বরং বেড়েছে। গোপীনাথ চৌধুরীর এই পুজো এবার পঁচিশ বছরে পা দিল। শুরুতে ঠিক ছিল, পুজোর মাঝেই সার্কাসের খেলা হবে। কিন্তু গ্রেট বেঙ্গল কিংবা ইম্পেরিয়াল সার্কাসের কেউই দুনো পয়সাতেও এত দূরে আসতে রাজি নয়। শেষে নায়েব নিবারণ দত্তই উপায় বাতলালেন। বোসের সার্কাসের সবচেয়ে নামজাদা জাদুকর গণপতি চক্রবর্তী নাকি ছোটোখাটো শো-তে নিজেই তাঁবু খাটিয়ে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। সঙ্গে সার্কাসের জনাকয়েক সঙ্গী আর এক মহিলা শিল্পী হিঙ্গনবালা। যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই তাঁর জয়জয়কার। তাঁবু লোকে লোকারণ্য।
গোপীনাথ একপ্রকার নিরুপায় হয়েই এই ম্যাজিক শো-র জন্য কলকাতার তাঁর ভাইপো প্রবীরেন্দ্রর শরণাপন্ন হলেন। প্রবীরেন্দ্র ফিরতি চিঠিতে জানায়, সে কলকাতার উইজার্ড ক্লাবের নতুন প্রেসিডেন্ট নারায়ণ মান্নার সঙ্গে কথা বলেছে। নারায়ণবাবু জানিয়েছেন ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে গণপতির দলের যাতায়াতের রাহা খরচ আর থাকা খাওয়া বাদেও নগদ দেড়শোটি টাকা গণপতিকে বুঝিয়ে দিতে হবে। গোপীনাথ তাতেই রাজি।
সপ্তমীর দিন সন্ধের আগেই গোটা ছয়েক গোরুর গাড়িতে লটবহর চাপিয়ে গণপতির দলবল হাজির। হঠাৎ গণপতিকে দেখলে জাদুকর মনে হওয়া অসম্ভব। গায়ে ময়লা শতচ্ছিন্ন একটা ফতুয়া, হেঁটো ধুতি, মাথার চুল একেবারে ছোটো ছোটো কদমছাঁট করে ছাঁটা, পিছনে আবার ছোটো একটি টিকি। কিন্তু জ্বলজ্বলে চোখদুটো দেখলেই বোঝা যায়, এ বড়ো সাধারণ মানুষ নয়। আর হাসিটি মায়াভরা। বড্ড সরল।
দেখতে না দেখতে গোটা তামাটুলি জুড়ে গণপতির আগমন সংবাদ ছড়িয়ে গেল। আশেপাশের লবটুলিয়া, শিমলাতলা, ধাঙড়হাটে যত ভদ্রঘরের বাস, তারা প্রায় সবাই গোপীনাথের কাছে আর্জি পেশ করলে এই ভোজবাজি দেখার। সেবার বরং এই জাদুখেলার উত্তেজনায় পুজোর আসল আনন্দে খানিক ভাটা পড়ল। নবমীর বলিতে ছাগলের রক্ত মেখে যে উদ্দাম নাচানাচিটা হয়, সেটিও তেমন সরেস হল না। গণপতি পশুহত্যার বিরোধী। সে পুজো থেকে দূরে নিজের তাঁবুতেই প্রায় সারাদিন কাটাল। হিঙ্গনবালা সার্কাসের মেয়ে হলেও খুব একটা লোকসমাজে আসে না। তাকে দেখতে কিছু ছেলেছোকরা উঁকিঝুকি মারলেও বিশেষ সফল হল না।
দেবীর ভাসান শেষ হতে তাঁবুর চারদিকে গ্যাসবাতি জ্বলে উঠল। দুম দুম শব্দে একটা ধামসা বাজাচ্ছে কেউ। গোটা তামাটুলি এবার আর বিসর্জনের শোকের সময়টুকুও পায়নি। সবাই সাগ্রহে অপেক্ষা করছে আগামী কাল কখন জাদুর খেলা শুরু হবে। পরদিন সকাল থেকেই ঘোড়ার গাড়ি, গোরুর গাড়ি চেপে, পায়ে হেঁটে দলে দলে মানুষ আসতে লাগল শহরে। অলস ঘুমিয়ে থাকা গঞ্জ জেগে উঠল রাতারাতি। জমিদারবাড়ির