ষষ্ঠদশ অধ্যায়—সকলই ফুরাল স্বপন-প্রায়

ষষ্ঠদশ অধ্যায়—সকলই ফুরাল স্বপন-প্রায়

তারিণী পাশেই রাখা একটা কাচের গেলাস থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে আবার শুরু করল। সবাই টানটান। চুপ। উঠতে গিয়েও উঠতে পারছে না।

“ওফেলিয়া আর জর্জের সংসার সুখের ছিল না। জর্জ তুমুল মহিলাসক্ত ছিল, কিন্তু সন্তান উৎপাদনে অক্ষম। এদিকে বিয়ে হবার পর থেকেই ওফেলিয়া প্ৰাণপণে মা হতে চেয়েছিল। পারছিল না। ওফেলিয়া জর্জকে ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে বলে। জর্জ রাজি হয় না। ওফেলিয়া চরম পথ বেছে নেয়। প্রাচীন ভারতের নিয়োগ প্রথার মতো সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে নিয়োগ করে সে। মজার ব্যাপার, এই লোকটির নাম জানলেও আমাদের হাত পা বাঁধা। ওফেলিয়ার শেষ চিঠি থেকে জানতে পারি কোনও এক মৃত ব্যক্তির আত্মাকে চিঠি লিখত ওফেলিয়া। লিখতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হল তার পেটের বাচ্চা তো আর কোনও আত্মার অভিপ্রায় না। রীতিমতো কোনও জ্যান্ত মানুষের অবদান। ওফেলিয়া ইদানীং প্রায়ই চাকরবাকরদের এক বেলা ছুটি দিয়ে দিত। কারণ পরিষ্কার। তার প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য। সেদিনও তেমনটাই হয়েছিল। ওফেলিয়া সব চাকরদের ছুটিতে পাঠিয়ে নিজের ঘরে একলা অপেক্ষা করছিল, কখন তার প্রেমিক আসবে। ঠান্ডার জন্যে ঘরের সব পর্দা টেনে দেওয়া। অগ্নিকুণ্ডে আগুন জ্বালানোর জন্য সবে দেশলাই বার করেছে, এমন সময় দরজায় আগন্তুকের সাড়া পেল। শিকলি দিয়ে দরজা বাঁধা। দরজা সামান্য খুলে প্রেমিকের বদলে দেখল জর্জ দাঁড়িয়ে। জর্জকে দেখেই দরজা বন্ধ করে দিতে চাইল। পারল না। জর্জ শক্তিশালী। তার প্রবল ধাক্কায় লক গেল ভেঙে। জর্জ ঘরে ঢুকল।”

“কিন্তু, শিকল তো আগাগোড়া ভিতর থেকে লাগানো ছিল।” প্রতিবাদ করলেন ডাক্তার হান্টার।

হাত উঠিয়ে তাঁকে থামাল তারিণী।”আমি বলছি। একটু ধৈর্য ধরে শুনুন। ঘরে ঢোকার পরে জর্জের সঙ্গে ওফেলিয়ার কী কথা হয়েছিল আমরা জানি না। জানতেও পারব না কোনও দিন। কিন্তু তারপরে কী হল আন্দাজ করতে পারি। জর্জের কোটের পকেটে পাহাড় বাইবার যন্ত্রপাতি থাকত সবসময়। হাতুড়ি জাতীয় কিছু দিয়ে সে ওফেলিয়ার মাথায় আঘাত করে। ওফেলিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। ড্রেসিং টেবিল থেকে ছুরির বাক্সটা নিয়ে, বাঁট রুমাল জাতীয় কিছু দিয়ে ধরে ওফেলিয়ার শিরা কেটে দেয় জর্জ। অজ্ঞান অবস্থাতে কিছু বোঝার আগেই ওফেলিয়ার মৃত্যু ঘটে।”

“তারপর?” প্রশ্ন এল স্বয়ং নলিনীবাবুর থেকে।

“তারপরেই জর্জ যেটা করল তা থেকে জর্জের শয়তানি বুদ্ধির তারিফ না করে পারবেন না। দরজার পাশেই ছিল ভারী কোচটা। তার পিছনের পায়াতে পাহাড় বাইবার শক্ত, নমনীয় দড়ির একটা লুপ লাগিয়ে দিল সে। টানতে গিয়ে যাতে হড়কে না যায়, তাই পুঁতে দিল ছোট্ট পেরেকটা। সে পাহাড় বেয়ে অভ্যস্ত। এই সব কিছু তার জানা। নলিনীবাবুর হয়তো মনে আছে, সেদিন আমি ওই পেরেকটার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম।”

