১১. সংকেত
ঘরে ফিরতেই মাখন হিঙ্গনবালার দুর্দশার ফিরিস্তি নিয়ে বসল।
“দেখুন না, যদি গণপতিবাবুকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতে পারেন। একবার দারোগাবাবুকে বলে দেখলে হয় না? উনি আপনার কথা খুব মানেন।”
তারিণী উত্তর দিচ্ছিল না। তার মনের এক অংশ বিশ্বাস করতে চায় গণপতি নির্দোষ, কিন্তু চার্জশিটে যেভাবে একের পর এক প্রমাণ রয়েছে গণপতির বিরুদ্ধে, সেটাই বা সে কী করে অস্বীকার করে? তারিণী নিশ্চিত, গণপতি সত্য গোপন করছে। কিন্তু কেন? কাউকে আড়াল করতে? কাকে? তবে কি পুলিশের ধারণাই ঠিক? গোপনে গণপতি বিপ্লবীদের সঙ্গে ষড় করেছে?
এসব ভেবে ভেবে মাথা গরম হয়ে গেল তার। রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না তারিণীর। বিছানা থেকে উঠে পড়ল সে। মাখন আর খোকা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। তারিণী উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কার্তিক মাসের এই পাথুরে ঠান্ডাতেও তার গরম লাগছে। জানলার একটা পাল্লা খুলে সে তাকিয়ে রইল বাইরের অন্ধকারের দিকে। তামাটুলির বিরাট পাহাড়গুলো আবছা জ্যোৎস্নায় যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ঘিরে রয়েছে মাঝের এই সমতল অংশটুকুকে। বাঁদিকে বিস্তীর্ণ বনভূমি। তাকে পিছনে রেখেই তৈরি হচ্ছে পুলিশের নতুন সদর দপ্তর। বেঁচে থাকলে টেলর সাহেবই হয়তো এর উদ্বোধন করতেন। পাশেই ছোট্ট পাঠশালা। তারিণী শুনেছে এটিকে নাকি সরিয়ে সাঁওতাল গ্রামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। উলটো দিকেই খানিক দূরে বিরাট দৈত্যের মতো মাথা উঁচিয়ে রয়েছে গথিক চার্চখানি। এরই এক এঁদো ঘরে বন্দি গণপতি। কী জানি, রাতের খাবার জুটেছে কি না। চার্চের প্রায় গায়েই ছোটো হাসপাতাল আর এলা ম্যাডামের হোম। তারিণী যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে গোটা তামাটুলি এক বিরাট সিল্যুয়েটের মতো দেখাচ্ছে। স্তূপ স্তূপ অন্ধকার যেন চাঁই বেঁধে রয়েছে এদিক ওদিকে।
প্রথম যখন আলোটা দেখতে পেল তারিণী, ভাবল চোখের ভুল। স্থির তাকিয়ে রইল জমাট আঁধারের দিকে। খানিক বাদে আবার একটা আলো পাঠশালার পাশ থেকে ঝিকিয়ে উঠেই বন্ধ হয়ে গেল। যদি এটা সংকেত হয়, তবে নিশ্চিত এর বিপরীত সংকেত আসবে। তারিণী ঠিক উলটো দিকে তাকাল। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। চার্চের দিক থেকে একটা আলোর রশ্মি দপ করে জ্বলেই বন্ধ হয়ে গেল। তারপর আবার। কেউ যেন ঢাকা লন্ঠনের ঢাকনা খুলছে আর বন্ধ করছে।
তারপরেও প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করল তারিণী। ফ্যাকাশে চাঁদ ডুবে গিয়ে চারিদিকে প্রগাঢ় তমসায় কিছু ঠাহর করা মুশকিল। এদিকে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। জানলা বন্ধ করে তারিণী বিছানায় ফিরে গেল।
.
পরদিন উঠতে বেশ দেরিই হল তার। মাখন এসে জানালে প্রিয়নাথ তাকে খুঁজছেন। কোনওমতে তৈরি হয়ে মুখে দুটো গুঁজে বেরোতে বেরোতে তারিণী দেখল, সূর্য প্রায় মধ্যগগনে। প্রিয়নাথের মুখ গম্ভীর। থমথমে।
“কাল রাতে কিছু টের পেয়েছিলে?”
