অষ্টম অধ্যায়—গ্লেনডেলের গণ্ডগোল
৩০ মার্চ, মঙ্গলবার। আজ প্রভাতে নিদ্রা হইতে উঠিতে সামান্য বিলম্ব হওয়ায় টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখিতে যাওয়া হইল না। মাখনকে লইয়া চা-ক্ষেত্র বিশেষ করিয়া দেখিলাম। চা-ক্ষেত্রগুলি দেখিলে বোধ হয়, পৰ্ব্বতগাত্রে কে যেন হরিতবর্ণের মনোহর গালিচা বিস্তার করিয়া রাখিয়াছে। চা-আবাদ দ্বারা এ জেলার বিশেষ উপকার হইয়াছে; অনেক হিংস্র জন্তুর আবাসভূমি রমণীয় চা-ক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছে। পাৰ্ব্বত্য বিভাগে যথেষ্ট চা জন্মিয়া থাকে। ১৮৫৩ সালে গবর্ণমেন্ট কর্তৃক চা-আবাদের চেষ্টা হয়, এবং ১৮৫৬ সাল হইতে আবাদ আরম্ভ হইয়াছে। এখন অনেকগুলি চা-বাগান দেখিতে পাওয়া যায়। চা-ব্যবসায়ে বিলক্ষণ লাভ আছে। কোন কোন চা-কোম্পানি শতকরা ৩০/৪০ টাকা পৰ্য্যন্ত ডিভিডেন্ড দিতেছেন। দার্জ্জিলিং জেলায় ১৮৪টা চা-ক্ষেত্ৰ আছে এবং প্রায় ১৪ লক্ষ বিঘা জমিতে চা-আবাদ হয়। গত ১৮৯৩ সালে এই জেলায় ১,৩২,২৭০ মণ চা প্রস্তুত হইয়াছিল।
প্রিয়নাথের জার্নালের দেখাদেখি আজকাল তারিণীও সাধু বাংলায় ডায়রি লেখার প্রচেষ্টায় আছে। এই পর্যন্ত লিখেছে, এমন সময় চাকর এসে ভাঙা বাংলায় জানাল, মনিব চায়ের ঘরে তার অপেক্ষায় বসে আছেন। তারিণী গিয়ে দেখল গতরাতের ঘটনার ছাপ তখনও তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট। দার্জিলিংয়ে বসবাসের কারণেই হয়তো এমন সাহেবি কায়দায় একত্র প্রাতরাশের ব্যবস্থা। টেবিলে সুন্দর করে সাজানো সেঁকা পাউরুটি, মাখনের পাত্র, কমলা মার্জারিন, ডিমসেদ্ধ, নানারকমের ফল, দুধ, চায়ের কেটলি আর ফলের রস। মাখনলতার কাছে এসব একেবারেই নতুন। সে কী করবে বুঝতে না পেরে পুতুলের মতো চুপটি করে বসে আছে। কল্যাণী সেটা বুঝেই”দাও আমায়, বেড়ে দিই”, বলে সবার প্লেটেই ডিম, পাউরুটি, ফল সাজিয়ে দিল। দারোগাবাবু চুপচাপ খাচ্ছিলেন। কল্যাণী যেন এই স্তব্ধতাকে ভাঙতেই তারিণীকে জিজ্ঞাসা করল, “কেমন ঘুরলেন সকালে?”
“ভালোই। আগে এত কাছ থেকে চা গাছ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কী ভাগ্যি এখানে এসেছিলাম!”
“সে তো বটেই”, কল্যাণী হেসে বললে, “তবে ভোর ভোর উঠলে আজই টাইগার হিল যেতে পারতেন। কাল কী এমন কাজে বেরোলেন যে ফিরতে এত রাত হল?”
