যাহাতে কলিকাতার বুকে নৃশংসভাবে খুন হন ইম্পেরিয়াল সার্কাসের ম্যানেজার পান্নালাল। মূল সন্দেহভাজন এক মৃতদেহ।
.
বেলা ব’য়ে যায়,
গোধূলির মেঘ-সীমানায়
ধূম্ৰমৌন সাঁঝে
নিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে,
শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে;
পান্থ ম্লান চিতার কবলে
একে-একে ডুবে যায় দেশ জাতি সংসার সমাজ
পিরামিড, জীবনানন্দ দাশ
প্ৰথম পৰ্ব
“ভালোবাসার জন্য ছাড়া অন্য কোনও মৃত্যুই সত্যি না”, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলছিল তারিণী।
সে এটা কোথায় পড়েছিল ঠিক মনে নেই। তবে মন্ত্রের মতো এই এটাই আউড়ে যাচ্ছিল ক্রমাগত। তারিণীর দুচোখ বোজা। জানে চোখ খুললেই সে কী দেখতে পাবে। একটু আগে তার সামনে যে দৃশ্য থিয়েটারের ক্ল্যাইম্যাক্সের মতো খুলে গেল, তা এতই ভয়াল, এতই অলীক, যা ইহজন্মে কোনও দিন দেখবে বলে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। আজ সকালে যখন প্রিয়নাথ মুখুজ্জে হাবিলদার দিয়ে তাঁকে এত্তেলা দিলেন, কিংবা টিকিটঘরের পাশে সোডা লেমোনেডের দোকানের সামনের ভীরু জটলা থেকে যখন”দানোর ভর” কথাটা কানে এল আর ন্যাশনাল সার্কাসের সবচেয়ে হাসিখুশি বামন জোকারকে তাঁবুর একপাশে মাথা গুঁজে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখল, তখনও সে এতটা আন্দাজ করতে পারেনি।
সার্কাসের রিফ্রেশমেন্ট রুমের ধারে মিনাজারির জন্তুজানোয়ারগুলিও যেন আজ এক অজানা ভয়ে ত্রস্ত। খুব ধীর পায়ে পায়চারি করছে তারা। বহুদূর থেকে শোনা যাচ্ছে একটা কুকুরের ডাক। একটানা না। থেমে থেমে। একটা বাঘ দু গর্জন করল যেন। চোখ বন্ধ অবস্থাতেও তারিণীর পা কাঁপছে। ক্যারাভানের কাঠের সিঁড়ি একসঙ্গে দুইজনের ভার নিতে পারে না। তবু তারিণীর এই অবস্থা দেখে প্রিয়নাথ একধাপ উঠে তারিণীর হাত ধরে শুধালেন, “কী বুঝছ?”
তারিণীর মুখে কথা জোগাচ্ছিল না। গলা জিভ সব শুকিয়ে গেছে। প্রায় জোর করেই আবার চোখ খুলল। আর খুলতেই সেই ছবি। আবার। অবিকল। সার্কাসের ম্যানেজার পান্নালালের ছোটোখাটো দেহটা চেয়ারের একপাশে এলিয়ে পড়ে আছে। সামনে ভারী সেগুন কাঠের টেবিলটা না থাকলে হয়তো মাটিতেই পড়ে যেত। পড়লেই ভালো হত বরং। এখন আধা ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর বিস্ফারিত চোখ আর হাঁ করা মুখ দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় মৃত্যু যে এত দ্রুত, বিদ্যুৎগতিতে নেমে আসবে তা পান্নালাল ভেবে উঠতে পারেননি। পান্নালালের বিরলকেশ খুলি ফেটে চৌচির। অমানুষিক, দানবীয় শক্তিতে প্রচণ্ড আক্রোশে খুনি তাঁর মাথা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
অবশ্য এক্ষেত্রে খুনি খুব বেশি দূরে নেই। পান্নালালের ক্যারাভানের ভিতরে তাঁর পাশেই একদিক ফিরে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে পান্নালালের আততায়ী। একে দেখেই চিনতে পারল তারিণী। বাইরে সার্কাসের হাতে আঁকা পোস্টারে এরই ছবি আঁকা হয়েছে সবচেয়ে বড়ো করে। হ্যান্ডবিলে একে নিয়েই লেখা থাকে”অমিত শক্তিশালী, যে-কোনো লৌহবেষ্টনী ভঙ্গকারী, ব্যাঘ্র দমনকারী কলিযুগের ভীমসেন হুকুমচাঁদ।” হুকুমচাঁদ লম্বায় প্রায় আট ফুট, তেমনই আড়ে-বহরে। মাংসের পাহাড় বলা চলে। শুধু তাকে দেখতেই দূর দূর থেকে কত লোক আসে।
হুকুমচাঁদের একটা চোখ এখন বন্ধ। অন্য চোখ-সহ মাথাটার কিছু অংশ গতকাল রাতেই খেলা দেখানোর সময় বাঘের পেটে চলে গেছে। আজ সকালে সব পত্রিকায় সে খবরও হয়তো বেরিয়েছে ফলাও করে। যা বেরোয়নি, হয়তো কাল বেরোবে, তা হল হুকুমচাঁদের আধখাওয়া মৃতদেহ কোনও অলীক মন্ত্রবলে গতরাতে প্রাণ ফিরে পেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তার চিরশত্রু ম্যানেজার কাম মালিক পান্নালাল বসাককে।
বেঁচে থাকতে বহুবার চেয়েও সে যেটা করতে পারেনি…
.
২।
১৮৯৮ সালের অক্টোবর মাস। কলকাতা শহরে প্রত্যেকবারের মতো এবারেও পুজো আসছে। তবে এবার পুজোর আগে সেই বোলবোলাও নেই। গত দুই বছর ধরে প্লেগের মহামারিতে শহরের অর্ধেক নেটিভ আর সাহেব ফৌত হয়েছেন। শহরে বিশ থেকে চল্লিশ বছরের পুরুষমানুষ আর কটাই বা দেখা যায়? ব্ল্যাক টাউনের ঘরে ঘরে হাহাকার। সংবাদ রত্নাবলী পত্রিকায় বড়ো করে হেডিং করেছে, “সুখের পুজোতে এবার সেই মহাধুম নাই।”
তাতেও কম কিছু হচ্ছে না। পুজোর মরশুম এলেই ইংরেজদের পোয়াবারো। তাঁদের সবচেয়ে বিক্রিত পত্রিকা ইংলিশম্যানের পাতায় পাতায় লেখা থাকে এই বছর কোন কোন পুজো সবচেয়ে”স্পেলেন্ডিড” হতে পারে, তার বিবরণ, কোথায় কোন বাই আসছে, কোন বাড়ি কেমন করে সাজানো হচ্ছে। এই তো সেদিন গোপীমোহন দেবের বাড়িতে পুজো শুরুই হল গড সেভ দ্য কুইন গেয়ে। তাতেও শেষ না। পুজো মন্ত্রের আগে সুর করে একদল গাইয়ে গাইলে—
উড়িষ্যা-বেহার-বঙ্গ অধিপতি
সিরাজ-উদ-দৌলা যবন কুমতি,
পরাজিত হইয়া ক্লাইবের বলে
ত্যাজিল ধরণী আধার।
ক্লাইবের গুণে কলিকাতা মাঝে
ফোর্ট উইলিয়াল দুর্গ বিরাজে,
অরিকুল-বীরগণ-দুরজের
ভূধরগহবর মতন।
তবে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোর আবার অন্য ধুমধাম। সেখানে ভারি জাঁকের পুজো করতেন। সাধারণ লোকের ঢোকার অধিকার নেই। তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন ফটকের বাইরে। ভিতরে ঢুকতে গেলে রীতিমতো টিকিট লাগে। তবে টিকিটধারী বড়লোক আর পুজোর বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় না প্রায়ই। পুরোহিত বলে দ্যান”বাবুরা ওপরে, ওই সিঁড়ি, মশাই যান না!” কিন্তু নিমন্ত্রিতরা”আজ্ঞে না আরও পাঁচ জায়গায় যেতে হবে, থাক” বলে টাকাটুকু দিয়ে ওমনি গাড়িতে ওঠেন।”বাবু নিজের ফুর্তিতে মসগুল। গোবিন্দরাম মিত্তিরের বাড়ি তিনদিন টানা বলি তো হতই, নবমীর দিন সেই বলির সীমা থাকে না। বলিদানের আরতির পরে সেই রক্তমাখা উঠানে মোষ আর ছাগলের মুণ্ডু নিয়ে মল্লযুদ্ধ, ব্যায়ামক্রীড়া হয়। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। একজন উবু হয়ে বসে উরু আর পেটের মাঝে নারকেল ধরে চেপে রাখেন আর আট দশজন বীর সেই নারকেলটি বার করে নেবার জন্য আছাড়ি পিছাড়ি করে রক্ত মেখে সারা হন। তারপর পথে মিছিল বার হয়। সেই রক্তাক্ত দেহের পুরুষদের দেখে মনে হয় যেন দক্ষযজ্ঞ ধ্বংস করে শৈব সৈন্যেরা সদর্পে পৃথিবী কাঁপিয়ে চলেছেন।
