তৃতীয় পৰ্ব
১।
বলবন্তের তাঁবুর একপাশে তাকে হাতে দড়ি বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়ের ভাব। তার তাঁবুর ভিতরে তোশকের তলায় পান্নালালের ছড়ি পাওয়া গেছে। সাদা কাপড়ে মোড়া সেই ছড়ি এক হাবিলদার নিয়ে এল তারিণীদের সামনে।
“হাত দিয়ে ধরার প্রয়োজন নেই। রাইটার্সের সাহেবরা এটাতেও হাতের ছাপ খুঁজবেন”, বললেন প্রিয়নাথ।
তারিণী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেই লাঠির দিকে। হালকা বেতের ছোটো লাঠি। মাথায় লোহা বাঁধানো। কাপড়সুদ্ধ হাতে নিয়ে তারিণী দেখল সব মিলিয়ে খুব বেশি ভারী না। তবে ঠিক মাথায় জমাট রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। তারিণীকে সেদিকে দেখাতে যেতেই তারিণী প্রিয়নাথকে হাত দিয়ে থামতে বলল। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল ছড়ির বেতের চকচকে গা-টা। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট্ট ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বার করে বারবার দেখল। এই গ্লাসটা সাইগারসন সাহেব তাকে উপহার দিয়ে গেছেন বিলেত যাবার আগে। অবশেষে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে প্রিয়নাথকে বলল, “এই জায়গাটা দেখুন!”
প্রিয়নাথ দেখলেন লাঠির বেতের অংশে দুই জায়গায় হালকা ছোটো ছোটো কয়েকটা ফুটো। লাঠির পিছন দিকটা একেবারেই বেমানান। যেন ভারী কোনও হাতুড়িজাতীয় জিনিস দিয়ে ঠোকা হয়েছে। ফলে নিচের গোল অংশ থ্যাবড়া হয়ে গেছে অনেকটাই। আঁশ বেরিয়ে এসেছে কোনও কোনও জায়গায়। মাথায় রে দাগ দেখেও বার দুই”আশ্চর্য! আশ্চর্য!” বলে ভয়ানক চিন্তায় ডুবে গেল তারিণী। প্রিয়নাথ অবধি তাকে বিরক্ত করার সাহস পেলেন না।
প্রায় মিনিট পনেরো ধ্যানস্থ থেকে যেন ঘুম ভাঙল তারিণীর। প্রিয়নাথের দিকে চেয়ে বলল, “ম্যাপ। আমার এই গোটা সার্কাসের একটা ম্যাপ চাই। কার তাঁবু কোথায় সেটা জানা ভয়ানক জরুরি।”
প্রিয়নাথ এই পরিবেশেও হাসলেন। ছেলেটিকে ঠিক এই কারণেই পছন্দ করেন তিনি। দুজনের চিন্তাভাবনার ধারা অনেকটা একরকম। তারিণীর কাঁধে হাত রেখে প্রিয়নাথ বললেন, “আমিও এটা ভেবেই একটা ম্যাপ বানাতে বলছিলাম আমার সহকর্মীকে। সে বোধহয় এতক্ষণে বানিয়েও ফেলেছে। দেখি। আর কিছু?”
“হ্যাঁ। যদি আপনি অনুমতি দেন তো আপনার সঙ্গেই আমি সবার তাঁবুতে একবার করে নিজে ঘুরে দেখতে চাই। পান্নালাল আর হুকুমের লাশ তো পুলিশ নিয়ে চলে গেছে, ফলে ওই ক্যারাভ্যানের ভিতরেও একবার ঢুকব।”
“মঞ্জুর। আর কিছু?”
“আমি আপনার জবানবন্দিগুলো পড়লাম। আমি প্রয়োজনে নিজে কি কোনও প্রশ্ন করতে পারি? অবশ্যই আপনার সামনে।”
“সে কেন পারবে না? অবশ্যই পারো। তবে হ্যাঁ, আমার সামনে।”
প্রিয়নাথের আদেশে এক সহকারী তুলোট কাগজে হাতে আঁকা এক মানচিত্র উপস্থিত করল।
গভীর মনোযোগ দিয়ে তারিণী মানচিত্র দেখতে দেখতে আপন মনেই বিড়বিড় করতে লাগল। প্রিয়নাথ কান পেতে শুনতে পেলেন তারিণী বলছে, “তেজির তীব্র থেকে তেজি রামদীনকে দেখতে পেয়েছিল। রামদীন প্রথমে পদ্মর তাঁবুতে ঢুকে, তাকে না পেয়ে পবনের কাছে যায়। মিলে যাচ্ছে। কিন্তু ময়নার তীব্র উলটো দিকে কেন? একমাত্র মহিলা যার তাঁবু উলটো দিকে। রাতে বলবস্তের ঘুম ভেঙেছিল। সে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেছিল। পান্নার গান আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। কেন? স্বাভাবিক? নাকি তখনই… শঙ্কর কুকুরটাকে যখন খোঁটায় বাঁধে তখন বলবন্ত কোথায় ছিল? শেষরাতে কুকুরটা অমন করে ডাকছিল কেন?”
আচমকা মাথা উঠিয়ে সে প্রিয়নাথকে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা দারোগা সাহেব, এই যে নিচু জলাজমিটা আছে, তার ওপাশে ঘিরে রাখা। কোনও পায়ের ছাপ নেই, আপনি বললেন। এপাশের পায়ের ছাপ পরীক্ষা করা হয়েছে?”
প্রিয়নাথ মাথা নেড়ে বললেন, “হয়নি। যেভাবে মাথা ফাটানো হয়েছে, একেবারে সামনে থেকে না আক্রমণ করলে অতটা জোরে মারা সম্ভবই না। জলাজমির ওই পাড় নিদেনপক্ষে দশ ফুট দূরত্বে। ফলত …”
“তবু আমি একবার দেখব। আর সবার তাঁবু। চলুন। দেরি করা যাবে না।” প্রিয়নাথ এই ছেলেটিকে যত দেখেন অবাক হন। আপাতদৃষ্টিতে একেবারেই সাধারণ, ছাপোষা। আর দশজনের থেকে আলাদা করা অসম্ভব। কিন্তু যত জটিল সমস্যা আসে, ততই যেন তারিণী ভূতগ্রস্তের মতো হয়ে যায়। যতক্ষণ না সমাধান হবে, তার শান্তি নেই।
প্রিয়নাথ তারিণীর পাশে পাশে চলতে লাগলেন। প্রথমেই সে গেল সেই নিচু জলাজমির দিকে। জমিতে প্রায় নাক ঠেকিয়ে কী যেন খুঁজল। আতশকাচ দিয়ে দেখল বারকয়েক।
“এই দেখুন দারোগা সাহেব। এখানে মূলত তিনটে পায়ের ছাপ কাদায় পড়েছে। এই ছাপগুলো কুকুরের থাবার। জিমি লাফালাফি করছিল। তাই ছাপগুলো জড়িয়ে গেছে। এখানে দেখুন। আরও একজোড়া পায়ের ছাপ। সেটা কুকুরের ছাপের সঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় গেছে খুঁটো অবধি। আমি নিশ্চিত এই ছাপ শঙ্করের পায়ের। সে কুকুরটাকে ধরে বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল জলাজমির একেবারে ধারে বেশ গভীর কিছু পায়ের দাগ। এগুলো কার? বা কাদের? আচ্ছা, এখন কর্ডনের চারদিকে পরীক্ষা করা যায়?”