তারিণী অবাক। কীসের কথা বলছেন প্রিয়নাথ?
“অবশ্য এত দূর থেকে টের না পাবারই কথা। ভোররাতে চার্চে আগুন লেগেছিল।”
“কী বলছেন? আবার আগুন?”
উপরে নিচে মাথা নাড়লেন প্রিয়নাথ।
“তারপর?”
“চার্চের পিছন দিকের যে ঘরটাতে গণপতিকে রাখা হয়েছে, ঠিক তার পাশের ঘরে আগুন লেগেছিল। সত্যি বলতে কী, গণপতিই প্রথম ধোঁয়ার গন্ধ পায়। সে চিৎকার করে দরজা ধাক্কাতে থাকে। ভাগ্য ভালো, গণপতির দরজার সামনে যে সিপাইটা ঘুমোয় তার ঘুম পাতলা। সে-ই সবাইকে ডেকে আগুন নেভায়। কিন্তু ঘরের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সব ছাই হয়ে গেছে।”
“কী ছিল সেই ঘরে?”
“গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। গুদোমঘর জাতীয় ঘর।”
“আগুন কীভাবে লাগল বোঝা গেছে?”
“একটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। একেবারে আধুনিক জিনিস। বোতলে দাহ্য পদার্থ ভরে, মুখে পলতে লাগিয়ে, আগুন ধরিয়ে উপরের ফুটো দিয়ে ঘরে ছুড়ে মারা হয়েছে। সারা ঘরে কাচের টুকরোটাকরা পাওয়া গেছে।”
“এমন জিনিসের কথা তো আগে শুনিনি!”
“না শোনারই কথা। এ জিনিসের ব্যাপারে আমাদের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট সদ্য জেনেছে। ইতালিতে নাকি বিপ্লবের সময় বিদ্রোহীরা এই বোতল বোমা ব্যবহার করে। সশস্ত্র বিপ্লবীদের খুব প্রিয় এই অস্ত্র। খরচা কম। ক্ষতিও বেশি। সে জিনিস আমাদের দেশেও ঢুকে পড়েছে, তা জানা ছিল না।”
“কিন্তু চার্চে বোমা মেরে বিপ্লবীদের কী লাভ?”
“এক হতে পারে প্যানিক তৈরি। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমার ধারণা বিপ্লবীদের কাছে নির্দিষ্ট খবর ছিল। অকারণে তারা এই কাজ করেনি।
“কিন্তু আপনিই তো বললেন, ঘরটায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। সেই ঘরে…”
“সেই ঘর গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্ব ঠিক তার পাশের ঘরের, যে ঘরে গণপতিকে রাখা হয়েছিল।”
এক ভয়ানক কুৎসিত সম্ভাবনার কথা ভাবতেই তারিণী শিউরে উঠল। বাইরে থেকে দুটো ঘরের তফাত করা মুশকিল। দুটোরই মাথায় একটা করে ঘুলঘুলি। রাতের অন্ধকারে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক।
“যদি গণপতি বিপ্লবীদের কার্যকলাপ নিয়ে কিছু জেনে থাকে, তবে গতকাল আমি যাবার পর তাদের সন্দেহ হতেই পারে যে সে পুলিশকে কিছু জানিয়ে দিয়েছে। আর ওরা শত্রুর শেষ রাখে না। আমি এখন একশো শতাংশ নিশ্চিত, এর পিছনে স্বদেশিদের হাত আছে।”
“গণপতি কোথায়?”
“আপাতত চার্চের ভিতরের দিকে একটা ঘরে ডবল প্রোটেকশান দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু যা বুঝছি, ওকে আর বেশিদিন এখানে রাখা নিরাপদ না। ডিপোর্ট করতেই হবে। আমি জিরনিয়ার সঙ্গে আজই কথা বলব। কিন্তু সমস্যা হল, একবার ডিপোর্ট করলে ব্যাপারটা আমাদের হাতের বাইরে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু এখন যা বুঝছি, সেটাই হয়তো ভালো হবে। এখানে তো ডেড লক অবস্তা। তুমি কিছু বুঝতে পারলে?”
