১২. দ্য বুলেট ক্যাচিং ট্রিক

১২. দ্য বুলেট ক্যাচিং ট্রিক

“আপনারা কিছু নেবেন? ওহ, সরি। ডিউটি আওয়ারে বোধহয় আপনারা কিছু… এনিওয়ে, আমি একটা ড্রিঙ্ক নিচ্ছি।”

সাইড টেবিলের ডিক্যান্টার থেকে গেলাসে সামান্য হুইস্কি ঢেলে শূন্যেই তাঁদের দিকে তাকিয়ে চিয়ার্স করলেন আর্থার স্মিথ।”ইনফ্যাক্ট আপনারা আসবেন সেটা ভাবছিলান, কিন্তু এভাবে সদলবলে আসবেন তা ভাবতে পারিনি। ‘জমিন্দার আসেননি? হি শুড অলসো কাম।”

কথা চলছিল আর্থার স্মিথ সাহেবের বাংলোর বৈঠকখানা ঘরে বসে। চার্চের পিছনের রাস্তা ধরে সোয়া মাইল পথ গেলেই সুন্দর একটেরে বাসাখানি। লালচে টালিতে মোড়া এই ধরনের বাংলোবাড়ির নাম টিউডর বাংলো। ইংরেজ রাজপরিবারের মানুষরা এই ধরনটাই পছন্দ করেন বেশি। ঢুকতেই লাল মোরাম বিছানো রাস্তা। তার দুধারে বাগান। একটা শিমুল গাছকে জড়িয়ে ধরে বেয়ে উঠেছে মাধবীলতার ঝাড়। তাতে ইতিউতি উঁকি দিচ্ছে নীল ফুল। দেওয়ালের ধারে আলো করে আছে রংবেরঙের বোগেনভিলিয়া আর ফুরুস ফুলের সারি। পোর্টিকোতে দুইখানি বেতের চেয়ার পাতা। পাশে সন্ধ্যাহ্নিকের জন্য কয়েকটি কাচের গেলাস সাজানো।

ঘরে ঢুকেই তারিণী বুঝেছিল, কিছু একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। বিরাট বড়ো বড়ো সব তোরঙ্গ, ট্রাঙ্ক, সুটকেস, হোল্ড অল বেঁধেছেদে একপাশে রেখে দেওয়া। আসবাবের গায়ে সাদা কাপড় পরানো। দেওয়ালের ছবিগুলো নামিয়ে উলটোবাগে মুখ করে রাখা। নিতান্ত না হলে নয়, এমন কিছু জিনিসপত্র বাদে গোটা ঘরটাই প্রায় ফাঁকা।

.

আর্থার স্মিথ তামাটুলি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন!

“আই থিংক আই ডিজার্ভ এ ফেয়ারওয়েল। সেই চব্বিশ বছর বয়েসে এ দেশে এসেছি। মান্দ্রাজের রেভোলিউশান দেখেছি, কানপুরের সিপাই মিউটিনি দেখেছি, এখন আবার এই নতুন সব স্বদেশিদের কাণ্ডও দেখছি। নাও আই অ্যাম টু ওল্ড অ্যান্ড আই অ্যাম টু ব্লাডি টায়ার্ড। নইলে এইসব টেররিস্টদের কেমন করে শায়েস্তা করতে হয়, দেখিয়ে দিতাম।”

প্রিয়নাথ মাথা নিচু করে শুনছিলেন। হার্পার একটু উশখুশ করে বললেন, “আসলে এঁরা ইনভেস্টিগেশন চালাচ্ছেন। ইনি লালবাজারের দারোগা প্রিয়নাথ মুখার্জি আর উনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ তারিণীচরণ রায়। আপনার সঙ্গে একটু কথা…”

“কথা? কী ব্যাপারে? আমি কী জানি? হোয়াই আর ইউ ড্র্যাগিং মি ইন দিস মেস? আই অ্যাম সরি। আই হ্যাভ নাথিং টু টেল ইউ। ভেবেছিলাম আপনারা আমায় ফেয়ারওয়েল দিতে এসেছেন। সরি, আই মিসআন্ডারস্টুড। নাও গো।”

এরপর আর কিছুই বলার থাকে না। প্রিয়নাথ আর হার্পার পিছন ফিরলেও তারিণী দাঁড়িয়েই রইল।

“ওয়েল, ইয়ং ম্যান, তোমার কিছু বলার আছে?”

