ইয়ান জি হং-এর মুক্তো (ভস্মবহ্নির পরিশিষ্ট)

ইয়ান জি হং-এর মুক্তো (ভস্মবহ্নি পরিশিষ্ট) – ডিটেকটিভ-প্রহেলিকা

নমস্কার। আমার নাম তুর্বসু রায়। প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ শ্রী তারিণীচরণ রায় আমার প্রপিতামহ ছিলেন। কয়েক বছর আগে আমি তাঁরই পথ ধরে প্রাইভেট ডিটেকটিভগিরি আরম্ভ করলেও এক দুর্ঘটনায় আমায় স্মৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর যখন ডাক্তার আমাকে সুস্থ ঘোষণা করেন, আমি আবার ‘রে প্রাইভেট আই অ্যান্ড কোং’ খুলে বসি। ইদানীং পসার আবার কিছুটা জমেছে। কিন্তু সেসব কথা বলার জন্য এ লেখা নয়।

২০২২ সালের শারদীয়া অন্তরীপ পত্রিকায় ‘ভস্মবহ্নি’ উপন্যাসটি প্রথমে আমার চোখে পড়েনি। আমার স্ত্রী উর্ণার অফিসের এক কলিগের কাহিনিটা ভালো লাগায় উর্ণাকে পড়তে দেন। উর্ণা আমার থেকেই তারিণীচরণের নাম শুনেছে। কিন্তু এখানে তাঁর কথাই বলা হচ্ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকায় সে উপন্যাসটি আমায় পড়ায়। আমি তারিণীর ১৮৯৮ সালের ডায়রিতে এই ঘটনার কোনও উল্লেখ পাইনি। কিন্তু গত হপ্তায় তাঁর ১৯৪০ সালের ডায়রির একটি এন্ট্রিতে এমন একটি কাহিনির উল্লেখ পাই, যার সঙ্গে এই ভস্মবহ্নি কেসের পরোক্ষ সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে।

আমি লেখক কৌশিক মজুমদারের প্রকাশকের সূত্রে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে ডায়রির ওই অংশটি পাঠাই। তিনি সেটি পড়ে উত্তেজিত হয়ে আমায় ফোন করে জানতে চান, ওঁর পরবর্তী বইতে উনি তারিণীর এই লেখা ছাপতে পারেন কি না। আমি লিখিত অনুমতি দিলে উনি আমাকেই এই পরিশিষ্টের একটি ছোটো ভূমিকা লিখে দিতে অনুরোধ করেন। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র। বাংলা লেখায় অভ্যস্ত নই। তবু নিজের প্রপিতামহের জন্য এই লেখা লিখলাম।

ধন্যবাদ।

.

১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪০, চুঁচুড়া

জীবনে চলার পথে পরমেশ্বর আমাদিগের অজান্তেই এমন সব অলৌকিক ঘটনা ঘটান, যাহার তল পাওয়া সামান্য মনুষ্যের পক্ষে অসম্ভব। এখন বৃদ্ধ হইয়াছি। কলিকাতার নিবাস ত্যাগ করিয়া সপরিবারে চুঁচুড়ায় থাকি। এককালে সে গোয়েন্দাগিরির নেশা ধমনিতে উষ্ণ শোণিতের ন্যায় প্রবাহিত হইত, এক্ষণে তাহা ম্রিয়মাণ। ভাবিলে মনে হয়, যেন গত জন্মের কথা। কিন্তু তাহারই মধ্যে অতীত দীর্ঘ ছায়া ফেলিয়া মধ্যে মধ্যে সামনে আসিয়া দাঁড়ায়। আজও তেমনই হইল।

চুঁচুড়ায় রামেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের গৃহে একটি সান্ধ্য আড্ডা বসে। এলাকারই জনা চার-পাঁচেক প্রৌঢ় তাহাতে যোগ দেন। বলিতে লজ্জা নাই, সেই আড্ডা এদানি আমার প্রাণের সঙ্গী হইয়া উঠিয়াছে। সমস্ত দিন ধরিয়া অপেক্ষায় থাকি, কখন সাড়ে পাঁচটা বাজিবে আর আমি চাটুজ্যের বৈঠকখানার উদ্দেশে যাত্রা করিব।