প্রতিবার এই সময় থেকেই গড়ের মাঠে সার্কাসের তাঁবু পড়ে। বিলাতি সার্কাস আসে। এই যে এইবার সেই বিলিতি ইম্পেরিয়াল সার্কাসের দল খেলা দেখাতে আসবে না, সে কথা লোকের মুখে মুখে ফিরছিল অনেকদিন থেকেই। দুর্গাপুজোর অনেক আগে থেকেই ইংলিশম্যান পত্রিকায় সংশয় প্রকাশ করেছিল। গোপন সুত্রে প্রকাশ, সেই দলের বেশিরভাগ সাহেব আর মেমসাহেব নাকি প্লেগের ভয়ে এই দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছেন। সে সার্কাসের কী হল কেউ জানে না। ফলে এবার যে কলকাতায় সার্কাসের খেলা হচ্ছে না, সে বিষয়ে সবাই প্রায় নিশ্চিত ছিল। তবু কিছু আশা থেকে যায়। বলা যায় না। হয়তো কোনও ভবঘুরে সার্কাসের দল খেলা দেখাতে এল।
পুজোর এক হপ্তা আগে অবধি কোনও খবর ছিল না, তারপর হঠাৎ মহালয়ার আগের দিন গড়ের মাঠের একপাশে লাল, নীল তাঁবুর ঘেরাটোপ পড়তেই শহরের মানুষ নড়েচড়ে বসল। কেউ বললে এরা সাহেবি সার্কাস না। প্রচুর নেটিভকে নাকি দড়ি ধরতে, গোঁজা পুঁততে দেখা গেছে। কেউ কেউ বললে এবার নাকি গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস আবার ফিরে এসেছে। রেওয়ার রাজার নাকি ক্ষমতা হয়নি তাদের খাঁই মেটানোর। পগারের ধারে পাতা জ্বালিয়ে, আলোয়ান মুড়ি দিয়ে আগুন পোহাচ্ছিল জনা চারেক। তাদেরই একজন বুক ঠুকে বলে বসল, “এই বাজি ধরে বলচি ভাই, এ বোসের সার্কাস ছাড়া কিছু না। আমি সেদিন সন্ধের দিকে ওইদিকপানে গেছলুম। ওমা! দেখি স্বয়ং বোস সায়েব। পরনে কোট প্যান্টুলুন, হাতে চাবুক, মহানন্দে একটা সিংহকে চাবকাচ্চেন।”
শুনেই জটলার সবাই হো-হো করে হেসে উঠল। গুপীনাথ আর থাকতে না পেরে বললে, “রোসো রোসো হে শ্যামাচরণ, সন্ধের পর দেখা তোমার কোনও কতাই যে বিশ্বেস হয় না। তোমার মতো গুলিখোর সন্ধের পর যা দেখেচ, তা সাদা চোকের দেখা, না অহিফেন তোমায় দেকালো, তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন আচে। আমার কাচে খাঁটি খবর, তেনারা রেওয়ায় খেলা দেকিয়ে এবার রেঙ্গুনের পতে যেতে পারেন।” শ্যামাচরণ ছাড়ার পাত্র নয়। সবার সামনে গুলিখোর বলাটা সে মেনে নিতে পারেনি। ফলে সেও খেপে উঠে”রাক তোর খাঁটি খবর, গু-খোরের বেটা…” বলে তেড়ে গেল। ঝামেলা পাকিয়ে উঠল।
সব মিলিয়ে কদিন ধরে নানা আলাপ আলোচনায়, আপিস কাছারিতে, দোকানে বাজারে এই সার্কাসের কথাই বলতে লাগল সবাই। এরা কারা, কোথা থেকে এসেছে, কবে থেকে খেলা দেখাবে, কিছুই জানে না কেউ। ফলে কল্পনা উড়ান নিল। অদ্ভুত সব গল্পকথা শোনা যেতে লাগল এদের নামে। শহরের কিছু নিষ্কর্মা লোক সার্কাসের তাঁবুর এদিক ওদিক উঁকি মেরেছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তাদের দেখামাত্র নাকি ভাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওদের দলে নাকি একটি খেঁকি কুকুর আছে। অবাঞ্ছিত লোক দেখলেই তাকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তবু তাঁবুর ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে যে খবর কানে আসে, তা অদ্ভুত রোমাঞ্চকর। দলে নাকি প্রায় দোতলাসমান উঁচু এক দানব আছে, হাতিদের আকার সাধারণ হাতির চারগুণ, ঘোড়ারা সব তাগড়াই আরবি ঘোড়া, বাঘেরা মহা তেলিয়ান, সিংহগুলো ভয়ানক হিংস্র। একজন তো এমন খবরও আনল, সেই দলে নাকি মুখ থেকে আগুন বার করা গিরগিটি, দুইমাথা, চার পা-ওয়ালা শিশুও আছে। কিছু লম্পট বলে বেড়াতে লাগল, “এবারের ট্রাপিজের মেয়েগুলো অন্যবারের চেয়ে ঢের সরেস। আমি নিজে পরীক্কা করে দেখেচি। এই দিব্যি গেলে বললুম।” সোজা কথা, সার্কাসের একটা শো হবার আগেই সার্কাস নিয়ে শহরে বেশ একটা হইচই পড়ে গেল। সব জল্পনার অবসান হল যখন হিতবাদী পত্রিকায় বেশ বড়ো করে খবর করল-
এই অ্যাক নূতন
১২ অক্টোবর, সন ১৮৯৮: হিতবাদী পত্রিকার পাঠকগণ নিশ্চিত অবগত আছেন যে কলিকাতার গড়ের মাঠে এদানি এক সার্কাস কোম্পানি আসিয়া তাঁবু গাড়িয়া বসিয়াছে। উহাদের পরিচয় কী, উহারা কোথা হইতে আসিয়াছে, বেঙ্গল সার্কাসের সহিত উহাদের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, এই লইয়া হিতবাদীর পাঠকগণ দিবানিশি চিন্তিত। কয়েকজন মহাশয় তো এই মর্মে আমাদিগের পত্রিকার দপ্তরে পত্রাঘাত অবধি করিতে ছাড়েন নাই। পাঠকদের অবগতির জন্য আমরা বিস্তর খোঁজ খবর লইয়াছি এবং হিতবাদীর সাংবাদিকদের অভূতপূর্ব কৌশলে যাহা জানিতে পারিয়াছি, তাহাই আপনাদিগের সঙ্গে ভাগ করিয়া লইলাম।
গড়ের মাঠের এই সার্কাসটি বেঙ্গল সার্কাস তো নহেই, এমনকী ইহাকে পুরাতন ইম্পেরিয়াল সার্কাস-ও বলা চলে না। ইম্পেরিয়াল সার্কাসের মালিক টমাস সাহেব সার্কাসের সমস্ত স্বত্ব উহার ম্যানেজার শ্রী পান্নালাল বর্ধনকে বিক্রি করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন নিমিত্ত রওনা হইবার পূর্বেই প্লেগে আক্রান্ত হইয়া মারা যান। দলের পুরাতন ইউরোপীয়ান খেলোয়াড়দিগের অনেকেই সার্কাস ছাড়িয়া দেন। ফলে পান্নালাল এক বৎসরকাল সারা ভারতবর্ষ ঘুরিয়া ঘুরিয়া নূতন ও আশ্চর্য সব খেলোয়াড়দের একত্র করিয়া কলিকাতায় খেলা দেখাইতে আসিয়াছেন। তাঁহার দলে একহস্তপ্রমাণ বামন হইতে অট্টালিকাসম দানব-উভয়েই রহিয়াছে। পশুপাখির পুরাতন খেলার সহিত ট্রাপিজের খেলায় নিত্যনতুন সংযোজন হইয়াছে বলিয়া দাবী। আমাদের বিশ্বাস ‘দ্য গ্রেট ন্যাশনাল সার্কাস’ নাম্নী এই নূতন সার্কাসটি কলিকাতাবাসীর মনোরঞ্জনে সমর্থ হইবে। প্রথম শো বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা হইতে, কিন্তু সেটি কেবল ইউরোপীয়গণের জন্য সংরক্ষিত। জনসাধারণের জন্য আগামী একাদশী হইতে এই সার্কাসের শো উন্মুক্ত হইবে। শহরবাসী প্রস্তুত থাকুন।
