২. প্রাইভেট ডিটেকটিভ
শহর কলকেতায় দুর্গাপুজো সবে শেষ হয়েছে। কিন্তু আমোদ আহ্লাদ এখনও কিছুমাত্র কমেনি। উনিশ শতকের শেষ পুজো বলে কথা। বাড়ির ঠাকুরদের ভাসান সব শেষ হয়ে গেলেও ইদানীং বারোয়ারি দুর্গাপুজোর গাদি লেগেছে। তাদের প্রতিমা এখনও ঝিলমিলে চাঁদোয়ার তলায় হ্যাজাকের আলোয় ফুটফুট করছেন। মোড়ে মোড়ে মহা ভিড়। দিন আর রাত উভয়ই প্রায় সমান। ফলে না শীত, না গ্রীষ্ম। চিৎপুর রোডের বিজলিবাতির অপূর্ব শোভা এখনও খোলা হয়ে ওঠেনি। গ্রাম থেকে বহু মানুষ কাতারে কাতারে সেই আলোর চেকনাই দেখতে রাস্তার এপার থেকে ওপার উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়াচ্ছেন। কে কার ঘাড়ে পড়ে, কে কার পকেট মারে, তার কিছুই ঠিক নেই। সবাই নিজের প্রাণ আর পকেট নিয়ে ব্যস্ত। পিকপকেটের দল কাতায় কাতায় ফিরছে। পুলিশের নাভিশ্বাস দশা। কোনখানে খুন, কোনখানে দাঙ্গা, কোথাও সিঁদচুরি, কোথায় কোন সোনার দোকানে ডাকাতি হয়েছে, কোথায় কোন মহিলার নাকের নথ ভিড়ের মধ্যে ছিঁড়ে নিয়েছে, এই নিয়ে পুলিশ জেরবার। আজকাল আবার নতুন আপদ এসেছে, মেয়ে পকেটমার। পাশপকেট থেকে টাকা সরিয়েই তারা সোজা বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। ধরা পড়লে সেখান থেকে সে টাকা উদ্ধার অসম্ভব। ধরলে পরে চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করে। তাদের মধ্যে কিছু নতুন চ্যাংড়া টিংবাজ-ও থাকে। শেষে যার টাকা চোট গেল তাকেই দু-ঘা মেরে দেয়।
তারিণী দ্রুত পায়ে ভিড় ঠেলে বাড়ি ফিরছিল। আজ ঘর থেকে বেরোবার ইচ্ছে ছিল না বিশেষ। কিন্তু আশুবাবুর লাইব্রেরির বইগুলোর এক অদম্য নেশা আছে। একবার ধরলে কাটানো মুশকিল। মাস চারেক হল হাইকোর্টের নামজাদা উকিল আশু মুখুজ্যের সঙ্গে তার আলাপের সুযোগ হয়েছে। ভদ্রলোক বয়সে তারিণীর চেয়ে সামানাই বড়ো হবেন, কিন্তু দেখলেই কেমন একটা সম্ভ্রম জাগে। আশুবাবুর বইয়ের সংগ্রহ বিশাল। বাংলায় অমনটি খুব কম মানুষেরই আছে। বাড়িতে বিরাট বিরাট সব ঘর আগাপাশতলা বইতে ঠাসা।
একদিন এন্টালির জোড়া গির্জার পাশের ফুটপাথে রহমতের দোকানে বুনিয়ানের পিলগ্রিম প্রোগ্রেস-এর এক অতি দুষ্প্রাপ্য সংস্করণ দেখে কৌতূহলী হয়ে আশুবাবু বই হাতে নিতেই তাঁর একগাল মাছি। এ কী! এ যে তাঁরই বই! এমনকী তাঁর নিজের হাতে নাম সই অবধি আছে। রহমত বিশেষ কিছু বলতে পারলে না। সে নানা দালালের থেকে বই কেনে। তাদের মধ্যে কে দিয়েছে মনে নেই। খুঁজে দেখতে গিয়ে সেই লটে নিজের লাইব্রেরির আরও বেশ কয়েকটি বই চোখে পড়ল তাঁর। বুঝলেন অজান্তেই লাইব্রেরি থেকে বই চুরি হচ্ছে। কিন্তু লাইব্রেরির দরজা তো তালা মারা থাকে, আর সে চাবিও তাঁর কাছেই।
