১৭. সংবাদ

১৭. সংবাদ

“আগামী কাল দারোগাবাবু তোমায় জিরনিয়া পাঠিয়ে দেবেন। সেখান থেকে সোজা কলকাতার কোর্টে তোমার বিচার হবে। টেলর সাহেবের আসল খুনি যতক্ষণ ধরা না পড়ে, পুলিশের চোখে তুমিই খুনি। যা প্রমাণ আছে, সব তোমার বিরুদ্ধে। এদিকে আমি জানি তুমি খুন করোনি। আমি জানি, সেদিন শো-এর আগে বেরিয়ে তুমি টেলরের বাংলোতে যাওনি। কিন্তু তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হলে আমাকে গোটা ঘটনাটা একেবারে ঠিকটি জানতে হবে। সবাই সত্যি বলছে, এদিকে তুমিই তোমার বন্ধুর কাছ থেকে লুকাচ্ছ।”

“কিছুই লুকাইনি আমি।”

“দ্যাখো গণপতি, তুমি হয়তো জানো না, বিপিন মুখ খুলেছে। পোড়ামাতার দিব্যিতে কাজ হয়নি। এবার বলো তুমি বাকিটা বলবে কি না।”

গণপতির চোখে যেন আগুন খেলে গেল। দাঁতে দাঁত পিয়ে বলল, “সর্বনাশ হবে ওর। পোড়ামাতা অভিশাপ দেবেন। ভালো হবে না। ওর ভালো হবে না। নির্বংশ হবে।”

“হরিমতীও মুখ খুলেছে। কজনকে আর অভিশাপের ভয় দেখিয়ে রাখবে তুমি” গণপতির মুখ এবার সত্যিই হাঁ হয়ে গেল।

“হরিমতীও…”

“হাতে আধঘণ্টা সময় আছে। যদি বাঁচতে চাও আর দল চালাতে চাও, তবে যা জানো, সবটা বলো। সত্যি কথা বলবে। কিচ্ছু বাদ দেবে না।”

“কী জানতে চাও তুমি?”

“বেশি কিছু না। তুমি, বিপিন আর ভূপেন, তিনজনে মিলে দালান বানানো দেখছিলে। সেই সময় থেকে নন্তুর মারা যাওয়া অবধি পরপর কী হয়েছিল?”

খানিক মাটির দিকে চেয়ে রইল গণপতি। তারপর বিড়বিড় করে বলা শুরু করল-

“যেদিন তামাটুলিতে এলাম, সেদিনও আমি জানি না ভূপেন আসলে পুলিশের চর। স্বদেশিদের থেকে গা-ঢাকা দিতে আমাদের দলে লুকিয়ে আছে। সেদিনই জানলাম। সত্যি বলতে ও-ই আমাকে বলল। আমরা তিনজন দালান বানানো দেখছিলাম। এমন সময় একটা সাঁওতাল মেয়েছেলে মাথায় ইট নিয়ে পড়ে গেল। কামিনদের অনেকে দৌড়াল। আমরা তিনজনও পিছু পিছু গেলাম। ভূপেন খানিকটা গিয়েই থেমে রইল। আমি তাকিয়ে দেখলাম ওর দুচোখে ভয় মেশানো বিস্ময়। যেন কী একটা দেখে ফেলেছে। পাঠশালার মাস্টারবাবু সামনেই ছিলেন। ততক্ষণে মেয়েটির চোখেমুখে জল দিয়ে একরকম সুস্থ করা গেছে। মাস্টার নিজে খোঁড়া মানুষ, তাও তিনি আর দুজন কামিন মিলে মেয়েটাকে স্কুলঘরে নিয়ে গেলেন ।”

“তারপর?”

