১৯. পচা আপেলের গন্ধ

১৯. পচা আপেলের গন্ধ

“আমার জন্ম আমেরিকায়। নিউ ইয়র্কের কাছেই জার্সি নামের ছোট্ট এক শহরে। কুমারী মা। বাবা কাকে বলে জানতাম না। ইহুদি মা নাম রেখেছিল আরিয়া। সিংহী। আমি ছোটো থাকতেই মা শিকাগোর লালবাতি এলাকায় এসে ছোট্ট একটা এক কামরার ঘর নিয়েছিল। কথায় বলে, “লাভ ইজ অ্যারাউন্ড দ্য কর্নার”। আমাদের পাড়াতেই সন্ধে হতে না হতে মোড়ে মোড়ে ডলার দিয়ে ভালোবাসা বিক্রি হত। খদ্দের ঘরে ঢুকলে আমি ঘর ছেড়ে বাইরের সিঁড়িতে বসে খেলা করতাম। পাশেই অনাথ বাচ্চাদের একটা ওয়ার্ক হাউস আর ইস্কুল ছিল। সেখানেই বিনে পয়সায় পড়াশোনা করেছি। একরকম চলছিল। একদিন অনেক রাত। আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। মা আমায় ডেকে তুলে বলল, “তুমি ঘুমোও সোনা, আমি এখুনি আসছি।”

আর ফিরল না। মায়ের গলাকাটা ছিন্নভিন্ন দেহটা পাওয়া গেল সেন্ট্রাল পার্কের মধ্যে। পুলিশ খুনিকে ধরতে পারল না। এক হপ্তা যেতে না যেতে আরও একজন বেশ্যা খুন হল। তারপর আরও এক। খবরের কাগজে লেখা হল ‘রিপার অফ নিউ ইয়র্ক’। আর তখনই আমাদের বাঁচাতে প্রায় ভগবানের মতো উদয় হল এক বক্সার। নাম পল কেলি। প্রোটেকশন মানির বদলে সে আমাদের সুরক্ষা দিত। কেলি আর তার দলবল দাপট চালাত নিউ ইয়র্কের অন্ধকার গলিঘুঁজি আর লম্বা মিনারের ছায়ায় ছায়ায়। ফাইভ পয়েন্ট গ্যাং তখন গোটা নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ত্রাস। সেই গুন্ডাদলে বেশ কিছু মেয়েও ছিল। আমি ছিলাম তাদের সর্দার। মা মারা যাবার পর কেলি নিজের হাতে বেছে নিয়ে আমায় দলে ঢোকায়। আসলে ওর এইরকম ছেলেমেয়েই পছন্দ ছিল। যারা মরতে ভয় পায় না। যাদের পিছুটান নেই।

কেলির দলে ব্রুনো নামের এক কানা জার্মান ছিল। এক চোখে কালো ফেট্টি বাঁধা। এককালে সার্কাসে কাজ করত। এখন বুড়ো হয়ে কেলির পিছন পিছন ঘোরে। ছুরিতে অসম্ভব দক্ষ। শুনেছিলাম সে নাকি কাউকে নাইফ থ্রোইং শেখায় না। কেলিই আমাকে বলেছিল। আমি কেলিকে চ্যালেঞ্জ করলাম। মাত্র হপ্তা দু-এক বুড়োর বিছানা গরম করার পর সে নিজেই আমাকে ছুরির নানা কৌশল শিখিয়ে দেয়। এমনকী ট্র্যাপিজের নানা কায়দাও।

এর ঠিক দুই মাস পরে কেলির সঙ্গে ব্রুনোর কী একটা ঝামেলা হয়। কেলি খালি হাতে শুধু ঘুসি মেরে মেরে ব্রুনোকে মেরে ফেলে। ব্রুনোর সবচেয়ে দামি সম্পত্তি ছিল একটা থ্রোয়িং নাইফ। ‘টর্নেডোর মধ্যে ছুড়ে মারলেও এক চুল এদিক ওদিক সরবে না’, বলত ব্রুনো। কেলি সেটা আমায় দিয়ে দিল। বলেছিল খুব প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার না করতে। আমিও সে কথা রেখেছি।”

এখানে একটু থামলেন মাদাম এলা। হয়তো অতীতের মধ্যে ডুবে যেতে চাইছিলেন। একটা কাশির দমক আবার আসতে আসতেই মিলিয়ে গেল। দুই-একবার খুক খুক করে আবার শুরু করলেন তিনি।

