চতুর্দশ অধ্যায়—অনেক কমলারঙের রোদ

চতুর্দশ অধ্যায়—অনেক কমলারঙের রোদ

“এবার?” বাইরে বেরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ডাক্তার হান্টার।

“পুলিশ স্টেশন। অনেকদিন আগে ঘটা একটা খুনের বিষয়ে খবর নিতে হবে।”

“কার খুন?”

“সেই কার্মি সর্দারের। নাম কী ছিল তাঁর?”

“লোবসাং। গলায় দড়ি পেঁচিয়ে খুন করেছিল কেউ।”

“আপনি তখন এখানেই ছিলেন?”

“লন্ডন থেকে সবে ফিরেছি। সর্দারের ভাইয়ের সঙ্গে সর্দারের বনত না। সবাই ধরে নিয়েছিল সেই ভাই-ই খুন করেছে। তবে ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি হইচই হয়নি। ওর ভাই এখন ওদের গোষ্ঠীপতি।”

“আর একটা প্রশ্ন, এই ওফেলিয়াকে তো খুব ভালো চিনতেন আপনি। কেমন মেয়ে ছিল সে?”

“কেমন বলতে?”

“চরিত্র ইত্যাদির কথা শুনতে চাই না। স্বভাব। একজন অচেনা মানুষ প্রথম দেখলে কী বুঝবে?”

“মরা মানুষের বদনাম করতে নেই শুনেছি। যিশু পাপ দেন। কিন্তু আমি খুব বেশি ধার্মিক নই। বলতেই পারি। বেশ উদ্ধত ছিল ওফেলিয়া। উদ্ধত আর অহংকারী। ওর বাবা চার্লস মা-মরা মেয়েকে বড্ড বেশি আহ্লাদে মানুষ করেছিলেন। কোনও কিছু চাইলে পেয়েই ছাড়ত। এমন জেদ। আর পাবার জন্য যা খুশি করতে পারত। এই যেমন ইদানীং খুব সন্তানের শখ চেপেছিল।”

“ইদানীং?”

“বছরখানেক। ও বেশ কয়েকবার আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেছে কেন ওদের সন্তান হচ্ছে না। সাধ্যমতো উপায় বাতলেছি। বলেছি জর্জেরও পরীক্ষা করাতে। কিন্তু জর্জ রাজি নয়। হতাশায় বেশ কয়েকবার হাত কেটে আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিল। আমিই সারিয়ে তুলি। আসলে একসময় ভেবেছিল এ জন্মে ওর মা হওয়া হবে না। কিন্তু মারা যাবার সময় তো…” বলে আচমকা একেবারে চুপ মেরে গেলেন ডাক্তার। দুজনে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছিলেন পুলিশ স্টেশনের দিকে। আচমকা এক ভুটিয়ার দিকে চোখ পড়ল তারিণীর। ডাক্তারের আস্তিন ধরে সেদিকে দেখিয়ে উত্তেজিত তারিণী বলল, “ওই যে, দেখুন দেখুন। ওই লাল পশমের জামা পরা লোকটা। চেনেন ওকে?”

“হ্যাঁ, চিনি বইকি। ওয়াংডুপ ভুটিয়া। জর্জের চা বাগানের কামিনদের সর্দার। বুদ্ধিমান ছেলে। বাংলা, ইংরাজি সব জানে। কেন?”

“বাংলা জানে?” শুনেই লাফিয়ে উঠল তারিণী।”আপনি থানার দিকে যান ডাক্তারবাবু, আমি আসছি।” বলে কোথায় যেন ছুট লাগাল তারিণী। পুলিশ স্টেশনের সামনে হান্টার প্রায় আধাঘন্টা অপেক্ষা করার পর তারিণী এল। বেশ খুশি খুশি ভাব। থানায় অবশ্য বিশেষ লাভ হল না। লোবসাং নামে কারও কোনও খুনের মামলা কোনও দিন থানায় রুজুই হয়নি। ডাক্তার হেসে তারিণীকে বললেন, “তোমায় আগেই বলেছিলাম।”

বাড়ি ফিরে প্রথমেই নলিনীবাবুর ঘরে গেল তারিণী। ঘুমোচ্ছেন। জ্বর কমেনি। তবে ভুল বকাটা বন্ধ হয়েছে। মাঝেমাঝেই নাকি মৃতা স্ত্রীয়ের নাম ধরে কঁকিয়ে উঠছেন। কল্যাণী একা থাকলে কী হত জানা নেই, তবে মাখন এ ব্যাপারে বেশ করিৎকর্মা দেখা গেল। সে নলিনীর মাথা ধুইয়ে ওডিকোলনের জলপটির ব্যবস্থা করে ফেলেছে এতক্ষণে। ডাক্তার হান্টার সঙ্গে আসেননি। তবে বলেছেন যে-কোনওরকম বাড়াবাড়ি হলে খবর দিতে। তারিণী নিজেদের ঘরে এসে কাগজ কলম নিয়ে আবার আঁক কাটতে বসল। সব মিলিয়ে আসলে একটাই বড়ো প্যাঁচ। নানাভাবে ঘুরে ঘুরে আসছে!