প্রিয়নাথ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। যদিও জানতেন তারিণী কিছুই পাবে না। সাহেবরা এত যন্ত্রপাতি এনে কিছু পাননি, সেখানে সামান্য আতশকাচ দিয়ে সে কী-ই বা করবে? তবুও তারিণী ক্যারাভ্যানের চারপাশে ঘুরে কিছু একটা দেখে বেশ উত্তেজিত হয়ে গেল। হাতে হাত ঘষতে ঘষতে চাপা গলায় বলে উঠল, “আপনি বলেছিলেন ক্যারাভ্যানের চারপাশে বলবস্তু ছাড়া অন্য কোনও মানুষের পায়ের ছাপ নেই। একেবারে ঠিক! একেবারে ঠিক!” এতে এত আনন্দের কী হল প্রিয়নাথ বুঝলেন না।
তারিণী এবার ক্যারাভ্যানে ঢুকল। বডি সরানো হলেও জিনিসপত্র যতটা পারা যায় নড়ানো হয়নি। দেওয়ালের ঘুলঘুলির পাশেই ভারী টেবিল চেয়ার। এই চেয়ারে বসেই মারা গেছে পান্নালাল। তারিণী খুব মনোযোগ দিয়ে টেবিল, চেয়ার, এমনকী মদের বোতল, গেলাস পরীক্ষা করে দেখল। তারপর প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে বলল, “পান্নালাল লম্বায় কতটা ছিল?”
প্রিয়নাথ এই প্রশ্নটা আশা করেননি। তিনি আমতা আমতা করতে লাগলেন।
“মানে খুনের সঙ্গে এর কি কোনও …”
“বলেন কী! পান্নালাল কতটা লম্বা ছিল, তার উপরেই গোটা কেস দাঁড়িয়ে আছে।”
প্রিয়নাথ বিব্রত হলেন। তারিণীর চিন্তাভাবনার কোনও থই পাচ্ছিলেন না তিনি। আর তখনই নিজেকে বড্ড বোকা বোকা মনে হচ্ছিল। অকারণেই রেগে গেলেন হঠাৎ।
“বিড়বিড় করে কী বলছ আর কী করছ কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আসল কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না, শুধু কুলোপানা চক্কর। তুমি বলেছিলে যা করবে, আমায় জানিয়ে বুঝিয়ে করবে। এখন তো দেখছি তুমি নিজে নিজেই সব ঠিক করছ! এমন জানলে তোমাকে আনার আগে দশবার ভাবতাম।”
তারিণী সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বারবার ক্ষমা চাইল।
“দারোগা সাহেব, আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমার মতো অভাজনকে আপনি যে সুযোগ আগেও দিয়েছেন, আজও দিচ্ছেন, তার জন্য কোনও ধন্যবাদই যথেষ্ট না। আসলে আমার এই এক দোষ। নিজের মধ্যে ঢুকে যাই। তখন আর কিছু খেয়াল থাকে না। আমি আপনাকে সব খুলে বলব। কিন্তু আগে তো আমাকে নিশ্চিত হতে দিন। ছেঁড়া পাতার মতো সমাধান এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে। তাদের গুটিয়ে আনতে হবে। আমি একটা থিয়োরি বানিয়েছি। সেটা ঠিক কি না বোঝার জন্যেই পান্নালালের উচ্চতা জানা খুব দরকার।”
প্রিয়নাথ আর তর্কে গেলেন না। তাঁর কাছে ফাইলে মৃতের যাবতীয় তথ্য লেখা ছিল। সেখান থেকেই দেখে নিলেন তিনি। পান্নালাল খুব লম্বা ছিল না। সাড়ে পাঁচ ফুট। তারিণীকে সেটা বলতেই তার চোখ যেন জ্বলে উঠল। শ্বাস দ্রুত হল। যেন বহুকাল অন্ধগুহায় হাঁটার পরে পথিক আলোর দিশা দেখতে পেয়েছে এমনভাবে সে প্রিয়নাথকে বলল, “আর একটা মাত্র অনুরোধ। শেষ অনুরোধ। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা একজন কাউকে খুঁজে আনুন। একটা পরীক্ষা করব। দয়া করে মানা করবেন না। আমি সবটা আপনাকে বুঝিয়ে বলব। আগে আমাকে বুঝে নিতে দিন।”
ব্যাপারটা বলতে যত সোজা, আখেরে ততটা দাঁড়াল না। সাড়ে পাঁচ ফুটের কোনও পুলিশ কর্মচারী নেই। বেশ অনেকটা খুঁজেপেতে সার্কাসের এক জমাদারকে জোগাড় করা গেল। তার উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট। কিন্তু সে বেজায় ভীতু। কিছুতেই ক্যারাভ্যানের ধারেকাছে আসবে না। ভিতরে ঢোকা দূরস্থান। ভালো কথা, ধমক, কিছুতেই কাজ হল না। ওই ক্যারাভ্যানে নাকি প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ঢুকলেই তার ঘাড় মটকাবে। প্রিয়নাথ পুলিশের লোক হলেও কাউকে জোর করে এ কাজে বাধ্য করতে পারেন না। তারিণীকে সমস্যার কথা বলতেই তারিণী”আমি দেখছি” বলে সেই জমাদারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি এর ভিতরে ঢুকবে না কেন?”
“না বাবু। জান খোয়াতে রাজি নই।”
“আট আনা দিলেও না?”
“আজ্ঞে আট আনায় আজকাল কী হয়?”
“ঠিক আছে। একটা গোটা সিক্কা টাকা দেব। ভিতরে ঢোকো।” বলতেই সে তড়াক করে বিনা বাক্যব্যায়ে ক্যারাভ্যানে ঢুকে গেল। তারিণী এবার যেটা করল, তাকে বলে রি-ক্রিয়েশান অফ ক্রাইম। অপরাধের পুনঃনির্মাণ। পান্নালালের চেয়ারে বসানো হল সেই জমাদারকে। যেমন পান্নালাল বসে ছিল। সামনে রাখা হল টেবিল। টেবিলে কেরোসিনের লণ্ঠন, মদের বোতল। তারপর তারিণী তাকে গান করতে বলায় সে হাতজোড় করে বলল গান করতে সে অপারগ। এক টাকা দিলেও এই কাজ সম্ভব না। ক্যারাভ্যান থেকে নেমে তারিণী সোজা চলে গেল ক্যারাভ্যানের পিছনে সেই জলাজমিতে। যেন স্বপ্ন দেখছে, এইভাবে তাকিয়ে রইল ক্যারাভ্যানের দিকে। তারপর প্রিয়নাথকে ডেকে বলল, “দারোগা সাহেব এদিকে এসে দেখুন।”
অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেই কাদাজমিতে বুটজুতো পায়ে নামলেন প্রিয়নাথ”কী দেখতে পাচ্ছেন?”