“হয়তো এভাবেই চলত, যদি না একদিন আমাদের পাড়ায় এক বুড়ো ডাক্তার এসে বাসা বাঁধতেন। আগের দিন এই একটাই সত্যি কথা আপনাদের বলেছি। তবে ডাক্তার ওয়ার্ডের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা কেলির হপ্তা আদায়ের জন্য। বৃদ্ধ মানুষ। মুখে মিষ্টি হাসি। চোখে অদ্ভুত এক সব হারানোর মায়া। এমন গাঢ় নীল চোখ আমার মায়ের ছিল।

চারিদিকে বেশ্যা আর গুন্ডাদের এই রাজত্বে কোনও ডাক্তার চেম্বার খুলে বসার সাহস করে না। অজান্তেই এ পাড়ায় এসে ডাক্তার ওয়ার্ড এখানকার একমাত্র চিকিৎসক হয়ে উঠলেন। আমাকে প্রায়ই যেতে হত ওঁর চেম্বারে। আমার সঙ্গীসাথিদের নিয়ে। কারও নাক ফেটেছে, কারও বা মাথা। ওয়ার্ড একা পারতেন না। আমিই সাহায্য করতাম তাঁকে। অবাক হয়ে দেখতাম, ক্যাথলিক এই মানুষটার কাছে পাপ-পুণ্য, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের চেয়েও বড়ো হয়ে উঠেছে মানুষ। মনুষ্যত্ব।

তারপর একদিন কেলি এমার মুখ বুট দিয়ে থেঁতলে দিল। প্রথম থেকেই এমা একটু অবাধ্য। তার পাল্লায় পড়ে আরও কয়েকজন কেলির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছিল। যেন সবাইকে শিক্ষা দিতেই এমাকে এমন করল কেলি। সেদিন রাতে এমার সারা মুখে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে দিতে মোমের আলোয় দেখলাম ডাক্তারের চোখে জল।

বললাম, “কী হয়েছে ডাক্তার ওয়ার্ড?”

“আমার ভয় হয় আরিয়া। মনে হয় এর পরের জন হয়তো তুমি।”

“একই আশঙ্কা যে আমিও করিনি তা নয়। কিন্তু এই নরক ছেড়ে যাব কোথায়? কে উদ্ধার করবে আমাকে? আর আমেরিকার যেখানেই যাই, পলের লোকজন আমাকে খুঁজে বের করে খুন করবে।

ডাক্তার ওয়ার্ড গোপনে ভারতে ফিরে আসার প্ল্যান করলেন। ইংল্যান্ডে কেলির দলের লোক থাকতে পারে। তাই ভারত সবচেয়ে নিরাপদ। পুরুষের পোশাক পরে এ দেশে পালিয়ে এলাম। আসার পর ক্যাথলিক চার্চে আমাদের বিয়ে হল। নতুন নাম হল আরিয়েল্লা। ডাক্তার ওয়ার্ড আবার তাঁর পুরোনো চেম্বার খুলে বসলেন। তবে এবার অনেক বেশি উৎসাহে। নতুন ছাত্রী পেলেন যে! প্রতিটি রোগ লক্ষণ, রোগের নিদান, ওষুধ বানানোর পদ্ধতি হাতে ধরে শেখালেন আমাকে। আমিও উৎসাহ পেয়ে গেলাম। নিউ ইয়র্কের দিনরাত্রিরা স্মৃতিতে ফিকে হয়ে আসতে থাকল।”

এতক্ষণ টানা কথা বলায় শেষের দিকে আরিয়েল্লার শব্দগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। তারপর আবার সেই কাশির দমক। তারিণীরা নাকে মুখে রুমাল চেপে রইল জোরে। এই অদ্ভুত অলীক পরিবেশে ইন্দ্রিয়েরা সবাই যেন কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছে। খানিক বাদে কাশি থামলে মাদাম খুব জোরে জোরে দম নিতে শুরু করলেন। প্রিয়নাথের ভয় হল এখুনি না কিছু হয়ে যায়। মিনিট পাঁচেক কেউ কোনও কথা বলছে না। নিস্তব্ধ ঘরে শ্বাস টানার শব্দটুকু না থাকলে হয়তো মনে হত সবাই মরে গেছে।

আবার যখন কনফেশন শুরু হল, তখন কিছুটা ধাতস্থ হয়েছেন এলা। হাঁপাতে হাঁপাতেই বলে চললেন-

