১৬. আলোর নিশানা

১৬. আলোর নিশানা

থানায় খগেনকে পিছমোড়া করে বেঁধে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। মাথায় উশকোখুশকো চুল। ঠোঁটের এক কোনা কেটে রক্ত বেরোচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, তারিণীরা আসার আগে পুলিশ খগেনের উপরে বেশ খানিক হাতের সুখ করে নিয়েছে। তারিণীরা ঢুকতেই আর্থার বেশ উল্লসিত হয়ে বললেন, “এইবার আসল কথা বেরোবে। এই মেয়েকে পেলেন কোথায়?”

“জমিদারবাড়ি। তারিণীর কাছে সাহায্য চাইতে গেছিল।”

“আপনি এঁকে আগে থেকে চিনতেন?” তারিণীকে শুধালেন আর্থার।

“না, আমার সঙ্গে আজই আলাপ হল। তবে আমার স্ত্রীর সঙ্গে টেনে এই মেয়েটির আলাপ হয়েছিল।”

“এ কিছু বলল?” খগেনের দিকে আঙুল দিয়ে প্রিয়নাথ জিজ্ঞেস করলেন।

“নাহ”, মাথা নাড়লেন আর্থার। “সেই একই বুলি আওড়াচ্ছে।”

প্রিয়নাথ এবার খগেনের মুখোমুখি চেয়ারে বসলেন। চুলের মুঠি ধরে মাথা উঠিয়ে গালে সপাটে একটা চড় মেরে জিজ্ঞেস করলেন, “সত্যি কথা বলে দে। আমি সব জানি। আমার কাছে মিথ্যে বলে লাভ নেই।”

“বললাম তো। আমার নাম শ্রী খগেন্দ্রনাথ দত্ত। হাটখোলার প্রাণকৃষ্ণ দত্তরা আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তালপুকুরে ঘটি ডোবে না। এনট্রান্স পাশ করে বম্বে চলে গেছিলাম কাজের সন্ধানে। সুতাকলে ওভারশিয়ারের কাজ করতাম।”

“কোন সুতাকল?” প্রশ্ন করল তারিণী।

“জনতা মিল। তারপরই প্লেগ এল। কলের অর্ধেক মজুর এক হপ্তায় খতম। কল বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে দেশের বাড়ি জবরদখল হয়ে গেছে। উপায় না দেখে এই তামাটুলিতে আসি। উত্তমার সঙ্গে দেখা হয়।

“পায়ে চোট লাগল কী করে?”

“আজ্ঞে চোট না, ছেলেবেলায় পোলিও হয়েছিল। সেই থেকে, একটু…”

গোঙানির শব্দ শুনে তারিণী দেখল, মুখে কাপড় দিয়ে অবরুদ্ধ কান্নায় ফুলে ফুলে উঠছে উত্তমা।

প্রিয়নাথ উত্তমাকে অন্য ঘরে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন।

তারিণী বলল, “মাপ করবেন দারোগাবাবু। খগেনের বিরুদ্ধে অভিযোগটা ঠিক কী, যদি একটু বলেন দয়া করে…”

“এর মুখ দেখে ভুলো না তারিণী। এ এক ভয়ানক সন্ত্রাসবাদী। বোম্বাই প্রদেশে ড্রেভিড ভাইয়ের হত্যায় এর সরাসরি যোগ ছিল। এর নাম খগেন না। আসল নাম গিরীন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত। যেদিন ড্রেভিডদের খুন করা হয়, সেদিন চাপেকর আর রানাডের সঙ্গে এও ছিল।”

“আপনি নিশ্চিত?”

“নব্বই শতাংশ। রানাডে আর চাপেকর ধরা পড়লেও এ পালিয়ে যায়। রানাডেরা শত অত্যাচারেও এর নাম বলেনি। কিন্তু এর নাম অন্য সূত্রে আমাদের কানে এসেছে। মুশকিল হল, এর চেহারা কেউ দেখেনি। অজিত, মানে ভূপেন একে পিছন থেকে দেখেছিল। দোহারা চেহারা, দৌড়োবার সময় লেংচে হাঁটে। খবর আছে, একবার পুলিশের হাত থেকে পালাবার সময় গিরীনের পায়ে চোট লাগে। দলে ও ল্যাংড়া গিরিন নামে পরিচিত। এই বছর ফেব্রুয়ারির পর থেকে গিরীন নিখোঁজ। আর এ এখানে এসেছে মার্চের শেষ দিকে। টাইমলাইন-ও মিলে যাচ্ছে।”

“কিন্তু সে তো কাকতালীয়ও হতে পারে!”

