২০. ন্যাস
মাদাম এলার মৃত্যু হয়েছে প্রায় দিন চারেক হয়ে গেল। মাত্র সাতদিনের মধ্যে পরপর চারটি অস্বাভাবিক মৃত্যুতে গোটা তামাটুলি এখনও শোকস্তব্ধ। গণপতি ছাড়া পেয়েছে। প্রিয়নাথকে প্রায়ই জিরনিয়া যেতে হচ্ছে নানা দরকারে। বম্বে আর কলকাতা থেকে খবর এসেছে। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার খগেন্দ্রনাথ নিজের সম্পর্কে যা যা বলেছে, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। বিপ্লবীদের সঙ্গে তার দূরদূরান্তে কোনও যোগাযোগ নেই। ইংরেজ বাহাদুর সেটাই জেনেছেন, যেটা তাঁদের জানানো হয়েছে। মাদাম এলার লিখিত জবানবন্দিতে তিনি শুধু এটাই লিখেছেন, টেলর তাঁর সম্মানহানি করতে গেছিল, তাই তিনি টেলরকে খুন করে লজ্জায় আত্মহত্যা করেছেন। টেলরের মহিলালোলুপতার কথা সরকারি মহলে জানা ছিল। তারাও এই নিয়ে বিশেষ নাড়াঘাঁটা করতে চায়নি। এতে আখেরে সরকারেরই বদনাম আপাতত তামাটুলির নতুন সুপারিনটেন্ডেন্ট কে হবেন, তা ঠিক হয়নি। অনেকে বলছেন, হার্পার সাহেবকেই হয়তো দায়িত্ব নিতে হবে। দালান তৈরির কাজ অবশ্য চলছে পুরোদমে। সকালে তারিণী গিয়ে খানিক সেই কাজ দেখে মিস্তিরিদের সঙ্গে গল্পও জুড়ে এসেছে।
জমিদারবাড়িতে গণপতির দলে সাজ সাজ রব। খবর এসেছে প্রিয়নাথ বোস এবার সার্কাস নিয়ে রেঙ্গুন যাবেন। দলের সবাইকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতা পৌঁছোতে হবে। সবাই বাক্সপ্যাঁটরা গোছাচ্ছে, গণপতি তদারক করছে, এমন সময় তারিণী এসে হাসিমুখে দাঁড়াল।
“চলে যাচ্ছ ভাই?”
“হ্যাঁ। জানি না আবার কবে দেখা হবে। তবে তোমায় অশেষ ধন্যবাদ। তুমি না থাকলে এতদিনে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে ঝুলতে হত। বুকে এসো ভাই।” গণপতি তারিণীকে জড়িয়ে ধরলে। পাশেই হরিমতী ছিল। সুযোগ বুঝে সেও টিপ করে তারিণীকে একটা প্রণাম ঠুকল।
“সাবধানে যেয়ো। আর হ্যাঁ, যাবার আগে আমার সেই প্রশ্নটার জবাব দিয়ে যাও গণপতি। মনে শান্তি পাই।”
“কোন প্রশ্ন?”
“সেই যে শেষের দিন তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম। কীভাবে ক্যাচিং দ্য বুলেট দেখানো হয়, তা আমি প্রথম দিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। তুমি বলোনি। পরের দিন বিপিন বলার পর বললে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আগে বলোনি কেন? সেই প্রশ্নটা।”
“হেহ! এর আর কী জবাব দেব? বলিনি, তার কারণ ম্যাজিশিয়ানদের নিজেদের ম্যাজিকের তুক বলতে নেই। সবাই সব জেনে গেলে মুশকিল।”
“তা বলে যখন নিজের জীবন অবধি যেতে পারে, তখনও তুমি বলবে না! আর আমরা তো ম্যাজিশিয়ান নই যে শিখে নেব। এই তো বিপিন বলল। ও না বললে তো বুঝতেই পারতাম না।”
“কী বুঝতে পারতে না?”
