গোধূলিসন্ধি – পূর্বকথন

পূর্বকথন

১৮৯৬ সালের ডিসেম্বর মাস নাগাদ মহারাষ্ট্রের পুনা শহর এবং তার চারপাশে প্লেগের ভয়ানক উৎপাত দেখা দিল। রোগ দমনে নিয়োগ করা হল ওয়াল্টার চার্লস র‍্যান্ড নামের এক বদমেজাজি, সন্দেহপ্রবণ, নিষ্ঠুর, দাম্ভিক সিভিল সার্ভেন্টকে। দেহপরীক্ষার নামে সবার সামনে নির্বিচারে নারী পুরুষকে উলঙ্গ করে দেখা হত পশুদের মতো। উল্লসিত হয়ে উঠত সাদা চামড়ার মিলিটারিরা। তাদের হাত অশালীনভাবে ঘুরে বেড়াত মারাঠি মা-বোনেদের দেহে।

১৮৯৭ সালের ২২ জুন, রাত এগারোটায় মহারানির জুবিলি উৎসব বার্ষিকীর শেষে গভর্নর হাউস থেকে খানাপিনা সাঙ্গ করে র‍্যান্ড-এর ঘোড়ায় টানা বগি গাড়ি বেরোতেই তার পিছন থেকে লাফ মেরে উঠে র‍্যান্ডের মাথা লক্ষ্য করে পিস্তল থেকে গুলি চালালেন এক যুবক। ঠিক আগের গাড়িতেই ছিলেন র‍্যান্ডের স্যাঙাত আয়ার্স্ট। তিনি কিছু বোঝার আগেই তাঁর গাড়িতেও অন্য একজন চড়ে একইভাবে খুন করলেন তাঁকে। স্ত্রীর কোলে ঢলে পড়লেন তিনিও। দণ্ডদান করে দণ্ডদাতারা রাতের অন্ধকারে উধাও হয়ে গেল। চমকে উঠল গোটা ভারতবর্ষ। এমনও সম্ভব!

এই ঘটনার পর প্রায় দুই বছর কেটে গেছে। ১৮৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের আট তারিখ। এসময় পুনা শহরের আশেপাশে সন্ধে হলেই জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ে যায়। খুব দরকার না থাকলে ঘরের বাইরে কেউ বেরোয় না খুব একটা। জনশূন্য প্রায়ান্ধকার রাস্তায় এক দোকানের গায়ে ছায়ার সঙ্গে মিশে রয়েছে যে তিন যুবক, তাদের দুজন কিছুদিন পরেই ভারতের ইতিহাসে চিরকালের মতো নিজের নাম খোদাই করবে। এরা দুজনেই মারাঠি। বয়সে অপেক্ষাকৃত বড়ো যে জন, সে আগে পুনায় গভর্নমেন্ট ওয়ার্কশপে শিক্ষার্থী ছিল। এখন সেসব ছেড়ে বিপ্লব সংস্থায় যোগ দিয়েছে। নাম মহাদেব বিনায়ক রানাডে। আয়ার্স্ট-এর মাথায় গুলি চালিয়েছিল এই যুবকই।

অপরজনের বড়দা দামোদরকে বছরখানেক আগেই অত্যাচারী র‍্যান্ড আর আয়াস্টকে হত্যার জন্য ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে ইংরেজ সরকার। মেজদাদা বালকৃষ্ণ আড়ালে উধাও হয়ে গেলেও গত বড়দিনের সময় বিশ হাজার নগদ পুরস্কারের লোভে তাকে ধরিয়ে দিল দলেরই দুজন। এখন সে পুনা জেলে। হত্যার ষড়যন্ত্রের মামলা শুরু হবে আর দুদিন বাদেই। অন্তত সেরকমই খবর। সবচেয়ে ছোটো ভাই বাসুদেব হরি চাপেকরকে এখনও কিশোরই বলা চলে। ঢলঢল মুখখানি। গোঁফের রেখা সদ্য উঠেছে। প্রায়ই তাকে থানায় ডেকে নিয়ে যায় পুলিশ। অত্যাচার করে। নানা প্রশ্ন করে বিরক্ত করে তোলে।