“ক্যারাভ্যানের একদিকের ছই আর ছোট্ট ঘুলঘুলি।”
“ঘুলঘুলির ভিতরে কী দেখতে পাচ্ছেন?
“কিচ্ছু না। দাঁড়াও, দাঁড়াও। এ তো চুল, মানে মাথা। সেই জমাদারের মাথার চুল।”
ম্লান হাসি হেসে তারিণী বলল, “পান্নালালের মাথাভরা টাক ছিল। মনে আছে?”
.
২।
প্রিয়নাথ খুব যে কিছু বুঝতে পারলেন তা নয়। তবে তারিণী একটা দিশা পেয়েছে, আর সেই দিশাতেই চলছে, সেটা খুব ভালো বোধগম্য হল তাঁর। তারিণীকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। বরং ওর পথেই চলা যাক। কারণ তিনি নিজে এই কেসের কোনও থই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ক্যারাভ্যানের কাজ শেষ। তারিণী এবার বলল সে কয়েকটা তাঁবু নিজে ঘুরে দেখবে। দরকার হলে কিছু প্রশ্নও করবে। তার গলায় উত্তেজনা। একেবারে সমাধানের সামনে পৌঁছে গেলে মানুষের এমনটা হয়। প্রিয়নাথ জানেন। কিন্তু তারিণীর কাজকর্মের মাথামুণ্ডু কিছুই তাঁর মাথায় ঢুকছিল না।
প্রথমেই তারিণী দাবি করল আগাছা মারতে যে পাউডার ব্যবহার হয় সেটা দেখবে। একজন হলুদ রঙের টিন ভরা সাদা পাউডার নিয়ে এল। নাম”ডা. লিগান’স গার্ডেন ইনসেক্টিসাইড।” ভালো করে টিনটা উলটেপালটে দেখল তারিণী। তারপর বলল, “হুকুমের তাঁবুতে যাব।”
গতকাল হুকুম মারা যাবার পর পুলিশ এসে তাঁবু সিল করে গেছিল, যাতে কেউ ঢুকতে বা বেরোতে না পারে। প্রিয়নাথের নির্দেশে তাঁবু খোলা হল। তারিণী খোঁজা শুরু করল। যেন আগে থেকেই জানে কী পেতে চলেছে, এইভাবে কয়েক লহমায় ঘরের এক কোণ থেকে বার করে আনল একটা ছোটো কাঠের বাক্স। তাতে ভরা দুই-তিনটে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। তবে এ সিরিঞ্জ সাধারণ সিরিঞ্জ না। আকারে প্রায় তার তিনগুণ। হুকুমের চেহারাও সাধারণের তিনগুণ ছিল। কী নিত সে এই সিরিঞ্জ দিয়ে! ভাববার আগেই তারিণী বলে উঠল, “এদিকে কাজ হয়ে গেছে। এবার ময়নার তাঁবু।”
তাঁবুর বাইরেই দাঁড়িয়ে কমলালেবুর কোয়া ভেঙে ভেঙে খাচ্ছিল ময়না। তাঁদের দেখেই কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে বলল, “বলুন বাবুরা। আবার জেরা?”
“জেরা না”, বলল তারিণী, “তুমি হুকুমের পাশের তাঁবুতেই থাকতে। ওর গতিবিধি তোমার জানা ছিল। কাল রোজের থেকে অন্যরকম কিছু খেয়াল করেছিলে?”
“আমি আকাশের পাখি বাবু। এটা আমার তাঁবু হলেও ভিতরে কম থাকি। বাইরে বেশি। সবাইকেই দেখি। বিকেলে মূল ফটক দিয়ে চোরের মতো রামদীনকে ঢুকতে আমিই দেখেছি প্রথম। কাউকে বলিনি। কী দরকার? খানিক বাদে সে আবার বেরিয়েও গেল চোরের মতো। সে চলে যাবার পর বলবন্ত আর পবন ঢুকল উমাকে খাওয়াতে। পবন মাঝে একবার বেরিয়ে আবার ঢুকল। তারপর বেরোল বলবন্ত। পিছে একটু বাদেই পবন। ওরা বেরোবার পর হুকুম ঢোকে। অন্য দিনের মতোই। এই সময় ও নাকি বাঘ বশ করে পর্দা ঢেকে। কিন্তু কাল একটু অন্যরকম হল। খেলা শুরুর একটু আগে উমাকে দেখতে গিয়ে হুকুম কোনও কারণে ভয় পেয়ে যায়। কোনও দিন যা করে না সেটাই করল। তাঁবুতে ঢুকল, সেখান থেকে সোজা চলে গেল উনার খাঁচায়, সেখান থেকে বেরিয়ে আবার তাঁবুতে। এইরকম কয়েকবার করার পরে, হুকুম পান্নালালকে ডেকে জানায় আজ উমাকে নিয়ে খেলা দেখানো যাবে না। পান্না অবশ্য সেটা মানেনি।”
তারিণী খুব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “কী বলে যে তোমায় ধন্যবাদ জানাই ময়না। তুমি অনেক সাহায্য করলে। এখন আসি”, বলে সোজা উলটোদিকে হাঁটা লাগাল।
“এবার?” প্রশ্ন করল প্রিয়নাথ।
“এবার পদ্মর তাঁবু।”
পদ্ম তার তাঁবুতেই ছিল। তাঁদের ঢুকতে দেখে সসংকোচে উঠে দাঁড়াল। তারিণী মৃদু হেসে বলল, “মা তুমি ব্যস্ত হোয়ো না। জানি তুমি কী ভাবছ। এই সার্কাসেই তোমার সব, এবার কী হবে। কিচ্ছু ভেবো না। আমরা আছি। তোমার কোনও অনিষ্ট হতে দেব না। তুমি শুধু বলো, গতকাল সার্কাস শুরুর আগে, বিকেলবেলায় তুমি তাঁবু ছেড়ে কোথায় গেছিলে? খুব ভেবেচিন্তে জবাব দেবে। তোমার এই উত্তরের উপরে একজন মানুষের জীবন মরণ নির্ভর করছে।”
মাথা নাড়ল পদ্ম, “কোথাও না বাবু।”
“ভেবে বলো। কোনও তাড়া নেই।”
“ভেবেও লাভ নেই কিছু। এই সার্কাসে আমার কোনও বন্ধু নেই। আগে রামদীন ছিল। ও চলে যাবার পরে পবন শুধু মাঝেমধ্যে হাসিমুখে কথা বলে। ময়নাটার পেটভরা হিংসে। আগে আমার পাশের তাঁবুতে থাকত। এখন ঝগড়া করে উলটো দিকে তাঁবু নিয়েছে। আর কাল তো আমার দুপুর থেকে মাথা টিপটিপ করছিল। আমি ঘুমোনোর জন্য এপাশ ওপাশ করছিলাম। বেরোবার প্রশ্নই ওঠে না।”
“মানে গতকাল রামদীনের সঙ্গে তোমার দেখা হয়নি?”