“এই যে তুমি নন্তুর খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ প্রথম থেকে।”
“কী বলতে চাইছ তুমি?” হিসহিসিয়ে বলে উঠল গণপতি।
“হিঙ্গন মানে হরিমতীর সঙ্গে সুশীলার একদম বনে না। সে দুঃখ করে আমার স্ত্রীকে বলেছে। এও বলেছে, সার্কাসে সে টিকেই আছে তোমার জন্যে। তুমি সার্কাস ছাড়লেই হরিমতীকে আবার সেই আগের অনিশ্চিত জীবনে ফিরে যেতে হবে। সে তো পালাতেও পারবে না। সব ঠিকঠাকই চলছিল। সমস্যা হল এই তামাটুলিতে এসে। জানা গেল নন্তু আসলে পুলিশের চর। সে তোমাকে লোভ দেখাল। তুমিও লোভে পড়ে গেলে। সার্কাস ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবার কথা ভাবলে। হিঙ্গন সিঁদুরে মেঘ দেখল। সে এত ভাবতে পারে না। সে শুধু নিজের সামান্য ভালো থাকাটুকু বুঝতে পারে। সে বুঝল তুমি চলে গেলে তার সমূহ বিপদ আর এই বিপদের কারণ নস্তু। চট করে ভেবে একটা উপায়ই তার মাথায় এল। আর নন্তুর দুর্ভাগ্য, নন্তু নিজেই নিজের সে বিপদ ডেকে আনল।
সেদিন টেলরের সঙ্গে দেখা না করতে পারায় তুমি যখন নন্তুকেই খেলা দেখাতে বললে, হরি দেখল এই তার শেষ সুযোগ। নন্তু কোনও দিন খেলা দেখায় না। কাঠের বাক্স থাকে হরিমতীর কাছে। আমি নিশ্চিত সে-ই গুলি বদলে দিয়েছিল।”
হরিমতীর মুখ ফ্যাকাশে রক্তশূন্য হয়ে গেছে। যেন এখুনি অজ্ঞান হয়ে পড়বে গণপতি কাঁপা গলায় বলল, “কেউ দেখেনি, কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখলাম, হরি অম্লানবদনে বাক্স থেকে গুলি বার করে নন্তুর হাতে দিল। নস্তু হরিকে অবিশ্বাস করতে পারেনি। যেই মুহূর্তে গুলি নন্তুর কপাল ভেদ করে গেল, আমি বুঝে গেলাম কী হয়েছে। এই মেয়েরা অদ্ভুত জাত ভাই! ভালোবাসার জন্য প্রাণ দিতেও পারে, আবার নিতেও পিছপা হয় না। আমি কী করব বলো? এর নাম বলে দেব? এ কি সম্ভব?”
“কী জানি, আমিও তোমার জায়গায় থাকলে এটাই করতাম কি না। তবে তোমাদের ভয় নেই। পুলিশ এই কেসে বিপ্লবীদের কোনও অ্যাঙ্গেল খুঁজে পায়নি তাই নন্তুর মৃত্যু তাদের কাছে দুর্ঘটনা মাত্র। আমি শুধু গোটা ছবিটার হারিয়ে যাওয়া টুকরোগুলোকে খুঁজে বার করছি। নিজের শখেই। কাউকে জানিয়ে বাহবা নেব বলে নয়।
.
সেদিন বিকেলেই গণপতিদের গোটা দল কলকাতার দিকে রওনা হল। তারিণী, জমিদারবাবু, মাস্টারমশাই সহ অনেকেই এসেছিলেন বিদায় জানাতে সবাই ফিরে গেলে দাঁড়িয়ে রইল শুধু খগেন আর তারিণী। আচমকা তারিণী বলল, “আচ্ছা মাস্টারমশাই, আপনি উত্তমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসেন?”
লাজুক হাসি হেসে খগেন বলল, “তাই তো মনে হয়।
“বিয়ে করবেন ওকে?”
“করব।”
“ও তো খ্রিস্টান। সমস্যা হবে না?”
“সমস্যা আর কোথায়? আমার তিন কুলে কাছের মানুষ আর কেউ নেই। বাকি জীবন এই তামাটুলিতেই থাকব। এখানে আপনাদের শহুরে বাবুদের মতো এত জাতপাতের বিচার নেই।”
“আচ্ছা। তবে এটা বলুন দেখি, আপনি গভীর রাতে কেন আলো জ্বেলে সংকেত দেন?”
খগেনের মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল।
“আচ্ছা ঠিক আছে। ছাড়ুন। এটা বলুন দেখি, কিছুদিন আগে দালান তৈরির সময় একজন সাঁওতাল মেয়ে পড়ে যায়। শ্রমিকরা দৌড়ে আসে। গণপতিরাও এসেছিল। আপনিও কি দৌড়ে এসেছিলেন?”