“খবর পেলাম… খবর পেলাম বম্বেতে বিউবোনিক প্লেগে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। এ রোগ নাকি কলকাতাতেও আসবে। ডাক্তার ওয়ার্ড এর আগে লন্ডনে প্লেগের চিকিৎসা করেছেন। বললেন, “চিন্তা কোরো না। আমি তোমাকে সব শিখিয়ে দেব।” তাঁর কাছেই জানলাম, এই প্লেগ দুইরকম, বিউবোনিক আর নিউমোনিক। বিউবোনিক স্পর্শে ছড়ায় আর নিউমোনিক আরও ভয়ানক। নিঃশ্বাসে, আর কাশিতে ছড়ায়। এ রোগ সারা দেহে ছড়ালে প্রথমে জ্বর জ্বর আসে, সারা গা ব্যথা করে, কফের সঙ্গে পুঁজ রক্ত আর তারপর ফুসফুসের সংক্রমণে কাশতে কাশতে রক্তাক্ত মৃত্যু। এই রোগ চোখের আগে ধরা দেয় নাকে। রোগীর সারা গা থেকে পচা আপেলের গন্ধ ছড়াতে থাকলে বোঝা যায়, আর আশা নেই। তবে রোগ আক্রমণের আগেই যদি টিংচার আয়োডিন আর ব্র্যান্ডির মিশ্রণ খেয়ে নেওয়া যায়, তবে আক্রমণের সম্ভাবনা কিছু কমে।”

“নেসেখ!!” প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠলেন প্রিয়নাথ।

“সেদিন না চাইতেও আপনাদের সামনে এসে বসতে বাধ্য হয়েছিলাম। চাইনি এ রোগ আমার থেকে আপনাদের মধ্যে ছড়াক। মিথ্যে বলে নেসেখের নামে ওই তরলই আপনাদের দিয়েছি। ভুল হলে মাফ করবেন।”

“কিন্তু টেলর যে প্লেগে আক্রান্ত, সেটা বুঝলেন কখন?”

“চিনে নিউমোনিক প্লেগ ছড়াচ্ছে। সেই ভয়েই টেলর মে ফ্লাওয়ার জাহাজে চেপে পালিয়ে আসেন। সেই জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয়নি শুনেছিলাম। কারণ জানতাম না। যেদিন শুনলাম টেলর তামাটুলিতে এসেছেন, সেদিনই চার্চে পত্রিকায় দেখলাম জাহাজের পাশে লেখা, QRT। জাহাজে ছোঁয়াচে কোনও রোগী আছে, তাই জাহাজকে একমাস কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। কিন্তু সে জাহাজ থেকে টেলর রোগের জীবাণু বহন করে নিয়ে আসছেন না তো?

জমিদারের পার্টিতে গেলাম। যাবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমাকে দেখতেই হত। ভারতে বিউবোনিক প্লেগ এসে কী সর্বনাশ করেছে, আপনারা সবাই জানেন। আমার স্বামীকেও কেড়ে নিয়েছে আমার থেকে। এবার এই জঘন্য অসুখটা এলে কী হবে ভাবতে পারেন?

টেলরের সঙ্গে হাত মেলাতেই তার গরম হাতের চেটো আর খুশখুশে কাশি সংকেত দিল, লক্ষণ ভালো নয়। টেলর আমায় বলল এ দেশে এসে ঠান্ডা লেগে কাশি হয়েছে। বললাম ব্র্যান্ডিতে একটু গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে খেতে। ও ঠিক তাই করল। এদিকে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কীভাবে বোঝা যাবে টেলরের এই মারণ রোগ হয়েছে কি না? প্রভু যিশুকে ডাকছিলাম। পথ দেখাও… হে প্রভু, পথ দেখাও। প্রভু দেখালেন। মিস্টার হার্পার বেখেয়ালে আমার কোটে পানীয় ফেলে দিলেন। আমাকে সেই পার্টির মধ্যেই কোট খুলতে হল, আর তখনই টেলর ওটা দেখতে পেলেন।

“আপনার গলার উল্কিটা। তাই তো?” তারিণী বলল।

“ঠিক তাই। টেলর সব জানত। কেলির কথা। ফাইভ পয়েন্ট গ্যাং-এর কথা। এবার ওর ঘৃণ্য নারীলোলুপ রূপটা বাইরে বেরিয়ে এল। আমার কানের খুব কাছে মুখ এনে বলল, “আমি তোমার সব কিছু জানি। কেলি গ্যাং থেকে কেউ বেরিয়ে আসতে পারে না। এলে সে হয় পালিয়েছে, নয়তো মরে গেছে। তুমি তো মরোনি। তার মানে পালিয়েছ। যদি ভালো চাও তো আমার কথা শুনে চলো, নয়তো আবার তোমায় নিউ ইয়র্কে পাঠিয়ে দেব। কেলি তোমায় ছিঁড়ে খাবে।”

আমি বললাম, “কী চান আপনি?”

