ষষ্ঠ অধ্যায়—ছিন্ন সূত্রাবলি

ষষ্ঠ অধ্যায়—ছিন্ন সূত্রাবলি

নেহাত বন্ধু প্রিয়নাথ এই যুবক সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন, তা না হলে তারিণীর এই অদ্ভুত আচরণকে নেহাত বদ্ধ উন্মাদের কীর্তি ছাড়া কিছুই ভাবা সম্ভব ছিল না নলিনী দারোগার। স্পষ্ট দেখতে পেলেন ডাক্তার হান্টারের চোখে ভ্রূকুটি, সারা মুখে বিরক্তির আভাস। কে জানে, হয়তো এই যুবককে অকুস্থলে আনা একপ্রকার ভুলই হয়ে গিয়েছে। তবু নিজেকে সংযত করে অতি ধীরে তারিণীকে প্রশ্ন করলেন, “এই দেশলাই কাঠি থেকে কী প্রমাণ পেলে? ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

তারিণী যেন এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল। বাক্সের একদিক আলোর সামনে ধরে বলল, “ভালো করে দেখুন দারোগাবাবু। এ বড়ো সাধারণ দেশলাই না। ব্রায়ান্ট অ্যান্ড মে কোম্পানির সেফটি ম্যাচ। অন্য সব ঠুকে জ্বালানোর দেশলাইতে দপ করে আগুন জ্বলে উঠে কাপড় পোড়ার ভয় আছে। এতে তা নেই।”

“তাতে কী হল?”

“এই দেশলাই অন্য দেশলাই থেকে অনেক বেশি দামি। বিলেত থেকে মেলা হ্যাপা করে আনাতে হয়। নিতান্ত দরকার না থাকলে এটা কেউ ব্যবহার করে না। এর একটাই মুশকিল। কাঠি বাক্স থেকে বার করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে ফেলতে হয়। নইলে বারুদ চুপসে যায়।”

কেউ কিছু বলছে না দেখে তারিণী আবার শুরু করে, “বাইরে ঠান্ডা পড়েছে। তাই সন্ধে না হতেই মেমসাহেব সব জানলার পর্দা টেনে বন্ধ করে দিলেন। তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে এলেন। দেশলাই বাক্স থেকে দেশলাই বার করলেন। কেন? না, ফায়ারপ্লেসে কাঠ সাজানো আছে। তিনি সেই কাঠে আগুন দেবেন। সব ঠিক চলছে, এমন সময় আচমকা কোন খেয়ালে ঘরের মাঝে এসে তিনি নিজের হাতের শিরা কাটবেন, বলতে পারেন? যে মানুষ খানিক বাদেই আত্মহত্যা করবেন, তিনি ফায়ারপ্লেস জ্বালানোর উদ্যোগই বা করবেন কেন? আসলে যেটা হয়েছিল, আপনাকে বলি, মেমসাহেব দেশলাই বাক্স থেকে কাঠি বার করতেই দরজায় কেউ আসেন। খুব সম্ভব এ-ই আমাদের খুনি। মেমসাহেব কাঠি আর দেশলাই টেবিলে রেখে তাকে দরজা খুলে দেন। সে দেশলাই আর জ্বালানো হয়নি। তার আগেই আততায়ী তাঁকে হত্যা করে।”

নলিনীবাবু ডাক্তারকে ইংরাজিতে গোটাটা বললেন। ডাক্তার গম্ভীর মুখে শুনছিলেন আর বারবার অসন্তোষের ভঙ্গিতে পাশাপাশি মাথা নাড়ছিলেন। নলিনী শেষ করতেই বার তিনেক “নো নো” বললেন তিনি। শেষবার বেশ জোরে। তারপর তারিণীর দিকে তাকিয়ে যেন একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই বললেন, “হোয়াট মেকস ইউ হারি, মাই বয়? হোয়াই সো রাশ? ইউ নো নাথিং ইয়েট। নাও লেট মি টেল ইউ সামথিং। রোজ সন্ধেবেলা ওফেলিয়া নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে বসার ঘরে এসে চা খায়। আজ বেরোয়নি। চাকর চাকরানিরা দরজায় বারবার ধাক্কা দেয়। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। আই রিপিট, ভিতর থেকে। দরজার উপরে একটা ছিটকিনি আছে। সেটা লাগানো ছিল না বটে, কিন্তু আড়াআড়ি শিকলিটা দিয়ে দরজা আটকানো ছিল। শুধু তাই নয়, দরজার পাশের সোফাটা টেনে এনে দরজায় ঠেসে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সহজে কেউ দরজা খুলতে না পারে। শিকল ভাঙার পরেও দুজন সা-জোয়ান চাকরকে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে দরজা খুলতে। এখনও সেই সোফা শুয়ে আছে দরজা আটকে। আত্মহত্যা বাদে আর কী কী মোটিভ থাকলে কেউ এমন করবে বলে মনে হয়?

তারিণী কিছু বলতে যাচ্ছিল, ডান হাত উঠিয়ে তাকে থামিয়ে ডাক্তার প্রায় ধমকের সুরে বললেন, “প্লিজ, লেট মি স্পিক নাও। ঘরে ঢোকার পর এক মুহূর্তের জন্য ঘর ফাঁকা করে কেউ বেরোয়নি। ভানু এই ঘরে ফুলিকে সামলাচ্ছিল। পাসান বাইরে গিয়ে সবাইকে খবর দেয়। তোমার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে দুটো পথ খোলা আছে। এক, খুনি এই ঘরেই কোথাও লুকিয়ে আছে, আর দুই, খুনি দরজার তলা দিয়ে সূক্ষ্ম শরীরে ভ্যানিশ হয়ে গেছে। এবার বলো তুমি কী বলবে?”

“আজ্ঞে মেমসাহেবের ডান হাতের শিরা কাটা। বাম হাতে ছুরি। সচরাচর লোকে ডান হাতে ছুরি ধরে। যে হাতে জোর বেশি থাকে। মেমসাহেব কি ন্যাটা ছিলেন? বাঁহাতি?”

“এটা আমিও খেয়াল করেছি। নিশ্চয়ই তাই হবে। না হলে তো যুক্তি দাঁড়ায় না।”

“তাহলে ডাক্তারবাবু এটাও আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ড্রেসিং টেবিলে চিঠি লেখার একটা গোলাপি প্যাড আর দোয়াত কলম রাখা?”

“হ্যাঁ, কিন্তু…”

“দোয়াত আর কলমটা প্যাডের ডান দিকে। খেয়াল করুন। বাঁহাতি মানুষদের ক্ষেত্রে দোয়াত আর কলম বাঁদিকে থাকাই কি স্বাভাবিক নয়?”

ডাক্তার হান্টার চুপ মেরে গেলেন। তারিণী আচমকা এমন যুক্তির প্যাঁচ কষবে, তা তিনি ভেবে উঠতে পারেননি। একটু যেন আমতা আমতা করেই বললেন, “আমরা এই ব্যাপারে খবর নিচ্ছি। তুমি এখন কী চাইছ?”

“দারোগাবাবু, আপনি কি একবার গোটা ঘরটা পরীক্ষা করে দেখবেন?”

আমতা আমতা করে নলিনী দারোগা বললেন, “দেখার খুব বেশি কিছু আছে কি? তবু…”

“আজ্ঞে আপনি যদি সম্মত থাকেন, তবে আমি একবার ঘরটা পরীক্ষা করে দেখতে চাই।”

নলিনী দারোগা রাজি হলেন। একটু আগেও একে পাগল ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। এখন তাঁর মনের মধ্যেই কে যেন একটা গুনগুন করে বলল, এ নিছক পাগলামো নয়। এই পাগলামির একটা প্যাটার্ন আছে। বিলিতি স্ট্যান্ড ম্যাগাজিনে শার্লক হোমস নামের এক গোয়েন্দার কাহিনি প্রকাশ পায়। এ যেন অনেকটা তাঁর মতো। তবে এদেশি কোনও গোয়েন্দা বা পুলিশকে এমন করতে দেখেননি আগে। তাই তিনি বাধা দিলেন না।

হাতে কেরোসিনের টেবিল ল্যাম্প নিয়ে বিড়ালের মতো হামা দিয়ে গোটা ঘর ঘুরতে লাগল তারিণী। সাইগারসন সাহেব শিখিয়েছিলেন চোখের উচ্চতাকে মাটির কাছাকাছি নামিয়ে আনলে অনেক নতুন নতুন জিনিস দেখা যায়। তাই কুকুর-বিড়ালদের চোখে পৃথিবী নাকি আমাদের চেনা পৃথিবী থেকে একেবারে আলাদা। ডাক্তার আর দারোগাবাবু মৃতদেহ পোস্টমর্টেম করার আলোচনা করছেন। এখানে সমস্যা তৈরি হয়েছে। পোস্টমর্টেমে পাঠাতে গেলে নিকট কোনও আত্মীয়ের অনুমতি লাগে। ফলে উইলিয়ামসন সাহেব না এলে কিছু করা যাবে না। তিনিও বা কোথায়? এতক্ষণ কী করছেন? কে জানে!

তারিণী বুকে ভর দিয়ে প্রায় শুয়ে পড়েছে। অতি সন্তর্পণে মেঝেতে কী যেন দেখছে। খাটের তলা, ড্রেসিং টেবিলের তলা, কাঠের আলমারি, পর্দার পিছনের জায়গা পরীক্ষার পর তারিণীর দৃষ্টি পড়ল কাঠের মেঝের উপরে সোফা সরানোর প্রায় অর্ধবৃত্তাকার দাগটিতে। ঘোর-লাগা মানুষের মতো সেই দাগের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল খানিক।

“দারোগাবাবু, এই ঘষার দাগটা দেখুন। কী অদ্ভুত না?”

“কোচটাকে ঠেলে দরজায় ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। ছেঁচড়ে নেবার দাগ তো হবেই। এতে অবাক হবার কী আছে?”

“নেই বলছেন? কী জানি!” বলেই তারিণী আবার ডুবে গেল নিজের মধ্যে। মন দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল দরজায় আটকানো শিকলিটাকে। ঘরে ঢোকার সময় এটা ভেঙেই ঢুকেছিল পাসানরা। সেই শিকল এখন একদিকে দুলছে আর লকটা ভেঙে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। স্মৃতি হিসেবে একটা স্ক্রু কোনওক্রমে লেগে আছে দরজার পাল্লার গায়ে। লকটাকে খুব ভালো করে পরীক্ষা করল তারিণী। কী যেন খুঁজল, তারপর দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোফাটাকে নিয়ে পড়ল। সোফায় কী যেন দেখতে পেয়ে ফুর্তিতে জোরে শিস দিয়ে উঠল সে। সোফার একদিকের পায়ার চকচকে বার্নিশ ঘষা খেয়ে সামান্য উঠে গেছে। ভালো করে তাকিয়ে নলিনীকান্ত তারিণীর আনন্দের কারণটা দেখতে পেলেন। পায়ার একদিকে একেবারে ছোট্ট একটা পেরেক গাঁথা রয়েছে। কিন্তু এই পেরেক দেখে তারিণীর উত্তেজনার কারণ তাঁর বোধগম্য হল না। কোটের পকেটে একটা মাপবার ফিতে নিয়ে এসেছিল তারিণী। সেটা দিয়ে আড়ে বহরে গোটা সোফা, মেঝে থেকে শিকলের উচ্চতা, আর দরজার পাল্লার চারদিক মেপে অবশেষে বেশ খুশি হয়ে উঠে দাঁড়াল। দুই হাতের তালু ঘষতে ঘষতে বলল, “ধন্যবাদ দারোগাবাবু। আপনি আমার মতো একজন সামান্য গোয়েন্দাকে এভাবে অকুস্থল পরীক্ষা করতে অনুমতি দেবেন, এ আমার ভাবনার বাইরে। হয়তো দার্জিলিং বলেই। কলকাতায় একজন নেটিভকে এমন অবস্থায় ধারে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না।”

আবেগের বশে সে হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা অঘটন ঘটল। একটা টেবিল ল্যাম্পের আলো সদ্য নিভে গেছিল। বুঝতে না পেরে সেটাকেই হাতে ধরে তুলতে গিয়ে নলিনীবাবুর ডান হাতের আঙুলগুলো গরম কাচে গেল পুড়ে। ভাগ্যিস ডাক্তার হান্টার ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। এদিকে একজন চাকর এসে খবর দিল উইলিয়ামসন সাহেব নিচে অপেক্ষা করছেন। হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ নেবার গাড়িও পৌঁছেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নলিনীবাবু তারিণীকে শুধালেন, “পরীক্ষা তো করলে। বুঝতে পারলে কিছু?”

“আজ্ঞে কিছু বুঝেছি।”

“কী?”

“ডাক্তারবাবু ঠিকই বলেছেন। খুনি সূক্ষ্ম শরীরে ভ্যানিশ হয়ে গেছে।”