“আজ্ঞে না। কিছু একটা ভুল হচ্ছে। আমি উলটো দিক থেকে আসছিলাম। আমার ঠিক সামনেই মেয়েটি উলটে পড়ে। আমি খোঁড়া মানুষ, একা কী করে ওঠাব? কুলি কামিনরা দৌড়ে এসে ওকে তুলে ধরে। তারও কিছু বাদে গণপতিরা এসে পৌঁছোয়।”
“অনেক ধন্যবাদ। এটাই শুনতে চেয়েছিলাম। আচ্ছা আসি।” বলে তারিণী যখন দ্রুতপদে পা বাড়াল, পিছনে খগেন তখনও তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
জমিদারবাড়িতে নিজের ঘরে ঢুকে তারিণী দেখল, মাখন প্রায় সব কিছুই গুছিয়ে রেখেছে। প্রিয়নাথ জানিয়েছেন তাঁদের তামাটুলিতে থাকার মেয়াদ শেষ। কাল সকালেই কলকাতার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়বেন তাঁরা। মাখন খোকাকে একটা লাল আলোয়ান দিয়ে জড়িয়ে নাচিয়ে নাচিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে আর গল্প করছে। উত্তমা এসেছে দেখা করতে।
“দিদি, আবার আসবে তো?”
“দেখি, তোমার জামাইবাবু যদি আবার আনেন। তার চেয়ে তুমিই একবার ঘুরে এসো কলকাতায় আমাদের বাড়িতে। আপনি একটু আমাদের ঠিকানাটা ওকে দিয়ে দিন না!”
“দেব”, বলল তারিণী।”তবে একটা শর্তে। উত্তমাকে আমার একটা প্রশ্ন আছে। একেবারে সত্যি কথা বলতে হবে। কথা দিচ্ছি কেউ জানবে না। দরকার হলে আমি মাখনকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
“দরকার নেই। কী প্রশ্ন বলুন?”
“তুমি রাতারাতি জার্মান মাউজার বন্দুকটা কোথায় লুকালে?”
উত্তমার মুখে একটি পেশিও কোঁচকাল না। খানিক চুপ করে থাকার পর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি দেখা দিল।
“ধরে ফেলেছেন? আমি জানতাম আপনি পারবেন। কী করে ধরলেন?”
“একে তো খগেন বলছে রাতে সে কোনও সংকেতের কথা জানে না। কিন্তু তুমি নিজে স্বীকার করেছ তুমি সংকেত পাঠাও। কাকে? তোমার সঙ্গে সরলা বলে যে মেয়েটি থাকে, তার পক্ষে মাউজার পিস্তল না দেখলে ক্যাটালগ দেখে চিহ্নিত করা অসম্ভব। কিন্তু সে করেছে। সুতরাং সে পিস্তল তো আছে। কল্পনা না। কিন্তু কোথায়? আর তখনই আমার মনে পড়ল নন্তুর সেই বিপ্লবীকে চিনে নেওয়ার দিনের কথা। পুলিশের বয়ান আর বিপিনের বয়ানে সমস্যা ছিল। পুলিশ বলে সাঁওতালকে পড়ে যেতে দেখে মাস্টার দৌড়ে আসেন। কিন্তু তিনি খোঁড়া মানুষ। লাঠি নিয়ে চলেন। দৌড়োবেন কী করে? তিনি তো আগেই সেদিকপানে আসছিলেন। তখন তো নস্তুর কিছু মনে হয়নি। আসলে নন্তু সেই বিপ্লবীকে দৌড়ে পালাতে দেখেছিল পিছন থেকে। ওর মাথা পরিষ্কার। দৌড়োনোটা মনে রেখে দিয়েছিল। এ এমন মানুষ, যে হাঁটে স্বাভাবিকভাবে, কিন্তু দৌড়োনোর সময় ল্যাংচায়। মানে একটাই। সেই কুলি কামিনদের মধ্যে কেউ। কিন্তু কে? বার করতে বেশি সময় লাগবে না। বিহারি কুলিদের মধ্যে খুব বেশি অন্য জাতের লোক নেই। একজনই আছে। কেউ বলে সে মারাঠি, কেউ বলে বাঙালি। আজ সকালেই এক কামিন আমায় বলল। সে যে কে, কেউ জানে না। তুমি জানো?”