একপেশে একটা হাসি হেসে টেলর বললেন, ‘তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে বাকি জীবন কোনও পুরুষের সঙ্গ ছাড়া একা কাটাবে, এ তো হতে পারে না। আমি যখন বলব তুমি আমার বাংলোয় চলে আসবে। আর হ্যাঁ, তোমার হোমের মেয়েদেরও আসতে বলবে, যখন আমার স্বাদবদলের দরকার হবে। চাই কি, তুমিও থাকতে পারো। একসঙ্গে দুইজনকে বিছানায় নিতে আমার অন্তত আপত্তি নেই।’

বিশ্বাস করুন, আমার কানে এসব কিচ্ছু ঢুকছিল না। টেলরের কথার সঙ্গে ভেসে আসা নিঃশ্বাসে আমি প্রথমবার পচা আপেলের গন্ধ পেলাম। সেই গন্ধ, যার কথা অনেকদিন আগে ডাক্তার ওয়ার্ড আমায় বলেছিলেন। যেটা বলেননি, তা হল তার সঙ্গে মিশে থাকা গা গোলানো এক অদ্ভুত গন্ধের কথা, যে গন্ধ প্রতিবার কোনও মৃত মানুষের থেকে পেয়েছি। আমি রাজি হলাম। বললাম, আজ হবে না। আগামী কাল ম্যাজিক শো শুরুর আগে ওর বাংলোতে যান। পুরুষের ছদ্মবেশে। মুখোশ পরে। যাতে কেউ চিনতে না পারে। টেলর রাজি হলেন। আমি জানতাম এই প্রস্তাবে না করার সাধ্য টেলরের নেই।

ম্যাজিকের দিন সন্ধ্যা হতে না হতে একটা থলিতে পোশাক, মুখোশ, হিল দেওয়া জুতো, টুপি ইত্যাদি নিয়ে রেখে দিলাম ঝিরনির ধারে এক পাথরের আড়ালে। ওদিকটা কেউ যায় না। প্রথমে খানিক হোমের মেয়েদের সঙ্গে বসে রইলাম। তারপর একটু ঘুরে আসি, বলে সবার চোখ এড়িয়ে পোশাক বদলে চলে গেলাম টেলরের বাংলোতে। দারোয়ান আটকায়নি। জানতাম টেলর ওকে বলে রাখবেন।

ঘরে ঢুকতেই টেলর আদর আপ্যায়ন করলেন। বসার ঘরে বসালেন। নিজের হাতে দুটো গেলাসে মদ বেড়ে দিয়ে চুরুট ধরিয়ে কাশতে কাশতে বললেন, ‘চলো, তাহলে বেডরুমে যাওয়া যাক।’

পচা আপেলের গন্ধে গোটা ঘর যেন ভরে আছে। আমি বুঝে গেছি এই লোককে বাঁচানো এখন ভগবানেরও অসাধ্য।

‘আমি আপনার সঙ্গে বেডরুমে যেতে আসিনি মিস্টার টেলর। আমি এসেছি আপনাকে সাবধান করতে। যে নিউমোনিক প্লেগের ভয়ে আপনি কোয়ারেন্টাইন জাহাজ থেকে পালিয়ে এসেছেন, সেই রোগ আপনার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়েছে। এবার আপনার থেকে তা ছড়াবে গোটা তামাটুলিতে। সেখান থেকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। আগের বিউবোনিক প্লেগের ধাক্কাই আমরা এখনও সামলে উঠতে পারিনি। এ রোগ আরও মারাত্মক। আরও ছোঁয়াচে।’

টেলরের মুখ লাল হয়ে উঠল।

‘কী বলতে চাইছ তুমি? স্পষ্ট করে বলো তো!’