লক্ষ্মীপুজোর রাতেও দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের নাইট ডিউটি ছিল। প্রতি বছর পুজোর সময় এই এক ঝক্কি। দেশের বাড়ি স্ত্রী-পুত্রদের সঙ্গে কাটানো দূরে থাক, নিজের কলকাতার ভাড়া করা বাসায় অব্দি যেতে পারেন না। এই ক’দিন শহরে আমোদের চূড়ান্ত। স’বাজারের রাজার বাড়িতে আজ বিজয়ার ভোজে সাহেব মেম দর্শকদের ভীড়। সাদা মুখের শোভায় রাজবাড়ির উঠানে পদ্মফুলের মালা ফুটে ওঠে আর দলে দলে বাঙালিরা আশেপাশে ঘেঁষে গুঞ্জন করে। সাহেবদের জন্য শেরি শ্যাম্পেন ব্র্যান্ডি বিস্কুট থাকে বটে আর ভাগ্যবান দু-দশজন বাঙালি তার প্রসাদ পান। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার বেলা বাঙালিদের ভাগ্যে ফক্কা। তাতেও উৎসাহে ভাঁটা পড়ে না। আজ কোজাগরীর দিন বলে রাস্তার ভীড় অপেক্ষাকৃত কম। আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। কিন্তু ফাঁকা রাস্তায় চুচুরে মাতালদের কমতি নেই।
মধ্যরাতের একটু পরেই প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ সহ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। এই অবস্থায় আর ঘোরা যায় না। নিজের আপিস ঘরে ঢোকার সময় প্রিয়নাথ খেয়াল করলেন তাঁর দরজার পাশেই দুটি প্রহরী ফিসফিসিয়ে উত্তেজিতভাবে হাত পা নেড়ে নিজেদের মধ্যে কী একটা আলোচনা করছে। প্রথমে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, আচমকা কানে”বাঘ” আর”সার্কাস” শব্দ দুটো এল। প্রিয়নাথ থমকে গেলেন। ন্যাশনাল সার্কাস নিয়ে উন্মাদনার খবর তাঁর কানেও এসেছিল। ইচ্ছে ছিল দেশের বাড়ি গিয়ে এবারই স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে এসে এই সার্কাস দেখাবেন। সেখানে আবার কী হল? প্রহরী দুইজনের মধ্যে যে প্রধান বক্তা, তার নাম শিউপ্রসাদ সিং। বাড়ি বেহার প্রদেশে। প্রিয়নাথ আগেও খেয়াল করেছেন, সব কিছুই সে খুব নাটকীয়ভাবে বর্ণনা করে। তাকে জিজ্ঞাসা করায় প্রায় অভিনয় করে টুটাফুটা বাংলা আর হিন্দি মিশিয়ে যা জানাল, সে এক ভয়ানক খবর।
সকাল থেকে আকাশে মেঘ সত্ত্বেও আজ সার্কাসে এত ভিড় হয়েছিল যে শেষে জোর করে গেট বন্ধ করে দিতে হয়। শিউপ্রসাদের দেশোয়ালি এক ভাই কলকাতায় এসেছে। সেও গেছিল সার্কাস দেখতে। তার ভাগ্য ভালো-কাঠের গ্যালারিতে বসার জায়গা পেয়েছিল। শুরুতেই হাই ট্রাপিজের খেলা। ন্যাশনাল সার্কাসের মজা হল প্রথম থেকেই তাক লাগিয়ে একেবারে জমিয়ে দেয়। মাঝে দুই একটা মাঝারি মানের খেলা থাকলেও কেউ খেয়াল করে না। যে-কোনো বড়ো খেলার আগে বড়ো বড়ো ড্রাম ইত্যাদি এনে অর্কেস্ট্রা বাজে। ফলে একটা থিয়েটারি মেজাজের সঙ্গে সঙ্গে সময়ও ভরাট হয় কিছুটা। সার্কাসের বামন জোকার এই ফাঁকে সবাইকে খুব হাসায়। এরপর প্যারালাল বার আর রিং-এর খেলা, আগুনের মধ্যে দিয়ে কুকুরের লাফের খেলা, চোখ বেঁধে তির ছোড়ার খেলা। ঘোড়ার খেলা শেষ হতেই মঞ্চে আসে হুকুমচাঁদ। দৈত্যাকার হুকুমচাঁদকে দেখেই বাচ্চারা কেঁদে উঠল। হুকুমচাঁদ এসবে অভ্যস্ত। সেও চোখমুখের নানা বিকট অঙ্গভঙ্গি করে আরও ভয় দেখাতে লাগল। খানিক এইরকম করে শুরু হল খেলা। প্রথমে হাত দিয়ে লোহা বাঁকানো, তারপর চোয়াল দিয়ে, দাঁত দিয়ে লোহা বাঁকানোর পরে নিয়ে আসা হল সার্কাসের বিরাট হাতি মঙ্গলকে। মঙ্গল নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়, শুঁড় উঠিয়ে সেলাম করে। এদিকে হুকুমচাঁদ শুয়ে পড়ে মঞ্চের উপরে। তার বুকে পেতে দেওয়া হয় কাঠের তক্তা। মঙ্গলের ট্রেনার মঙ্গলকে নিয়ে আসে হুকুমচাঁদের দিকে। মঙ্গল হুকুমের উপরের কাঠের তক্তায় উঠে দাঁড়ায়। সেই অবস্থাতেই হুকুম হাত নাড়ে। খানিক বাদে মঙ্গল নেমে গেলে তড়াক করে উঠে দাঁড়ায় এ যুগের ভীমসেন হুকুম। গোটা সার্কাস করতালিতে ফেটে পড়ে। সমস্যা শুরু হয়েছিল এর পর থেকেই।
সার্কাসের শেষ খেলা বাঘের খেলা। খেলার আগে অর্কেস্ট্রা বেজেই চলেছে। শেষ আর হয় না। জোকার একই কায়দা দেখিয়ে দেখিয়ে ক্লান্ত। দর্শকরা বুঝতে পারছিল কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ফিসফাস শুরু হল। আজ নাকি বাঘের মুড নেই। বাঘের খেলা হবে না। ফিসফাস বাড়তে বাড়তে চিৎকার চেঁচামেচি হবার উপক্রম হতেই দেখা গেল বিরাট এক বাঘের খাঁচা ঠেলে মঞ্চে নিয়ে আসছে জনা চারেক। পিছনে মালিক পান্নালাল স্বয়ং। তাঁকে সবাই চেনে। খেলার একেবারে শুরুতে ইনিই সবাইকে অভিবাদন করেন। নিজের পরিচয় দেন মাস্টার পান্নালাল বলে। পান্নালালের হাতের ইশারায় থেমে গেল বাজনা। দর্শকদের সবাই চুপ। হঠাৎ করে মন্ত্রবলে সবাই যেন মরে গেছে। এরিনার মাঝখানে বাঘের খাঁচা। দুইজন বন্দুকধারী এসে খাঁচার দুপাশে দাঁড়াল। এবার যেন শূন্য থেকে উদয় হল হুকুমচাঁদ। দরজা খুলে দিতেই সোজা সে ঢুকে গেল বাঘের খাঁচায়। বাঘের নাম উমা। আজ যেন উমার মেজাজ ভালো নেই। হুকুম হাত বাড়িয়ে দিল। উমা সে হাত ধরল না। হুকুম আরও দুইবার চেষ্টা করে নিরাশ হয়ে একবার পান্নালালের দিকে তাকাল। পান্না হাত দিয়ে ইশারা করলেন, খেলা চালিয়ে যাও। হুকুম এবার ল্যাজ ধরে মোচড় দিয়ে, কান টেনে, গলার চামড়া ধরে ঝুলে প্রচণ্ড উত্যক্ত করতে লাগল উমাকে। একবার উমা গর্জেও উঠল। লোকে দমবন্ধ করে দেখছে। হাততালি দিতে ভুলে গেছে সকলে। শেষে হুকুম যা করল, সেটাকে দুঃসাহস বললেও কম বলা হয়। উমার মুখটা দুই হাতে টেনে হাঁ করিয়ে নিজের মাথাটা ঢুকিয়ে দিল বাঘের মুখের ভিতরে।
এইটুকু বলে শিউপ্রসাদ ঢোঁক গিলল। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল বারকয়েক। প্রিয়নাথ অধৈর্য হয়ে বললেন, “তারপর?”
