ভস্মবহ্নি – দ্বিতীয় পর্ব

দ্বিতীয় পৰ্ব

১।

প্রিয়নাথ আর তারিণী দুইজনেই হতবাক। তারিণী কিছু একটা বলার আগেই প্রিয়নাথ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, “এভাবে হবে না। পদ্ধতি মেনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কাউকে ছাড়া যাবে না।” এই বলে এক হাবিলদারকে নির্দেশ দিলেন একটা তাঁবুতে টেবিল চেয়ার পাতার। সেখানেই জিজ্ঞাসাবাদ হবে। প্রিয়নাথের সঙ্গে তারিণীও থাকবে। যাদের জিজ্ঞাসা হয়ে যাবে, তাদের পাশের এক তাঁবুতে রাখতে হবে, যাতে তারা অন্যদের এই জিজ্ঞাসাবাদের ধরন সম্পর্কে না জানাতে পারে।

“সকাল থেকে খেয়েছ কিছু?” প্রিয়নাথ তারিণীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “নাকি আমার মতোই? হরিমটর?”

“আজ্ঞে, আপনার মতোই।”

“সে মুখ দেখেই বুঝেছি। দাঁড়াও, আগে কিছু গলাধঃকরণ করি। খালি পেটে কি আর জেরা করা যায়? এদিকে সূর্য তো মাঝগগনে ।”

খানিক বাদে একটা শালপাতার দোনায় কিছু ঠান্ডা লুচি, ছোলার ডাল, আর জিলিপি হাজির হল। আপাতত পিত্তি নিবারণের জন্য এই যথেষ্ট। তারপর দুইজনে গিয়ে বসল জেরা করতে। প্রিয়নাথ কাগজ কলম নিয়ে এসেছিলেন। সবার বয়ান নিয়ে, তাদের পড়ে শুনিয়ে নিচে আঙুলের ছাপ নিয়ে নিতে হবে। ইংরেজ বাহাদুর এই নতুন নিয়ম করেছেন। সবার এজাহার নেবার পরে তারিণী প্রিয়নাথকে বলল, “একবার জবানবন্দির নথিটা দেখি। সব নিজের কানেই শুনলাম, তবু একবার নিজের চোখে দেখে না নিলে কিছু ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। সবার লাগবে না, যাদেরটা আপনার দরকারি মনে হয়, সেগুলো দিন।” ।

.

নাম-বলবন্ত।

বয়স ৩৫

আদি নিবাস—রাজপুতনা।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত—পাঁচ।

কীসের খেলা দেখানো হয়—খেলা দেখাতে পারি না, মালিকের ফাইফরমাশ খাটি।

মৃত পান্নালাল বসাকের মতো ভালো মানুষ ছিল না। আমাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে সার্কাসে ঠাঁই দিয়েছিলেন। টমাস সাহেব ভয়ানক নেশাড়ু ছিলেন। বকলমে অনেকদিন ধরেই ম্যানেজার সাহেবই সার্কাসের দেখাশোনা করতেন। আমি তাঁর কথামতো নানা কাজকর্ম করতাম। মাইনা সে অর্থে কিছু ছিল না। সাহেব সামান্য হাতখরচা দিতেন। পরে ম্যানেজারবাবু মালিক হলে জানান আয় কম। ফলে সার্কাসের খেলুড়ে ছাড়া কাউকে টাকা দেওয়া যাবে না। আমি মেনে নিয়েছিলাম। এই সার্কাসই আমার ঘরবাড়ি। ফলে যাব কোথায়?

কাজ বলতে পশুদের খাবার বানানো, বাঘের মাংসের জোগান ঠিক চলছে কি না এইসব খেয়াল রাখা। খুনের দিন সকাল থেকে মালিকের সঙ্গে হুকুমের বেশ কয়েকবার ঝামেলা বেধেছিল। হুকুম দেখতেই বড়ো। আসলে খুব ভীতু। ও আর উমাকে নিয়ে খেলা দেখাতে চাইছিল না। এই নিয়েই ঝামেলা। মালিক বলেছিল এই সার্কাসে থাকলে হলে তোকে খেলা দেখাতেই হবে। না পোষালে চলে যা। হুকুমও বলেছিল, তোমার কাছে কেউ টিকবে না। রামদীনের মতো আমিও চলে যাব। তখন মালিক হেসে বলেছিল, একবার সেই চেষ্টা করেই দেখ। তোকে ফাঁসিতে চড়াবার রাস্তা আমার জানা আছে। হুকুম থেমে গেছিল। পরে আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে স্পষ্ট শুনেছি, ও বলছে”শালে কো একদিন মার ডালুঙ্গা।” এইজন্যেই আমি মালিককে বলেছিলাম রাতে ওর সঙ্গে এক ঘরে না থাকতে। বেঁচে থাকতে ভয় ছিল। মরার পর তো ওর আর সেই ভয় নেই!

প্রশ্ন—রামদীনের সঙ্গে সমস্যাটা ঠিক কী হয়েছিল?

উত্তর (খানিক চুপ থেকে) আসলে একটা কথা বলি। মালিক এমনিতে লোক ভালো। কিন্তু …

প্রশ্ন—কিন্তু কী?

উত্তর—সত্যি বলতে কী হুজুর, সার্কাসে মেয়েদের চরিত্র ঠিক থাকে না। থাকবে সেই আশাও কেউ করে না। রামদীন সেই ভুলটা করেছিল। পদ্মকে মন দিয়ে ফেলেছিল। তারপর যা হয় আর কি। প্রেমে পড়ে মাথা খারাপ দশা। পদ্মও তেমনি তাকে ল্যাজে খেলাচ্ছিল। একদিন রামদীন জানতে পারে রাতে লুকিয়ে পদ্ম মালিকের ক্যারাভ্যানে যায়। সে নিয়ে সে মালিককে যা নয় তাই বলে। মারতে যায়। বলে খুন করে ফেলব। মালিক একবাক্যে তাকে তাড়িয়ে দেয়। কী মজা দেখুন, যে পদ্মের জন্য এত কিছু, সে একবারও রা-টি কাড়েনি।

প্রশ্ন—শেষ কবে রামদীনকে দেখেছ?

উত্তর—এই ঘটনা তো ঘটল ঝাঁসিতে। তারপর ওখানেই একদিন আবার রামদীন এসেছিল। বোধহয় ক্ষমা চাইতে। মালিক হুকুমকে ডেকে তাকে তাড়িয়ে দেয়।

প্রশ্ন—কাল রাতে হুকুমকে বাঘে খেয়েছিল। তুমি দেখেছ?

