৫. অকুস্থল

৫. অকুস্থল

সরকার জেলা সদর অফিস চালু করলেও তামাটুলিতে এখনও উপযুক্ত দালান বানানো যায়নি। এদিকে থানার যে ছোট গারদঘরটা আছে, তাতে স্থানীয় ছিঁচকে চুরির আসামিদের রাখা গেলেও খুনের দায়ে সোপর্দ ব্যক্তিকে রাখার ঝুঁকি নেননি হার্পার সাহেব। গণপতিকে আপাতত চার্চের একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তার দলবলকেও বলা হয়েছে তামাটুলি থেকে কোথাও না যেতে। জমিদারবাবুই তাঁর বাড়ির আস্তাবলের একধারে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন।

মাদাম এলা কিছুটা ধাতস্থ হয়েছেন শুনে, পরদিন সকালে তারিণী আর প্রিয়নাথ গণপতির সঙ্গে দেখা করতে যাবে ঠিক করল। যার কারণে তামাটুলি আসা, এসে অবধি তাকেই দেখতে পায়নি।

হার্পার বললেন, “আপনারা ওকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করার করে নিন। গণপতিকে এখানে আর বেশিদিন রাখা যাবে না। উপর থেকে অর্ডার এলেই একে জিরনিয়াতে পাঠিয়ে দিতে হবে। কিংবা কলকাতা।”

“চার্জশিট তৈরি করেছেন?” প্রিয়নাথ জিজ্ঞেস করল।

“এখনও না। তবে করব। আজ কালের মধ্যেই। বিনা চার্জে তো একে ধরেও রাখা যাবে না।”

“খুনের চার্জ যে দিয়েছেন, প্রমাণ পেয়েছেন কিছু?” তারিণীর প্রশ্নে একটু যেন চমকে উঠলেন হার্পার। একেবারে নামগোত্রহীন এক নেটিভ তাঁকে এভাবে প্রশ্ন করতে পারে, তা তাঁর চিন্তার বাইরে। হার্পারের দুচোখে যেন পক করে আগুন জ্বলে উঠল।

“আপনি কী ভেবেছেন মিস্টার… মিস্টার… হোয়াটএভার ইয়োর নেন, আমরা কোনও কারণ ছাড়াই একজনকে গ্রেপ্তার করেছি?”

প্রিয়নাথ জানেন রাজার জাতকে চটাতে নেই। তিনি তারিণীকে মৃদু পगক দিয়ে বললেন, “এভাবে বলতে নেই তারিণী। তুমি চুপ থাকো। এ ছোকরা নিতান্ত নবিশ মিস্টার হার্পার। সব আদবকায়দা এখনও শিখে উঠতে পারেনি। কিন্তু ও যা বলতে চেয়েছে, সেটা আমিও জানতে চাই। গণপতির বিরুদ্ধে কী কী প্রমাণ পেলেন?”

সাহেবের রাগ এখনও কমেনি। নেহাত প্রিয়নাথ লালবাজারের দারোগা, তাই গজগজ করে উত্তর দিলেন, “অকারণে ধরিনি। রীতিমতো পাথুরে প্রমাণ আছে। আর…” বলে খানিক চুপ রইলেন হার্পার।

“আর?”

“আর সুপারিনটেন্ডেন্ট রিচার্ড টেলর নিজে মৃত্যুর আগে খুনিকে চিহ্নিত করে গেছেন।”

তারিণী আর প্রিয়নাথ দুজনেই একইসঙ্গে হাঁ। এটা একেবারে অপ্রত্যাশিত।

“কীভাবে?”