“হতেই পারে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আসল নাটক শুরু হয় গণপতির দলের তামাটুলিতে আসার পর। ওদের দলের বিপিন কী বলল শোনোনি? তিনজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল, উলটো দিক থেকে এই খোঁড়া মাস্টারকে আসতে দেখে ভূপেন উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সে আর গণপতি নিজেদের মধ্যে কথা বলে। কী বলে তা জানি না, তবে আমি নিশ্চিত, ভূপেন বলেছিল মাস্টারের সব খবর ফাঁস করে দেবে। গণপতি মানা করে। হয়তো বলে শো শেষ হোক, তারপর বলতে। এদিকে স্বদেশির দল বুঝে যায় ভূপেন সব জেনে গেছে। তারা কায়দা করে ভূপেনকে খুন করায়।”

“কী কায়দা? ভূপেন তো নিজেই গুলির সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিল। আর্থার সাহেবকেও সে-ই ডেকে নেয়।”

“এর ব্যাখ্যাও আমার কাছে আছে তারিণী। গণপতি যে ম্যাজিশিয়ান, সেটা ভুলে গেলে? সম্মোহনের জোরে অনেককে দিয়েই অনেক কিছু করানো যায়। ভূত আনার ছলে তারিণী আসলে ভূপেনকে সম্মোহিত করেছিল। স্টেজে ওঠার আগে গণপতির আজই তোর শেষ খেলা, বলাটা ভুলে গেলে? এ তো স্পষ্ট হুমকি!”

“হ্যাঁ, কিন্তু তারপরেও ভূপেন খেলা দেখাতে উঠল। কেন?”

প্রিয়নাথ একটু থতোমতো খেয়ে গেলেন। তারিণী কিন্তু থামছে না। বলেই চলেছে, “গণপতি খেলার আগে খানিক গায়েব হয়ে গেছিল। কোথায় গেল সে? ধরলাম সে গেছিল টেলর সাহেবকে খুন করতে, এই খগেন মাস্টারের কথায়। কিন্তু গণপতির সঙ্গে খগেনের আলাপ হয়েছে, এমন প্রমাণ এখনও আসেনি। টেলর আর নন্তুর খুনকে আপনি এক সুতোয় বাঁধছেন। কিন্তু একটা মৃত্যুকে বারবার ভুলে যাচ্ছেন। ওই বেদিয়া মেয়ে বুধনীর মৃত্যু। বুধনী কিন্তু টেলর সাহেবের ঘরে রাত কাটিয়েছিল সাহেবের মৃত্যুর আগের দিন, ভুলে গেলে চলবে না। আর হ্যাঁ, সাহেবের মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া দুটি চিহ্ন, জাদুকর আর সিংহ, এদের সঙ্গে গণপতির যোগ আপনারা বের করেছেন, কিন্তু এই খগেন মাস্টারের এর সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?”

একটানা বলে তারিণী যেন একটু হাঁফিয়ে গেল।

ঘরে সবাই চুপ। পাশের ঘর থেকে শুধু উত্তমার ফোঁপানোর শব্দ আসছে।

“এবার ওই মেয়েটিকে কিছু প্রশ্ন করার আছে। চলো।” বলে প্রিয়নাথ পাশের ঘরে এলেন। এখানে উত্তমাকে একা জেরা করা হবে। উত্তমাকে দেখিয়ে প্রিয়নাথ বললেন, “এই যে মেয়েটি, তার সঙ্গে এই মাস্টারের একটা সম্পর্ক আছে, তুমি জানো?”

“আজ্ঞে জানি। আর সেইজন্যেই সে সাহায্য প্রার্থনায় আমার কাছে এসেছিল।”

“তুমি কি জানো, দিন দুই আগে রাতের বেলায় সে কী করেছে? সেটা বলেছে তোমায়?”