“সবাই বলছে রামদীন নাকি কাল এসেছিল। কিন্তু আমি দেখিনি। মিছে কথা কেন বলব বলুন তো?” কান্নায় ভেঙে পড়ে পদ্ম। তারিণীরা অপ্রস্তুত। কোনও কথা না বলে বেরিয়ে এল দুজনে।
তারিণীর দিকে তাকানোর আগেই তারিণী দ্রুত ঢুকে গেছে পাশে পবনের তাঁবুতে। পবন তখন জিমিকে কোলে নিয়ে আদর করছিল আর খেলছিল। তারিণী তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, “কাল রামদীনকে পদ্মর তাঁবুতে ঢুকতে তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”
পবনের অবাক তার তখনও কাটেনি। তবু সে মাথা নেড়ে বলল, “না। কিন্তু হয়ে বলল…”
“মানে ওর কথায় বিশ্বাস করে তুমি বলছ। তাই তো?”
“হ্যাঁ। আর ও খামোখা মিথ্যে বলতেই বা যাবে কেন?”
“তার হাজার কারণ থাকতে পারে। এবার তুমি বলো কাল বাঘকে খাইয়েছিল কে?”
“রোজ যে খাওয়ায়। বলবন্ত। আমি ওর সঙ্গে থাকি। হেল্পার।’
“কাল কি অন্যদিনের তুলনায় আলাদা কিছু হয়েছিল?”
“বাঘের খাবার কম পড়ে। বলবত্ত আমাকে আরও মাংস নিয়ে আসতে বলে। এমনটা আগে কোনও দিন হয়নি।”
“সেই সময় বাঘের সঙ্গে বলবন্ত একা ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“জিমির বয়স কত?”
“এই আড়াই হল। অ্যামিটা চলে না গেলে ওর তিন হত।”
পবন জিমির সঙ্গে খেলতে লাগল। তারিণী ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল পবনের তাঁবুর নানা জিনিস। আগুনের রিং। আড়ধনু। তিরের ফলা। কুকুরের গলায় বাঁধার চেন। তারপর গালে হাত দিয়ে বসে জিমি আর পবনের খেলা দেখতে লাগল। পবনের হাতে একটা লাল বল। সে সেটা ছুড়ে দিচ্ছে। শিস দিলেই জিমি মুখে করে বল নিয়ে আসছে।
প্রিয়নাথ খানিক অপেক্ষা করে বললেন, “এবার কার তাঁবু?”
“শঙ্কর আর মধু।”
শঙ্করের তাঁবুতেই মধুকে পাওয়া গেল। তারিণী সরাসরি মধুকেই জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, এই যে পান্নালাল মারা গেল। এখন সার্কাসের মালিক কে হবে?”
মধু মাথা নাড়ল, “জানি না। হয়তো বলবন্ত।”
“কিন্তু বলবন্তকে তো পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে পান্নালালের খুনের দায়ে। এখন?” শঙ্কর মাথা নিচু করে ছিল। এই কথা শুনেই সোজা তারিণীর দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “এই সার্কাস আমার হকের ধন। আমার কারও ভিক্ষার দরকার নেই।’
“চলুন দারোগাবাবু! আমার যা জানার জানা হয়ে গেছে।”
বাইরে বেরিয়ে প্রিয়নাথ বললেন, “কিছু বুঝতে পারলে?”
উত্তরে হ্যাঁ কিংবা না বলার বদলে অদ্ভুত একটা কথা বলল তারিণী।
“আসলে দারোগা সাহেব, একটা খুব পুরোনো কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম মানুষ কেন খুন করে?”
“টাকা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা বা কোনও লাভের জন্যেই মানুষ মানুষকে খুন করে।”
“এ ছাড়া?”
“এর পরেই আসে ক্ষমতা। তবে সেও একরকম লোভ। তারপর আসে ভালোবাসা। তারপর ঘৃণা, প্রতিহিংসা, ভয়…”
“একটা মজা দেখেছেন? এই সার্কাস যেন একটা থিয়েটারের মঞ্চ। সবাই এর নট-নটী। সবার নিজের নিজের খুন করার মোটিভ আছে। বলবস্তের টাকা বন্ধ করে দিয়েছিল পান্নালাল। পান্না খুন হলে গোটা সার্কাসের ক্ষমতা সে পেতে পারত। মধু আর শঙ্করের আছে প্রতিহিংসা। টমাস সাহেবের সার্কাস তাদের পাওয়ার বদলে জালিয়াতি করে পান্নালাল পেয়ে গেল। রামদীনের পান্নার প্রতি তীব্র ঘৃণা, পদ্মকে অন্ধের মতো ভালোবাসা, পদ্মর পান্নালালকে ভয়। এদের যে কেউ খুন করতে পারে পান্নালালকে। সবার নিজস্ব মোটিভ আছে। কিন্তু দারোগা সাহেব, এর বাইরেও একটা কারণে মানুষ খুন করে।”
“সেটা কী?”
“পরোপকার।”
“কী বলছ তুমি তারিণী?”
“ঠিকই বলছি। কোনও মানুষ গোষ্ঠী বা সমাজের জন্য খারাপ হয়ে উঠলে তাকে সরিয়ে দিতে হয়।”
“ওসব তত্ত্বকথা ছাড়ো। পান্নালালকে কে খুন করেছে?”
“আমি জানি না।”
“মানে? কী বলতে চাও তুমি?”
“বিশ্বাস করুন দারোগা সাহেব, আপনি অনেক বেশি বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন আমার উপরে। আমি অত দক্ষ গোয়েন্দা নই। তবে আশেপাশে যা প্রমাণ রয়েছে, তাতে বলবত্তকেই খুনি মনে হয়। সার্কাস দখলের লোভ সবচেয়ে বড়ো মোটিভ আর মার্ডার ওয়েপন তো ওর ঘরেই পাওয়া গেছে।”
প্রিয়নাথের কিছু একটা গণ্ডগোল মনে হচ্ছিল। কিন্তু উপায় নেই। তিনিও হালে পানি পাচ্ছেন না। চুপ করে খানিক তারিণীর দিকে চেয়ে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, “তার মানে তোমার মতে বলবন্ত খুনি। কিন্তু সে খুনটা করল কীভাবে?”
“এটা বলা আমার সাধ্যের বাইরে। ওকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। হয়তো বলবে। আমি বলতে পারব না।”
“এই তোমার শেষ কথা?”
“শেষ কথা।”
.