“আপনি আমাকে তিনটে দিন সময় দেবেন? আর, কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিতে হবে। দরকার হলে আপনার সামনেই কথাবার্তা হবে। তারপরেও আমি কোনও রাস্তা খুঁজে না পেলে আপনি যা চাইবেন, করবেন।”
“তিনদিন এমনিতেই লাগবে। কিন্তু তারপর আর এক মুহূর্ত না। আবার বলছি, গণপতি বিপ্লবীদের বাঁচাতেই পারে, কিন্তু তাহলে ওকে মরতে হবে। কিছু করার নেই।”
তারিণী পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে প্রিয়নাথের হাতে দিল।”এটা কী?”
“যাঁদের সঙ্গে কথা বলব তাঁদের নাম। আমি কালই দিতাম। সাহস করে উঠতে পারিনি।”
“বেশ।”
“আর একটা কথা। কাল রাতে আমারও এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে। শুনুন তবে …”
.
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে পুলিশ স্টেশনের সামনে আসার পর তারিণী দেখল, হার্পার সাহেব উত্তেজিতভাবে নেটিভ ভাষায় এক সিপাইকে বকাবকি করছেন, “বাইঞ্চত, তুমহারা খোই আকাল নেহি হ্যায়? ইউ শুয়ার কে বাচ্চে! ইউ ড্যাম ফুল! টুম পাক্কা হারামি হ্যায়। হাম তুমহারা নোকরি খায়েগা।”
আর সে বেচারিও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রিয়নাথদের দেখে সাহেবের গালিবর্ষণ বন্ধ হল। প্রিয়নাথ”কী হয়েছে সাহেব?” জিজ্ঞাসা করাতে জানা গেল, টেলর সাহেবের রক্তমাখা পোশাক থানার এভিডেন্স রুমে ছিল। কিন্তু এই ঘর পাহারা দেয় যে দেহাতি সিপাই, তার বড়ো ভূতের ভয়। রাতের বেলা নাকি ওই ঘর থেকে অদ্ভুত সব আওয়াজ শোনা যায়। একদিন রাতে থানার আশেপাশে সে কোট পরা অচেনা এক সাহেবের ভূতও দেখেছে। বাধ্য হয়ে সিপাইটি চার্চের ফাদারকে বলেছিল, এই জামাকাপড়ে একটু হোলি ওয়াটার ছিটিয়ে দিতে। ফাদার রাজিও হয়েছিলেন। গতকাল সন্ধ্যায়, যখন থানায় কেউ ছিল না, সেই পুঁটলি নিয়ে সিপাইটি চুপিচুপি চার্চে গেছিল। ফাদার চার্চে ছিলেন না। অগত্যা সে গণপতির ঘরের সামনে পাহারারত সিপাইকে বলে পুঁটলিটি চার্চের গুদামঘরে রেখে এসেছিল। ভেবেছিল অন্য কেউ টের পাবার আগে আজকেই গিয়ে জল ছিটিয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু তার আগেই আগুন পরে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
“এভিডেন্স বলতে তাহলে আর কিছু নেই?”
“আছে। সেই বই, সিংহ, কার্পেট, মুখোশ আর ছোরা।”
“মুখোশ আর ছোরাটা দেখা যায়?”