অগত্যা লালবাজারের দারোগা প্রিয়নাথের শরণাপন্ন হলেন আশুতোষ মুখুজ্যে। প্রিয়নাথ পরামর্শ দিলেন, এসব কাজে পুলিশের চেয়ে বেশি কাজে দেয় প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তাঁর সন্ধানে একজন ভালো ছেলে আছে। কলকাতার প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। নাম তারিণীচরণ রায়। আশুবাবু চাইলে তিনি ছেলেটিকে নিয়ে আসতে পারেন।
তারিণীর এখনও মনে আছে সেই দিন। ৭৭, রসা রোডের প্রাসাদপ্রমাণ বাড়ির দাওয়ায় একটা ছোটো জলচৌকিতে খালি গায়ে হাঁটু অবধি ধুতি তুলে বসে ছিলেন বিরাট চেহারার মানুষটি। মাথায় বাটিছাঁট চুল, কিন্তু চুলের অভাব মিটিয়ে দিচ্ছে বিরাট মোটা ঝোলা গোঁফ। এমন গোঁফ তারিণী আগে দেখেনি। এক রোগাপানা চাকর প্রাণপণে তাঁর পিঠে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। প্রথমে তারিণীকে দেখে খুব একটা ভরসা পাননি আশুতোষ, কিন্তু মাত্র দিন চারেকের মাথায় আশুবাবুর বইবাঁধিয়ে ইসমাইলকে যখন তারিণী হাতেনাতে ধরল, তখন তিনি মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না। এই সামান্য কাজে তারিণী কোনও পারিশ্রমিক নেয়নি। বলেছিল, “আজ্ঞে আমি গরিব মানুষ। ইচ্ছে থাকলেও ভালো ভালো বই পড়ার উপায় নেই। যদি এই লাইব্রেরির কিছু বই আমাকে পড়তে দেন… চিন্তা নেই, আমি এখানে বসেই পড়ব।”
আশুবাবু মহানুভব। সঙ্গে সঙ্গে চাকর কেদারকে দিয়ে লাইব্রেরি রুমে তারিণীর জন্য একটা চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখন সময় পেলেই তারিণী এখানে এসে পড়াশোনা করে যায়। কত বিচিত্র সব বই। আশুবাবুর কাছেই প্রথম তারিণী শেখে রেয়ার, প্রেশাস, লিমিটেড, ফার্স্ট এডিশন আর ড্যাডি অফ দ্য লটের নাম। জানতে পারে নাম্বারড এডিশনের কার দাম কত। পড়তে পারে বিদেশে প্রকাশিত নানা পত্রপত্রিকা। লন্ডন টাইমস কিংবা নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় বই ১৮৮৯-এ ছাপা পঁচিশ ভল্যুমের ‘এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা’-র স্কলারস এডিশন। বেশিরভাগ সময় এতেই ডুবে থাকে তারিণী।
কিন্তু সময়ই বা তেমন কোথায়? ছেলে হবার পর বছরখানেক হল তারা এখন বাগবাজারে এক ভাড়াবাড়িতে এসে উঠেছে। মাসে দুই টাকা চার আনা ভাড়া। তার উপরে ছেলের দুধের জোগান, স্ত্রী মাখনলতার টুকিটাকি প্রয়োজন মেটাতে কাজের পরিমাণ বাড়াতে হয়েছে। ডিটেকটিভগিরির সঙ্গে সঙ্গে এক মাড়োয়ারি কাপড়ের দোকানে খাতা লেখার কাজ নিয়েছে সে। দিনে দুই ঘণ্টা করে। তাতেই সামান্য সুসার হয় আর কি।
