৩. যাত্রাপথে

৩. যাত্রাপথে

মার্টিন কোম্পানির গদাইলশকরি ট্রেন টুং টাং টুং টাং শব্দে রানিগঞ্জ অবধি পৌঁছোতেই বেলা পার করে দিল। প্রিয়নাথ সঙ্গে যাচ্ছেন বলে এবার মাখন আর তার খোকার জন্যে জেনানা কামরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুরুতে গাড়ি এত ধীরে চলছিল যে আদৌ কোনও দিন রানিগঞ্জে পৌঁছোবে কি না সন্দেহ। যখন-তখন গাঁয়ের ছেলেরা চলন্ত গাড়ির পাদানিতে উঠে খানিক এগোনোর পর আবার লাফিয়ে নেমে যাচ্ছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কন্ডাকটর পারলে ঘর থেকে ডেকে ডেকে ট্রেনে লোক তুলছে। তাতেও কারও তেমন ভ্রূক্ষেপ নেই। মাখন নিজের চোখে দেখেছে, কন্ডাকটর পথচলতি এক মহিলাকে অনুরোধ করছে, “বলি ও মাসি, হেঁটে যাচ্ছ যে! ট্রেনে উঠে পড়ো।” সেই মাসিও তেমনি। তিনি”ভূমি এগোও বাবা, আমার তাড়া আছে”, বলে দ্রুত পদে পা চালিয়ে ট্রেনের আগে এগিয়ে গেলেন। খোঁড়াতে খোঁড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে ট্রেন এগোতে লাগল।

মাখনের খোকাটি বড়ো দুরন্ত। সবে সামনের দুখানি দাঁত উঠেছে আর তা দিয়েই সামনে যা পায় তার উপরে দাঁতের জোর পরখ করে দ্যাখে। একটু নজরের আড়াল করলেই দূরস্তুপনা চালু। শুরুতে সে খানিক জানলা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখলে, তারপর খানিক ঘুমিয়ে উঠেই ভয়ানক ছটফট আরম্ভ করে দিলে। একা মাখনের জো কী যে তাকে সামলায়। বরবাবাজিও অন্য কামরায়, আর এদিকে খোকা একখানা টিনের সৈনিকের মাথার টুপিটা প্রাণপণে চিবানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

“ও কী, হ্যাঁ রে খোকা, ছাড় ছাড়, বলি দাঁত দুখানি তো ভেঙে যাবে”… বলে ছাড়িয়ে নিতেই সে “না-ন্না-ন্না-ন্না” করে চিলচিৎকার জুড়ে দিলে। গোটা কামরার অনেকেই বিরক্ত মুখে মাখনের দিকে চাইল। মাখন অনেক ভুলিয়েভালিয়েও কিছুতেই খোকাকে সামলাতে পারলে না।

“দাও দেখি, তোমার খোকাকে আমার কাছে দাও।” বলে যে হাসিমুখ মেয়েটি দুহাত বাড়িয়ে দিল, মাখন শুরু থেকে একে দেখলেও সাহস করে কথা বলতে পারেনি। মেয়েটি মাখনেরই বয়সি হবে। মুখে অদ্ভুত এক সারল্য। কিন্তু এর পোশাকআশাক গড়পড়তা আর পাঁচটা বাঙালি মেয়ের মতো না। চুল টেনে পিছনে খোঁপা করে বাঁধা, পরনে লম্বাহাতা সাদা গাউন, গলায় সোনালি ক্রুশ ঝুলছে। এতক্ষণ জানালার ধারে বসে কালো মলাটের একখানি বই মন দিয়ে পড়ছিল সে। এবার খোকার দিকে দুহাত বাড়াতেই খোকা একগাল হেসে তার কোলে নিজেকে সঁপে দিল। মাখনও একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

গল্প জমে উঠতে সময় লাগল না।

“অনেক দূরে কোথাও যাচ্ছ বুঝি?”

“তা ভালো জানিনে বাপু। রাতের বেলায় আমার স্বামী এসে বললেন, খুব জরুরি দরকার। বেরুতে হবে। হাতের কাছে যা আছে গুচিয়ে ফ্যালো। আর আমিও কোনওমতে রাত জেগে বাক্সে সব কিছু ভরে তাঁর পিছু পিছু চলে এলাম। বেরিয়েচি সেই ভোররাতে। তিনিও এই গাড়িতেই আচেন। বন্ধুর সঙ্গে। অন্য কামরায়।”

“তা কোথায় যাচ্ছ, নামটুকুও জানো না?”