সামনের মাঠে বিরাট ম্যারাপ) বেঁধে লুচি, আলুনি কুমড়োর ছক্কা আর মেঠাই খেয়ে ধন্য ধন্য করলে সবাই। সূর্য ডুবতেই সকলে এসে জমা হল গণপতির তাঁবুতে। দুইপাশে মাটিতে বসার ব্যবস্থা। ছেলেমেয়ে আলাদা আলাদা। মাঝে শুধু কয়েক সার চেয়ার পাতা সায়েবসুবো আর জমিদারের খাস মেহমানদের জন্য। একেবারে মাঝের চেয়ারটি লাল মখমলে মোড়া। কাঠের হাতলে সিংহের মুখ খোদাই। সবাই জানে এ চেয়ার কার। কিছুদিন আগেই সরকার বাহাদুর লবটুলিয়া, নাঢ়া বইহার, জিরনিয়া, তামাটুলি আর পাঙড়হাট রেঞ্জ নিয়ে তামাটুলিতে নতুন জেলা সদর অফিস খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে দিন দু-এক হল নতুন সুপারিন্টেনডেন্ট রিচার্ড টেলর সাহেব দায়িত্ব নিয়েছেন। পুজোতে আসেননি। জাহাজযাত্রা করে শরীর নাকি বিশেষ সুবিধের নেই। আজ আসবেন। কথা দিয়েছেন।
ঘড়িতে যখন সাড়ে ছটা বাজল, তখনও সুপারিন্টেনডেন্টের আসার কোনও লক্ষণ নেই। তবে কি শরীর খুব বেশি খারাপ করল? গোপীনাথ বারবার তাঁর কুক কেলভির ট্যাঁকঘড়িটা বার করে দেখছিলেন। লোকজন অশান্ত হয়ে উঠছে। এখনই শুরু না করলে অনর্থ বাধবে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন বারকয়েক। তাঁর দুই লেঠেল গোবিন্দ কিংবা ধনুয়া—কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। তারাও বুঝি খেলা দেখার আনন্দে এই ভিড়ের কোথাও মিশে গেছে। অগত্যা মাথা নেড়ে নায়েবমশাইকে শুরু করতে বললেন তিনি।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝমঝমিয়ে বেজে উঠল ব্যাঞ্জো, ফুলুট, হারমোনিয়াম আর খোল। দুই ধাপ সিঁড়ি বেয়ে বিরাট এক রঙিন বল হাতে মঞ্চে উঠল হিঙ্গনবালা। তাকে দেখেই উপস্থিত পুরুষ মহিলাদের মধ্যে একটা অলীক ফিসফিসে হাওয়া বয়ে গেল। তামাটুলিতে আগে কেউ কোনও দিন টাইটস পরা মহিলা দেখেনি। এখানে সার্কাস আসে না। ফলে দেখার সুযোগও নেই। কিন্তু হিঙ্গন কোনও দিকে না তাকিয়ে একলাফে বলের উপরে উঠে দাঁড়াল। ‘গেল গেল’ রব উঠল দর্শকদের মধ্যে। মহিলারা অনেকে চোখে আঁচল চাঁপা দিলে। হিঙ্গন মুখে স্মিত হাসি নিয়ে স্টেজের এদিক থেকে ওদিক নিশ্চিন্তে বলের উপরে হেঁটে চলে। তারপর আচমকা ভল্ট খেয়ে লাফ মারে শূন্যে আর নিখুঁত হিসেবে এসে ল্যান্ড করে ঠিক বলের উপরে। সবাই তালি দিয়ে ওঠে। এরপর ঠিক উলটো খেলা। হিঙ্গন মাথায় বল নিয়ে নানা কসরত দেখাতে থাকে আর সেই বলও যেন তার দেহের সঙ্গে আঠা দিয়ে আটকানো। কিছুতেই মাটিতে পড়ে না। গোপীনাথ জানেন, এই সবই নেহাত দর্শকদের গা গরম করানোর কৌশল। আসল খেলা এর পরেই শুরু হবে। কিন্তু সুপারিন্টেনডেন্ট সাহেব এলেন না কেন? বাড়াবাড়ি কিছু হল? নাকি অজান্তেই গোপীনাথ সাহেবকে চটিয়ে দিয়েছেন?
