দ্বাদশ অধ্যায়–অসম্ভব হত্যাকাণ্ড
পরদিন খুব ভোরে সপার্ষদ দারোগা নলিনীকান্ত গ্লেনডেলের উদ্দেশে বেরুলেন। দুটি টানা ঘোড়ার বগি গাড়ি। একটিতে তারিণীর সঙ্গে তিনি নিজে। অন্যটিতে কিছু নেটিভ পুলিশ কনস্টেবল। এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটতে চলেছে। আর তারই সাক্ষী হতে চলেছেন তাঁরা। তারিণীকে বিশদে সেই কথাই বলছিলেন যেতে যেতে।
“বুঝলে কি না, এই জর্জ ছেলেটি মহা ধড়িবাজ। আমি শুরু থেকেই একে চিনি। অত্যাচারী, শয়তান। অথচ ফুর্তিবাজ। একবার শুধু মজা দেখবে বলে মিঃ ব্রাউনের ক্যানারির খাঁচায় একটা বিড়াল ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু গতকাল সব হিসেব উলটে গেল। কাল বিকেলে তোমরা দুজনে তখন বেরিয়েছ। আমিও রোঁদ সেরে সবে বাড়িতে এসেছি। এমন সময় দেখি বাইরে একটা জুড়িগাড়ি এসে থামল। গোর্খা চাকর এসে জানাল, এক সাহেব দেখা করতে এসেছেন। সাহেবসুবোরা আমার বাড়িতে আসেন না তা নয়, কিন্তু আগেভাগে জানিয়ে আসেন। গিয়ে দেখি জর্জ বসে। বললে বিশ্বাস করবে না, আমি দেখে চিনতে পারিনি প্রথমে। গোটা মুখ কাগজের মতো সাদা। ঠোঁট কাঁপছে। চোখে ভয়। বিশ্বাস করো তারিণী, আমি অনেক মানুষ দেখেছি, কিন্তু মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষ দেখলেই আমি চিনতে পারি। সাহেব ঘরময় পায়চারি করছিলেন। আমায় দেখে এগিয়ে এসে দুই হাত চেপে ধরলেন। গলা কাঁপা কাঁপা। বললেন, ‘মিস্টার চক্রবর্তী, একটা খুব পার্সোনাল প্রশ্ন করব আপনাকে। যদি কিছু মনে না করেন।’
আমি আর কী বলব। বললাম, করুন।
উনি যে প্রশ্ন করলেন, তার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না। মাটির দিকে খানিক তাকিয়ে মুখ তুলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন?’
বাঙালি ব্রাহ্মণসত্তান আমি। ভূত আর ভগবান দুয়েতেই বিশ্বাস না করে উপায় কী! তো বললাম, করি। বলা মাত্র কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাহেব। ‘প্লিজ সেভ মি, প্লিজ মিস্টার’ বলতে লাগলেন বারবার। সেই সেদিনের রোখের বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। প্রথমে তো কিছু সময় গেল সাহেবকে প্রকৃতিস্থ করতে। তারপর যা শুনলাম, বুঝলে, সে এক ভয়ানক কাণ্ড।”
“কী কাণ্ড?”
“তুমি, কল্যাণী, তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়ে প্রেতযোনিতে বিশ্বাস করো না। আমি করি। শুধু করি না, প্রেতের ক্ষমতা নিয়ে আমার সম্যক ধারণা আছে। * এই জায়গায় গলাটাকে একেবারে খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন নলিনীকান্ত, “গত পরশু গভীর রাতে ওর ঘরে ওফেলিয়া এসেছিল।”
“স্বপ্নে?”
“না না। তখন রাত প্রায় আড়াইটে। জর্জ তখনও ঘুমাতে যায়নি। চা বাগানের হিসেবনিকেশ করছিল বসে বসে। আচমকা পিছনে কেমন একটা শীতল হাওয়ার স্পর্শমতো বোধ হওয়াতে ফিরে তাকিয়েই দ্যাখে ওফেলিয়া দাঁড়িয়ে। পরনে সেই সাদা গাউন। মনে হয় পা যেন মাটিতে ছুঁয়ে নেই। শূন্যমার্গে অদ্ভুতভাবে ঝুলে আছে সে। হাতে স্লাইসার। কোন স্লাইসার বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই…”
“হ্যাঁ, যেটা দিয়ে ওফেলিয়ার…”
“ঠিক। এবারে বোঝো। There are more things in Heaven and Earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy. পাশ্চাত্যে মাদাম ব্লাভাটস্কি বলেন …”
“তারপর ওফেলিয়া কী করল?”