নলিনীবাবু একটা আবছা মাথা নাড়ালেন।

“ঘরের দরজা ভিতরের দিকে খোলে। তাই বাইরে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে নিচের ফাঁকটুকু দিয়ে কোচটাকে দরজা অবধি টানতে থাকল সে। টানল। ঠেলল না। মেঝের অর্ধচন্দ্রাকৃতি দাগটা টানলে সম্ভব। ঠেললে নয়। আর এই টানাটানিতে পায়ার বার্নিশ উঠে গেল কতকটা। সোফাটা দরজাকে প্রায় আটকে দিতেই সে দড়ির লুপ দিল খুলে। দরজার তলা দিয়ে গোটা স্থিতিস্থাপক দড়ি চলে এল জর্জের হাতে। রয়ে গেল শুধু পেরেকটা। জর্জ জানত ওটাকে কেউ খেয়াল করবে না।

এবার শেষ কাজ। দুর্গার চক্ষুদান। লকটা ভেঙে ঝুললেও পাল্লায় একটা স্ক্রু লাগানো ছিল। দরজা সামান্য ফাঁক করে একটা নিডল নোজ প্লায়ার গলিয়ে দিল সে। এবার সেটা দিয়ে খুব সাবধানে শিকলিটা ধরে স্ক্রুতে ঝুলিয়ে দিল। ফলে বাইরে থেকে একটা ধোঁকার টাটি তৈরি হল। দরজাকে বন্ধ রাখল ভারী সোফা। কিন্তু মনে হল লকটাও যেন অক্ষত রয়েছে। চাকররা ঘরে ঢোকা মাত্ৰ সেই শিকল স্ক্রু থেকে খসে পড়ল। সবাই ভাবলাম চাকররা লক ভেঙে ঘরে ঢুকেছে। একেবারে পারফেক্ট লকড রুম ক্রাইম।”

“কিন্তু…” বলে উঠল কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য।

“কিন্তু, একেবারে ঠিক বলেছেন কুমুদবাবু। এই কিন্তুর সমাধান হচ্ছিল না বলেই এতদিন কী কষ্ট যে পেয়েছি, বলতে পারব না। এই গোটা ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা যেত না। কারণ জর্জের অ্যালিবাই একেবারে পাক্কা। সেই সময় সে অন্য কোথাও ছিল। কোথায়? বলবেন কুমুদবাবু।”

“প্ল্যান্টার্স ক্লাবে। আমার সঙ্গে।”

“ঠিক। এমন একটা ঘরে যার টয়লেটের জানলা খোলা। আর পিছনে খাড়া পাহাড় থাকলেও সেটা বেয়ে সবার চোখের আড়ালে উঠে যাওয়া, আবার নেমেও আসা, জর্জের মতো মানুষের পক্ষে কিছুই না। আর সেই জন্যেই তার পকেটে পাহাড় বাইবার সরঞ্জাম ছিল।”

“কিন্তু মিথ্যে বলে আমার লাভটা কোথায়? বলবেন একটু?”

“ভেরি গুড। এই প্রশ্নটাই এতক্ষণ শুনতে চাইছিলাম। বিশ্বাস করুন, আমাকেও এই প্রশ্নটা কুরে কুরে খেয়েছে। জর্জের হাতে এইরকম হেনস্থা হবার পরেও জর্জের এত বড়ো কুকর্ম চেপে যাওয়ার পিছনে বড়ো কোনও মোটিভ লাগে। সেই মোটিভটাই পাচ্ছিলাম না। আচ্ছা, জর্জ আপনাকে ক্লাবে ডেকে এনেছিল কেন?”

“আমি তো আগেই বলেছি। ওর ধারণা হয়েছিল আমি হিসেবে গণ্ডগোল করেছি…”

“তারপরেও সেদিন দেখলাম কর্মচারীদের রোজের মাইনে আপনিই মেটাবার ব্যবস্থা করছেন। এটা কেমন?”