“বলব। কিন্তু তাহলে আপনাকে আমার সঙ্গে ওঁর বাংলোতে যেতে হবে।”

“সে তো যাবই। আপনি দয়া করে একটু খুলে বলবেন গোটা ঘটনাটা? আসলে লালবাজারে ডিটেলড রিপোর্ট পৌঁছোনোর আগেই আমরা চলে এসেছি কিনা… আর এসেই তো কাল এমন সব ঘটনা ঘটল যে বিস্তারিত সব কিছু জানতে পারিনি।”

হার্পার লোক মন্দ নন। প্রিয়নাথ ক্রমাগত নরম সুরে কথা বলায় তিনিও কিছুটা নরম হয়েছেন বোঝা গেল।

“আমি গতকালই আপনাকে অকুস্থলে নিয়ে যাব ভাবছিলাম। সময়াভাবে হয়নি। বন্দির সঙ্গে দেখা করতে যাবার আগে সেখানে একবার যেতে চাইলে আমি সঙ্গে যেতে পারি। বেশি দূর না। কাছেই। কিন্তু দিস জেন্টেলম্যান…” বলে আবার তিনি তারিণীর দিকে তাকালেন। মানে পরিষ্কার।

এবার গলা খাঁকরে প্রিয়নাথ বললেন, “সাহেব, এই যুবকটিকে দেখে যতটা সাধারণ মনে হচ্ছে, ইনি ততটাই অসাধারণ। গোপনীয়তার কারণে বলতে পারছি না, কিন্তু এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে, আমাদের চিফ ম্যাজিস্ট্রেট টমসন সাহেব থেকে বড়োলাট অবধি নানা প্রয়োজনে এঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। ক্ষমতায় ইনি বিলাতের বিখ্যাত কনসাল্টিং ডিটেকটিভ হোমস সাহেবের সমকক্ষ। এঁকে অবহেলা করবেন না।”

হার্পার সাহেব যেন একটু দমেই গেলেন।

“তবে চলুন”, বলে তিনজন টেলরের বাংলোর দিকে পা বাড়ালেন।

.

“এই পাণ্ডববিবর্জিত জায়গায় জেলা সদর অফিস খোলার কারণ?” প্রিয়নাথের মনে বেশ কিছুদিন ধরেই এই প্রশ্নটা ঘোরাফেরা করছিল।

“গুড কোশ্চেন। আপনি তো জানেন মিস্টার মুখার্জি, ইদানীং ভারত জুড়ে আমাদের রানির শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে ন্যাশনাল কংগ্রেস আমাদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের অসুবিধের কথা জানানোর শাস্তিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছে। মহারানিও এই সংগঠনকে দমনের চেষ্টা করেননি। শি ইজ ট্রায়িং হার বেস্ট। হাজার হোক, আমরা, ইংরেজরা সবার সমান অধিকারে বিশ্বাসী। কিন্তু কিছুদিন হল অবস্থা বদলেছে। চারিদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো উগ্রপন্থী সংগঠন গড়ে উঠছে। এরা কারা, এদের নাম কী, এদের সংখ্যা কত, কিছুই আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এরা কোনও মিটিং মিছিল করে না। একেবারে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা ধরা পড়ে। এদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। দুদিন বাদে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে আর-এক জায়গা থেকে আক্ৰমণ নেমে আসে।”

“আমি জানি মিস্টার হার্পার, আমি জানি। রক্তবীজের বংশধর সব!”

“কী বললেন?”

“নেভার মাইন্ড। আপনি বলুন।”