উত্তর-না হুজুর। আমি শো-তে থাকি না। তবে হট্টগোল শুরু হতে বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে। দেখি শঙ্কর আর তেজি দৌড়ে আসছে। দুজনেই চিৎকার করে বলছে হুকুমকে বাঘে খেয়েছে।

প্রশ্ন-এরা কারা?

উত্তর–হুজুর, তেজি হল আমাদের জোকারের নাম। বুন্দেলখন্ডের মানুষ। আর শঙ্কর এই সার্কাসেরই ছেলে। ওর মা মধু আগে টমাস সাহেবের আমলে ট্র্যাপিজ দেখাত। ডাকসাইটে সুন্দরী। লোকে বলে শঙ্কর নাকি আসলে টমাসেরই ছেলে। দেখতেও দেবতার মতো সুন্দর।

প্রশ্ন—সেদিন রাতে হুকুমকে ক্যারাভ্যানে রাখার কথা কে প্রথম বলে?

উত্তর-মালিক নিজেই। আমি মানা করেছিলাম। কিন্তু মালিকের যেন গোঁ চেপেছিল। আসলে মরণ ডাকলে যা হয় আর কি। মালিক নিজেও হাত লাগিয়েছিল লাশ তুলতে। পুলিশ বাইরে থেকে সিল করে চলে গেল। মালিক ভিতর থেকে আমাকে বলল, বলবন্ত, তুই শুতে যা। আমি সারারাত মাল খাব আর গান গাব। বলে দরজা বন্ধ করে বেতালে গান গাওয়া শুরু করল। আমি শুতে গেলাম। ঘুম আসছিল না। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। শেষ রাতে বৃষ্টি কমে গেল। মেঘ কেটে আকাশে ফটফটে জ্যোৎস্না উঠল। আমি তাঁবু থেকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। মালিকের জড়ানো গলায় গান তখনও চলছিল। হঠাৎ দেখি মালিক গান থামিয়ে দিল। আমি তাঁবুতে এসে শুয়ে পড়লাম। আর সকালে কী হল সে তো আগেই থানায় আপনাকে বললাম হুজুর।

.

নাম—পদ্মাবতী।

বয়স-১৬/১৭

আদি নিবাস—দাঁতন, মেদিনীপুর।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত—তিন।

কীসের খেলা দেখানো হয়–হাই ট্র্যাপিজ।

মৃত পান্নালাল বসাক আমার কাকার বন্ধু ছিলেন। মা ছোটোবেলায় মারা গেছিল। বাবা ওলাওঠায় মারা গেলে কাকা বললে, নিজের পথ নিজে বেছে নে। আমি বললাম, আমি তো কিছুই জানিনে। কাকা একদিন পান্নালালের কাছে বেচে দিল। ম্যানেজার সাহেব আমাকে বড়ো সাহেবের কাছে নিয়ে আসেন। বড়ো সাহেব খুব ভালো দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন। দিনরাত তাঁকে মদ খাইয়ে বশে রেখেছিল এই পান্নালাল। শেষে একদিন সাহেব বলেন দেশে ফিরে যাবেন। পান্না তাঁর থেকে এই সার্কাস কিনে নেয়। সাহেবের দেশে যাওয়া হয়নি। একদিন সারারাত প্রচণ্ড ভেদবমি, নাক মুখ দিয়ে রক্ত। পান্না বলল সাহেবের প্লেগ হয়েছে। আমরা কেউ সামনে গেলাম না। গেছিল শুধু শঙ্কর আর শঙ্করের মা। পরদিন সকালে সাহেব মারা গেলেন। তখন আমরা বোম্বেতে খেলা দেখাচ্ছি।

প্রশ্ন-রামদীনের সঙ্গে তোমার কেমন পরিচয় ছিল?

উত্তর–(চুপ)

প্রশ্ন—দেখো আমরা সব শুনেছি। যা বলার সত্যি বলো। তোমার কিছু হবে না। রামদীন নির্দোষ হলে ওরও কোনও ক্ষতি হতে দেব না।

উত্তর– (কেঁদে ফেলে) রামদীন এই সার্কাসে একমাত্র সাচ্চা মরদ ছিল। কাউকে ভরত না। মানুষকেও না, বাঘকেও না। মালিক একসময় ওকে সমালো চলত। ভালো কথাবার্তাও বলত। একদিন নেশার ঘোরে সে মালিককে বাঘ বশে রাখার কৌশল বলে দেয়। তারপর থেকেই মালিক বুঝে যায়, এ লোক থাকলেও কী, না থাকলেও কী। ওর সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে।

প্রশ্ন- বাঘ বশে রাখার কৌশলটা কী?

উত্তর– আমি জানি না। জিজ্ঞাসা করেছিলাম। রামদীন কিছু বলেনি। শুধু রহস্য করে মুচকি মুচকি হাসত।

প্রশ্ন— রামদীন চলে গেল কেন?

উত্তর– জানি না আপনাদের কে কী বলেছে। রামদীন আমাকে ভালোবাসত।

আমরা দুজনে বিয়ে করে ঘর করব ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম সার্কাস ছেড়ে দেব রামদীন কামারের কাজ জানত। বলেছিল সেভাবেই চালিয়ে নেবে। আমিও রাজি ছিলাম। দুটো টাকার জন্য সার্কাসের এই পরিশ্রম আর সয় না। রামদীন বাঘের মুখে মাথা ঢোকায়, আমি ভয়ে মরি। আমাদের আয়ের টাকা সব পান্নালালের কাছে জমা থাকত। রামদীন তার থেকে আমাদের জমা টাকা চায়। মালিক বলে এক পয়সাও দেবে না। এই নিয়ে ঝাঁসিতে খুব ঝামেলা হল। রাগের মাথায় রামদীন মালিককে জুতোর বাড়ি মারল। মালিক ওকে তাড়িয়ে দিল।

প্রশ্ন—শেষ কবে রামদীনকে দেখেছ?

উত্তর–ঝাঁসিতেই। দুই-একদিন পরে মালিকের সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চাইতে এসেছিল। আসলে আমাকে না দেখে বেশিদিন থাকতে পারত না। মালিক হুকুমকে দিয়ে ওকে তাড়িয়ে দেয়।

প্রশ্ন—তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি?

উত্তর—না। শুধু তাঁবুর বাইরে পবনের সঙ্গে খানিক কথা বলে চলে যায়। পবন আমায় বলেছিল, যাবার আগে রামদীন বলেছে টাকাপয়সার জোগাড় করতে পারলে একদিন এসে আমায় সার্কাস থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।

প্রশ্ন—পবন কে?

