১৫. উল্কি

১৫. উল্কি

১৮৯৭ সালের মার্চ নাগাদ গোটা কলকাতায় একেবারে হইচই পড়ে গেল। স্বামী বিবেকানন্দ মাদ্রাজ থেকে ফেরার কিছুদিন পর থেকেই কলকাতায় নাকি বিউবোনিক প্লেগ এসে হাজির। এই রোগে বম্বেতে নাকি লোকজন পড়ছে আর মরছে। একবেলায় একলাখ লোক মরেছে এমন গুজবও শোনা গেল। এরই মধ্যে আবার নতুন গুজব।

বজবজ জাহাজঘাটা থেকে শিয়ালদহে নাকি এক মহিলা এসে হাজির। তাঁর মাথা ঘোমটায় ঢাকা। একটা ঠিকে গাড়ি ভাড়া করে তিনি চললেন হ্যারিসন রোডের দিকে। আরও কিছুটা এগিয়ে কোচোয়ান যখন তাঁকে শুধাল, “কোথায় যাবেন মা?” তখন নাকি অদ্ভুত এক গলায় পিছন থেকে উত্তর এসেছিল, “আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি প্লেগ দেবী।” কোচোয়ান আঁতকে পিছন ফিরে দ্যাখে, গাড়িতে কেউ নেই। আর যায় কোথায়! এইসব শুনে প্লেগের ভয়ে শহরসুদ্ধ লোক পড়ি কি মরি করে পালাতে শুরু করল। কেউ গেল উত্তরে দার্জিলিং-এর দিকে। কেউ পশ্চিমে। ইস্টিশনে পৌঁছোনোর ঠিকেগাড়ির গাড়োয়ানেরা ভাড়া বাড়িয়ে চার পয়সা থেকে এক লাফে দেড় টাকা করে দিলে। এই সুযোগে ঘোড়ার গাড়ি, গোরুর গাড়ি, নৌকা, মুটে, সকলেই ভাড়া হাঁকতে পাগল চারগুণ, পাঁচগুণ।

গোটা শহরে কর্পোরেশন থেকে ঢ্যাঁড়া পিটতে আরম্ভ করল, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্লেগের টিকে নিতে হবে।” কিন্তু বললেই কি আর কাজ হয়? শহরে গুজব ছড়াল, টিকে নেবার দশ ঘণ্টার মধ্যেই নাকি মানুষ কাবার হয়ে যাচ্ছে। কেউ বলল টিকার নামে পেট থেকে এক পয়সার মাপের মাংসের বড়া তুলে নিচ্ছে। ভয়ে কেউই আর টিকা নিতে যায় না। এইরকম অবস্থা মাস তিনেক চলার পরে শহরে শুরু হল দাঙ্গাহাঙ্গামা। সরকার ঘোষণা করেছিল, কর্পোরেশনের লোক বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখবে, কারও প্লেগ হয়েছে কি না। যদি রোগীর সন্ধান পায়, তাহলে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। এ কথা শুনে শহরে যত গরিব মানুষ ছিল, সরকারের ওপরে ভীষণ রেগে গেল। প্লেগ হাসপাতালে গেলে নাকি কেউ আর বাঁচে না। ডাক্তাররাই ইঞ্জেকশন দিয়ে রোগীকে মেরে দেয়। এমনকী প্লেগ রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য যে গাড়ি পাঠায়, তার ভেতরেও বিষ মাখানো থাকে। সুস্থ লোকও সেই গাড়িতে উঠলে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যায়।