“জানি। আমার হারিয়ে যাওয়া দাদা। ইনিই গিরীন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত নামে ডেভিড ভাইদের খুন করেছিলেন। ওর আসল নাম শচীন। তামাটুলিতে আমি আছি, এই খবর ওর কাছে ছিল। তাই কুলি সেজে এখানে এসেছে। মাঝে মাঝে রাতে আলোর সংকেত পাঠায়। আমি লুকিয়ে খাবারদাবার দিয়ে আসি। সেদিন ও-ই আমায় বলল, পুলিশের খোচর আছে আশেপাশে। বন্দুকটা লুকিয়ে রাখতে।”
“সে বন্দুক কোথায়?”
খিলখিল করে হেসে উত্তমা বলল, “তা আমি কেমন করে বলব? সে তো আপনি আমায় বলবেন।”
“রহস্য কোরো না উত্তমা। জানো, আমি এখনও তোমায় পুলিশে দিতে পারি? পুলিশ স্বদেশিদের হন্যে হয়ে খুঁজছে।”
“সে আর জানিনে? কিন্তু আপনি আমায় পুলিশে দেবেন না। আমি জানি ।”
“পিস্তল কোথায়?”
“এমন একজনের কাছে গচ্ছিত রেখেছি, যার নাগাল পাওয়া আপনার পক্ষে অসম্ভব।”
“তুমি বলবে কি না বলো।”
উত্তমা চোখের ইশারা করতেই লজ্জা লজ্জা মুখে খোকার জামাকাপড়ের পুঁটলি থেকে খয়েরি বাঁট আর কালচে লম্বা নলের মাউজার সি ৭৮ ওবেরনডর্ফ রিভলভারটা বার করে দিল মাখন।
“আগের দিন এটা গচ্ছিত রাখতেই এসেছিলাম। কি? এবার খুশি তো?”
তারিণী কোনও জবাব দিল না। শুধু মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
.
উপসংহার
“ভাই তারিণী,
এই চিঠি যখন তোমার কাছে পৌঁছোবে, তখন আমি রেঙ্গুনের পথে। এখানে এসে অবধি নানা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। দাদার সঙ্গে প্রিয়নাথবাবুর নানা অর্থনৈতিক কারণে সংঘাত বেধেছে। ফলে সার্কাসে এখন স্পষ্টই দুটি দল। একটি মতিলালের আর অন্যটি প্রিয়নাথের। সুশীলার সেই আগের বোলবোলাও অনেকটাই কমেছে। তবে আশা রাখি, একদিন আমি আর হরিমতী মিলে নতুন দার্কাসের দল খুলতে পারব।
যে কথা বলতে তোমায় এই চিঠি লেখা। শুধুমাত্র হরিকে আড়াল করার জন্য আমি নীরব ছিলাম না। তামাটুলিতে আচমকা আমার যাওয়া, সেখানে থেকে দালানের অগ্রগতি দেখার পিছনেও এমন একটি চালিকাশক্তি ছিল, যা এই চিঠিতে লেখা সম্ভব নয়। মায়ের আদেশ বলে ধরে নিতে পারো। যখন দেখলাম বিনা অপরাধে আমারই এক ভাইকে এক হিংস্র হায়না আক্রমণে উদ্যত, তখন আমাকে তো কিছু করতেই হত, বলো। ভাইকে রক্ষা তো ভাইয়েরই কর্তব্য।
তুমি হরিকে ক্ষমা করে দাও। হাতের কারসাজি ওর হলেও অজান্তে ও আমার আজ্ঞাই পালন করেছে বলে বিশ্বাস রেখো। বউঠানকে প্রণাম আর খোকাকে আমার প্রাণভরা ভালোবাসা জানিয়ো।
ইতি তোমার বন্ধু,
শ্রী গণপতি চক্রবর্তী
গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস”
.
ঋণ:
১। ড্যাঞ্চিনামা: পরিমল ভট্টাচাৰ্য্য (অবভাস)
২। ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব: ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায় (র্যাডিকাল ইম্প্রেশন)
৩। যাদুকাহিনি: অজিতকৃষ্ণ বসু (রূপা এন্ড কোং)
৪। A is for Arsenic : Kathryn Harkup (Bloomsbury)
