নবম অধ্যায়—কেউ দূরে নেপথ্যের থেকে
শ্রী কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য বৈঠকখানায় বসে একটা বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিল। নলিনীবাবুকে দেখে শশব্যস্তে উঠেই তারিণীকে দেখতে পেয়ে তার মুখ সহসা রক্তশূন্য হয়ে গেল। তারিণীর মতো নলিনীও সেটা খেয়াল করলেন। কুমুদ অপ্রস্তুত হয়ে হাতজোড় করে হালকা একটা প্রণাম ঠুকল।
“বোসো কুমুদ। এলে কবে?”
“আজ্ঞে গতকাল। বিশেষ প্রয়োজন ছিল। তাড়াতাড়ি আসতে হল।”
“ঘুম স্টেশনে কাল কী হয়েছিল?”
“কিছু না। কিছু হয়নি তো! আমার কিছু ব্যক্তিগত কাজ ছিল, তাই ঘুমে নেমে গেসলাম।”
“ভাই কী? কিন্তু আমি যে অন্যরকম শুনলাম।”
চোখের দৃষ্টিতে ভস্ম করা গেলে তারিণীর ছাইটাও বোধহয় খুঁজে পাওয়া যেত না। রোষকষায়িত নেত্রে তারিণীর দিকে তাকিয়ে কুমুদ বললে, “আপনাকে কোন অজ্ঞাতকুলশীল কী বলছে সেটাতে বিশ্বাস করবেন, নাকি আপনার ভাবী জামাতার কথা মানবেন, সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার মেসোমশাই। আমি কী বলতে পারি?”
ঢোলা ফতুয়ার পকেট থেকে কুমুদের চামড়ার হাতব্যাগটা বার করে সামনে বাড়িয়ে দিলেন নলিনীকান্ত।”এই ব্যাগখানা কল্যাণী তোমায় উপহার দিয়েছিল। এই অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তির কাছে এ হাতব্যাগ কেমন করে গেল যদি বলতে। আর হ্যাঁ, সঙ্গে তোমার চোখের তলায় এই কালশিটে দাগটার জন্যেও যে মিথ্যেটা তৈরি করে রেখেছ, সেটাও বলে ফেলো।”
পুলিশি জেরা বুঝি এমনই হয়। কুমুদের প্রতিরোধের বাঁধ ভেঙে গেল। দুই হাতে মুখ চেপে খানিক বসে রইল। তারিণী কিছুটা বিব্রত। নলিনীবাবু কঠিন মুখ করে বসে রইলেন। খানিক বাদে মুখ উঠিয়ে কুমুদ বলল, “সত্যিটা জানলে আপনার চোখে আমি ছোটো হয়ে যাব। সেই ভয়ে এতক্ষণ বলিনি।”
“সত্যিটা না বললে ক্ষতি আরও বেশি। বিচারের ভার আমার। তুমি বলো।” প্রায় ফোঁপাতে ফোঁপাতে কুমুদ যা বলল তার সারসংক্ষেপ এইরকম—
স্ত্রীর সঙ্গে ইদানীং একেবারেই বনিবনা হচ্ছিল না সাহেবের। বাগানের আয় থেকে সাহেব একটা লভ্যাংশ পেতেন। মাসখানেক হল সেটাও বন্ধ করে দেয় ওফেলিয়া। ফলে বাগানের সিনিয়ার ম্যানেজার কাম প্ল্যান্টারের মাইনেটুকু বাদে আর কিছুই জুটত না। এই সামান্য টাকায় সাহেবের চলে না। মদ, মেয়েমানুষের মেলা খরচা। তাই মাঝেমধ্যেই ক্যাশিয়ারবাবুর থেকে টাকা ধার করতে হত। একমাস আগে স্বামী স্ত্রী-তে তুমুল ঝগড়া বাধে। ওফেলিয়া টের পেয়ে যান, জর্জ নয় নয় করে অনেক টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন ক্যাশ থেকে। তিনি সাহেবকে টাকা দিতে স্পষ্ট না করে দেন। এবার সাহেব যেটা করেন, সেটা নিতান্ত অনৈতিক ও বেআইনি। বাগানে প্রায়ই কাঁচা টাকার দরকার পড়ে। জুনিয়ার ম্যানেজার হিসেবে কুমুদ ওফেলিয়ার কাছে গিয়ে ভাউচারে সই করিয়ে সে টাকা উঠিয়ে নেয়। সাহেব এবার কুমুদকে চাপ দিতে থাকে ওফেলিয়ার সই নকল করে ভাউচারে বড় টাকা তুলে নিতে। যেহেতু কুমুদের হাতে খরচের উপায় আছে, সে কোনওভাবে হিসেব দেখিয়ে দিতে পারবে। কুমুদ রাজি হয় না। সাহেব তাকে লোভ দেখান। বলেন এই কাজ করতে পারলে চার আনা কমিশন তার।