এদিকে ইংরেজ ডাক্তার কুক কোথা থেকে শুনতে পেলেন বোম্বাইতে নাকি চার্লস র‍্যান্ড জোর করেই প্লেগ পরীক্ষা করে টিকা দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে প্রকোপ কিছুটা কমেছে। তিনিও একই পথ নেবার উদ্যোগ করলেন। লোকজন গেল খেপে। ঠিক করল কুককে রাস্তায় পেলেই তারা মারবে। শহরের গরিব মানুষকে যেন একপ্রকার পাগলামিতে পেয়ে বসল। ঝাড়ুদার, মেথর, ভিস্তিওয়ালা ও কুলি-মজুররা বলল, আমরা কাজ করব না। ধর্মঘট। গোটা শহর আবর্জনায় ও দুর্গন্ধে ভরে উঠল। অনেকে দলবদ্ধভাবে লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। কর্পোরেশন থেকে প্লেগের কোয়ারান্টাইন কেন্দ্র বানানোর জন্য ঠিকাদারদের দায়িত্ব দিয়েছিল। তাদের দেখলেই জনতা লাঠি নিয়ে তাড়া করত। অনেক নিরীহ ভদ্রলোকও ঠিকাদার সন্দেহে মার খেল। বাংলার ছোটোলাট উডবার্ন বুঝতেই পারছিলেন না কী করে এই রোগের প্রকোপকে নিয়ন্ত্রণে আনবেন।

এমন তালবেতালের নাগরদোলার মধ্যে দুই-তিন জায়গায় প্লেগ রোগ দমনের জন্য সত্যিকারের প্রচেষ্টা চলছিল। তাদের প্রথমটা অবশ্যই ভগিনী নিবেদিতার নেতৃত্বে আর রাধাগোবিন্দ করের সাহায্যে। অন্যটি চিৎপুর হাটখোলার ডাক্তার উইলিয়াম ওয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে। বৃদ্ধ ডাক্তার ওয়ার্ড নিজে খুব বেশি ঘোরাঘুরি করতে পারতেন না। সেটুকু পুষিয়ে দিতেন তাঁর সদ্য যুবতি স্ত্রী। একদিকে সিস্টার মার্গারেট আর অন্যদিকে সিস্টার আরিয়েল্লাকে একডাকে চিনত কলকাতার মানুষ।  

একদিন খবর এল, সর্বনাশ হয়েছে। সোনাগাজিতে প্লেগ ঢুকে গেছে। ওই পাড়ায় ঘিঞ্জি সব বাড়ি। বহু অচেনা লোকের যাতায়াত। তারা কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েই হয়তো ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা দিকে। প্রাণ হাতে নিয়েই আরিয়েল্লা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। টগর নামের যে মহিলার প্লেগ হয়েছিল, তার এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে বেশ কিছুদিন নিখোঁজ। রোগীকে বাকিদের থেকে আলাদা করার জন্য টগর আর তার মেয়ে উত্তমাকে আরিয়েল্লা নিয়ে এলেন নিজের হাসপাতালে। ভুল করলেন হয়তো। টগর বাঁচল না। মাঝখান থেকে প্লেগে আক্রান্ত হলেন বুড়ো ডাক্তার ওয়ার্ড। প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচানো গেল না। রয়ে গেল উত্তমা। সিস্টার এলা তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হতে বললেন। সাহেব পাদরিরা নেটিভ খ্রিস্টানদের নানা সুযোগসুবিধা দেয়। হয়তো লোভ দেখানোর জন্যেই। কিন্তু তাতে ক্ষতি কী? উত্তমার নতুন নাম হল ক্যানডেনস। দুজনে মিলে নেমে পড়লেন প্লেগ রোগীদের সেবায়।

বেশ কয়েকমাস পরে, যখন প্লেগের প্রকোপ আপনিই বেশ কিছুটা কমে এল, সিস্টার এলা ঠিক করলেন কলকাতায় আর থাকবেন না। এদিকে ততদিনে আর-এক অভাগী, প্রতিমা, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তিনজনেই চলে এলেন তামাটুলিতে। জমিদারমশাইয়ের আশ্রয়ে। নতুন হোমে