শিউপ্রসাদের গলা একটু কেঁপে গেল যেন, “ফির উও বাঘ নে উস আদমিকো সবকে সামনে খা লিয়া।”
.
৪।
খবরটা শুনে অবধি প্রিয়নাথের ঠিক বিশ্বাস হয়নি। এমনও হয় নাকি! অবশ্য বনের জন্তু। তাদের মর্জি বোঝা দায়। কিন্তু পোষমানা বাঘ এমনটা করলই বা কেন? জন্তুরা আর যাই হোক, মানুষের মতো বেইমান না তিনি তা জানেন। নিজের প্রাণ গেলেও তারা প্রভুর ক্ষতি হতে দেয় না, তাকে চিবিয়ে খাওয়া তো দূরস্থান। প্রিয়নাথ নেহাত ওই এলাকার থানার চার্জে নেই, আর বাইরে যা বৃষ্টি, তাতে বেরোনো অসম্ভব। নইলে তাঁর খুব আগ্রহ হচ্ছে একবার অকুস্থলে গিয়ে দেখার। ঘটনাটি বীভৎস, তবুও এমন কিছু আছে যা চুম্বকের মতো তাঁকে টানছে। প্রায় সারারাত অঝোরে বৃষ্টি হল। প্রিয়নাথের চোখ লেগে এসেছিল। ভোরের দিকে আচমকা টেলিফোনের ঘণ্টা বেজে উঠল টুং টুং করে। এই ডাক সাহেবের ছাড়া কারও হওয়া মুশকিল। প্রিয়নাথ তাড়াতাড়ি দেওয়ালে ঝোলানো যন্ত্রের কাছে গেলেন। কানে রিসিভার নিতেই বুঝে গেলেন তাঁর ধারণা সত্যি। টমসন সাহেব বিলাতে ফিরে যাবার পর তাঁর জায়গায় এখন নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন রবার্ট বার্ডেন। নাম কিছু প্রাচীন ধরনের হলেও মানুষটি এখনও যৌবনেই আছেন। হাসিখুশি। প্রিয়নাথকে পছন্দ করেন।
প্রিয়নাথ যেতেই সাহেব একটা কাগজের টুকরো বাড়িয়ে দিলেন তাঁর দিকে। কোনও খবরের কাগজের কাটিং।”এটা পড়ে দ্যাখো।” প্রিয়নাথ অবাক হয়ে পড়ে দেখলেন এতে গতকাল রাতের সেই সার্কাসের দুর্ঘটনার কথা লেখা। কিন্তু সকালের কাগজ তো এখনও বেরোয়নি!
প্রিয়নাথের মুখ দেখেই সাহেব বুঝি তাঁর মনের কথা বুঝতে পারলেন। মৃদু হেসে বললেন, “এটা স্টেটসম্যানের গ্যালি প্রিন্ট থেকে আনিয়েছি। এটা রাখো। কাজে লাগবে। খানিক বাদেই সব পত্রিকায় এই খবর ছাপা হবে। কিন্তু আমাদের হাতে সে সময় নেই। তাই জরুরি ভিত্তিতে এটা আনিয়েছি।”
প্রিয়নাথ জানালেন, গত রাতেই শিউপ্রসাদের মুখে তিনি এই খবর কিছুটা শুনেছেন। পত্রিকার খবরের সঙ্গে তাঁর শোনা কাহিনির খুব অমিল নেই। শুধু একটা শব্দে সামান্য খটকা লাগল প্রিয়নাথের। মাথা চুলকে তিনি বললেন, “কিন্তু স্যার, এটা তো প্লেন অ্যান্ড সিম্পল অ্যাক্সিডেন্ট। তাও অন্য থানার আন্ডারে…
“জানি। কিন্তু এই কেসে আমি তোমাকে ডাকিনি। ডেকেছি অন্য কেসে।” বলে টেবিলে পিতলের ঘন্টি বাজাতেই চাপরাশি এসে হাজির। সাহেব হেঁড়ে গলায় তাঁকে”উস আদমি কো লে আও” বলতেই সে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গিয়ে একটা লোককে ধরে নিয়ে এল।
প্রিয়নাথ নিজের চাকরিজীবনে বহু মানুষ দেখেছেন। কিন্তু এমন লোক দেখেননি। আচমকা দেখলে কোনও বানরজাতীয় প্রাণী বলে ভ্রম হয়। গোটা দেহ কুঁকড়ে যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে, পিঠে বিরাট একটা কুঁজ, মিশমিশে কালো দেহ, গায়ের লোম এতটাই বড়ো আর ঘন যে মানুষ বলে মনে হয় না। কিন্তু সেই লোকটি ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল। চাপরাশি তাঁকে ধরে এনে মাটিতে বসিয়ে দেবার পরেও মুখ থেকে একটা কথা বেরোচ্ছিল না তার। কান্নার দমকের মধ্যে মধ্যে শুধু”মার ডালা, মালিককো মার ডালা” শব্দ দুটোই কানে এল প্রিয়নাথের। কে মারল? কাকে মারল? এর সঙ্গে গতকাল বাঘের খেলার সম্পর্কই বা কী? কিচ্ছু মাথায় আসছিল না। লোকটি শুরুতে কিছুই বলতে পারছিল না। তারপর কোনওক্রমে যা বলল, আপাতদৃষ্টিতে তা একেবারেই অসম্ভব।
সে জানাল, তার নাম বলবন্ত। রাজপুতনা তার দেশ। নামের সঙ্গে চেহারার কোনও মিল নেই। বরং ছোটো থেকেই এমন চেহারার জন্য লোকের অবজ্ঞা আর ঠাট্টার পাত্র। কাজকর্ম কিছু জানত না। রাস্তার ধারে বসে মাদারির খেলা দেখাত আর ভিক্ষা করত। ইম্পেরিয়াল সার্কাস বছর তিনেক আগে রাজস্থানে খেলা দেখাতে গেলে ম্যানেজার পান্নালালের চোখে পড়ে সে। পান্নালালই সাহেব মালিককে বলে তাকে সার্কাসে নিয়ে আসেন। তিন কুলে তার কেউ ছিল না। একমাত্র ম্যানেজার তাকে যা একটু ভালোবাসতেন। সেই পান্নালালকেও গত রাতে দানোতে মেরে ফেলেছে।
শেষ লাইনটা শুনে প্রিয়নাথ চমকে উঠল। কয়েকঘণ্টার মধ্যে দু-দুটো মৃত্যু! তাও একই সার্কাসে!