আমতা আমতা করতে লাগল কুমুদ। তারিণীর গলা ক্রমে ধারালো হচ্ছে। শব্দের যদি সেই শক্তি থাকত তবে বোধহয় এই ধারেই কুমুদের মাথা মসৃণভাবে কেটে নিত তারিণী।

“জানেন না। তাই তো? আমি যদি বলি, আপনাকে লেখা ওফেলিয়ার প্রেমপত্র আপনার আগে ওর কাছে এসে গেছিল?”

“আমাকে?” যেন আকাশ থেকে পড়লেন কুমুদ, “সে তো কোন এক কাৰ্বিকে …”

“এ নাম আপনি জানলেন কোথা থেকে কুমুদবাবু? আমরা তো কেউ কার্বির নাম একবারও উচ্চারণ করিনি।”

ঘরে পিনপতনের স্তব্ধতা। বাইরে বৃষ্টিটাও ধরেছে। কিন্তু কুমুদের মুখে ঘন মেঘ জমছে। রাগ, আতঙ্ক, বিস্ময়—সব একসঙ্গে মিলেমিশে মাথা নিচু করে বসে রইল সে। একবার মুখ তুলে কী যেন বলতে গেল। আবার মাথা নামিয়ে নিল। তারিণী কল্যাণীর দিকে চেয়ে দেখল। চরম ঘৃণা যদি অবয়ব পায়, তবে হয়তো এমনই দেখতে লাগে।

“এই কার্বি আসলে কে, তা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। উত্তর পাইনি। পেলাম গতকাল। সহসা। কুমুদবাবুকে এই ব্যাগ উপহার দিয়েছিলেন নলিনীবাবু। কিংবা কল্যাণী। ট্রেনে এই ব্যাগ ফেলে চলে যান তিনি। দ্বিতীয়বার এই বাড়িতে এলেও ব্যাগ নিয়ে যেতে ভুলে যান। হয়তো নিয়ে গেলেই ভালো করতেন। কাল কুমুদবাবুকে ব্যাগের কথা মনে করানোর পরেও এই বিষয়ে তাঁর তেমন উৎসাহ দেখলাম না। তখনই প্রথম সন্দেহ হল। কোনও কারণে কুমুদ এই ব্যাগের থেকে দূরত্ব রাখতে চাইছেন। কেন? কী আছে এতে? এই ব্যাগ যে কেউ খুলতে পারে। মামুলি কিছু ভিজিটিং কার্ড আর ভাঁজ করা একটা খবর কাগজ ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু তাহলে ভয় কোথায়? কাল যখন মাখন ব্যাগটা আমার হাতে তুলে দিল, বুঝলাম সমাধান এতদিন চোখের সামনেই ছিল। তবু দেখতে পাচ্ছিলাম না। ব্যাগের ভিতরে কিছু নেই। যা আছে বাইরে। ব্যাগের বাইরে পিতলের তবকে কুমুদবাবুর নামের আদ্যক্ষর সই করা। কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য। K. R.B। সংক্ষেপে… কাৰ্বি।”

“মিথ্যে কথা। সব আপনি বানিয়ে বানিয়ে বলছেন। এর একটা কথাও বিশ্বাস কোরো না কল্যাণী।

“ঠিক আছে। তবে প্রমাণ হাজির করি। ইনি সেই সকাল থেকে এসে বসে রয়েছেন। ওয়াংডুপ, এসো দেখি, “ বলতেই লাল পশমের পোশাক পরা এক ভুটিয়া পর্দা সরিয়ে ঘরে এসে হাজির হল।

“কুমুদবাবু, ভালো করে দেখুন দেখি, দামুকদরিয়ায় এ-ই তো আপনাকে চিঠি পৌঁছাতে গেছিল? চিঠি পড়ে এর উপরেই তো চোটপাট করেছিলেন। ভুলে গেছেন? ওফেলিয়া মারা যাবার পর ওর মুখ বন্ধ রাখার জন্য ভুটিয়া বস্তিতে গিয়ে ওর হাতে টাকা গুঁজে দেননি?”