“আজ্ঞে, মারা যাবার আগে টেলর সাহেব আপনাকে যে উপহারখানি দিয়েছিলেন, সেটা ঠিক কবে, আর কেন, তা যদি জানাতেন।”

মুহূর্তের মধ্যে স্মিথের চেহারায় অদ্ভুত এক পরিবর্তন দেখতে পেলেন প্রিয়নাথ। তাতে রাগ আর বিস্ময়ের অদ্ভুত মেলবন্ধন। এই পরিবর্তন এতই স্পষ্ট যে তা লুকানোর চেষ্টা বৃথা। স্মিথ সে চেষ্টাও করলেন না। খানিক আগুনজ্বলা দৃষ্টিতে

তারিণীর দিকে চেয়ে বললেন, “টেল মি, হু আর ইউ অ্যাকচুয়ালি? এ কনজিউরার? এ প্রফেট? এ ফরচুন টেলার?”

ম্লান হেসে তারিণী বললে, “নো স্যার, আই অ্যাম এ ভেরি সিম্পল পারসন স্যার। প্রাইভেট ডিটেকটিভ।”

“তোমাকে দেখে আমার দেশের বেকার স্ট্রিটের এক কনসালটিং ডিটেকটিভের কথা মনে পড়ছে। ওঁর দাদা মাইক্রফট আমার ক্লাসমেট ছিল। এনিওয়ে, টেলর আমাকে উপহার দিয়েছে তা তোমাকে কে বলল?”

“আজ্ঞে জানতাম না। একটু আগে জানলাম। এই ঘরে ঢুকে। ঘরের প্রায় সব কিছুই লটবহর বাঁধা হয়ে রয়েছে। বইগুলো যে গাঁটরিতে বাঁধা, তাদের স্পাইনে সোনার জলে লেখা নাম স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। প্রায় সবকটাই অফিসের লেজার আর শিকারের পদ্ধতির বই। সাহিত্যের একটিও নেই। শুধু একেবারে উপরে একটা ছোটো বই কোনওমতে চেপেচুপে ঢোকানো হয়েছে। সত্যি বলতে কী, সেটা ঢোকাতে গিয়ে বইয়ের গাঁট ঢিলে হয়ে গেছে কিছুটা। অর্থাৎ এই বই একেবারে শেষ মুহূর্তে ঠেসে দেওয়া। আশ্চর্যের ব্যাপার, বইটার নাম ‘টেলস ফ্রম শেক্সপিয়র’ আর স্পাইনের গোটা গোটা হরফে দুটি অক্ষর ‘আর. টি’ লেখা। আমি যদি খুব ভুল না করি”, এবার প্রিয়নাথের দিকে চেয়ে বলল তারিণী, “এই বই সেই টেলর সাহেবের ঘর থেকে পাওয়া নাট্যকার শেক্ষপীরের বইখানির জোড়া।”

“কিন্তু এই বই এখানে এল কী করে?”

“সেটাই তো আমি সাহেবের থেকে জানতে চাইলাম।”

.

স্মিথ এবার ধীর পায়ে পাশেই একটা চেয়ারে গিয়ে বসলেন। বাক্স খুলে চুরুট বার করে ডগাটা কেটে নিলেন ধারালো ছুরি দিয়ে। তারপর বার তিনেকের চেষ্টায় চুরুট ধরিয়ে মুখভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “টেলরকে আমি আজ চিনি না। একেবারে ছোটোবেলা থেকে চিনি। ওঁর বাবা পিটার আমাদের পরিবারের গ্যারিসনের দায়িত্বে ছিলেন। হোয়াট আ ম্যান হি ওয়াজ! পিটারের বড়ো ছেলে উইলিয়াম, আমি আর সেই মাইক্রফট, তিনজনেই একসঙ্গে লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল স্কুলে পড়েছি। উই ওয়্যার বেস্ট ফ্রেন্ডস। মাইক্রফটের বাবা সাইগার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ছিলেন। পরে পা ভেঙে দেশে ফিরে যান। বাঁচেননি বেশিদিন। যা বলছিলাম, উইলিয়াম আর মাইক্রফট দেশে রয়ে গেল, আর আমি চলে এলাম এই দেশে সৈন্য হয়ে। তারপর কী না অভিজ্ঞতা হয়েছে! ১৮৮০-তে নেইওয়ান্দের যুদ্ধে পায়ে গুলি লেগে খোঁড়া হয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম পা-টা গেল। যাই হোক, তারপর থেকে মন দিয়ে হান্টিং করি। গাছে মাচা বেঁধে বসে থাকি, কখন শিকার আসে। বিগ গেম তেমন শিকার করিনি। ভাল্লুক, চিতা ইত্যাদি মেরেছি কিছু। তবে হ্যাঁ, বন্দুকের টিপ আমার অভ্রান্ত।”