বলবন্ত শুরুতে কথা বলতে চাইছিল না, এখন তাকে বলায় পেয়েছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে বলেই যাচ্ছিল। গতকাল খেলার সময় শুরু থেকেই তার মনে কু ডেকেছিল। সে বলেছিল আজ খেলা বন্ধ করে দিতে। কেউ দেয়নি। আর তারই ফল দেখুন। খেলার মাঝে হুকুমচাঁদকে বাঘে খেল। দর্শকরা সবাই ভয়ে পালাল। পুলিশ এল। কিন্তু তখন ভয়ানক বৃষ্টি। রাতও গভীর হয়েছে। হুকুমের মতো বিরাট দেহ মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়ার গাড়ি মিলল না। এদিকে সারারাত এই লাশ কোথায় রাখা যাবে? উপায় জানালেন পান্নালাল। তাঁর নিজের একটা বিরাট বড়ো ক্যারাভ্যান ছিল। প্রথমে পুলিশ পাহারার কথা হল। পান্নালাল পুলিশকে কথা দিলেন ক্যারাভ্যানের ভিতরে সারারাত জেগে তিনি লাশ পাহারা দেবেন। একে তো এই মৃত্যুতে রহস্যের কিছু নেই, তায় আবার এমন বৃষ্টি। হাবিলদার কিন্তু কিন্তু করেও রাজি হয়ে গেল। শুধু শর্ত একটাই। পুলিশ বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে সিল করে দিয়ে যাবে। ক্যারাভ্যানে লাশ ঢুকিয়ে, তালা মেরে পুলিশ চলে গেল। দরজার ভিতর থেকে ছিটকিনি মেরে তালা এঁটে পান্নালাল হেঁকে জানিয়ে দিলেন পুলিশ এবার নিশ্চিন্তে যেতে পারে।
এইটুকু বলে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল বলবস্ত। প্রিয়নাথ আর সাহেব দুইজনেই অপেক্ষায়। খানিক সুস্থির হয়ে আবার বলা শুরু করল সে। রোজ খুব ভোরে পান্নালালের বড়ো এক কাপ চা খাবার অভ্যেস। এই অভ্যেস আগে ছিল না। ইদানীং ইংরেজ বাহাদুর জায়গায় জায়গায় পোস্টার দিয়ে চায়ের বিজ্ঞাপন করায় এই নেশা তাঁকে ধরেছিল। অত ভোরে সার্কাসের কেউ ওঠে না। রাতে শো থাকলে তো না-ই। একমাত্র বলবন্ত উঠে যায়। সেই দুই পাত্র চা বানায়। নিজের আর পান্নালালের জনা। আজও সেইরকমই বানিয়ে নিয়ে পান্নালালের ক্যারাভ্যানে গেছিল সে। দরজার কাচ লাগানো ঘুলঘুলি ভিতর থেকে খোলা যায়। মালিক চাইলে চায়ের পেয়ালা ঢুকিয়ে দেবে। কিন্তু ক্যারাভ্যানের দরজার ঘুলঘুলি দিয়ে উকি মারতেই ভয়ে তার হাত থেকে চায়ের পেয়ালা পড়ে গেল। ঘুলঘুলির কাচ শক্ত করে আটকানো। ভিতরে টিমটিমে একটা কেরোসিনের আলো জ্বলছিল তখনও। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। তালার সিল অবিকল রয়েছে। কিন্তু সেই অভিশপ্ত রাতে কখন যেন হুকুমচাঁদের লাশ প্রাণ ফিরে পেয়ে পান্নালালের মাথা ফাটিয়ে চুরমার করে দিয়েছে। বলবন্তের চিৎকারেই সার্কাসের সবাই জড়ো হয়ে গেল। এদেরই একজন বলল সোজা লালবাজারে জানাতে। তাই সে সাত তাড়াতাড়ি এসেছে খবর দিতে।
সাহেব বোধহয় আগে এ খবর জানতেন, না হলে প্রিয়নাথকে ডেকে আনতেন না। এবার প্রিয়নাথের দিকে চেয়ে সাহেব বললেন, “তোমার হাতে অন্য কোনও কেস আছে?”
“আজ্ঞে, সেসব তো কিছু…”
কথায় বাধা দিয়ে সাহেব বললেন, “তোমার হাতে কী কাজ আছে আমি তা জানি। তাতে দুই-চারদিন দেরি হলেও সমস্যা নেই। আগে এই কেসটা দ্যাখো, আর যত তাড়াতাড়ি পারো এই কেস সমাধানের চেষ্টা করো।”
সেদিন বাড়িতে ফিরে প্রিয়নাথ তাঁর ডায়রিতে লিখেছিলেন, “সাহেবের কথায় মনে বড়ো দুঃখ হইল। ভাবিলাম, লোকে যে বলে চাকরে আর কুকুরে কোনও প্রভেদ নাই, তাহা সম্পূর্ণ সত্য। যখন চাকরের কার্য্য স্বীকার করিয়াছি, তখন আর দুঃখ করিলে চলিবে কেন? এই কেসের প্রতি আমার আগ্রহ কম নাই। কিন্তু মনিবের হুকুম হিসাবে তামিল করিলে নিজেকে বড় ছোট মনে হয়। সাহেবের নিকট বিদায় লইয়া, এই নূতন কার্য্যের নিমিত্ত প্রস্থান করিলাম !”
.
৫।
ক্লাইভ স্ট্রিটে তারিণীচরণ রায়ের ছোট্ট অপিস। নাম রে প্রাইভেট আই অ্যান্ড কোং। তারিণী কলকাতার প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আগে ড্রিসকল সাহেবের চ্যালা ছিল। তিনি দেশে ফিরে যাবার আগে এই আপিস, আসবাব সব তারিণীকে দিয়ে গেছেন। পসার যে খুব বেশি তা বলা যায় না, তবে বছর ছয়েক আগে এক ভয়ানক কেসে পুলিশ ইনস্পেকটর প্রিয়নাথ মুখার্জির সঙ্গে তারিণীর একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তারিণী না থাকলে মহা অনর্থ ঘটে যেত। সেই থেকে পুলিশি নানা জটিল কেসেও তারিণীকে ডাকেন প্রিয়নাথ। এ নাকি তেমন নতুন কিছু না। সাইগারসন নামে এক সাহেব গোয়েন্দার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তারিণীর। তিনিও বলেছিলেন বিলাতের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের পুলিশ গোয়েন্দারা যখন হালে পানি পায় না, তখন তাঁরই শরণাপন্ন হয়। একটা নতুন শব্দ শিখিয়ে গেছেন সাহেব। কনসাল্টিং ডিটেকটিভ। তারিণীও আজকাল তেমন লালবাজারের কনসাল্টিং ডিটেকটিভ হয়েছে। আয় কিছু বেড়েছে। তবে যথেষ্ট না। মাসখানেক হল তারিণীর একটি পুত্রসন্তান জন্ম নিয়েছে। ফলে স্ত্রী মাখন এখন দেশের বাড়ি। ইচ্ছে থাকলেও গতকাল নানা কাজে যেতে পারেনি। মন বড়ো উচাটন। কাল রাতে একবার বাইরের লোকজন দেখতে বেরিয়েছিল। বৃষ্টি নামার উপক্রম দেখে না বেরিয়ে ফিরে এসেছে। রাতে সে আপিসেই ঘুমায়। সকালে বেশ দেরিতে উঠে জলখাবারের আয়োজন করতে না করতে পুলিশের ছাপ মারা দুই ঘোড়ার গাড়িতে এক কনস্টেবল এসে হাজির। প্রিয়নাথ দারোগা ডেকে পাঠিয়েছেন। তবে লালবাজারে না। গড়ের মাঠে। জলদি যেতে হবে। খাবার সময় নেই। ঘরে কিছু শুকনো চিঁড়ে পড়ে ছিল। তাতেই জল ঢেলে কোনওক্রমে খেয়ে তারিণী রওনা দিল। এই কনস্টেবল নিজে খুব বেশি কিছু জানে না। শুধু বলল গড়ের মাঠের সার্কাসে নাকি কী সব গণ্ডগোল হয়েছে। বাঘে একজনকে খেয়েছে। অন্যজনকে কে যেন রাতে মেরে রেখে গেছে। বুকপকেট থেকে একটা ছোটো খবরের কাগজের টুকরো বার করে তারিণীর হাতে দিল কনস্টেবল। সামান্য মোটা কাগজে ছাপা গ্যালি প্রুফ। তাতে ছোট্ট খবর।
Catastrophe in Calcutta Circus
Oct 24, 1898 -We regret much to announce a violent death of a distinguished circus persona named Hookumchund aka Bheemsen of the Great National Circus yesterday night. This amateur tiger tamer was suddenly attacked by a tigress named Umma during one singularly dangerous act in which the ill-fated man put his head into the mouth of the beast and was eaten alive. We condemn such heinous
acts by the native circus owners. We prefer to inform our readers that this particular circus was previously named Imperial Circus and was owned by the deaceased Thomas Brown for about ten years and no such mishap happened in his time. We are grieved to watch such ill fate of a famous endeavor once achieved by a European.