“হ্যাঁ, যা বলছিলাম, বছর কয়েক আগে পুনায় সেই চাপেকর ব্রাদার্সের ইনসিডেন্টটার পরে এই টেররিস্টদের সাহস অনেকটা বেড়ে গেছে। তারা ভাবছে ইংরেজ রাজপুরুষকে চাইলেই খুন করতে পারে। এ ব্যাপারে আমাদের রানি একেবারে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। এদের বেশি বাড়তে দিলে আবার ফিফটি সেভেনের মিউটিনির দিন ফিরে আসতে সময় লাগবে না। আমাদের কাছে খবর ছিল, বেশ কিছু ফেরার টেররিস্ট তাড়া খেয়ে এদিক ওদিক পালিয়েছে। তাদের অনেকেই এই জিরনিয়া, লবটুলিয়া, তামাটুলিতে নাম ভাঁড়িয়ে লুকিয়ে আছে। এখানে লুকোনো সহজ। চারিদিকে ঘন জঙ্গল, দূরে দূরে থানা। কে কোথায় লুকিয়ে থাকবে, তা দেখা প্রায় অসম্ভব। সরকার তাই তামাটুলিতে জেলা সদর অফিস বানাচ্ছেন যাতে এইসব জায়গায় নজর রাখার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ জঙ্গলে চিরুনি তল্লাশি চালাতে পারে। রিচার্ড টেলর সুনামের সঙ্গে মাদ্রাজ আর বম্বে প্রেসিডেন্সিতে দায়িত্ব সামলেছেন। এই এপ্রিলেই রানির মুখপাত্র হয়ে সুদূর চিনদেশে গেছিলেন। সেখানে নাকি আবার খ্রিস্টান মিশনারিদের উপরে বক্সাররা আক্রমণ চালাচ্ছে। ওখানের কাজ মিটতে সরাসরি এখানে। আর তারপরেই…”

তিনজন হাঁটতে হাঁটতে ছোট একটা বাংলোর সামনে চলে এসেছিল।

“কিন্তু যেখানে জেলা সদর অফিস বিল্ডিং অবধি এখনও ঠিকঠাক তৈরি হয়নি, সেখানে এত তাড়াহুড়োরই বা কী ছিল?”

“তাড়া আমাদের না। স্বয়ং টেলর সাহেবের। বিয়ে-থা করেননি। কাজপাগল মানুষ। কোথাও অশান্তির খবর শুনলেই সেখানে ছুটে যাবেন। সরকার চালানো যেন ওঁর ব্যক্তিগত ক্রুসেড। মিথ্যে বলব না, প্রধানমন্ত্রী স্যালিসবেরিও ওঁকে পছন্দ করেন। যেই কানে এসেছে এখানে কিছু টেররিস্টের আস্তানা হতে পারে, অমনি টেলর ছুটে চলে এসেছেন। তবে দালান তৈরি হচ্ছে। আর মাসখানেক বড়োজোর। কিন্তু তার আগেই এমন ঘটনা ঘটে যাবে, কে জানত?”

বাংলোর ফটকের সামনে এক পেয়াদা তাঁদের দেখেই লম্বা সেলাম ঠুকে কটক খুলে দিলে। ভিতরে বাগান আছে, তবে তেমন গুছানো নয়। ইতস্তত কয়েকটা মার্বেলের মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে। চারিদিকে বিরাট উঁচু পাঁচিল। দেখেই বোঝা যায় কোনও পুরোনো বাংলো চটজলদি সারিয়ে বসবাসযোগ্য করা হয়েছে। এক কোণে এখনও ভারা বাঁধার বাঁশ, কাঠ, দড়ি জড়ো হয়ে পড়ে আছে। কিছুটা মোরামের পথ পেরিয়ে মূল বাসস্থান।

“শুনেছি বছর পাঁচেক আগে এক বুড়ো ইহুদি এই বাড়িতে থাকত। তার তিন কুলে কেউ নেই। বুড়ো মরার পর বেশ কিছুদিন এই বাড়ি বন্ধ ছিল। শেষে স্থানীয় চার্চ এর দখল নেয়। আমিই পাদরিকে বুঝিয়ে এখানে কমিশনারের একটা থাকার ব্যবস্থা করি। আসুন।”