“ও হ্যাঁ, ওফেলিয়া নাকি বলেছে জর্জের জন্মদিনের দিন ওরা একসঙ্গে আবার মিলিত হবে। তবে ইহলোকে না। পরলোকে। সকাল সাড়ে আটটায় জর্জের জন্ম। সেই সময়ই মৃতরা জেগে উঠবে নরকের থেকে। তখন জর্জকে এই পৃথিবী ছাড়তে হবে। আর জর্জের জন্মদিন…’
“বুঝেছি। আজকে। কিন্তু বাড়িতে না থেকে জর্জ এখন চা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন?”
“আজ মাসপয়লা। সকালের দিকে চায়ের পালংবাড়িতে অনেক কাজ থাকে। সেগুলো মালিক না দেখলে হয় না। তাই জর্জের ইচ্ছে আমি নিজে পুলিশ ফোর্স নিয়ে ওখানে থাকি। ওর প্রোটেকশানের জন্য।”
“সেসব তো ঠিকই আছে নলিনীবাবু, কিন্তু যে জর্জ সেদিন আপনার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করল, আজ তাকেই…”
“সেসব ছাড়ো। হাজার হোক এঁরা হলেন মনিবের জাত। কথায় কথায় মাথা কাটতে পারেন। আর দ্যাখো, আমরা পুলিশ। আমাদের কাজ বিপদে পড়লে মানুষকে সাহায্য করা। তাতে তো আর না করতে পারি না।”
“কিন্তু বিপদ যেদিক থেকে আসবে বলছেন, সেখানে পুলিশ খুব কাজে আসবে কি?”
নলিনী উত্তর দিলেন না। একপ্রকার গুম হয়ে বসে রইলেন।
প্রায় দুশো একর জুড়ে গ্লেনডেলের বিশাল চা বাগান। একদিকে ছোটো ছোটো ঢা গাছ গড়ে তোলা হচ্ছে। এর নামই পালংবাড়ি। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক চা গাছ থেকে পাতা আর কুঁড়ি নিয়ে পিঠে রাখা শাঙ্কব ঝুড়িতে ফেলছেন একদল পাহাড়ি মহিলা। তবে একটা জিনিস দেখে বেশ অবাক লাগল তারিণীর। এমনটা সে আগে কোনও দিন দেখেনি। মুখোমুখি দুটো ছোটো পাহাড়ের ঢাল জুড়ে চায়ের বাগিচা। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে দ্রুত যাবার জন্য অদ্ভুত এক কল করেছেন এরা দুটো পাহাড়ের মাথাতেই লম্বা স্তম্ভে পুলি আর তার দিয়ে বাঁধা। তারের প্রান্তে একটা করে বিরাট লোহার ঝুড়ি। সেই ঝুড়িতে একজন মানুষ অনায়াসে বসে থাকতে পারে। দুটো ঝুড়ি দুই পাহাড়ে। একটা এ পাহাড়ে এলে অন্যটা ও পাহাড়ে যায়। এই চলাচলের জন্য কপিকলের ব্যবস্থা আছে। ফলে শূন্যমার্গে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাতায়াত করে সহজেই কাজের দেখাশোনা করা যায়।
“এর নাম রোপওয়ে। বিলেতেও এদানি এসবের চল হয়েছে। ওফেলিয়ার বাবা করিৎকর্মা লোক ছিলেন। পাঁচ বছর আগেই এই ব্যবস্থা করে গেছেন। এখন দেখি সাহেব কোথায়?”