“আমি পাপী। লোভের বশবর্তী হয়ে এই কাজ করি। আমিই ওফেলিয়ার সই জাল করে ক্যাশিয়ারের থেকে পাঁচশো টাকা উঠিয়ে নিই। কিন্তু সে টাকা আমি ভোগ করতে পারিনি। আমার কলকাতায় দেশের বাড়ি যাবার সময় হয়েছিল। সাহেব বললেন ওঁর এই মুহূর্তে পুরো টাকাটাই দরকার। আমি ফিরে এলে আমার বখরা আমায় মিটিয়ে দেবেন। আমিও ভালো মনে কলকাতায় চলে গেলান। একদিন টেলিগ্রাম এল। কাম শার্প। আর্জেন্ট। আমিও কোনওমতে দার্জিলিং মেল পরে চলে এলাম। ঘুম স্টেশনে আমার সঙ্গে কী হল, তা তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। আমাকে পরে নিয়ে গেল প্ল্যান্টার্স ক্লাবের একটা ঘুপচি ঘরে। প্রথমে বেধড়ক পেটাল। মোসাহেব নাকি চুরি ধরে ফেলেছেন। সাহেব আর এর মধ্যে জড়াতে চান না। আমাকে গোটা দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে পুলিশে সারেন্ডার করতে হবে। সাহেবের নাম কোথাও করা যাবে না। আমি রাজি হইনি। এই ঘটনা ঘটলে চাকরি তো যেতই, সমাজে মুখ দেখাতে পারতাম না। আর কল্যাণীর সঙ্গে আমার বিয়েটাও…”
কুমুদ আচমকা চুপ করে গেল। নলিনী গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, “থামলে কেন? বলতে থাকো। আমি কর্ণময়।”
“ওই ঘুপচি ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে সাহেব মদ খাচ্ছিলেন আর আমায় বারবার বলছিলেন সারেন্ডার করতে। রাজি না হওয়ায় মাঝে মাঝেই উঠে বুটের লাথি মারছিলেন। একসময় হতাশ হয়ে বললেন, ‘ওকে! বাদ দাও। কোশ্চেন নম্বর দুই। ওফেলিয়া আমাদেরই কোনও এক প্ল্যান্টারের সঙ্গে প্রেম শুরু করেছে। এক গোপন প্রেমিক। আমার কাছে জেনুইন খবর আছে। তার নাম বলো। এদিকটা আমি ম্যানেজ করে নেব।” আমি বললাম, আমি অধস্তন কর্মচারী। এসব
জানব কেমন করে? সাহেব বলেন, পরের বার যখন যাব, যেন চোখকান খোলা রাখি। এমন সময় দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল, সাহেব বাইরে বেরিয়ে কার সঙ্গে যেন খানিক কথা বলে ভিতরে ঢুকে আমায় বললেন, ‘ওয়েল। ইউ মে গো। আওয়ার হেডেক ইজ নো মোর।’ তখন আমি ব্যাপারটা বুঝিনি। পরে বাংলোতে ফিরে খবরটা শুনতে পাই।”
“আপনি আর সাহেব একসঙ্গে কতক্ষণ ছিলেন?” তারিণীর প্রশ্নে চমকে তার দিকে তাকাল কুমুদ। বুঝতে পারছে না কিছু বলবে কি না। নলিনী তাকে এতক্ষণে তারিণীর পরিচয় দিয়ে বললেন, “ইনি শ্রী তারিণীচরণ রায়। কলকাতার নামজাদা প্রাইভেট ডিটেকটিভ।” এই নামজাদাটুকু প্রিয়নাথের সঙ্গে পরিচয়ের ফল। কুমুদ তারিণীর দিকে তাকিয়ে বলে, “ঘুম থেকে কখন বেরিয়েছি, সে তো আপনি জানেন। প্ল্যান্টার্স-এ যেতে যেতে প্রায় আধঘণ্টা। মানে তিনটে। আর ছাড়া যখন পেলাম, তখন সন্ধে হয়েও অনেকটা পেরিয়েছে। এই ধরুন সাড়ে ছটা নাগাদ।”
“এর মধ্যে সাহেব একবারও ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন?”
“নাহ। দুবার শুধু লাগোয়া বাথরুমে গেছিলেন। মিনিটখানেকের জন্য। আমিও গেছিলাম। একবার।”
“এই সাড়ে তিন ঘণ্টা টানা একভাবে বসেছিলেন?”
