৭. ভিতরবাড়ি

৭. ভিতরবাড়ি

বর্ধমানের গাঁয়ের বাড়ি থেকে কলকাতার দুই কামরার ঘর অবধি একরকম ছিল, কিন্তু তামাটুলির জমিদারবাড়িতে এসে মাখনলতা যেন অথৈ সমুদ্রে পড়ল। একে তো এত বিশাল দালান সে আগে কোনও দিন দেখেনি, তার উপরে এ বাড়ির রকমসকম সব কেমন আলাদা। জমিদারমশাইয়ের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়েদের একজনের কলকাতায়, অন্যজনের শ্রীরামপুরে বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলের মধ্যে একেবারে ছোটোটির বিয়ে হয়েছে সবে এক বছর হল। জমিদার গিন্নি আর তাঁর বউমারা এই কালশীতেও রাত চারটেয় উঠে, পাতকুয়ার বাসি জলে স্নান করে, তুলসীগাছে জল দিয়ে রান্নাঘরে আসেন। ঠাকুর, চাকর, জোগালি সবই আছে, তবু তাঁদের সারাদিন রান্নাঘরেই থাকতে হয়। এইরকমই নিয়ম। বাড়ির ছেলেরা একটু বেলায় ঘুম থেকে ওঠেন। কুয়ার পাশে সারে সারে কলাইয়ের বাটিতে কর্তাদের কারও জন্য নিম বা পেয়ারার দাঁতন, কারও জন্য অষ্টবজ্র মাজন, আবার ছোটোকর্তার জন্যে কলিনোজ টুথপেস্ট।

সকালের জলখাবারে লুচির সঙ্গে আলু, পটল, কুমড়োর ছেঁচকি কিংবা মোহনভোগ। দুপুরে মাছ, মাংস, হাঁসের ডিম। মুরগি এ বাড়িতে ঢোকে না। খোকাকে দুপুরে খাইয়েদাইয়ে মাখনের চোখে ঘুম নেমে আসে। খোকা প্রায় সারারাত ঘুমোয় না। খেলা করে। তার সঙ্গে খেলা করতে হয়। তারিণী রাত জাগতে পারে না। খানিক খেলা করেই বেহুঁশ ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে রাত জেগে মাখনের সারাদিনই কেমন একটা ঘুম ঘুম পায়। এ বাড়িতে আবার দুপুরে ঘুমানোর নিয়ম নেই। বড়ো গিন্নি সবাইকে একসঙ্গে ছাতে ডাকেন। সেখানেই চলে গল্পগাছা, সেলাই ফোঁড়াই। অনেকসময় সবাই মিলে তাস নিয়ে গ্রাবু, বিন্তি খেলে। বিন্তি খেলায় মাখনের পূর্বপারদর্শিতা ছিল। ফলে অল্প সময়েই সে সব বউদের বেশ প্রিয় হয়ে উঠল। বিশেষ করে ছোটো বউ প্রতিমা, তার সমবয়সি। সে মাখনকেই পার্টনার করে দানের পর দান জিততে লাগল।

চারটে বাজতে না বাজতে গিন্নিরা উঠে গেলেন। বিকেলের অনেক কাজ বাকি।  ঝিকে দিয়ে ছাদ থেকে বড়ি, আচার, আমসত্ত্ব নামিয়ে আবার রান্নাঘরের তদারক। প্রতিমার এবেলা ছুটি। সে অন্দরমহলে গিয়ে মাখনের সঙ্গে গল্পগুজব করে।

“বড়দি বলছিলেন, তুমি নাকি দার্জিলিং-এও গেসলে?”

“গেছি বইকি। সে বিয়ের পথম পথম। ওখানে গিয়ে কল্যাণী নামে এক মিষ্টি মেয়ের সাথে আলাপ হয়েছিল। ওর বিয়েতেও নেমন্তন্ন করেছিল। যেতে পারিনি কো।

মাখন যখন প্রথম কলকাতায় এসেছিল, তখন কথায় গ্রাম্য টান পুরো মাত্রায় ছিল। এতদিনে কিছুটা কমলেও বেশ খানিকটা রয়ে গেছে।

“তাই বুঝি? আর এখানে আমি বুঝি মিষ্টি নই?”