মধ্যে মধ্যে মাখনও বিরক্ত হয়। কহে, “বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেচে দ্যাখো! একদিন গে দেখব কোন সুন্দরীর জন্যে মন এত আঁকুপাঁকু করে।” কিছু কহি না। চুপটি করিয়া যষ্টি হস্তে বাহির হইয়া যাই। বোবার শত্রু নাই।

যাহা বলিতেছিলাম। আজ আসরে গিয়া দেখিলাম সীতাপতির সমভিব্যহারে এক সুন্দর পুরুষ আসিয়া উপস্থিত। ইহাকে আগে দেখি নাই। গেরুয়া পাঞ্জাবি, চুনট করা ধুতি, স্কন্ধ পর্যন্ত লম্বিত শ্বেতশুভ্র কেশ, গৌরবর্ণ মানুষটিকে দেখিলে প্রথমেই রবি ঠাকুরের চিত্রটি মনে আসে।

আমি কিছু কহিবার আগেই সীতাপতি বলিল, “এই যে আমাদের গোয়েন্দা তারিণীচরণ এসে গেছে। এবারে বলো দেখি তারিণী, আজ আসরে যিনি এসেছেন উনি কী করেন?”

আমি কহিলাম, “এদের কথা শুনবেন না। এককালে কিছু গোয়েন্দাগিরি করতাম ঠিকই, কিন্তু এখন সেসব ছেড়ে দিয়েছি”, বলিয়া হাত জোড় করিয়া নমস্কার করিলাম।

ভদ্রলোকও হাসিমুখে প্রতিনমস্কার করিলেন। তাহার পর হাত ধরিয়া নিজের পাশে বসাইয়া কহিলেন, “আপনার কথা এদের কাছে খুব শুনেছি। আপনি নাকি মানুষ দেখেই তাঁর প্রফেশন বলে দিতে পারেন? এ কি সত্যি?”

“আজ্ঞে তেমন কিছু না। তবে আপনি যে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী য-বাবু তা বুঝতে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি।”

য-বাবু চমকিয়া উঠিলেন।

“সে কী! আপনি আমায় চেনেন? আগে দেখেছেন? আমার ছবি তো কোথাও ছাপা হয় না।”

“আপনার নাম কে না শুনেছে? তবে আপনিই যে তিনি, তা এইমাত্র অনুমান করেছি।”

“কেমন করে?”

“আপনার হাতের আঙুল লম্বা, শিল্পীসুলভ। যখন নমস্কার করলেন, দেখলাম পাঞ্জাবির ভিতরে থাকা অংশ ফর্সা, কিন্তু বাইরের অংশ তামাটে। অর্থাৎ রোদে পুড়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু কী করতে হয়? উত্তর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেলাম। কবজির কাছে সামান্য লাল আর সবুজ তেল রং লাগা। শুকনো। শেষে যখন আপনি হাত ধরে আমায় কৌচে এনে বসালেন, তখন গা থেকে তারপিন তেলের স্পষ্ট গন্ধ পেলাম। ফলে আপনি যে শিল্পী তাতে সন্দেহ রইল না। এদিকে চুঁচুড়া গেজেটে কালই ছাপা হয়েছে বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ শিল্পী য—এক হপ্তা চুঁচুড়ার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বিখ্যাত কিছু জায়গার ছবি আঁকবেন। দুইয়ে দুইয়ে চার করতে আর কতক্ষণ?”

“বাহ বাহ”, বলিয়া য-বাবু প্রায় তালি দিয়া উঠিলেন।

ইতোমধ্যে চা জলখাবার ইত্যাদি আসিয়া পড়িয়াছিল। বিভিন্ন বিষয়ে কথা চলিতে চলিতে সীতাপতি কহিল, “তুমি জানলে আশ্চর্য হবে তারিণী, ইনি জীবন শুরু করেছিলেন সার্কাসের পোস্টার এঁকে।”

“বলেন কী? কোন সার্কাস?”