‘আপনি তামাটুলি ছেড়ে চলে যান মিস্টার টেলর। একেবারে একা। অথবা এখানে থাকলেও আর কারও সঙ্গে দেখা করবেন না। যে কদিন বেঁচে আছেন, এই ঘরে বসে প্রভু যিশুর স্তব করুন।’

ভেবেছিলাম টেলর রেগে যাবেন। টেলর রাগলেন না। হাসলেন। অদ্ভুত সেই হাসি।

‘আমারও মনে হচ্ছিল কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে। ওয়েল, মরতে যখন হবেই, একা মরব কেন? সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মরি। একটু বাদেই ম্যাজিক শো দেখতে যাবার কথা। ভেবেছিলাম যাব না। কিন্তু এখন আমায় যেতেই হবে। আমি যাব, সবার সঙ্গে কথা বলব, হাত মেলাব। প্রভু যিশুর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় মোটা তামাটুলি যেন আমার সঙ্গে থাকে, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার।’

‘না-আ-আ!’ আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম, ‘তামাটুলির একটি মানুষও যেন আপনার থেকে এই রোগ না পায়।’

এবার রীতিমতো শব্দ করে হাসলেন টেলর।

‘একজনকে তো আমি এই রোগ উপহার দিয়েই দিয়েছি। তার কাছে অনেক মানুষ আসে। তামাটুলির অনেক মানুষ। আমি ঘরে বসে থাকলেও সে এবার রোগের জীবাণুকে ছড়িয়ে দেবে গোটা শহরে। কী করবে তুমি?’

‘কে সে?’

“বলব না!” বলে আবার সেই নরকের হাসি হাসতে লাগলেন টেলর। সঙ্গে কাশি। আমার মাথা কাজ করছিল না। কোটের মধ্যে থ্রোইং নাইফটা লুকানো ছিল। চোখের নিমেষে গুস্তাভ ফেলিক্স টেলরের বুক চিরে ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে টেনে বন্ধ করে দিলাম। জানলার তলায় স্প্রিং লাগানো ছিটকিনি ছিল। বাইরে লাফিয়ে নেমে ছিটকিনি উপরে তুলে ছেড়ে দিতেই সেটা খাপে খাপে বসে গেল। জানতাম সদর দরজা দিয়ে বেরোতে পারব না। গ্যাং-এ থাকার সময় পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বহুবার উঁচু পাঁচিল বেয়ে পালিয়েছি। এখানেও তাই করলাম। পাশেই ভারা বাঁধার বাঁশ থাকায় সমস্যাও হল না খুব একটা। তারপর নদীর ধারে জামাকাপড় বদলে সোজা প্রতিমাদের দিকে গিয়ে যখন বসলাম, ততক্ষণে হিঙ্গনবালা খেলা দেখানো শুরু করেছে। প্রতিমাকে বলেছি এইমাত্র ওদিক থেকে আসছি। জানতাম এই অনুষ্ঠানের ডামাডোলে কেউ আমার এই আধঘণ্টার না থাকা খেয়াল করবে না।

“বুধনীকে কি মারতেই হত?” তারিণী প্রশ্ন করল।

“উপায় ছিল না। পরদিন ও নিজেই এসেছিল আমার কাছে ওষুধ নিতে। গলা ব্যথা, খুসখুসে কাশি। আমি ওর গায়েও সেই গন্ধ পেলাম। বুঝলাম, কেন টেলর বলেছিলেন এমন একজনকে রোগ ছড়িয়েছেন, যার কাছে অনেক লোক আসে।”

“কী দিয়েছিলেন ওকে? বেলেডোনা?”

“আমার স্বামী ডাক্তার ওয়ার্ড আমায় একটা গল্প বলতেন। গ্রিক পুরাণের তিন বোন। ক্লথো মানুষের জীবনসুতো রচনা করে, ল্যাচেসিস সেই সুতোর দৈর্ঘ্য মাপে আর অ্যাট্রোপস সেই সুতো কেটে দেয়। বেলেডোনা মানে ইতালীয় ভাষায় সুন্দরী রমণী। তাই বেলেডোনা থেকে পাওয়া অ্যাট্রোপিনকেই বেছেছিলাম বুধনীর জন্য। উপায় ছিল না। তা ছাড়া অ্যাট্রোপিন কাজ করে ধীরে, প্রয়োগের প্রায় ঘণ্টা দু-এক পরে। সেটাও তো দেখতে হত।”

“দারোগাবার, আপনাকে সেই প্রথম দিনই জিজ্ঞেস করেছিলাম না, বুধনীর চোখের তারা এত কালো কেন? অ্যাট্রোপিন প্রথমে চোখের তারাকে বড়ো করে দেয়, লোকে ঝাপসা দ্যাখে। বেশি পরিমাণ অ্যাট্রোপিনে প্রথনে গরম লাগতে থাকে, চামড়া শুকিয়ে যায় আর তারপর শুরু হয় হ্যালুসিনেশন। সবাই ভাবে একে ভূতে ধরেছে। যেমন বুধনীর বেলায় ভেবেছিল। মরার আগে চোখের মণির আকার বেড়ে প্রায় গোটা সাদা অংশকেই গিলে ফেলে। ভয়ানক মৃত্যু!”