দর্শকদের সমবেত ক্ল্যাপের মধ্যে হিঙ্গনের খেলা শেষ। সবাইকে মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করে বল হাতে সে নামতেই আবার জোরে বেজে উঠল ব্যাঞ্জো। কিন্তু এ কী! গলায় হারমোনিয়াম নিয়ে এ কেমন বেশে মঞ্চে এল জাদুকর গণপতি? তার পরনের ফতুয়া ছেঁড়া, ভালি মারা। ধুতির একদিক গুটিয়ে হাঁটুর কাছে ওঠানো, অন্যদিক মাটিতে লুটাচ্ছে। চোখে রঙিন চশমা, যার একটা পরকলা নেই। সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে, মাথা নেড়ে নেড়ে, মজাদার মুখভঙ্গি আর অঙ্গভঙ্গি করে গণগতি গাইতে লাগল–
মানুষ চলে কলের বলে।
পঞ্চভূত, বড়োই মজবুত, ঘেরেছে সহস্র দলে।
(ওরে ভাই)
এই দেহ-মেশিন, ইহা ভাই বড়োই প্রবীণ,
ইংরাজ চিন ফ্রেঞ্চ মার্কিন, সবাই হার মানিলে;
মরি কি শিল্পবিদ্যা,
করেছেন মহাবিদ্যা, যোগারাধ্যে পায় না বুদ্ধে,
অসাধ্য হয় ভাবতে গেলে।
.
এক-একবার গান করে আর ঘুরে ঘুরে পাক খায়। সবাই হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। পাক খেতেই তার চেহারায় অল্প অল্প বদল চোখে পড়ে। ফতুয়ার বদলে জামা আসে, ধুতির বদলে প্যান্ট। শেষে জোরে জোরে লাটুর মতো পাক খেয়ে যখন স্টেজের মাঝে এসে দাঁড়াল, তখন তার চশমায় পরকলা জুড়ে গেছে, পরনে কালো কোট আর তা থেকে ঝুলছে অসংখ্য মেডেল। হারমোনিয়াম রেখে সেই মেডেল ঝমঝমিয়ে গণপতি শুরু করল নাচ। ব্যাঞ্জোতে বাজতে লাগল ‘হি ইজ এ জলি গুড ফেলো’। নাচতে নাচতেই গণপতি কোটের পকেট থেকে দুটো গিঁটবাঁধা রুমাল বার করলে। একটার নাম পিকলু আর অন্যটার নাম মণি। মঞ্চে ছেড়ে দিতেই সে দুটো রুমালও গণপতির সঙ্গে হেলেদুলে তিড়িংবিড়িং নাচতে লাগল। তামাটুলিতে কেউ এমন জাদুখেলার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। হাতে তালি দিতে দিতে চেটো লাল হয়ে যাচ্ছে, তবু থামা যাচ্ছে না।
নাচ শেষ হতেই গণপতি একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু করে দিল। তাসের পর তাস উড়ে যেতে লাগল ফোয়ারার মতো। গণপতিকে থলেতে বেঁধে বাক্সে পোৱা হল। সেই বাক্সে তালা বন্ধ করে পিছনে ফিরতে না ফিরতেই বন্ধন কাটিয়ে গণপতি হাজির। তার পরের খেলাটি আরও এককাঠি সরেস। সিংহের খোলস পরে হিঙ্গনবালা সিংহ সাজল আর শিকারির পোশাক পরে গণপতি