“আজ্ঞে প্রিয়নাথ বোসের গ্রেট বেঙ্গলে ছবি আঁকতাম। বাঘের ছবি। সিংহের ছবি।”

“আমার এক বন্ধুও ওই সার্কাসেই ছবি আঁকার কাজ দিয়ে জীবন শুরু করেছিল। মস্ত নামজাদা ম্যাজিশিয়ান। গণপতি চক্রবর্তী। নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই।”

য-বাবুর মুখমণ্ডলে কে যেন মুহূর্তে কালিমা লেপন করিয়া দিল। কাষ্ঠ হাসিয়া কহিলেন, “তা আর চিনি না? ও আসার পরেই তো চাকরি গেল আমার। তবে আমি একদিকে ওঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। আজ আমি যে জায়গায় পৌঁছেছি, তাতে গণপতির হাত একেবারে নেই বললে ভুল বলা হবে।”

নূতন গল্পের আশায় সবাই বেশ উদগ্রীব হইয়া বসিল। য-বাবু বলিতে শুরু করিলেন। তাঁহার গলাটি মধুর। বলার ভঙ্গিটিও ভারি সুন্দর।

“আমি গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে ঢুকি মাত্র তেরো বছর বয়সে। অনাথ ছেলে। ছবি আঁকা ছাড়া অন্য কিছু পারতাম না। একদিন ফুটপাথে ইটের টুকরো দিয়ে ছবি আঁকতে দেখে প্রিয়নাথবাবু মাসে দুই টাকা আর তিনবেলা খাওয়ার কড়ারে আমায় সার্কাসে নিয়ে আসেন। প্রথম দু-তিন বছর ভালোই ছিলাম। তারপরেই মতিভ্ৰম হল। একদিকে আমার ছবি আঁকার পরিমাণ বাড়তে লাগল। সার্কাসের ছবি এঁকে মন ভরত না। আমি ল্যান্ডস্কেপ পেন্টিং ধরলাম। ইউরোপীয় ড্যানিয়েল সাহেবদের আঁকা ছবির একটা বই ছিল প্রিয়নাথবাবুর কাছে। সেই ছবির আদলে। অন্যদিকে বাড়ল মদ্যপান। সার্কাসে থাকলে চরিত্র ঠিক রাখা মুশকিল। মদ এবং মেয়েমানুষ, এই দুই নেশায় কাজে আর মন বসত না। প্রিয়নাথবাবু নিজের চেনাজানা বাবুদের থেকে অর্ডার ধরে দিতেন। আমি তাঁদের বসার ঘরের জন্য ছবি আকতান। মদের নেশায় তাতেও ভাটা পড়তে লাগল। তারপর এমন হল, আমি ছবি আকার আগেই বায়না হিসেবে মোটা টাকা নিয়ে সময়মতো ছবি আঁকতে পারছি না। গোটাটাই চলে যাচ্ছে আমার বদখেয়ালে।