হোমের অবস্থা শুরুতে খুব একটা ভালো ছিল না। সরকারি সাহায্য সামান্য পাওয়া যেত। কিন্তু হোমের তত্ত্বাবধানের কেউ ছিল না। সুপারের নামে যিনি ছিলেন, সেই বলরাম নায়েক হোমের মেয়েদের দিয়ে কুৎসিত সব কাজ করাতেন। মেয়েরা ভয়ে কিছু বলতে পারত না। মাদাম এলা এসে নায়েকের মৌরসি পাট্টা ভাঙেন। জমিদারকে আসল সত্য জানান। নায়েককে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে এতে এলাকার সব সাহেবরা খুশি হননি, বলাই বাহুল্য। হোমের মেয়েরা তাঁদের লালসা মেটাত প্রায়ই। এলা আসায় সে সুযোগ বন্ধ হল চিরতরে। এলা, প্রতিমা আর ক্যানডেনস মিলে সাঁওতাল গ্রামে গিয়ে বউ-ঝিদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন, তাদের স্বাস্থ্য সচেতন করতেন, এমনকী শাশুড়ি-বউমার ঝামেলাও মেটাতেন। অনেকসময় তাঁদের সঙ্গে থাকতেন জমিদারের ছোটো ছেলে। সাঁওতাল পল্লিতে এই ছেলেটিকে সবাই ভালোবাসে। ওদের ভাষায় কথা বলতেও তাঁর জুড়ি নেই। দোভাষী হিসেবে কাজ শুরু করলেও ধীরে ধীরে তাঁর আর প্রতিমার মধ্যে ভাব ভালোবাসা গড়ে উঠল। সেই ভালোবাসা গড়াল বিয়ে পর্যন্ত।

তবে খুব বেশিদিন একা থাকতে হয়নি উত্তমাকে। গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলের আগের মাস্টার ডেনিস সাহেব দেশে চলে গেলেন। কিছুদিন বাদেই তামাটুলিতে এক ভবঘুরে এসে হাজির। ময়লা পোশাক, দেখেই মনে হয় বহুদিন ভালো করে খেতে পায়নি। বোম্বাই প্রদেশের ভয়ানক প্লেগের উপদ্রবে সে পালিয়ে এসেছে এখানে। ছেলেটি শিক্ষিত, কায়স্থ সন্তান। নাম খগেন্দ্রনাথ দত্ত। যদি জমিদার তাঁকে দুবেলা দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থা করেন, তবে সে যে-কোনো কাজ করতে প্রস্তুত। জমিদারমশাই দিলখোলা মানুষ। তিনি প্রাথমিক ইস্কুলের দায়িত্ব দিলেন খগেনের হাতে। মাদাম এলাকে অনুরোধ করলেন, ক্যানডেনস যদি কিছুদিন খগেনকে সাহায্য করে।

এভাবেই খগেনের সঙ্গে ক্যানডেনসের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আজ স্কুল থেকে দুজনে একসঙ্গে ফিরছিল। আচমকা থানা থেকে জনা দুই পুলিশ আর এক রাশভারী দারোগা এসে খগেনকে মাঝপথে আটকায়। কিছু প্রশ্ন করে। তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করে, সে নাম ভাঁড়িয়ে তামাটুলিতে কেন লুকিয়ে আছে? তার সঙ্গীরা কোথায়? ইত্যাদি। খুব স্বাভাবিকভাবেই খগেন অবাক হয়ে যায় আর জানায়, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। দারোগা নাকি তখন তাকে এত জোরে একটা চড় মারেন যে সে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যায়। দারোগা বলেন, “সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আমি বাঁকাতে জানি। সত্যি করে বল, টেলর আর নন্তুকে কীভাবে খুন করেছিস?”

খগেন এবার হাত জোড় করে কেঁদে বলে, সে এসবের কিছুই জানে না। দারোগা শোনেন না। দুই পেয়াদা মিলে হিড়হিড় করে টানতে টানতে খগেনকে নিয়ে যায়। উত্তমা বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। উত্তমা শুনেছে দারোগাবাবু বলছেন, “তোকে যদি ফাঁসিতে না ঝোলাই তবে আমার নাম প্রিয়নাথ মুখুজ্যে নয়।”

.