শিকারি। এবার এক গাছের গুঁড়ির চারদিকে ঘুরে ঘুরে সেই সিংহকে তাড়া করতে লাগল শিকারি। খানিক বাদে ধরতে না পেরে হতাশ হয়ে যখন পোশাক ছেড়ে ফেলল, সবাই অবাক হয়ে দেখতে পেল সিংহের পোশাকে চলে গেছে গণপতি আর শিক্ষারি হিঙ্গনবালা। এ খেলা দেখে স্বয়ং গোপীনাথ হাঁ। মনে মনে ঠিক করলেন, নগদ টাকাটা বাড়িয়ে দুশো করবেন আর সঙ্গে একটা মেডেল।
আর তারপরেই গণপতি সেই অভিশপ্ত ম্যাজিকের কথা তুলল।
“আমার গুরু বলে গেছেন সঠিক আধার না থাকলে এই খেলা না দেখাতে। তাই হেঁজিপেঁজি জায়গায় এ বিদ্যা আমি দেখাই না। জমিদারবাবুকে আমাদের দলের সবারই ভারি পছন্দ হয়েছে। তাঁর যত্নআত্তির তুলনা নেই। রামুকে আমি আজকাল আর মঞ্চে ডাকি না। কিন্তু রামু আজ নিজেই মঞ্চে আসতে চাইছে। এখন যদি জমিদারমশাইয়ের অনুমতি পাই…”
“কে রামু? ডাকো তাকে!” একগাল হেসে বলে উঠলেন গোপীনাথ।”
আজ্ঞে সে আমার পোষা ভূত। আমার সঙ্গেই খেলা দেখায়।”
.
এক লহমায় গোটা তাঁবুকে কে যেন স্তম্ভন মন্ত্রে স্তব্ধ করে দিল। দর্শকদের বেশিরভাগই পশ্চিমা বাঙালি। সাহেবরা কিংবা যারা বাংলা বোঝে না, তারাও ফিসফিসিয়ে পাশের জনের থেকে জেনে চুপ করে বসে রইল। গণপতির নির্দেশে তার এক সহকারী এসে ফুটলাইটগুলো বন্ধ করে দিল একে একে। হ্যাজাক লন্ঠনের একপাশ ঢেকে দেওয়া হল কালো কাপড় দিয়ে। গোটা তাঁবু জুড়ে আলো আবছায়ার অদ্ভুত এক পরিবেশ। অজানা ভয়ে গোপীনাথ একটু কেঁপে উঠলেন যেন। গণপতি আবার সবাইকে সাবধান করল, “খবরদার! আমি না জিজ্ঞেস করলে কেউ কোনও কথা বলবেন না কিন্তু।” আর তারপরেই বিচিত্র গলায় হেঁকে উঠল, “রামু…”
সবাই দমবন্ধ করে অনাগত উত্তরের অপেক্ষায়। কেউ কোনও কথা বলছে না। কোথা থেকে এক শিশু ডুকরে কেঁদে উঠতে যেতেই তার মুখ চেপে ধরেছে তার মা।
গণপতি আবার ডাকল, “রামু এসেছ?”
যেন বহুদূর থেকে আওয়াজ এল, “আসছি…
“তাড়াতাড়ি এসো! জমিদারমশাই যে অস্থির হয়ে পড়ছেন!”
এবার আওয়াজ আরও কাছে, “এই এলাম বলে…”
“এখুনি এসো বলছি!”
সবাইকে চমকে দিয়ে তাঁবুর ঠিক উপর থেকে কে যেন হুংকার দিল, “এসে গেছি!” তারপরেই ধুপ করে একটা শব্দ। অশরীরী কে যেন উপর থেকে মঞ্চে লাফিয়ে পড়ল। চারিদিকে এক অদ্ভুত পরিবেশ। গা ছমছম ভাব। একটা চিমসে গন্ধে ভরে উঠেছে চারদিক।
“তুমি বসবে কোথায়?”
গোপীনাথের ঠিক পাশ থেকে উত্তর এল, “জমিদার মহানুভব। নিজের পাশের মখমলে মোড়া কেদারাখানি আমার বসার জন্য রেখেছেন। ওখানেই বসেছি।”
গোপীনাথ চৌধুরী এককাত হয়ে পাশের চেয়ারের সংস্রব থেকে যতদুর পারা যায় সরে বসলেন। তাঁর সত্যিই মনে হতে লাগল, শীতল এক বাতাস যেন দেহ ধারণ করে এসে বসেছে সেখানে।
“কারও কিছু প্রশ্ন থাকলে নির্ভয়ে রামুকে করতে পারেন”, বলল গণগতি।
কিন্তু কে প্রশ্ন করবে? স্বয়ং জমিদারবাবুরই ভয়ে হাত পা ভিতরে সেঁধিয়ে গেছে। শেষে গণপতিই বললে, “রামু, তুমি খেলা দেখাবে?”
“দেখাব।”
“কীসের খেলা?”
“গুলি ধরার খেলা।
“না না। ওসব ছাড়ো। অন্য কোনও খেলা দেখাও।”
“আমি গুলির খেলাই দেখাব। নইলে যাব না।”
জমিদারবাবু একদৃষ্টিতে গণপতির ঠোঁটের দিকে তাকিয়েছিলেন। রামু কথা বলার সময় তার ঠোঁট কিন্তু নড়ছে না।
“আর যদি সে খেলা দেখাতে না দিই?”
“তবে অনর্থ বাধাব!” বলতে না বলতে সবার চোখের সামনে মঞ্চের উপরের একটা টুল প্রায় দুই হাত শূন্যে উঠে গেল। তারপর সেখানেই খানিক নড়াচড়া করে সোজা মঞ্চে আছড়ে পড়ল টুকরো টুকরো হয়ে।
জমিদারমশাই শুকনো গলায় বললেন, “ও যা করতে চায় করতে দিন। তারপর ওকে যেতে বলুন।”
“যে আজ্ঞে জমিদারবাবু। তবে এই খেলা রামু একা দেখাতে পারে না। ও অশরীরী কিনা, তাই প্রথমেই ওর একটা জীবন্ত শরীর লাগবে, যার উপরে ভর করে ও এই খেলা দেখাবে। মঞ্চে ডেকে নিচ্ছি আমার সহকারী ভূপেন ওরফে নন্তুকে।”
দুই হাত তুলে হেঁটো ধুতি আর ফতুয়া পরা যে ছেলেটি ঢুকল, তাকে কিছু আগেই দর্শকরা ফুটলাইট নেভাতে দেখেছে। বয়সে যুবক, কিন্তু মুখে এখনও কিশোরের লালিত্য আছে।
গণপতি তাকে মঞ্চের ঠিক মাঝখানে ডেকে বলল, “নন্তু, তুমি মিডিয়াম হতে রাজি? জানো তো, এতে তোমার ঘোর বিপদও ঘটতে পারে? এমনকী জীবনসংশয়ও?”