উত্তর—পবন সিং। আমার চেয়ে কিছু বড়ো। সার্কাসে কুকুরের খেলা দেখায় আর তিরের খেলা দেখায়। রামদীনের খুব বন্ধু ছিল।

প্রশ্ন—কাল কি রামদীন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?

উত্তর-(বিস্মিতভাবে) কাল এসেছিল? আপনি ঠিক জানেন? আমার সঙ্গে তো দেখা হয়নি!

.

নাম-ময়না।

বয়স -২০/২২

আদি নিবাস-বর্ধমান।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত—সাত।

কীসের খেলা দেখানো হয়—হাই ট্র্যাপিজ।

আমি আর পদ্মা সার্কাসে হাই ট্র্যাপিজের খেলা দেখাই। বাপ রাস্তায় মাদারির খেলা দেখাত। আমি দড়িতে হাঁটতাম। সেই দেখে পান্নালাল আমাদের সার্কাসে যোগ দিতে বলে। দুজনেই দিয়েছিলাম। বাপটার যক্ষ্মা ছিল। এক বছর ঘুরতে না ঘুরতে মরে গেল। সেই থেকে একাই আছি। বন্ধু বলতে কেউ নেই। সার্কাসে কেউ কারও বন্ধু হয় না। এই যে পদ্ম বলে বেড়ায় সে আর রামদীন নাকি বন্ধু ছিল। ছাই ছিল। রামদীনকে ও চাকরের মতো রাখত। নিজের ফাইফরমাশ খাটাত। আর বলত ওকে নিয়ে নাকি ঘর বাঁধবে। মিথ্যেবাদী আর কাকে বলে! এদিকে লুকিয়ে লুকিয়ে রাতে বলবত্তের বিছানায় যেত।

প্রশ্ন—বলব? পান্নালাল না?

উত্তর—পান্নাবাবুর এসব দোষ ছিল না। বলবত্তের চেহারা যেমন, মনটাও তেমন বিচ্ছিরি। ও আর পদ্ম মিলে ষড় করছিল পান্নাবাবুকে সরিয়ে সার্কাসের দখল নেবে

প্রশ্ন—সেটা কী করে জানলে?

উত্তর—আগে বলবন্তের একটা হাতখরচ দেওয়া হত। কিন্তু মালিক বুঝতে পারেন বলবন্ত নানা জায়গা থেকে টাকা সরাচ্ছে। সেই নিয়ে একদিন খুব গণ্ডগোল। এদিকে বলবন্ত ছাড়া সার্কাস অচল। মালিক শেষে বাধ্য হয়ে ওর হাতখরচা বন্ধ করে দেন। তাতে অবশ্য ওর খুব বেশি কিছু যায় আসেনি। জন্তুদের খাবার থেকে যে টাকা মারে তা দিয়েই ও পদ্মকে পুষতে পারে।

প্রশ্ন—রামদীনকে শেষ কবে দেখেছিলে?

উত্তর ঝাঁসিতে ওকে তাড়িয়ে দেবার পর কিছুদিন তাঁবুর এদিক ওদিক দেখেছি। একদিন মালিক হুকুমকে দিয়ে ভাগিয়ে দেয়। তবে… (খানিক চুপ থেকে) গতকাল আমাদের তেজি বামন নাকি ওকে দেখেছে। আমাকে কাল বলেনি। মালিক মারা যাবার পরে আজ সকালে বলল। খেলা শুরুর আগে নাকি পদ্মর তাঁবু থেকে রামদীনকে বেরোতে দেখেছে।

কাল রাতে হুকুমকে বাঘে খাবার পরে তার বডি মালিকের ক্যারাভ্যানে ঢোকানো হয়। তখন খুব বৃষ্টি পড়ছিল। আমি পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। মালিকের হাতে একটা বেতের ছড়ি থাকত, লোহা বাঁধানো। মালিক সেটা ক্যারাভ্যানের বাইরে একপাশে গুঁজে নিজেও পুলিশের সঙ্গে হাত লাগায়। তারপর আমাদের চলে যেতে বলে। আমি তাঁবুতে ফিরে অনেকক্ষণ মালিকের গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙে বলবস্তের চিৎকারে।

নাম-তেজি যাদব।

বয়স- ৩০।

আদি নিবাস- বুন্দেলখন্ড।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত—সার্কাসের শুরুর দিন থেকে।

কীসের খেলা দেখানো হয়—জোকারের খেলা।

আমি আগে উইলসন সার্কাসে ছিলাম। টমাস সাহেব ওই সার্কাসের ম্যানেজার ছিলেন। একবার মালিকের সঙ্গে তাঁর ঝামেলা বাধে। টমাস সাহেবের খাস লোক ছিলাম আমরা কজন। আমি, পান্নালাল, মধু। আমরাই তাঁকে বললাম নতুন সার্কাস খুলতে। সাহেব তখন এই ইম্পেরিয়াল সার্কাস খোলেন। শুরুর দিকে ট্র্যাপিজ, পাখির খেলা এসব দেখানো হত। পরে রামদীন আসার পরে বাঘের খেলা শুরু হয়। রামদীন এককালে কামার ছিল। কিছুদিন ব্ল্যাকপুল সার্কাসে কাজ করে বাঘের খেলা শেখে। বাঘ বশ করার খেলা। এই বিদ্যা কেউ কাউকে জানায় না। রামদীনকে দেড়া মাইনায় এই সার্কাসে নিয়ে আসেন পিটার। তখন উমাকেও নিয়ে আসা হয়। উমা রামদীনের বড়ো নেওটা ছিল। তবে ওকে খেতে দেবার সময় হুকুমও থাকত রামদীনের সঙ্গে। খেলার এক ঘণ্টা আগে রামদীন খাঁচার চারদিক ঢেকে দিয়ে বাঘকে বশ করত। সেটা কীভাবে কেউ জানে না। অবশ্য পরে পান্নালাল জেনে গেছিল। একদিন রামদীনই নেশার ঘোরে ওকে বলে দিয়েছিল। মালিক তখন বুঝে যায় একে ছাড়াও চলবে। তারপর রামদীনকে একদিন তাড়িয়ে দেয়।

পান্নালাল কারও বন্ধু ছিল না। নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু বুঝত না। পিটার সাহেবকে খুব তোষামোদ করে চলত। সাহেবও সব কিছু ওর উপরে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সাহেবের তিনকুলে কেউ ছিল না। বিলাতে একটা বাড়ি ছিল শুনেছি। সারাজীবনের সঞ্চয় নিয়ে সার্কাস বিক্রি করে সাহেব চলে যেতে চাইলেন। পান্নালাল বলল সে কিনে নেবে। কিন্তু সে যা দর দিয়েছিল সাহেবের পোষায়নি। সাহেব বড়ো খদ্দের খুঁজছিলেন। কিন্তু তার আগেই তো মুখে রক্ত উঠে মারা গেলেন। ওরা বলল প্লেগ। কী জানি। হবে হয়তো।

প্রশ্ন-তাহলে পান্নালাল এই সার্কাসের মালিক হয়ে বসল কীভাবে?