এমন সময় একদিন বোস সাহেব আমাকে নিজের তাঁবুতে ডেকে পাঠালেন। রোগাভোগা একটা লোককে দেখিয়ে বললেন, ‘এর নাম গণপতি। এখন থেকে তোমার আঁকার কাজে সাহায্য করবে।’ আমাকে সাহায্য করবে!! ভাবতেই হাসি পেল। কিন্তু দুই মাস ঘুরতে না ঘুরতেই গণপতি জাদু দেখাল। হাতের আঁকায় তেমন পটু না, কিন্তু খাটতে পারে। যে পোস্টার আমি একমাসের আগে ফিনিশ করতাম না, ও সেটা হেলায় সাতদিনে শেষ করে দিত। সার্কাসে কোয়ালিটির কোনও মূল্য নেই। সে যাই হোক, প্রিয়নাথ অবশ্য আমায় ক্রমাগত বলতেন, সার্কাসের জীবন তোমার জন্য নয়। তুমি আর্টিস্ট। ছবি আঁকো। কিন্তু কম বয়সে সে কথা মাথায় ঢুকলে তো! আর্টিস্ট থেকে আমার নাম কাটা গেল। হয়ে গেলাম সেকেন্ড হেল্পার। তার সামান্য মাইনেতে আমার বিচিত্র শখ পূরণ হয় না। প্রিয়নাথের থেকে টাকা ধার চাইতে ভয় লাগত। ওঁর দাদা মতিলাল তো এসব ব্যাপারে এক কাঠি উপরে। প্রথম কয়েকমাস গেল আগাম মাইনে চেয়ে চেয়ে। তারপর একদিন টাকা চাইতেই ওঁর তাঁবুতে ঢুকেছি, দেখি ওঁর টেবিলের সামনে গণপতি এক ছোকরাকে নিয়ে বসে ফিসফিস করে কী যেন বলছে। আমাকে দেখেই চুপ করে গেল। প্রিয়নাথ আমায় ডাকলেন। বসতে বললেন। আমি বসলাম না। মনে কেমন কু গাইছিল। সামান্য একটু কেশে প্রিয়নাথ বললেন, ‘শোনো হে য-, কাল থেকে এই সার্কাসে তোমার আর প্রয়োজন নেই। সেকেন্ড হেল্পারের জায়গায় ভালো ছেলে এসেছে। এর নাম পবন। আগে গ্রেট ন্যাশনালে তিরের খেলা দেখাত। গণপতির এক বন্ধুর রেকোমেন্ডেশনও আছে। আজ রাতটা এখানেই থাকো। কাল সকাল থেকে তোমায় যেন আর দেখতে না পাই।’

আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। যাব কোথায়? খাব কী? আমি আর একটা কথা না বলে নিজের তাঁবুতে গিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলাম। অনেকক্ষণ বাদে, তখন বেশ রাত হয়েছে। দেখলাম কে যেন আমার তাঁবুতে ঢুকল। আলো জ্বালাতে যেতেই বোসের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘আলো জ্বেলো না। কথা আছে।’

তিনি আমার পাশের কেদারাখানিতে বসে বললেন, ‘তোমার টাকা চাই জানি। কত টাকা?’

‘আজ্ঞে আপাতত শ-খানেক হলেই চলবে।’

‘মাত্র একশো? যদি আমি তোমায় দুহাজার টাকা দিই? তবে?’

আমি ভাবলাম উনি নিশ্চিত আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আমি নিরুত্তর রইলাম।

উনি আবার বললেন, ‘বাজারে তোমার কত ধার আমার জানা আছে। কাবুলিরা রোজ এসে ঘুরে যাচ্ছে সার্কাসে। এ জিনিস সার্কাসের পক্ষে ভালো নয়। এখানে তোমাকে রাখা যাবে না। কিন্তু তোমায় অন্য কাজ দেব। করতে পারলেই হাতে হাতে টাকা। কড়কড়ে দুহাজার। ভেবে দ্যাখো।”

‘কী কাজ করতে হবে?’

‘খুব কঠিন কিছু না। একজন লোককে খুন করতে হবে।’”

উপস্থিত সকলে চমকাইয়া উঠিল। বেশ কয়েকটি শ্বাস টানার শব্দও পাওয়া গেল। সীতাপতি উত্তেজনায় বলিয়া উঠিল, “তারপর? তারপর?”

“প্রথমে আমি ভাবলাম ভুল শুনছি। কিন্তু তিনি পরপর তিনবার একই কথা বললেন। এও বললেন, আমার কাছে আর কোনও উপায় নেই। কাল সকালে উনি আমার পোশাকটুকু বাদে সব কিছু কেড়ে তাড়িয়ে দেবেন। তখন ভিক্ষা বাদে কিছুই জুটবে না। খানিক চুপ করে বসে থেকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাকে খুন করতে হবে?’