খোকাকে কোল থেকে বিছানায় শোয়াতে শোয়াতে মাখন বললে, “তা কেন হবে ভাই? তুমিও ভারী মিষ্টি। তবে তোমরা এত বড়োলোক…”

“না গো দিদি, আমার শ্বশুরবাড়ি বড়োলোক। আমার নিজের তিন কুলে কেউ নেই। আমি বড়োলোক না। আমি অনাথ”, প্রতিমার চোখ জলে ভরে এল।

এক অর্থে মাখনের অবস্থাও তাই। এক রাত্রে সে পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে। বাপের বাড়ির আত্মীয় বলতে যে পিসি বেঁচে ছিলেন, তিনিও গত। তারিণী ছাড়া তার জীবনেও আর কেউ নেই। অজান্তেই প্রতিমার মনের তারে সে যে আঘাত দিয়ে ফেলেছে তা যে বড়ো বেদনার মতো মাখনের নিজের বুকেই বাজতে থাকবে, কে জানত? সে-ও হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল। কান্নাকাটির পালা মিটলে মাখন জিজ্ঞাসা করল, “তবে এই বাড়িতে তোমার বিয়ে হল কীভাবে?”

আঁচলের খুঁটে চোখের জল মুছে প্রতিমা বলল, “সে এক গল্প। রূপকথার গল্পের মতো বলতে পার। আমি এখানকার মেয়ে নই। কলকাতার বাগবাজারের মেয়ে। বৃন্দাবন পাল ফার্স্ট লেনে আমাদের বাড়ি ছিল। বাবা ঈশ্বর নৃত্যলাল মজুমদার ছিলেন ডাক্তার চুনীলাল বসুর কম্পাউন্ডার। চুনীলাল বসুর নাম শুনেছ তো?”

মাখন মাথা নেড়ে জানাল, সে শোনেনি।

“সে কী গো! এত বড়ো ডাক্তার দেশে আর কটা আছে? ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের হাঁপানি তো উনিই সারালেন। তা যা বলছিলাম, ছেলেবেলা ভালোই কেটেছিল, মিথ্যে বলব না। মেম ইস্কুলে প্যারী সরকারের ফার্স্ট বুক অবধি পড়েছিলাম। বাংলায় বর্ণপরিচয়, কথামালা, বোধোদয় আর বাড়িতে মায়ের কাছে নারীর কর্তব্য। তারপরেই বছর দেড়েক আগে কলকাতায় প্লেগ এল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে প্লেগে বাবা-মা দুজনেই শেষ। আমি অভাগী বেঁচে রইলাম। আমার প্লেগও হল না, মরলামও না। সবাই তখন শহর ছেড়ে পালাতে ব্যস্ত। আমি ডাক্তারবাবুর কাছে গেলাম। ডাক্তারবাবু আমায় খানিক জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। তারপর নিয়ে গেলেন ভগিনী নিবেদিতার কাছে। নিবেদিতা আমায় কত আদর করলেন, শেষে ডাক্তারবাবুকে বললেন, “কলকাতায় ভয়ানক বিভীষিকার অবস্থা চলছে। অবিলম্বে প্লেগ নিরাময়ের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বামীজি আমাকে সে দায়িত্ব দিয়েছেন। ভোর হতে না হতে আমি আর সদানন্দ মিলে বেরিয়ে যাই ঝাড়ুদার বাহিনীর তদারক করতে। ফেরার কোনও ঠিক নেই। এই কচি মেয়ের দায়িত্ব নিলে ওর প্রতি অন্যায় হবে। আপনি এমন ব্যবস্থা করুন যাতে ও এই শহর ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে পারে।”

“তারপর?”

“তারপর আর কী? ডাক্তারবাবুর আর-এক পরিচিত সায়েব ডাক্তার ছিলেন। নাম ডাক্তার ওয়ার্ড। চিৎপুর হাটখোলায় চেম্বার। সদ্য সদ্য প্লেগে মারা গেছেন। তাঁরই বিধবা আমাদের মাদাম এলা। মাদামকে চেনো তো? এই চার্চের পাশেই হোমটা চালান।”

মাখন আবার দুদিকে মাথা নাড়ল।

“মানুষ নয় গো, উনি সাক্ষাৎ দেবী”, প্রতিমা বলেই চলল, “এমনিতে ওয়ার্ড সায়েবের মেয়ের বয়সি। শুনেছি দ্বিতীয় পক্ষ। কিন্তু বরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। ডাক্তারও তাঁকে নানা কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই ধরো ইঞ্জেকশান দেওয়া, জ্বর মাপা, বাচ্চা বিয়োনো… এত বড়ো ডাক্তার প্লেগে ফৌত। কী কপাল ভাবো একবার! মাদাম ঝরঝর করে বাংলা বলতে পারেন। আমায় বললেন, ‘আমার সঙ্গে যাবি প্রতিমা? এই পাপের শহরে আমরা আর থাকব না।’ আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। করেই বা কী হবে? কে-ই বা আছে আমার? বললুম, ‘যেখানে নিয়ে যাবেন, যাব।’ মাদাম এখানে নিয়ে এলেন। হোমের কাজ শেখালেন। প্রথম প্রথম সাঁওতাল মেয়ে বউদের জ্বরজারির ওষুধ দিতুম। এখানের ডাক্তার পিয়ার্সন সাহেবও আমায় খুব ভালোবাসেন। এই হোমেই তো আমার উনি প্রথমবার আমায় দেখেছিলেন”, বলে প্রতিমা একটা লাজুক হাসি হাসল।