মনে মনে একটু হাসল তারিণী। মানুষ মারা যাচ্ছে, সেদিকে এদের নজর নেই। এরা আছে নিজেদের কূটকচালিতে। এখনও দেশীয় উদ্যোগ দেখলেই এদের গা জ্বলে। প্রিয়নাথ বসুর বেঙ্গল সার্কাসের পিছনেও এরা এভাবেই লেগেছিল। কিন্তু এখানে তো এই দুর্ঘটনার পর আক্রমণ আরও শানাবে। ভাবতে ভাবতেই গাড়ি থেকেই গড়ের মাঠের তাঁবু দেখতে পেল তারিণী। দূর থেকেই বিশালাকার ভীমের মতো হুকুমচাঁদের হাতে আঁকা ছবি দেখা যাচ্ছে। হুকুম দুই হাত দিয়ে লোহার শিক বাঁকাচ্ছে। অন্য একটা ছবিতে হুকুমের পেটের উপরে হাতি দাঁড়িয়ে আছে শুঁড় তুলে। বাঘের বেশ কয়েকটা ছবি আছে বটে, তবে সঙ্গে মাথায় পাগড়ি, ছোটমতো কেউ একটা, হুকুম না। সার্কাসের বিরাট বড়ো লোহার গেটের সামনে এসে গাড়ি থামল। প্রিয়নাথ গেটের ঠিক বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন। তারিণীকে দেখে প্রথম যে প্রশ্নটা করলেন, তার জন্য তারিণী প্রস্তুত ছিল না।
“তুমি প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করো?”
অবাক তারিণী মাথা নাড়ল দুইদিকে।
মৃদু হেসে প্রিয়নাথ বললেন, “আমিও করতাম না। কিন্তু এখানে যা দেখছি, বুদ্ধিতে তার ব্যাখ্যা মেলে না। কনস্টেবল তোমাকে খবরটা দেখিয়েছে?”
“হ্যাঁ”, বলে ফতুয়ার থেকে কাগজ বার করল তারিণী।
“ওটা তোমার কাছেই রাখো। খবর দেখে কোনও ব্যাপার কি আশ্চর্য ঠেকল?”
“শুধু খবর না, অন্য একটা জিনিস দেখেও অবাক হলাম। সে কথা পরে, আপনি আগে বলুন এই দুর্ঘটনার জন্য আমায় কেন ডাকলেন?
“পরেরটা তুমি জানো না। জানার কথাও না। গতকাল রাত্রে কিংবা আজ খুব ভোরে সার্কাসের মালিক পান্নালাল খুন হয়েছে। ভারী লোহার ডান্ডা জাতীয় কিছু দিয়ে মাথা চুরমার করে দিয়েছে।”
“সন্দেহভাজন কেউ আছে?”
“এখানেই আমি একেবারে অসহায় হয়ে তোমায় ডেকেছি।”
“কেন? সন্দেহভাজন কেউ নেই?”
“না থাকলে সমস্যা হত না। আছে। একজনই। সে ছাড়া আর কেউ এই খুন করতে পারে না।”
“সে কে?”
“হুকুমচাঁদ।”
এবারে সত্যিই চমকে উঠল তারিণী। দারোগা সাহেবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? প্রিয়নাথ যেন সেটা বুঝতে পেরেই বললেন, “অকুস্থলে তোমায় নিয়ে যাব, কিন্তু তার আগে গোটা কেসটা শুনে নাও। মানে আমি এতক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে যা জানতে পেরেছি। গতকাল সার্কাসে বেজায় ভিড় হয়েছিল। সব একেবারে ঠিকঠাক চলছিল। সমস্যা হল বাঘের খেলা দেখানোর আগে। নাম প্রচন্ত অর হয়ে উঠল। হুকুমচাঁদ বারবার অনুরোধ করে পান্নালাল যেন আজ নামের খেলা না দেখায়। পান্নালাল মানেনি। কোনও কারণে হুকুমচাঁদ তাকে যমের মতো ভয় পেত। হুকুমচাঁদ আর পান্নালালের সম্পর্ক ভালো ছিল না। প্রায়ই হুকুম পান্নালালের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দিত। কিন্তু পান্না হুকুমের এমন কিছু জানত যা প্রকাশ পেলে হুকুম বিপদে পড়বে। গতকালও হুকুম রাজি না হলে পান্না চিৎকার করে বলেছিল, ‘আমায় ডোবাতে চাইছিস? আমি ডুবলে একা ডুবব না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ডুবব।’ অনেকেই শুনেছে এটা। আমার ধারণা সবার কোনও-না-কোনও গোপন পাপের কথা পান্না জানত। মুখে নুন পড়া জোঁকের মতো হুকুম খেলা দেখাতে রাজি হয়। মঞ্চে বাঘ শুরু থেকেই বেয়াড়াপনা করছিল। শেষে হুকুমচাঁদ বাঘের মুখে মাথা ঢোকাতেই বাঘ মাথার খানিকটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। ভয়ানক মৃত্যু।”
প্রিয়নাথ যেন সেই আতঙ্কের অভিঘাত কাটাতেই খানিক চুপ করে মাটির দিকে চেয়ে রইলেন। তারিণীও কিছু বলল না। অপেক্ষা করতে থাকল প্রিয়নাথ কখন আবার শুরু করেন। একটা জোরে শ্বাস টেনে প্রিয়নাথ আবার শুরু করলেন-
“আসল খেলা শুরু হল তার ঠিক পরেই। গোটা এরিনার আশপাশ জুড়ে দর্শকদের চেঁচামেচি। বাঘকে ঘুমের ওষুধের গুলি দিয়ে বেহুঁশ করে পান্নালাল যখন ভিতরে ঢুকল তখন আর বিশেষ কিছু করার নেই। পুলিশে খবর দেওয়া হল। ততক্ষণে প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমেছে আকাশ ভেঙে। লোকাল পুলিশ বলেছিল তখনই বড়ি সরাবে। কিন্তু অত বড়ো লাশ সরানোর গাড়ি নেই। পুলিশ একজন কনস্টেবলকে রেখে যেতে চাইল। পান্নালাল কিছুতেই তাতে রাজি না। সে বলল হয় এখুনি নিয়ে যান, নয়তো আমাকে সারারাত বড়ি পাহারা দিতে দিন। শেষে ব্যাপারটা এই জায়গায় গেল যে পুলিশ ভাবল ডেডবডি রেখে গেলেই বা কী। প্রথমে ঠিক হল বডি পান্নালালের ক্যারাভ্যানে রাখা হবে। বাইরে তালা দিয়ে। পান্না বলে অপঘাতে মরা বড়ি একা ফেলে যেতে নেই। সে নাকি এই বডি সারারাত জেগে পাহারা দেবে। বাইরে থেকে তালা মেরে সিল করে পুলিশ চলে যায়। অনেকেই মানা করেছিল। পান্নালাল বলেছিল ওর কাছে নাকি দানো বশ করার মন্ত্র আছে। কেউ ওকে কিছু করতে পারবে না। বড়ো এক বোতল মদ আর একটা গেলাস নিয়ে ক্যারাভ্যানের ভিতরে ঢোকে। সবাই নিজের নিজের তাঁবুতে ফিরে গেল। তবে অনেক রাত অবধি পান্নালালের হেঁড়ে গলায় গান অনেকের কানেই এসেছিল। তারপর সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। খুব ভোরে সার্কাসের এক চাকর কুঁজো বলবন্ত চা নিয়ে পান্নালালের ক্যারাভ্যানের কাছে যায়। অতি কষ্টে দরজার ঘুলঘুলি দিয়ে তাকিয়ে দেখে বন্ধ ক্যারাভ্যানের মধ্যে কেউ পান্নালালের মাথা ফাটিয়ে মেরে রেখেছে। তবে ওকে বাহবা দিতে হবে। এমন দৃশ্য দেখেও সে বুদ্ধি হারায়নি। দলের সবাই তার চিৎকারে জড়ো হলে সবাইকে কী হয়েছে জানিয়ে সে বলে কেউ যেন ক্যারাভ্যানের ধারেকাছে না যায়। সোজা লালবাজারে খবর দিতে চলে আসে, আর তার বুদ্ধিতেই সার্কাসের বাকিরা ক্যারাভ্যানের চারদিকে বড়ো করে দড়ির কর্ডন দিয়ে দেয়। ফলে আমরা আসার আগে ক্যারাভ্যানের ধারেকাছে কেউ আসেনি।”
“আপনি এসে কী দেখলেন?”