উত্তর-তা জানি না। পিটার সাহেব মারা গেলে সে কোথা থেকে একটা কাগজ বার করল। দানপত্র। পিটার সাহেব নাকি মরার আগে এই গোটা সার্কাস পান্নালালকে দিয়ে গেছেন। অসম্ভব মনে হলেও মেনে নিলাম।

প্রশ্ন–অসম্ভব কেন?

উত্তর–(একটু গলা খাঁকরে) দেখুন, সার্কাসে সবাই জানে শঙ্কর কার ছেলে। কোনও দিন নিজের মুখে না বললেও সাহের শঙ্করকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। বলতেন তাঁর অবর্তমানে এই সার্কাস শঙ্কর চালাবে। শঙ্করের মতো নম্র, ভদ্র ছেলে আর হয় না। যেমন সুন্দর দেখতে, তেমন স্বভাব। সার্কাসের সবাই তাকে ভালোবাসে। তার এমনিতে কোনও বন্ধু নেই। পবন ছাড়া। পবন ও চুপচাপ। একা থাকে কুকুর নিয়ে। ও কুকুরের খেলা আর তিরের খেলা দেখায়। মধু সঙ্গে থাকে। মধুও ওকে ছেলের মতো দেখে।

প্রশ্ন—হুকুমের অতীত কী?

উত্তর–হুকুমচাঁদ রেওয়া প্রদেশের ছেলে। কৃষক ঘরের। চেহারাটাই বড়ো। মাথায় বুদ্ধি বিশেষ ছিল না। মা ছিল না। সৎমা বেজায় অত্যাচার করত। বাবা বাধা দিত না। বছর ছয়েক আগে একদিন আর সইতে না পেরে মায়ের মাথায় কাস্তের বাড়ি মেরে পালিয়ে আসে। আমরা তখন ওখানেই খেলা দেখাচ্ছিলাম। পিটার সাহেব ওকে আশ্রয় দিতে চাননি। কে পুলিশের ঝামেলায় পড়তে চায়? পান্নালাল সাহেবকে বুঝিয়ে ওকে দলে আনে। খেলা শেখায়। পান্নালাল ওকে গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। একটু বেগড়বাঁই করলেই পুলিশে দেবার ধমকি দিত। হুকুম ভয় পেয়ে চুপ মেরে যেত।

প্রশ্ন—উইলসন সার্কাসে পান্নালালের কাজ কী ছিল?

উত্তর-পিটার সাহেব ছিলেন ম্যানেজার, আর ও ক্যাশিয়ার। এখানে এসে ও প্রথমে ম্যানেজার হয়, পরে নিজেই মালিক হয়ে বসে।

প্রশ্ন—রামদীনকে তুমি কাল দেখেছ বললে। একটু খোলসা করে বলো।

উত্তর—গতকাল সার্কাস শুরু হবার বেশ কিছু আগে। আমি তাঁবু থেকে বিকেলবেলায় সবে বেরিয়েছি। সাজপোশাক পরব, এমন সময় দেখি রামদীন পদ্মর তাঁবু থেকে বেরোচ্ছে। আমি অবাক হয়ে তার নাম ধরে ডাকলাম। সে ভয় পাওয়া প্রাণীর মতো দৌড়ে পালিয়ে গেল।

প্রশ্ন–তুমি নিশ্চিত, তুমি রামদীনকে পদ্মর তাঁবু থেকে বেরোতে দেখেছ?

উত্তর-পদ্মর তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে কারও সঙ্গে কথা বলছিল। পদ্ম বাদে আর কে হবে? আমাকে দেখেই পালাল। এর আগেও ঝাঁসিতে মাঝে মাঝেই পদ্মর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করত। ভেবেছিলাম সেরকম কিছু হবে। তাই কাল কাউকে বলিনি। নেহাত মালিক মারা গেল তাই…

গতকাল রাতে বাঘ যখন হুকুমকে চিবিয়ে মাথার অর্ধেক খেয়ে নিল, আমি খাঁচার ঠিক পাশে। এখনও সেই কথা ভাবলে শিউরে উঠছি। মালিক সবাইকে শান্ত হতে বলে। কিন্তু বললেই কি শাস্ত হওয়া যায় নাকি? সারারাত নিজের তাঁবুতে বসে ভয়ে কেঁপেছি। বৃষ্টি থামল। বাইরে মেঘ কেটে আকাশের চাঁদ বেরিয়ে এল। আমি খানিক তাঁবুর সামনে ঘোরাঘুরি করলাম। আমি কাউকে দেখিনি। শুধু পবনের কুকুরটা রাতে ছাড়া থাকে। ওটাই ঘেউ ঘেউ করছিল। মালিকের গান ততক্ষণে বন্ধ। কে জানে মরেই গেছিল কি না।

.

এই অবধি পড়ে তারিণী প্রিয়নাথের দিকে হতাশ হয়ে তাকাল, “একজনের জবানবন্দির সঙ্গে অন্যজনের তো প্রায় কোনও মিলই নেই। কে সত্যি বলছে, কে মিথ্যে বলছে, আর কে-ই বা সত্যি গোপন করছে বোঝা ভার।” প্রিয়নাথ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, “তুমি বাকিগুলোও পড়তে থাকো। আমি একটু ঘুরে আসি। গোটা সার্কাসটা আর তাঁবুগুলো একটু সার্চ করতে হবে। মার্ডার ওয়েপন এখনও হাতে আসেনি।” প্রিয়নাথ জনা দুই হাবিলদারকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তারিণী আবার জবানবন্দির কাগজ খুলে পড়তে বসল।

.