“ক্যামেলিয়া নামে বাড়িটায় গেছিলাম। ওই বাড়ির মালকিন ওফেলিয়া উইলিয়ামসন মারা গেছেন।” তারিণী ইচ্ছে করেই খুন বা আত্মহত্যা শব্দদুটো বলল না।
কল্যাণীর মুখে একইসঙ্গে বিস্ময় আর আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ তার বাবার দিকে তাকাতে নলিনীবাবু বললেন, “কাল তোমায় বলা হয়নি। রাত হয়ে গেছিল। ওফেলিয়া কাল মারা গেছে। আত্মহত্যা। আমি তোমায় আগেই বলেছিলাম মা। এ হবারই ছিল। আমি বলতাম, তোমরা হেসে উড়িয়ে দিতে। আমি জানি এই অভিশাপ মিথ্যে হবার নয়। তবে একটাই শান্তি। এই শেষ।”
“কিন্তু বাবা, কাল তো…”
“কোনও কথা না। এই বাড়িতে আমি এসব নিয়ে আর আলোচনা চাইছি না।”
“আমার অবশ্য তা মনে হয় না”, কথার মাঝেই বলে উঠল তারিণী।”আমার বিশ্বাস প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে এমন কোনও কারণ আছে, যা একেবারেই জাগতিক আর যার সঙ্গে এই অভিশাপের কোনও সম্পর্ক নেই। গ্লেনডেলে ভয়ানক একটা গণ্ডগোল চলছে। আচ্ছা, গ্লেনডেলের জুনিয়ার ম্যানেজার কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য, ভট্টবাবুকে চেনেন আপনারা?”
এই কথায় যেন ঘরে বাজ পড়ল। সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে চিত্রার্পিত, তেমন হয়ে দুজন খানিক বসে রইলেন। দারোগাবাবু কিছু একটা চিবোচ্ছিলেন। দৃশ্যতই তাঁর মুখ হাঁ হয়ে রইল। একটু ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন, “কিন্তু তুমি কুমুদকে চিনলে কীভাবে? আর কোথায় আলাপ হল? যতদূর জানি সে তো এখন কলকাতায়।”
তারিণী পূর্বাপর সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিল। যত শুনছিলেন, দারোগাবাবু যেন ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন। বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন, “তুমি নিশ্চিত? তুমি নিশ্চিত?” শেষে তাঁকে বিশ্বাস করাতে তারিণী ভট্টবাবুর কার্ড আর চামড়ার হাতব্যাগ এনে দেখাল। দারোগাবাবু মুখে কিছু বললেন না। নীরবে সে দুটো বাড়িয়ে দিলেন কল্যাণীর দিকে। কল্যাণীও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে শুধু বলল, “কিন্তু বাবা…”
হতাশ মাথা নেড়ে নলিনী বললেন, “জানি না মা ।”
প্রাতরাশের টেবিলের গোটা পরিবেশটাই এমন থমথমে হয়ে যাবে, তা বোধহয় কেউই কল্পনায় আনতে পারেনি। কথা শুরু করল তারিণীই।
“যদি কিছু মনে না করেন, তবে এই গ্লেনডেলে যা ঘটছে, আমায় একটু বুঝিয়ে বলবেন? কোথাও একটা ভয়ানক অনিয়ম আছে, তা বুঝতে পারছি। কিন্তু বিশদে বললে হয়তো আমি কিছু সাহায্য করতে পারি।”
খানিক কী যেন ভেবে নলিনী দারোগা বললেন”তুমি আমার সদ্যপরিচিত, অতিথি। কিন্তু এই অল্প সময়েই তোমার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ। এখন বুঝতে পারছি নেহাত অকারণে প্রিয়নাথ তোমার প্রশংসা করেনি। তবু বিবাহের পর তুমি এখানে স্ত্রীর সঙ্গে ঘুরতে এসেছ। আমি চাই না যে অদ্ভুত নরকে আমরা বন্দি হয়ে আছি, তুমি তার অংশ হয়ে যাও। আমি দৈবে বিশ্বাসী। না হলে এত দিন থাকতে এমন অভিশপ্ত দিনেই বা তুমি আসতে যাবে কেন? হয়তো পরমেশ্বর আমাদের পরিত্রাতা হিসেবেই তোমায় পাঠিয়েছেন।”
