৯. মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট

৯. মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট

গণপতিকে দেখে তারিণী বা প্রিয়নাথ দুজনের কেউই প্রথমে চিনতে পারেনি। এ কী চেহারা হয়েছে গণপতির? রাত্রি জাগরণে চোখ দুটো জবাফুলের মতো টকটকে লাল, কোটরাগত। গাল ভরা না-কাটা এলোমেলো দাড়ি। রোদে পুড়ে গায়ের বর্ণ ঝলসে গেছে, কিন্তু এসব কিছুই না, এক অচেনা বিষাদ জড়িয়ে রয়েছে গণপতিকে। শত বিপদেও যে মানুষকে ভেঙে পড়তে দেখেনি তারিণী, এমনকী জাদু দেখাতে গিয়ে গঙ্গায় ডুবে প্রায় মরে যেতে যেতেও যে গণপতি হাল ছাড়েনি, তার এমন দশা দেখে তারিণীর কান্নাই পেল। চার্চের একটা গুমটি মতো ঘরে গণপতিকে রেখে দেওয়া হয়ছে। ঘরের একদম উপরে ছোট্ট একটা চৌকো গর্ত দিয়ে যতটুকু আলোবাতাস ঢোকে। ঘরের ভিতরে পুরীষ আর মূত্র মিশ্রিত গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়। এই শীতেও তারিণীর কপাল দিয়ে টপটপিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল।

“এই ঘরে একে কে রেখেছে?” বেশ ধমক দিয়েই বললেন প্রিয়নাথ।

যে সেপাইকে দ্বাররক্ষক হিসেবে রাখা হয়েছিল, সে লম্বা স্যালুট মেরে জানাল, হার্পার সাহেবের সেরকমই ইচ্ছে।

প্রিয়নাথ আর কথা বাড়ালেন না। বললেন বন্দিকে অন্য কোনও ঘরে নিয়ে যেতে। তিনি জেরা করবেন।

গণপতিকে পাশেই এক ফাঁকা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। হাতে বেড়ি। সেখান থেকে শিকল নেমে এসেছে পায়ের বেড়ি অবধি, চলতে ফিরতে ঝনঝন শব্দ হচ্ছে। গণপতি কলদেওয়া পুতুলের মতো থপথপ করে অন্য ঘরে গিয়ে চেয়ারে বসে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রিয়নাথ গার্ডকে বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে বললেন। সে বেরোতেই শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছ গণপতি?”

গণপতি কোনও উত্তর দিল না। আবার একই প্রশ্ন করতে মাটির দিকে তাকিয়েই জবাব দিল, “আজ্ঞে যেমন দেখছেন।”

“তোমার বন্ধু তারিণী এসেছে সেই কলকাতা থেকে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। আমিও এসেছি। দৃশ্চিত্তা কোরো না। যদি তুমি নিরপরাধ হও, তবে আমি নিশ্চিত, আমরা তোমায় বাঁচাতে পারব। তোমার কোনও ক্ষতি আমরা হতে দেব না। কি তারিণী, তাই তো?”

তারিণী শুধু উপরে নিচে মাথা নাড়ে।

“তুমি জানো কি না জানি না, পুলিশ তোমার নামে লম্বা একটা চার্জশিট বানিয়েছে। যা যা অভিযোগ আছে, তাতে তোমার ফাঁসি নিশ্চিত। একটি খুন আর অন্য একটি খুনের ষড়যন্ত্রের মামলা দিয়েছে পুলিশ তোমার উপরে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তুমি নির্দোষ। কেউ তোমাকে ফাঁসিয়েছে। তোমার বাঁচার উপায় একটাই। যা জানো, সবটা বলো। একেবারে শুরু থেকে। কিচ্ছু লুকাবে না, কিংবা বাদ দেবে না।”

গণপতি খানিক চুপ থেকে বলল, “আজ্ঞে কোথা থেকে শুরু করব বলুন তো?”