“অবশ্যই।”
পুরু লোহার বিরাট ভল্ট খুলে সাদা কাপড়ে মোড়া একটা পুঁটলি বার করে নিয়ে এলেন হার্পার। খুলতেই যেটা চোখে পড়ল, তা হল কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি হাসি হাসি একটা গালফোলা মুখোশ। উজ্জ্বল হলুদ আর কালোতে মেশানো। চোখ, নাকের জায়গায় ছ্যাঁদা করা। চেহারায় চৈনিক ভাব স্পষ্ট। তবে অন্য মুখোশের মতো শুধু মুখের সামনেটার জন্য না। এ মুখোশ গলা অবধি গোটা মাথাটাই ঢেকে ফেলে।
“এ জিনিস আগে দেখেছেন কখনও?” কাপড়ের মোড়ক সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন হার্পার।
“আরেহ! এ তো প্যাপিয়ার ম্যাসে। কাগজের মণ্ড আর আঠা দিয়ে বানিয়ে তাতে রং করে তৈরি। কলকাতায় চিনা সার্কাসে খুব দেখা যায়।” বললেন প্রিয়নাথ। তারিণী হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখছিল মুখোশটা। ভিতরে উঁকি মেরে বলল, “এদিকে দেখুন দারোগাবাবু।”
ভিতরে তুলি দিয়ে কালো চিনা অক্ষরে কী সব যেন লেখা।
“আপনি ঠিকই বলেছেন। এ জিনিস চিন থেকেই এসেছে”, বললেন হার্পার।
“হ্যাঁ, আর টেলর সাহেবও”, বলেই তারিণী কেমন একটা চুপ মেরে গেল। প্রিয়নাথ দেখলেন, তারিণী হাঁ করে সেই ছোরার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে যে বিস্ময় প্রকাশ পাচ্ছে, তা অচেনা বস্তু দেখার বিস্ময় না। বরং আকস্মিকভাবে কোনও বস্তুকে চিনে ফেলার বিস্ময়। প্রিয়নাথের মনে পড়ল, খুব ছোটোবেলায় একবার নদিয়ার রাস্তায় তিনি হাতি দেখেছিলেন। প্রাণীটির বিরাট আকারের চেয়েও এই প্রাণী যে বইয়ের পাতার বাইরে অবস্থান করতে পারে, সে চিত্তাই তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছিল। তারিণীর চোখে মুখে অবিকল সেই ভাব।
“কিছু বলবে তারিণী?”
“এ তো… এ তো… গুস্তাভ ফেলিক্স!!!”
“একটু বুঝিয়ে বলো।”
“আশু মুখুজ্যের জয় হোক। তাঁর বাড়িতেই ছোরাছুরির এক বিশ্বকোশ রয়েছে। তাতেই ফেলিক্স সাহেবের নাম পড়ি। জার্মান। সবচেয়ে পুরোনো ছোরাছুরির কারবারি। এককালে তাঁর ওসিক নাইফের বাজারে বিরাট কদর ছিল। তিনি মারা যাবার পর একশো বছর ধরে তারা আর ওসিক লাইফ বানায় না। আমি এর নামই শুনেছি। ছবিই দেখেছি। সামনে এই প্রথম দেখলাম।”
দুই দিকের ধারালো ছোরার অর্ধেকের বেশি কালচে রক্ত মাখা। তারিণী বীটের দিকে দেখিয়ে বলল, “এই বাঁটটা ভালো করে দেখুন। কীসের তৈরি জানেন?”
প্রিয়নাথ ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলেন। দেখাদেখি হার্পারও।
“চকচকে বাদামি রঙের গালার মতো কিছু একটা। মধ্যে আবার সোনালি ছিট ছিট। এদিকে বেশ মজবুত মনে হচ্ছে। ফলে গালা তো না। কী এটা?”
“এটাকেই বলে ওসিক। উত্তরের সেই আলাস্কায় এস্কিমো নামের এক জাতি থাকে। তারা যে সিন্ধুঘোটক শিকার করে তার লিঙ্গের হাড় থেকে এই বাঁট বানায়। ফেলিক্স সাহেবই প্রথম সলিঞ্জেনে নিজের কারখানায় ওসিকের বাঁটের ছুরি বানানো শুরু করেন। এখন আর বানানো হয় না। এই দেখুন, ছুরির ফলায় এই ওলটানো বাটির মতো অদ্ভুত চিহ্ন। আমার ধারণা যদি সঠিক হয়, এই ছোরা ফেলিক্স সাহেবের নিজের হাতে ঢালাই করা। অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য।”
“সেই ছুরি তামাটুলিতে এল কীভাবে?” হার্পার প্রশ্ন করতেই প্রিয়নাথ একটা কেঠো হাসি হেসে বললেন, “বুঝতে পারছেন না সাহেব? এই ছুরি, ওই বোতল বোমা, সবই বিদেশ থেকে আসা প্রযুক্তি আর অস্ত্র। আমরা যেটা সন্দেহ করছিলাম, এখানে লুকিয়ে থাকা বিপ্লবীদের পিছনে জার্মানি, ইতালি কিংবা চিনের মদত আছে। যতদিন যাচ্ছে সে সন্দেহ আরও দৃঢ় হচ্ছে। আমি একটা বিরাট আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাচ্ছি। ব্যাপারটা যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক জটিল। কাউকে সন্দেহের আওতার বাইরে রাখা যাবে না। কাউকে না।”
.