“আজ্ঞে আপনি যেসব বিশেষণ ব্যবহার করছেন, আমি তার যোগ্য নই। তবু এ কথা বুঝতে পারছি, এক দুঃসহ যন্ত্রণায় আপনাদের দিন কাটছে। যে কথা কাছের মানুষদের বলা যায় না, একেবারে অপরিচিত জনকে অনায়াসে বলে বুকের ভার লাঘব করা যায়। শুধু সেই কারণেই আপনি বলতে পারেন। অবশ্য কল্যাণী দেবীর যদি আপত্তি না থাকে।”
কল্যাণী নতমস্তকে মাথা নাড়ল। দারোগা নলিনীকান্ত শুরু করলেন–
“আমি মাত্র কয়েকবছর হল এখানে এসেছি। যা বলছি, তার বেশিরভাগটাই আমারও কানে শোনা। লর্ড বেন্টিঙ্কের নির্দেশে টি কমিটি গঠনের কথা নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে। সেই কমিটিই প্রথম ঠিক করে, চীনকে টেক্কা দিতে দার্জিলিংয়ে চা বাগান গড়ে তোলা হবে। বড়োলাটের একেবারে ঘনিষ্ঠ কিন্তু উপযুক্ত কিছু ইংরেজ সাহেব সেই কমিটিতে ছিলেন। তাঁদেরই একজন রবার্ট উইলিয়ামসন। ধনী, বুদ্ধিমান, উদ্যোগী। মূলত তাঁর বুদ্ধিতেই লন্ডনে চায়ের নিলাম চালু হয়। ১৮৫৬-র শুরুতে আলুবাড়িতে কার্শিয়াং অ্যান্ড দার্জিলিং টি কোম্পানি প্রথম চা বাগান খুললে তারও শেয়ার ছিল রবার্টের হাতে। সব ভালো, কিন্তু চূড়ান্ত মাতাল আর লম্পট। টি কমিটির এক সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর একটা সম্পর্ক জানাজানি হয়ে যাওয়ায় কমিটি থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। বিপত্নীক রবার্ট কলকাতা ছেড়ে দার্জিলিং চলে আসেন। এখানে এসে কিছুদিনের মধ্যেই এখানকার প্ল্যান্টারদের সঙ্গে তাঁর দারুণ ভাব হয়ে যায়। তিনি দার্জিলিংয়ের একজন কেউকেটা হয়ে বসেন। শেষ বয়সে নিজের ফিরিঙ্গি পরিচারিকার সঙ্গে তাঁর মেলামেশার ফলে একটি সন্তান জন্ম নেয়। জর্জ। যাকে কাল দেখলে। পরিচারিকাকে স্ত্রীর আসন না দিলেও ছেলেকে নিজের নামটা দিয়েছেন সাহেব। ভালোও বাসতেন খুব। বুড়ো বয়সের সন্তান। জর্জ ছোটোবেলা থেকেই বুদ্ধিমান। পড়াশোনায় ভালো। এখানের লোকাল থিয়েটারের নায়ক। শুনেছি এই অঞ্চলে সে বেশ জনপ্রিয়ও ছিল। একদিন আচমকা রবার্টের মৃত্যু হলে রবার্টের সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী হয়ে বসে জর্জ। ততদিনে তার মা-ও মারা গেছে। এবার জর্জ আসল রূপ দেখাতে শুরু করে। প্ল্যান্টারদের সঙ্গে আলাপ থাকলেও জর্জ কোনও চা বাগানের মালিক ছিল না। ইংরেজ আইনের জটিলতায় যেহেতু জর্জের মাকে তাঁর বাবা বিয়ে করেননি, তাই সে নিজে নতুন চা বাগান কিনতেও পারবে না। জর্জের নজর পড়ল ক্যাপ্টেন জেমস নেপিয়ারের বাগানের দিকে। নেপিয়ার-ও বিপত্নীক। একমাত্র মেয়ে ওফেলিয়া। প্ল্যান্টার্স ক্লাবে ওফেলিয়া নিয়মিত যাতায়াত করত। জর্জ সুপুরুষ। মহিলামহলে তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। এই প্রত্যন্ত দার্জিলিং শহরে প্রায় সকল যুবতি মেয়ের আকাঙ্ক্ষার পুরুষ ছিল জর্জ। সেই জর্জ যখন ওফেলিয়াকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে থাকে, ওফেলিয়া যেন হাতে চাঁদ পায়। আলাপের কিছুদিনের মধ্যেই জর্জ ওফেলিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এই বিয়েতে চরম আপত্তি ছিল ওফেলিয়ার বাবার। একে তো ফিরিঙ্গির গর্ভে অবৈধ সন্তান, তার উপরে জর্জের নানা কীর্তিকলাপের খবর তাঁর কানে আসছিল। তিনি কিছুতেই এই বিয়েতে মত দিলেন না। এও নাকি বলেছিলেন, তিনি মরে যাবেন, তবুও এই বিয়ে হতে দেবেন না। আর তাই হল।”
“কী হল?”