২।

প্রিয়নাথ বাইরে বেরিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ভিতরে বদ্ধ তাঁবুতে এতক্ষণ এজাহার নেবার পর মাথা আর কাজ করছে না। একটু দূরেই পান্নালালের ক্যারাভ্যান, মূর্তিমান অভিশাপের মতো। বড়ি সরিয়ে, হাতের ছাপ নিয়ে সবাই চলে গেছে। ক্যারাভ্যানের দরজাটা খোলা। ভিতরটা হা হা করছে। কাল ঠিক এই সময়ই দুইজন লোক বেঁচে ছিল। একজন তো এই কয়েক ঘণ্টা আগে অবধি গান গাইছিল হেঁড়ে গলায়। সব কেমন অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেল নিমেষে। অন্যদিন পাশের ওই প্যারালাল বারে এতক্ষণে নিমখাসা রকমের খেলার প্র্যাকটিস শুরু হয়। মেয়েরা জিমন্যাস্টিকস করে। পান্নালাল ছড়ি হাতে হম্বিতম্বি করে বেড়ায়। হুকুমচাঁদ পশুদের খাবার জোগাড় করে। আজ সবাই যেন বুঝে গেছে আচমকা এই সার্কাস মরতে বসেছে। পরপর দুইজনের মৃত্যু এক অদ্ভুত বেদনার জাল ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা সার্কাস জুড়ে। কেউ জোরে কথা বলার আগে দুবার ভাবছে। হাসছে না। চলতে গেলেও ধীর পায়ে চলছে।

প্রিয়নাথ হাঁটতে হাঁটতে ক্যারাভানের দিকে গেলেন। এই ধরনের চারদিক ঢাকা ক্যারাভ্যানকে বলে ফ্লোট। চাইলে সব ঘুলঘুলি আর দরজা খুলে ভিতরে হাওয়াবাতাস চলাচল করানো যায়, আবার চাইলে কাচের শার্শি দিয়ে এঁটে ভিতর থেকে স্ক্রু বন্ধ করেও দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে হাওয়া ঢোকার জন্য দেওয়ালে ছোট্ট গোল একটা ঘুলঘুলি খোলা থাকে, আর ঘরের গরম হাওয়া উপরের ছাদের লোহার জালি দিয়ে বেরিয়ে যায়। ক্যারাভ্যানের গায়ে লাগানো কাঠের সিঁড়ি বেনে উপরে উঠলেন প্রিয়নাথ। লোহার জালি ঝালাই করে লাগানো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বহুদিন এতে হাত পড়েনি। সুতরাং উপর থেকে কেউ নেমে এসেছে এই ধারণাও বাতিল করতে হল। বাকি রইল ওই ছোট্ট ঘুলঘুলি যা দিয়ে খুব চেষ্টা করে মাথাটাও গলানো যাবে না। কে খুন করেছে, তার চেয়ে কীভাবে খুন হল সেই চিন্তা ক্রমাগত চারিয়ে বসল প্রিয়নাথের মাথায়। ক্যারাভ্যানের ভিতরটা এখনও রক্তে মাখা। বাসি রক্তে মাছি উড়ছে ভনভন করে। ক্যারাভ্যান জোড়া নানা আসবাব, ছবি, মখমলি চাদর আর আসন। আয়েশি লোক ছিল এই পান্নালাল। যে চেয়ারে বসে মরেছিল, সেটা আর টেবিলটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টেবিলটা কাত হয়ে একটেরে হয়ে রয়েছে। সাদা চোখেই প্রিয়নাথ বুঝতে পারলেন ক্যারাভ্যান থেকে ব্লু পাবার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু এই বদ্ধ পরিসরে ভিতরে না ঢুকে পান্নালালের মাথায় অমানুষিক, অস্বাভাবিক শক্তিতে আঘাত করা কি কোনও মরমানুষের পক্ষে সম্ভব! যদি না… হাড় হিম হয়ে গেল প্রিয়নাথের। সব সম্ভাবনা ব্যর্থ হলে যেটা পড়ে থাকে সেটা এতই অসম্ভব যে তাঁর যুক্তিবাদী মন মেনে নিতে পারছে না। হুকুমচাঁদকে কি সত্যিই দানোয় পেয়েছিল?

ক্যারাভ্যান থেকে বলবত্তের পায়ের ছাপ ধরে ওরই তাঁবুর দিকে হাঁটা লাগালেন প্রিয়নাথ। ওখান থেকেই শুরু করা যাক। পুলিশি নির্দেশে যতক্ষণ না সার্চ শেষ হয় কেউ তার তাঁবুতে ঢুকতে পারবে না। বলবন্তের তাঁবুর ভিতরটাও বেশ ঝাঁ চকচকে সাজানো। বিছানায় লাল মখমলি চাদর। পালক ভরা বালিশ। অন্যদের থেকে সে যে একটু স্পেশাল, তা আর বলে দিতে হয় না। প্রিয়নাথ উদ্দেশ্যহীনভাবেই ইতিউতি ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কোথাও সন্দেহ করার মতো কিছু নেই। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার। দেখতে যেমনই হোক, মানুষ হিসেবে বলবন্ত খুব গুছানো। সার্কাসের তাঁবু এত নিটিপিটি ভাবে গুছিয়ে রাখা কোনও মহিলার পক্ষেও অসম্ভব। খাটের চাদরটাও একেবারে টানটান তোশকের মধ্যে গোঁজা। কিন্তু তাই কি? মাথার দিকে চাদরটা একটু কুঁকড়ে আছে না? যেন কেউ তাড়াহুড়োয় গুঁজে দিয়েছে!

প্রিয়নাথ এক ঝটকায় বিছানার সামনে গিয়ে তোশক উলটে দিলেন।

.

৩।

নাম-মধু চিত্রে।

বয়স –8৫।

আদি নিবাস –বোম্বে প্ৰদেশ।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত—সার্কাসের শুরুর দিন থেকে।