“সে কী গো? কীভাবে?”

“উনি ছোটো থেকেই এই সাঁওতালদের সঙ্গে মেশেন। জমিদারের ছেলে হয়েও। এত ভালো সাঁওতালিতে কথা বলেন, কী বলব! এলা ম্যাডাম আমাকে আর ওঁকে নিয়েই শুরুতে গ্রামে যেতেন। আর সেখানেই আমরা দুজনে… প্রতিমা আর কিছু বলল না। মাখন মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বেশ খানিকটা হেসে নিল। ছড়া কেটে বলল-

যাদের নিয়ে মেম চলেছে
ছেলে মেয়ে দুইজনে
আপন ভাবেই বিভোর থাকে
কিছুই নাকি শোনে।

প্রতিমা কপট রাগ দেখিয়ে বললে, “এ তোমার ভারি অন্যায় ভাই। এমন করলে আর কিছুই বলব না।”

আলোচনা হয়তো আরও কিছু এগোত, হঠাৎ এক চাপা কান্নার আওয়াজে দুজনেই চমকে উঠল।

“কে কাঁদে ভাই?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল মাখন।

“তাই তো, দাঁড়াও দেখি”, বলে একছুটে প্রতিমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এদিকে মাখনের খোকা বিছানায় প্রস্রাব করে ঘুম ভেঙে বেজায় চিৎকার জুড়ে দিলে। এখন তাকে কোলে নিয়ে গা মুছিয়ে বুকের দুধ না খাওয়ালে থামবে না। প্রতিমা ঘর থেকে বেরোনোর খানিক বাদেই বাইরে থেকে ভেসে আসা সেই কান্না বন্ধ হয়ে গেল। আরও মিনিট পনেরো বাদে প্রতিমা হাত ধরে একটি প্রায় গুটিশুটি কালোকোলো মেয়েকে ধরে নিয়ে মাখনের ঘরে ঢুকলে। খোকা ততক্ষণে মাখনের কোলেই আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।

“এ কাকে নিয়ে এলে প্রতিমা?”

“সেই যে জাদুকর গণপতি, যাকে পুলিশে খুনের দায়ে ধরেছে, এ তারই দলে খেলা দেখায়। বলের খেলা। আমি সেদিন নিজে সেখানে বসে দেখেছি। কী দারুণ সে খেলা, না দেখলে প্রত্যয় হবে না।”

মাখন মেয়েটিকে খাটে বসতে বললে। সে বসল না। মেঝেতে জড়োসড়ো হয়ে বসল।

“কী হয়েছে তোমার? কাঁদছিলে কেন? তোমার নাম কী?”

মেয়েটি উত্তর দিল না। এবার প্রতিমা বলল, “নাম জিজ্ঞেস করছেন যে, নাম বলো।”

“আজ্ঞে হরিমতী।”

“হরিমতী? কিন্তু সেদিন যে শুনলাম হিঙ্গনবালা!” প্রতিমা অবাক।

“আজ্ঞে ও আমার স্টেজের নাম। প্রোফেসর বোস দিয়েছিলেন।”

“কিন্তু তুমি অমন করে কাঁদছিলে কেন?”

“কাঁদছিলাম আমার পোড়া কপালের কথা ভেবে। ও ছাড়া আমার আর যে কেউ নেই। কিন্তু সেসব শুনে আপনারা আর কী করবেন?” হরিমতীর চোখ আবার জলে ভরে এল।

প্রতিমা তার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে বলল, “তাও বলো। আমরা দুজনেই একসময় সব হারিয়েছি। তুমিও নাহয় আমাদের সই হলে।”

হরিমতী নিজের কথা বলে যেতে লাগল আর সমাজের তিন আলাদা আলাদা তলায় থাকা তিনজন অনাথা মেয়ের চোখের জল মিলেমিশে ঘরের বাতাসও যেন বেশ খানিকটা আর্দ্র হয়ে উঠল।

.