“একদিন আচমকা অপঘাতে মারা গেলেন নেপিয়ার সাহেব। আমি তখন সবে দার্জিলিং এসেছি। বিকেলে ঘোড়া নিয়ে বা হিলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। ঘোড়া আচমকা পাগল হয়ে তাঁকে নিয়ে খাদে ঝাঁপ দেয়। পুলিশ একে অ্যাক্সিডেন্ট বলেই ধরে নেয়। বাবা মারা যাবার এক মাসের মধ্যে ওফেলিয়া জর্জকে বিয়ে করে। তিন মাসের মধ্যে জর্জ গোটা বাগানের চার আনা অংশের মালিক হয়। তারপর থেকেই সমস্যার শুরু।”
“জর্জ আধাআধি মালিকানা চায়। তাই তো?”
“না। পুরোটার। এই পাহাড়ে কোনও মহিলা প্ল্যান্টার নেই। সবাই পুরুষ। তাই সে ওফেলিয়াকে জোর করতে থাকে সব সম্পত্তি তার নামে করে দেবার জন্য। ওফেলিয়া রাজি হয় না। এদিকে জর্জের লাম্পট্যের খবর ওফেলিয়ার কানে আসতে থাকে। নেটিভরা জর্জকে আড়ালে জারজ ডাকত। তাতে অবশ্য জর্জের কিচ্ছু এসে যেত না। আর তারপরেই একদিন ওফেলিয়ার অ্যাক্সিডেন্টটা হল।”
“অ্যাক্সিডেন্ট?”
“বছরখানেক আগের কথা। ওফেলিয়া আগে অন্য মেমদের মতো বিকেলে ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে যেত। একদিন অবিকল জেমসের ঘোড়ার মতো তার ঘোড়াও পাগলামো শুরু করে। শেষে খাদে ঝাঁপ দেয়। ওফেলিয়ার ভাগ্য ভালো। বড়ো স্কার্ট পরে ঘোড়ায় চড়ার জন্য সে দুই পা জিনের একপাশে দিয়ে ঘোড়ায় বসত। ফলে শেষ মুহূর্তে লাফ মারতে পেরেছিল। তবে দুর্ঘটনায় তার পা মচকে যায়। আগেরবার ঘোড়ার অটোপ্সি করা হয়নি। এবার করা হল। ঘোড়ার পেটে বেশ কিছু অপাচ্য ডেডলি নাইটশেড আর ক্লোভারের পাতা পাওয়া যায়। এসব পেটে গেলে ঘোড়ার পাগলামো করা অসম্ভব না। রাতারাতি নিজের ঘর আলাদা করে, জর্জের ঘনিষ্ঠ সব চাকরবাকরকে তাড়িয়ে নতুন লোক রাখে ওফেলিয়া। অশান্তি চরমে ওঠে মাসখানেক আগে। ওফেলিয়া সম্পত্তি থেকে জর্জকে বাদ দেওয়ার ভয় দেখায়। ঝগড়ার মধ্যে জর্জ একটা লাঠি দিয়ে ওফেলিয়াকে আঘাত করে। ওফেলিয়া সবার সামনে জর্জকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। বলে পরেরবার এলে পুলিশে জানাবে। তারপর তো গতকাল স্বয়ং নিয়তি এসে…”
ঠিক এই সময়ে একজন চাকর ঘরে ঢুকে নলিনীর কানে কানে কী যেন বলল। উনি সচকিত হয়ে একবার তারিণীর দিকে তাকিয়ে কল্যাণীকে বললেন, “কুমুদ এসেছে। বাইরের ঘরে বসে আছে। তবে তুমি এখন যেয়ো না। আমি ওর সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।”
তারিণী উঠে নিজের ঘরে দিকে যাচ্ছিল। নলিনীবাবুই ডেকে নিলেন।
“তুমি আমার সঙ্গে এসো তারিণী। তোমার থাকা প্রয়োজন।”