“আমার কিছু করার ছিল না”, যন্ত্রের মতো বলে চললেন এলা।”তামাটুলিকে বাঁচাতেই হত। যখন দেখলাম, আপনারা এসে গেছেন, আমাকে বাধ্য হয়েই ওই ঘরে রাত কাটাতে হল। এই রোগ ছড়ানো বন্ধ করার একমাত্র উপায় রোগীর দেহ আর পোশাক পুড়িয়ে ফেলা। টেলরের বেলায় পারা যায়নি। কিন্তু এক্ষেত্রে আমি সেটাই করেছি।”

“আপনিই কি টেলরের পোশাক…” প্রিয়নাথ কথা শেষ করার আগেই এলা উত্তর দিলেন, “আর কে করবে? কয়েকদিন চেষ্টা করেও পুলিশের এভিডেন্স রুমে থাকা সেই পোশাকের নাগাল পাইনি। ডিউটিতে থাকা সিপাই একবার প্রায় দেখে ফেলেছিল আর কি। আবার প্রভু যিশু পথ দেখালেন। সেদিন চার্চের পাদরি এসেছিলেন দেখা করতে। এক পেজ বয় এসে জানাল, সিপাই নাকি সেইসব পোশাক হোলি ওয়াটার ছিটানোর জন্য নিয়ে এসেছিল। এখন গুদামঘরে রাখা। পাদরি বললেন কাল সকালে যা করার করবেন। বুঝেছিলাম আজ রাতটুকু আমাকে সময় দিয়েছেন প্রভু। চার্চের সবকটা ঘর আমার হাতের তালুর মতো চেনা। কেলির দলে আমার কাজই ছিল লুটপাট সেরে সব পুড়িয়ে দিয়ে আসা।”

“টেলরকে কবর দেবার সময়ও তো রোগ ছড়াতে পারত। সেক্ষেত্রে?”

“সেইজন্যেই তো এই কদিন বেঁচে ছিলাম। না হলে টেলরকে খুনের পর থেকে আমার বাঁচার ইচ্ছা চলে গেছিল চিরকালের মতো। রোগলক্ষণ দেখা যেতে তিন-চার দিন লাগে। সেদিন কবর দেবার সময় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, প্রায় প্রতিদিন তাঁদের শরীরের খবর নিয়েছি। প্রভু যিশু মঙ্গলময়। রোগলক্ষণ দেখা যায়নি। যাই হোক, আর কী বলব… মানুষের প্রাণ নেওয়া পাপ। আত্মহত্যাও পাপ। আমি পাপী। জানি নরকেও আমার ঠাঁই হবে না। আমার জন্য প্রার্থনা করবেন”, অবরুদ্ধ এক কান্নায় এবার ভেঙে পড়লেন মাদাম এলা।

গোটা ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই যেন পুতুল হয়ে গেছে। কারও কিছু বলার ক্ষমতা নেই। খানিক বাদে প্রথম কথা বলল তারিণীই।

“পাপ পুণ্য, অপরাধ ক্ষমার হিসেবনিকেশ বড়ো কঠিন জিনিস মাদাম। আমার মতো মূর্খ মানুষ তার বিচার করতে পারে না। তবে এটুকু বলি, এই ক্ষুদ্র জীবনে যে কয়েকটি মহান মানুষকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, আপনি তাঁদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে থাকবেন। প্রণাম নেবেন। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ/ তস্মাদপরিহার্যেঽর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি॥

দারোগাবাবু, আপনার কাছে একটা দেশলাই বাক্স আছে না?”

.

মৌন তিন ছায়াময় পুরুষ যখন ঝিরনি নদীর ধার দিয়ে ফিরছেন, দূরে তখন এলার ছোট্ট কাঠের কুটিরটি গোলাপি লাল আর সোনালি আগুনের শিখায় জ্বলে উঠেছে। স্থানীয় সাঁওতালরা অনেক চেষ্টা করেও আগুন নেভাতে পারল না।

.