কুমুদ থতোমতো খেয়ে বসে রইল। তারিণী বলেই চলছিল, “সত্যিটা আপনি স্বীকার না করলে ওয়াংডুপ থানায় আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে। পুলিশ এখন হন্যে হয়ে ওফেলিয়ার খুনিকে খুঁজছে। এই সাক্ষ্যের মানে কী হতে পারে জানেন নিশ্চয়ই। নেটিভ হয়ে ইংরেজকে খুনের শাস্তি একটাই…

ওয়াংডুপের দিকে চেয়ে চোয়াল শক্ত করে একটাই কথা বলল কুমুদ, “বেইমান!” সে উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে রইল।

“মিথ্যে ওর উপরে রাগ করছেন কুমুদবাবু। যে বিক্রি হতে রাজি, তাকে যে কেউ কিনতে পারে। শুধু দামটুকু জানা চাই।” তারিণীর কথা কল্যাণী আর সইতে পারল না। উঠে গেল সেখান থেকে। সঙ্গে সঙ্গে মাখনও। ওয়াংডুপকে তারিণী চোখের ইশারা করায় সে-ও বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। একটু অপেক্ষা করে আবার শুরু করল তারিণী

“নানা কাজে প্রায়ই ওফেলিয়ার বাড়ি যেতে হত কুমুদবাবুকে। ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। কুমুদের মধ্যে নিজের প্রাক্তন প্রেমিককে কীভাবে খুঁজে পেয়েছিলেন ওফেলিয়া, তা কুমুদবাবুই ভালো বলতে পারবেন। তবে কোনও বিশেষ কারণে নিজের সন্তানের জন্য শেষ চেষ্টা হিসেবে কুমুদবাবুকেই বেছে নেন ওফেলিয়া। তাঁর নির্বাচন যে সঠিক হয়েছিল, তাও আমরা জানি। নলিনীবাবু, আপনার সেই চিঠি মনে আছে? ওফেলিয়ার চিঠি? যা দেখে আমাদের মনে হল কোনও অধস্তনকে চিঠি লেখা হচ্ছে? ওফেলিয়া কখনোই ভুলতে পারেননি তিনি মালিক, আর কুমুদবাবু কর্মচারী। কুমুদবাবুও সেটা ভালোই জানতেন। সে যাই হোক। এ চিঠির খবর দুজনের কাছে গেল। ওয়াংডুপ সম্ভবত মেমসাহেব আর কুমুদবাবুর মধ্যে যোগসূত্র ছিল। সে মেমসাহেবের চিঠি নিয়ে গেল ট্রেনে কুমুদবাবুর কাছে। তাতে লেখা, পরদিন সন্ধেবেলা দেখা করার কথা। লেখা পেটের বাচ্চার কথা। চিঠি পেয়ে কুমুদবাবুর মাথায় বাজ পড়ল। উনি ওফেলিয়ার সঙ্গে ফুর্তি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ে করতে চাননি। তিনি খুব ভালোই জানেন মালকিনকে বিয়ে করার নানা সমস্যা। অন্যদিকে ওফেলিয়ার বাচ্চার খবর জর্জের কাছে আসে। কীভাবে? কুমুদবাবু বলবেন?”

কুমুদ মাথা নিচু করেই বলল, “ওয়াংডুপ ডবল এজেন্ট ছিল। চিঠি পেয়েই ও সাহেবকে সেটা জানিয়ে দেয়। সাহেব সেদিন প্ল্যান্টার্স ক্লাবে নিজেই সেটা আমাকে বলেছেন।”

“যাক। একটা রহস্য অন্তত দূর হল। যা বলছিলাম, জর্জ দেখল, ইংরেজ আইন অনুযায়ী এই সস্তানের হাত ধরে তার সিকিভাগ মালিকানাও চলে যেতে পারে। কুমুদরঞ্জনকে প্ল্যান্টার্স ক্লাবে নিয়ে আসার আগেই সে এক বীভৎস পরিকল্পনা করে। ঘুম স্টেশন থেকেই কুমুদবাবুকে সবার সামনে মারতে মারতে নিয়ে আসা হয় প্ল্যান্টার্স ক্লাবে। সেখানে ওই বদ্ধ ঘরে বসে দুজনের মধ্যে এক নারকীয় চুক্তি হয়। জর্জ জানত সেদিন সন্ধেবেলা বাড়িতে কেউ থাকবে না। আর ওফেলিয়া মারা গেলে দুজনেরই লাভ। দুজনে ঠিক করল একে অপরের অ্যালিবাই হবে। আর এই দুজনের অ্যালিবাই দেবে গোটা প্ল্যান্টার্স ক্লাব। অ্যালিবাই পাক্কা করতে সবার সমানে কুমুদবাবুকে দু-চার ঘা মেরেও দেয় জর্জ। এতে দুজনের সাঁট নিয়ে কেউ কোনও সন্দেহ করতেই পারে না। কি কুমুদবাবু? ঠিক বলছি তো?”

