১৮. ফাইভ পয়েন্ট
আলগা ভেজানো দরজা খুলতেই গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে তীব্র একটা গন্ধ এসে তারিণীদের নাক যেন জ্বালিয়ে দিল। খুব চেনা গন্ধ। কিন্তু না, একাধিক চেনা গন্ধেরা মিলেমিশে ঝিম ধরানো নতুন একটা গন্ধের রূপ নিয়েছে।
“এসব কী তারিণী?” প্রিয়নাথ জিজ্ঞাসা করলেন।
“জানি না। তবে কার্বলিক অ্যাসিড আর কেরোসিনের গন্ধ। সারা ঘরে কেউ অ্যাসিড আর কেরোসিন ছড়িয়েছে।”
“তাও প্রচুর পরিমাণে”, বললেন হার্পার।
“সর্বনাশ!” নাকে রুমাল চাপা দিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন প্রিয়নাথ ।”এ তো প্রায় জতুগৃহ বানিয়ে রেখেছে! এই কাঠের বাড়ির গোটাটাই প্রায় কেরোসিনে চুবানো। এক ফুলকি আগুন ধরলেই আমরা জ্যান্ত পুড়ে মরব। বেরিয়ে চলো।”
বন্ধ জানালার একটা ছোটো ফুটো দিয়ে চাঁদের আলো এসে ঘরের মেঝের কিছুটা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে সামনেই ভিতর ঘরে যাবার পথে একটা পর্দা টাঙানো। পর্দার ওপারে কেউ আছে কি না বোঝা মুশকিল। কেউ আর এগোনোর সাহসও করছে না।
তারিণী এক পা এগোতেই অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ভাঙা গলার আওয়াজ ভেসে এল, “খবরদার! আর এক পা এগোলেই মৃত্যু। আমি অবশ্য আপনাদের জন্যেই এই কুটিরে অপেক্ষা করছিলাম।
“যাক! সময়মতো চলে এসেছি, কী বলেন মাদাম এলা?”
“নাহ, বড্ড দেরি করে ফেলেছেন।”
পর্দার ওপারে নড়াচড়ার শব্দ। গ্যাসবাতিটাকে উসকে দিলেন আরিয়েল্লা। এখন পর্দায় তাঁর অবয়ব এক সিল্যুয়েটের মতো দেখাচ্ছে। ফ্যাকাশে হলুদ আলোতে শুধু তাঁর বসে থাকাটুকু বোঝা যাচ্ছে। তিনি বসে আছেন বজ্ৰাসনে। আগের দিন যেমন ছিলেন।
“কাছে আসবেন না। আর কিছুক্ষণ বাদেই আমি মারা যাব, আর আমি চাই যতটা সম্ভব শান্তিতে যেন মরতে পারি। তবে মরার আগে আমার সব পাপের কথা স্বীকার করার জন্য কাউকে তো চাই। ভালো হল, আপনারা তিনজন এসে গেলেন। বুড়ো পাদরিকে ডাকার প্রয়োজন নেই। আর আমার পাপের বোঝা বহন করার শক্তিও বেচারা পাবেন না। তবে হ্যাঁ, আপনাদের কাছে আমার কিছু অনুরোধ আছে। আপনারা চলে যাবার সময় এই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবেন। জানি ক্যাথলিক খ্রিস্টানের পক্ষে পুড়ে মরা মানে নরকযাত্রার সমান। কিন্তু যে পাপ আমি করে ফেলেছি, তাতে স্বর্গে যাবার কিছুমাত্র সুযোগ নেই। আমি সব কিছুর দায় নিজে নিয়ে একটা কাগজে লিখে ঘরের ঠিক মাঝের টেবিলে রেখে দিয়েছি।
সেই ম্যাজিশিয়ানকে ছেড়ে দেবার পক্ষে এটাই যথেষ্ট। আর সামান্য কিছু সম্পত্তি আছে আমার। সেটাও উইল করে রেখে গেলাম। মিস্টার হার্পার, দয়া করে দেখবেন, যেন সেটুকু রক্ষা করা হয়। এক মৃত্যুপথযাত্রীর এটুকু অনুরোধ আপনি রাখবেন আশা করি।”
“কিন্তু আপনাকে তো এভাবে মরতে দিতে পারি না। ইংরেজ আইন আপনার বিচার করবে”, বলে প্রিয়নাথ এগোতেই তারিণী এক হ্যাঁচকায় তাঁকে পিছনে টেনে নিল।
“এক পাও এগোবেন না। এই রোগ স্পর্শে ছড়ায়”, হিসহিসে গলায় বলল তারিণী।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা হাসির আওয়াজ ভেসে এল পর্দার ওপার থেকে। যেন কোনও বাচ্চা মেয়ে মজা পেয়েছে। আর তারপরেই শুরু হল ভয়ানক কাশির দমক। প্রিয়নাথ বুঝতে পারল, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় এলার গোটা দেহটা মাটিতে পড়ে সাপের মতো ছটফট করছে। তবে মুখ চেপে ধরে সেই কাশিকে থামাতে চেষ্টা করে চলেছে সে। প্রিয়নাথ ভাবলেন, একটু কাছে গিয়ে রোগিণীর মুখের সামনে এক গেলাস জল তুলে দেবেন। কিন্তু তারিণী তখনও বজ্রমুষ্টিতে তাঁর হাত চেপে ধরে আছে।
খানিক বাদে কিছুটা সামলে এলা অদ্ভুত গলায় বললেন, “তাহলে আপনি বুঝতে পেরেছেন, মিস্টার প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”
“পেরেছি। যতটুকু সন্দেহ ছিল, গত সতেরো তারিখের স্টেটসম্যান-টা দেখেই ঘুচে গেছে। তবে আপনিও একটা কাঁচা কাজ করে ফেলেছিলেন। জানি না পরখ করার জন্যে কি না, আমার সামনে কেলির নামটা না করলেই পারতেন।”
এলা চুপ।
প্রিয়নাথ জিজ্ঞেস করলেন, “কোন কেলি?”