দেখতে খুব বেশি কষ্ট করতে হল না। উলটো দিকে যে পাহাড়টা আছে, সেখানেই তিন-চারজন গোর্খা কামিনের সঙ্গে সাহেব কথায় ব্যস্ত ছিলেন। তারিণী পকেট থেকে ঘড়ি বার করে দেখল। আটটা বেজে কুড়ি মিনিট। জর্জের কথা যদি সত্যি হয়, তবে আর মাত্র মিনিট দশেক সময় হাতে আছে। নলিনীবাবু খুব জোরে চেঁচিয়ে”গুড মর্নিং স্যার” বলায় সাহেব তাকালেন। পুলিশ দেখেই বেশ খুশি হয়ে উঠলেন, বোঝা গেল। যেখানে ঝুড়িগুলো এসে থামে, তার চারদিকে টিনের ছাউনি দিয়ে ছোটো ঘর মতো করা। তাদের দেখতে পেয়ে সাহেব দ্রুত ঢুকে গেলেন সেই টিনের ঘরে। কিছুক্ষণ পরেই ওপারের পাহাড়ের সেই ঘর থেকে একটা ঝুড়ি বেরিয়ে এল। সাহেব তাতে বসে আছেন। হাতের ইশারায় সাহেব দেখালেন, তিনি তাদের দিকেই আসছেন। তারিণীরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে রোপওয়ের ঘরটা সামান্য উপরে একটা টিলায়। পাহাড়ের গা কেটে সিঁড়ি মতো করা হয়েছে। দুই পাহাড়ের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল ঝুড়িটা। এদিকের ঘর থেকেও একটা ফাঁকা ঝুড়ি বেরিয়ে এসে ওদিকের পানে রওনা দিল। বাইরে বেশ জোরে হাওয়া বইছে। এদিকের ঝুড়িটা তাই বেশ জোরে জোরে দুলছে। তারিণী সেটাই মন দিয়ে দেখছিল।
“সাহেবকে কেমন একটা লাগছে না?” নলিনীকান্তের কথায় চমকে সাহেবের ঝুড়ির দিকে তাকাল তারিণী। সত্যিই কিছু একটা গণ্ডগোল মনে হচ্ছে। এতক্ষণ সাহেব সোজা বসে ছিলেন। এখন এলিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন ঝুড়ির ধার বেয়ে। বাঁ হাত কাঠের মতো শক্ত। ডান হাত অদ্ভুত কোণে দুমড়ে আছে।
“পড়ে গেলে তো হাড়গোড় একটাও আস্ত থাকবে না। ছেলেটা কি পাগল?” পাশের পাহাড় পেরিয়ে সূর্যের একটা রেখা আচমকা ঝুড়ির উপরে পড়তেই সবাই যেন এক মুহূর্তে নির্বাক হয়ে গেল। সাহেবের দেহ ঝুলছে, আর সেই ঝুলন্ত দেহতে আটকে আছে চকচকে ধারালো কোনও বস্তু।
“সে কী-ই-ই! তোমরা এখানেই দাঁড়াও”, বলে আর্তনাদ করে নলিনী সোজা সিঁড়ি বেয়ে টিলার মাথায় ছুট লাগালেন। সাহেবের ঝুড়ি সেই টিনের ছাউনিতে ঢোকার আগেই তিনি পৌঁছে গেলেন সেখানে। হতভম্ব তারিণীরা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। বিরাট একটা পুতুলের মতো ঝুড়ির গা বেয়ে ঝুলছে জর্জের দেহটা। অনস্ত সময় লাগছে যেন ঝুড়ির এপাশে পৌঁছোতে। অবশেষে সে পৌঁছে গেল অভীষ্ট লক্ষ্যে। নলিনী দারোগার নির্দেশ না মেনেই তারিণী আর কনস্টেবলরা ছুটল সেই টিনের ছাউনির দিকে। টিলার উপরে পৌঁছে দেখল ঘরের ঠিক মাঝে দুই পা ছড়িয়ে বসে থরথর করে কাঁপছেন নলিনীকান্ত। তাঁর চোখেমুখে অদ্ভুত আতঙ্ক। দৃষ্টিতে ঘোর অবিশ্বাস। তাঁর ঠিক সামনেই সেই ঝুড়ি। আর ঝুড়ির মধ্যে জর্জ উইলিয়ামসন এলিয়ে পড়ে আছেন। নিশ্চল, নিষ্কম্প। এ দেহে যে প্রাণ নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাহেবের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে সামান্য উঠে আছে ইস্পাতের একটা ছোরা। এমন ছোরা দুদিন আগে সে নিজেই একটা কিনে এনেছে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং-এর দোকান থেকে। পাহাড় বাইতে কাজে লাগে, বলেছিল দোকানি। পকেট থেকে ঘড়ি বার করল তারিণী। সবে সাড়ে আটটা বাজল।
ভূত থাক বা না থাক, ওফেলিয়ার ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে।