“আমরা ফিরে আসতেই দেখি ভূপেনের হাবভাব পুরো বদলে গেছে। আগে আমায় ওস্তাদ বলে ডাকত। সেদিন দেখি বলছে, গণপতি, তোমার তাঁবুতে চলো। কথা আছে। আমি অবাক হলাম। কী এমন হল? আমার তাঁবুতে ঢোকার আগে সে নিজের তোরঙ্গ থেকে একটা ছোটো বাক্স নিয়ে এল। তাতে প্রচুর সার্টিফিকেট। বম্বে প্রেসিডেন্সির ছাপ মারা। আমি ইংরেজি ভালো বুঝি না, ভূপেনই বলল সে আসলে ইংরেজের লোক। এই তামাটুলিতে এক অপরাধীর সন্ধানে এসেছে। এমনি কপাল, প্রথম দিনই সে অপরাধীকে চিনতে পেরেছে। আমাকে শুধু একটাই কাজ করতে হবে। পুলিশ স্টেশনে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষ্য দিতে হবে যে আমার দলের কয়েকজনের সঙ্গেও এই অপরাধীর যোগ আছে বলে সন্দেহ হয়। তাহলে কেসটা আরও জোরদার হবে।”

“তুমি মেনে নিলে?”

“এ শর্ত মানা যায়? আমি সোজা না করে দিলাম। তখন ও লোভ দেখাল। টাকার লোভ। বলল, একজন লোককে ধরার চেয়ে একটা গোটা গ্যাং-কে ধরলে পুলিশ অনেক বেশি পুরস্কার দেয়। দলের কয়েকজনকে ধরিয়ে দাও। যা টাকা পাবে, তাতে পায়ের উপরে পা তুলে সারাজীবন খেতে পারবে। আমি বললাম, কিন্তু এমন করলে তো আর এ জীবনে ম্যাজিক দেখাতে পারব না! বোস বাবু আমায় দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবেন। ভূপেন মুখ বিকৃত করে যেন নোংরা কিছু দেখেছে, এমনভাবে বলল, ‘বোস তোমাকে কুকুরের মতো রেখেছে। আমি যা বলছি শোনো। নিজের মালিক নিজে হবে। লাখ টাকার বিছানায় শুয়ে থাকবে।’ কিন্তু তুমি তো জানো তারিণী, দলের লোককে ধরিয়ে দিলে আর কেউ, কোনও দিন আমার সঙ্গে কাজ করতে চাইবে না। এ জীবনের মতো আমার ম্যাজিক দেখানো বন্ধ। ভূপেনকে এ কথা বলতেই সে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘ম্যাজিক ছাড়া কি দুনিয়ায় আর কোনও কাজ নেই? আর ম্যাজিক দেখানোর শখই যদি থাকে, আমার সঙ্গে বম্বে চলো। নতুন করে দল বানাও। ওখানে ম্যাজিকের কদর ঢের বেশি।”

“তুমি রাজি হয়ে গেলে?”

“প্রথমে হইনি। বললাম, ভেবে দেখার সময় দাও। নস্তু ছাড়ার পাত্র না। সে বলেই যেতে লাগল, ‘চাকর চিরকাল চাকরই থাকে। মালিক হবার সুযোগ পেলেও হয় না।’ গায়ে লাগল খুব। মিথ্যে বলব না, লোভও হল। বোসের সার্কাসে যতদিন সুশীলা আছে, ততদিন তার কথাই শেষ কথা। দলের সবাই তাদেরই মানে। আমি নেহাতই অন্যদের মতো এক কর্মচারী। চিন্তা ছিল শুধু হরিমতীকে নিয়ে। সে বেচারি আমায় বড়ো ভালোবাসে। কিন্তু বোসের সার্কাসের সঙ্গে তার কন্ট্রাক্ট আছে। তাড়িয়ে না দিলে নিজে থেকে বেরুতে পারবে না। বেরুলে এতদিনের থাকা খাওয়ার টাকা দিয়ে বেরুতে হবে। আসলে হরি হল সুশীলার চোখের বালি। ও-ই বোসকে বলে এমন কন্ট্রাক্ট করিয়েছে।”

“তুমি হরিমতীকে ডেকে সব বললে? সে কী বলল?”

“কিছু বলেনি। শুধু নীরবে কাঁদল, আর বলল, ভগবান যদি আমার কপালে এমনটাই লিখে থাকেন, তবে তাই হবে।”

“ব্যস! এটুকুই?”