৩।
মুখে একটা তেতো ভাব নিয়ে বিছানায় বসে ছিলেন প্রিয়নাথ। রাত প্রায় দশটা বেজেছে। বলবন্ত অনেক কান্নাকাটি করার পরেও তাকে ছাড়া গেল না। লালবাজারে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে তাকে। কিন্তু প্রিয়নাথ জানেন, গোটা ব্যাপারে ভয়ানক গোঁজামিল রয়েছে। ধাঁধার একটা অংশও অন্য অংশের সঙ্গে মিলছে না। যে মিলিয়ে দেবে ভেবেছিলেন সেও আচমকা কেন পিছু হটে গেল সেটাও তাঁর মাথায় ঢুকছিল না।
গতকালই ছিল কোজাগরীর রাত। সে রাতে নাকি নিদ্রা নিষিদ্ধ। দেবী নাকি ঘুরে ঘুরে জিজ্ঞেস করবেন, কো জাগর? কে জাগে? না জাগলে রুষ্ট হবেন তিনি। ‘নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ কো জাগতীতি ভাষিণী’। আজ রাতে যে পাশা খেলবে, জুয়োর দানে রাত জাগবে, দেবী নাকি তাকেই বিত্ত দেবেন। সেই রাতে এমন বীভৎস দুই হত্যাকাণ্ড যখন হয়ে গেল, তা কি দেবীর অজ্ঞাতেই? তাঁর লক্ষ্মীমন্ত রূপের সঙ্গে পূর্ণিমার স্নিগ্ধতা মিলেমিশে এক হয়ে যায় প্রিয়নাথের কাছে।
গোটা কলকাতার ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর রাত জাগরণের পর এক মহানিদ্রা এসে ভরে করেছে। গতকাল সারারাত ঘুম হয়নি। আলো বন্ধ করে শুয়ে পড়বেন ভাবছেন, এমন সময় দরজায় টোকা। কে এল এত রাতে? আলো উসকে দিয়ে দরজা খুলে দেখেন তারিণী দাঁড়িয়ে। ওই অল্প আলোতেই প্রিয়নাথ দেখলেন তারিণীর চেহারায় এক বিধবস্ত ভাব। চোখ লাল, চুল উশকোখুশকো।
“কী ব্যাপার তারিণী? কী হল? ঘরে এসো।”
“আপনি আমার সঙ্গে চলুন দারোগাবাবু। আমি পাপ করেছি।”
“কী পাপ?”
“মানুষ খুনের পাপ। জেনেশুনে আমি একটা মানুষ খুন করতে গেছি। বলবত্তের যতই দোষ থাক ও খুনি না। খুনি অন্য একজন।”
প্রিয়নাথ তারিণীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। পিতলের ঘটি করে জল আর রেকাবিতে বাতাসা নিয়ে এলেন। সেই খেয়ে একটু যেন শান্ত হল তারিণী। তারপর প্রিয়নাথের হাত দুটো দুই হাতে চেপে ধরে বলল, “আমি জানি কে খুন করেছে। কীভাবে করেছে। কিন্তু ইচ্ছে করে আপনাকে বলিনি। আমি মনে মনে বলবন্তকে অপছন্দ করছিলাম। চাইছিলাম ও শাস্তি পাক। অন্যদিকে খুনি কে বোঝার পরেও পক্ষপাতিত্ব করে তাকে ধরিয়ে দিতে পারিনি। এ আমার পাপ। একজন গোয়েন্দাকে পক্ষ নিলে চলে না। সে সত্যান্বেষী। কোনওভাবেই সত্যের সঙ্গে সে আপোশ করতে পারে না। আমি করেছি। আমি পাপ করেছি। আমায় ক্ষমা করুন।” ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে তারিণী।
প্রিয়নাথ তাকে সান্ত্বনা দেন, “দেরিতে হলেও তুমি বুঝেছি এটা। সেটাই বা কজন বোঝে? যাই হোক, এবার বলো তো, খুনি কে?”
“আমার একটা অনুরোধ আছে। আপনাকে এখুনি আমার সঙ্গে আর একটিবার সেই সার্কাসে যেতে হবে।”
“এখুনি? কাল সকালে…”
“না দারোগাবাবু। আপনি আমায় অনেক প্রশ্রয় দিয়েছেন। আমি হয়তো তার অপব্যবহার করেছি। কিন্তু এবার আমি কথা দিলাম আপনার মান রাখব।”
অত রাতে ঘোড়ার গাড়ি বা মোটর পাওয়া দুষ্কর। তাও তাঁদের ভাগ্য ভালো, একখানি ভাড়ার চেরেট গাড়ি পেলেন। পৌঁছাতে প্রায় মাঝরাত। মূল ফটক বন্ধ প্রিয়নাথের হাঁকডাক শুনে দারোয়ান দরজা খুলে দিল। এত রাতে কোনও তাঁবুতে আলো জ্বলবে সে আশা করেননি প্রিয়নাথ। রাতের অন্ধকারে গোটা সার্কাস এক আদিম রূপ নিয়েছে। বাঘের গর্জন, হাতির ডাক, পাখিদের ডানা ঝটপটানোর আওয়াজে মনেই হচ্ছে না এর বাইরেই নাগরিক কলকাতা নিজের মহিমায় বিরাজ করছে। প্রিয়নাথের মনে হল তিনি যেন দূর কোনও গহিন অরণ্যের মাঝে এক ভয়াল পাপের মোকাবিলা করতে এসেছেন। এই জগৎ আমাদের চেনা জগৎ না। এখানে আমাদের পরিচিত নিয়ম চলে না।
তারিণীর সেদিকে খেয়াল নেই। নিশিডাকা মানুষের মতো কোনও এক প্রেতের আহ্বানে সে সোজা হেঁটে চলেছে একটা নির্দিষ্ট তাঁবুর দিকে। সে তাঁবুতে এখনও আলো জ্বলছে। এ তাঁবুতে কয়েক ঘণ্টা আগেও এসেছেন প্রিয়নাথ। দিনের বেলায়। কিন্তু রাতের অমানিশায়, মৃদু কেরোসিন ল্যাম্পের আলোতে সেই চেনা তাঁবুই কেমন ভূতুড়ে রূপ নিয়েছে। তারিণী সোজা ঢুকে গেল তাঁবুতে। তাঁবুর মালিক এত রাতে তাঁদের আশা করেনি। চমকে উঠে বলল, “আপনারা? এত রাতে?”
তারিণী সেসবের তোয়াক্কা না করে বলল, “অ্যামিকে ছেড়ে আসা হয়নি, মেরে ফেলা হয়েছে, এটা তোমায় কে বলল?”
পবনের চোখেমুখে অদ্ভুত বিস্ময়। বোঝাই যাচ্ছে সে এই প্রশ্ন আশা করেনি। উত্তর না দিয়ে গোঁজ হয়ে বসে রইল সে।
তারিণী বলল, “পবন, আমি সব জানি। প্রথম থেকে শেষ… সব। চিন্তা নেই। আমি সব বলব তোমাকে। বদলে তোমাকে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। মিথ্যে বললে হবে না। তবে হ্যাঁ, আমি যদি কিছু ভুল বলি, তবে তুমি চুপ থাকতেও পারো। এ কথা বলে দিচ্ছি, তোমার বন্ধুদের কোনও অনর্থ দারোগা সাহেব হতে দেবেন না। কি, তাই তো?”