পুজোতে আদালত বন্ধ। তাই বেশ কিছুদিন আশুবাবুর লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে কাটিয়েছে তারিণী। আজ ফিরতি পথে ক্লাইভ স্ট্রিটের আপিস খুলতে হবে। আপিসের ঢোকার আগেই রাস্তার মুখে একদল ফচকে ছোঁড়া”এবার পূজার বিপদ ভারী, বউ চেয়েছে সোনার চুড়ি” নামে বটতলার একখানি রংদার বই বেজায় বোলচালে বেচছে। দেখতে দেখতে একখানা ট্রামকার গড়গড়িয়ে মোড়ের দিকে ছুটে এল। প্যাসেঞ্জাররা ‘বাঁধ বাঁধ’ শব্দ করলে। কিন্তু ড্রাইভার সামলাতে না পেরে এক ছ্যাকরাগাড়ির পিছনের চাকার সঙ্গে সজোরে ট্রামকারের চাকা লাগিয়ে দিল। ট্রামকার আউট রেল, ছ্যাকরাগাড়িও কুপোকাত। হইহই রব! তারিণী সবে দেখতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে কে যেন তার হাত টেনে ধরল।
দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়।
“ওসব দেখার মেলা সময় পাবে। ভিতরে চলো। কথা আছে।”
“আপনি কী করে জানলেন আমি এখানে থাকব?”
“তোমার বাড়ি গেছিলাম। বউমা বলল, আজ আপিস খুলতে আসবে। আধাঘণ্টা এখানেই অপেক্ষা করছি।”
তারিণী কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রিয়নাথের থমথমে মুখ দেখে বুঝল ব্যাপার গুরুচরণ।
আপিসের দরজার সামনে একগাদা হ্যান্ডবিলের ছড়াছড়ি। দরজা খুলে হ্যাজাক জ্বালাতে আরও খানিক সময় লাগল।
প্রিয়নাথ কথার মাড় না বাড়িয়ে সোজা প্রশ্ন করলেন, “তোমার এদিকে কাজের চাপ কেমন?”
“আজ্ঞে খুব বেশি না। শুধু ওই নাগরমলদের দোকানে খাতা লেখা…”
“সেটা আমি দেখে নিচ্ছি। তুমি আজ রাতের মধ্যেই তৈরি হয়ে যাও। কাল ভোরেই বেরুতে হবে !”
“কোথায়?”
“পশ্চিমে। ছোটোনাগপুরের কাছেই। তামাটুলি।”
“অসম্ভব। এত কম সময়ে… তার উপরে খোকা এখন ছোটো, মাখন একা এত বড়ো শহরে দিশা পাবে না। আমায় মাপ করবেন।”
“তেমন হলে বউমা আর খোকাও সঙ্গে যাবে। তোমার যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। আচ্ছা, বউমার সেই পিসিমা? তাঁর কাছে ওদের রেখে যাওয়া যায়?”
“তিনি গত হয়েছেন দুই মাস হল। আমি তো বলছি দারোগাবাবু, এখন আমার যাওয়া হবে না। আর কী এমন হল যে লালবাজার থেকে পুলিশকে আর প্রাইভেট ডিটেকটিভকে এত দূর উজিয়ে যেতে হচ্ছে?”
“আজ সকালে জরুরি তার এসেছে। তামাটুলিতে এক রাতে পরপর দুজন খুন হয়েছে। একজন স্বয়ং পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট রিচার্ড টেলর, আর অন্যজন ভূপেন দাস নামে এক ছোকরা। লালবাজারের তলব কেন পড়েছে, আশা করি বুঝতে পেরেছ?”
“সে তো বুঝলাম। কিন্তু আমি গিয়ে কী করব, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
“তোমার প্রিয় বন্ধু, সেই ম্যাজিশিয়ান গণপতিকে লোকাল পুলিশ এই জোড়া খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করেছে। ওকে বাঁচাতে না পারলে ফাঁসি নিশ্চিত। এবার বলো, তুমি কি যাবে? নাকি যাবে না?”
.