এইটুকু বলেই একটু যেন তটস্থ হয়ে গেলেন স্মিথ।

“অবশ্য সেই ম্যাজিকের রাতের মিসহ্যাপের পর এখন ভাবি, ঈশ্বর কেন সেদিন আমায় লক্ষ্যভ্রষ্ট করলেন না। মাঝখান থেকে একটা নিরীহ মানুষের প্রাণ গেল। যা বলছিলাম, রিচার্ড ওয়াজ আ ড্যাম ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ছোটো থেকেই শখ, ইন্ডিয়ায় আসবে। টাকা কামাবে। দেশে যখন ফিরবে, সবাই ওকে ‘নাবুব’ বলে ডাকবে। আর সে পথে সে অনেকটা এগিয়েওছিল। আমার সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ করত নিয়মিত। চাকরিতে উন্নতিও দেখার মতো। মাসখানেক আগে শেষ যে চিঠি পেলাম, তাতে লেখা, প্রোমোশন পেয়ে তামাটুলিতে আসছে। আমার আগেই দেশে ফিরে যাবার কথা। ওর জন্যেই পিছিয়ে দিলাম। তারপর মাঝে খবর এল, জাহাজে কী গণ্ডগোল হয়েছে। আরও একমাস লাগবে। অতদিন দেরি করা আবার আমার পক্ষে সম্ভব না। লন্ডনে আমার বউ, ছেলেমেয়েরা অস্থির হয়ে গেছে। আমি গোছগাছ শুরু করতে না করতেই দেখি রিচার্ড এসে হাজির।”

“আপনি কারণ জিজ্ঞাসা করেননি?”

“করেছিলাম। বলল, জাহাজ অকারণে দেরি করছিল, তাই স্পেশাল তার করে বন্দর থেকে ছোটো বোট নিয়ে চলে এসেছে। এখানকার জমিন্দার ওর অনারে একটা পার্টি রেখেছিল, সেখানেই বলল।”

“সেদিন ওঁকে কেমন দেখেছিলেন? স্বাভাবিক?”

“হ্যাঁ। একেবারেই। তবে সদ্য জাহাজ থেকে আসায় একটু টায়ার্ড ছিল বলে মনে হল। কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলছিল না। এখানের ওয়েদার স্যুট করেনি তখনও। বলল মাথা ধরেছে। আর হ্যাঁ, একজন স্টুয়ার্ডকে বলে রান্নাঘর থেকে কী যেন আনিয়ে মদের সঙ্গে মিশিয়ে ঢক করে খেয়ে নিল। তারপর খানিক গল্পগুজব করেই বেরিয়ে গেল। বলল রেস্ট নেবে।”

“সেইদিনই আপনাদের শেষ দেখা?” প্রিয়নাথ জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যাঁ। গেটের সামনে টেলর আমাকে বিদায় জানিয়ে বলল, ‘বাই আর্থার ডিয়ার। আই ও ইউ’। সেই শেষ। তারপর তো সেই ম্যাজিকের দিন দেখা হবার কথা ছিল। ইউ নো দ্য রেস্ট।”

“বেরোবার সময় আনইউজুয়াল কিছু হয়েছিল?”

“ও হ্যাঁ। আপনি মনে করালেন, তাই মনে পড়ল। সেই ম্যাজিশিয়ান, দলবল নিয়ে গেটের সামনে বসে ছিল। টেলর তাকে চিনতে পেরে সামনে গিয়ে কথা বলে। তাও বেশিক্ষণ না। সামান্য সময়।”

“কী কথা হয়েছিল?”

“সেটা আমি কেমন করে জানব? আমি কি কান পেতে শুনেছিলাম?”

“শেষ প্রশ্ন, নন্তুকে গুলি করার আগে আপনি বন্দুক চেক করে নিয়েছিলেন?”

“না। করার প্রয়োজন বোধ করিনি। এটা খুব কমন একটা পার্লার ট্রিক। এই খেলা আমি আগে অনেক দেখেছি। এই ধরনের ম্যাজিকে বিশেষভাবে বানানো দুইঘরা বন্দুকের একটায় গুলি থাকে। আর একটায় ফাঁকা কার্তুজ থাকে। ম্যাজিশিয়ান পরীক্ষা করানোর সময় আসল কার্তুজটা দেখায়। তারপর গুলি ছোড়ার আগে হাতসাফাইয়ের কায়দায় রিভলবারের সিলিন্ডারটা ঘুরিয়ে ফাঁকা কার্তুজটা সামনে নিয়ে আসে। ফলে আওয়াজ হয়। কিন্তু গুলি বেরোয় না। কিন্তু সেটা বলে আমি স্পয়েলস্পোর্ট হতে চাইনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একবার চেক করে নিলেই ভালো হত।”

“মানে এক্ষেত্রে সিলিন্ডারটা শেষ মুহূর্তে ঘোরাতে ভুল হয়ে গেছে?”