‘যাক। তবে রাজি হলে। তবে শোনো, শেষবার যখন আমি হংকং-এ খেলা দেখাতে গেছিলাম, সেখানের এক পাহাড়ি অঞ্চলে আমার সঙ্গে জুই ই নামের এক চিনাম্যানের দেখা হয়েছিল। মুখে হাসি। কিন্তু শয়তানের বাসা। হংকং-এ আমি সেই প্রথমবার ইয়ান জি হং-এর মুক্তোর মালা দেখতে পাই। আমার খুব ইচ্ছে ছিল সে মালা আমি সঙ্গে করে নিয়ে আসি। কিন্তু জুই ই-র শয়তানিতে তা পারিনি। এখনও সেই মালা জুই ই-র কবজাতেই আছে। তোমাকে সেই মালা উদ্ধার করে আমায় এনে দিতে হবে। ভেবে বলো পারবে কি না। ‘

‘কিন্তু হংকং যাব কেমন করে?”

‘সে চিন্তা তুমি কোরো না। ঠিক দুই হপ্তা বাদে এক মালবাহী জাহাজ ক্যালেন্ডুলা হংকং যাচ্ছে। তার ক্যাপ্টেন আমার পরিচিত। ওকে বললে ও তোমায় হংকং পৌঁছে দেবে। বন্দরে পৌঁছেই কামালউদ্দিনের সেলাইয়ের দোকানটা খুঁজে নেবে। কামাল আমার পুরোনো বন্ধু আর জুই ই ওর পরিচিত। ও-ই তোমায় চিনিয়ে দেবে।’

‘কিন্তু সে কী করে বুঝবে আমি সত্যি কথা বলছি? কিংবা আমিই সেই য-?’

‘আমি একটা বাক্স পাঠাব ওর কাছে। তালাবদ্ধ। সঙ্গে নির্দেশ দিয়ে চিঠি থাকবে। তোমায় আমি একটা চাবি দেব। তুমি সেই চাবি দিয়ে বাক্স খুললেই প্রমাণ হবে তুমিই সেই য-’

‘কী থাকবে সেই বাক্সে?”

‘সেটা নাহয় সেখানে গিয়েই দেখবে। আর…’ এই বলে লম্বা চুরুটের বাক্সের মতো একটা বাক্স নিয়ে এলেন প্রিয়নাথ। ভিতর থেকে বার করলেন লম্বা মুখ একটা পিস্তল। বাঁটে কারুকার্য করা।

‘এগুলোকে বলে ডুয়েল পিস্তল। তবে দুই ঘরার। আমার কাছে এমন দুটো আছে। একটা দিয়ে গণপতি কী সব ম্যাজিক দেখাবে বলে স্থির করেছে। অন্যটা দিয়ে তুমি জুই ই-কে খুন করবে। কিন্তু তার আগে সাধনা দরকার। গুলিতে বিফল হলে জুই ই তোমায় আস্ত রাখবে না। এতে দুটো গুলি ধরে। চেষ্টা করবে যাতে এক গুলিতেই কাজ হয়।’

‘কিন্তু আমি তো টার্গেট প্র্যাকটিস জানি না।”

‘সেটাই শিখবে এই কয়দিন। আর তার জন্য মদ্যপান একেবারে বন্ধ। মনে রাখবে, হাত যেন একটুও না কাঁপে।’

সেই বন্দুক হাতে নিতে গিয়ে আমার হাত কেঁপে গেল।

তবে স্থির করলাম, জলে যখন নেমেইছি তখন ডুবে যাব না। সাঁতার শিখব। দিনরাত জেগে সেই বন্দুক দিয়ে তাগ করার অভ্যেস চালিয়ে গেলাম। সার্কাসের জনা দুই, বিশেষ করে পবন নামের নতুন ছেলেটির নিশানা অব্যার্থ। তারাই আমাকে শিক্ষা দিল। হয়তো ভাবল নতুন কোনও খেলা দেখাব আমি।