কীসের খেলা দেখানো হয়—আগে ট্র্যাপিজের খেলা। এখন পবনের সঙ্গে কুকুর আর তিরের খেলা।

উইলসন সার্কাস থেকে টমাস সাহেবের সঙ্গে আমি, পান্না আর তেজি আছি। সাহেব আমাকে বোম্বের খারাপ পাড়া থেকে উদ্ধার করে নিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন সার্কাসে। উইলসন সাহেব পছন্দ করেননি। ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থেকে। শঙ্করের জন্মের পর উইলসন আমাকে ছেড়ে দেবেন বলে ভয় দেখান। কিন্তু আমি তখনও ট্রাপিজের খেলা দেখাতে পারি। টমাস সাহেবের সঙ্গে একদিন উইলসন সাহেবের প্রায় হাতাহাতি। টমাস সাহেব আলাদা সার্কাস খুললেন। শুরুতে সব ঠিকই চলছিল। সমস্যা শুরু হল এই বলবন্তটা আসার পর থেকে। ওই পান্নালালকে কুবুদ্ধি দিল এই গোটা সার্কাস দখল করার। সাহেবকে মদ খাইয়ে, নেশা করিয়ে বুঁদ করে রাখত, আর নিজের মতো সার্কাস চালাত। আমাদের সঙ্গে চাকরবাকরের মতো ব্যবহার করত। বলবন্তের ছিল মেয়ের নেশা। সার্কাসে নতুন মেয়ে এলেই বলবন্তের ভোগে লাগত। আমি অনেকদিন অনেককে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি। টমাস সাহেবের আমলে ওরা আমায় তেমন ঘাঁটাত না। কিন্তু তিনি গত হবার পর আমার দুর্দিন শুরু। শঙ্কর সাতে-পাঁচে থাকে না। ওর বন্ধু বলতে পবন আর রামদীন। রামদীনকে তো বলবন্তই তাড়াল। ও থাকলে পদ্মকে বিছানায় তুলতে পারছিল না। পদ্ম মেয়ে ভালো। কিন্তু খুব ভীতু। পবনও খুব ভালো ছেলে। কুকুর বলতে পাগল। আগে দুটো কুকুর ছিল। জিমি আর অ্যামি। অ্যামিটা পবনের খুব ন্যাওটা। তারপর ওটা পাগল হয়ে গেল। পান্নালালকে কামড়ে পায়ের মাংস খুবলে উঠিয়ে দিয়েছিল। ওটাকে দূরে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়। সেই থেকে পবন আরও চুপচাপ হয়ে গেছে। সার্কাসে আমি ওর সঙ্গে খেলা দেখাই। আমাকে ‘তাই’ বলে ডাকে। মানে বড়ো বোন। কুকুরের খেলায় ও জিমিকে কল দিলে জিমি আগুনের রিং-এর মধ্যে দিয়ে লাফায়। রিং আমি ধরি। আর একটা চোখ বেঁধে তির ছোড়ার খেলা। সেটাতেও আমি বোর্ডে দাঁড়াই। পবন তির ছোড়ে।

কাল রাতে উমা শুরু থেকেই বেগড়বাই করছিল। অন্যদিন একেবারে শান্ত হয়ে বসে থাকে। কাল বারবার দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তখনই হুকুম বলেছিল খেলা না দেখাতে। পান্না শুনল না। আসলে হুকুমের সঙ্গে পান্নালালের সম্পর্ক ভালো চলছিল না। প্রায়ই ঝামেলা লাগত দুজনের। হুকুম সামনে কিছু বলতে পারত না। পরে পিছনে এসে গজগজ করত। বলত একদিন মেরে পান্নালালের মাথা ভেঙে দেবে। আর দেখুন। সেটাই করল।

প্রশ্ন—টমাস সাহেবের পর এই সার্কাস শঙ্কর না পেয়ে পান্নালাল পেল। খারাপ লাগেনি?

উত্তর-লেগেছিল তো অবশ্যই। সবাই জানত টমাস সাহেবের পর শঙ্করত এই সার্কাসের মালিক হবে। কিন্তু ওই যে বললাম না, শয়তান বলবটা… এর ষড়েই কিছু হল না। ভুয়ো একটা কাগজ দেখিয়ে বলল সাহেব নাকি সব কিছু পান্নাকেই দিয়ে গেছে। আমি জানি সব মিথ্যে।

প্রশ্ন—কী করে?

উত্তর-সাহেব আমায় নিজে বলেছিলেন। কথা ছিল সাহেব নিজের দেশে ফিরে যাবেন। শরীর ভালো যাচ্ছিল না এদানি। একদিন নিজের ক্যারাভ্যানে ডেকে বললেন, “মধু তুই আমার অনেক সেবা করেছিস। এ সার্কাস আমি শঙ্করকে দিয়ে যাব। ও তো আমারও সন্তান। মানি বা না মানি।” আমি মানা করেছিলাম। বলেছিলাম থেকে যেতে। তিনি শুনলেন না। পরের দিন সকাল থেকেই ভেদবমি। সবাই বলল প্লেগ। কেউ কাছে গেল না। আমায় অবধি কাছে যেতে দিতে চায়নি। তাও আমি আর শঙ্কর গেলাম। কিন্তু কিছু করার ছিল না। একবেলার মধ্যে সাহেব চলে গেলেন। আর সাহেব যেতেই এই দুই বদের ব্যাটা সার্কাসের মালিক হয়ে বসল (চোখের জল মুছল)।

প্রশ্ন—শঙ্কর কিছু বলেনি?

উত্তর-ও কোনও ঝামেলায় থাকে না। আমি ঝগড়া করলে থামিয়ে দেয়। তবে দারোগা সাহেব, আমার বিশ্বাস বলবস্তু এসব করেছে। ও আগে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করত, আর ওষুধ বেচত। ওর কাছে একটা কাঠের বাক্সে বোতলে পোরা অনেক ওষুধ আছে, বিষ আছে। আমি একদিন দেখেছিলাম। আমায় দেখেই বাক্সটা তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলেছিল। মড়া বাঁচানোর উপায় ও জানে। ওই হুকুমের মড়াকে দিয়ে পান্নাকে খুন করিয়েছে, যাতে এবার ও মালিক হয়ে বসতে পারে।

গতকাল রাতে হুকুমের লাশ ক্যারাভ্যানে ঢোকানোর পর আমি খানিক শঙ্করের তাঁবুতে বসে নিজের তাঁবুতে চলে আসি। বৃষ্টির শব্দে আমার তাঁবু থেকে কোনও গান শোনা যাচ্ছিল না। তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। রাতে কী হয়েছে কিছু জানি না।

.

নাম— শঙ্কর চিত্রে।

বয়স- ২০।

আদি নিবাস— সার্কাস।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত— জন্ম থেকে।

কীসের খেলা দেখানো হয়— হাই ট্র্যাপিজ।

আমার জন্ম এই সার্কাসেই। টমাস সাহেব আমায় খুব স্নেহ করতেন। ওঁকে বাবার মতো দেখতাম। পান্নালালের সঙ্গেও আমার কোনও বিরোধ ছিল না। কাছের বন্ধু বলতে পবন আর রামদীন। রামদীন পদ্মর প্রেমে পড়ে। কিন্তু বলবও প্রায়ই ভয় দেখিয়ে পদ্মকে ভোগ করত। এই নিয়ে ওর সঙ্গে বলবত্তের ঝামেলা বাধে। পান্নালাল রামদীনকে পছন্দই করত। কিন্তু জানি না কেন বলবত্তের পক্ষ নেয়। সাহেব মরার পর থেকে পান্নালাল বলবত্তকে কেমন একটা ভয় পেয়ে চলত। আমাদের নতুন জায়গায় তাঁবু পড়লে আমরা প্রথমে আগাছা সাফ করতাম। একদিন আমার সামনেই বলবন্ত জোরে জোরে পান্নালালকে বলল, “কী হে, একটা আগাছা তো সাফ হয়েছে। আরও দরকার?” শুনেই পান্নালালের মুখে দারুণ একটা ভয়ের ছায়া দেখলাম। শরীর খারাপের অজুহাতে সে সেদিন ক্যারাভ্যান থেকে বেরোলই না।