“ভুলে গেলেন দারোগাবাবু? নিউ ইয়র্কের সেই কুখ্যাত গুন্ডা পল কেলির নাম বলেছিলেন মাদাম এলা। ডাক্তার ওয়ার্ড আর উনি নাকি তাঁদের উপদ্রবেই এ দেশে পালিয়ে চলে এসেছেন। এদিকে কেমন কাকতালীয় দেখুন, এই কেসে অদ্ভুত কিছু জিনিসপত্র আমাদের হাতে এসেছে। জার্মান ছোরা, ইতালিয়ান বোতল বোমা, চিনদেশীয় কাগজের মুখোশ। খাঁটি ব্রিটিশ জিনিস একটিও নেই। কিন্তু এরা সব আলাদা আলাদা জায়গা থেকে এসেছে মনে করার বদলে যদি ভাবি, এরা এমন এক জায়গা থেকে এসেছে, যেখানে এই সব জাতির মানুষদের একসঙ্গে দেখা যায়, তবে একটা দেশের কথাই মাথায় আসে। আমেরিকা। যখন জানলাম, ডাক্তার ওয়ার্ড কিছুদিনের জন্য নিউ ইয়র্কে ছিলেন, তখনই মন কু গেয়েছিল। তার উপরে বজ্রাসনে বসা মাদামের প্রতিটি আঙুলে নখের ঠিক নিচে একটা করে তারার উল্কি। মাস কয়েক আগে নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড পত্রিকায় জোসেফ পুলিৎজার নামে এক সাহেব কেলির দল নিয়ে বড়ো একটা লেখা লিখেছিলেন। আশুবাবুর লাইব্রেরিতে পড়েছি। সেখানেই লেখা, এই দলের নাম ফাইভ পয়েন্ট গ্যাং। দলের সকলের হাতের আঙুলে একটা করে তারার উল্কি আর গলায় পাঁচটা তারা। চারটে একটা বর্গক্ষেত্রের চার কোণে আর একটা মাঝে। কেলিকে একবার জেলে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল। চার বিন্দু সেই চার দেওয়াল। আর মাঝের বিন্দু কেলি নিজে।
“ব্র্যাভো!” পর্দার উলটো দিক থেকে উত্তর এল।”অনেক কিছু জেনে গেছ হে ছোকরা। কিন্তু এটা কি জানো, কীভাবে দিনের পর দিন নিজের দলের মেয়েদের অত্যাচার করত কেলি? কীভাবে না চাইলেও রাতের পর রাত তাদের কাটাতে হত সিফিলিস আক্রান্ত পুরুষদের সঙ্গে? একটু বেগড়বাঁই করলেই ভাঙা কাচের বোতল ঢুকিয়ে দেওয়া হত যৌনাঙ্গে কিংবা বুটের বাড়ি মারতে মারতে মুখ থেঁতলে দেওয়া হত, যতক্ষণ না সে মুখ চেনার অযোগ্য হয়ে যায়? আমরা ছিলাম পলের অস্ত্র। পলের যত গোপন ধান্দা, যত পাপের বেসাতি, আমরাই করতাম। আর তার বদলে পান থেকে চুন খসলে জুটত অকথ্য মার আর অত্যাচার। এসবের কতটা লিখেছেন মিস্টার পুলিৎজার?”
“আমি বুঝতে পারছি…” তারিণী কিছু একটা বলতে যেতেই প্ৰায় ধমকে উঠলেন এলা, “কিছুই বুঝতে পারছ না। ইউ নো নাথিং মাই ল্যাড। নাথিং। তুমি কয়েকটা ঘটনাকে অনুমানের সুতোয় বেঁধে সত্যের মালা গাঁথার চেষ্টা করছ। কিন্তু সত্যটা একেবারে অন্যরকম। বললে সহ্য করতে পারবে?”
“আপনি বলুন মাদাম। আমরা শুনব।” নরম গলায় বলল তারিণী।
.
খানিক চুপ থেকে বোধহয় এক ঢোঁক জল খেয়ে আবার কথা বললেন আরিয়েল্লা।
“তাহলে শুনুন আপনারা। পাপ করলেও মনেপ্রাণে আমি ক্যাথলিক। আমার স্বামী এক মহান মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন স্বীকার করলে নাকি সব পাপের ক্ষমা হয়। আমি ক্ষমা চাইছি না। কিন্তু মরার আগে কনফেশনটা করতে খুব মন চাইছে।”
“আপনি কথা বলতে পারবেন?”
“পারব। আমাকে পারতেই হবে। তবে শুনুন…”
.