বাসুদেব, বিনায়ক আর তাদের এক বাঙালি বন্ধু গিরীন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত মিলে স্থির করল যারা এই দেবতুল্য দুই ভাইকে ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে পারে, তাদের আর বাঁচার কোনও অধিকার নেই। বালকৃষ্ণকে গ্রেপ্তার করেছিল ইংরেজদের ধামাধারী এক নেটিভ হেড কনস্টেবল। নাম রামপাণ্ডু। ঠিক হল একেই সবার আগে সরাতে হবে। একবার হাতের নাগালে পেয়েও কিছু করতে পারেনি বাসুদেব। আজ গিরীন পাকা খবর এনেছে। এই পথেই রোজ রাতের বেলা বাড়ি ফেরে রাম। তিনজনের কোঁচড়ে গোপনে লুকানো মাউজার সি ৭৮ ওবেরনডর্ফ রিভলভার। এই পথে রাম এলে তাকে আর বেঁচে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে না।

দুই ঘণ্টা কেটে গেল। রাম তো দূরস্থান, একটা জীবিত প্রাণীরও দেখা নেই। গোটা পুনা শহর যেন কালঘুমে আচ্ছন্ন।

“কী করব? ফিরে যাব?” বলল বিনায়ক।

“প্রশ্নই নেই। মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়েছি। দাদাদের উপর অন্যায়ের শোধ নেব। খালি হাতে ফেরা যাবে না।”

“কিন্তু রামপাড় আর এদিকপানে আসবে বলে তো মনে হয় না।”

“আমার একটা প্রস্তাব আছে”, গিরীন বলে উঠল।”আমরা ভুল লোকের পিছনে ছুটছি। রামকে ছাড়ো। শুনেছি ডেভিড ভাইয়েরা আজই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। আজ রাতে ওরা নিজেদের বাড়িতেই কাটাবে। আমি ওদের বাড়ি চিনি। যদি বলো…”

ড্রেভিড ভাইদের নাম শুনতেই বাসুদেবের রক্ত গরম হয়ে উঠল। এই দুই ভাই বিশ হাজার টাকার লোভে বালকৃষ্ণকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। এতদিন পুলিশ কাস্টডিতে জামাই আদরে ছিল। তাদের খবরের উপর ভিত্তি করেই বাসুদেব আর বিনায়ক রানাডেকে থানায় ডেকে অত্যাচার করেছে পুলিশ। পরশু বালকৃষ্ণের শুনানি শুরু। তাই আজই দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে স্বয়ং ইংরেজ সরকার তাদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছেন।

রাত দশটা নাগাদ তিনজন চুপিচুপি এসে দাঁড়াল ড্রেভিডদের বাড়ির সামনে। কান পেতে শুনতে পেল গলার আওয়াজ। গিরীনের মনে হল তিনজন। খানিক বাদে উঁকি মেরে দেখল, তিনজন না, গণেশ আর রামচন্দ্র দুই ভাই মিলে খাটে বসে তাস খেলছে। বাসুদেব আর বিনায়ক এদের চেনা। তাই ভিতরে যাবার দায়িত্ব নিল গিরীনই। দরজা খোলাই ছিল। একটু যেন হাঁফাতে হাঁফাতে ভিতরে ঢুকে গিরীন বলল, “পুলিশ সুপার ইয়েথে আলা আহে। কৃপয়া বাহের আ।” গিরীনের মাথায় পাগড়ি। পরনে আঁট ধুতি। কে বলবে সে যে মহারাষ্ট্রীয় নয়?