টমাস সাহেবের শরীর আচমকা খারাপ হয়ে যায়। ঝাঁসিতে তখন প্লেগ চলছে। সবাই ভাবলাম প্লেগ। কিন্তু এখন মনে হয় অন্য কিছু। পেটে ব্যথা, মুখ লাল, ভেদবমি হচ্ছে। মা বলল, “বিষ না তো?” আমি বললাম”না, না।” তবে এখন মনে হয়, কী জানি। ঝাঁসিতেই সাহেবকে কবর দেওয়া হয়।

হুকুম মানুষ খারাপ ছিল না। তবে মাথায় বুদ্ধি কম ছিল। না হলে পান্নালাল ওকে নিজের মতো চালাতে পারত না। রামদীন থেকে পবন সবাই ওকে পছন্দই করত। কিন্তু রামদীন ছেড়ে চলে যাবার পর আবার যখন ফিরে আসে তখন হুকুমই ওকে তাড়ায়। আবার পবনের কুকুর অ্যামি পাগল হয়ে গেলে হুকুম তাকে দূরে ছেড়ে আসে। অ্যামি তখন পোয়াতি। তাই ইদানীং হুকুমের কোনও বন্ধু ছিল না।

প্রশ্ন—রামদীনকে গতকাল দেখেছিলে?

উত্তর― (চমকে উঠে) না তো! রামদীন তো সেই ঝাঁসিতেই…

প্রশ্ন—পান্নালাল এই সার্কাসের মালিক হয়ে বসায় খারাপ লাগেনি?

উত্তর-যা পাওয়ার না, তা জোর করে পাওয়া যায় না। সে সম্পত্তি হোক, বা ভালোবাসা। মায়ের খারাপ লেগেছিল।

কাল উমা হুকুমকে মেরে ফেলার পর ওর বডি সরাতে গিয়ে ঝোলা প্যান্টের পকেট থেকে এই খালি বোতলটা পাই। এটা আমি আপনাদের দেওয়ার জন্যেই নিয়ে এসেছি। এ বোতল কীসের আমি জানি না। আমার তাঁবু থেকেও পান্নালালের গান শুনতে পাচ্ছিলাম। খানিক শুনে তারপর ঘুমিয়ে পড়েছি। অনেক রাতে যখন একবার ঘুম ভাঙে তখন গানের আওয়াজ ছিল না। শুধু জিমি খুব চিৎকার করে ডাকছিল। আমি বাইরে বেরিয়ে আসি। তখন বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সব ঝকঝক করছে। জিমি আমার তাঁবুর খুব কাছে এসে চিৎকার করছিল। আমি তাই ওকে টেনে নিয়ে মিনেজারির কাছে একটা খুঁটোতে বেঁধে দিই। তারপর আবার শুয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙে পবনের ধাক্কায়। ও-ই আমাকে জানায় মালিক খুন হয়েছে। বলবস্ত দেখেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলবন্তকে পুলিশে খবর দিতে বলি।

.

নাম—পবন সিং।

বয়স-২১।

আদি নিবাস-পাঞ্জাব।

সার্কাসে কত বছর যুক্ত-ছয় বছর।

কীসের খেলা দেখানো হয়—কুকুরের খেলা। তিরের খেলা।

আমাকে সার্কাসে এনেছিল পান্নালালই। আগে রাস্তায় খেলা দেখিয়ে বেড়াতাম। পান্নালাল আগে খারাপ ছিল না। পরে লোভ এসে ধরে ওকে। সবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে। সঙ্গী ছিল বলবন্ত। পরে হুকুমকেও নিজের দলে টেনে নেয়। রামদীন বলে একজন ভালো খেলোয়াড় ছিল। দোষের মধ্যে নেশা করত খুব। নেশার ঘোরে একদিন পান্নালালকে বাঘ বশের পদ্ধতি বলে দিল। আর ওরাও কায়দা করে রামদীনকে তাড়িয়ে দিল। রামদীন এখনও পদ্মকে ভালোবাসে। তাড়ানোর পরেও ঝাঁসিতে পদ্মর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।

প্রশ্ন—গতকালই রামদীন এসেছিল পদ্মর সঙ্গে দেখা করতে। সাক্ষী আছে। তুমি দেখেছ?

উত্তর- (খানিক চুপ থেকে) হ্যাঁ। শুধু দেখিনি, আমার সঙ্গে কথাও হয়েছে। পদ্ম তখন তাঁবুতে ছিল না। ওকে না পেয়ে রামদীন আমার তাঁবুতে আসে। কান্নাকাটি করছিল। আমি ওকে বলি চলে যেতে। মালিক জানতে পারলে অনর্থ হবে। বেরোবার সময় তাঁবুর বাইরে থেকে বলে যায়, ও আবার আসবে। এবার এলে পদ্মকে নিয়ে যাবে।

প্রশ্ন—সার্কাসে কী ধরনের খেলা দেখাও তুমি?

উত্তর—আগে আমার দুটো কুকুর ছিল। জিমি আর অ্যামি। অ্যামি একবার ভুল করে মালিককে কামড়ে দেয়। মালিক ওকে দূর করে তাড়িয়ে দেয়। সেই থেকে শুধু জিমির সঙ্গেই খেলা দেখাই। আগুনে রিং-এর খেলা। আর একটা তিরের খেলা আছে। মধু তাই বোর্ডে দাঁড়ান। আমি আড়ধনু দিয়ে তির মারি চারদিকে। চোখ বাঁধা অবস্থায়। আগে এক বেদের কাছে এই খেলাই দেখাতাম।

কাল হুকুমকে ক্যারাভ্যানে তোলার পরে আমিও তাঁবুতে চলে আসি। তখন খুব বৃষ্টি। বৃষ্টি কমার পরেও পান্নালালের গানের আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। সেটা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ঘুম ভাঙে বলবস্তের চিৎকারে। আমি শঙ্করকে ডেকে ভুলি। জিমি আমার তাঁবুতেই থাকে। রাতে মাঝে মাঝে বেরিয়ে যায়। শঙ্কর জানায় কাল রাতে নাকি খুব চিৎকার করছিল দেখে ও জিমিকে খুঁটিতে বেঁধে রাখে … এই অবধি পড়া হয়েছে, এমন সময় প্রায় হস্তদন্ত হয়ে প্রিয়নাথ তারিণীর তাঁবুতে ঢুকলেন। আর ঢুকেই বললেন, “এখুনি চলো। দুটো বড়ো ঘটনা ঘটেছে।”

“কী?”