“প্রথমেই পায়ের ছাপের কথা বলি। গতকাল সারারাত বৃষ্টি পড়েছে। ক্যারাভ্যান মাটির উপরে রাখা। তাই আগের পায়ের ছাপ সবই প্রায় ধুয়ে গেছে। নতুন ছাপের মধ্যে শুধু একজোড়া ছোটো পায়ের ছাপ। সে ছাপ বলবন্তের। সে নিজেও স্বীকার করেছে। পায়ের ছাপ বলবন্তের তাঁবু থেকে সোজা ক্যারাভ্যানের দিকে গেছে। ক্যারাভ্যানের কাঠের সিঁড়িতে তার কাদাপায়ের দাগ আছে। ফিরে আসার সময় ছাপ কিছুটা অস্পষ্ট।”
“সেটা স্বাভাবিক। বলবন্ত উত্তেজিতভাবে হেঁটে ফিরছিল। কিন্তু বলবন্তের পরে ওই রাস্তা দিয়ে কেউ যায়নি? ওর পায়ের ছাপ এত স্পষ্ট পাওয়া গেল কীভাবে?”
“সবার তাঁবু একদিকে, বলবত্তের একেবারে অন্যদিকে, একটেরে। এর কারণ জানি না। ফলে ওইদিকে অন্যরা বিশেষ যায় না।”
“ক্যারাভ্যানের দরজা?”
“বাইরের সিল অক্ষত। দরজার ঘুলঘুলি ভিতর থেকে শক্ত করে আঁটা। ভিতর থেকে ছিটকানি আর তালা দিয়ে বন্ধ ছিল। রীতিমতো লোহার রড আর শাবল দিয়ে ভাঙতে হয়েছে। তারপর আমরা অবশ্য আর ভিতরে ঢুকিনি। রাইটার্স বিল্ডিং-এর হাতের ছাপ বিশেষজ্ঞদের খবর দিয়েছি। ওঁরা এলে তবেই ঢুকব।”
“ক্যারাভ্যানে ঢোকার অন্য কোনও উপায়?”
“এটাই তোমাকে বলতে যাচ্ছিলাম। গোটা ক্যারাভ্যান একটা সিন্দুকের মতো। উপরে মোটা কাঠের ছাউনি, তাতে লোহার পাত, কাপড় মোড়া। পিঁপড়ে ঢোকার জায়গা নেই, মানুষ দূরে থাক। দরজা একটাই, যেটা ভিতর থেকে বন্ধ। তাতে একটা কাচ আঁটা ঘুলঘুলি। সেটা অবিকৃত। জানলা বলতে পাশের দিকে আরও একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি আছে, হাওয়া চলাচলের জন্য। সেটা খোলা। কিন্তু তা দিয়ে একটা এক বছরের বাচ্চাও গলবে না। মেঝেও পুরু কাঠের তক্তা আটা। সে তক্তা অক্ষত আছে।”
“তার মানে…”
“মানে একটাই তারিণীচরণ, চোখের সামনে একটা লকড রুম মিস্ট্রি আর ইম্পসিবল ক্রাইন একইসঙ্গে দেখতে পাচ্ছি। তুমি পাচ্ছ না?”
.
৬।
হড়হড় করে বমি করে ফেলল তারিণীচরণ। ক্যারাভ্যানের ভিতরে কী দেখবে তা আগেই আন্দাজ করেছিল, কিন্তু প্রকৃত দৃশ্য এতই বীভৎস, এতই বিকৃত যে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ক্যারাভ্যানের দরজার সামনেই মাথা ঘুরিয়ে উঠেছিল তার। প্রিয়নাথের দুই কনস্টেবল তাকে ধরে ক্যারাভ্যান থেকে একটু দূরে এনে বসাতেই এই বমি। সকালে প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। সবুজাভ পিত্ত মিশে রয়েছে বমিতে। মুখে অদ্ভুত তেতো ভাব। মাথা ঘোরাচ্ছে তখনও। এদিকে রাইটার্সের হাতের ছাপ বিশেষজ্ঞরা এসেছেন। প্রিয়নাথ তাঁদের নিয়ে ব্যস্ত। তারিণী তাকিয়ে ছিল কর্ডনের চারপাশে ভিড় করা মানুষগুলোর দিকে। বাইরের কাউকেই ভিতরে আসতে দেওয়া হয়নি, ঠিক যেমন ভিতরের কাউকে বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ধরে নেওয়া যায়, পুলিশ বাদে বাকি সবাই সার্কাসের লোক। তিন-চারজন মহিলাকেও দেখা যাচ্ছে। গতরাতের মুখের চড়া রং তখনও ওঠেনি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়েসি যে, সে কেঁদেই যাচ্ছিল। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক এক মহিলা সান্ত্বনা দিচ্ছিল তাকে। নানা কথার মধ্যে”কাঁদিসনে পদ্ম। পান্না তার পাপের শাস্তি পেয়েচে”, কথাটা কানে এল তার। পদ্মর কান্না দ্বিগুণ হল, “কিন্তু আমাদের কী হবে গো দিদি?” বলে বিলাপ করতে লাগল সে। তার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে সেই মহিলা”ভগমান ঠিক আমাদের দেকবেন। জিভ দিয়েচেন যিনি, আহার দেবেন তিনি” বলাতে কান্নার দমক কমল কিছুটা। একটু দূরে একটা খুঁটিতে অনেকটা দেশি কুকুরের মতো দেখতে একটা কুকুর বাঁধা। সে বেচারা ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। তারিণী শুরু থেকেই এর গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। এবার দেখতে পেল ভিড়ের মধ্যে থেকে ছিপছিপে এক তরুণ এগিয়ে গিয়ে এক লাল পাগড়ি হাবিলদারকে কিছু বলল। হাবিলদার মাথা নাড়তেই সে সোজা চলে গেল কুকুরের দিকে। তাকে দেখেই কুকুর দুইপায়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল তার বুকে পরম যত্নে মাথায় হাত বোলাতেই কুকুরটিও সামনের দুই পায়ের আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল তাকে। তবে তারিণী অবাক হয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে এক দীর্ঘদেহী যুবককে দেখে। চুল ভারতীয়দের মতো কালো, সোজা নেমে এসেছে কাঁধ বেয়ে। কিন্তু গায়ের রং, টিকালো নাক, আর কটা চোখ দেখে যে কেউ ইউরোপিয়ান ভাববে। চেহারায় সম্ভ্রান্ত ঘরের ছাপ। তার ঠিক পাশেই এক বিগতযৌবনা প্রৌঢ়া, কিন্তু তাঁর সাজপোশাকের উগ্রতা দেখে বোঝা যায় যৌবনকে ধরে রাখতে তিনি ব্যঘ্র। তিনি যুবকটির প্রায় কানে কানে কিছু বলছিলেন। সেও মাথা নামিয়ে শুনছিল আর ধীরে ধীরে মাথা নাড়াচ্ছিল। এর মধ্যেই হেলেদুলে চোখ মুছতে