গণেশ “বাহের খাম্বা” বলে শান্তমতে তাস গুটাতে শুরু করতেই গিরীনের কেমন যেন একটা খটকা লাগল। বুঝতে না বুঝতে গণেশ গাল পাড়ল, “মূর্খে বাহের যা”। এরপর আর থাকা চলে না। খানিক বাদে দুই ভাই বাইরে এসে কয়েক পা এগুতেই একসঙ্গে গর্জে উঠল বাসুদেব চাপেকর, বিনায়ক রানাডের আর গিরীন দত্তগুপ্তের তিনখানি মাউজার পিস্তল। ম্যাগাজিন খালি হতেই তিনজন পালাল তিনদিকে। পাড়ার লোক যখন ভিড় করে এল, তখন গণেশ মৃত। রামচন্দ্র মারাত্মকভাবে আহত। পরের দিন হাসপাতালে সেও ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে।

গিরীনের সন্দেহ একেবারে সঠিক। সেদিন সেই ঘরে দুই ভাই ছাড়াও আরও একজন ছিল। কাকতালীয় কি না জানা নেই, এই তৃতীয় ব্যক্তিটিও বাঙালি। নাম অজিত বটব্যাল। হা-ঘরে এই ছেলেটি ছোটো থেকেই জালিয়াতি, জোচ্চুরিতে পটু। কলকাতায় হল অ্যান্ডারসনের দোকান থেকে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে জেলও খেটেছে একবার। বছর তিনেক আগে পালিয়ে পুনায় চলে আসে। আর এখানে এসেই গণেশ ডেভিডের জোচ্চুরির দলে নাম লেখায়। মাত্র কয়েকদিনে অজিত এদের সবচেয়ে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে। এতটাই যে, জেলে থাকার সময় অজিতের হাতেই গোটা দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিল দুইজন। সেদিন বাড়িতে আসার পর তিনজনে মিলে খেয়েদেয়ে বসেছিল তাস খেলতে। গিরীন তাদের তিনজনেরই গলা শুনতে পেয়েছিল। আচমকা বাহ্যের বেগ আসায় অজিত উঠে যেতে বাধ্য হয়। গিরীন ঘরে ঢুকে খাটে তিন সেট তাস দেখে সন্দেহ করার পরেও কিছু করতে পারেনি। বাড়ির উঠোনে গণেশ আর রামচন্দ্র যখন মরছিল, আড়াল থেকে গোটাটাই দেখেছিল অজিত। রাস্তার বিজলিবাতি এসে পড়েছিল চেনা দুজনের মুখে। তবে আরও একজন ছিল সেই দলে। যাকে শুধু পিছন থেকে সে দেখতে পেয়েছে। যে দৌড়াতে গেলে সামান্য খোঁড়ায়।

১০ ফেব্রুয়ারি অজিতের বয়ানের ভিত্তিতে বিনায়ক আর বাসুদেবকে ইন্টারোগেশানের জন্য ডাকল পুলিশ। সেদিনই তাদের গ্রেপ্তার করা হল। অনেক অত্যাচারের পরেও তারা তাদের তৃতীয় সঙ্গীর নাম বলেনি। ১৮৯৯ সালে ২ মার্চ দুজনকে দায়রায় সোপর্দ করা হল। বিচারক ফাঁসির হুকুম দিলেন। ৮ মে আর ১০ মে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরলেন বাসুদেব চাপেকর আর বিনায়ক রানাডে। কিন্তু কীভাবে যেন ছড়িয়ে পড়ল অজিতের নাম। গোপনে ফিসফিসানি শুরু হল। বেইমানের এ জগতে ঠাঁই নেই। ইংরেজ সরকার এর আগে কথা দিয়েও ড্রেভিডদের বাঁচাতে পারেননি। অজিতের বেলায় তাই তাঁরা আর কোনও ঝুঁকি নিলেন না। অজিতকে অত্যন্ত গোপনে অন্য প্রেসিডেন্সিতে পাঠিয়ে দিলেন। এমনকী এ কথা পুলিশ আর সরকারের একদম মাথায় থাকা জনাকয়েক বাদে কেউ জানল না। অন্যদিকে গোটা পুনা জুড়ে চিরুনি তল্লাশির পরেও ডেভিড হত্যার তৃতীয় সন্দেহভাজন গিরীন্দ্রনাথ দত্তগুপ্তর খোঁজ পাওয়া গেল না কোথাও সে যেন বিলকুল হাওয়ায় উবে গেছে।

.