“মার্ডারের সাসপেক্ট আর মার্ডার ওয়েপন দুটোই পাওয়া গেছে।”

“বাঃ। এ তো ভালো খবর!”

“ভালো খবর না। রামদীন তাঁবুর এদিক ওদিক ঘুরছিল। তেজিই আবার ওকে দেখে পুলিশকে জানায়। পুলিশ ওকে পাকড়াও করে। কিন্তু…

“কিন্তু কী?”

“পান্নালালের সেই লোহায় বাঁধানো ছড়িটা, রক্তমাখা অবস্থায় সেটা পাওয়া গেছে বলবন্তের তাঁবু থেকে।”

.

৪।

মাথা নিচু করে বসেছিল রামদীন। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। ছোটোখাটো চেহারা। চোখদুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। দুটো হাত মোটা দড়িতে বাঁধা। প্রিয়নাথ এসেই হাবিলদারদের আদেশ দিলেন হাতের বাঁধন খুলে দেবার। তারিণী উলটো দিকে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রিয়নাথ রামদীনের পাশে বসে একেবারে বন্ধুর মতো খুব নরম স্বরে বললেন, “তুমি রামদীন?”

প্রায় চিৎকার করে রামদীন বলে উঠল, “আমাকে ধরে এনেছেন কেন? আমি কী করেছি?”

“কিছু না, কিছু না। তাই তো তোমার হাতের বাঁধন খুলে দিতে বললাম। এবার বলো, তোমাকে তো ঝাঁসিতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপরেও বেশ কয়েকবার তুমি ঢোকার চেষ্টা করেছ এই সার্কাসে। এমনকী গতকালও এসেছিলে। কেন?”

রামদীনের চোখমুখের ভাব বদলে গেল। একটু চোর চোর ভাবেই ফিসফিস করে সে বলল, “পদ্মর সঙ্গে দেখা করতে।”

“দেখা হল?”

“না।”

“কেন?”

এবার আবার তেরিয়া হয়ে রামদীন বলে উঠল, “সে কথা আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করছেন? সার্কাসের মালিক পান্নালাল আর তার স্যাঙাত বলবন্তকে

জিজ্ঞাসা করুন। ওরা দুজন মিলে নষ্ট করছে আমার পদ্মকে।”

তারিণী আর প্রিয়নাথ নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করলেন।

“কাল পদ্মর সঙ্গে দেখা না হওয়ার পরে কী করলে?”

“পাশেই পবনের তাঁবু। ওখানে গেলাম। ও বলল পালিয়ে যেতে। মালিক জানলে আবার হুকুমকে লেলিয়ে দেবে। অশাস্তি হবে। আমি চলে গেলাম। যাবার সময় তেজি আমায় পিছু থেকে একবার ডেকেছিল। আমি আর দাঁড়াইনি।”

“তারপর?”

“কলকাতায় হাড়কাটা গলির কাছে একটা মেসে আমার বন্ধু থাকে। সোজা চলে গেলাম সেখানে।”

“সারারাত কোথায় ছিলে?”

“সেখানেই। তাসের বাজি চলছিল। সারারাত তাস খেলে ভোরের দিকে চারটে নাগাদ একটু শুয়েছি। উঠে মনে হল যাই আর-একবার। যদি পদ্মর সঙ্গে দেখা হয়। এদিকপানে আসতেই আপনার হাবিলদাররা পাকড়াও করল।”

“তাসের বাজির সাক্ষী আছে?”

“অন্তত জনা দশেক। আপনি মেসে লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করুন।”

“বেশ। হুকুমকে গতকাল বাঘে খেয়েছে। খেলা দেখানোর সময়। জানো?”

একটা মৃদু হাসি যেন খেলে গেল রামদীনের ঠোঁটের কোণায়। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে সে বলল, “জানি। বাঘকে বশ করা কি সবার কম্মো?”

“তা তো নয়। কিন্তু তুমি তো পারতে বশ করতে। কি, পারতে না?”

“পারতাম। আমার সে মন্ত্র জানা ছিল।”

“কেমন মন্ত্র?”

“অতি গুহ্য মন্ত্র। আমার গুরুর থেকে পাওয়া। সবাইকে বলা যায় না।”

“তাই বুঝি? কিন্তু সেই গুহ্য মন্ত্র নেশার ঘোরে পান্নালালকে বলে দেওয়া যায়। ঠিক কি না?”

রামদীন জ্বলন্ত চোখে একবার প্রিয়নাথের দিকে চাইল। কিছু বলল না।

প্রিয়নাথ আবার খুব নরমভাবে বললেন, “আমাদেরও সেই মন্ত্র শিখিয়ে দাও। কাউকে বলব না। কথা দিলাম।”

রামদীন তবু গোঁজ হয়ে বসে রইল।

আচমকা তারিণী বলে উঠল, “আচ্ছা, মন্ত্রের নাম কি চেরি পেক্টোরাল?”

প্রায় তড়িদাহত বাঘের মতো ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়ল রামদীন।

“কে বলেছে আপনাদের এ কথা? ওই পান্নালাল? আমি ওকে… আমি ওকে…”

“তুমি ওকে আর কী করবে রামদীন? গতকাল রাতে পান্নালালকে মাথা কাটিয়ে কেউ খুন করেছে।”

শুনে রামদীনের মুখের ভাব যা হল তা যদি অভিনয় হয়, তবে তেমন অভিনেতা স্বয়ং গিরিশ ঘোষ-ও নন।

“পান্নালাল খুন হয়েছে!! কে করল?”

“সেটা আমরাও জানার চেষ্টা চালাচ্ছি। তোমার কাউকে সন্দেহ হয়?”

“সন্দেহের কী আছে? আমি জানি কে খুন করেছে। ওই শালা বলব। সার্কাসের মালিক পিটার সাহেবকেও ওই খুন করেছে। পান্না তাতে সায় দিয়েছিল। বোঝেনি এর পরে ওর পালা। উপরে ভগবান আছেন। পাপ বাপকেও ছাড়ে না।”

প্রিয়নাথ বললেন, “দেখো, তোমায় আটক করছি না। কিন্তু সার্কাসের এই বাউন্ডারির চারদিকে পুলিশি প্রহরা। আমি না বললে বেরোবে না। কেমন?”

রামদীন মাথা নেড়ে রাজি হয়ে চলে গেল। তারিণীর কপালে ভ্রূকুটি। প্রিয়নাথ তাকে শুধালেন, “মার্ডার ওয়েপন দেখবে না?”

“হ্যাঁ, সে তো দেখবই। কিন্তু …”

“আবার কিন্তু কী?”

“ভাবছি আসলে খুন হয়েছে ঠিক কটা? একটা? দুটো? তিনটে? নাকি আরও বেশি?”

.