যখন মাখন ঘরে ঢুকল, তারিণী তখন অস্থিরভাবে গোটা ঘরে ঘুরে হাঁটাচলা করছে। মাখন খানিক তার চলা দেখল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “আপনি খাবেন না?”

“ইচ্ছে করছে না।”

“সবাই এমনি করলে হয়? বলুন দেকি? কাকাবাবু খাননি, সে নাহয় বোজা গেল। কল্যাণী খেতে চাইচে না। আপনিও। আমার যে বড্ড খিদে পেয়েচে।”

হেসে ফেলল তারিণী।

“চলো তবে। তার আগে আমি একটু গরম জলে নেয়ে আসি বরং। তুমি চাকরটাকে গরম জল দিয়ে যেতে বলো।”

মাখন বলেই চলছিল, “বেচারি মেয়েটা। সারাদিন শুদু কাঁদচে আর বলচে, তবে যে বাবা বলেচিলেন, যে অভিশাপ দেয়, সে শেষ হলেই অভিশাপের বিনাশ ঘটে? তিন বচর হয়ে গেল। এই অভিশাপ আর কবে আমাদের ছেড়ে যাবে? আমি সাদ্যমতো বোজালুম। কিন্তু সে কি আর বোজে? এখন আপনিই ভরসা।”

বিয়ের পর সামান্য এই কয়দিনে মাখন যে ধীরে ধীরে তার স্বামীকে একটা কেউকেটা ভাবতে শুরু করেছে, তা ভেবে এই বিপদের মধ্যেও তারিণীর মনে বেশ পুলক জাগল। মুখে বলল, “দেখি, কতদূর কী পারি? চেষ্টা তো চালিয়ে যাচ্ছি। আজ জর্জ উইলিয়ামসনের মরাটাকে কিছুতেই…

“আর শুনুন, যে দুটো প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তর পেয়েছি।”

“পেয়েছ? বাহ। কী উত্তর?”

“বছর দু-এক হল কুমুদবাবুর সঙ্গে কল্যাণীর মেলামেশা। তাও কল্যাণীর ইচ্ছেয় না। কাকাবাবু জোর করেচেন তাই। এখন তো কল্যাণী ঠিকই করে নিয়েচে সে এই বিয়ে করবে না। যতই কাকাবাবু জোর করুন। কাকাবাবু সুস্থ হলে সে সব খুলে বলবে। আর কুমুদবাবুর এই ব্যাগখানা আমাদের ঘরেই রয়ে গেচে। কল্যাণীকে দিতে চাইলাম। নিল না। এটা আপনি ওকে ফেরত দিয়ে দেবেনখন।”

যেন ভূত দেখছে এমন করে তারিণী সেই ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ জ্বলজ্বল করছে। মুখে কেমন একটা বিহ্বল ভাব। মাখন ব্যাগটা তারিণীর হাতে ধরিয়ে বিছানা টানটান করতে করতে বলতে লাগল, “এই বাড়িতে নাকি ফুলি নামের একজন নেপালি মেয়ে কাজ করত। মেয়েটা খারাপ না। তবে ভূতপ্রেতে ভয়ানক বিশ্বাস। কল্যাণী বললে ও-ই কাকাবাবুর মাতায় এসব ঢুকিয়েচে। কল্যাণী ওকে বিদেয় করলেও সে মেয়ের বিশেষ সমস্যা হয়নি। যে মেমসায়েব মারা গেলেন, তার বাড়ি কাকাবাবু ওকে মেমসাহেবের খাস চাকরানি করে…”

মাখনের কথা শেষ হল না। আচমকা মাখনকে জড়িয়ে ধরে গালে, মুখে, ঠোঁটে একের পর এক চুম্বনে ভরিয়ে অস্থির করে দিল তারিণী।”এ কী!! কী করচেন আপনি? ছি ছি! কেউ এসে যাবে। ছাড়ুন!” মুখে যতই বলুক না কেন, এক অজানা পুলকে মাখনলতার হৃদয় ভরে উঠছিল। তার স্বামী যে তাকে অবশেষে গ্রহণ করেছেন আর সে যে তার স্বামীর উপযুক্ত হয়ে উঠতে পেরেছে সেই অপূর্ব ভাবে মাখনের সারা দেহে কাঁটা দিয়ে উঠল।

“সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে মাখন। সবটা। আর তুমি না থাকলে এমনটা সম্ভব হত না একেবারেই। এখন কাজ বলতে দুটো। এক, এখুনি দার্জিলিং স্টেশনে যেতে হবে। দুই, একখানা চিঠি লিখে কাল ভোরে কাউকে দিয়ে সেটা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”

“কাকে?”

“পাঁচ বছর আগে মরে যাওয়া এক ভূতকে।”