প্রিয়নাথ কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তবুও উপরে নিচে মাথা নাড়লেন।
তারিণী বলে চলল, “আমি শুরু থেকে শুরু করছি। ভুল হলে পবন আমাকে শুধরে দেবে। এই গোটা কেসে আপাতদৃষ্টিতে খুন একটা মনে হলেও আসলে খুন হয়েছে চারটে। সবার জবানবন্দিতে যা বুঝলাম, উইলসন সার্কাসে থাকাকালীন পান্নালাল বসাক নেহাত খারাপ লোক ছিলেন না। সমস্যা হল বলবত্ত আসার পরে। বলবস্তের ভূমিকা এইখানে ম্যাকবেথের সেই তিন ডাইনির মতো। তারা নিজেরা কিছু করে না, কিন্তু মানুষের মনে লোভ ঢুকিয়ে দেয়। টমাস সাহেবকে নেশায় বশ করে বকলমে পান্নালাল আর বলবন্ত সার্কাসের মালিক হয়ে বসেছিলেন। এক হিসেবে ভালোই। সুখ আছে, দায়িত্ব নেই। সমস্যা হল সাহেব যখন দেশে ফিরতে চাইলেন। সবাই জানত, এরপর মালিক হবে শঙ্কর। শঙ্কর আবার এদের পছন্দ করে না। ফলে তাড়িয়ে না দিলেও বোলবোলাও তো কমবেই। এই সময় ঝাঁসিতে প্লেগ দেখা দিল। প্লেগের উপসর্গের সঙ্গে সবচেয়ে কাছাকাছি যায় আর্সেনিকের বিষের উপসর্গ। বলবন্ত আগে রাস্তায় ওষুধ বেচত। এইসব তার জানা। সে এটাও জানে, জমির আগাছানাশকে আর্সেনিক থাকে, যা খাবারে মেশালে কোনও গন্ধ হয় না। ফলে যে খায় সেও সন্দেহ করে না। আমার ধারণা বলবস্তের কথায় পান্নালাল খাবারে আর্সেনিক মিশিয়ে টমাসকে খুন করে। বলা হয় সাহেব প্লেগে মারা গেছেন। কিন্তু মুশকিল হল কবর দেবার পরেও আর্সেনিক হাড়ে আর মাংসে অনেকদিন থেকে যায়। এটা পান্না জানত না। বলবন্ত জানত। সাহেবকে ঝাঁসিতে কবর দেওয়া হয়েছিল। প্লেগ বলে ভয়ে কেউ সেই দেহ ছুঁয়ে দেখেনি। কিন্তু এখন যদি কেউ পুলিশে জানায় সাহেবকে আর্সেনিক দিয়ে খুন করা হয়েছে, আর দেহ কবর থেকে খুঁড়ে আর্সেনিক মেলে, তবে পান্নালালের ফাঁসির সাজা নিশ্চিত।
বলবন্ত ক্রমাগত পান্নালালকে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে। শঙ্করের সামনে আগাছার কথাটা বলা উচিত হয়নি তার। ওটা না বললে আমার মাথাতেও আসত না। এদিকে রামদীন আর পদ্মর প্রেম জমে উঠেছিল। কিন্তু ভীরু পদ্ম বলবন্তের ভয়ে তার বিছানায় যেত। রামদীন জেনেও কিছু করতে পারত না, কারণ সে বাঘ বশের মন্ত্র নেশার ঘোরে বলে দিয়েছিল।
“সেটা কী?” প্রশ্ন করলেন প্রিয়নাথ।
“চেরি পেক্টোরাল। সেই খালি বোতল, যা হুকুমের পোশাক থেকে পড়ে গেছিল। শঙ্কর আমাদের দেয়। এই চেরি পেক্টোরাল আসলে আফিমের আরক। রক্তে মিশিয়ে দিলে বাঘ ঝিমিয়ে থাকে। ফলে তাকে নিয়ে খেলা দেখাতে কোনও ভয় থাকে না। কিন্তু সময়মতো এই ওষুধ না পেলে বাঘ খেপে ওঠে। চেরি পেক্টোরালের কথা জানার পরে রামদীনকে তাড়িয়ে দেয় পান্না। বদলে হুকুমকে সেই দায়িত্ব দেয়। একে তো হুকুম তার চাকরি খেয়েছে, তার উপরে ঝাঁসিতে পান্নার সঙ্গে দেখা করতে এলে হুকুম রামদীনকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে রামদীনের সব রাগ গিয়ে পড়ে হুকুমের উপরে। সে প্রতিশোধ নেবার উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু পদ্ম ভীরু, শঙ্কর সাতে-পাঁচে থাকে না। তার দরকার ছিল ভিতরের এমন এক লোককে, যে তাকে সাহায্য করবে, কিন্তু সেই লোককে কেউ সন্দেহ করবে না।”
“সেটা কি পবন?” প্রিয়নাথ অজান্তেই বলে ফেললেন। পবন একদৃষ্টিতে তারিণীর দিকে চেয়ে।
“ঠিক তাই। পবন। কিন্তু পবনই বা রাজি হবে কেন এমন একটা কাজে, যদি না তার নিজের কোনও রাগ থাকে? তখনই অ্যামির কথা জানতে পারি। অ্যামি কোনও কারণে পান্নাকে কামড়ে দেয়। কুকুরটা তখন পোয়াতি। হুকুম তাকে দূরে ছেড়ে আসে। পোষা কুকুর ঠিক পথ খুঁজে মালিকের কাছে ফিরে আসে, যদি না তাকে মেরে ফেলা হয়। এখানে সেটাই হয়েছিল। পান্নার কথায় হুকুম ওকে মেরে ফেলে। পবন সেটা জানতে পারে। সার্কাসেরই কেউ ওকে জানায়। ফলে সেও রামদীনের চক্রান্তে রাজি হয়। রামদীন সেদিন পদ্মর সঙ্গে না, পবনের সঙ্গেই দেখা করতে এসেছিল।”
“চক্রান্তটা কী?
“চেরি পেক্টোরালের বোতল বদলে দেওয়া। ঠিক ওইরকম দেখতে একটা বোতল রেখে দেওয়া, যাতে হয়তো শুধু জল রয়েছে। আমার ধারণা উমার খাঁচার কোথাও বোতলটা লুকিয়ে রাখা হত। জানত শুধু রামদীন, আর পরে পান্না আর হুকুম। সেদিন বলবন্ত আর পবন মাংস দিতে ঢুকলে পবন ইচ্ছে করে মাংস কম আনে। আবার তাকে বাঘের মাংস আনতে যেতে হয়। বলবন্ত জানে সার্কাস শুরু হয়ে যাবে। সে হাজার কাজে ব্যস্ত। শেষটুকু পবনকে দিতে বলে সে চলে যায়। সেই ফাঁকে পবন বোতল বদলে দেয়। হুকুম বারবার সিরিঞ্জে করে ওষুধ দিলেও বাঘের নেশা হচ্ছিল না। সে বলে খেলা বন্ধ করে দিতে। রামদীন বা পবন জানত, নিউ ইয়ারের দিন যা ভিড় হবে, সেখানে পান্নালালের মূল খেলা বাঘের খেলা দেখানোর সুযোগ সে ছাড়বে না। ছাড়লে প্রচুর বদনাম আর অনেক টাকা গচ্চা দিতে হত।”
“তাহলে হুকুমের মৃত্যুটা …”
“একেবারেই দুর্ঘটনা না। আগে থেকে হিসেব করা খুন। কিন্তু এর ঠিক পরে যেটা হল, সেটা সব হিসেবনিকেশের বাইরে। কেউ ভাবতেও পারেনি এমনটা হতে পারে। পশুদের আফিম দেওয়া সরকার নিষিদ্ধ করেছেন। ফলে কেউ এটা নিজের তাঁবুতে রাখে না। উমার খাঁচায় চেরি পেক্টোরালের বোতল না পেয়ে পান্না ভয় পেল। বুঝল এটা হুকুমের পোশাকের কোথাও আছে। পুলিশের হাতে পড়লে হ্যাঙ্গাম। সে বলল বডি তার ক্যারাভ্যানে থাকবে। বৃষ্টি না হলে কী হত জানি না, এক্ষেত্রে পুলিশ রাজি হল। তাতে পান্নার সুবিধে কিছু হল না। বোতল পড়ল মাটিতে, সেখান থেকে শঙ্করের হাতে।”
“কিন্তু পান্নালালকে খুন করার প্ল্যান হল কীভাবে?”
