১৩. নেসেখ

১৩. নেসেখ

হোমের এই অংশটা যে নতুন তৈরি হয়েছে, তা দেখলেই বোঝা যায়। চুন সুরকি আর ছোটো ছোটো ইটের মজবুত গাঁথুনি। ফলে চার্চের পিছন দিক থেকে লম্বা ‘টি’ অক্ষরের মতো উইং বেরিয়ে পিছনের জঙ্গল অবধি চলে গেছে। হোমের দালানে ঢুকতেই একখানি গথিক আর্চ। তার উপরে বড়ো বড়ো করে লেখা, “সেন্ট ক্যাথরিন হোম ফর নেটিভ উইমেন”। এখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কারও সঙ্গে দেখা করতে হলে পাশে অফিস ঘরে জানাতে হয়। একটা ভিজিটিং রুম আছে। কথাবার্তা সেখানেই চলে।

গোমড়ামুখো মেট্রন এসে জানাল, মাদাম এলা এখন হোমে নেই। তিনি হোম ছেড়ে একটু দূরে ওঁর একটা মেডিটেশন হাউসে গিয়ে রয়েছেন। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। আদৌ দেখা করবেন কি না সন্দেহ। কাউকে পাঠিয়ে একবার খোঁজ নিতে হবে। অগত্যা হার্পার মেট্রনের হাতে একটা চিরকুটে নিজেদের নামধাম আর দেখা করার কারণ লিখে পাঠালেন। খানিক বাদে একটি সাঁওতাল মেয়ে এসে মেট্রনের কানে কানে কী যেন বলল। মেট্রন ঘাড় নেড়ে বললেন, “তবে আর কী, যান আপনারা। মাদাম রাজি হয়েছেন। কিন্তু এঁকে বেশি প্রশ্ন করে জ্বালাতন করবেন না যেন।”

হোম থেকে হাঁটাপথে একটা মাঠ পেরিয়ে ছোট্ট একটা কাঠের বাড়ি। দেখেই বোঝা যায় খুব বেশিদিন তৈরি হয়নি। সামনে একফালি বাগিচায় নানারকম মরশুমি ফুল ফুটেছে। দুইধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে বারান্দা। আধখোলা দরজার পাল্লায় ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি। দরজায় টোকা দিতেই ভিতর থেকে ‘কাম ইন’ ভেসে এল। তারিণী জুতো খুলে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল। প্রিয়নাথ মাথা নেড়ে মানা করলেন। সাহেবদের এসব চলে না।

ঘরের ভিতরে আসবাব প্রায় কিছু নেই বললেই চলে। বসার ঘরের মাটিতে একটা মোটা তোশক পাতা। সামনে একটা বড়ো পাত্র আর তিনখানি গেলাস। হালকা একটা ফুলের সুবাস ভেসে আসছে। কোন ফুল বুঝতে পারল না তারিণী। দেওয়ালে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা লাস্ট সাপারের একখানি অদ্ভুত ভালো কপি আর একপাশে ছোটো একটা কাঠের আলমারি। এত কম আসবাবে এই নিরাভরণ ঘরটিকে যেন বিশাল দেখাচ্ছে।

ঘরের অন্য প্রান্তে কুচকুচে কালো লেসের পোশাক পরে বজ্রাসনে বসে আছেন মাদাম এলা। হাতদুটি ঊরুর উপরে পাতা। কালো পোশাকের মধ্যে ধবধবে গোলাপি হাতখানি পদ্মফুলের কোরকের মতো লাগছে। কালো লেসের ঘন জাল চোখ বাদে গোটা মুখটাকে আড়াল করে প্রায় বুক অবধি ঝোলা।

“আমায় ক্ষমা করবেন। আসলে সেদিনের দুর্ঘটনায় মুখের বেশ কিছুটা পুড়ে গেছে। তাই এই মুহূর্তে আমার পোড়া মুখ আপনাদের দেখাতে পারছি না। বুধনী আমার খুব কাছের ছিল। জানি আপনারা ওকে কী চোখে দেখেন। কিন্তু ও যে পথে গেছিল, পেটের দায়ে গেছিল। শোকের এই কালো পোশাক বুধনীর জন্যেই।”

খানিকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না।

শুরু করলেন হার্পারই। তিনি বাকি দুজনের পরিচয় দিয়ে বললেন, “এঁরা আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চান। অবশ্য যদি আপনার আপত্তি না থাকে। আসলে পরপর এমন কিছু ঘটনা ঘটল…”

“যা জানার আছে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। যদি আমি কোনও সাহায্য করতে পারি, তবে সত্যিই খুশি হব।”

“আপনার স্বামী, ডাক্তার ওয়ার্ডের সঙ্গে আলাপের সুযোগ ঘটেছিল আমার। তখন অবশ্য আপনাকে চিনতাম না।” প্রিয়নাথ বললেন।

“কতদিন আগে?”

“তাও প্রায় বছর দশেক তো হবেই।”

“তখন আমার সঙ্গে ডাক্তারের আলাপ হয়নি। দশ বছর যদি হয়, তখন উনি সদ্য সদ্য বিপত্নীক হয়েছেন। তার কয়েকদিন পরেই তো আমেরিকায় গেলেন।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। বলছিলেন বটে, এই দেশে আর মন টিকছে না। নিউ ইয়র্কে যাবেন ।”

“ওখানেই আমার সঙ্গে পরিচয়। আমার মায়ের গল্লা হয়েছিল। উনি অনেক চেষ্টা করেছিলেন সারাতে। পারেননি। আমার বাবা আগেই মারা গেছিলেন। মা মারা যাবার পর অনাথ হয়ে যাই। ডাক্তার ওয়ার্ড-ই নিজের অ্যাপোগেকারিতে রেখে আমায় কাজ শেখান।”

“আপনারা আবার এ দেশে ফিরে এলেন কেন?”

“আপনি পল কেলির নাম শুনেছেন?”

“হ্যাঁ। খানিক কানে এসেছে বটে। নিউ ইয়র্কের গ্যাংস্টার। সেখানের অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি।”

“ঠিকই শুনেছেন। তবে ওই লোকের নামে যতই যা শুনুন না কেন, কম হবে। পল কেলির অত্যাচারের সীমা নেই। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের দিয়ে জঘন্য অপরাধ করায়। বারের নামে পতিতালয় চালায়। দোকানিদের থেকে জোর করে টাকা উশুল করে। না দিলে ওর পোষা গুন্ডারা এসে পেটায়। তাতেও না মানলে খুনই করে ফেলে। বুড়ো ডাক্তার ওয়ার্ডের ক্লিনিকের উপর ওদের নজর পড়েছিল। ইচ্ছে ছিল সেটাকেও পতিতালয় বানাবে। একদিন সন্ধ্যাবেলা ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফেরার সময় ডাক্তারকে মেরে প্রায় আধমরা করে দিল। সেদিনই আমরা ঠিক করলাম, আর না। এবার পালাতে হবে। ইংল্যান্ডে যাওয়াই যেত, কিন্তু ওয়ার্ড চাইলেন ইন্ডিয়াতে ফিরতে। হাজার হোক সেখানেই অ্যালিস, মানে ওঁর প্রথম বউয়ের কবর আছে। এ দেশে আসার কিছুদিনের মধ্যেই আমি প্রভু যিশুর শরণ নিয়ে ক্যাথলিক হলাম। তারপরেই কলকাতার ওল্ড মিশন চার্চে আমাদের বিয়ে হল।”

“আগে আপনি ক্যাথলিক ছিলেন না?”

“না। আমার জন্ম নিউ ইয়র্কেই, এক ইহুদি পরিবারে। আমার বিয়ের আগের নাম আরিয়েল্লা ক্যান্টর।”

“আর তামাটুলিতে আসা কীভাবে?”