নন্তু বেশ জোরেই জানাল, সে রাজি।
খুব ধীরে আবার মঞ্চের পিছন থেকে সেই দ্রিম দ্রিম আওয়াজটা শুরু হল। তাঁবুর সব দর্শকের হৃৎস্পন্দনের মতো।
এবার গণপতির নির্দেশে হিঙ্গন মঞ্চে নিয়ে এল চুরুটের বাক্সের মতো লম্বাটে একখানা কাঠের বাক্স। সেখান থেকে বেরোল হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা লম্বামুখ এক পিস্তল। গণপতি নিজে মঞ্চ থেকে নেমে এসে সামনের সারির সবাইকে সেই বন্দুক পরীক্ষা করে দেখতে বলল। জমিদার মশাই থেকে সায়েবসুবোরা সবাই নানাভাবে পরীক্ষা করে জানালেন, বন্দুক নিখুঁত।
“এবার আসল কাজ। রামু ভর করবে নস্তুর দেহে। আর তারপর নম্বর দেহকে অবলম্বন করে রামু অসাধ্যসাধন করতে পারবে। ছুটন্ত গুলি, উড়ন্ত বুলেট কামড়ে ধরে ফেলবে দুই দাঁতের ফাঁকে। আমি এবার রামুকে ডাকছি।”
গণপতির গলায় অদ্ভুত মন্ত্র। সে সাপের মতো দুই হাত নাড়াচ্ছে নন্তুর চোখের সামনে আর ক্রমাগত বিড়বিড় করে কী যেন বলে চলেছে। নস্তুর চোখ ঢুলে পড়েছে। মনে হচ্ছে আর দাঁড়াতে পারবে না। টলছে। যেন এখুনি পড়ে যাবে। আর তারপরই স্প্রিং লাগা পুতুলের মতো একেবারে সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল নক্ত। চোখ খোলা। পলক পড়ছে না।
“কে তুমি?”
অদ্ভুত চেরা চেরা গলায় নন্তু উত্তর দিল, “আমি রামু।”
“বন্দুকের খেলা দেখাতে পারবে? উড়ন্ত বুলেট ধরতে পারবে?”
“পারব।”
“কে তোমায় গুলি ছুড়বে? তার নাম বলো।”
খানিক চুপ থেকে ধীরে ধীরে কেটে কেটে উচ্চারণ করল নন্তু, “আর-থার-স্মিথ। আর-থার-স্মিথ। আর-থার-স্মিথ।”
আবার সবার চমকে ওঠার পালা। প্রৌঢ় স্মিথ সাহেব এখানকার নামজাদা শিকারি। রামু তাঁকে চিনল কীভাবে?
সাহেব অবশ্য এসব ব্যাপারে বেশ স্পোর্টিং। সামনের সারিতেই বসেছিলেন তিনি। জমিদারবাবুর হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে সোজা উঠে গেলেন মঞ্চে।
“হোয়াট শুড আই ডু বাবু?”
ভাঙা ইংরাজি আর বাংলা মিশিয়ে গণপতি সাহেবকে এই বুলেট ধরার খেলা বুঝিয়ে দিলে। নস্তুকে লক্ষ্য করে সাহেব গুলি ছুড়বেন। ভালো হয় যদি মুখ তাগ করে ছোড়েন। ভয় নেই। রামু আছে। সে এই বুলেট কামড়ে ধরে ফেলবে।
“আর ইউ শিয়োর? ইজ ইট সেফ এনাফ?”
“হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যার। প্লিজ শুট স্যার।”
নন্তু একইভাবে স্থির দাঁড়িয়ে। সাহেব একটু ইতস্তত করে বন্দুক তাগ করলেন তার দিকে।
ড্রামের শব্দ এবার চরমে উঠেছে।
সাহেবের হাত ট্রিগারে। আচমকা ড্রামের আওয়াজ থেমে গেল।
ঠিক এই সময় গণপতি দেখল, নস্তুর চোয়ালটা নড়ে উঠল যেন। আর তারপরেই তার চোখে যে আতঙ্ক দেখতে পেল এমনটা সে আগে কোনও দিন দেখেনি। নস্তু চিৎকার করে কিছু বলতে যাবে বলে মুখ খুলতেই কানফাটানো আওয়াজে গর্জন করে উঠল পিস্তল।
কেঁপে উঠে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল নন্তু, বিনা মেঘে বজ্রাহতের মতো তারপর মঞ্চে লুটিয়ে পড়ল।
গণপতি দেখতে পেল নন্তুর কপাল ভেদ করে বেরিয়ে গেছে গুলি। একটা রক্তের ধারা চুঁইয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে গালের চারপাশ।
শুরুতে কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারেনি।
প্রথম চিৎকারটা ভেসে এল মেয়েদের বসার জায়গা থেকে।
তারপর গণপতির আর কিচ্ছু মনে নেই।
.