ঠিক দুই সপ্তাহ বাদে বাও চেন নামের এক চিনাম্যানের জাহাজ ক্যালেন্ডুলায় চেপে হংকং-এর উদ্দেশে রওনা হলাম। পাথেয় হিসেবে বোস সামান্য কিছু টাকা দিয়েছিলেন। তাতে হংকং যাওয়া-আসাটুকু হবে। কিন্তু আমার তখন সমুদ্রে শয়ান, শিশিরে বিন্দুমাত্র ভয় নেই। মনেও কেমন একটা জোর এসে গেছে। জানি না কেমন করে জুই ই-কে খুন করব, কিন্তু করতে আমায় হবেই। একটা আশা ছিল, সেই কামালউদ্দিন নিশ্চয়ই পথ দেখাবেন।

হংকং পৌঁছোতেই অদ্ভুত একটা ভয় সারা শরীরে জাঁকিয়ে বসল। একেবারে ভিনদেশ। ভিন ভাষা। আমি জানিও না জুই ই কে? হয়তো এখানের বড়োসড়ো কোনও গুন্ডা, কিংবা কে বলতে পারে পুলিশের কোনও বড়ো কর্মচারী নন? কটা টাকার লোভে এ কোন পথে আমি পা বাড়ালাম? বন্দরে পা রাখতেই প্রথম যেটা মনে হল, তা হল আমি ভয়ানক একা। জ্বোরো রুগির মতো সারা গা হাত পা কাঁপছে ঠকঠক করে। এক পা এগুতে সাহস হচ্ছে না। কিন্তু যে কাজে এসেছি, তা সম্পূর্ণ না করলে না খেয়েই মরে যাব হয়তো। তাই খানিক ভেবেচিন্তে কামালউদ্দিনের দোকানের খোঁজে গেলাম। বন্দর থেকে দোকান বেশি দূর নয়। তবে দোকানের বাঙালি কর্মচারী জানালেন, স্বাস্থ্যের কারণে কামাল দোকানে আজকাল বিশেষ বসেন না। তিনি একটু দূরে পাহাড়ি অঞ্চলে নিজের বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকেন।

অগত্যা সেখানেই যেতে হল। ধূসর পাহাড়ের কোলের এক কোণে কামালের ছোট্ট কুটিরখানি। লাল ছাউনি। চারিদিকে ঝোপগাছের নেড়া দেওয়া। দরজা খোলাই ছিল। নাম ধরে ডাকতেই বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ। বয়স অন্তত আশি তো হবেই। ন্যুব্জ দেহ। ধবধবে সাদা দাড়ি লুটোচ্ছে বুকে। আমি নিজের পরিচয় দিতে যেতেই উনি বললেন, ‘কিচ্ছু বলতে হবে না। এখানে খুব বেশি বাঙালির মুখ দেখা যায় না। প্রিয়নাথ আমাকে চিঠি আর বাক্স পাঠিয়েছে। ভিতরে এসো।’

আমি মনে মনে ভাবছি কোথাও একটা ভুল হয়েছে নিশ্চয়ই। এই বৃদ্ধ কিনা আমায় পথ দেখাবেন? এই অমায়িক ভদ্রলোককে দেখে আর যাই হোক খুনি মনে হওয়া অসম্ভব। তবু চেহারায় আর কীই বা যায় আসে?

ভদ্রলোক ঘরের ভিতর থেকে একটা কেরাসিন কাঠের বাক্স বার করে আনলেন। মাঝারি আকৃতির। ধরে দেখলাম ওজন খুব বেশিও না, আবার

একেবারে হালকাও বলা যায় না।

‘আপনি জানেন এতে কী আছে?’

‘না। চিঠিতে সেসব কিছু লেখা নেই। শুধু লেখা, তুমি এলে এই বাক্স তোমায় দিতে। এতেই তোমার পথের হদিশ আছে।’

একেবারে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কিছু জানেন না?’

মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। জানেন না।

‘আপনি জুই ই-কে চেনেন না?’

‘তা চিনব না কেন? এখানে সবাই জুই ই-কে চেনে।’

‘আপনি কি জানেন, প্রিয়নাথবাবু আমায় জুই ই-কে মেরে ইয়ান জি হং-এর মুক্তোর মালা নিয়ে ফিরতে বলেছেন?’

কামালউদ্দিনের মুখটা যেন কেমনতর হয়ে গেল।

‘এ কী বলছ তুমি? এখানের স্থানীয় চিনারা জুই ই বলতে শয়তানকে বোঝায়। যে সে শয়তান না, এই শয়তান মনের মধ্যে বাস করে মানুষকে দিয়ে খারাপ খারাপ কাজ করায়।’

‘বুঝলাম, জুই ই খুবই খারাপ লোক, কিন্তু…’

‘আরে না না, জুই ই হল হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা চিনাদের এক উপকথার দৈত্য। তুমি তাকে মারবে কী করে? আর ইয়ান জি হং-এর মুক্তার মালা? এসো, বাড়ির পিছনের বাগানে এসো। এই দ্যাখো…’

বাড়ির পিছন দিকে পাহাড়ের কোলে পরপর চার-পাঁচটা ছোটো ছোটো হ্রদ। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন একসারি মুক্তা কেউ গেঁথে রেখেছে একটা মালায়। সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে আমার বাক্যস্ফূর্তি হল না। কতক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না, সংবিৎ ফিরল বুড়োর কথায়।

‘এই হল ইয়ান জি হং-এর মুক্তোর মালা। গতবার হংকং-এ শো দেখাতে আসার সময় আমার বাড়িতে দুই রাত ছিল প্রিয়নাথ। দিনরাত এইদিকেই তাকিয়ে থাকত মুগ্ধ হয়ে। কিছু মনে কোরো না, জুই ই-কে তুমি মারতে পারবে কি না জানি না, তবে ইয়ান জি হং-এর মুক্তোর মালা নিয়ে দেশে ফেরা অসম্ভব। তোমার মতো মানুষকে সরল পেয়ে প্রিয়নাথ বোকা বানিয়েছে।’

আমার গলা প্রায় বুজে এসেছিল। ধরা গলায় বললাম, ‘কিংবা উলটোটা। আমার মতো বোকাকে মানুষ বানিয়েছেন।’

ঠিক তখনই মনে পড়ল ঘরে রাখা বাক্সটার কথা। চাবি তো আমার কাছেই ছিল। খুলে দেখলাম তাতে রং, তুলি, গোল করে গোটানো ক্যানভাস, প্যালেট, সব কিছু সাজানো আছে।

কামালের দিকে মুখ তুলে বললাম, ‘আপনার ভুল হচ্ছে। আমি ইয়ান জি হং-এর মুক্তোর মালাকে দেশে নিয়ে যাবই।’”

.

এইটুকু বলিয়া য-বাবু চুপ রহিলেন। তাঁহার চোখের কোণে অশ্রুবিন্দুটুকু কাহারও দৃষ্টি এড়াইল না। সীতাপতির প্রশ্ন করার স্বভাব। সে আবার কহিল, “দেশে ফিরে দুহাজার টাকা পেলেন?”

“আড়াই পেলাম। প্রিয়নাথবাবু এক আর্ট কনৌসারকে আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন। সে ছবি কে কিনেছিলেন জানেন? স্বয়ং বড়োলাট। শুনেছি এখনও লাটভবনে গেলে সে ছবি দেখা যায়। সেই থেকেই নামডাক, আর সেই থেকেই যা কিছু। মহাপ্রাণ মানুষ।”

.

সকলে একযোগে হাত জোড় করিয়া মস্তকে ঠেকাইয়া প্রফেসর প্রিয়নাথ বোসের আত্মার শান্তি কামনা করিলাম।

ওঁ শাস্তি! ওঁ শাস্তি! ওঁ শান্তি!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *