দশম অধ্যায়—অপরাধের অবয়ব

দশম অধ্যায়—অপরাধের অবয়ব

দারোগাবাবু বেরিয়ে গেলেন। মাখনকে কল্যাণী ডেকে নিয়ে গোপনে কী সব যেন বলছে। অগত্যা তারিণীর ঘরে বসে থাকার কোনও অর্থই রইল না। সে নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পদব্রজে এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল। আজ দার্জিলিং শহরে হাট বসেছে। সাহেব, মেম, ভদ্রাভদ্র সবাই এই হাটে এসে আগামী এক হপ্তার খাবার সংগ্রহ করেন। তারিণী ঘুরে ঘুরে দেখল বিরাট এক ঘরের মধ্যে নানারকম মাংস, শাক সবজি, বরফের বাক্সে বন্দি মাছ বিক্রি হচ্ছে। বাইরে অনেক দোকানি মুরগি, হাঁস, পায়রা খাঁচায় করে নিয়ে বসে কী যেন চিল্লাচ্ছে। একধারে পাহাড়প্রমাণ কমলালেবু। এখানে কমলাকে সুত্তালা বলে, এই বাজারে এসেই জানতে পারল তারিণী। সেখান থেকে ডাইনে বেঁকে মূল বাজার কিংবা দার্জিলিংয়ের হোয়াইট টাউন। কলকাতার লেডল, বোসেক ইত্যাদি নানা নামজাদা কোম্পানি এখানেও নিজেদের বস্ত্রাদি, অলংকার, চেন ইত্যাদি সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। স্মিথ কোম্পানির ওষুধের দোকানও বাদ যায়নি। কিন্তু তারিণীর চোখ পড়ল অন্য একটি সাহেবি দোকানে। দোকানের সামনে তিন-চারটে রঙিন তাঁবু সাজানো, রংবেরঙের দড়ি, লাঠি, অদ্ভুতদর্শন জুতো সযত্নে কাচের আলমারিতে শোভা পাচ্ছে। ভিতরে এক সাহেব দোকানদার আর তার বাঙালি কর্মচারী খদ্দেরের আশায় পথপানে চেয়ে বসে ছিল। তাকে দেখেই উঠে এসে”কাম বাবু কাম” বলে আপ্যায়ন করে ভিতরে নিয়ে গেল। হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং নামের এই দোকানে পাহাড়ে চড়ার নানা সামগ্রী পাওয়া যায়। সেই বাঙালি ভদ্রলোকটি তারিণীকে নানা জিনিস খুঁটিয়ে দেখাল। সেই প্রথম তারিণী পিক অ্যাক্স, ক্রাম্পটন, স্টুবাই, নাটস অ্যান্ড রোপ, নানারকমের আংটা, হাতুড়ি আর প্লায়ার দেখল। বিক্রেতাটির অসীম ধৈর্য। তারিণী নানারকম প্রশ্ন করছিল আর সেও জবাব দিচ্ছিল।

“আচ্ছা, এই অ্যাক্সের কাজ কী?”

“আজ্ঞে বরফ কাটতে এর জুড়ি নেই। পাহাড়ে বরফ কেটে ধাপ তৈরি করে তবেই কিনা উপরে ওঠা যাবে।”

“আর এই দড়ি অন্য দড়ির থেকে আলাদা কোথায়?”

“এই দড়ি অনেক বেশি ভার সহ্য করতে পারে। স্থিতিস্থাপক। রবারের মতো না হলেও কিছুটা তো বটেই।”

তারিণী মজা পাচ্ছিল। সে দড়িগুলো টেনে টেনে দেখল। “এ দড়ি আমার দেহের ভার নিতে পারবে?”

“নিঃসন্দেহে স্যার। পা পিছলে গেলেও ঝুলে থাকবেন। পড়ে যাবার ভয় নেই।” কর্মচারীটি বলেই যাচ্ছিল, “এমন একটা দড়ি, কিছু নাটস, হুকস, একটা নিডল নোজ প্লায়ার আর ছোটো একটা হাতুড়ি কিনে নিয়ে যান স্যার। আপনার কোটের পকেটেই ধরে যাবে। এগুলো থাকলেই ছোটোখাটো পাহাড় বাইতে সমস্যা হবে না।”

এবারে হেসে ফেলল তারিণী। “বাইতে গেলে তো পাহাড়ে চড়া শিখতে হবে। কে শেখাবে আমায়?”

“সমস্যা নেই স্যার। এখানে কিছু গোর্খারা ট্রেনিং দেয়। আর আপনার যদি তাতে আপত্তি থাকে, তবে উইলিয়ামসন সাহেবের কাছে শিখতে পারেন। উনি অবশ্য শেখাতে বেশ চড়া দাম নেন।”

নামটা শুনেই তারিণী চমকে উঠল। আবার উইলিয়ামসন! তবু নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞেস করল, “কোন উইলিয়ামসন?”

“জর্জ উইলিয়ামসন। এখানে গ্লেনডেল নামের একটা চা বাগান আছে। তার মালিক। দারুণ পাহাড় বাইতে পারেন। হপ্তায় তিনদিন সকালে শেখান। উপরি রোজগার আর কি। গতকালও ক্লাস ছিল। যাবার আগে আমার থেকে কিছু নাল কিনে নিয়ে গেলেন। তবে কানাঘুযো শুনলাম মেমসাতের নাকি গতকাল নারা গেছেন। এই অবস্থায় ক্লাস হবে কি না…”

তারিণীর মুখে চিন্তার এক ঘন মেঘের ছায়া দেখে লোকটি নিজে থেকেই চুপ করে গেল। তারিণীর দৃষ্টি স্থির, শূন্য। যেন আচমকা তার দেহটুকু এই দোকানে রয়ে গেছে। মন অন্য কোথাও বিচরণ করছে আপনমনে। স্বপ্নাবিষ্টের মতো তারিণী শুধাল, “কী কী জিনিস নিয়েছিলেন কাল সকালে?”

কর্মচারী একটু অপ্রস্তুত বোধ করে। এই প্রশ্নটা সে আশা করেনি। তাকে ইতস্তত করতে দেখে তারিণী বলে, “আসলে আমিও সেগুলোই নেব। দেখি সাহেবের কাছে ভরতি হওয়া যায় কি না।”

এবার লোকটির মুখে হাসি ফুটল। এতক্ষণ সময় দেওয়ার ফল ফলেছে। সে এবার মহানন্দে এদিক ওদিক থেকে কাউন্টারে বার করে রাখল একগাছি দড়ি, ছোটো একটা হাতুড়ি, এক বাক্সভরা ছোটো ছোটো নানা হুক, স্ক্রু ইত্যাদি আর একজোড়া মাউন্টেনিয়ারিং গ্লাভস। মোট বারো টাকা চার আনা। সবকটা একটা কাপড়ের ব্যাগে ভরে দিতেই নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল তারিণী। বড্ড খরচা হয়ে গেল। কিন্তু কিছু করার নেই। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে সে চলল ভুটিয়া বস্তির দিকে। জায়গাটা নিচু, অপরিষ্কার। দেখার বলতে কাঠের তৈরি এক বৌদ্ধ প্যাগোডা। ধারে সার বাঁধা দোকান। সেখানে বিরাট বিরাট সব পাত্রে মাংসের পুর দেওয়া সাদা সাদা ময়দার মণ্ড ভাপে সিদ্ধ হচ্ছে। বাচ্চাবুড়ো সবাই পাতায় করে নিয়ে লাল লংকার চাটনি সহকারে খাচ্ছে। এ খাবারের নাম জানতে আগ্রহ হলেও উপায় নেই। তারিণী এদের ভাষা একবিন্দু বোঝে না। একধারে শালপাতায় হলুদ মাখন বিক্রি করছিল এক ভুটিয়া মহিলা। কিনবে কি না ভাবতে ভাবতেই দূরে চেনা মুখ দেখে বেশ অবাক হল সে। কুমুদ এখানে কী করছে? কুমুদের চালচলনে কেমন একটা ত্রস্ত ভাব। সে ফিসফিসিয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলছে। এই লোকটিকে তারিণী আগে দেখেছে। দামুকদরিয়ার সেই পাহাড়ি লোকটি। একটা স্তম্ভের পিছনে দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখতে লাগল তারিণী। ভট্টবাবু কিছু অনুরোধ করছে। কিন্তু লোকটি বারবার মাথা নাড়ছে শেষে তার হাতে একতাড়া নোট গুঁজে দিল ভট্টবাবু। বোঝা গেল লোকটি নিমরাজি হয়ে নিজের পথে পা বাড়াল। তারিণী ভাবল পিছু নেবে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেছে। কল্যাণীরা হয়তো খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। তাই অচিরেই সে ইচ্ছে ত্যাগ করল।

সারা দুপুর মাখন ঘুমাল আর তার পাশে বসে দোকান থেকে আনা প্রতিটা জিনিস মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করল তারিণী। যে কুৎসিত অপরাধ গতকাল সংঘটিত হয়েছে, তা এতই ভয়ানক, এতই চতুর, যার ব্যাখ্যা সাধারণ বুদ্ধিতে মেলে না। তারিণী প্রথমে একেবারে বোকা হয়ে গেছিল। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে গোটা অপরাধ একটা অবয়ব নিচ্ছে। কিন্তু সে অবয়ব স্পষ্ট না। আবছা। আর সেই আবছা অবয়ব যার, তার বিরুদ্ধে কোর্টে পেশ করার মতো কোনও প্রমাণ তারিণীর হাতে নেই। এই অপরাধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এইটাই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতেই বসার ঘর থেকে চায়ের ডাক এল। দারোগাবাবু ফিরে এসেছেন। তারিণীকে দেখে বললেন, “জর্জের নাম ওয়ারেন্টটা আজ বার করা গেল না। দেখি যদি কাল হয়। কাল তো আবার এই মাসের শেষদিন। সবাই মাইনে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তবু আমি চেষ্টা করব। যা হোক, আজ ক্যামেলিয়াতে গেছিলাম।”

“কিছু জানা গেল?”

“ইদানীং ওফেলিয়া নাকি প্রায়ই অন্যমনস্ক থাকত। মাঝে মাঝেই চাকরবাকরদের ছুটি দিয়ে দিত। সে সময় কে বা কারা আসা যাওয়া করত, তা তারা জানে না। তবে ফুলি নামে একটা মেয়ে ওদের ওখানে কাজ করে। সে জানাল, ইদানীং নাকি বাড়ির আশেপাশে রাতের বেলা কার কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। বিশেষ করে মেমসাহেব মারা যাবার পরে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে। ঘরের মাঝে একটা ঝাড়লণ্ঠন ছিল। সেটা খসে পড়েছে। একটা ঘোড়া আচমকা খেপে গিয়ে ভানুর বুকে লাথি মেরেছে। একটু এদিক ওদিক হলে ভানু মারাও যেতে পারত। ওরা কেউ আর ওখানে থাকতে চাইছে না। সব পালিয়ে যেতে চাইছে। আপাতত ক্যামেলিয়া বন্ধ থাকায় সবাই টিউলিপে আছে। উইলিয়ামসন ওদের চা বাগানের কাজে লাগিয়েছেন। তবুও..”

“ঘরে তল্লাশি করে আর কিছু পেলেন?”

“পেলাম। কিন্তু যেটা পেলাম, সেটা ভয়ানক। শুরুতেই তোমায় বলেছিলাম, এই কেসের তল পাওয়া মানুষের অসাধ্য… টেবিলে ওফেলিয়ার লেখার প্যাড ছিল, দেখেছ তো? সেটায় শেষ যে চিঠিটা লেখা হয়, তার ছাপ নিচের পাতায় পড়েছিল। ওফেলিয়ার কলম চেপে লেখার অভ্যাস ছিল। ভুষোকালি মাখিয়ে সেই চিঠির বক্তব্য উদ্ধার করেছি। মূল চিঠি পুলিশ স্টেশনে। আমি তোমার জন্য চিঠিটা কপি করে এনেছি। এই দ্যাখো।” বলে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। তাতে ইংরাজিতে লেখা–

প্ৰিয় কাৰ্বি,

তোমায় একটা সুখবর দিই। সত্যি বলতে এর চেয়ে ভালো খবর গত কয়েক বছরে আমার জীবনে আর আসেনি। আমার গর্ভে সন্তান এসেছে এবং সেই সন্তান তোমার। তুমি তো জানো, ওই নপুংসকটি আমায় সন্তানসুখ দিতে অপারগ। কিন্তু তুমি আমার সে ইচ্ছে পূরণ করেছ। স্থির করেছি, আমি শীঘ্রই জর্জকে ডিভোর্স দেব, ফলে আমায় বিয়ে করতে তোমার আর কোনওরকম অসুবিধা থাকবে না। আমার সন্তানের পিতৃনাম প্রয়োজন এবং জর্জ বেঁচে থাকতে নিজের নাম দেবে না। আমি চাইও না আমার অনাগত সন্তানকে ওর মতো জারজ বলে ডাকা হোক। আগামী কাল বেলা ৩টে থেকে ৫ টা অবধি ক্যামেলিয়ায় কেউ থাকবে না। আমি সব চাকরবাকরদের ছুটি দিয়েছি। তুমি যথাসময়ে চলে এসো। এই বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন।

তোমার,
ওফেলিয়া নেপিয়ার

উপরে ২৮ মার্চের তারিখ দেওয়া। পড়া শেষ করেও বেশ খানিক লেখাগুলো বারবার করে খুঁটিয়ে দেখল তারিণী। দারোগাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝলে?”

“আজ্ঞে বেশ কিছু অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ছে।”

“যেমন?”

“ওফেলিয়া তাঁর আগের পদবিতে সই করেছেন। মানে, মনে মনে তিনি উইলিয়ামসন সাহেবকে একপ্রকার ডিভোর্স দিয়েই দিয়েছিলেন। আর একটা কথা, একটু খবর নিয়ে দেখবেন, আমার ধারণা ওফেলিয়া মেমসাহেবের লেখার বাতিক খুব পুরোনো না। আগের দিন প্যাডের খালি পাতার পরিমাণ দেখেই কিছুটা সন্দেহ হয়েছিল। নতুন প্যাড, নতুন কলম। আজ নিশ্চিত হলাম। একে তো যারা নিয়মিত লেখেন, তাদের সবার একটা রাইটিং টেবিল থাকে। ড্রেসিং টেবিলে তারাই লেখে, যাদের কদাচিৎ লিখতে হয়। দ্বিতীয়ত এই প্রেমপত্রের ভাষা। পড়ে মনে হচ্ছে একেবারে আপিসের কেজো চিঠি। যাই হোক, এখন একটাই কাজ, এই কাৰ্বি সাহেবকে খুঁজে বার করা।”

“খোঁজার কিছু নেই। কাৰ্বি নামে গোটা দার্জিলিং শহর একজনকেই চেনে টমাস কার্বি। গ্রিন ভ্যালি এস্টেটের প্ল্যান্টার। দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলোয়াড়। সুপুরুষ। ওফেলিয়ার প্রাক্তন প্রেমিক।”

“বাহ, তাহলে তো সমস্যা মিটেই গেল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। নাকি করা হয়ে গেছে?”

মাথা নাড়লেন নলিনীবাবু।”হয়নি। উপায় নেই।”

“কেন? অনুমতি মিলবে না?”

“ওকে জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল আমাদের অনায়ত্ত। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে মাত্র দুইদিনের জ্বরে ভুগে কার্বি মারা গেছে।”