“অথবা ইচ্ছে করে ঘোরানো হয়নি। কিন্তু…” বলে থেমে গেলেন আর্থার।”কিন্তু কী?”

“আমি বহু প্রাণী শিকার করেছি মিস্টার মুখার্জি। মারা যাবার ঠিক আগের মুহূর্তে তাদের চোখের দিকে তাকিয়েছি। সবার চোখে দুটো জিনিস দেখেছি। ঘৃণা আর আতঙ্ক। কিন্তু এই নন্তুর কেসটা ওয়াজ সামথিং ডিফারেন্ট। গুলি করার ঠিক আগে ওর চোয়াল নড়ে উঠেছিল। যেন কিছু কামড়াচ্ছে। আর তারপরেই ওর চোখে যেটা দেখতে পেলাম তা হল বিস্ময়। অপার বিস্ময়। তখন আর কিছু করার নেই। গুলি বেরিয়ে গেছে। নন্তু ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর কাছে গেলাম। মুখ হাঁ। মুখের ভিতরটা, জিভ, কুচকুচে কালো, গুঁড়ো গুঁড়ো কিছুতে ভরা।”

“এ কথা আপনি আগে বলেননি তো মিস্টার স্মিথ!” হার্পার অনুযোগ জানালেন। 

“বিকজ ইউ নেভার আস্কড।”

.

হাতের গেলাস রেখে আর্থার স্মিথ যেমনভাবে উঠে দাঁড়ালেন, তার একটাই মানে, “আপনারা এখন আসুন।”

তারিণী ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, “কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা?”

“আবার কীসের প্রশ্ন?” আর্থারের মুখে এবার স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।”এই তো বললে যে শেষ প্রশ্ন। তারপরেও আবার কী?”

“শেষ না। একেবারে প্রথম প্রশ্নের জবাব এখনও পেলাম না। টেলর সাহেব আচমকা আপনাকে এমন দুষ্প্রাপ্য একটা বই উপহার দিলেন কেন? কেনই বা তিনি বলেছিলেন, ‘আই ও ইউ? কী এমন উপকার করেছিলেন আপনি তাঁর?”

আর্থারের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি দেখা গেল। এমনটা ঠিক কেউই আশা করেননি।

“তাহলে আপনারা সত্যিটা জানতেই চান? দেন লেটস টক অ্যাবাউট দ্য এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম। মরা লোকের নামে নিন্দা করতে নেই, বাট রিচার্ড ওয়াজ অ্যান আউট অ্যান্ড আউট উত্তম্যানাইজার। অ্যাডিক্ট-ও বলতে পারেন। সেদিন পার্টিতে ও আমাকে জনান্তিকে জানায়, ইন্ডিয়াতে ফিরে ওর খুব গরম লাগছে। গা ঠান্ডা করতে একজন নেটিভ উওম্যান প্রয়োজন। দ্যাট টু, ইন দ্যাট ভেরি নাইট। আমি ওকে আশ্বস্ত করি, আজ রাতেই একটা ব্যবস্থা হবে। ও বাংলোয় চলে যায়। যাবার আগে ওই কথা বলে। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওই বইটাও পরের দিন উপহার হিসেবে পাঠায়।”

“তার মানে রাতারাতি ব্যবস্থা হয়েছিল?” তারিণী জানতে চায়।

“ইয়েস। আগে ওই লেডিজ হোমের মেয়েরা অ্যাভেলেবল ছিল। কিন্তু দ্যাট বিচ, আরিএল্লা আসার পর থেকে তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমাকে সান্তালদের পাড়া থেকে একটা ব্যবস্থা করতে হয়।”

.

একটা ভয়ানক সম্ভাবনার কথা প্রিয়নাথের মনে পাকিয়ে উঠছিল, কিন্তু সেটা জমাট বাঁধার আগেই তারিণীই সেই প্রশ্নটা করে ফেলল, “সান্তাল? হু?”

“বুধনী, দ্যাট ডেড বেদিয়া গার্ল।”

.