পকেট থেকে লম্বা পিতলের একটা চাবি বার করলেন হার্পার। মূল দরজায় বিরাট তালা ঝুলছে। তাতে মার্কিন কাপড় জড়িয়ে, সুতো বেঁধে গালা দিয়ে সিল করা। সিল ভেঙে ঘরে ঢোকা মাত্র তারিণীর নাকে অদ্ভুত একটা গন্ধ এল। এমন গন্ধ মন বিষণ্ণ করে দেয়। ঢুকেই সরু একটা লবির দুপাশে দুটো করে মোট চারটে বড়ো ঘর। বাঁদিকের দুটো ঘর খালি আর ডানদিকে শুরুতেই একটা বসার ঘর আর তারপর বেডরুম। দুটোই সুসজ্জিত।

“আচ্ছা, টেলর সাহেব কি আচমকা এসে পড়েছিলেন? মানে কোনও খবর না দিয়েই?” তারিণী প্রশ্ন করল।

“একরকম তাই বলা যায়। আর সেইজন্যেই সব ঘর গুছিয়ে ওঠা যায়নি। খবর পেলাম সাহেবের জাহাজ আরএমএস মে ফ্লাওয়ার চিন থেকে ফিরতে আরও একমাস লাগবে। আমরা নিশ্চিন্তে আছি। এমন সময় হঠাৎ জিরনিয়া থেকে তার পেলাম, সাহের এসে গেছেন। তখন সাততাড়াতাড়ি যতটা গোছানো যায় আর কি।”

“সাহেবের সঙ্গে মালপত্র?”

“মালপত্র বলতে পোশাকের দুটো ট্রাঙ্ক আর প্রায় তিন ট্রাক ভর্তি বই। তাদের কিছু সাহেব নিজে বসার ঘরে গুছিয়ে রেখেছিলেন, আর কিছু এখনও দড়িবাঁপা অবস্থায় ট্রাঙ্কবন্দি হয়ে পিছনের গুদাম ঘরে পড়ে আছে। তবে এই বই ছিল বলেই তো খুনি ধরা এত সহজ হল।”

“মানে?”

“সবটা বুঝিয়ে বলছি। আগে এই বসার ঘরে আসুন। এই যে দেখছেন কাচ লাগানো দরজার পাল্লা দুটো হাট করে খোলা, আর দুটো কাচ নেই, সেদিন অবশ্য এমনটা ছিল না। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। উলটো দিকের জানলাটাও ভিতর থেকে বন্ধ। দরজা ভেঙে ঢুকে আমরা সুপারিনটেন্ডেন্টকে এই ঘরেই মৃত অবস্থায় পাই। বাকি যা যা দেখছেন, সব সেদিন ঠিক যেমন ছিল, তেমন রেখেছি। আমিই বলেছিলাম, যতক্ষণ না লালবাজার থেকে পুলিশ ডিটেকটিভ আসছেন, কিছু ধরা যাবে না।”

“আচ্ছা, সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেব মারা গেলেন কীভাবে?”

তারিণীর এই সরল প্রশ্নে চমকে প্রথমে তার দিকে, পরে প্রিয়নাথের দিকে তাকালেন হার্পার।

তারিণী স্পষ্ট দেখল হার্পারের মুখের রং কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনি এঁকে বলেননি কিছু?”

“না। কারণ যে রিপোর্ট এখান থেকে গেছিল, সেটা আমার নিজেরই বিশ্বাস হয়নি।”

ঘরে এক দমবন্ধ নীরবতা ঝুলে রয়েছে যেন।

“কীভাবে মারা গেলেন?” আবার জিজ্ঞাসা করল তারিণী।

প্রিয়নাথ”ছুরির আঘাতে”, বলতেই যেন জ্বলে উঠলেন হার্পার।

“আই বেগ টু ডিফার স্যার। শুধু ছুরির আঘাত বলবেন না। সেই রিপোর্ট আমিই পাঠিয়েছিলাম। অস্বাভাবিক, অমানুষিক শক্তিতে ছুরিটাকে বুকের মধ্যে প্রায় বাঁট অবধি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, খুনি অদৃশ্য হবার ক্ষমতা রাখে।”

.