“তোমার সঙ্গে ভূপেন দাসের আলাপ থেকে শুরু করো।”

তারিণী চমকে উঠল। সে যতদূর ভেবেছিল, টেলরের হত্যাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভূপেনের মৃত্যু কাকতালীয় এবং দুর্ঘটনা মাত্র। তাহলে কি প্রিয়নাথ এই দুই মৃত্যুর মধ্যে কোনও যোগ খুঁজে পেয়েছেন যা তারিণী জানে না? বা প্রিয়নাথ জানাতে চাননি?

“ভূপেন দাসের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। মাস ছয়েক আগের কথা, আমরা তখন প্রোফেসর বোসের বেঙ্গল সার্কাসে খেলা দেখাচ্ছি। বরোদার রাজার আমন্ত্রণে প্রায় সাতদিনের খেলা। বাইরে গেলে প্রোফেসর বোসের কড়া নির্দেশ আছে, বাইরের খাবার খাওয়া যাবে না। শরীর খারাপ হলেই শো নষ্ট। আমরা সবাই তাই মানতাম। মানত না ছোটেলাল। সার্কাসে আমার সঙ্গী ছিল। বেহার প্রদেশের। খেলা দেখাত খুব ভালো। কিন্তু অবাধ্য। সার্কাসের তাঁবু পড়লেই রাতে লুকিয়েচুরিয়ে ভেগে যেত। মেয়েমানুষের দোষও ছিল। একদিন রাতে ঘুমিয়ে আছি। আচমকা শোরগোল। ছোটেলালের ভেদবমি উঠেছে। রাজার ডাক্তার এলেন। কিন্তু আধঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ। খবর নিয়ে জানা গেল সেদিন সন্ধেবেলাতেও সে নাকি চুপিচুপি বেরিয়েছিল। কী খেয়েছিল কে জানে! পরের দিন আবার রাজার কোন অতিথি আসবেন। বড়ো শো। এদিকে আমি একজন সহকারী ছাড়া কানা। কী করব ভেবে পাচ্ছি না, এমন সময় দেবদূতের মতো ভূপেন এসে হাজির।”

“কীরকম?”

“পরদিন সকালে আমি সার্কাসের তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে বোসবাবুর সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় ছেঁড়া কোট আর পাতলুন পরা রোগাপানা এক ছেলে এসে হাজির। জানাল তার নাম ভূপেন দাস। জাতে বাঙালি। কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে বরোদায় এসে পৌঁছেছে। রাজবাড়ির বাগানে কিছুদিন কাজও করেছে। এখন সেখানেও বাকিরা অন্য জাতের লোককে থাকতে দিতে রাজি নয় বলে কাজটি গেছে। দিন সাতেক পাগলের মতো ঘুরছে। ঠিকঠাক খাওয়া নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আমাদের মুখে বাংলা কথা শুনে এসেছে। যদি কিছু ভিক্ষা পায়। প্রোফেসর ভিক্ষা দিতে নারাজ। বললেন, ‘সার্কাসের কাজ করতে পারবে?’

সে ছোঁড়া যেন হাতে চাঁদ পেল। বারবার প্রোফেসর বোসকে পেন্নাম ঠুকতে লাগলে। প্রোফেসর আমার দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘এর একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট লাগবে। আজই। দ্যাখো যদি পারো, তো চাকরি পাকা। না হলে কালই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেব’।”

“কেমন ছিল ভূপেন? কাজের?”

“অবশ্যই। ছোটেলালের চেয়ে একশো গুণ ভালো। তবে একটাই সমস্যা। বড়ো বেশি প্রশ্ন করত। যতটুকু পারতাম উত্তর দিতাম, না হলে ধমকে চুপ করিয়ে দিতাম।”

“কী ধরনের প্রশ্ন?”

“সে নানারকম। সব বিষয়েই তার অত্যধিক আগ্রহ। প্রোফেসর বোসের কিছু প্যাট্রন আছেন। কারা তাঁরা, কে কে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে, সার্কাসের মেয়েদের পূর্বাশ্রমের ইতিহাস, এমন সব।”

“চরিত্র কেমন ছিল?”