“এটা তো অনেকেই জানে। প্লেগে ডাক্তার ওয়ার্ড মারা গেলেন। এদিকে এখানের এই হোমটা নাম কা ওয়াস্তে চলছিল। এমনকী অনাথ মেয়েদের নানা পাপ কাজেও ব্যবহার করা হত শুনেছি। চার্চের ফাদার ডাক্তার পিয়ার্সনকে অনুরোধ জানান, চেনা কেউ যদি এর দায়িত্ব নিতে পারেন। পিয়ার্সন আবার আমার স্বামীর বন্ধু ছিলেন। এদিকে কলকাতা আমার কাছেও দমবন্ধ ঠেকছিল। আমিও প্রতিমাকে নিয়ে এখানে চলে আসি। প্রতিমাকে আপনারা চিনবেন। জমিদারবাড়ির ছোটো বউ। আগে আমার সঙ্গে কাজ করত। ভেরি গুড গার্ল।”

“রিচার্ড টেলরের সঙ্গে তো আপনার দেখা হয়েছিল। তিনি ডাক্তারের খোঁজ করায় আপনিই তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কী হয়েছিল তাঁর?”

“ওঁর অনারে জমিদারবাবু একটা পার্টি থ্রো করেন। সেখানেই সামান্য কথা হয়। এই দেশে এসে ওঁর একটু সর্দিগর্মি মতো হয়েছিল। তাই জিজ্ঞেস করছিলেন, কী করা যায়?”

“আপনি কী বললেন?”

“আমি টোটকার কথা বলেছি। বললাম এক পেগ রাম নিয়ে এক চিমটে গোলমরিচ মিশিয়ে খেয়ে দেখতে। অনেকসময় কাজ দেয়।”

হার্পার আর প্রিয়নাথ চোখাচোখি করলেন। আর্থার স্মিথ তবে এর কথাই বলেছিলেন।

“আর কোনও কথা হয়নি?”

“না, আসলে তার আগেই…”

এখানে হার্পার সাহেব তড়বড় করে উঠে বললেন, “এখানে আমার একটা ভুল হয়েছে। আই অ্যাম স্টিল সরি। হাতে গেলাস নিয়ে আমি একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। খেয়ালই করিনি সিস্টার এলা পিছনে আছেন। ঘুরতে গিয়ে হাতের গেলাসের গোটাটাই ওঁর গলাবন্ধ কোটে গিয়ে পড়ে। উনি কোট ছেড়ে ফেলেন। কিন্তু সেই ঠান্ডায় আর বেশিক্ষণ থাকেননি। সরি ম্যাডাম।”

“ইউ শুড নট বি। এ তো দুর্ঘটনা। হতেই পারে।”

“অবশ্য টেলর সাহেব নিজে ম্যাডামের খোঁজ নেন। আমি দেখেছি।”

“কী খোঁজ নিচ্ছিলেন টেলর?” প্রিয়নাথ এলার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।”যেমনটা একজন ভদ্রলোকের করা উচিত। উনি গাড়ি পাঠিয়ে আমায় পৌঁছে দেবেন কি না, অন্য পোশাকের ব্যবস্থা করবেন কি না ইত্যাদি। বড়োজোর মিনিট পাঁচেক। তারপরেই আমি পার্টি ছেড়ে চলে যাই।”

“গণপতির ম্যাজিক শো-তে আপনি গেছিলেন?”

“গেছিলাম। কিন্তু স্টেজে যা হল… জাস্ট হরিবল!”

“কোথায় বসেছিলেন?”

“প্রথমে মঞ্চের ডানদিকে। হোমের বাকি মেয়েদের সঙ্গে। খানিক পরে উলটো দিকে যেখানে প্রতিমারা বসেছিল, ওখানে গিয়ে বসি।”

“বুধনী কীভাবে মরল? আপনার কী ধারণা?”