মুছতে সার্কাসের সেই জোকার এসে হাজির। রাইটার্সের সাহেবদের একজন এসে বলবত্তকে নিয়ে গেল। তারিণী দেখল প্রিয়নাথ বলবস্তুকে কী যেন বলছেন, আর বলবন্ত প্রাণপণে পাশাপাশি মাথা ঝাঁকাচ্ছে। শেষে সে রাজি হওয়ায় প্রিয়নাথ তাকে সঙ্গে নিয়ে সোজা ঢুকে গেল ক্যারাভ্যানের মধ্যে। সময় আর কাটে না। প্রায় আধঘণ্টা বাদে সে যখন বেরিয়ে এল, তখন অনেকটা সুস্থির। প্রিয়নাথ বাইরে বেরিয়েই দুই হাবিলদারকে নির্দেশ দিল। হাবিলদার এবার চিৎকার করে সার্কাসের সবাইকে তাঁবুর একপাশে লাইন দিয়ে দাঁড় করাল। সবাই উপস্থিত। এক সেই জোকার ছাড়া। তার খোঁজ হতেই দেখা গেল যে সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে প্রায় ছুটে আসছে। দুই লম্বাপানা চিকন সাহেব টেবিল পেতে বসলেন। তারিণী বুঝল এবার সবার হাতের ছাপ নেওয়া হবে। সবার হাতে ভুসোকালি মাখিয়ে কাগজে হাতের আর দশ আঙুলের ছাপ নেওয়া হল। এতে গেল প্রায় ঘণ্টাখানেক। তারিণী মনযোগ দিয়ে গোটাটাই খেয়াল করছিল। এই হাতের ছাপ থেকে অপরাধী ধরার কথা সে সাইগারসন সাহেবের মুখে শুনেছিল। এই প্রথম এত কাছ থেকে গোটা ব্যাপারটা দেখার সুযোগ হল। হাতের ছাপ ইত্যাদি নিয়ে সাহেবরা প্রিয়নাথের সঙ্গে দু-চার কথা বলে বিদায় নিলেন। প্রিয়নাথের ফুরসত হল তারিণীর কাছে আসার। তারিণী কিছু বলার আগেই তার জিজ্ঞাসু মুখ দেখে প্রিয়নাথ বললেন, “খুব বেশি কিছু এগোনো যায়নি। ক্যারাভ্যানের ভিতরের হাতের ছাপ নেওয়া হয়েছে। আর বাকি সবার। মার্ডার ওয়েপনটা যে কী, তা নিয়ে একটা প্রশ্ন ছিল। সেটার বোধহয় একটা সন্ধান পাওয়া গেছে।”
“কী সেটা?”
“পান্নালাল সবসময় একটা ছোটো লাঠি হাতে নিয়ে ঘুরত। কখনও কাছছাড়া করত না। বেতের সাধারণ লাঠি। কিন্তু মাথাটা ভারী সিসে পোরা লোহা বাঁধানো। বলবস্তু ওটার খবর দিল। গোটা ক্যারাভ্যানে ওটা নেই। মিসিং।
“কিন্তু …”
“হ্যাঁ, তুমি যা ভাবছ, সেটা আমার মাথাতেও এসেছে। এই লাঠি দিয়ে খুলি ফাটাতে হলে খুনিকে প্রথমে ক্যারাভ্যানে ঢুকতে হবে, লাঠি দিয়ে মাথা ফাটাতে হবে, আবার লাঠি নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সেটা কেমন করে? একমাত্র বায়ুভূত বা প্রেতাত্মা ছাড়া এই কাজ অসম্ভব। আর একটা কথা, এটা আরও আশ্চর্যের। পান্নালাল বসেছিল ক্যারাভ্যানের দেওয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে। তার সামনে ভারী টেবিল। টেবিলে মদের বোতল, গেলাস, কেরোসিন তেলের টেবিল ল্যাম্প। কিছুটি নড়েনি।’
“মানে খুনের সময় পান্নালাল বাধা দেবার চেষ্টা করেনি?”
“না। এর দুরকম মানে হতে পারে। হয় নেশা করে তার বাধাদানের ক্ষমতা চলে গেছিল, অথবা মৃত্যু নেমে এসেছিল আকস্মিকভাবে। আর ঠিক এখানেই দ্বিতীয় আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটছে।”
“সেটা কী?”
“তোমাকে আগেই বলেছিলাম পান্নালাল বসেছিল দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। এদিকে খুন করা হয়েছে মাথার পিছনে বাড়ি মেরে।”
“এটা কী করে সম্ভব?”
“তা জানি না। কিন্তু বডির প্রাথমিক পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা সেটাই বলে গেলেন। আমার চোখেও তেমনটাই লাগছে। দেওয়াল ফুঁড়ে আততায়ী এল, খুন করল, মার্ডার ওয়েপন নিয়ে চলে গেল।”
“ক্যারাভ্যানের চাবি পাওয়া গেছে?”
“হ্যাঁ, পান্নালালের কোটের বুকপকেটে।”
“ক্যারাভ্যানের চারদিকে পায়ের ছাপ ভালো করে পরীক্ষা করা হয়েছে?”
“সব করেছেন ওঁরা”, হতাশ হয়ে বললেন প্রিয়নাথ, “কোনও মানুষের পায়ের ছাপ নেই সেখানে। বলবন্ত ছাড়া। সেগুলোর কথা তো আগেই বলেছি। আচ্ছা ভালো কথা, তুমি আসার পর তোমায় একটা প্রশ্ন করেছিলাম। মনে আছে?”
“হ্যাঁ, খটকার কথা। পত্রিকায় দেখেছি লেখা আছে হুকুমচাঁদ ছিল অ্যামেচার টাইগার টেমার। শুধু তাই না, সার্কাসের বাইরেও বাঘের সঙ্গে অন্য লোকের ছবি, হুকুমের না।”
“একেবারে ঠিক। আমারও এই ব্যাপারে খটকা লাগে। বলবন্তকে জিজ্ঞেস করায় বলল বাঘের আসল ট্রেনার নাকি রামদীন বলে কেউ একজন। গতমাসে ঝাঁসিতে খেলা দেখানোর সময় রামদীনের সঙ্গে পান্নালালের কথা কাটাকাটি হয়। রামদীন সার্কাস ছেড়ে চলে যায়। তখন থেকেই হুকুম বাঘের খেলা দেখাচ্ছে।”
তারিণীরা কথা বলছে, এই সময় একটু দূরে সেই বামন জোকারটিকে দেখা গেল। অপেক্ষারত। যেন কিছু বলবে। প্রিয়নাথ একটু হেঁকে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার? কিছু বলতে চাও?”
সে প্রথমে মাথা নেড়ে চলে যাচ্ছিল। কিছুদূর গিয়েই আবার ফিরে এল। প্রিয়নাথদের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে যেন কোনও গোপন কথা বলছে, এমনভাবে ভাঙা হিন্দি বাংলা মিশিয়ে বলল, “বলবন্ত নে কহা, আপলোগ রামদীনকে বারে মে পুছছেন?”
“হ্যাঁ। তুমি কিছু জানো ও এখন কোথায় আছে?”
“নেহি”, মাথা নাড়ল সেই জোকার, “পর কাল ম্যায়নে উসে দেখা থা।”