“হ্যাঁ। আর কিছু না।”

“তারপর বলতে থাকো।”

“ঠিক হল, শো হয়ে গেলে আমরা দুজন থানায় যাব। আমি আর নস্তু। কিন্তু তার আগেই অন্য একটা ঘটনা ঘটে গেল।”

“টেলর সাহেব তোমায় চিনতে পেরে গেলেন।”

“আমি বম্বে প্রেসিডেন্সিতে বড়োলাটের কথায় একবার খেলা দেখাতে গেছিলাম, বোসের সঙ্গে। সেখানে আমার আর হরির সেই সিংহের খেলা দেখে সাহেব বড়ো প্রীত হয়েছিলেন। সেটাই জানালেন। টেলর আমায় চেনেন দেখে নস্তু প্রায় পাগলপারা হয়ে যায়। বারবার বলতে থাকে, পুলিশ-ফুলিশ ছাড়ো, সরাসরি টেলরের সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও। তাতে পুরস্কারের পরিমাণও বাড়বে, আর আমাদের সম্মানও। আমি বলি, শো শেষ হোক, তারপর। নন্তু রাজি হয় না। মাঝে মাঝেই আমার তাঁবুতে এসে বলছিল, এখুনি চলো টেলরের বাংলোতে। কিন্তু এভাবে কি যাওয়া যায় বলো? শেষে আমি বললাম, শো-এর আগে যে করেই হোক আমি টেলরের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলব। শো-এর দিন চলে এল। আমার আর কথা বলা হয় না।

সেদিনই সকালে নন্তু অদ্ভুত প্রস্তাব দিল আমায়। যদি আমি শো-এর আগে দেখা করতে পারি তো ভালো, তা না হলে বুলেট ক্যাচিং ট্রিক আমার বদলে ও দেখাবে। গুলি ছুড়বেন টেলর সাহেব। ফলে টেলরের নন্তুকে মনে থেকে যাবে। পরদিন নন্তু নিজেই দেখা করে যা করার করবে। সেক্ষেত্রে আমাকে আমার পুরস্কারের আশা ত্যাগ করতে হবে।”

“শো-এর আগে তাই তুমি টেলরের সঙ্গেই দেখা করতে গেছিলে?”

“বেরিয়েছিলাম। কিন্তু যতই সেই বাংলোর কাছে যাই, দুই পা যেন কেউ আঠা দিয়ে মাটির সঙ্গে আটকে দেয়। বারবার শুধু হরিমতীর মুখটা মনে পড়ছিল, বিশ্বাস করো। সার্কাসে আমি ছাড়া এই মেয়েটার নিজের বলতে আর কেউ নেই। আমি চলে গেলে ও থাকবে কীভাবে? ঝিরনি নদীর ধারে বসে খানিক এইসব সাত-পাঁচ ভেবে আবার ফিরে এলাম। নন্তু জিজ্ঞেস করল, দেখা হল? মাথা নাড়তেই নন্তু বললে, ‘তোমার দ্বারা হবে না। যা করার আমাকেই করতে হবে। আমিই আজ খেলা দেখাব ।”

“নন্তু খেলা জানত?”

“অবশ্যই। ও-ই তো ফার্স্ট হেল্পার ছিল।”

“যা বলছিলে বলে যাও …”

“আমি মঞ্চ থেকে উঁকি মেরে দেখলাম, টেলর আসেননি। কিন্তু নন্তু মরিয়া হয়ে উঠেছিল। বলল, তাতে কী? আমার কাছে খবর আছে, আর্থার স্মিথ সাহেব টেলরের অত্যন্ত কাছের মানুষ। আমি আজ তাঁকেই ডাকব। প্রয়োজনে তাঁর মাধ্যমেই টেলরের সঙ্গে দেখা করব। আজ রাতে আমায় শুধু নিজেকে চেনাতে হবে।”

“তুমি রাজি হলে?”

“প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। দুইদিন আগেই যে ছোঁড়া ওস্তাদ ওস্তাদ বলে পিছনে ঘুরত, তার এই বদল সহ্য করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল এই আপদ দল থেকে যত তাড়াতাড়ি বিদেয় হয়, ততই ভালো। আমি সোজা বলে দিলাম, স্লাজকেই তোর শেষ শো। নস্তুর অবশ্য তাতে কিছু এসে গেল না।”

“নন্তুর মুখে আসল গুলির বদলে নকল গুলি ছিল। আর পিস্তলে আসল গুলি। যে কারণে নস্তু মারা গেল। কেন এমনটা হল বলতে পারো?”