উত্তর দেবার অবস্থায় নেই কুমুদ। সে শুধু মাথা নাড়ল। আর তাতেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন নলিনীকান্ত। “শয়তান, কুলাঙ্গার, লম্পট। এই চরিত্র নিয়ে তুই আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিস? তোকে আমি জেলে দেব। ফাঁসিতে ঝোলাব…”

“শান্ত হোন নলিনীবাবু। আমার গল্প শেষ হয়নি। তাহলে আবার শুরুতে ফিরে যাই। কার্মি সর্দার যেদিন অভিশাপ দিয়েছিল, সেদিন আপনি আর জর্জ ছাড়া ডাক্তার হান্টার ছিলেন না। তবে কে ছিলেন? প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল চায়ের বাগানের ঝামেলায় ডাক্তারবাবুর থাকা একরকম অস্বাভাবিক। বরং অন্য একজনের থাকা একেবারে স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি প্রথম থেকে তাকে আড়াল করছেন। এদিকে সেই লোক জানে ঠিক কীভাবে কার্মি সর্দারকে খুন করা হয়েছিল। সে ক্রমাগত তা নিয়ে আপনাকে ব্ল্যাকমেল করে যায়। আপনিও নিরুপায়ের মতো তার হাতে নিজের মেয়েকে সমর্পণ করেন। এই বিয়েতে কল্যাণীর ইচ্ছে নেই, তা কি আপনি জানতেন না নলিনীবাবু?”

কোনও কথা বললেন না নলিনী দারোগা।

“আমার শুধু জানার ইচ্ছে, কী এমন জিনিস ছিল আপনার হাতে যা দিয়ে একজনকে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেল করা যায়?”

কুমুদ এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। ডুবন্ত মানুষ যেমন কুটো ধরে বাঁচতে চায়, তেমনি সে চিৎকার করে ওঠে, “আমি বলছি। সব খুলে বলছি আপনাকে। এই নলিনীকান্ত চক্রবর্তী অভিশাপের ভয়ে জর্জকে বলেন সর্দারের একটা ব্যবস্থা করতে। পুলিশ কিছু করবে না। জর্জ চালাক ছেলে। সে বলে, আমার লিখিত প্রমাণ চাই। পরে যে আপনিই আমাকে ধরবেন না, তার বিশ্বাস কী? নলিনীবাবু তখন ভয়ে দিশেহারা। কাগজে লিখে দেন। আর…’

“আর সেই কাগজই আপনার ব্ল্যাকমেলের অস্ত্র হয়ে যায়। কেমন কি না? এই হল গোটা গল্প।”

তারিণী চুপ করে পিছন ফিরে বন্ধ জানলার কাচের দিকে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার হান্টার এটা আশা করেননি। তিনি নিজেই বললেন, “তারপর?”

“তারপর আর কিছু নেই।” পিছন ফিরেই বলল তারিণী।

“আর জর্জ? জর্জ যে মারা গেল? কীভাবে?”

“সে রহস্য আমিও সমাধান করতে পারিনি ডাক্তারবাবু। আর এখানেই হয়তো বিজ্ঞান হার মেনে যায়। সব কিছুর ব্যাখ্যা তো আর বিজ্ঞান দিয়ে হয় না। যেমন কাল রাতে…”

“কাল রাতে কী হয়েছে?”

“বললে আপনারা হাসবেন। কাল রাতে আমি জর্জকে দেখেছি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে না। জেগে। সজ্ঞানে। তখন আকাশে গুমোট মেঘ। শার্শিতে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আর তখনই আমি জর্জকে দেখলাম। চোখে একটা ক্ষুধার্ত ভাব। কী যেন বলতে চায়। হাতে একটা অদ্ভুত ছুরি। এই ধরনের ছুরি পাহাড় বাইবার সময় লাগে। সে আমার দিকে তাকিয়ে…” বলতে বলতে তারিণীর গলা ধরে এল। আচমকা অদ্ভুত একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার গলা থেকে। গোটা শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। কুমুদ নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। দৌড়ে এলেন ডাক্তার হান্টার আর নলিনীবাবু। চমকে দেখলেন তারিণীর কোট ফুঁড়ে বুক থেকে ঠেলে বেরিয়েছে একটা ছুরির হাতল। যে ধরনের ছুরি পাহাড় বাইবার সময় লাগে। তারিণীর চোখ উলটে গেছে। মুখ দিয়ে গ্যাঁজা বেরোচ্ছে। হাত পা বেঁকে যাচ্ছে আপনা থেকে। খানিক ছটফট করেই গোটা দেহ নিঃস্পন্দ হয়ে গেল।