“বলতে পারছি না। আমার সঙ্গে যে ধরনের আলোচনা করত, তাতে তাকে সৎচরিত্র বলে মনে হওয়া মুশকিল। কিন্তু সার্কাসের মেয়েদের দিকে কোনও দিন হাত বাড়ায়নি। হয়তো মাত্র মাস ছয়েক হয়েছিল, তাই।”

“তুমি তো তাকে ম্যাজিকের নানা কৌশল শিখিয়েছিলে, নাকি? হাজার হোক তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে কথা।”

“আজ্ঞে ম্যাজিকের আসল কৌশল কি কোনও ম্যাজিশিয়ান শেখায়? শুধু সাহায্য করতে যতটুকু শেখাতে হয় আর কি। সেও খুব জটিল কিছু না। নেহাত মামুলি।”

“কিন্তু বন্দুকের গুলি দাঁতে ধরার কৌশল তো শিখিয়েছিলে? তা না হলে সেদিন সে দেখাল কীভাবে?” তারিণী হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল।

গণপতি খানিক গুম হয়ে কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “হ্যাঁ। ওটা শিখিয়েছিলাম।”

“শেষ কবে মঞ্চে এই খেলা দেখিয়েছিল ভূপেন?” প্রিয়নাথের প্রশ্ন।

গণপতি উত্তর দিল না।

“গণপতি উত্তর দাও”, তারিণী বলল, “এর আগে কবে ভূপেন এই খেলা দেখিয়েছিল?”

“দেখায়নি”, খুব ধীরে মাথা নাড়ল গণপতি।

“মানে?” এবার প্রায় চমকে উঠল তারিণী।”এমন একটা খেলা সেদিনই প্রথম দেখাল ভূপেন? অমন এক গুরুত্বপূর্ণ দিনে?”

“ও জোর করছিল। বলছিল আর কোনও দিনও অনুরোধ করবে না। এই প্রথম, এই শেষ।”

“আর তুমিও ওকে দেখাতে দিলে? এটা জেনেও যে এই খেলায় প্রাণসংশয় আছে?” প্রিয়নাথ প্রায় ধমকে উঠলেন। গণপতি মাথা নিচু করে বসে রইল।

“চুপ করে বসে থেকো না গণপতি”, এবার তারিণী বলল, “যত চুপ থাকবে, তত বিপদে পড়বে। আচ্ছা, এটুকু বলো, এই গুলি ধরার খেলাটা ঠিক কীভাবে দেখানো হয়? মানে তুর্কটা কোথায়?”

এতক্ষণে মাথা উঁচু করে সোজা তারিণীর দিকে তাকিয়ে গণপতি বলল, “একজন সত্যিকারের জাদুকর কোনও দিন তার জাদুর রহস্য বলে দেয় না ।”

“যাই হোক না কেন?”

“হ্যাঁ। যাই হোক না কেন।”

“তবে শোনো গণপতি”, প্রিয়নাথের গলার স্বর এবার বেশ কঠিন, “তুমি জানো কি না জানি না, তুমি যাকে ভূপেন কিংবা নন্তু নামে চেনো, তার আসল নাম অজিত বটব্যাল। সে ইংরেজ সরকার বাহাদুরের নামজাদা গুপ্তচর। আমি নিশ্চিত, তার কাছে তামাটুলির উগ্রপন্থীদের কার্যকলাপ নিয়ে বেশ কিছু তথ্য ছিল। হয়তো সে সময় পেলে টেলরকে কিছু জানাত। কিন্তু তার আগেই প্রায় একইসঙ্গে দুজনেরই অদ্ভুত মৃত্যু ঘটে। কাকতালীয়? আমি বিশ্বাস করি না। আমি একশোভাগ নিশ্চিত, এর পিছনে উগ্রপন্থী দলগুলোর হাত আছে। যেটা নিশ্চিত নই, তা হল তুমি তাদের সঙ্গে জড়িত কি না। আমি আজ রাত্রিটুকু তোমাকে সময় দিচ্ছি। ভালো করে ভাবো। আমি কাল আবার আসব। লাস্ট অ্যান্ড ফাইনাল। তবে যদি সত্যিই তোমার সঙ্গে এই সো কলড স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যোগ থাকে, তবে এই প্রিয়নাথ মুখুজ্জে নিজের হাতে তোমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরাতে দুবার ভাববে না। আফটার অল, আই অ্যাম দ্য মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট অফ হার ম্যাজেস্টি।”

তারিণী এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল।

.