“পান্নালালকে খুনের কোনও প্ল্যান কোনও দিন ছিল না। ইচ্ছে থাকলে যেমন উগায় হয়, উপায় থাকলেও ইচ্ছে হয়। সেদিন পান্না হাতের লাঠিটা ক্যারাভ্যানের গাশে গুঁজে ভিতরে ঢুকে গেল। ভিতরে বসে মদ খেতে আর গান গাইতে লাগল। হয়তো হুকুমের পোশাকও পরীক্ষা করল, কিন্তু কিছু পেল না। মাঝরাতের পর বৃষ্টি থেমে গেলে কোজাগরী পূর্ণিমার ভরা চাঁদ উঠল আকাশে। গোটা ঘটনাটাই দাঁড়িয়ে আছে এই চাঁদের উপরে। চাঁদের আলোতে জিমি ঘুমস্ত পবনকে ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে পান্না গাইছিল। জিমি ক্যারাভ্যানের কাছে এসে ওই চকচকে লাঠি দেখে মুখে করে নিয়ে এল পবনের তাঁবুর কাছে। এই জায়গাটা আমার কাছেও ধোঁয়াশা। খুব সম্ভবত পবন জিমিকে খুঁজতে বাইরে বেরিয়েছিল, কিংবা জিমি লাঠি নিয়ে ভিতরে ঢোকে। এই লাঠি সবাই চেনে। পবন বাইরে বেরিয়ে সোজা ক্যারাভ্যানের দিকে যেতে গিয়ে ওই নিচু জমিতে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখতে পায়। জানলার ঘুলঘুলিতে পান্নার মাথা। থুড়ি, মাথার চকচকে টাক। ছাইচাপা আগুনের মতো পবনের রাগ উসকে ওঠে। জানি না, হয়তো তার মনে হয়েছিল বোন অ্যামির মৃত্যুর প্রতিশোধ এভাবেই নিতে বলছে ভাই জিমি। অস্ত্র তুলে দিচ্ছে তার হাতে। অদ্ভুত এক ফন্দি আসে পবনের মাথায় নিজের আড়ধনু বা ক্রস-বো নিয়ে এসে তিরের বদলে এই লাঠি লাগিয়ে সোজা পান্নার মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে। আড়ধনুর জোর বন্দুকের গুলির সমান। এককালে এতে বল্লম লাগিয়ে শত্রুর দিকে ছুড়ে মারতেন যোদ্ধারা। বেদের কাছে খেলা শিখে আড়ধনুর ব্যবহার ভালোই জানত পবন। এখানেও চোখ বেঁধে নিখুঁত তির ছুড়ত মধুর দিকে। সেই রাত্রে পান্না গান গাইছিল। এদিকে ঘুলঘুলি দিয়ে চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তার টাকমাথা। পবন এ সুযোগ ছাড়েনি। আড়ধনু বেঁধে সীসে পোরা লাঠির লোহা পান্নার মাথা ফাটিয়ে দেয়। দিয়ে ক্যারাভ্যানের বাইরেই পড়ে থাকে। তাই লোহার ঠিক ওপরেই রক্ত ছিল। গায়ের কোথাও না। আমি দেখে অবাক হয়েছিলাম। আর লাঠির পিছনে আড়ধনুর হ্যামারে ফেটে আঁশ বেরিয়ে এসেছিল। অন্য কোনওভাবে সেটা সম্ভব না।”
“কিন্তু সেটাকে নিয়ে এল কে? ক্যারাভ্যানের চারদিকে তো পায়ের ছাপ ছিল না।”
“ভুল বললেন দারোগাবাবু। আগেরবারই ঠিক বলেছিলেন। কোনও মানুষের পায়ের দাগ ছিল না। এখানে অপরাধের অন্যতম সহযোগী জিমি। সে জানে তার মালিক কিছু ছুড়ে দিলেই মুখে করে নিয়ে আসতে হয়। সেদিন পবনের তাঁবুতে বসে আমি সেটাই দেখছিলাম। লাঠিটা পান্নালালের মাথা ফাটানোর পর জিমিই সেটাকে মুখে করে পবনের কাছে নিয়ে আসে। তারই দাঁতের দাগ ছোটো ছোটো ফুটোর মতো বসে গেছিল লাঠির গায়ে।”
“তারপর?” প্রিয়নাথ এক দুই শব্দের বেশি বলতে পারছেন না। সম্পূর্ণ স্তম্ভিত তিনি।
“পবন বোঝে সে কী করে ফেলেছে। কুকুরের মুখ থেকে লাঠিটা নিয়ে লে তাঁবুতে ঢুকে তাঁবু বন্ধ করে দেয়। জিমি রেগে চিৎকার করতে থাকে। শঙ্কর পাইলে এসে তাঁকে খোঁটায় বেঁধে দেয়। এবার পবনকে আমার একটাই প্রশ্ন। অ্যামিকে যে হুকুম খুন করেছে এটা তোমায় কে বলল?
পবনের দুচোখে জল। হাউহাউ করে কেঁদে বলল, “আমার মেয়ে ছিল অ্যামিটা। নিজের মেয়ে। আমার হাত ছাড়া খেত না। আদর না করলে অভিমান করত। আর তাকেই ওই শয়তান দুটো মিলে পিটিয়ে পিটিয়ে খুন করল! অ্যামির পেটের বাচ্চাগুলোও…”, কান্নায় ফুলে ফুলে উঠল পবনের গোটা দেহ।
“তুমি জানলে কীভাবে?”
“হুকুমের খুব কাছের বন্ধু ছিল আমাদের জোকার তেজি। যেদিন মারল, সেদিনই রাতে এসে তেজিকে গর্ব করে বলেছিল। তেজি আমাকে বলে। পরদিন আমি খুব ভোরে গিয়ে দেখি ভাগাড়ে আমার অ্যামি পড়ে আছে। মাথা ফেটে দুইভাগ।”
কেউ কোনও কথা বলতে পারছিল না। প্রিয়নাথ তার মধ্যেই বললেন, “লাঠিটা বলবত্তের তাঁবুতে গেল কেমন করে?”