“নাম বলেছিল বটে। পাহাড়ি এলাকা। তাঁবাটোলা না তাঁবাটুলি কী যেন।”

এবার মেয়েটির চোখ গোল গোল হয়ে মুখ হাসিতে ভরে উঠল।

“কী বলছ গো? তামাটুলি? আরে আমিও তো সেখানেই থাকি! তামাটুলির কোথায়, কিছু জানো? অবশ্য না জানলেও চলবে। ওইটুকু তো টাউন। দেখা তয়েই যাবে। আমি অবশ্য আজ যাব না। রানিগঞ্জে আমাদের মিশনের কিছু কাজ আছে। সেটা সেরে কাল কি পরশু যাব। তুমি থাকবে তো কিছুদিন?”

মাখন কিছু না ভেবেই উপরে নিচে মাথা নাড়ল।

“বাহ! তাহলে তো হয়েই গেল। ওখানে আমাদের মিশনের মেয়েদের একটা আশ্রম আছে। পারলে এসো। ভালো লাগবে। আমাদের সিস্টার এলা প ভালোমানুষ। ওকে জানিয়ো আমার সঙ্গে ট্রেনে তোমার আলাপ হয়েছে। গুণ আদর যত্ন করবেন।”

“কিন্তু তোমার নামটা তো জানা হয়নি ভাই।”

“উত্তমা, থুড়ি ক্যানডেনস। সবাই আমাকে ওখানে খুকি নামে ডাকে। এই তোমার খোকা, আর এই আমি খুকি”, বলে যেন কতই না মজা পেয়েছে এমনভাবে হো হো হেসে উঠল। খোকাও কিছু বুঝতে না পেরেই অকারণে মাড়ি বের করে হাসতে লাগল।

“তোমার খোকার হাসিটা বড্ড বায়না করা!”

“আমার নাম মাখনলতা। তুমি আমায় মাখন বলে ডেকো’খন।”

.

রানিগঞ্জ থেকে গাড়িতে চাপতে হবে। ইনল্যান্ড ট্র্যানজিট কোম্পানিকে তার করে আগে থেকেই ডাকগাড়ি ভাড়া করে রেখেছিলেন প্রিয়নাথ। আঁকাবাঁকা নদীতে জল প্রায় নেই। সাপের শুকনো খোলসের মতো সেই নদী মৃত পড়ে আছে। তবু গাড়ি কাদায় আটকে যাওয়ায় কুলিদের দিয়ে ঠেলে সে গাড়ি উপরে উঠাতে হল। একফাঁকে গুটিকয় নগ্নদেহ আদিবাসী শিশু এসে গাড়ির চারদিকে ঘিরে “মেমসাহেব একটা পইসা দিবি? একটা পইসা দিবি?” বলে মাখনকে ব্যস্ত করে তুলল। মাখন যেই একজনকে পয়সা দেয়, সে তালি দিয়ে নেচে ওঠে, আর কোলে বসে থাকা খোকাও পরম আমোদে খিলখিল করে হাসতে থাকে। এইভাবে পাঁচ-ছয় পয়সা দেবার পর তারিণী এসে না থামালে মেলা খরচা হয়ে যেত।

নদী পেরোতেই চারিদিকের প্রকৃতি সব কেমন বদলে গেল। মনে হল যেন কালো মেঘের দল মাটিতে নেমে এসেছে। আরও কিছু কাছে যেতে পাহাড়গুলো স্পষ্ট চেনা যেতে লাগল। এখানেই খানিক দূর গিয়ে বিরাট এক বনের সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। বনের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলার আর কোনও পথ নেই। এবার পালকিই সম্বল। তামাটুলি থেকে জোড়া পালকি পাঠানো হয়েছে। একখানিতে প্রিয়নাথ একা, আর অপেক্ষাকৃত বড়োটিতে স্ত্রী পুত্র সহ তারিণী চেপে বসল। মৃদু শব্দে বনের মধ্যে দিয়ে পালকি এগিয়ে চলল। খানিক যাবার পর আর কোনও পথ দৃশ্যমান হয় না। পাহাড়ের গায়ে, উপরে, নিচে সর্বত্র জঙ্গল। কোনও খেত নেই, গ্রাম নেই, নদী নেই, পথ নেই—কেবল বন। ঘন, গভীর বন। উপরের দিকে তাকালে শুধু পাহাড় আর পাহাড়ের উপর পাহাড় যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তরঙ্গে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছে। এর আগে দার্জিলিং-এ তারিণীরা পর্বত দেখেছে, কিন্তু সে পর্বত কাঁচা, সবুজ আর নবীন শ্যামলিমায় ঢাকা। কিন্তু এই সুপ্রাচীন বনভূমি, এই প্রাগৈতিহাসিক যুগের গ্রানাইট আর ব্যাসল্ট শিলায় ঘেরা প্রকৃতি মনে এক অদ্ভুত বিষাদের জন্ম দেয়।