নলিনীকান্ত বিহ্বল। কুমুদ জিজ্ঞাসু। হান্টার হাত বাড়িয়ে নাড়ি দেখতে যাবেন, এমন সময় তড়াক করে মড়া লাফিয়ে উঠে, একগাল হেসে বলল, “বুউউউ”। হান্টারের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। নলিনীবাবু তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন। তাঁর হাত যন্ত্রের মতো চকিতে তারিণীর বুক থেকে ছুরি উঠিয়ে যেই না আবার গেঁথে দিতে যাবে, তারিণী ক্ষিপ্র হাতে ধরে ফেলল নলিনীর কবজি। নলিনী নেশাগ্রস্তের মতো কিচ্ছু না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে তারিণী বলল, “এই, ঠিক এইভাবে জর্জ মারা গেছিল।”

“কী বলতে চাইছ হে ছোকরা?” ডাক্তার হান্টারের গলায় বিস্ময় কাটেনি।

“আচ্ছা বলুন দেখি, যে মানুষ চাকরিসূত্রে সারাজীবনে একাধিক মৃত্যু দেখেছেন, এই সেদিনও ওফেলিয়ার মৃতদেহের সামনে একেবারে শান্ত, স্থির ছিলেন, জর্জকে মৃত দেখে কেনই বা তিনি এত বিহ্বল হয়ে পড়লেন যে তাঁর জ্বর এসে গেল?” তারিণী আজ ছাড়ার পাত্র নয়। এদিকে নলিনী মেঝেতেই বসে পড়েছেন পা ছড়িয়ে।

“সেদিন প্ল্যান্টার্স ক্লাবে ম্যানেজারের মুখে কী শুনলেন?” ডাক্তারের দিকে ফিরে বলল তারিণী, “জর্জের মধ্যে অদ্ভুত একটা বাচ্চা লুকিয়ে ছিল। যে বাচ্চা অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়, প্র্যাকটিক্যাল জোক করে। নলিনীবাবুর এই কুসংস্কার আর ভূতের ভয় দেখে দিব্যি আমোদ হয় তার। সে ঠিক করে দারোগাবাবুকে বোকা বানাবে। আর এই বোকা বানাতে গিয়েই বিপদ ঘটে। আগের দিন সন্ধ্যায় সে দারোগাবাবুর কাছে এসে বলে, ওফেলিয়া তাকে খুন করার হুমকি দিয়েছে। অন্য কেউ হলে এই কথায় গুরুত্ব দিত না। কিন্তু সে জানে নলিনীবাবু এই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারবেন না। গোটা ব্যাপারটা আগে থেকেই সাজানো। যেমন নাটকের সেটে থাকে। জর্জের প্ল্যান ছিল সে ঝুড়িতে বসবে। হাত নাড়াবে। সবার অলক্ষে কোটের ভিতরে ছুরি ঢুকিয়ে বগলে চেপে ধরে মৃতের অভিনয় করবে। যেমনটা একটু আগে আমি করলাম। মনে আছে, ওর বাঁ হাতটা একেবারে কাঠের মতো অনড়, অচল লাগছিল? জর্জ ভেবেছিল সবাই একসঙ্গে টিলার ঘরে দৌড়ে যাব। আর সে হাসতে হাসতে উঠে বসবে। ভাবটা এমন, কেমন বোকা বানালাম?”

“কিন্তু সেদিনই কেন?” ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন।

“দিনটা ভালো করে ভাবুন ডাক্তারবাবু। গোটা কাহিনিতে এই দিনের গুরুত্ব বড়ো কম নয়। পয়লা এপ্রিল। অল ফুলস ডে। হয়তো সেদিন জন্মের কারণেই জর্জের এমন অদ্ভুত স্বভাব। কিন্তু যাই হোক, জর্জের গোটা পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল।”

“কীভাবে?”