তারিণী চুপ করে রইল।

“বলেনি, ঠিক কি না? তবে আমিই বলি। হোমে এই মেয়েটি আর-একটি মেয়ের সঙ্গে একই ঘরে থাকে। নাম সরলা। পরশু গভীর রাতে সরলার ঘুম ভেঙে যায়। সে দ্যাখে জানলা থেকে হাত বাড়িয়ে উত্তমা ঢাকা লণ্ঠনের ঢাকনা খুলছে আর বন্ধ করছে। কিছুক্ষণ বাদে লণ্ঠন হাতে সে বেরিয়ে যায়। ফেরে প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে। সরলা ঘুমের ভান করে পড়ে ছিল। ঘরে এসে উত্তমা লন্ঠনের আলো উসকে দেয়। খুব মন দিয়ে হাতের কিছু একটা দেখতে থাকে। এমন সময় দরজার বাইরে একটা শব্দ হয়। উত্তমা হাতের জিনিসটা বিছানাতেই রেখে দরজার বাইরে যায়। তখনই সরলা সেটাকে দেখতে পায়।”

“কী সেটা?”

“পিস্তল। যে সে পিস্তল না, মাউজার সি ৭৮। ঠিক যে পিস্তল দিয়ে ডেভিড ভাইদের খুন করা হয়েছিল।”

“সরলা মাউজার চিনল কীভাবে?”

“আমি নিজে বন্দুকের ক্যাটালগ দেখিয়ে প্রশ্ন করেছি। ও সেখান থেকেই চিহ্নিত করেছে।”

“কিন্তু সরলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা আপনার মাথায় এল কেন?” মৃদু হাসলেন প্রিয়নাথ।

“মাস্টারের সঙ্গে উত্তমার সম্পর্কের কথা তামাটুলিতে সবাই জানে। বিপিনের কথায় যখন মাস্টারকে ধরলাম, প্রায় তখনই উত্তমার গতিবিধি নিয়েও প্রশ্ন উঠল। আমি নিজে হোমে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।”

“সরলা আগে বলেনি কেন?”

“হয়তো ভয়ে। পুলিশে ছুঁলে আঠেরো ঘা। কে না জানে?”

তারিণী এবার উত্তমার দিকে চেয়ে বলল, “দারোগাবাবু যা বলছেন, ঠিক?” উত্তমা উত্তর দিল না।

“হোমের দিক থেকে আলোর নিশানা আমি নিজে দেখেছি। সেটা তুমিই করেছ, তাই তো?”

“হ্যাঁ”, উত্তর দিল উত্তমা।

“কেন?”

মাথা নিচু করে উত্তমা বলল, “মাস্টারমশাই পাঠশালারই এক ঘরে থাকেন। তামাটুলি ছোটো জায়গা। দিনমানে মেলামেশার সুযোগ কম। তাই রাতে সব নির্জন হলে উনি আমায় আলোর সংকেত দিয়ে নিজের ঘরে ডাকেন। সরলা আগে টের পায়নি। সেদিন হয়তো দেখে ফেলেছিল।”

“মাস্টারমশাইয়ের ঘরে তোমরা কী করো?”

একটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেল উত্তমার মুখে।

“এও কি আমার নিজের মুখে বলতে হবে? আগুন আর ঘি পাশাপাশি থাকলে কী করে? আগুন ঘিকে গিলে খায়। আরও কিছু বলব?”

“লাগবে না। আর বন্দুক?” এবার প্রশ্ন প্রিয়নাথের।

“আমি কোনও বন্দুকের কথা জানি না। সরলা মিছে কথা বলেছে। ও আমার হিংসে করে।”

“মিথ্যে কথা তুমি বলছ। সরলা জানিয়েছে, সেদিন থেকে সে বন্দুক কাপড় পেঁচানো অবস্থায় তোমার তোরঙ্গে বন্দি আছে। আজ সকালেও তুমি তোরঙ্গ থেকে বার করে দেখেছ।”

“মিছে কথা। সব মিছে কথা ।”

প্রিয়নাথ এবার কড়া গলায় বললেন, “তোমার তোরঙ্গের চাবি দাও উত্তমা। আমরা নিজের চোখে দেখব।”

“চাবি নেই। চাবি হারিয়ে গেছে। দুপুর থেকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

“তাহলে তালা ভাঙতে হবে। তারিণী, তুমিও চলো। সাক্ষী লাগবে দুজন। তুমি তাদের একজন হবে।”

“যাচ্ছি দারোগাবাবু, তবে একটা অনুরোধ, জিরনিয়াতে খবর পাঠান। বম্বের জনতা মিলের ওভারশিয়ারের ব্যাপারে যেন খোঁজ নেয়। আর কলকাতার হাটখোলায়। হয়তো এ মিথ্যেই বলছে। তবু…”

.