“এ ক্লিয়ার কেস অফ পয়জনিং। আই থিঙ্ক হাঁড়িয়া বা অন্য কিছু বিষাক্ত হয়ে গেছিল। সেটা থেকেই বিষক্রিয়ায় মৃত্যু।”

“কেউ বিষ দিতে পারে কি?”

“পারে। কিন্তু কেন দেবে? মোটিভ কী? বুধনী সৎচরিত্র ছিল না। কিন্তু সেটার জন্য কেউ কেন ওকে বিষ দেবে?”

“কিন্তু ম্যাডাম, এটা কি জানেন, সেই পার্টির রাতে বুধনীকে পাঠানো হয়েছিল টেলরের ঘরে। তাঁকে সন্তুষ্ট করতে। মে বি, ও এমন কিছু জেনে ফেলেছিল যেটা কারও পক্ষে ক্ষতিকারক।”

“এটা তো আমার জানা ছিল না। কী ভয়ানক!” দুই হাতে কপাল চেখে ধরলেন এলা।

“আচ্ছা, সেদিন আগুনটা কেমন করে লাগল? মনে আছে আপনার?”

“আমার ঘুম খুব পাতলা। ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও জানলা খোলা ছিল। আচমকা মনে হল একটা কাচ ভাঙার শব্দ শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গে জেগে দেখি ঘরে পোড়া কাপড় আর কেরোসিনের গন্ধ। কোনওমতে উঠে দরজার দিকে দৌড়ানোর আগেই দেখতে পেলাম আগুন প্রায় দরজা ছুঁয়ে ফেলেছে। প্রাণ নিয়ে কোনওমতে বেরিয়েছি। কিন্তু বুধনীর দেহের যোগ্য সৎকার করা গেল না। এ আক্ষেপ আমার সারাজীবন থাকবে। প্রভু যিশু আশা করি আমায় ক্ষমা করবেন।”

ঘরের সবাই চুপ। নিস্তব্ধতা ভাঙলেন প্রিয়নাথই, “যাক, আপনাকে আর বিরক্ত করব না। আপনি বিশ্রাম করুন। আমরা উঠি।”

“দরকার হলে আবার আসবেন। তবে আমার ঘরে এই প্রথমবার আপনারা এলেন। আপনাদের সামনের পাত্রে একটা পানীয় আছে। আমি এখন ক্যাথলিক হলেও কিছু কিছু ইহুদি স্বভাব ছাড়তে পারিনি। আমাদের বাড়ি কেউ এলে প্রথমবার এই পানীয় অফার করা হয়। আমরা একে বলি নেসেখ, ত্যাগের তরল। দয়া করে সবাই একটু পান করে নিন।”

বাদামি হলদে অদ্ভুত সেই তরলটি বড্ড বিস্বাদ। তারিণী স্পষ্ট দেখল প্রিয়নাথের প্রায় উলটে বমি আসছে। তিনি কোনওমতে সামলালেন।

.

মাদাম এলাকে বিদায় জানিয়ে ফেরার পথে পকেট থেকে তারিণীর দেওয়া চিরকুট বার করে প্রিয়নাথ বললেন, “এবার জমিদারবাবু আর বিপিন। দুজনকেই জমিদারবাড়িতে পেয়ে যাব। কিন্তু এলার ঘরে তুমি একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলে যে… কী মনে হচ্ছে? কোনও আশা আছে?”

তারিণী জবাব দিল না। মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগল। ভুরু কোঁচকানো।

“কিছু ভাবছ?”

“আচ্ছা হার্পার সাহেব, এলা ম্যাডামের গলায় কি যিশুর ক্রুশ না লকেট? কোনও দিন খেয়াল করেছেন?”

“করব না কেন? লকেট। তাতে মাদার অফ পার্লের উপরে আঁকা প্রভু যিশুর মুখ।”

“ঠিক, ঠিক। বটেই তো, বটেই তো।” বলে প্রিয়নাথ আর হার্পারকে প্রায় চার কদম পিছনে ফেলে তারিণী শিস বাজিয়ে লক্ষ দিয়ে হাঁটতে লাগল।

.