“আমার ধারণা, গোটাটাই দুর্ঘটনা। সেদিন নস্তুর প্রথম দিন ছিল। আমি নিজের হাতে গুলি বেছে দিলে এ ভুল হত না। আমি দিইনি। সে আমার গাফিলতি। নন্তু গুলি বাছতে ভুল করেছিল।

“গুলি কোথায় থাকে?”

“আসল নকল দুটোই বন্দুকের সঙ্গে কাঠের বাক্সে থাকে। অভিজ্ঞ হাতে তফাত বোঝা যায়। নন্তু বুঝতে পারেনি। নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিল।

“এই কথাগুলো তো তুমি আগেও বলতে পারতে গণপতি। এতদিন চুপ করে ছিলে কেন?”

গণপতি নিরুত্তর রইল।

.

জমিদারবাড়ির সামনে গিয়ে তারিণী দেখল, প্রিয়নাথ তার জন্যেই অপেক্ষা করছেন। জমিদারবাবু এখনও এসে পৌঁছোননি। প্রিয়নাথের হাতে একটা খবরের কাগজ। তারিণীকে দেখেই কাগজটা বাড়িয়ে বললেন, “দেখে নাও। আমি আমার কথা রেখেছি। এবার তোমার কথা রাখার পালা।”

তারিণী পত্রিকাটা হাতে নিয়েই সোজা চলে গেল বসার ঘরে। আলোর নিচে ঝটপট প্রথম পাতা উলটে দ্বিতীয় পাতার তলায় খুদে খুদে অক্ষরে ছাপা কী যেন দেখতে লাগল। প্রিয়নাথ দেখলেন, উত্তেজনায় তারিণীর চোখ চকচক করছে। প্রায় ধরা গলায় তারিণী প্রিয়নাথকে ডেকে বলল, “দেখুন দারোগাবাবু। কী বলেছিলাম?”

প্রিয়নাথ দেখলেন তাতে লেখা—

“এর মানে?”

“মানে পরে শোনাব। আগে চলুন। কথা রাখা যাক। টেলর সাহেবের খুনির সঙ্গে আপনার দেখাই করাব।”

“কে সে? তুমি ধরে ফেলেছ?”

“ধরে ফেলেছি অনেকদিন আগেই। কিন্তু মোটিভটা বুঝতে পারছিলাম না। আর সেইজনোই এতটা সময় লাগল।”

“খুনি কে?”

“হার্পার সাহেব ঠিক বলেছিলেন দারোগাবাবু। টেলর খুনির নাম সংকেতে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন।”

“কেমন?”

“শেক্ষপীর সাহেবের বইয়ের সেই ছবিটা মনে করুন। দি টেম্পেস্ট নাটকের দৃশ্য। বামদিকে যুবক ফার্দিনান্দ। অন্যদিকে জাদুকর প্রসপেরো আর তার মেয়ে মিরান্ডা। রক্তের চিহ্ন লাগানো ছিল জাদুকর প্রসপেরোর গায়ে। কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষ, যে প্রায় বুকে ভর দিয়ে এতটা এসেছে, যার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, তার পক্ষে একেবারে সঠিক চরিত্রকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। আমি নিশ্চিত, এই রক্তচিহ্ন সামান্য একটু ডানে সরে গেছিল।”

“কী বলতে চাও তুমি?”

“তিনি আসলে দাগ দিতে চেয়েছিলেন মাঝের সেই ডানা মেলা পরিটিকে। নাটকের এই পরি আসলে এক আত্মা। গোটা নাটক যে তুফানকে ঘিরে লেখা হয়েছে, সেই তুফান সৃষ্টি করেছিল এই চরিত্রটিই। একদিকে সুন্দরী, অন্যদিকে ভয়ংকর। এর নাম এরিয়েল। ইহুদিরা হিব্রুতে বলে আরিয়েল্লা, অর্থ লায়ন অফ দ্য গড। ঈশ্বরের সিংহ। দুর্গা ঠাকুরের বাহন সিংহের মুখে রক্তের ছাপটা মনে করুন। প্রচুর পড়াশোনা করতেন টেলর। তাই যখন বুঝেছিলেন, আর বেশি সময় নেই, সেই মরমর অবস্থাতেও খুনিকে ধরতে একটা ক্লু মিস হলেও পরেরটা যাতে ভুল না হয়, সে ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন সাহেব।

এলেম আছে বটে!”

.