এভাবেই ঘণ্টা দু-এক যাবার পর যখন সন্ধ্যা হয় হয়, বনমধ্যে পায়ে চলার পথ দেখা গেল। গলার কাঠের ঘন্টার আওয়াজ শুনে তারিণী বুঝতে পারল পোনা গোরুরা এবার যে যার ঘরে ফিরছে। খানিক বাদেই বন উধাও হয়ে ছোটো ছোটো কৃষিক্ষেত্রের দেখা মিলল। রাস্তার দুইপাশে খড় আর খাপরার চাল দেওয়া গোলাকার কুটির। দেওয়ালে নানা রঙের ফুল, গাছপালা আঁকা। কেউ কেউ দেওয়ালে কাচের টুকরো বসিয়েছে। তাতে যাই যাই রোদের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে।/আগুনবরন মোরগ ঘুরে বেড়াচ্ছে দাওয়ায়, ধুলোয় গাঁজানো মদের নেশা ধরানো গন্ধ, কুকুরের একটানা ডাক আর পালকির সঙ্গে অচেনা ভাষায় গাইতে গাইতে ছুটে আসা শিশুদের একঘেয়ে গান শুনে নাগরিক তারিণীর মনে হল কলকাতা শহরের বিজলিবাতি, ছ্যাকরাগাড়ি, ট্রাম বাস, লোকজনের ভিড় যেন দূরতর কোন ফেলে আসা জন্মের কথা। অচেনা এক সমান্তরাল পৃথিবীর পথ বেয়ে নিরন্তর এগিয়ে চলেছে তারা।

গ্রাম পার হতেই দূরে যখন সাদা গির্জের চুড়োটা চোখে পড়ল, বোঝা গেল তামাটুলি এসে গেছে। সূর্য তখন অস্তাচলে। শুধু পশ্চিম আকাশের লাল ভাবটা মিলিয়ে যায়নি একেবারে। হুম হুম শব্দ করে সেই গির্জা পেরিয়ে, বিরাট এক মাঠ পার হয়ে জমিদারবাড়ির সদর দরজা। দুইদিকে দুই উদ্যত সিংহের মূর্তি বসানো। বিরাট সেই সিংদুয়ার খুলে দিল দুজন বলশালী পাইকান। অবশেষে পালকি থামল জমিদারবাড়ির সামনে। কলকাতাতে এত বড়ো অট্টালিকা আগে দেখেনি তারিণী। প্রিয়নাথও না। ম্যাকিনটশ বার্নের নকশা গায়ে। সামনে বড়ো বড়ো করিন্থিয়ান থাম। যেন গ্রিক স্থাপত্যের কোনও অট্টালিকা। খিলান দেওয়া সিঁড়ি একতলা থেকে উঠেছে দোতলায়। জানালায় রংবেরং-এর কাচ। জমিদারমশাই সপার্ষদ দাঁড়িয়েছিলেন পোর্টিকোতে। আগেই খবর পেয়েছিলেন নিশ্চিত। তারিণী আর প্রিয়নাথ পালকি থেকে নামতেই হাসিমুখে জমিদার এগিয়ে এলেন তাদের দিকে কিন্তু এই হাসি বড্ড কেঠো। যেন জোর করেই হাসছেন।

“আসুন আসুন। গরিবখানায় আস্তেজ্ঞে হোক।”

প্রিয়নাথ নিজেদের পরিচয় দিয়ে সরাসরি কাজের কথায় এলেন, “সেসব পরে হবে। কিন্তু অবস্থাগতিকে তারিণীর পরিবার আর শিশুসন্তানকেও সঙ্গে আনতে বাধ্য হয়েছি। বেচারারা এতটা পথ যাত্রা করে হা-ক্লান্ত। আপনি বাড়ির মেয়েদের একটু খবর দিন। আগে খোকার জন্য একটু দুধ ইত্যাদির ব্যবস্থা করুক।”

তারিণী “আহা, সে সব হবে’খন। এত অস্থির হবেন না” বলতে গিয়ে প্রিয়নাথের চোখ পাকানো দেখে চুপ করে রইল। জমিদারবাবু বাস্তবিকই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে জনা তিনেক দাসী দৌড়ে এসে সসন্তান নাগন আর তাদের মালপত্র ভিতরবাড়িতে নিয়ে গেল।

“আমাকে এখুনি বেরুতে হবে। লোকাল পুলিশ স্টেশনে গিয়ে রিপোর্ট করব। তারিণীও সঙ্গে যাবে।”

গোপীনাথ কী যেন বলবেন বলে বার দুই মুখ খুলেই ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলেন।

“কিছু বলবেন?”

“আজ্ঞে পুলিশ স্টেশনে এখন কাউকে পাবেন না।”

“কেন?”

“সবাই বেদিয়া পাড়ায় গেছে।”

“কোথায়?”

“কাছেই একটা সাঁওতাল পাড়া আছে। সেখানে।”

“কেন?”

“আজ্ঞে কী আর বলি, আজ দুপুরেই একটা বেদিয়া মেয়েছেলে অদ্ভুতভাবে মারা গেছে।”

.