“আমার কথা তোমায় কে বলল?” তারিণী জিজ্ঞাসা করল।

“রাস্তার দুধারে লোক জমে গেছিল। তাদেরই কে একজন বললে, জমিদারবাড়িতে এই দারোগার এক বন্ধুও এসেছেন। দেখতে নরমসরম। ওঁর সঙ্গেই ঘোরেন, তবে ওঁর মতো পাষণ্ড নন। তাঁকে একবার বলে দেখতে পারো। সেই খোঁজেই এখানে এসে দেখি, আপনার গিন্নির সঙ্গে আমার ট্রেনেই দেখা হয়েছে। যেদিন আপনারা তামাটুলিতে এলেন, সেইদিন।”

“আমি দারোগাবাবুর সঙ্গে কথা বলব। খগেন নির্দোষ হলে ওর কিছু হবে না, এটুকু বললাম। দারোগাবাবুর বাইরেটা কঠিন হলেও তিনি মানুষ মন্দ নন…”

গলা খাঁকরানোর আওয়াজে তারিণী বুঝল, প্রিয়নাথ দরজার বাইরে অপেক্ষা করছেন। হয়তো তার কথাও কিছু শুনে ফেলেছেন। তারিণী পর্দা সরিয়ে বেরোতেই দেখল, গতিক ভালো না। প্রিয়নাথের মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতো ধনথন করছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটির সঙ্গে বাগানে বসে সে বিপিনের সঙ্গে কথা বলছিল, এ যেন সে নয়, অন্য কেউ। তারিণীকে বেশ কড়াভাবেই তিনি বললেন, “ভিতরে যে মেয়েটিকে লুকিয়ে রেখেছ, তাকে বাইরে আসতে বলো। ওকে থানায় যেতে হবে।”

“আমি তো কাউকে লুকিয়ে রাখিনি দারোগাবাবু। মেয়েটি আমার স্ত্রীর পূর্বপরিচিত। দেখা করতে এসেছে। এতে লুকিয়ে রাখার প্রশ্ন আসে কোথা থেকে?”

“ওসব ছেঁদো কথা রাখো। ওকে বেরোতে বলো। নইলে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাব।”

“ওর অপরাধ?”

“অপরাধ? ওর সঙ্গে স্বদেশিদের যোগ থাকার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। আরও জানতে হলে তুমিও থানায় চলো। ওর এজাহার নেওয়া হবে।”

“আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি উত্তমাকে ডেকে দিচ্ছি। আমিও যাব ।”

ঘরে ঢুকেই তারিণী একেবারে ফিসফিসিয়ে উত্তমাকে বলল, “দারোগাবাবু তোমাকে থানায় নিয়ে যাবেনই। তবে চিন্তা নেই। আমিও যাব। যাবার আগে একটাই প্রশ্ন করব, খুব ভেবেচিন্তে জবাব দেবে, আর মিথ্যে বলবে না। এর উপরেই সব কিছুর ভাগ্য নির্ভর করছে।”

“বলুন।”

“মাদাম এলার গলায় কি কোনও উল্কি আছে? যেটা তিনি যিশুর লকেট দিয়ে ঢেকে রাখেন?”

“সেটা আপনি জানলেন কী করে? এই কথা তো আমরা কয়েকজন বাদে…”

“সেই উল্কিটা কি পাঁচটা তারা? চারটে তারা একটা বর্গক্ষেত্রের চার কোনায়, আর একটা মাঝে?”

উত্তমা স্পষ্টতই হাঁ হয়ে গেছিল। সে উত্তর দিতে পারল না। শুধু উপরে নিচে মাথা নাড়ল।

“এবার চলো। কোনও চিন্তা কোরো না। তোমার বা তোমার মাস্টারমশাইয়ের কিচ্ছু হবে না। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি।”

.