হোমে মেয়েদের থাকার ঘরগুলো একেবারেই ছোটো। পাশাপাশি দুইটি কাঠের ছোটো চারপাই। তাতে তোশক নেই। ধবধবে সাদা চাদর আর পাতলা বালিশ পাতা। দুটো তোরঙ্গ আর একটা টেবিল। মাথার কাছে প্রভু যিশুর একটা ছবি। হাত তুলে আশীর্বাদ করছেন। উত্তমার তোরঙ্গের তালা ভাঙতে বিশেষ কষ্ট করতে হল না। ভিতরে তেমন কিছু নেই। রোজ পরার পোশাক, তোয়ালে, দুটো গাউন, সেমিজ, আর চামড়ায় বাঁধানো বাইবেল। পুলিশ তন্নতন্ন করে খুঁজে বন্দুক দূরে থাক, সন্দেহ করার মতো কোনও বস্তুই পেলে না। প্রিয়নাথের মুখ দেখার মতো। একেবারে হাতে চলে আসা কেস তাঁর চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার সমস্তটাই শুরুর বিন্দুতে চলে এল যেন। সাহেবরা যাকে বলেন, “ব্যাক টু স্কোয়ার ওয়ান”। তারিণী প্রিয়নাথের মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল। কাছে গিয়ে মৃদু গলায় বলল, “একটা অনুমতি দিতে হবে দারোগাবাবু।”

“আবার কীসের অনুমতি?”

“আমাকে একবার গণপতির সঙ্গে কথা বলতে দিতে হবে। একা।”

“বলে কী হবে? বললাম তো সেদিন। ও কিছু বলবে না। কালই ওকে জিরনিয়া পাঠিয়ে দেব। আমার আর ওকে বাঁচানোর দায় নেই।”

“কী অপরাধে?”

“টেলরকে খুনের অপরাধে। নস্তুকে খুনের ষড়যন্ত্রে। কেন, তুমি কি জানো না?”

“কিন্তু গণপতি তো টেলর সাহেবকে খুন করেনি?”

“তাই নাকি? তবে কে করেছে? বলতে পারবে?”

“হয়তো পারব। গোটা ধাঁধাটাই চোখের সামনে সমাধান হয়ে গেছে, দারোগাবাবু। শুধু দুটো কালো কালো ছোপ। সে দুটো না মিটলে সোয়াস্তি পাচ্ছি না। আর তার জন্য দুটো জিনিস জানা দরকার। একটা গণপতি বলবে। অন্যটা আপনি জমিদারবাবুর থেকে জোগাড় করে আনবেন।”

“কী আনতে হবে?”

“জমিদারবাড়িতে স্টেটসম্যান পত্রিকা রাখা হয়। সেই পত্রিকা কলকাতায় ছাপার দুদিন পরে এখানে আসে। টেলর সাহেব তামাটুলিতে পৌঁছোন উনিশ তারিখ। মানে সেদিন সতেরো তারিখের পত্রিকা এখানে এসে পৌঁছেছিল। আমার ওই পত্রিকাটা চাই।”

“ধরো এনে দিলাম, তবে তোমার খুনি ধরতে আর কতদিন লাগবে?” প্রিয়নাথের গলায় ব্যঙ্গের আভাস তারিণীর কান এড়াল না।

“আমি গণপতির কাছে যাচ্ছি। বড়োজোর আধঘণ্টা। সেটা মিটলে আজ রাতের মধ্যেই আপনাকে খুনির সামনে দাঁড় করাব। কিন্তু আপনি তাকে ধরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।” বলেই তারিণী হোম ছেড়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।

.