“হ্যাঁ। বসে বসে মদ খাচ্ছিলেন আর এক কথা বকবক করছিলেন।”
তারিণী হয়তো আরও কিছু বলত, কিন্তু তার আগেই ডাক্তার হান্টার পরে ঢুকে কিছু একটা বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন। নলিনীবাবু কুমুদকে”তুমি এসো” বলে বিদায় করলেন। তারিণীকেও চোখের ইশারায় বললেন ঘরের ভিতর যেতে। যেতে গিয়ে তারিণী খেয়াল করল, তাড়াহুড়োতে এবারও নিজের ব্যাগটা নিতে ভুলে গেছে কুমুদ। কাউকে কিছু না বলে সে নিজেই সেটাকে নিয়ে ভিতরবাড়িতে চলে এল।
ঘরে মাখন একা বসে উদাস নয়নে জানলার দিকে চেয়ে বাইরের কুয়াশা দেখছিল। যে অদ্ভুত মানুষটির সঙ্গে একেবারে সহসাই বিবাহবন্ধনে সে আবদ্ধ হয়েছে, তার জীবন যে আর দশটা মানুষের মতো সরল, স্বাভাবিক নয়, তা সে এতদিনে বুঝেছে। অপরাধ তার স্বামীকে ভীত করে না, বরং উত্তেজিত করে। খুন, মৃত্যু, পাপ এসব যেন তার স্বামীর কাছে দুর্বোধ্য ধাঁধার মতো। না হলে একেবারে অপরিচিত এক ভিনদেশি মেয়েমানুষের মৃত্যুর কথা ভেবে ভেবে কেউ প্রায় সারারাত নির্ঘুম কাটায়? মাখন গত রাতে বার দুই তার স্বামীর ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল। সাড়া না পেয়ে সরে এসেছে। এই যে তারা বিরাট এক প্রকৃতির মাঝে বেড়াতে এসেছে, তার স্বামীর সেসব দিকে কোনও উৎসাহই নেই। সে যেন সারাক্ষণ কীসের এক চিন্তায় মগ্ন।
এইসব আকাশপাতাল ভাবছিল, এমন সময় তারিণী এসে “সে কী! একলা বসে আছ? কল্যাণী নেই?” বলাতেই তার সকল অভিমান যেন শব্দ খুঁজে পেল।
“থাকবে বইকি। তার বুঝি আমার চৌকিদারি করা বাদে অন্য কোনও কাজ নেই!”
“তা বটে। তা তোমার জন্য একটা পাকা চৌকিদার মাইনে করে রাখি? কী বলো?”
“যাকে চৌকিদার বেছেছিলুম, সে-ই তো নিজের সম্পত্তি ফেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বাইরের চৌকিদারের ভরসা কী?”
তারিণী বুঝলে মাখনের পুথিগত বিদ্যা তেমন না হলেও বুদ্ধি কম নেই। হাজির জবাবেও পটু। যত দিন যাচ্ছে, এই কিশোরীকে ততই নতুন করে আবিষ্কার করছে সে। কথা এড়িয়ে বলল, “সত্যি বলো। কল্যাণী কোথায়?”
“সে নিজের ঘরে ঢুকে দোর দিয়েছে। কেঁদে কেঁদে বালিশ ভাসাচ্ছে বোধহয়।
“সে কী! কেন?”
“হবু বর চোর জানতে পারলে কোন মেয়েরই বা ভালো লাগে, বলতে পারেন?”
তারিণী এবার সত্যি চমকে গেল। এরা এতসব জানল কীভাবে? হয়তো তারিণীর মনের কথা বুঝেই মাখন বললে, “আমরা দুজনেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনেছি। কল্যাণী আমায় চুপিচুপি বর দেখাবে বলে দরজার কাছে নিয়ে গেল। তখনই শুনতে পেলুম সব। কী লজ্জা! মা গো! কল্যাণী আর সইতে পারলে না। আমিও চলে এলুম।”
তারিণী দেখলে মাখনের চোখেও এক বিন্দু জল। মাখনের দিকে এগিয়ে এসে সে জল সযত্নে মুছিয়ে তারিণী নিজের মুখ নামিয়ে আনল মাখনের আধখোলা ঠোঁটের উপরে। আর ঠিক তখনই বাইরে নলিনীকান্তের গলা খাঁকরানোর আওয়াজ শোনা গেল, “তারিণী একবার একটু শুনে যাও”… এ ডাক উপেক্ষা করার নয়। তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বেরিয়ে তারিণী দেখল নলিনীবাবু মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি মাটির দিকে। তারিণীকে বাইরের ঘরে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার ততক্ষণে চলে গেছেন।
“কী আর বলব বলো। ওফেলিয়া ভালো মেয়ে বলেই জানা ছিল। ও যখন নতুন করে চাকরবাকর রাখল, তখন আমি নিজের বাড়ির কিছু চাকরকে ওদের বাড়িতে কাজে পাঠিয়েছি। যতবার দেখা হয়েছে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু…”
তারিণী কিছু বলল না। দারোগাবাবুকে সময় দিল।
“আমাকে এখুনি অফিসে বেরোতে হবে। জর্জের নামে ওয়ারেন্ট বার না করলে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না। যদিও ওর পাকা অ্যালিবাই আছে। আর আজ দিনের আলোয় ওফেলিয়ার ঘরটা একটু পরীক্ষা করতে চাই।”
“কী ঘটেছে?”
“ওহহ। বলিনি, তাই না? ভুলে গেছি। বুড়ো হচ্ছি কি না। কাল সারারাত জেগে ডাক্তার হান্টার পোস্টমর্টেম করেছেন। ওফেলিয়াকে খুন করা হয়েছিল কাল বিকেল চারটে থেকে সাড়ে চারটে নাগাদ। সেটা বড়ো কথা না। ওফেলিয়া পোয়াতি ছিল। পেটে একমাসের বাচ্চা, যেটা জর্জের না হওয়াই স্বাভাবিক।”
“গোপন প্রেমিক?” এই একটা কথাই বলতে পারল তারিণী।