“ঝুড়িগুলো যে টিনের ঘরে এসে থামে, সেখানে আমরা সবাই মিলে যাবার পরিবর্তে গেলেন শুধু দারোগাবাবু। ভেবে দেখুন, প্রেতের আতঙ্কে, একের পর এক মৃত্যুতে এই মানুষটা এমনিতে ভিতরে ভিতরে ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন। প্রেতাত্মারা কিছুদিন আগেই চুষে নিয়েছে ওফেলিয়ার প্রাণ। একদিন আগে সেই ওফেলিয়ার প্রেতাত্মা ফিরে এসেছে। এমন মানসিক অবস্থায় ঘরে ঢুকেই তিনি দেখলেন আবার এক অপঘাত মৃত্যু। বুকে ছোরা বিধে জর্জ পড়ে আছে ঝুড়িতে। আর তারপরেই আচমকা হয়তো ‘এপ্রিল ফুল’ বলে সেই মড়া জেগে উঠল। আমাদের কাছে এটা চমক হতে পারে। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য নলিনীবাবুর হয়তো মনে হল, এই শেষ। এবার সোজা নরক থেকে উঠে আসবে প্রেতাত্মারা। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তিনি আর অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে, হাতের কাছে যা পেলেন… বুক থেকে ড্যাগারটা বার করে আমূল ঢুকিয়ে দিলেন জর্জের হৃৎপিণ্ডে। গোটা ঘটনাটা ঘটল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। জর্জ কিছু বোঝার আগেই তার শেষ মজাটার বড়ো করুণ সমাপ্তি হল।”

“কিন্তু হাতের ছাপ?”

“নলিনীবাবুর হাতের দিকে তাকিয়ে দেখুন ডাক্তারবাবু। ২৯শে মার্চ রাতে, ওফেলিয়ার বাড়িতে আঙুলের ডগাগুলো টেবিল ল্যাম্পে পুড়ে যাওয়ায় আপনিই না ব্যান্ডেজ করে দিলেন! ভুলে গেছেন? আঙুলের ছাপ পড়বে কী করে?”

ঘরে সবাই চুপ। যেন পাথরের মূর্তি। দুই হাত জোড় করে নলিনীকান্তের সামনে দাঁড়াল তারিণী।

“এবার আমায় বিদায় দিন। হরিণ যেমন মরীচিকার পানে ছুটে বেড়ায়, না পেলেও ভাবে জল আছে কোথাও, তেমনি আপনারা সবাই ছুটেছেন কাকাবাবু। জর্জ নিজের সম্ভোগের দিকে, কুমুদবাবু তাঁর লোভের দিকে আর আপনি আপনার বিশ্বাসের দিকে। কিন্তু এসব কিচ্ছু না, একবার ওফেলিয়ার কথাটা ভেবে দেখুন তো। সে ছুটেছিল নিজের স্নেহের টানে। বদরাগি, মেজাজি মেয়েটা শুধু একটা সন্তান চেয়েছিল। যে কোনও মূল্যে। শুধু বুঝতে পারেনি সেই মূল্যটা তাকে জীবন দিয়ে চোকাতে হবে। শুধু তাই না, সেটাকে অভিশাপের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে ধামাচাপা দেবার ঘৃণ্য চেষ্টাও চালানো হবে।

এই বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকা আপনার আর আমার, দুজনের পক্ষেই অস্বস্তিকর। আপনাদের ভালো হোক। যে সত্যি আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি, কথা দিলাম কারও কাছে প্রকাশ করব না। যে আতিথেয়তা আপনার থেকে পেয়েছি, তার তুলনা নেই। শুধু একটাই অনুরোধ। কল্যাণী মেয়েটি ভারী ভালো। আপনি তো বাবা। আপনার সন্তান যাতে কষ্ট পায়, সেরকমটা কি আপনি চাইবেন? যা হোক, ভালো থাকবেন। আমি গতকালকেই স্টেশনে গিয়ে ফেরার টিকিট কেটে রেখেছিলাম। আজকের দার্জিলিং মেলেই আমরা কলকাতা রওয়ানা হচ্ছি। এই ভ্রমণের কথা ভুলব না কোনও দিন।”

নলিনীকে একটাও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তারিণী দ্রুতপায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।