“আমি বলবত্তকে পছন্দ করি না। ও আসার পর থেকেই এই সার্কাস শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ওকে বুঝতে দিই না। সেদিন আমিই ওকে বলি পুলিশে খবর দিতে। ওর তাঁবু ফাঁকা ছিল। নিজের তাঁবু থেকে লাঠিটা নিয়ে কাপড় দিয়ে মুছে ওর তাঁবুতে এমনভাবে লুকিয়ে রাখি যাতে একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়।”
“এক ঢিলে দুই পাখি। তাই কিনা?”
পবন উত্তর দিল না। উপরে নিচে মাথা নাড়ল।
তারিণীর চোখে জল। সে প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার বলুন, আমার জায়গায় থাকলে আপনি কী করতেন? যে খুনে মানুষের উপকার…
প্রিয়নাথ বললেন, “বলবত্তের ঘরে লাঠি পাওয়া গেছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কেস দাঁড়াবে না। দুইদিনে ছাড়া পেয়ে যাবে। আর ও ছাড়া পেলে যাতে এই সার্কাসমুখো না হয় সেটা আমি দেখব। সবচেয়ে বড়ো কথা কীভাবে খুন হয়েছে সেই ব্যখ্যাই তো এখনও পাওয়া গেল না।”
তারিণী অবাক হয়ে বললে, “সে কী! আমি এতক্ষণ তবে কী বললাম?”
প্রিয়নাথ মাথা নেড়ে বললেন, “বুড়ো হয়েছি তো, সব কথা ঠিকঠাক কানে শুনতে পাই না। অনেক রাত হল। সেই চেরেট গাড়ি আছে না চলে গেছে কে জানে? চলো বাড়ি যাওয়া যাক।”
তারিণী আর কিছু না বলে প্রিয়নাথকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।
.
৪।
(প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের জবানি থেকে)
এই মরজগতে জন্মাবধি মানব সত্যের অন্বেষণ করিয়া আসিতেছে। মানবজাতির উত্তরণ আজ এই পর্যায়ে হইয়াছে, তাহার মূল কারণ বোধকরি এই জিজ্ঞাসা। মনুষ্যেতর প্রাণীদের মধ্যে এই প্রবৃত্তি দেখা যায় বলিয়া আমার অন্তত জানা নাই। পশুগণ আপন আপন ক্ষণিক উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়া দেখাইয়া থাকে। মানব তেমন নয়। সে প্রতিটি বেদনা আপনার হৃদয়গাত্রে খুদিয়া রাখে, সময় পাইলেই খুঁড়িয়া বাহির করিয়া নিজ জ্ঞান বুদ্ধি মতে বিচারসাধন করে। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগে যুক্ত হইয়া জীবনের ব্রত লইয়াছিলাম, আজীবন সত্যকে সন্ধান করিব। দোষীকে উপযুক্ত শাস্তি দিব। কিন্তু বাস্তব বড়োই অকরুণ। এক্ষণে বুঝিয়াছি, সাদা বা কালো বলিয়া কিছুর অস্তিত্ব নাই। সকলই ধূসর। ঠিক সেইমতো চরম সত্য বলিয়াও কিছু ইহজগতে বর্তমান নাই। চরম মিথ্যা বলিয়াও কিছু হয় না। সমাজ ও সংস্কার কিছু গতে বাঁধা নিয়ম বানাইয়াছে। আমরা সেই মতে চলি, সেই মতে সত্য মিথ্যা, দোষী নির্দোষ নিরূপণ করি। ইহার পূর্বে ম্যাসনদের লইয়া যে মহাকা ঘটিয়াছিল, তাহাতেও দেখিয়াছি অপরাধবিজ্ঞানের কেতাবে লিখিত আদর্শ অপরাধী অসম্ভব। পরিস্থিতি, পরিবেশ, ও সুযোগ মানবকে অপরাধী বানাইয়া তোলে। এই কেসেও ঠিক একই ঘটনা ঘটিয়াছে। বহুপূর্বে ঘটিত একাধিক পাপের অগ্নি সময়ের ভস্মে নিমজ্জিত হইয়া ছিল। সুযোগ আসিতেই সেই ঘুমন্ত বহ্নি দানবের ন্যায় মাথা চাড়া দিয়া সকল অপরাধের শোধ লইল।…
ইংরাজ সরকারের বিচারসভায় পবন অবশ্যই অপরাধী। কিন্তু হৃদয়ের বিচারে? আমার জানা নাই। যাহা করিলাম তাহাতে আইনের পট্টনী আবদ্ধ চক্ষুতে আমিও অপরাধের অংশীদার। আমি এই ডায়রিতে বিশ্ববিধাতার নিকট সেই কারণে ক্ষমা চাহিতেছি, কিন্তু বিবেক বিসর্জন দিয়া পবনকে হাতকড়া পরানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই লেখা যখন লিখিতেছি তখন দ্য গ্রেট ন্যাশনাল সার্কাস চিরতরে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। পদ্ম রামদীনকে বিবাহ করিয়া আপন দেশে ফিরিয়া গিয়াছে। পবন, ময়না, তেজি ও শঙ্কর সার্কাস ছাড়ে নাই। পরের শীতেই তাহারা প্রফেসর প্রিয়নাথ বসুর দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে যোগ দেয়। পবন অবশ্য তীরের খেলা আর দেখায় না। সে ওই সার্কাসে ম্যাজিশিয়ান গণপতির সহকারী হইয়া কালাতিপাত করে। এই সুযোগ সে কীভাবে পাইল জানা নাই। তবে শুনিতে পাই ইহাতে নাকি গোয়েন্দা তারিণীচরণের সামান্য হইলেও হাত রহিয়াছে।
.
উৎস-
আব্দুস শুকুর, বাংলার পুলিশ-সেকাল একাল, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ
অমৃতলাল বসু, রসরাজের রসকথন, সংবাদ
সমীরকুমার ঘোষ, জাদুসম্রাট গণপতি ও বাঙালির জাদুচর্চা, সপ্তর্ষি প্রকাশন
সুমস্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান, অনুষ্টুপ
সৌমিত্র শ্রীমানী সম্পাদিত, কলিকাতা কলকাতা, বঙ্গীয় ইতিহাস পরিষদ
হরিপদ ভৌমিক, নতুন তথ্যের আলোকে কলকাতা, পারুল প্রকাশনী
হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, কলিকাতা সেকালের ও একালের, পি এম বাগচি
হরিহর শেঠ, প্রাচীন কলকাতা পরিচয়: কথায় ও চিত্রে, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি
হেমেন্দ্রকুমার রায়, কলকাতার রাত্রি রহস্য (সম্পাদনা ও টীকা—কৌশিক মজুমদার), বুক ফার্ম
John Zubrzycki, Jadoowallahs, Jugglers and Jinns: A Magical History of India, Picador India
Sumanta Banerjee, The Parlour and the Streets: Elite and Popular Culture in Nineteenth Century Calcutta, Seagull
Sumanta Banerjee, The Wicked City, Crime and Punishment in Collonial Calcutta, Orient Longman
